Breaking news
উপসম্পাদকীয়

ডিজিটাল কোলাহল ও ভুয়া তথ্যে তরুণ মনের সুরক্ষা

সিফাত আহম্মেদ
সিফাত আহম্মেদ শিক্ষার্থী তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা
অক্টোবর ১৯, ২০২৬ • 0

প্রতিদিন সকালে আমাদের ঘুম ভাঙে অ্যালার্মের শব্দে নয়, বরং স্মার্টফোনের নীল আলো আর অনবরত ভেসে আসা নোটিফিকেশনের টানে। বিছানা ছাড়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রলে কেটে যায় দিনের প্রথম মূল্যবান আধঘণ্টা। সংবাদের ট্র্যাকিং, সহপাঠী ও বন্ধুদের জীবনযাত্রার ঝলক, লাইক-কমেন্টের ডিজিটাল প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সিংহভাগের প্রতিটি দিন শুরু হয় একধরনের অদৃশ্য ডিজিটাল কোলাহল দিয়ে। কিন্তু এই রঙিন স্ক্রিনের আড়ালে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক মহামারি, যার নাম ‘ডিজিটাল দুশ্চিন্তা’ ও ‘তথ্য-উৎকণ্ঠা’।

 

 

আজকের তরুণ সমাজ যে যুগে বসবাস করছে, তাকে তথ্যের যুগ বলা হলেও এটি মূলত ’তথ্য-বিস্ফোরণ’ ও ‘অপতথ্যের’ যুগে পরিণত হয়েছে। সংবাদের অবাধ প্রবাহ আমাদের যেমন সচেতন করার কথা ছিল, বাস্তব চিত্র তার ঠিক বিপরীত। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি, যা সত্য তথ্যের চেয়ে চটকদার, উত্তেজক ও ভুয়া খবরকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে ও অনলাইন অঙ্গনে প্রতিদিন আমরা এর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখতে পাই।

 

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বাংলাদেশে প্রায় ২৯ হাজার শিশু ও তরুণের ওপর একটি বিস্তৃত মতামত জরিপ পরিচালনা করে। সেই জরিপের ফলাফল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রায় ৬৭ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জন তরুণ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে ‘ভুয়া তথ্য ও গুজবকে’ চিহ্নিত করেছেন। যখন একটি প্রজন্মের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ অনলাইনে থাকা অবস্থায় প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তি ও গুজবের কারণে মানসিক চাপে ভোগেন, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি গভীর এক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট।

 

তরুণদের তথ্য গ্রহণের অভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এনডিসি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯২ শতাংশ প্রতিদিন গড়ে ৩ ঘণ্টার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করে। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এদের মধ্যে ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী কোনো তথ্য বা সংবাদের মূল উৎস হিসেবে ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর বেশি ভরসা করেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাপ্ত তথ্য শেয়ার বা বিশ্বাস করার আগে তা সঠিকভাবে যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেক করে মাত্র ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ বিশাল একটি অংশ যাচাই ছাড়াই তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে বা সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করছে।

 

তথ্য যাচাই না করার এই অনীহা এবং অতিরঞ্জিত বা অসত্য খবরের মুখোমুখি হওয়া তরুণ মনের ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাজশাহী অঞ্চলের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় কাটানো ও ভুয়া সংবাদের সম্মুখীন হওয়া তরুণদের প্রায় ৫৭.৮ শতাংশ নানা মাত্রার বিষণ্নতায় ভুগছে। একটি অমূলক সামাজিক গুজব বা ভুয়ো খবরের কারণে রাতারাতি তৈরি হওয়া সামাজিক আতঙ্ক, রাজনৈতিক অস্থিরতার ভীতি কিংবা সহপাঠীর বিরুদ্ধে সাইবার বুলিং—সবকিছুই শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতাকে তছনছ করে দিচ্ছে।

 

