ডিগ্রি নিয়ে চাকরির অপেক্ষায় থাকা তরুণদের জন্য এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট) নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। কিন্তু প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার চেয়ে বড় কাজ হলো বাংলাদেশের শ্রমশক্তিকে এআইয়ের সঙ্গে কাজ করার মতো করে প্রস্তুত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়। এটি ইতোমধ্যে ব্যাংকিং, সফটওয়্যার, বিপণন, গ্রাহকসেবা, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও ব্যবসার নানা কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, এ প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বাংলাদেশের শ্রমবাজারের জন্য কী অর্থ বহন করছে? প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এআই আসার আগেই দেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় বা তৃতীয় পর্যায়ের শিক্ষাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বেকারত্বের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই এমন মানুষের ১ দশমিক ২৫ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সামগ্রিক বেকারত্ব ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ, কিন্তু তরুণদের বেকারত্ব ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। শহুরে তরুণদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে ১৩ দশমিক ২৭ শতাংশে পৌঁছেছিল। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব ছিল আরও ভয়াবহ, প্রায় ২৫ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার ছিল ১৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যেখানে উচ্চশিক্ষিত পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মডেলড হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের ১৫–২৪ বছর বয়সী শ্রমশক্তির বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা ২০২৪ সালের ৯ দশমিক ১০ শতাংশের চেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৫ সালের গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় প্রতি চারজন কর্মীর একজন এমন পেশায় কাজ করেন, যেখানে সৃষ্টিশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো না কোনো মাত্রায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে সংস্থাটি বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরো চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার চেয়ে চাকরির কাজের ধরন পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত আরেকটি আইএলও গবেষণায় আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে, এআইয়ের সম্ভাব্য প্রভাবের সূচককে সরাসরি চাকরি হারানোর পূর্বাভাস হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। এসব সূচক মূলত দেখায় কোন কাজগুলো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাবে পড়তে পারে। বাস্তবে চাকরি হারানো নির্ভর করবে প্রযুক্তির খরচ, প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রহণযোগ্যতা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, কর্মীদের দক্ষতা ইত্যাদির ওপর। বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিটি সবচেয়ে বেশি হতে পারে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে। কারণ, একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক কর্মজীবন শুরু করার সময় সাধারণত এমন কাজের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেন, যেখানে অভিজ্ঞতার চেয়ে নিয়মিত তথ্যভিত্তিক কাজের প্রয়োজন বেশি। যেমন : তথ্য এন্ট্রি, গ্রাহকসেবা, প্রাথমিক হিসাব, সাধারণ প্রতিবেদন তৈরি বা কনটেন্ট তৈরি। এআই এসব কাজগুলো দ্রুত করতে পারে। ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠানে আগে ১০ জন কর্মী প্রতিদিনের তথ্যভিত্তিক কাজ করতেন। এআই ব্যবহারের ফলে যদি একই কাজ ছয় বা সাতজন কর্মী করতে পারেন, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি হয়তো পুরোপুরি কর্মী ছাঁটাই করবে না। কিন্তু নতুন কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন কমতে পারে। আইএলওর গবেষণায় দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজগুলো এআইয়ের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তনের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। তথ্য এন্ট্রি, টাইপিং, হিসাব সংরক্ষণ, প্রশাসনিক সহায়তা এবং নিয়মিত নথিপত্র তৈরির মতো কাজ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে আর্থিক বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার তৈরি, ওয়েব উন্নয়ন ও অন্যান্য ডিজিটাল পেশাতেও এআইয়ের প্রভাব বাড়ছে। ২০২৬ সালের আইএলও বিশ্লেষণ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখিয়েছে। আগের কম্পিউটারায়ন ও স্বয়ংক্রিয়তার গবেষণায় মূলত কম দক্ষ ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজকে বেশি ঝুঁকিতে দেখা হতো। কিন্তু আধুনিক এআইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবসা, অর্থনীতি, কম্পিউটিং, শিক্ষা ও প্রশাসনের মতো উচ্চদক্ষতার জ্ঞানভিত্তিক কাজও উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২৫ সালের ফিউচার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি তৈরি হতে পারে, বিপরীতে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি স্থানচ্যুত হতে পারে। অর্থাৎ নিট হিসাবে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ চাকরি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি অবশ্য বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চাকরির সংখ্যা সম্পর্কে কোনো সরাসরি পূর্বাভাস নয়। এটি বিশ্বব্যাপী ১,০০০-এর বেশি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের মতামতভিত্তিক পূর্বাভাস। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপে ৮৬ শতাংশ নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান বলেছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি তাদের ব্যবসায় পরিবর্তন আনবে। একই প্রতিবেদনে এআই ও বড় তথ্য বিশ্লেষণ, নেটওয়ার্ক ও সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার মধ্যে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে শুধু কিছু চাকরি হারাবে না, চাকরির ধরনও বদলাবে এবং নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ইতোমধ্যেই কিছু সংকেত দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি চালু হওয়ার পর এআইয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রতিস্থাপনের ঝুঁকিতে থাকা দক্ষিণ এশিয়ার চাকরিগুলোতে মাসিক চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে অন্যান্য পেশার তুলনায়। একই সময়ে এআই-সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বেড়েছে এবং এ ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন এমন চাকরিতে অন্যান্য পেশাগত চাকরির তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ মজুরি সুবিধা দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে ডিগ্রির সঙ্গে ব্যবহারিক দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়বে। একজন অর্থনীতির স্নাতককে শুধু অর্থনৈতিক তত্ত্ব জানলে হবে না; তথ্য বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান, তথ্যচিত্র তৈরি এবং এআই-সহায়িত গবেষণার দক্ষতা দরকার হবে। একজন হিসাবরক্ষককে শুধু প্রচলিত হিসাববিজ্ঞান জানলেই হবে না; স্বয়ংক্রিয় হিসাবব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করতে জানতে হবে। এ ছাড়া একজন উদ্যোক্তাকে এআই ব্যবহার করে বাজার বিশ্লেষণ, বিপণন, গ্রাহকসেবা ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত উন্নত করতে জানতে হবে। প্রথম কাজ হওয়া উচিত শ্রমবাজারের বাস্তব তথ্য সংগ্রহ। কোন খাতে এআই ব্যবহার বাড়ছে, কোন পেশায় নিয়োগ কমছে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করতে হবে। এআইকে শুধু কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগের বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। অর্থনীতি, ব্যবসা, আইন, সাংবাদিকতা, কৃষি, শিক্ষা প্রতিটি ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের মৌলিক দক্ষতা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এআই ব্যবহারে সহায়তা করতে হবে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রযুক্তির সুবিধা নেয় কিন্তু ছোট ব্যবসাগুলো পিছিয়ে থাকে, তাহলে উৎপাদনশীলতার বৈষম্য আরও বাড়বে। সর্বশেষ এআইয়ের কারণে চাকরির ধরন পরিবর্তিত হলে শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনঃপ্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
