Breaking news
সাহিত্যকথন কবিতা গল্প

গল্প

মুখগুলো

সন্ধ্যা ছয়টার ডাক্তার এখনো আসেনি। ঘড়িতে সাতটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। হাসপাতালের করিডরে বসে আছি চেম্বারের ঠিক পাশে। সামনে লম্বা বেঞ্চ। বেঞ্চভরতি মুখ। প্রতিটি মুখ একটা গল্প। কেউ পড়ছে না, তবু পড়া যায়। বাম দিকে বৃদ্ধ লোকটা। হাতে পুরোনো একটা পলিথিন। ভেতরে রিপোর্ট। চোখ দুটো ফোলা। রাত জেগেছে বোধহয়। ছেলের অপারেশনের টাকা জোগাড় হয়েছে কি না, সেই হিসাব কষছে মনে মনে। ডাক্তার যখন বলবে ‘তিন লাখ লাগবে’, তখন মুখটা কেমন হবে, আমি আগেই দেখে নিচ্ছি। ডান দিকে একটা মেয়ে। বয়স কুড়ি হবে। কোলে ছয় মাসের শিশু। শিশুটা কাঁদছে না, চুপ। চুপ করে থাকাটাই ভয়ের। মেয়েটা বারবার ওড়নার আঁচলে মিশুর কপাল মুছছে। ঘাম নাকি জ্বর, বোঝা যায় না। মাঝখানে একটা লোক। হাতে মোবাইল। বারবার কাউকে ফোন দিচ্ছে, “ভাই, দুই হাজার ম্যানেজ করতে পারবা? ডাক্তার বলছে আজকের ভেতর জমা দিতে হবে।” ফোনের ওপাশে কী উত্তর আসে জানি না। লোকটার মুখটা আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে। আমি মানুষের মুখ পড়ি। এটাই আমার অভ্যাস। হাসপাতালে এলে বোঝা যায়, কষ্টের হাজার রকম রং আছে। সাদা বেডশিটের নিচে লুকানো থাকে লাল রক্ত, কালো দেনা, ধূসর অপেক্ষা। হঠাৎ করিডরে একটা নড়াচড়া। ডাক্তার এসেছেন। সাদা অ্যাপ্রোন, মুখে ক্লান্তি। রোগীর ঢল তাঁকে গিলে নেয়। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলি। আমার পালা আসবে। আমাকে বসিয়ে রেখে আমার স্বামী গেছে ওষুধ কিনতে। আমি মোবাইলের নোটপ্যাড খুলি। লিখতে চাই, কিন্তু চোখ আটকে যায় সামনের দৃশ্যে। হঠাৎ একটা আর্তনাদ। গগন বিদারি। ‘ও আমার সোনা! কথা ক সোনা! চোখ মেলা তাকা!’ হাসপাতালের ফ্লোর, দেয়াল, বাতাস, সব কেঁপে ওঠে। একজন মা। কোলে দুই-আড়াই বছরের শিশু। নিথর। চোখ বোজা। গায়ে লাল লাল গুটি। হামের গুটি। মায়ের চুল এলোমেলো, জামা ভেজা ঘামে। পাশে সম্ভবত বাবা। চোখ শুকনা। বাবারা কেঁদে ফেলতে পারে না, তাই তাদের কষ্টটাই সবচেয়ে ভারী হয়। মা বুক চাপড়াচ্ছে, ‘ও আমার জাদু, চোখ খোল বাবা। একবার মা বল। আমি আর কিচ্ছু চাই না। শুধু তুই কথা ক।’ চারপাশে জমে যায় মানুষ। কেউ সান্ত্বনা দেয়, কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয় কষ্টে।। সান্ত্বনার ভাষা ফুরিয়ে গেছে। আমি উঠে যাই। শুনি। কয়দিন ধরে জ্বর। সারা শরীর গোটায় ভরে গেছে। গ্রামের হাসপাতালে নিয়ে গেছে। বলেছে, ‘হাম’ হয়েছে, ওষুধ নাই। রেফার করে দিয়েছে শহরে। শহরের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। অক্সিজেন নাই, বেড নাই, ডাক্তার নাই, টিকা নাই — এই শব্দগুলো শুনতে শুনতে মা-বাবার পা ক্ষয়ে গেছে। শেষে এই হাসপাতালে। ডাক্তার এসে নেড়ে দেখলেন। স্টেথোস্কোপ রাখলেন। মাথা নাড়লেন, “সরি। অনেক দেরি হয়ে গেছে, মৃত।” মা আবার চিৎকার করে ওঠে, “দেরি? কার দেরি? আমার পোলা তিন দিন ধইরা জ্বরে পুড়তেছে! তোমরা কী করছ? তিন দিন ধইরা এ হাসপাতাল, সে হাসপাতাল করতেছি। আজ কন সরি। বড় বড় হাসপাতাল সাজাইছেন, টিকা নাই, ওষুধ নাই? ও আল্লাহ আমার জাদুরে ফিরাইয়া দাও।” মায়ের কান্না কলিজা কামড়ে ধরছে। কেউ উত্তর দেয় না। আমি ফিরে আসি আমার বেঞ্চে। হাত কাঁপে। মোবাইলটা পড়ে যেতে নেয়। মনে পড়ে কাগজের খবর। সরকারি হিসাবেই ৪০০ শিশু মারা গেছে হামের টিকার অভাবে। ৪০০। সংখ্যাটা শুনতে ছোট লাগে, কিন্তু একটা মা যখন ‘ও আমার সোনা, জাদু বলে বুক চাপড়ায়’, তখন বোঝা যায়, ৪০০ মানে ৪০০টি করিডর, ৪০০টি আর্তনাদ, ৪০০টি মৃত ঘর। আরও শিশু মৃত্যুর পথে। আমার সামনের বেঞ্চে বসা বৃদ্ধ লোকটা এখনো পলিথিন চেপে ধরে আছে। তার ছেলের অপারেশন হবে। তিন লাখ টাকা। টাকা জোগাড় না হলে তার ছেলেও হয়তো এই করিডরেই নিথর হয়ে যাবে। ডান দিকের মেয়েটার শিশু সন্তানটি এখনো চুপ। মেয়েটা ফিসফিস করে দোয়া পড়ছে। মাঝের লোকটা ফোন কেটে দিয়েছে। মুখে হাসির মতো কিছু একটা টানছে। হয়তো ধার পেয়েছে। আমি বুঝি, হাসপাতাল শুধু রোগ সারায় না। এখানে মানুষের মুখ, মন প্রকাশ হয়ে যায়। অপারেশনের ভয়ে কাঁপা বাবা। ওষুধের টাকার অভাবে কুঁকড়ে যাওয়া মা। টিকার অভাবে মরে যাওয়া শিশু। দুঃখ-কষ্টের ব্যথায় নীল মা, বাবার ক্লান্ত মুখ। আর আমি, যে শুধু দেখছি, লিখছি অথচ কিছুই করতে পারছি না। ডাক্তার ডাকেন আমার নাম ধরে। আমি উঠি। যাওয়ার আগে একবার পেছন ফিরে তাকাই। মা এখনো শিশুটাকে বুকে চেপে ধরে আছে। যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে চিরদিনের জন্য। বাবা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। আত্মীয়রা মাথা নিচু করে আছে। করিডরের বাতাস ভারী। অক্সিজেনের চেয়েও ভারী মানুষের নিশ্বাস। আমি চেম্বারে ঢুকি। ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন, কী সমস্যা? আমি বলতে পারি না। গলা আটকে আসে। আমার কেন আসা আমি ভুলে যাই। এই মুহূর্তে আমার সমস্যা তো আমার শরীরে না। আমার সমস্যা এই করিডরে। এই মুখগুলোতে। আমি শুধু বলি, ডাক্তার, মানুষ বাঁচান। ডাক্তার চশমা ঠিক করেন। ক্লান্ত হাসি দেন, “চেষ্টা করছি। আপনিও দোয়া করেন। মালিক আল্লাহ, আমরা নিমিত্ত মাত্র।” বাইরে বেরিয়ে দেখি, মা এখনো বসে আছে। শিশুটার ঠান্ডা হাত ধরে। আমি আর লিখতে পারি না। শুধু মনে মনে বলি, হে সিস্টেম, একটা টিকা কি খুব দামি ছিল? একটা শিশুর জীবনের চেয়েও? ৪০০/৫০০/১০০০ টিকার দামের চেয়ে?কোটি  কোটি টাকা নাকি একটা জীবন? সবকিছু ‘নিমিত্ত’ বললেই শেষ হয়ে যায়! ‘সিস্টেম’-এর কোনো দায় নেই? এই অকালে ঝরে যাওয়া শিশুরাই তো ছিল ভবিষ্যৎ। সিস্টেমের বলি এই শিশুরাই ছিল আগামী। এদের হাত ধরেই তো আগামী বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখত। হায় সিস্টেম!  