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এই বয়সটি মূলত ক্যারিয়ারের চিন্তা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনা এবং নিজের ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার সময়। কিন্তু প্রতিনিয়ত ভুয়া খবর, অনলাইন ট্রোলিং, তথ্যের বিভ্রান্তি এবং অন্যদের কৃত্রিম সাফল্য দেখে নিজেদের তুলনা করার মানসিকতা তরুণদের মধ্যে তৈরি করছে একধরনের হীনম্মন্যতা ও বিষণ্নতা। অনলাইন অঙ্গনে তথ্য পাওয়ার অধিকার যেমন সবার রয়েছে, তেমনি কোনো তথ্য সত্য নাকি মিথ্যা, তা চেনার ক্ষমতা অর্জন করাও এখন অন্যতম নাগরিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।

 

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেবল পাঠ্যপুস্তকনির্ভর পড়ালেখার বাইরে গিয়ে ‘ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি’ বা মিডিয়া সাক্ষরতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তথ্যের উৎস কীভাবে যাচাই করতে হয়, কোনো সংবাদ সত্য নাকি সাজানো—তা শনাক্ত করার প্রাথমিক জ্ঞান প্রতিটি শিক্ষার্থীর থাকা উচিত।

 

দ্বিতীয়ত, আমাদের ক্যাম্পাসগুলোতে কার্যকর ও প্রবেশযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিষাক্ত প্রভাব থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত রাখতে শারীরিক খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং বই পড়ার চর্চা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

 

তৃতীয়ত, তরুণদের নিজেদেরও স্ব-সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা এখন মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যা-কিছু দেখা যায়, তার সবকিছু সত্য নয়—এই বোধ জাগ্রত করতে হবে।

 

প্রযুক্তি আমাদের জীবনের গতি ত্বরান্বিত করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই গতি যেন আমাদের মানসিক শান্তি ও সামাজিক সংহতিকে পিষে না ফেলে। তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারে আমরা ভেসে যাব নাকি দক্ষতার সাথে সঠিক পথ বেছে নেব—তা নির্ধারণের সময় এখনই। ভুয়া তথ্যের বিষাক্ত প্রভাব মুক্ত করে একটি সুস্থ, সচেতন ও মানসিকভাবে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের তরুণ প্রজন্মের দৃঢ় অঙ্গীকার।

 