প্রতিটি বিষয় পড়ানোর আগে একজন শিক্ষককে প্রথমে বুঝতে হয় শিক্ষার্থী আসলে কোন প্রশ্নটা নিয়ে দ্বিধায় আছে? পর্যটনবিদ্যা পড়াতে গিয়ে গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা শুনেছি তা হলো, এআই যদি সব করে দেয়, তাহলে আমরা এই পেশায় কেন পড়ছি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বোঝা যায়, এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য : ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন, কেবল সরকার বা ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি জরুরি পাঠ। শিক্ষকতার একটি নিয়ম হলো, কোনো ভীতিকর প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমে পুরো সংখ্যাটা দেখাতে হয়, অর্ধেক সংখ্যা নয়। বিশ্ব পর্যটন ও ট্রাভেল কাউন্সিলের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালে পর্যটন খাত বিশ্বব্যাপী রেকর্ড ৩৫৭ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সমর্থন করেছে, এবং এ সংখ্যা চলতি বছরেই ৩৭১ মিলিয়নে পৌঁছানোর কথা। আগামী দশকে এই খাতে নতুন ৯১ মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনটি নতুন চাকরির একটি হবে পর্যটন খাতে। কিন্তু প্রতিবেদনটি একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাতে শ্রমিকের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় ৪৩ মিলিয়নের বেশি ছাড়িয়ে যাবে, বিশেষত হসপিটালিটি খাতে যেখানে ঘাটতি হতে পারে প্রায় ১৮ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে পড়লে একটি জরুরি শিক্ষা পাওয়া যায়, পর্যটন খাতে সমস্যা চাকরি হারানোর নয়, বরং দক্ষ মানুষের অভাবের। যন্ত্র মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছে না, বরং মানুষের অভাব পূরণ করছে, এবং একই সঙ্গে নতুন একধরনের দক্ষতার দাবি তুলছে। শিক্ষার্থীদের যে ভুল ধারণাটি সবচেয়ে বেশি সংশোধন করতে হয়, তা হলো এআই মানেই চাকরি বিলুপ্তি। প্রকৃত পরিবর্তনটি ভিন্ন, ট্যুর গাইডের কাজ থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হবে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা। হোটেল রিসেপশনিস্টের কাজ থাকবে, কিন্তু তাকে বুঝতে হবে এআই বুকিং ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআইয়ের বিকাশ পর্যটন খাতে সম্পূর্ণ নতুন কিছু পদ তৈরি করবে, যেমন ভার্চুয়াল রিয়েলিটিনির্ভর হোটেল অভিজ্ঞতা তৈরির বিশেষজ্ঞ, যাদের কাজ হবে প্রযুক্তি ও অতিথি সেবার মাঝখানে সেতুবন্ধ তৈরি করা। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা নিজেই এগিয়ে এসেছে। সংস্থাটি তাদের অনলাইন একাডেমিতে দশটি নতুন কোর্স যুক্ত করেছে, যেখানে উন্নত এআই সরঞ্জাম একীভূত করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের পর্যটনকর্মীরা প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বাজারে প্রবেশ করতে পারেন। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নাতালিয়া বায়োনা এই প্রসঙ্গে যে কথা বলেছেন। তাঁর মূল বার্তা হলো, পর্যটনের মূল শক্তি এখনো গল্প বলার ক্ষমতা, এবং প্রযুক্তিকে সেই গল্পের বিপণন, প্রচার ও ব্যক্তিগতকৃত অভিজ্ঞতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই এখন সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। আমাদের নিজের প্রেক্ষাপটে ফিরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জাতীয় জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৩ শতাংশের সামান্য বেশি, আর সরকার এই অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এই লক্ষ্য কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স থেকে, যেখানে ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯ নম্বরে, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সর্বনিম্ন। শিক্ষক হিসেবে আমি এই সূচক পড়াই ভিন্নভাবে, নম্বর কম পাওয়ার লজ্জা নয়, বরং কোন বিষয়ে দুর্বলতা আছে তা চিহ্নিত করার সুযোগ হিসেবে। সূচক বলছে, বাংলাদেশ ভালো করেছে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের মাত্রায়, দুর্বল হয়েছে টিকে থাকার সক্ষমতা তথা টেকসই ব্যবস্থাপনায়। অর্থাৎ আমাদের হাতে কাঁচামাল আছে, নেই কেবল তা প্রক্রিয়াজাত করার দক্ষতা ও অবকাঠামো। আশার কথা হলো, সরকার এই ঘাটতি পূরণের কাজ শুরু করেছে। সংসদে জানানো হয়েছে, সারা দেশের প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি সম্ভাব্য পর্যটন স্থান চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এবং পর্যটন নীতিমালা ২০২৬ প্রণয়নের কাজ চলছে, যার আওতায় আগামী চার বছরে ২৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার বিনিয়োগে ৬০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এই মহাপরিকল্পনায় কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম মডেলের কথা বলা হয়েছে, যেখানে পর্যটন এলাকার বেকার যুবক ও নারীদের শেফ, ওয়েটার বা কারিগর হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। শিক্ষক হিসেবে আমার প্রশ্ন একটাই, এই প্রশিক্ষণ কারিকুলামে ডিজিটাল মার্কেটিং, এআই সহায়ক ব্যবহার এবং তথ্যভাণ্ডার ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় কি যুক্ত হচ্ছে, নাকি শুধু ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে? শিক্ষকতায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো তুলনামূলক উদাহরণ। ভারতের ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বহুভাষিক তথ্য ও ব্যক্তিগতকৃত ভ্রমণসূচি দিচ্ছে, এবং মহাকুম্ভ মেলায় কুম্ভসহায়ক নামের বহুভাষিক চ্যাটবট এগারোটি ভাষায় কোটি কোটি তীর্থযাত্রীকে সহায়তা দিয়েছে। সৌদি আরব ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ মিলিয়ন পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যে নিওম মেগাসিটির মতো প্রকল্পে প্রযুক্তিকে জাতীয় কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছে। এ দুই দেশের অভিজ্ঞতা থেকে একটি স্পষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায়, প্রযুক্তি গ্রহণের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিতে হয় মানুষ তৈরির প্রক্রিয়াকে। প্রযুক্তি কেনা যায় দ্রুত, কিন্তু দক্ষ মানুষ তৈরি করতে সময় লাগে বছরের পর বছর। তাই যে দেশ আজ প্রশিক্ষণ কারিকুলামে বিনিয়োগ শুরু করছে না, দশ বছর পর তার হাতে থাকবে চকচকে অ্যাপ, কিন্তু তা চালানোর মতো দক্ষ মানুষ থাকবে না। আমাদের দেশের হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রম এখনো মূলত সনাতনী, খাদ্য পরিবেশন, অতিথি সেবা এবং অদক্ষ ভাষাজ্ঞানে আবদ্ধ। এসব দক্ষতা আজও অপরিহার্য, কিন্তু এখন এর সঙ্গে তিনটি নতুন বিষয় যুক্ত করা জরুরি। প্রথমত, ডিজিটাল উপস্থিতি তৈরির দক্ষতা, যাতে একজন ক্ষুদ্র হোমস্টে মালিকও নিজের প্রতিষ্ঠানকে অনলাইন তথ্যভাণ্ডারে দৃশ্যমান করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, তথ্য বিশ্লেষণের মৌলিক জ্ঞান, যাতে একজন গন্তব্য ব্যবস্থাপক বুঝতে পারেন কোন সময়ে কোন গন্তব্যে পর্যটকের চাপ বাড়বে। তৃতীয়ত, নৈতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বোধ, যাতে পর্যটকের তথ্য সুরক্ষা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করে প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যায়। আমার শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বলি, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব প্রথমে ভয় জাগায়, পরে সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু কেবল তাদের জন্য যারা সময়মতো প্রস্তুতি নেয়। বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাতে যেখানে দক্ষ মানুষের ঘাটতি একটি বড় সংকট হয়ে উঠছে, বাংলাদেশের তরুণ জনসংখ্যা সেখানে একটি বিরল সম্পদ হতে পারে, যদি তাদের সঠিক দক্ষতায় প্রস্তুত করা যায়। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবস তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে, পর্যটন শিক্ষার পাঠ্যক্রম এখনই হালনাগাদ করতে হবে, নইলে যে সুযোগ আজ বিশ্বব্যাপী তৈরি হচ্ছে, বাংলাদেশ কেবল দর্শক হয়েই তা দেখে যাবে। আমার সেই শিক্ষার্থীদের জন্য এই একটি বার্তাই রেখে যেতে চাই, এআই তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তোমার হাতের নতুন একটি যন্ত্র, যাকে ব্যবহার করে তুমি হয়ে উঠতে পারো এমন একজন পর্যটন পেশাজীবী, যাকে কোনো যন্ত্র প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। মো. মামুন হাসান ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।
একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষা আর কেবল চক, ডাস্টার, পাঠ্যবই ও মুখস্থনির্ভর শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ শিক্ষার ধারণা, পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা ও মূল্যায়নে আমূল পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে, প্রাথমিক শিক্ষা—যেখানে শিশুর শেখার ভিত্তি তৈরি হয়—সেখানে প্রযুক্তির পরিকল্পিত ও সৃজনশীল ব্যবহার শিক্ষাকে আরও আনন্দময়, অন্তর্ভুক্তিমূলক, কার্যকর ও জীবনঘনিষ্ঠ করতে পারে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তি অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও শেখার মান, ঝরে পড়া, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি এবং মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির আগে বাংলাদেশে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৪৩ শতাংশ পড়ার ক্ষেত্রে দক্ষতার মৌলিক স্তরে পৌঁছেছিল। ফলে এখন মূল প্রশ্ন শুধু ‘কত শিশু বিদ্যালয়ে যায়’ নয়; বরং ‘বিদ্যালয়ে গিয়ে কতটা শিখছে’—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার জরুরি। প্রযুক্তি হবে শিক্ষার সহায়ক, বিকল্প নয়। প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো—কম্পিউটার, প্রজেক্টর, ট্যাব বা স্মার্ট বোর্ড স্থাপন করলেই শিক্ষার মান বাড়বে। বাস্তবে প্রযুক্তি নিজে শিক্ষা নয়; এটি শিক্ষকের হাতে একটি শক্তিশালী শিক্ষণ উপকরণ। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট স্পষ্টভাবে বলেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষার্থীর স্বার্থকে কেন্দ্র করে হতে হবে এবং এটি মানবিক মিথস্ক্রিয়াভিত্তিক শিক্ষক-নির্দেশিত শিক্ষাকে প্রতিস্থাপন নয়, বরং সহায়তা করবে। অর্থাৎ একজন দক্ষ শিক্ষক + উপযুক্ত শিক্ষণ-পদ্ধতি + প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল কনটেন্ট—এই সমন্বয়ই প্রযুক্তিনির্ভর প্রাথমিক শিক্ষার মূল শক্তি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে পারে বহুমাত্রিক। বাংলা ও ইংরেজি বর্ণমালা শেখাতে অ্যানিমেশন, শব্দ ও ছবি ব্যবহার করা যায়। গণিতের যোগ-বিয়োগ, ভগ্নাংশ, জ্যামিতি কিংবা পরিমাপকে ইন্টার্যাকটিভ গেম ও অ্যানিমেশনের মাধ্যমে সহজবোধ্য করা যায়। বিজ্ঞান বিষয়ে উদ্ভিদ, প্রাণী, সৌরজগৎ, পানি চক্র বা মানবদেহের মতো বিষয়গুলো ভিডিও ও ভার্চুয়াল মডেলের সাহায্যে দৃশ্যমান করা সম্ভব। শিশু যে বিষয়টি শুধু বইয়ে পড়ে, প্রযুক্তির মাধ্যমে সেটি যদি দেখতে, শুনতে ও প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে শেখা হয় অধিকতর অর্থবহ। বিশেষ করে যে শিশুরা পড়ায় দুর্বল, তাদের জন্য পুনরাবৃত্তিমূলক অনুশীলন, অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট এবং স্তরভিত্তিক ডিজিটাল কার্যক্রম কার্যকর হতে পারে। ইউনিসেফের ডিজিটাল শিক্ষাবিষয়ক নীতিতে প্রাথমিক পর্যায়ের মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান উন্নয়নে শিক্ষার্থীর সক্ষমতা অনুযায়ী অভিযোজিত, সহজপ্রাপ্য ও স্থানীয় ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ব্যবহার হতে পারে শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নে। প্রত্যন্ত এলাকার একজন শিক্ষকও অনলাইন প্রশিক্ষণ, ভিডিও টিউটোরিয়াল, ওয়েবিনার, ডিজিটাল রিসোর্স ও সহকর্মী-শিক্ষণ সম্প্রদায়ের মাধ্যমে নিয়মিত নতুন জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। একই সঙ্গে একটি ‘ডিজিটাল শিক্ষক ভাণ্ডার’ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে শ্রেণিভিত্তিক পাঠপরিকল্পনা, শিক্ষণ কৌশল, মূল্যায়ন উপকরণ, ভিডিও পাঠ, ছবি, অ্যানিমেশন ও বিভিন্ন শিক্ষণ-শেখানো সামগ্রী থাকবে। এতে একজন শিক্ষক অন্য শিক্ষকের উদ্ভাবনী কাজ থেকে শিখতে পারবেন। প্রযুক্তি শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং শিক্ষককে আরও দক্ষ করে তুলবে—এটাই হওয়া উচিত আমাদের নীতি। প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হলো শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ। একটি ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থা ব্যবহার করে কোন শিশু কোন বিষয়ে দুর্বল, কোন দক্ষতা অর্জন করেছে এবং কোথায় অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন, তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের Integrated Primary Education Management Information System (IPEMIS) একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে IPEMIS-এর সঙ্গে ৬৫ হাজারের বেশি বিদ্যালয়, ৩ লাখের বেশি শিক্ষক এবং প্রায় ১ কোটি শিক্ষার্থী সংযুক্ত রয়েছে। এ ব্যবস্থায় বিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অবকাঠামো, পাঠ্যবইসহ বিভিন্ন তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়; শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীর সাফল্যের জন্য বিদ্যালয় ও পরিবারের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল অ্যাপ, এসএমএস, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড বা নিরাপদ অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অভিভাবককে সন্তানের উপস্থিতি, শিখন অগ্রগতি, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ জানানো যেতে পারে। বিশেষ করে অনিয়মিত উপস্থিতির ক্ষেত্রে ডিজিটাল ‘early warning system’ তৈরি করা গেলে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীকে আগেই শনাক্ত করে পরিবার ও বিদ্যালয় যৌথভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে। World Bank-ও প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারের মধ্যে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঝরে পড়া প্রতিরোধে early warning system, শিক্ষক উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের চর, হাওর, পাহাড়ি ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষা নানা কারণে ব্যাহত হয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের বলছে, দেশের প্রায় ২ কোটি শিশু জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যার ফলে তাদের শিক্ষাজীবন বারবার ব্যাহত হতে পারে। এখানে অফলাইন ডিজিটাল কনটেন্ট, মোবাইলভিত্তিক শিক্ষা, রেকর্ডেড পাঠ, সৌরবিদ্যুৎ চালিত ডিভাইস এবং স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত ডিজিটাল রিসোর্স কার্যকর হতে পারে। একইভাবে দৃষ্টি, শ্রবণ বা অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা থাকা শিশুদের জন্য অডিও বই, বড় অক্ষরের কনটেন্ট, সাবটাইটেল ও সহায়ক প্রযুক্তি শিক্ষাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে। আগামী দিনের প্রাথমিক শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষার্থীর সক্ষমতা অনুযায়ী অনুশীলনী তৈরি, ভুল শনাক্তকরণ, শিক্ষককে পাঠপরিকল্পনায় সহায়তা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার উপকরণ তৈরি কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য সহায়ক কনটেন্ট তৈরিতে এআই ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এখানে সতর্কতা