নাজরিন আরা নাজরিন আরা অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
শাওনের ডাক

অনেকক্ষণ উবু হয়ে আছে সে। একটানে দশ-বারো আঁটি বিছুন পোঁতা হয়ে গেল। মাজা টনটন করছে, একটু আরাম না দিলেই নয়। উঠে দাঁড়াল। বাম হাতের মুঠোয় ধরা বিছুনগুলো থপ্পাক করে ফেলে দিল কাদান ভুঁইয়ে। খানিকটা ঘোলা জল চলকে এসে আছড়ে পড়ল শাড়িতে।   জল-কাদার সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক। ভোরবেলায় বীজতলায় হাঁটু মুড়ে বসে কোমর থেকে নিচের অংশ ভিজিয়েছে। মাথায় বিছুন বয়ে আনতে গিয়ে জল চুঁইয়ে পড়ে শরীর বেয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এখন নাহয় আরেকটু জল লাগল। কী আসে যায় তাতে! হাত দুটো ঊর্ধ্বমুখে প্রসারিত করে দিয়ে শরীরটাকে টানটান করে ধরে রাখল কয়েক মুহূর্তের জন্য। দুই হাতের আঙুল পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে কোমরটাকে বারকয়েক ডানে-বামে মোচড় দিয়ে নিল। তারপর বেলগোড়ার মাঠের দিকে তাকাল গভীর অভীলিপ্সা নিয়ে “এত বেলা হলো এ্যাখুনো ক্যানি এ্যাসে না উ?”   শাওন মাস শেষ হতে আর দিন কতক বাকি। খরিফ মরশুমের ধান পোঁতার কাজ এখনই শেষ করতে না পারলে নামলা হয়ে যাবে, ফলন ভালো হবে না। হাত-পা ধুয়ে  মাঠে নেমে পড়েছে চাষিরা। বেশির ভাগ জমিতে মুনিসেরা উবু হয়ে ধান পুঁতছে। কেউ কেউ বীজতলায় হাঁটু মুড়ে বসে বিছুন মারছে। বেশ কিছুটা দূরে একজন হোল্যা জমিতে চাষ দিচ্ছে। এক ঝাঁক সাদা বক পোকামাকড় খুটে খেতে খেতে তাকে অনুসরণ করে চলেছে মহা উল্লাসে।   মাঠখাটা মেয়ে সে। টাকার বিনিময়ে শ্রম বিক্রি করা তার পেশা। বাবা দিবাকর মালও ছিল একই পেশার মানুষ। ধান কাটার মরশুমে ধান, কচুর সময় কচু কুড়াতে সে বাবার সঙ্গে মাঠে যেত ছোটবেলায়। বাকি দিনগুলো তার কাটত ছাগল চরিয়ে। সঙ্গে নিয়ে যেত একটি প্যাছা। ছাগলগুলোকে মাঠে ছেড়ে দিয়ে ঘুরে ঘুরে গোবর কুড়িয়ে প্যাছা ভরত। গোবর ছেনে ঘঁসি দিত মা। শুকনো ঘঁসির কিছুটা বাড়িতে ব্যবহারের জন্য রেখে বাকিটা বেচে দেয়া হতো। সপ্তাহে এক-দেড় শ টাকা উপরি রোজগার অভাবের সংসারে যথেষ্ট না হলেও ভালো ঠেকা দিত। নুন তেল হলুদ কেনার জন্য বাবার কাছে পয়সা চাইতে হতো না মাকে।   বাবার ছিল হাঁপানি রোগ, টান উঠলে গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করত। সেই টানই একদিন মানুষটাকে টেনে নিয়ে গেল শ্মশানে। সেটাও ছিল শাওনের এক বর্ষণমুখর রাত। শ্বাসকষ্টে কাহিল হয়ে পাঁচ দিন আগেই বিছানা নিয়েছিল। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছাল সন্ধ্যাবেলায়। মাঝরাতে একেবারে স্থির হয়ে গেল। সে তখন দশ-বারো বছরের কিশোরী।   বাবা খুব ভালোবাসত। লেবেনচুস খাস্তা গজা, কাজ সেরে বাড়ি ফিরে কিছু না কিছু তুলে দিত মেয়ের হাতে। একদিন এনেছিল ডালপুরি আর মতিচুরের নাড়ু। মায়ের সেকি রাগ, “এক মুষ্ঠি পায়সা দিং ক্যানি ইয়্যা কিনতে য্যালা? হাঁড়িতে এক ছটাক চাল ন্যাই। পয়সা কটা থাকলে দুসের চাল কিনতে পারথাম আমি।” “তুমি শুধু শুধু রাগ করছ জবার মা। আমি পয়সা দিং কিছু কিনিনি, খান সাহেব দিয়্যাছে।”    ধান কাটার মরশুমে কিছু মানুষ নানা রকম মুখরোচক খাবার মাঠে মাঠে ঘুরে বিক্রি করে। তাদের বলা হয় গোস্তি। গেরস্তরা তাদের কাছ থেকে পছন্দের খাবার কিনে নিয়ে যায় পরিবারের জন্য। কোনো কোনো গেরস্ত মরশুমে অন্তত এক দিন মুনিসপাটকে কিনে খাওয়ায়। সেদিন খান সাহেব কেনাকাটা করে সবাইকে ভাগ করে দিয়েছিলেন। দিবাকর তার ভাগেরটুকু না খেয়ে বাড়ি নিয়ে এসেছিল।   মা ওসব শুনতে চাইল না। ঝাঁঝিয়ে উঠে বকবক করতে থাকল, “ধক ন্যাই শখ খুব! একদিন কাজ কোরি দশ দিন হাঁপর টানে। তার আবার রোজ রোজ ম্যায়াকে ভালোমুন্দ খাওয়ানো চায়। কী কোরি সংসার চলছে খোঁজ লিয়্যাছো কুনুদিন?”   বাবা নেই তিন-চার বছর কিন্তু তার স্নেহ ছায়া ঘিরে রেখেছে তাকে। বিপদে আপদে সে যেন অনুভব করে বাবা মাথায় হাত দিয়ে বলছে, “ভয় কী রে মা, আমি তো আছি।” “এ্যাই জবা, আগুন আছে তোর কাছে?” মাজা সাট করতে দাঁড়িয়ে কখন স্মৃতির গহিনে ডুব দিয়েছে খেয়াল ছিল না তার। পুরুষ কণ্ঠে ডাক শুনে সংবিৎ ফিরে পেল। মোনিহার পাড়ার অনাদি গায়ে উঠে পড়েছে প্রায়। চকিতে দুপা পিছিয়ে দাঁড়াল সে, “কী চ্যাহিল্যা, আগুন?” “হ! আছে তো দে ক্যানে। কখুন থ্যাকি বিড়ি টানিয়েনি, দম খরাঁই উঠ্যাছে।” অনাদি তার হাতের বন্দি দেখিয়ে আরও বলল, “শ্লা বন্দিটো কখুন জলে পোরি লিভ্যাঁই যেলছে।”   মাঠে অনেকে কাজ করছে, পুরুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের কাছে আগুন চাইতে না গিয়ে তার কাছে কেন? সচকিত হয়ে উঠল জবা। ডানে বামে ঘাড় ঘোরাল, মাঠে লোকজনের অভাব না থাকলেও কাছাকাছি কেউ নেই। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার। কঠিন স্বরে বলল, “আমার কাছে আগুন থাকবে ক্যানি, আমি বিড়ি খ্যায়ে নাকি?” “তোদের জাতের ম্যালা ম্যায়্যা খায় তো।” “যে খায় তাহার কাছে যাও। আমার কাছে আগুন ন্যাই।” “ন্যাই তো ন্যাই “ হাসল অনাদি। জবার দিকে এগিয়ে গেল দুকদম। তারপর বলল, “তোকে না মাইরি আজ খুব মিষ্টি লাগছে দেখতে।” “অ! মিষ্টি খ্যাবার শখ হইছে তুমার? দাঁড়াও খাওয়্যাছি।” বিছুন তোলা দাউলিখানা আলের মাথায় রাখা ছিল। দ্রুত তুলে নিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, “নামানিওলা তুমি ইখ্যান থ্যাকি য্যাবা না চিল্লিং লোক ডাকব?”   অনাদি আর কিছু বলার সাহস পেল না। অনুচ্চ স্বরে বিড়বিড় করতে করতে পালিয়ে গেল। অনাদিরা এমনই হয়, ভাবে মাঠখাটা মেয়েরা সস্তা। চাইলেই তাদের...   সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার, গোসা করে আছে যেন। থেকে থেকে আটা চালার মতো ঝিরঝির করে বৃষ্টি ঝরছে, বলা যায় না মুষলধারে নেমে পড়ে কখন। সময় নষ্ট করতে চাইল না জবা। ধান পুঁততে শুরু করল।   আগরডাঙ্গার হাজি নুহুউল্লার অনেক জমিজমা। মাসের প্রথম দিকে দশজন মুনিস নিয়ে পোঁতা শুরু করেছিলেন তিনি। পনেরো কাঠার এই জমিটা বাদে সব পোঁতা হয়ে গেছে। অল্প জায়গা, বেশি মুনিস দরকার নেই। হাজি দুজনকে রাখতে চাইলে সিসাম বলে, “আমরা থাকব।”   সিমাম গ্রামেরই ছেলে। তার সঙ্গে জবার বিয়ে ঠিক হয়েছে। সেই থেকে তারা একসঙ্গে মাঠে যায়, কাজ করে। আজ সকালেও বেলগোড়ার মাঠে বীজতলায় গিয়েছে দুজন। আঁটি বিশেক বিছুন জবাকে দিয়ে পাঠিয়ে সে থেকে গেছে বীজতলায়। বাকি বিছুন নিয়ে আসার কথা তার।   বাতাসের জোর বাড়তে বাড়তে ঝড়ের আকার নিয়েছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও বেশ ভারী, চড়বড় করে পিঠে আছড়ে পড়ছে। কাজ ছেড়ে আলের ওপর উঠে এল জবা। মাথাল মাথায় দিয়ে বসতে গিয়ে খেয়াল করল বিছুনের বোঝা মাথায় নিয়ে হনহন করে হেঁটে আসছে সিমাম। জবার রাগ হলো, কিছুটা অভিমানও। মনে মনে বলল, “আয় মিনস্যা মজা চাখ্যাছি তোকে।”   এমন সময় আকাশের বুকে একফালি আলোক রেখা খেলে গেল, পরক্ষণে কান ফাটানো বিকট আওয়াজ, চড়াম! গুর-গুর-র-র…   সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ছেয়ে গেল। সিমাম ক্রমশ ঊর্ধ্বাকাশে উঠে যাচ্ছে কুণ্ডলীতে ভর করে। হাত বাড়াল জবা, নাগাল পেল না। ধীরে ধীরে সে লীন হয়ে গেল অনন্ত আকাশের উত্তাল বক্ষে।  