0 Comments

Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

উপসম্পাদকীয়

View more
তারুণ্যের রাষ্ট্রচিন্তা : কেমন বাংলাদেশ চাই

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন একটি দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। তরুণরাই আগামী বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক। একটি দেশ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সেই দেশের তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যৎকে কীভাবে চিন্তা ও পরিকল্পনা করছে তার ওপরও।   বাংলাদেশের বিশাল তরুণ সমাজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা, হতাশা ও রাষ্ট্রচিন্তা তাই কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয় – এগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বারবার একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, বর্তমানে এবং আগামীতে তরুণরা কেমন বাংলাদেশ চায়? উত্তরটি খুব বেশি জটিল ও কঠিন নয়। বাংলাদেশের তরুণরা এমন এক বাংলাদেশ চায়, যেখানে নাগরিক হওয়ার অর্থ শুধু ভোট দেয়া কিংবা পরিচয় বহন করা নয়, নাগরিক হওয়ার অর্থ হবে মর্যাদা, অধিকার ও সুযোগের নিশ্চয়তা পাওয়া।   তারুণ্যের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে থাকা উচিত ন্যায়বিচার। কারণ, একটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় তখনই যখন মানুষ বিশ্বাস করে অন্যায় হলে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে তরুণরা এমন এক আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রত্যাশা করে, যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান। বিচার ও আইনের শাসন হবে স্বচ্ছ, কার্যকর ও নাগরিকবান্ধব। কোনো ব্যক্তি তার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। কোনো সাধারণ নাগরিকও তার দুর্বল অবস্থানের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে না।   দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের মেরুদণ্ডকে বিকল করে ফেলে। দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রকে বিকল করার পাশাপাশি জনগণের আস্থাকেও বিকল করে। রাষ্ট্রের একজন তরুণ যখন দেখে যোগ্যতার চেয়ে অযোগ্যকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং নিয়মের চেয়ে অনিয়ম ও প্রভাব বেশি শক্তিশালী, তখন সেই তরুণের মাঝে রাষ্ট্র সম্পর্কে হতাশা তৈরি হয়। তাই তরুণদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের সব সরকারি-বেসরকারি কাজ হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।   তরুণদের কাছে শিক্ষা শুধু একটি সনদ নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে যদি কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ-সুবিধা তৈরি না হয়, তাহলে শিক্ষিত তরুণদের মাঝে হতাশা বাড়ে। আজকের বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু পরীক্ষামুখী না রেখে দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী করা জরুরি। গবেষণা, ভাষা, যোগাযোগ, উদ্যোক্তা তৈরি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সৃজনশীলতার ওপর গুরত্ব বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের বাজারকে আরো বৈচিত্র্যময় করতে হবে। শিল্প, প্রযুক্তি, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষি, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং নতুন ধরনের পেশা ও কর্মসংস্থানের বিকাশ ঘটাতে হবে।   একজন তরুণের রাষ্ট্রচিন্তার আরেকটি গুরত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা। একজন ব্যক্তি যে মতের সঙ্গে একমত নয়, সেটি প্রকাশের অধিকার সেই ব্যক্তির রয়েছে – এই সাধারণ গণতান্ত্রিক বোধ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। মতের বিরোধিতা হতে পারে যুক্তি দিয়ে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত আক্রোশে পরিণত না হয়।   বর্তমান তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে উঠছে। তাদের কাছে ইন্টারনেট শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও মতপ্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই ডিজিটাল অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজন ডিজিটাল নাগরিকত্বের সংস্কৃতি। তথ্য যাচাই না করে গুজব ছড়ানো ব্যক্তিগত আক্রমণ, অনলাইন হয়রানি, কিংবা অপতৎপরতা বিস্তার সমাজের জন্য ক্ষতিকর। একই সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তার সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।   বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের তরুণরা বারবার প্রমাণ করেছে যে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এ দেশের তরুণ সমাজ কতটা একতাবদ্ধ। একটি দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়। বরাবর সব সময়ের জন্য শহর ও গ্রামের সুযোগের পার্থক্য, ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য, নারী ও পুরুষের অসম সুযোগ কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা এসব প্রশ্নও তারুণ্যের রাষ্ট্রচিন্তার অংশ হওয়া প্রয়োজন তরুণদের। তরুণদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশে শুধু জন্ম পরিচয় কোনো নাগরিকের সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করবে না। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে পিছিয়ে পড়বে না। একজন যোগ্য তরুণ কেবল সুযোগের অভাবে প্রতিভা হারাবে না।   আজকের তরুণদের রাষ্ট্রচিন্তায় পরিবেশের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, বিভিন্ন ধরনের দূষণ, নগরায়ণের চাপ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। তাই উন্নয়ন বলতে শুধু সড়ক, সেতু বা ভবন নির্মাণকে বোঝালে চলবে না। উন্নয়ন হতে হবে টেকসই। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।    একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরও করতে হবে–তরুণরা রাষ্ট্রের কাছে যতটা প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব কতটা? একটি ভালো রাষ্ট্র কেবল সরকার তৈরি করে দিতে পারে না। ভালো ও স্বয়ংসম্পূর্ণ রাষ্ট্র গড়তে তরুণদেরও দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। তরুণদের তাই নিজেদেরও প্রস্তুত করতে হবে। গুজবের পরিবর্তে তথ্য, ঘৃণার পরিবর্তে যুক্তি, সহিংসতার পরিবর্তে সংলাপ এবং সুবিধাবাদের পরিবর্তে নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও দুর্নীতিকে প্রত্যাখান করতে হবে। অধিকার দাবি করার পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সম্মান করতে হবে।   বাংলাদেশের তরুণদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো সুযোগ। তরুণরা সুযোগ পেলে কী করতে পারে তার অসংখ্য উদাহরণ আমরা দেখতে পাই শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই সম্ভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগে রূপ দেওয়া। তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের কণ্ঠ শুধু জাগ্রত নয়, তাদের সক্ষমতাকেও কাজে লাগাতে হবে।   তাই পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান তরুণ সমাজ রাষ্ট্রের বোঝা নয়। তারুণ্য একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে  শিক্ষা, দক্ষতা, নৈতিকতা, স্বাধীন চিন্তা ও দায়িত্বশীল নাগরিক অংশগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশ কেমন হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু নীতিনির্ধারকদের হাতে নয়। আজকের তরুণদের চিন্তা, কাজ ও দায়িত্ববোধের মধ্যেই আগামী বাংলাদেশের একটি বড় অংশের উত্তর লুকিয়ে আছে।  

অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0

ডিজিটাল কোলাহল ও ভুয়া তথ্যে তরুণ মনের সুরক্ষা

সাংবাদিক নির্যাতন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য মারাত্মক হুমকি

বাংলাদেশে অলাভজনক সংস্থা, ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্ট রেজিস্ট্রেশনে করণীয়

একটি জাতির আত্মঘাতী ইতিহাস : বাঙালি শিখে জেতে, নাকি জিতে শেখে

বাঙালির ইতিহাসে রক্ত আছে, কান্না আছে, বীরত্ব আছে; অভাব শুধু আত্মসমালোচনার। এই জাতি বারবার বুকের রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখেছে, তারপর সেই ইতিহাসের শিক্ষা মুছে দিয়ে পুরোনো ভুলের নতুন সংস্করণ মঞ্চস্থ করেছে। যে শাসকের বিরুদ্ধে একদিন রাজপথ কাঁপিয়েছে, ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে তারই মতো ক্ষমতাবান হওয়ার স্বপ্ন দেখেছে। যে অন্যায় তাকে রাস্তায় নামিয়েছে, সুযোগ পেয়ে সেই অন্যায়েরই সুবিধাভোগী হতে চেয়েছে। তারপর আবার নির্যাতিত হয়েছে, কেঁদেছে, রক্ত দিয়েছে, স্লোগান তুলেছে। এ যেন ইতিহাস নয়, একই ভুলের পুনরাবৃত্তিতে অভ্যস্ত একটি জাতির দীর্ঘ আত্মবিস্মৃতি।   প্রশ্ন হলো, বাঙালি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়, নাকি ইতিহাসকে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করতে শেখে? তার বিজয় কি মুক্তির দরজা খোলে, নাকি ক্ষমতার ঘরে কেবল নতুন মালিক প্রবেশ করে?   জাতির সংকটকে জন্মগত কাপুরুষতা কিংবা আবেগপ্রবণতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সহজ, কিন্তু সত্য অনুসন্ধানের জন্য যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক আচরণ তৈরি হয় রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে। বাঙালির সংকটও তার রক্তে নয়; তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক নৈতিকতায়—যেখানে মানুষ নিজের জন্য ন্যায় চায়, অথচ ব্যক্তিস্বার্থে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে।   ১৯৫২ সালে বাঙালি ভাষার অধিকারের জন্য লড়েছে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে, ১৯৯০ সালে স্বৈরশাসনের পতন ঘটিয়েছে। প্রতিটি অর্জন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু শাসক বদলানোর সঙ্গে শাসনের চরিত্র কতটা বদলেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন হয়েছে, নাগরিকের অধিকার কতটা দলনিরপেক্ষ হয়েছে—সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরও জরুরি। শাসকের পতন একটি রাজনৈতিক ঘটনা; ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণ দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক অর্জন।   স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সামরিক শাসন, নির্বাচনী রাজনীতি, গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি ও উন্নয়নের নানা বয়ান দেখেছে। তবু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত ও দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে তোলার সংগ্রাম বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। চাকরি, ব্যবসা কিংবা নিরাপত্তার জন্য রাজনৈতিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে নাগরিক অধিকারপ্রত্যাশী মানুষ থেকে ক্ষমতার অনুগ্রহপ্রার্থী হয়ে ওঠে। তখন প্রশ্ন থাকে না, ‘আমার অধিকার কোথায়?’ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, ‘আমার লোক কোথায়?’   এই মানসিকতার প্রতিফলন সমাজেও দেখা যায়। ঘুষের শিকার মানুষ সুযোগ পেলে নিজেই ঘুষ দিতে বা নিতে পারে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ব্যবসায়ী রাজনৈতিক আশ্রয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীকে কোণঠাসা করার সুবিধা খুঁজতে পারেন। ন্যায়সংগত সমাজের প্রত্যাশী অভিভাবক সন্তানের চাকরির জন্য নিয়ম ভাঙার সুপারিশ চাইতে পারেন। নিজের স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার নাগরিকও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের স্বাধীনতা অস্বীকার করতে পারেন।   রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায় অবশ্যই বেশি, কারণ আইন, প্রশাসন ও বলপ্রয়োগের ক্ষমতা তার হাতে। কিন্তু নাগরিকের সুবিধাবাদও অন্যায়কে সামাজিক প্রশ্রয় দেয়। শাসক যখন ক্ষমতাকে অধিকার মনে করেন, অনুসারী তখন ক্ষমতাবানের নৈকট্যকে যোগ্যতা ভাবেন, আর সাধারণ মানুষ নিয়ম মানাকে দুর্বলতা মনে করতে শুরু করে। অন্যায় তখন শুধু ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থা থাকে না; নিচ থেকেও তার সমর্থন তৈরি হয়।   ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এ সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে। সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দ্রুত রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষোভের বৃহত্তর বিস্ফোরণে রূপ নেয়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও উঠে আসে। সরকার পতনের সময় প্রতিশোধমূলক সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়।   এ ঘটনাপ্রবাহের শিক্ষা স্পষ্ট। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন যেমন অগ্রহণযোগ্য, প্রতিশোধের নামে সংঘটিত সহিংসতাও তেমনি অগ্রহণযোগ্য। একটির নিন্দা করে অন্যটিকে বৈধতা দেয়া ন্যায়বিচার নয়; তা নৈতিকতার দলীয়করণ।   ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ক্ষমতার পতনকে কেবল বিজয়ের চোখে দেখলে পরবর্তী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রশ্নগুলো আড়াল হয়ে যায়। স্বৈরাচারী শাসনের পতন নিজে আত্মঘাতী নয়; তা মুক্তির প্রয়োজনীয় শর্তও হতে পারে। আত্মঘাতী হয়ে ওঠে সেই মানসিকতা, যা পতনকেই পূর্ণ মুক্তি মনে করে, কিন্তু পরবর্তী রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে ভাবতে চায় না।   বিজয়ের পরই রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয়। তখন দেখতে হয়, ক্ষমতাসীনরা বিরোধী মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন কি না, বিচারব্যবস্থা ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত থাকছে কি না, প্রশাসন নাগরিককে দলীয় পরিচয়ের বদলে অধিকার অনুযায়ী বিবেচনা করছে কি না। এসব পরিবর্তন ছাড়া গণতন্ত্র কেবল নির্বাচনের আয়োজন হয়ে থাকতে পারে; নাগরিকের স্বাধীনতা হয়ে ওঠে না রাষ্ট্রের স্থায়ী ভিত্তি। বিপ্লবের আবেগ সাময়িকভাবে মানুষকে একত্র করতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানই পারে সেই আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিতে।   