অপরিহার্য। শিশুর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভুলতা, পক্ষপাত, অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং শিক্ষকের ভূমিকা কমে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হবে। UNESCO ও World Bank উভয়েই প্রযুক্তিকে ‘সমাধানের একমাত্র পথ’ হিসেবে না দেখে প্রমাণভিত্তিক, মানবকেন্দ্রিক ও নিরাপদ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি। যেমন : ১. প্রতিটি বিদ্যালয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট নিশ্চিত করা। ২. শুধু যন্ত্র বিতরণ নয়, যন্ত্রের কার্যকর ব্যবহার শেখাতে শিক্ষকদের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ দেয়া। ৩. জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বাংলা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা। ৪. অনলাইন ও অফলাইন—দুই পরিবেশেই ব্যবহারযোগ্য শিক্ষা উপকরণ তৈরি করা। ৫. শিক্ষার্থীর শিখন অগ্রগতি পরিমাপে প্রযুক্তিনির্ভর formative assessment চালু করা। ৬. প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক শিশুদের জন্য inclusive digital content নিশ্চিত করা। ৭. শিশুদের digital citizenship, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার ও তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা গড়ে তোলা। ৮. প্রযুক্তি প্রকল্প গ্রহণের আগে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ও ফলাফল মূল্যায়ন করা। ৯. বিদ্যালয়ের প্রযুক্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা। ১০. প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতিটি উদ্যোগে শিক্ষক, শিশু ও অভিভাবকের প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘আরও বেশি প্রযুক্তি’ নয়—‘আরও ভালো শেখা’। একটি স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ তখনই সফল, যখন সেখানে শিশু আনন্দের সঙ্গে শেখে, শিক্ষক আরও দক্ষতার সঙ্গে শেখান এবং অভিভাবক সন্তানের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত থাকেন। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে IPEMIS-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ডিজিটাল শিক্ষার নতুন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ UNESCO-UNICEF-এর Gateways to Public Digital Learning উদ্যোগের Community of Practice-এর অংশ। তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন প্রযুক্তি প্রকল্প নয়; বরং ‘শিক্ষককেন্দ্রিক প্রযুক্তি, শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা এবং তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’—এই তিনের সমন্বিত একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প। প্রযুক্তি যেন শিশুর হাতে শুধু একটি ডিভাইস তুলে না দেয়; বরং তার কৌতূহলকে জাগিয়ে তোলে, চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়, শেখার আনন্দ বাড়ায় এবং তাকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে—প্রাথমিক শিক্ষায় প্রযুক্তির প্রকৃত উৎকর্ষতা সেখানেই। শফিকুল ইসলাম রিপন প্রধান শিক্ষক শালঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাঁথিয়া, পাবনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) আজ বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তিগুলোর একটি। চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, ব্যাংকিং, গবেষণা, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে শিক্ষা ক্ষেত্রেও এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এখন শিক্ষার্থীরা কয়েক সেকেন্ডেই জটিল প্রশ্নের উত্তর, রচনা, গণিতের সমাধান, ভাষান্তর, প্রোগ্রামিং কোড, এমনকি ব্যক্তিগত শেখার পরিকল্পনাও এর মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছে। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে, এআই কি ভবিষ্যতে শিক্ষকের বিকল্প হয়ে উঠবে, নাকি শিক্ষকের সবচেয়ে শক্তিশালী সহযোগী হবে? এ প্রশ্নের উত্তরটি সরল নয়, তবে গভীর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এআই শিক্ষকের কিছু কাজের বিকল্প হতে পারলেও একজন প্রকৃত শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হওয়া সম্ভব নয়। বরং দক্ষ শিক্ষক এআইকে ব্যবহার করে আরও কার্যকর, আধুনিক ও ফলপ্রসূ শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন। এআইকে শিক্ষকের বিকল্প মনে হওয়ার কারণ হলো এর কিছু অসাধারণ সক্ষমতা রয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকের কাজকে সহজেই সম্পন্ন করতে পারে। যেমন ১. দ্রুত তথ্য প্রদান : এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজারো বই, গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে উত্তর দিতে পারে। একজন শিক্ষক যেখানে প্রস্তুতি নিতে সময় নেন, এআই তা মুহূর্তেই করে ফেলতে পারে। ২. চব্বিশ ঘণ্টা শিক্ষাসেবা : এআইয়ের কোনো অফিস সময় নেই। শিক্ষার্থী গভীর রাতে প্রশ্ন করলেও উত্তর পেতে পারে। ফলে শেখার সুযোগ সময়ের সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না। ৩. ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা : প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার গতি এক নয়। এআই শিক্ষার্থীর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে আলাদা অনুশীলন, ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে পারে। ৪. প্রশাসনিক কাজ কমানো : প্রশ্নপত্র তৈরি, উত্তর মূল্যায়নের প্রাথমিক ধাপ, উপস্থিতি বিশ্লেষণ, রিপোর্ট প্রস্তুত, পাঠ পরিকল্পনা ইত্যাদি কাজে এআই শিক্ষকদের সময় ও শ্রম কমাতে পারে। এসব কারণেই অনেকে মনে করেন, ভবিষ্যতে এআই শিক্ষকের জায়গা দখল করবে। এআই কেন শিক্ষকের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারবে না, তার ব্যাখ্যা এমন হতে পারে, যেমন (ক) শিক্ষা শুধু তথ্য দেয়া নয় : তথ্য দেয়া আর শিক্ষা দেয়া এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগান, মূল্যবোধ গড়ে তোলেন, ভুল সংশোধন করেন, চরিত্র নির্মাণে ভূমিকা রাখেন। এআই তথ্য দিতে পারে, কিন্তু মানুষ গড়ার দায়িত্ব পালন করতে পারে না। (খ) আবেগ ও মানবিকতা : শিক্ষার্থীর ভয়, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব কিংবা মানসিক সংকট একজন শিক্ষক মুখের অভিব্যক্তি, আচরণ ও পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারেন। এআই উত্তর দিতে পারে, কিন্তু প্রকৃত সহানুভূতি, স্নেহ, অনুপ্রেরণা ও মানবিক স্পর্শ দিতে পারে না। (গ) নৈতিক শিক্ষা : একজন ভালো শিক্ষক শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি দেন না, তিনি সততা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও সামাজিক মূল্যবোধ শেখান। এআই নৈতিকতা সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে, কিন্তু নিজে নৈতিক আদর্শ হয়ে উঠতে পারে না। (ঘ) বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত : একই শ্রেণিতে ৫০ জন শিক্ষার্থীর আচরণ, পারিবারিক অবস্থা, সামাজিক পরিবেশ ও শেখার পার্থক্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া মানুষের কাজ। এআই তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু মানবিক বিচারবোধের সমতুল্য নয়। এআইয়ের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন (ক) প্রচলিত শিক্ষাদান পদ্ধতির গুরুত্ব কমবে : যেসব শিক্ষক শুধু বই পড়ে শোনান বা মুখস্থনির্ভর শিক্ষা দেন, তাঁদের ভূমিকা কমে যেতে পারে। কারণ, একই তথ্য এআই আরও দ্রুত ও আকর্ষণীয়ভাবে দিতে পারে। (খ) দক্ষতার বৈষম্য : এআই ব্যবহার জানেন এমন শিক্ষক এবং যাঁরা জানেন না, তাঁদের মধ্যে দক্ষতার ব্যবধান তৈরি হবে। (গ) কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হবে : পরীক্ষার প্রাথমিক মূল্যায়ন, রুটিন তৈরি, প্রশ্ন প্রস্তুতি, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি ইত্যাদি কাজ এআই করে দিতে পারবে। ফলে এসব ক্ষেত্রে মানুষের শ্রমের প্রয়োজন কমবে। (ঘ) শিক্ষার্থীর অতিনির্ভরশীলতা : যদি শিক্ষার্থী সব উত্তর এআই থেকে নেয়, তবে চিন্তা, বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তখন শিক্ষককে নতুনভাবে শেখানোর কৌশল তৈরি করতে হবে। এআই বিভিন্নভাবে শিক্ষকদের আরও শক্তিশালী সহযোগী হতে পারে। যেমন : এআই বিভিন্ন মানের শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক পাঠ পরিকল্পনা, কার্যক্রম ও মূল্যায়ন তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। যেসব কাজে আগে কয়েক ঘণ্টা লাগত, এআইয়ের সাহায্যে তা কয়েক মিনিটে করা সম্ভব। ফলে শিক্ষক শিক্ষার্থীর সঙ্গে আরও বেশি সময় ব্যয় করতে পারবেন। গবেষণাপত্রের খসড়া, সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য সংগঠন, ভাষাগত সম্পাদনা ও ধারণা বিন্যাসে এআই গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হতে পারে। এআই সহজেই বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ, ব্যাখ্যা ও উদাহরণ দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে সহায়ক। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী কনটেন্ট, ভিন্ন মাত্রার ব্যাখ্যা এবং বিকল্প শেখার উপকরণ তৈরিতে এআই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যতের শিক্ষক শুধু জ্ঞানের উৎস হবেন না, তিনি হবেন শেখার নকশাকার, দক্ষ পরামর্শদাতা, মূল্যবোধের নির্মাতা, প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহারকারী, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশকারী, গবেষক ও উদ্ভাবক অর্থাৎ, তথ্য পরিবেশকের ভূমিকা কমে গিয়ে শেখার পথপ্রদর্শকের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। তাই এআইয়ের যুগে টিকে থাকতে আরও এগিয়ে থাকতে হবে শিক্ষকদের। এআই টুল ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। সমালোচনামূলক চিন্তা ও সৃজনশীল শিক্ষাদান বাড়াতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক ও সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে। গবেষণামুখী হতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও এআইয়ের নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখাতে হবে। প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। এআইয়ের যুগে ভবিষ্যতে সবচেয়ে নিরাপদ থাকবেন সেই শিক্ষক, যিনি নিয়মিত নতুন দক্ষতা অর্জন করেন। প্রযুক্তিকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীর চরিত্র, মূল্যবোধ ও নেতৃত্বগুণ বিকাশে কাজ করেন। গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতায় অগ্রণী থাকেন। অন্যদিকে যিনি কেবল পাঠ্যবই পড়ে শোনান, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে অনাগ্রহী এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চান না, তাঁর পেশাগত চ্যালেঞ্জ বাড়বে। এআই শিক্ষা ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এটি শিক্ষকের অনেক নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ সহজ করে দেবে, কিন্তু মানুষ গড়ার শিল্পকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। একজন দক্ষ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মনে স্বপ্ন জাগান, মূল্যবোধ গড়ে তোলেন, নৈতিক সাহস দেন, ব্যর্থতার সময়ে পাশে দাঁড়ান এবং জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করেন—এসব মানবিক গুণ কোনো অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। যে শিক্ষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিজের দক্ষতার সম্প্রসারণ হিসেবে গ্রহণ করবেন, তিনি আরও কার্যকর, গবেষণামুখী ও প্রভাবশালী হয়ে উঠবেন। আর যিনি পরিবর্তনকে অস্বীকার করবেন, তাঁর পেশাগত গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সুতরাং, এআই শিক্ষকের বিকল্প নয় বরং দক্ষ, দূরদর্শী ও মানবিক শিক্ষকের সবচেয়ে শক্তিশালী সহযোগী। ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে মানবিক শিক্ষকের প্রজ্ঞা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতার সৃজনশীল সমন্বয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকতে কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতাই যথেষ্ট নয়, বরং এর সঙ্গে মানবিক গুণাবলির সমন্বয় জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও জিজ্ঞাসার ক্ষমতা আয়ত্ত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তির প্রতি ভীতি কাটিয়ে একে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে শিখলেই কর্মজীবনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা সম্ভব। কর্মক্ষেত্রে এআই শুধু তথ্য বিশ্লেষণে দক্ষ, কিন্তু মানুষের মতো সহানুভূতি, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতায় এটি অক্ষম। যারা এআই-কে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে বরং মেধাবী শিক্ষানবিশ হিসেবে ব্যবহার করতে শিখবে, তারাই ১০ গুণ দ্রুত কাজ সম্পাদন করে এগিয়ে থাকবে। তাই প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সূক্ষ্ম মানবিক গুণাবলি অর্জনে শিক্ষার্থীদের এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে টিকে থাকতে আজীবন শেখার মানসিকতা এবং নতুন দক্ষতা আয়ত্তের আগ্রহ রাখাই হবে সফল ক্যারিয়ারের মূল চাবিকাঠি।
চীনে নিজস্ব এআই সেবা চালুর লক্ষ্যে আলিবাবা ও বাইদুর প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। এই ঘোষণার পরপরই হংকংয়ের শেয়ারবাজারে দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাক ডিভাইসে এখন থেকে এই দুই প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। চীনের সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্প্রতি অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সসহ সাতটি এআই সেবা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় আলিবাবার ‘কিউয়েন এআই’ মডেল ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা ছবি ও টেক্সট প্রক্রিয়াজাত করার উন্নত সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে, বাইদু আইফোন ডিভাইসের জন্য অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স ফিচার তৈরিতে কাজ করবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে এই অংশীদারিত্ব অ্যাপলের জন্য চীনের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর আইনি লড়াইয়ের উত্তাপের মধ্যেই বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) স্মার্টফোন বাজারে আনার ঘোষণা দিল চীন। সোমবার সাংহাইতে আয়োজিত এক ইভেন্টে 'স্টেপফান' নামের একটি স্টার্টআপ তাদের নতুন ‘স্টেপএক্স নিও’ ফোনটি সবার সামনে নিয়ে এসেছে। নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘স্টেপ এওএস’ এবং ‘স্টেপ আমু’ এআই এজেন্টের সমন্বয়ে তৈরি এই ফোনটি ব্যবহারকারীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ পরিচালনা করতে সক্ষম। মাইক্রোসফটের প্রাক্তন কর্মীদের তৈরি এই এআই স্টার্টআপের দাবি, সাধারণ স্মার্টফোনের মতো এই ফোনে আলাদা করে অ্যাপ খোলার প্রয়োজন নেই। ‘স্টেপ আমু’ নামের এআই এজেন্টটি ভয়েস বা সাধারণ টেক্সট কমান্ডের মাধ্যমেই আর্থিক লেনদেন, ভ্রমণ ও অন্যান্য জটিল কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও কাজ করতে সক্ষম এই এআই মডেলটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের ভিত্তিতে তৈরি। বর্তমানে মার্কিন প্রযুক্তি বাজারে যখন অ্যাপল ও ওপেনএআই-এর মতো কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক গোপনীয়তা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন চীনের এই সাফল্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই স্মার্টফোনের দাম বা বাজারে আসার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নিয়ে এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্টেপফান।