মুহাম্মদ সেলিম রেজা মুহাম্মদ সেলিম রেজা অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
অমল বড়ুয়া

পকেটে ঠিক তেত্রিশ টাকা নিয়ে সন্ধ্যায় বের হয়েছিল বিশ্বজিৎ। যাত্রা শুরুর জায়গা থেকে ডান দিকে সোজা মাত্র বারো মিনিটের পথ। হেঁটে গেলেই গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। কিন্তু বৃষ্টির কারণে বারো মিনিটের সেই ছোট্ট পায়ের ব্যায়ামটা এড়িয়ে গেল সে। বক্কর মামার টংয়ের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত নাকের মতো দেখতে নীল রঙের টেম্পোগুলোর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল বিশ্বজিৎ।   গাড়ি আসার অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই গাড়িতে থাকা খালি জায়গাগুলো দ্রুত ভরে যাচ্ছিল। অবশ্য কিছুদিন আগেই ডাক্তার মাইনাস ওয়ানের চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তখন ডাক্তারকে মনে মনে গালি দিয়ে চলে এসেছিল বিশ্বজিৎ। এখন অবশ্য সেই গালির জন্য মনে মনে ক্ষমা চাইছে। চশমাটা থাকলে সন্ধ্যার এই ব্যস্ত রাস্তায় দূর থেকেই গাড়ির খালি জায়গাটা ঠাহর করে চটজলদি উঠে বসতে পারত সে।   বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর অবশেষে একটি গাড়িতে জায়গা পেল বিশ্বজিৎ। ভিড় এতটাই বেশি যে, মানুষ গাড়ি থেকে নামার জন্য যে স্লেপে দাঁড়ায়, সেখানেও কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বজিৎ লক্ষ করল, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের মধ্যে একজন রুচিসম্পন্ন মধ্যবয়সী ভদ্রলোকও দাঁড়িয়ে আছেন। নিজের বসার জায়গাটা একপ্রকার জোর করেই ভদ্রলোককে দিয়ে দিল বিশ্বজিৎ।   গাড়ি চলতে শুরু করল। ভদ্রলোক বিশ্বজিৎ সম্পর্কে নানা কিছু জানতে চাইলেন। বিশ্বজিৎও লোকটি যা যা জানতে চাইলেন, শুধু সেসব প্রশ্নের উত্তরই দিতে লাগল। নিজ থেকে একটি প্রশ্নও করল না। কারণ, তার মাথায় তখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।   গাড়িভাড়া আট টাকা। আসা-যাওয়ায় মোট ষোলো টাকা। পকেটে আছে তেত্রিশ। তাহলে বাকি থাকে সতেরো টাকা। কিন্তু চা-সিগারেটের জন্য তো আরও পাঁচ টাকা চাই। এই পাঁচ টাকার লোভে টংয়ের দোকানদার কি তাকে দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি বিরক্তি ভরা মুখ নিয়ে অপরিচিত কাউকে পাঁচ টাকা বাকি দেবে? ভাবনার মাঝেই অদ্ভুত নাকওয়ালা গাড়ির চালক চিৎকার করে উঠল, “লালখান আছেন নাকি কেউ?” বিশ্বজিৎও চিৎকার করে বলল, “মামা, আছি!”   গাড়ি থামতেই বিশ্বজিৎ নেমে ভাড়া দেয়ার জন্য দশ টাকার নোট হাতে নিল। ঠিক তখনই গাড়ির ভেতর থেকে ভেসে এলো এক মধুর কণ্ঠ, “বিশ্বজিৎ, তুমি যাও। তোমার ভাড়াটা আমি দিয়ে দিব।”   এত মধুর বাক্য সে আগে কখনো শুনেছে কি না, সেই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারল না বিশ্বজিৎ।গাড়ি ছেড়ে দেয়ার ঠিক আগমুহূর্তে প্রথমবারের মতো নিজ থেকেই একটি প্রশ্ন করল সে, “আংকেল, আপনার নাম?” ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন, “অমল। অমল বড়ুয়া।”