যে আন্দোলন ন্যায়বিচারের দাবি তোলে, কিন্তু নিজের পক্ষের অপরাধীর বিচার চাইতে অস্বস্তি বোধ করে, সে ন্যায়বিচারের বদলে ক্ষমতার হাতবদলকে প্রশ্রয় দেয়। যে রাজনৈতিক শক্তি জনগণের ক্ষোভকে পুঁজি করে ক্ষমতায় পৌঁছায়, তারপর বিরোধী মতকে শত্রু মনে করে, সে পুরোনো ব্যবস্থার নাম বদলায়, চরিত্র নয়। আর যে জনগণ নতুন ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করার অধিকার বিসর্জন দেয়, সে নিজের স্বাধীনতার ভিত্তিই দুর্বল করে।   ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের ২০২৪–২০২৫ সালের জরিপগুলোতেও রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে। এসব ফলাফল কোনো চূড়ান্ত ঐতিহাসিক রায় নয়; তবে মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার পরিবর্তন আর মানুষের প্রত্যাশা পূরণ এক বিষয় নয়।   আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই আদর্শের চেয়ে পরিচয়, নীতির চেয়ে নেতা এবং নাগরিকত্বের চেয়ে দলীয় আনুগত্য বড় হয়ে ওঠে। আমরা নেতাকে ভালোবাসি, কিন্তু তাঁর ভুল ধরতে শিখি না। দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করি, কিন্তু দলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস অর্জন করি না। ফলে রাজনীতি নাগরিকের বিবেককে শাণিত করার বদলে তাকে আনুগত্যের শিকলে বেঁধে ফেলে।   এই শেকল ভাঙতে হলে নিজেদের নির্দোষ ভাবার অভ্যাসও ভাঙতে হবে। নাগরিকের দায়িত্ব হলো অপরাধের বিচার পরিচয় দিয়ে নয়, প্রমাণ ও নীতির ভিত্তিতে চাওয়া; ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, এমনকি সেই ক্ষমতা নিজের পছন্দের মানুষের হাতে থাকলেও। আত্মসমালোচনা মানে নিজের অর্জন অস্বীকার করা নয়; অর্জনকে অর্থবহ করতে তার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা। যে সমাজ ভুল স্বীকারকে পরাজয় ভাবে, সে সংশোধনের পথও বন্ধ করে দেয়।   বাঙালির প্রয়োজন আরেকটি বিজয় নয়; প্রয়োজন বিজয়ের অর্থ বদলে দেওয়া। বিজয় মানে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়, তার অধিকারও নিশ্চিত করা। বিজয় মানে নিজের নেতাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে তোলা নয়, তাঁকে জবাবদিহির আওতায় আনা। বিজয় মানে রাষ্ট্রের চাবি হাতে পাওয়া নয়, রাষ্ট্রের দরজা সবার জন্য খুলে দেওয়া।   বাঙালি শিখে জেতে, নাকি জিতে শেখে—তার উত্তর কোনো জাতিগত ভাগ্যে লেখা নেই। তা নির্ধারিত হবে আমাদের রাজনৈতিক আচরণ, নাগরিক সাহস ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণের মধ্য দিয়ে। প্রতিবার পতনের পর যদি আমরা নতুন প্রতিমা গড়ি, নতুন স্লোগান লিখি, অথচ পুরোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকি, তবে ইতিহাস আমাদের বিজয়ী বলবে না; বলবে, আমরা একই ভুলকে বিভিন্ন নামে পুনরাবৃত্তি করেছি।   একটি জাতির সবচেয়ে বড় পরাজয় ক্ষমতা হারানো নয়, নিজের ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা হারানো। যে জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শুধু অন্যায়কারীর পরিচয় বদলাতে চায়, সে মুক্তি অর্জন করে না; মুক্তির সম্ভাবনাকেই বিপন্ন করে।   সত্যিকারের ইতিহাস শুরু হয় বিজয়ের দিনে নয়, বিজয়ী যখন প্রথমবার নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়ায়—সেদিন।