অপরাধ দমনে পুলিশ কর্মকর্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। বৃহস্পতিবার রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে ৪২তম ক্যাডেট এসআই ব্যাচের সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে তিনি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেন। সাইবার অপরাধসহ আধুনিক ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিয়ত নিজেদের আপডেট থাকারও কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। এবারের সমাপনী কুচকাওয়াজে ১৯ জন নারীসহ মোট ৫০০ জন শিক্ষানবিশ ক্যাডেট এসআই অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আইজিপি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী পাঁচ প্রশিক্ষণার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন এবং পুলিশ সদস্যদের সততা ও নিষ্ঠার সাথে জনগণের সেবায় কাজ করার আহ্বান জানান। আইজিপি উল্লেখ করেন, বর্তমানে সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবেলায় পুলিশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনুষ্ঠানে পুলিশ একাডেমির অধ্যক্ষ ও অতিরিক্ত আইজিপি জিএম আজিজুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে এসব ক্যাডেটরা দুই বছরের মাঠ পর্যায়ের বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন ইউনিটে পদায়িত হবেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি দূর করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুরে ব্যবহৃত থার্ড-জেনারেশন প্রযুক্তির কারণে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এর নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান জানান, রূপপুরে অত্যাধুনিক Generation-III+ VVER-1200 প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা অতীতের সব পারমাণবিক দুর্ঘটনার শিক্ষা থেকে তৈরি। কেন্দ্রটিতে কোর ক্যাচার, প্যাসিভ হিট রিমুভাল সিস্টেম এবং ডাবল কন্টেইনমেন্টের মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম। কমিশনিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত কঠোর একটি শিল্পপ্রক্রিয়া, যা তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), আইএইএ (IAEA) এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো ধরনের কারিগরি দুর্বলতা নয়, বরং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রতিটি পরীক্ষা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তাই প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
টেসলা প্রধান ইলন মাস্কের রেকর্ড পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও ডিজিটাল অর্থনীতির চরিত্র বদলে যাওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রথাগত পণ্য উৎপাদন বা সম্পদের চেয়ে এখন ডেটা, অ্যালগরিদম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই অর্থনৈতিক ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানের এই নতুন ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণকে অনেক অর্থনীতিবিদ ‘টেকনো-ফিউডালিজম’ বা প্রযুক্তিগত সামন্তবাদ হিসেবে অভিহিত করছেন। অতীতে সম্পদের উৎস ছিল তেল, ইস্পাত বা ব্যাংক, কিন্তু বর্তমানের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন এক অবকাঠামো গড়ে তুলছে যা জনমত থেকে শুরু করে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। জেফ বেজোস বা মার্ক জাকারবার্গের মতো ‘ক্লাউডালিস্ট’রা এখন প্রথাগত পুঁজিবাদের সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক ডিজিটাল পরিসর তৈরি করেছেন, যেখানে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যই মুনাফার মূল কাঁচামাল। ব্যবহারকারীরা যখন এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন, তখন তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবর্তে অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক ডিজিটাল বাস্তুসংস্থানে প্রবেশ করেন, যা মালিকপক্ষের মুনাফা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলন মাস্কের মতো ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির রহস্য লুকানো রয়েছে তাদের সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে, যেখানে স্টারলিঙ্ক, স্পেসএক্স, এক্স (টুইটার) ও টেসলার ডেটা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। এই মডেল কোনো একক পণ্য বিক্রির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। যদিও অনেকে একে সামন্তবাদের আক্ষরিক পুনরাবৃত্তি না বলে পুঁজিবাদেরই আরও আগ্রাসী ও কেন্দ্রীভূত রূপ মনে করেন, তবুও এই ধারায় ধনকুবেরদের সম্পদের পাহাড় গড়া এবং বৈশ্বিক সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে।
চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন (ডব্লিউএআইসি) ২০২৬’-এ যোগ দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। শুক্রবার (১৭ জুলাই) চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এই চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ, উদীয়মান প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তিবিদেরা আলোচনা করছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানসহ জাতিসংঘের মহাসচিব বক্তব্য রাখেন। তারা এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল উন্নয়ন এবং এ খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। এই আয়োজনে ডিজিটাল রূপান্তর ও স্মার্ট সুশাসন নিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরতে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম একাধিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে সরকারের সদিচ্ছা বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে প্রতিফলিত হবে।
স্মার্টওয়াচ দিয়ে হৃদস্পন্দন, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বা ঘুমের হিসাব রাখার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যন্ত্র স্বাস্থ্যের প্রাথমিক ধারণা দিলেও তা কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য ডাক্তারি পরীক্ষার বিকল্প নয়। বিশেষ করে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া স্বল্পমূল্যের স্মার্টওয়াচের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে যেকোনো শারীরিক সমস্যায় সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অ্যাপল, স্যামসাং বা গারমিনের মতো স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের স্মার্টওয়াচগুলো বিশ্রামের সময় হৃদস্পন্দন বা রক্তে অক্সিজেনের (SpO₂) কাছাকাছি সঠিক মাত্রা জানাতে পারে। তবে দ্রুত হাঁটা, হাতের অতিরিক্ত নড়াচড়া, ত্বকের রং কিংবা ঘড়ি ঢিলাভাবে পরার কারণে এই রিডিংয়ে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এছাড়া ইসিজি, ঘুমের ধরন, স্টেপ কাউন্ট বা ক্যালরি খরচের মতো সূচকগুলো সেন্সরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অনুমান করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টওয়াচের ক্যালরি খরচের হিসাবে ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত গরমিল হতে পারে। এগুলো হার্ট অ্যাটাক বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো জটিল রোগ নির্ণয়েও সক্ষম নয়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের বাজারে ২ থেকে ৫ হাজার টাকায় যেসব চীনা বা নকল স্মার্টওয়াচ পাওয়া যায়, সেগুলোর স্বাস্থ্যগত ফিচারের কোনো ক্লিনিক্যাল ভিত্তি নেই। এগুলো রক্তচাপ বা রক্তে শর্করার মতো ভুয়া ফিচার দিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করছে। তাই স্মার্টওয়াচকে কেবল ফিটনেসের প্রাথমিক সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য প্রচলিত মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপরই ভরসা রাখা উচিত।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত এক সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এই তথ্য জানান। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল রোডম্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ই-হেলথ কার্ড হলো নাগরিকদের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্বের সব রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও ওষুধের বিবরণ মুহূর্তেই দেখতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে গত দুই বছর ধরে এই ডিজিটাল রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীমসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