বিজয় কুমার সুশীল বিজয় কুমার সুশীল অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
রং

হেমন্তের এ শহরটা খুব অচেনা। কত্ত রকম রঙের বাহার—আসমানে, দেয়ালে দেয়ালে, রিকশার ডালায়। রাঙানো এক বিশাল ক্যানভাস যেন।   আমাদেরও দেয়াল আছে—জীবনের। যে দেয়াল রাঙানোর চেষ্টায় সকাল-সন্ধ্যা মেকি প্রতিযোগিতায় নামি আমরা। কে কতটা সুন্দর করে সাজাবে জীবন, কে কতটা রঙিন দেখাবে নিজেকে—সে কী ব্যস্ততা! সবাই খুশি! ফেসবুকের পাতায় কলামে কলামে। অথচ পেছনে পড়ে থাকে ঘামে ভেজা টাউন সার্ভিস, সত্তর টাকা কেজি মিনিকেট চাল, তেলাপিয়ার ঝোল। মধ্যবিত্ত গল্প শেষ!   ছাতিমের ডালে সন্ধ্যা নামে এই শহরে। আবছায়ায় ক্লান্তির ভারে মানুষেরা এলিয়ে দেয় ভাঙা শরীর, মিলিয়ে যায় গাঢ় ঘুমের ঘোরে। সারা দিনের রং, সাজ, অভিনয় ধীরে ধীরে মুছে যায়। রং থেকে যায় শুধু দেয়ালে; জীবনের ভেতর জমে থাকে কালো—একরাশ ক্লান্তি আর হতাশা। নিজেদের দেয়াল রাঙাতে রাঙাতে কখন যে নিজেদেরই হারিয়ে ফেলি, টেরও পাই না।   তবু শেষরাত্তিরে কেউ একজন আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে—পেতেছি সমুদ্রে শয্যা, শিশিরে ভয় কীসের?   আবারও বেঁচে উঠি আমরা। রোদ যে উঠে গেছে জানালায়। নতুন দিনের ঘামে ভেজা গল্প। আবারও নিজেদের জানাই সাধুবাদ।   হেমন্তের শহর সব দেখে যায়, নিশ্বাস ফেলে শুধু গোনে নিশ্চুপ উনিশ-বিশের আলাপন!  

রাফিন মাহফুজ রাফিন মাহফুজ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
পরি

সারা দেশে তীব্র দাবদাহ চলছে। অফিস শেষ করে শোভন বাসায় রওনা দিয়েছে। সারা দিনের কর্মক্লান্ত শরীর। তার ওপর রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেল। শোভনের বাসার সামনের গলিটাতে প্রায়শই একটা গা ছমছমে ভাব থাকে।   বাস থেকে নেমে শোভন তার বাসায় যাওয়ার গলি ধরে হাঁটতে শুরু করে। কিছুক্ষণ হাঁটার পর তার মনে হলো, তার পাশে পাশে কে একজন হাঁটছে। আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ দেখে শোভন একটু থমকে দাঁড়ায়। চাঁদের আলোয় লোডশেডিংয়ে থাকা অন্ধকার পথটাও আজ খুব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আশপাশে কোনো হাসনাহেনা ফুলের গাছ নেই, তবুও কোথা থেকে যেন প্রচণ্ড সুঘ্রাণ তার নাকে ভেসে আসছে!   বাসায় ঢুকে শোভন গরমে অস্থির হয়ে যায়। এমনিতেই প্রচণ্ড গরম, তার ওপর আবার লোডশেডিং। কী দুর্বিষহ জীবন! সারা দিনের ক্লান্তি দূর করতে শোভন বাথরুমে গিয়ে গোসল করতে শুরু করে। প্রতিদিন ট্যাংকির পানি খুব গরম থাকে, কিন্তু আজ গোসল করতে গিয়ে শোভন একটু অবাক হয়ে যায়। হিমশীতল জল বের হচ্ছে পানির কল থেকে।   শোভন ব্যাচেলর। একাই একটা ছোট্ট দুই রুমের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। তাই কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে পারছে না আসলে ঘটনা কী? ঠান্ডা পানি পেয়ে প্রাণভরে গোসল সেরে নেয় শোভন। গোসল শেষ করে তার বেডরুমে প্রবেশ করতেই আবারও সেই মিষ্টি হাসনাহেনা ফুলের সুঘ্রাণ। সমস্ত ঘরটা ফুলের সুঘ্রাণে ভরে আছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, লোডশেডিং হওয়ার পরও ঘরে একটুও গরম নেই। একটা মৃদু শীতল বাতাস যেন বয়ে যাচ্ছে ঘরময়। হঠাৎ শোভন কিছু একটা দেখতে পেল তার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের ওপরে। যেন ধবধবে সাদা পোশাকে আবৃত অপরূপা কোনো নারী! শোভন তার মোবাইলে টর্চ লাইট জ্বালিয়ে ঘরময় খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। আর থাকবেই-বা কেমন করে, সে তো একাই থাকে এ বাড়িতে।   কর্মক্লান্ত দিন শেষে শোভন তার ঘরে শীতল অনুভূতি পেয়ে খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে। রাতে সে স্বপ্নে একটি অপরূপা সুন্দরী নারীর সাথে অজানা এক কল্পরাজ্যে ঘুরে বেড়ায়। নদী, পাহাড়, নীল আকাশ, সাদা মেঘ, মেঘের পরে মেঘ, ফুলের বিস্তীর্ণ বাগান, পাখির কলতান, হরেক রকম ফলের বাগান — এসব দেখতে দেখতে অপরূপা সেই নারীর সাথে তার খুব ভাব হয়ে যায়। অপরূপা সেই মেয়েটির পিঠে সাদা ধবধবে দুটো পাখা। হঠাৎ ঘড়ির অ্যালার্ম বেজে ওঠে। শোভনের ঘুম ভেঙে যায়।   কাচের জানালা ভেদ করে সকালের মিষ্টি সোনারোদ এসেছে তার ঘরে। হঠাৎ শোভনের চোখ পড়ে যায় তার ঘরের ড্রেসিং টেবিলের ওপর। মৃদু পায়ে সে এগিয়ে যায় ড্রেসিং টেবিলের দিকে। ভালো করে তাকিয়ে দ্যাখে দুটো সাদা ধবধবে পালক। গত রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে শোভনের। মনে পড়ে অফিস থেকে ফিরে বাসায় তার সাথে ঘটে যাওয়া সব অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর কথা। অফিসে গিয়ে শোভন তার কলিগদের বিষয়টা শেয়ার করে। সবাই বিষয়টা হেসে উড়িয়ে দেয়।   সেদিন থেকে প্রতিরাতে শোভনের সাথে একই রকম ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতিরাতে তার ঘরে পরি আসে। একটা সময় শোভনকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না...    