অক্টোবর ১৩, ২০২৬ 0

কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ : টেকসই কৃষি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির রূপরেখা

প্যাকেটজাত খাবারে পুষ্টি লেবেলিং বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা

অতিরঞ্জিত স্ট্যাটাস কনজামশন পরশ্রীকাতরতা উসকে দেয়

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনের খাবারের মান ভালো হবে কবে

দেশে পুষ্টিহীনতায় ভুগছে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ। তার ওপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিন দেখলে মনে হয় যে তারা নিম্নমানের একটি বস্তির হোটেলে খাবার খাচ্ছে। একে তো খাবারের নিম্নমান, তার ওপর খাবারে পাাওয়া যাচ্ছে পোকা ও মাছি। মাঝেমধ্যে আস্ত তেলাপোকাও রান্না হয়ে চলে আসে শিক্ষার্থীদের খাবারের সাথে।   উচ্চ মাধ্যমিক শেষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের। আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য প্রতিটি শিক্ষার্থী সময় পায় গড়ে তিন মাস। হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের স্বপ্নটি পূরণের উদ্দেশ্যে এই তিন মাস সবকিছু উৎসর্গ করে শুধু পড়াশোনায় লেগে থাকে। তারপর একজন শিক্ষার্থী হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সিট পায়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় তার জীবনের আরও একটি যুদ্ধ। তখন একজন শিক্ষার্থীর কাছে মনে হয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার থেকে সারভাইব করাটা আরও কঠিন।   একজন শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে তার মধ্যে একটি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল ক্যান্টিনের খাবারের মান ও পরিবেশের সমস্যা। আমরা জানি, আমাদের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাবার হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ও ফ্রেশ খাবার শরীর ও মনকে ভালো রাখে। আর শরীর ও মন ভালো থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া যায়। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে অধিকাংশ সময় বাসি, পচা ও নিম্ন মানের খাবার পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় খাবারের মধ্যে তেলাপোকাসহ বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত পোকামাকড় পাওয়া যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী এত পরিশ্রম ও প্রতিযোগিতা করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় পোকামাকড় খাওয়ার জন্য?    বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫৩.৮৫% থেকে ৬৩% শিক্ষার্থী নিয়মিত সকালের নাশতা না খেয়ে থাকেন। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী খাবার খান দুপুরে আর রাতে। কিন্তু এই দুবেলার খাবারও শিক্ষার্থীরা মানসম্মত পান না। তাহলে একজন শিক্ষার্থীর গবেষণা বা নতুন কিছু আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখার সুযোগ কোথায়? কারণ, তাঁর পেটে তো থাকে সব সময় ক্ষুধা । পেটে ক্ষুধা নিয়ে এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে তো একজন শিক্ষার্থী গবেষণার মানসিকতা খুঁজে পান না। তখন একজন শিক্ষার্থী চিন্তা করেন কোনোমতে পড়াশোনাটা শেষ করে দ্রুত চাকরির পেছনে ছুটতে হবে।   খাবারের বিষয় নিয়ে হল প্রশাসনের দ্বারস্থ হলে সাধারণত শিক্ষার্থীদের অল্প বাজেটের কথা মেইন ইস্যু হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ হল প্রশাসনগুলোর ভাষ্যমতে, ক্যান্টিনের খাবারের মান খারাপ হওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের অল্প টাকার বাজেটকেই দায়ী করা হয়। তাদের মতে, এই অল্প টাকার বাজেট দিয়ে ভালো মানের খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। কিন্তু বাস্তবে চিত্রটা আরেকটু ভিন্ন। একই টাকার বাজেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনে খাবার না খেয়ে বাইরের সাধারণ হোটেলগুলোতে খাবার খেলে খাবারের কোয়ালিটি বেশ কিছুটা ভালো পাওয়া যায়। তো এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সেইম বাজেট দিয়ে বাইরে ভালো খাবার পাওয়া গেলে ক্যান্টিন কেন ভালো খাবার দিতে ব্যর্থ হবে?   