একসময় বিদেশি ভাষা শেখাকে শখ হিসেবে দেখা হতো। কেউ সাহিত্য পড়তেন। কেউ ভ্রমণের জন্য শিখতেন। কেউ আবার ব্যক্তিগত আগ্রহে নতুন ভাষা আয়ত্ত করতেন। এখন সেই বাস্তবতা বদলে গেছে। আজ বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক দক্ষতা; এটি উচ্চশিক্ষা, চাকরি, গবেষণা, ব্যবসা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে, পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে ভাষাজ্ঞান মানুষের পেশাগত ও মানবিক সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, অটোমেশন ও তথ্য বিশ্লেষণ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যতের সমাজ শুধু যন্ত্রনির্ভর হবে না। সেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও যোগাযোগ ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে। এ প্রযুক্তি ও মানবিকতার সমন্বয়ই পঞ্চম শিল্পবিপ্লব বা ইন্ডাস্ট্রি ৫.০-এর মূল কথা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও অটোমেশনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। পঞ্চম শিল্পবিপ্লব সেই প্রযুক্তিকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে আসে। এখানে শুধু প্রশ্ন করা হয় না, একটি যন্ত্র কত দ্রুত কাজ করতে পারে? প্রশ্ন করা হয়, সেই যন্ত্র মানুষের জীবন কতটা সহজ করছে? প্রযুক্তি কি নিরাপত্তা বাড়াচ্ছে? এটি কি পরিবেশ রক্ষা করছে? কর্মক্ষেত্রে মানুষের মর্যাদা কি বজায় থাকছে? সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠী কি প্রযুক্তির সুবিধা পাচ্ছে? পঞ্চম শিল্পবিপ্লব মানুষকে উৎপাদনব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখে। এটি প্রযুক্তিকে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে না। বরং সহযোগী হিসেবে দেখে। একটি রোবট ভারী কাজ করতে পারে। এটি পুনরাবৃত্তিমূলক কাজও করতে পারে। কিন্তু নেতৃত্ব, সহানুভূতি, পরিকল্পনা, নৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংকট ব্যবস্থাপনা মানুষের দায়িত্ব। তাই ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা প্রয়োজন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির উদ্দেশ্য হলো ন্যায়সংগত, শান্তিপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব একটি বিশ্ব গড়ে তোলা। এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বৈষম্য, পরিবেশ, শিল্প, শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। শুধু প্রযুক্তি দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। সহযোগিতা প্রয়োজন। বোঝাপড়া প্রয়োজন। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। এসডিজি কোনো এক দেশের একক দায়িত্ব নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা এখন বৈশ্বিক বিষয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জরুরি। আর সেই অংশীদারত্বের ভিত্তি হলো ভাষা ও যোগাযোগ। বিশ্বের বহু দেশে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বসবাস করেন। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালি জনগোষ্ঠী রয়েছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতায় ফরাসি ভাষা শেখা একটি ভবিষ্যৎমুখী সিদ্ধান্ত। ফরাসি শুধু ফ্রান্সের ভাষা নয়, এটি কানাডা, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড এবং আফ্রিকার বহু দেশে ব্যবহৃত হয়। অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ফরাসি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ফরাসির গুরুত্ব রয়েছে। ফ্রান্স, কানাডা, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ডের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার সুযোগ আছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ফরাসি গুরুত্বপূর্ণ। দূতাবাস, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, বিমান সংস্থা, পর্যটন, অনুবাদ, গণমাধ্যম এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ফরাসি জানা প্রার্থীরা বাড়তি সুবিধা পান। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, চামড়া ও সেবা খাতের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। ফরাসিভাষী দেশের ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবসায়িক সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে। আফ্রিকার বহু দেশে ফরাসি প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসার ভাষা। সেখানে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক সহায়তায় কাজ করতে ফরাসি দক্ষতা কার্যকর। বিদেশি ভাষা শেখা শুধু শব্দ ও ব্যাকরণ শেখা নয়, এটি মানুষের আবেগ বোঝার ক্ষমতাও বাড়াতে পারে। আবেগিক বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের এবং অন্যের আবেগ শনাক্ত করা, বোঝা, প্রকাশ করা ও নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা। এর মধ্যে আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সহমর্মিতা ও সম্পর্ক পরিচালনা অন্তর্ভুক্ত। বাংলায় ‘অভিমান’, ‘মায়া’, ‘লজ্জা’ বা ‘সম্মান’ যেভাবে প্রকাশ করা হয়, অন্য ভাষায় তা ভিন্ন হতে পারে। একই অনুভূতি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন শব্দ, ভিন্ন ভঙ্গি এবং ভিন্ন সামাজিক অর্থ বহন করে। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী বুঝতে পারেন যে অনুভূতি সর্বজনীন হলেও তার প্রকাশ সংস্কৃতিনির্ভর। এই উপলব্ধি আবেগ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সূক্ষ্ম করে। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় একজন মানুষ শব্দ নির্বাচন, কণ্ঠস্বর ও শ্রোতার প্রতিক্রিয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেন। এই অনুশীলন আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহমর্মিতা বাড়াতে পারে। প্রকৃত আবেগিক বুদ্ধিমত্তা আবেগকে দমন করা নয়, বরং আবেগকে বুঝে যথাযথভাবে পরিচালনা করা এবং সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা হলো ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সম্মানজনক ও কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা। ভাষা ও সংস্কৃতিকে আলাদা করা যায় না। একটি ভাষার সম্ভাষণ, সম্বোধন, রসিকতা, নীরবতা, ভদ্রতা ও মতবিরোধ প্রকাশের ধরন সেই সমাজের মূল্যবোধ বহন করে। কোনো সংস্কৃতিতে সরাসরি কথা বলা স্বাভাবিক। অন্য সংস্কৃতিতে পরোক্ষ ভাষা বেশি গ্রহণযোগ্য। কোথাও প্রথম নাম ধরে ডাকা স্বাভাবিক। কোথাও পদবি ও সম্মানসূচক শব্দ জরুরি। বিদেশি ভাষা শেখার সময় শিক্ষার্থী এসব পার্থক্য দেখতে পান। তিনি বুঝতে শেখেন যে নিজের সংস্কৃতির আচরণই একমাত্র স্বাভাবিক আচরণ নয়। এটি সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার ধারণা তৈরি করে। এর অর্থ সব আচরণকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা নয়। বরং কোনো আচরণ বিচার করার আগে তার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝা। এই দক্ষতা আন্তর্জাতিক শিক্ষা, কূটনীতি, ব্যবসা, উন্নয়নকর্ম, পর্যটন ও বহুজাতিক কর্মক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক বুদ্ধিমত্তা হলো সামাজিক সংকেত বোঝা, সম্পর্ক তৈরি করা, পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ করা এবং বিরোধ সামলানোর সক্ষমতা। বিদেশি ভাষায় কথা বলার সময় সঠিক শব্দ সব সময় মনে পড়ে না। তখন শিক্ষার্থীকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হয়। অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করতে হয়। শ্রোতার মুখভঙ্গি লক্ষ করতে হয়। প্রয়োজনে নিজের বক্তব্য নতুনভাবে সাজাতে হয়। এই প্রক্রিয়া যোগাযোগের নমনীয়তা বাড়ায়। এটি ধৈর্য শেখায়। মনোযোগ দিয়ে শুনতে শেখায়। ভুল স্বীকার করতে শেখায়। ফরাসিভাষী অঞ্চলে শুধু ইংরেজির ওপর নির্ভর করলে সামাজিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। স্থানীয় ভাষা জানলে বন্ধুত্ব গড়া সহজ হয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত হয়। কর্মক্ষেত্রে সম্পর্ক শক্তিশালী হয়। তাই ফরাসি শেখা শুধু পেশাগত দক্ষতা নয়, এটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তিরও একটি কার্যকর মাধ্যম। বিদেশি ভাষা শেখার সময় মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেক কাজ করতে হয়। নতুন শব্দ মনে রাখতে হয়। ব্যাকরণ প্রয়োগ করতে হয়। উচ্চারণ শনাক্ত করতে হয়। মাতৃভাষার প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আবার