রবিউল করিম পলাশ রবিউল করিম পলাশ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
অপরূপা ও বৃষ্টিভেজা বিকেল

অপরূপার বৃষ্টি ভীষণ পছন্দ! সবুজ গাছপালা, পাখির কিচিরমিচির আর নিস্তব্ধ প্রকৃতি—এসব যেন তার অস্থির মনকে প্রশান্ত করে তোলে। এক বিকেলে সে একা হাঁটছে। চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ, ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নড়াচড়া আর পাখির সুরেলা ডাক যেন এক স্বপ্নের জগৎ তৈরি করেছে।   আজ আকাশের মন ভালো নেই। চারপাশে কালো মেঘ ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সামলে রাখতে না পারলে আকাশ কেঁদে ফেলবে। কিন্তু অপরূপার মন খুব খুশি, কারণ এমন আবহাওয়া তার খুব প্রিয়।   হঠাৎ করে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নামল বৃষ্টি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার সমস্ত মন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে থেমে দাঁড়িয়ে গেল। কোথায় যেন হারিয়ে গেল তার চিন্তা। কিছু ভাবার চেষ্টা করেও পারল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে একা। নীরব। আর সেই নীরবতার মাঝেই তার শরীরের প্রতিটি কোণ বৃষ্টিতে ভিজে গেল।   একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। চারদিকে নেমে এল প্রশান্ত এক নীরবতা। ভেজা চুল, চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজল, বৃষ্টিভেজা গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে পরিবেশটা এক গভীর আবেশ তৈরি করল। ঠান্ডা বাতাসে গা শিউরে উঠল অপরূপার। তবুও সে নড়ল না। এই মুহূর্তটা যেন কেবল তার একার। কোনো ব্যস্ততা নেই, কোনো কোলাহল নেই—শুধু সে আর প্রকৃতি।   বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ে যে শব্দ তুলেছিল, তা যেন গিয়ে ঠেকেছে তার হৃদয়ের গভীরতম কোণে। সেই অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।   হঠাৎ দূরে এক পাখির ডাক তাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে সে। প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে যেন ফেলে আসছে তার অস্থিরতা, ক্লান্তি আর না-বলা কথাগুলো।   আজ বৃষ্টির সঙ্গে কেবল শরীরই নয়, মনটাও ভিজেছে। ভিজে গিয়ে ধুয়ে গেছে সব মলিনতা। আজ অপরূপা যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছে নতুনভাবে। তার ঠোঁটে এক অম্লান হাসি। চোখে তৃপ্তির ছায়া। বাতাসে ভেসে বেড়ায় অপরূপার শান্ত, স্থির মন।   তাকে দেখে মনে হয়, সে আজ সত্যিই মুক্ত।  

নাফিসা আঞ্জুম ফারিহা নাফিসা আঞ্জুম ফারিহা অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
আরেকটু ডোপামিনের আশায়

বেলকনিতে বসে গল্পের বই পড়ছিলাম। হঠাৎ রাস্তার দিকে চোখ পড়তেই একটি ঘটনা চোখে পড়ল।কয়েকজন লোক একটা মেয়েকে জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার বিষয়টা একটু সন্দেহজনক মনে হলো। তাই আমি তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বের হয়ে তাদের পিছু নিলাম। কিছুদূর গিয়ে দেখি তারা মেয়েটিকে একটি বাড়িতে নিয়ে গেল। আমিও গেলাম লুকিয়ে লুকিয়ে। এরপর দেখলাম তারা মেয়েটিকে বারান্দায় বেঁধে রেখে রুমে চলে গেল। মেয়েটি একটু অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। মেয়েটি বলছিল, “আমার খিদে লেগেছে।” আরও অস্পষ্টভাবে শুনতে পেলাম, “আমাকে মরফিন দাও।”   আমি দৌড়ে গেলাম মাঠের দিকে। গিয়ে দেখি হাবলু আর বাবলু মাঠে বসে আছে। চিৎকার করে ডাক দিতেই হাবলু বলল— কী হয়েছে নিলু? এভাবে হাঁপাচ্ছিস কেন? বাবলু পানি এনে বলল— এটা খা আগে। তারপর শান্ত হয়ে বলিস কী হয়েছে?   আমি পানি খেয়ে কিছুক্ষণ শ্বাস নেয়ার পর পুরো ঘটনা খুলে বললাম। ওরা শুনে একটু অবাক হলো। ওদেরও মেয়েটিকে দেখার খুব ইন্টারেস্ট জাগল। ওদের নিয়ে গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি, মেয়েটি এখনো বাঁধা আছে। বাড়িতে লোকজনের সাড়াশব্দ নেই। আমরা তিনজন বাড়িতে প্রবেশ করেই দেখি, মেয়েটি আমাদের দিকে পেত্নীর মতো তাকিয়ে আছে। আমরা মেয়েটির শরীরে বাঁধা রশিগুলো খুলে দিলাম। বাড়ির লোকজন শব্দ পেয়ে ছুটে এল। তারা দৌড়ে এসে মেয়েটিকে ধরার চেষ্টা করে। আর আমরা অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। যখন দেখলাম যে মেয়েটি বেসিনে রাখা টুথপেস্ট, নেইল কাটার, টুথব্রাশ খাওয়ার জন্য মুখে ঢুকাছিল। কিন্তু লোকগুলো দেখা মাত্রই মেয়েটির হাত থেকে সেগুলো জোরজবস্তি করে কেড়ে নেয়। তারা মেয়েটিকে অনেক শক্ত করে ধরে রাখে। আমরা কিছু বলার আগেই একজন বয়স্ক মহিলা এসে বললেন— তোমরা কারা? এখানে কী করছ? হাবলু বলল— আমরা কে তা জেনে আপনাদের লাভ নেই। আগে বলেন আপনারা মেয়েটিকে জোরজবরদস্তি করে কেন বেঁধে রেখেছেন? আমরা মেয়েটির অভিভাবক। আমরা আমাদের মেয়েকে কী করব না করব, এটা আমাদের ব্যাপার। তোমরা কে? আমি বিস্মিত হয়ে বরলাম— আপনারা অভিভাবক! হ্যাঁ। কী হয়েছে মেয়েটির? সে এমন অখাদ্য বস্তু কেন গিলতে যাচ্ছিল? মরফিন-ডোপামিনের জন্য। মরফিন তো মাদকজাতীয় দ্রব্য! হ্যাঁ। আন্টি, আমরা তো আপনাদের কোনো কথায় বুঝতে পারলাম না। সবকিছু খুলে বলেন।   ধমক দিয়ে একজন বাবার বয়সী লোক বলে উঠলেন— এই বাচ্চারা, এখানে কী করতে এসেছ? চুরি করতে এসেছ নিশ্চয়! বিল্লু এই বিল্লু পুলিশকে ফোন কর। আমরা কিছু বুঝতে না পেরে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারা আমাদের বাইরে যেতে দিল না। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে হাজির হলো।   পুলিশ এসে বলল— কী হয়েছে? এই যে এই বাচ্চাগুলো চুরি করতে এসেছিল। এদের ধরে নিয়ে যান। না না স্যার। আমরা চুরি করতে আসিনি। দেখতে তো ভদ্রঘরের সন্তানের মতো, কিন্তু স্বভাবে চোর চোর ভাব কেন? আমরা চোর নই। একজন দারোগা বললেন— স্যার, আমার মনে হয় এদের আরও অনেক বড় গ্যাং আছে। এদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। একদম ঠিক। ধরো ওদের। নিয়ে চলো থানায়।   হাবলু আর বাবলু ভয় পেয়ে গেলেও আমার ভয় লাগছিল না। আমি জানতাম, আমরা কিছু করিনি। অতএব, ওরা আমাদের কিছুই করতে পারবে না। তাই আমি কোনো সংকোচবোধ না করেই চলে গেলাম।   থানায় আসার পর অফিসার বললেন— তোমাদের নাম কী? আমাদের সবার নাম বললাম। তোমরা কোন ক্লাসে পড়ো? ক্লাস টেনে। তোমাদের বাসা কোথায়? রোজ গার্ডেন। তোমাদের মাঠে গিয়ে এখন খেলার বয়স। তোমরা চুরি করো কেন? আমরা চুরি করি না। কারণ আমরা চোর নই। তাহলে ওই বাড়িতে কেন গিয়েছিলে? মেয়েটিকে বাঁচাতে। মানে? স্যার, আমি সব খুলে বলছি। শোনেন... সব শোনার পর তিনি বললেন— আচ্ছা, তাহলে এই কাহিনি! তোমরা কি জানো ওই মেয়েটি মাদকের প্রতি এডিকটেড? না স্যার জানি না। কিছুদিন আগে মেয়েটিকে আমরা বড় নদীর ব্রিজ থেকে মাতাল অবস্থায় উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসি। পরে মেয়েটির ফ্যামিলি এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। পরদিন কিছু কাগজপত্র জমা দেয়ার জন্য ফোন করলে জানতে পারি যে, মেয়েটির অবস্থা খুব সিরিয়াস। সে এখন হসপিটালে।   আমরা হসপিটালে গেলে তার অভিভাবক জানায় যে, মেয়েটিকে তারা মাদকদ্রব্য থেকে দূরে রাখার জন্য বন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু মেয়েটি অখাদ্য সব বস্তু অর্থাৎ নেইল কাটার, টুথপেস্ট ইত্যাদি গিলে ফেলে। এডিকশন লেভেল কী পর্যায়ে গেলে মানুষ এমন সব জিনিস গিলতে পারে! কী ভাবছ? এসব উল্টাপাল্টা জিনিস খাওয়ার এডিকশন! মোটেও না। সার্জারি করার সময় ব্যথা উপশমের জন্য যে মরফিন ড্র্যাগ দেয়া হয়, সেটার স্বাদ আরেকবার পেতে টুথব্রাশ, টুথপেস্ট, নেইল কাটারের মতো অখাদ্য বস্তু গিলতে শুরু করে মেয়েটি। যেন তাকে আরেকবার হসপিটালে গিয়ে সার্জারি করার সময়ে মরফিন ড্র্যাগ দেয়া হয়। জাস্ট আরেকটু মরফিনের আসায় আরেকটু ডোপামিনের আশায়। কী জীবনে সাথে মিলে যায়! রিলস, স্ক্রলিং, ধূমপান, মাস্টারবেশন, পর্নগ্রাফি...   এসব শোনার পর আমার ইন্দ্রিয় শক্তির এডিকশনের প্রতি জঘন্যতম ঘৃণা জমে গেল। আমি কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলাম না। পুলিশ অফিসার বললেন— তোমরা ছোট আছ। এখন থেকে সাবধান হয়ে যাও। আর মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলো। তোমরা প্রতিরোধী হলে তোমাদের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল।  