বিশ্ববিদ্যালয় হল ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়ে পরিচালিত এক পুষ্টি বিষয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, একজন বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া শিক্ষার্থীর বয়স ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে (২৮০০-৩০০০) কিলোক্যালরি শক্তির প্রয়োজন হয়। কিন্তু হলের ক্যান্টিনে খাবার খাওয়া শিক্ষার্থী দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্র ১৪৪৯ কিলোক্যালরি পাচ্ছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এই চরম পুষ্টি ঘাটতির ফলে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, রক্তশূন্যতা ও মনোযোগহীনতায় ভুগছেন, যা সরাসরি তাঁদের একাডেমিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।    আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনী উইলি জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনগুলোতে খাবারের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। গবেষক দল ক্যান্টিনের খাবার যেমন (আলুভর্তা ও মুরগির মাংস) পরীক্ষা করে ই. কুলাইসহ ( E.coli) ১৪ ধরনের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডাইনিং ও ক্যান্টিনের কর্মচারীদের ওপর পরিচালিত একটি ‘নলেজ, অ্যাটিটিউড অ্যান্ড প্র্যাকটিস (KAP)’ গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৩১.৫% খাবার পরিবেশনকারী বা বাবুর্চির খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রয়েছে;এবং ২৮.৪% কর্মী রান্না ও পরিবেশনের সময় পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মেনে চলেন।    অধিকাংশ হলের ক্যান্টিনে রান্নার কাজে নিয়োজিত কর্মীদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ বা স্বাস্থ্যবিধি (গ্লাভস পরা, চুল ঢাকা বা নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়া) সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। তা ছাড়া অনেক ক্যান্টিনে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকে না। অস্বাস্থ্যকর পানি, অপরিচ্ছন্ন হাত এবং বাসি ও পচা খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে প্রাণনাশী ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়, যা শিক্ষার্থীদের টাইফয়েড বা ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়েছেন এমন রেকর্ডও রয়েছে।   বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের আওতায় যেকোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ বা ক্যান্টিনে ভেজাল, বাসি, পচা ও জীবাণুযুক্ত খাবার পরিবেশন করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ক্যান্টিনগুলোতে এই আইনের কার্যকারিতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দেয়ালকে একধরনের শিল্ড বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিয়মিত আইনি মনিটরিং বা মোবাইল কোর্টের অভিযান হলের ভেতরে পৌঁছতে পারে না। ফলে ক্যান্টিন মালিকরা একধরনের অদৃশ্য ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন।   প্রতিটি হলেই একজন প্রভোস্ট এবং একাধিক আবাসিক শিক্ষক থাকেন, যাঁদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ডাইনিং ও ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়মিত তদারকি করা। কিন্তু বাস্তবে এই তদারকি খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা যখন একের পর এক ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করেন, তখনো প্রশাসন কোনো কার্যকর বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেয় না। বরং নামমাত্র একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়, যার রিপোর্ট কোনো দিন আলোর মুখ দেখে না।   পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনগুলো বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির দোহাই দিয়ে পর্যাপ্ত ভর্তুকি দিতেও অনীহা প্রকাশ করে। অথচ হাজারও শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেকোনো বিলাসী প্রকল্পের চেয়ে অগ্রগণ্য, তারা তারা ভুলে যায়। চরম জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি মূলত হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিনগুলোকে এক একটি অস্বাস্থ্যকর খাবারের ভাগাড়ে পরিণত করেছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষার বদলে নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনকে বাজি রেখে প্রতিদিন টেবিলে বসতে বাধ্য হচ্ছে।    

অক্টোবর ১১, ২০২৬ 0

‎পার্বত্য চট্টগ্রাম যেভাবে বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি

বাংলাদেশের প্রত্যাশা এবং নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন

শিশুর অধিকারে লেখা হয় ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

তারুণ্যের রাষ্ট্রচিন্তা : কেমন বাংলাদেশ চাই

অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0