প্রয়োজনের সময় সঠিক ভাষাটি দ্রুত নির্বাচন করতে হয়। এই অনুশীলন মনোযোগ, কার্যকর স্মৃতি, ভাষাগত সচেতনতা ও মানসিক নমনীয়তার সঙ্গে যুক্ত। দুটি ভাষার গঠন তুলনা করতে করতে একজন শিক্ষার্থী ভাষা কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে শেখেন। একে ভাষা-সম্পর্কিত উচ্চতর সচেতনতা বলা হয়। মানুষের মস্তিষ্ক স্থির নয়। অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে মস্তিষ্কের কার্যকর সংযোগ বদলাতে পারে। এই সক্ষমতাকে Neuroplasticity বলা হয়। বিদেশি ভাষা শেখা শ্রবণ, স্মৃতি, মনোযোগ, উচ্চারণ ও অর্থ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়বিক ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। Neuro-Linguistic Programming বা NLP ভাষা, চিন্তার ধরন ও আচরণগত অভ্যাসের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। এর প্রবক্তারা মনে করেন, ভাষা ও মানসিক কাঠামো পরিবর্তন করে যোগাযোগ ও আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব। ভাষা শিক্ষায় এর কিছু ধারণার ব্যবহার দেখা যায়। যেমন ইতিবাচক আত্মকথন। ভুলের ভয়কে নতুনভাবে দেখা। ফরাসি শেখার পথে বাংলা ভাষাভাষীদের কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভুল করার ভয়। এই ভয় আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ভাষা শেখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ছোট কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। বিচ্ছিন্ন শব্দ মুখস্থ না করে পুরো বাক্য শিখতে হবে। শুনতে হবে। বলতে হবে। পড়তে হবে। লিখতে হবে। উচ্চারণ উন্নত করতে অডিও শুনে বক্তার সঙ্গে সঙ্গে বলতে হবে। এই পদ্ধতিকে Shadowing বলা হয়। নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করতে হবে। পুরোনো ও নতুন রেকর্ড তুলনা করতে হবে। এতে অগ্রগতি বোঝা যায়। মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন ভিডিও, পডকাস্ট, ডিজিটাল অভিধান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যায়। AI-এর সঙ্গে কথোপকথন করা যায়। ভুল বাক্য সংশোধন করা যায়। অনুশীলন করা যায়। তবে প্রযুক্তি বাস্তব মানুষের বিকল্প নয়। শিক্ষক, বন্ধু বা ভাষাসঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা জরুরি। কারণ আবেগ, নীরবতা, কণ্ঠস্বর ও সামাজিক আচরণ শুধু অ্যাপ দিয়ে পুরোপুরি শেখা যায় না। ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। যত বেশি কথা বলা হবে, তত বেশি ভুল হবে। আবার তত দ্রুত উন্নতি হবে। বিদেশি ভাষাশিক্ষা একটি মানসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যাত্রা। এটি নতুনভাবে কথা বলতে শেখায়। একই সঙ্গে নতুনভাবে শুনতে, ভাবতে, অনুভব করতে ও মানুষকে বুঝতে শেখায়। ফরাসি ভাষা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা, গবেষণা, অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন দরজা খুলতে পারে। এটি আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানীয় বুদ্ধিমত্তার বিকাশেও সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অনুশীলন। বাস্তব যোগাযোগ। সাংস্কৃতিক কৌতূহল ও ভুল করার সাহস। পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের যুগে শুধু প্রযুক্তি জানাই যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রয়োজন যোগাযোগ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া। এ কারণে ফরাসি শেখা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি একটি বাস্তব বিনিয়োগ। এটি নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি এবং নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে সংযোগ তৈরির শক্তিশালী সেতু। সাবেক ও বর্তমান ফরাসি ভাষা শিক্ষক ঢাকা ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা, DELF & Cambridge IGCSE পরীক্ষক, ইন্সট্রাক্টর-বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদর দপ্তর, জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা, বেস্ট সেলিং লেখক।
শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে—বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি প্রায় সর্বজনীন হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা—বিশেষত পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা—উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল। এই বাস্তবতায় শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয় বরং একটি সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।বিশ্বব্যাপী গবেষণা বলছে, শিক্ষার মান নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষক। একজন যোগ্য, দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষক একটি দুর্বল অবকাঠামোর স্কুলেও ভালো শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। বাংলাদেশে শিক্ষকসংখ্যা অনেক হলেও শিক্ষকের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ,শিক্ষক পেশার সামাজিক মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধি, ধারাবাহিক in-service training, শিক্ষক মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি উচ্চ মর্যাদার পেশা—যেখানে সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসে। বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ হয়। শিক্ষাবিদদের মতে, একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। কিছু গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২৫% শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে প্রত্যাশিত পাঠ ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে। প্রাথমিক স্তরে ভাষা ও গণিত দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমানো, শিশু-কেন্দ্রিক ও আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকারযোগ্য। পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা থেকে বের হয়ে দক্ষতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। সমালোচনামূলক চিন্তা ও সমস্যা সমাধান দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজার ও বাস্তব জীবনের সাথে সংযুক্ত করা সময়ের দাবী। এক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে পরীক্ষার চেয়ে শেখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশে প্রযুক্তি ব্যবহারে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৭% নিয়মিত ইন্টারনেট সংযোগ সমস্যার মুখোমুখি হয়, যা ডিজিটাল শিক্ষাকে সীমিত করে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ল্যাব, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়ন জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শিক্ষা উন্নয়নের অনেক প্রকল্প থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। গত এক দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ,বিদ্যালয় পর্যায়ে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি। শিক্ষায় সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও অল্প বয়সে বিয়ে শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত করে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যালয় ও শিক্ষক প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের সংযোগ থাকা প্রয়োজন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন অনেক তরুণও কর্মসংস্থানের সংকটে পড়ে। STEM শিক্ষা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণে শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সাফল্য নয়, এখন প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষক উন্নয়ন, শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষা, আধুনিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্প্রসারণ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষায় সমতা—এই ছয়টি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা যায়, তবে শিক্ষাই হবে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। ড. মো. বিল্লাল হোসেন উপাধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।