শারমিন আক্তার শিমু শারমিন আক্তার শিমু অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
অচেনা শহর

ফেনীর চেনা রাস্তা, পরিচিত মানুষ আর মাকে ছেড়ে একদিন চলে এলাম নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। শহরটা আমার কাছে একদম অচেনা ছিল। বাস থেকে নামার পর চারপাশে এত মানুষ, এত শব্দ—তবুও কেন জানি নিজেকে খুব একা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এ শহরে আমাকে চেনে এমন একজন মানুষও নেই।   বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা বারবার বলেছিল, “নিজের খেয়াল রাখিস।” তখন কথাটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন পর বুঝলাম, মায়ের সেই কথার ভেতর কতটা চিন্তা লুকিয়ে ছিল।   এখন থাকি একটা মেসে। এখানে মা নেই, পরিবারের কেউ নেই—আছে শুধু আমি আর আমার ছোট্ট একটা ঘর। এখানে অসুস্থ হলে নিজেকেই ওষুধ খুঁজতে হয়, মন খারাপ হলে নিজেকেই সামলাতে হয়, কোথাও যেতে হলে নিজেকেই পথ চিনতে হয়। কেউ আর জিজ্ঞেস করে না, “খেয়েছিস?”   তবুও ধীরে ধীরে এই অচেনা শহরটাকেই চিনতে শুরু করলাম। নতুন রাস্তা, নতুন মানুষ, নতুন জীবন—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখলাম।   ফেনী আমার ঘর, আর নোয়াখালী আমাকে বড় হয়ে ওঠার গল্পটা শেখাচ্ছে। শুধু সন্ধ্যা নামলে মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মনে হয়, মানুষ হয়তো স্বপ্নের জন্য ঘর ছাড়ে, কিন্তু ঘরকে কখনো মন থেকে ছাড়তে পারে না।

তাহামিনা আক্তার সুমাইয়া তাহামিনা আক্তার সুমাইয়া অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
আত্মার শনাক্তকরণ

  এই যে লোকটা মাত্র গাড়িতে করে সামনে দিয়ে গেল, সে আমার আব্বা। এই লোকটা আমার কোনো এক বান্ধবীর মোবাইল নম্বর খুঁজছে। কেন? ভার্সিটিতে আমার বিষয় খোঁজ নেয়ার জন্য। শেষ কবে আমার যোগাযোগ হয়েছিল বান্ধবীদের সাথে আর শেষ কবে ক্লাসে গিয়েছি, তা জানার জন্য। আমার হোস্টেলে খবর নিয়েছে গত তিন দিন আগে আমি বের হয়েছিলাম শুনেছে। আর তেমন কিছু কেউ জানেনা, হোস্টেলে কে কার খোঁজ রাখে তেমন?   আব্বা যাচ্ছে এখন বাড়িতে মাকে জানাতে। আমার নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকে বেশ মরা মরা অবস্থা সবার, আজ খোঁজ পাওয়া গেছে। আব্বাকে জানিয়েছে থানা থেকে আমার লাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। শরীরের দাগের সংখ্যা অনেক, তবে হাতে গালে নখের দাগ দেখে বোঝা যাচ্ছে নিজেকে এভাবে আঘাত করার বিষয়টা নতুন কিছু নয়। তবে যে সাহসের ভীষণ প্রয়োজন ছিল, তা বেশ ভালো রকম জুগিয়েছি।   এসব স্বীকারোক্তি পাশে দাঁড়ানো কালো কোর্ট পরা লোকটার। আর এই যে এদিকে নীল রঙের শার্ট পরা ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারায় ছেলেটা, ওর নাম পুণ্য। জি হ্যাঁ, এভাবেই বসে আছে গত চার ঘণ্টা। ভাবছেন কাঁদছে না কেন? ও কাঁদবে কেন? ওর তো কাঁধ থেকে বিশাল এক বোঝা হালকা হয়ে গেল, তবে তার ভেতরে কী চলছে, তা সে ভালো জানে। না, চিন্তার কিছু নেই। তার সাথে আমার শেষ কথা হয়নি। তাই তার দায়ভার নেই এতে। আমাদের বিচ্ছেদের তিন মাস হয়ে গেছে প্রায়।   পুণ্য এসেছিল শনাক্তকরণের জন্য। ওর থেকে ভালো আর কে চিনবে আমাকে? তাকে ডাকা হয়েছিল ঠিক এমন না। পরিবারের পক্ষ থেকে সে নিজেই এসেছে। শনাক্তের কাজ শেষ। প্রায় দেড় ঘণ্টা থেকে তাকে যেতে বলা হচ্ছে মর্গ থেকে। কেন যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে!   বাড়িতে তিন দিন পর শোক বসেছে। দূর থেকে অদ্রি আর কায়াকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কেবল। মিকো সেই প্রাচীরের দেয়ালটায় শুয়ে আকাশ দেখছে, আর মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে মিউ মিউ করছে। ওর গলার আওয়াজ বরাবরই ধীরে। আর জেফি কোন গাছের ডালে উঠে আছে কে জানে!   এই ভেবে সামান্য খুশি হচ্ছি অন্তত ওরা দুজন আমাকে দেখতে পারছে। ওদের আদর করতে পারছি।    

মায়মুনাহ্ জামান চৌধুরী মায়মুনাহ্ জামান চৌধুরী অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
শরৎ আর আমি

শরৎ এলেই আমার ভেতরটা কেমন যেন বদলে যায়। নীল আকাশ, সাদা মেঘ আর নদীর ধারে দুলতে থাকা কাশফুল—সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত নীরবতা। চারপাশ এত সুন্দর, অথচ কোথাও একটা অকারণ শূন্যতা লেগে থাকে।   আজ বিকেলে একা কাশবনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাতাসে কাশফুলগুলো দুলছিল, আর আমি চুপচাপ তাকিয়ে ছিলাম তাদের দিকে। ভাবছিলাম, শরৎ কতটা অদ্ভুত!   সে আসে কোনো শব্দ না করে, অথচ পুরোনো কত কথা মনে করিয়ে দেয়। হারিয়ে যাওয়া মানুষ, অসমাপ্ত গল্প, কিছু ভুল সিদ্ধান্ত—সবকিছু যেন হঠাৎ করে ফিরে আসে।   একটা কাশফুল হাতে নিয়ে মনে হলো, আমিও বুঝি এই কাশফুলের মতো। বাইরে থেকে সাদা, শান্ত, সুন্দর, কিন্তু একটু বাতাস এলেই ভেতরের সব কথা দুলে ওঠে।   সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। আকাশে তখন শেষ বিকেলের আলো। আমি হাঁটতে শুরু করলাম। পেছনে পড়ে রইল কাশবন, সামনে অচেনা পথ। হয়তো জীবনও এমনই—কিছু ঋতু আসে, কিছু স্মৃতি রেখে চলে যায়। আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকি, পরের শরতের অপেক্ষায়।   শরৎ আসে প্রতিবছর। শুধু শরতের সেই ‘আমি’টা আর ফিরে আসি না।  

মো. নাহিদ ইসলাম মো. নাহিদ ইসলাম অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
শেষ পৃষ্ঠার মানুষ

রাত তখন প্রায় দুটো। শহরের সব জানালা একে একে অন্ধকার হয়ে গেছে। শুধু পুরোনো কাঠের টেবিলের ওপর জ্বলছিল একটি হলুদ বাতি। বাতির নিচে বসে একজন মানুষ—কলম হাতে, সামনে সাদা কাগজ। তার নাম মতিন।   সে কবিতা লেখে, গল্প লেখে, কখনো উপন্যাসের পাতা ভরায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—তার নিজের জীবনটাই যেন কোনো দিন লেখা হয়ে ওঠেনি।   সেদিনও সে লিখতে বসে প্রথম লাইনটি লিখল, ‘মানুষের সবচেয়ে বড় গল্পটি সে নিজেই জানে না।’ তারপর থেমে গেল। হঠাৎ দরজায় টোকা। কে? বাইরে থেকে কোনো উত্তর এল না। দরজা খুলে মতিন দেখল, একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে পুরোনো পাঞ্জাবি, হাতে একটি ছেঁড়া খাতা। বৃদ্ধ বললেন— বাবা, তুমি কি গল্প লেখো? হ্যাঁ। তাহলে আমার গল্পটা লিখবে? মতিন একটু অবাক হয়ে বলল— আপনার গল্প কী? বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন— সেটাই তো জানি না। সারা জীবন অন্যের গল্প শুনেছি, নিজের গল্পটা কখনো কেউ শোনেনি। মতিন তাকে ভেতরে বসাল। বৃদ্ধ বলতে শুরু করলেন— ছোটবেলায় বাবা বলেছিলেন, মানুষ হবি। যৌবনে মা বলেছিলেন, সংসার করবি। সংসার করে স্ত্রী বলল, সন্তান মানুষ করো। সন্তান বড় হয়ে বলল, বাবা, তুমি একটু বিশ্রাম নাও। আমি বিশ্রাম নিলাম। তারপর একদিন দেখলাম, সবাই ব্যস্ত, শুধু আমি অবসর।   মতিনের কলম থেমে গেল। বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন— জানো বাবা, জীবনে অনেক বাড়ি বানিয়েছি, কিন্তু নিজের জন্য একটা ঘর বানাতে পারিনি। মতিন ধীরে বলল— আপনার সন্তানরা কোথায়? বৃদ্ধ হাসলেন— সবাই আছে। শুধু সময় নেই। কথাটা বলে বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। মতিন বলল— আপনার নামটা তো জানলাম না! বৃদ্ধ দরজার কাছে গিয়ে বললেন— নাম লিখে কী হবে বাবা? গল্পটা লিখো। হয়তো কেউ নিজের বাবাকে চিনে ফেলবে।   দরজা বন্ধ হলো। মতিন আবার টেবিলে এসে বসল। ভোর হলো। পাখিরা ডাকল। শহর জেগে উঠল। কিন্তু মতিনের ঘরে কোনো বৃদ্ধ ছিল না।   চেয়ারটি খালি। শুধু টেবিলের ওপর পড়ে আছে সেই ছেঁড়া খাতাটি। মতিন খাতাটি খুলে দেখল—প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা মাত্র একটি বাক্য, ‘যে মানুষ সারা জীবন অন্যের জন্য বেঁচে থাকে, তার নিজের জীবনের শেষ অধ্যায়টি কেউ লিখে না।’   মতিনের চোখ ভিজে উঠল। সে নিজের গল্পের শেষ লাইনটি লিখল, ‘কিছু মানুষ গল্পের চরিত্র হয়ে জন্মায় না; তারা অন্যের জীবনের গল্প লিখতে লিখতেই একদিন নিজের গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় এসে দাঁড়ায়।’

মোঃ ওয়ালিউল্লাহ মোঃ ওয়ালিউল্লাহ অক্টোবর ১, ২০২৬ 0
ছায়াবাজি

মধ্যরাত। বাইরে প্রচণ্ড ঝড় বইছে। মুষলধারে বৃষ্টি আর বজ্রপাতের বিকট শব্দে চারদিক প্রকম্পিত। জানালার কাচ দমকা হাওয়ায় দুলছে। মনে হচ্ছে যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে। গাছের ডালপালা ঝড়ে উপড়ে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে।   বিদ্যুৎ নেই। গোটা বাড়ি অন্ধকারে ঢেকে আছে। রেবেকা তার শয়নকক্ষে একলা শুয়ে আছে, কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। বিছানার পাশে একটা টেবিল। সেখানে রাখা মোমবাতির আলো নিবু নিবু করে জ্বলছে। ঘরজুড়ে আলো-ছায়া খেলা করছে।   রেবেকা চুপচাপ শুয়ে আছে। চোখ দুটো অন্ধকারে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ তার দৃষ্টি দেয়ালের দিকে আটকে যায়। সেখানে একটি হাতের ছায়া! বড়, ভয়ংকর একটা হাত। দেয়ালে লম্বা ছায়া হয়ে ফুটে উঠেছে। মুহূর্তেই তার শরীর শিউরে ওঠে। আতঙ্কে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। হাতটি যেন ধীরে ধীরে নড়ছে—তার দিকে এগিয়ে আসছে।   রেবেকা চিৎকার করতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। হাত দুটো আঁকড়ে ধরে কম্বলের নিচে লুকিয়ে ফেলে। আর মুহূর্তেই হাতের ছায়াটি উধাও! সে আবার সাহস করে হাত বের করে। ছায়াটি আবার দেয়ালে ভেসে ওঠে।   তার দেহে বিদ্যুৎ খেলে যায়। মাথার মধ্যে ভয় গেঁথে বসে, এটা কি আমার হাতেরই ছায়া? আস্তে আস্তে তার উপলব্ধি হয়—হ্যাঁ, এটা তার হাতের প্রতিচ্ছায়া মাত্র। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে শান্ত হতে চায়। কিন্তু তখনই নতুন কিছু চোখে পড়ে। দেয়ালে শুধু তার হাতের ছায়া নয়, আরেকটি ছায়াও রয়েছে! রেবেকার শরীরে যেন দমবন্ধ হয়ে আসে। সে ধীরে ধীরে বিছানার এক পাশে সরে আসে।   মোমবাতির আলো দপদপ করে নিভে যায়। অন্ধকার আরও ঘনিয়ে আসে। সে তখন বুঝতে পারে, সে একা নয়। ঘরের কোণ থেকে খুব ধীরে একটা শব্দ আসে, যেন কেউ নিঃশব্দে নড়ছে। তার দৃষ্টি জানালার দিকে যায়। জানালার পর্দা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে, অথচ বাতাস বন্ধ। জানালার ভেতরে ঢুকতে পারে না। তার পা ঠান্ডা হয়ে আসে। কানের কাছে যেন এক অদৃশ্য শ্বাস ফেলার শব্দ শুনতে পায়।   তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে। সে আস্তে করে বিছানা থেকে নামতে চায়, কিন্তু তখনই পায়ের নিচে কিছুর স্পর্শ অনুভব করে—ভেজা কাদার মতো ঠান্ডা কিছু। সে দ্রুত মোমবাতি জ্বালায়। আলোয় যা দেখে, তাতে তার দেহ অবশ হয়ে যায়—মেঝেতে কাদামাটির ছাপ। কেউ একজন এই ঘরে এসেছে!   রেবেকা ছুটে দরজার দিকে যায়, কিন্তু দরজার ছিটকিনি খুলতে গিয়েই থমকে দাঁড়ায়। দরজার নিচ দিয়ে আস্তে আস্তে একটা হাত ভেতরে ঢুকে পড়ছে। তার চিৎকার বেরিয়ে আসে, কিন্তু ঝড়ের শব্দে তা হারিয়ে যায়। সে মরিয়া হয়ে জানালার দিকে ছুটে যায়, কিন্তু জানালার পর্দা সরাতেই দেখে, সামনে এক জোড়া অন্ধকার চোখ তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।   সে এক লাফে পিছিয়ে পড়ে। পেছনে হাওয়ার মতো কিছু একটা নড়ল। কেউ ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। রেবেকা শেষ শক্তি দিয়ে ঘরের লাইটের সুইচ টিপে দেয়। আলো জ্বলে ওঠে।   ঘরের এক কোণে একজন দাঁড়িয়ে আছে। ভেজা কাপড়, মাটিতে কাদা লেগে আছে। মুখটা অর্ধেক কাপড়ে ঢাকা। হাতে কিছু একটা চকচক করছে—একটা ছুরি। সে অনেকক্ষণ ধরেই ঘরের ভেতরে ছিল।   রেবেকা দৌড়ে দরজার দিকে যেতে চায়, কিন্তু লোকটা বিদ্যুতের গতিতে তার সামনে চলে আসে। কিন্তু ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে এক প্রতিবেশী ডাক দেয়, “রেবেকা! তুমি ঠিক আছ?”   লোকটা মুহূর্তের মধ্যে ছুটে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে যায়। রেবেকা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে। ঝড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে, শরীর কাঁপছে। প্রতিবেশী এগিয়ে আসে, “কী হয়েছে?”   রেবেকা শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। ভেতরে আর কেউ নেই। কিন্তু তার মন বলছে—লোকটা আবার আসবে।  

মইদুল ইসলাম অকিল মইদুল ইসলাম অকিল সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
অপূর্ণ চাওয়া

শেষ বিকেলের আলো জানালার ফাঁক গলে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকছিল। সেই আলো এসে পড়েছিল ইলহানার মুখে। দীর্ঘদিনের এক কঠিন অসুখ তার শরীরকে নিঃশেষ করে দিয়েছিল। চিকিৎসকেরা সময় বেঁধে দিতে পারেননি, কিন্তু ইলহানা বুঝতে পেরেছিল—তার সময় আর বেশি নেই। ‎ ‎ধীরে ধীরে সে আলমারির দরজা খুলল। ভেতর থেকে যত্ন করে বের করল সেই গাঢ় নীল জামদানি শাড়িটি—যেটি একদিন তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি তাকে দিয়েছিল। কতদিন শুধু ছুঁয়ে দেখেছে, অথচ পরা হয়ে ওঠেনি। আজ সে শাড়িটাই পরল। ‎ ‎খোলা চুলগুলো আলতো করে কাঁধে ছড়িয়ে দিল। কোনো বাড়তি সাজ নয়, শুধু একটুখানি শান্ত হাসি। যেন কোনো অষ্টাদশী কিশোরী প্রথমবার শাড়ি পরে আয়নায় নিজেকে দেখছে। এরপর ‎ধীর পায়ে সে তার প্রিয় মানুষের সামনে এসে দাঁড়াল। ‎ ‎জানালার নরম আলোয় ইলহানাকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন। যেন সময় নিজেই থমকে গেছে। ইলহানা তার দিকে এগিয়ে গেল। তাকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। শুধু অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল—সেই দৃষ্টিতে ছিল হাজারও না-বলা কথা, অগণিত অপূর্ণ স্বপ্ন, আর শেষবারের মতো ভালোবাসাকে দেখে নেয়ার আকুলতা। ‎ ‎এক মুহূর্ত পর ইলহানার ঠোঁট কাঁপল, “শুধু...আরেকটু...” ‎‎শব্দটি আর পূর্ণ হলো না। ‎তার চোখের আলো ধীরে ধীরে নিভে এলো। শরীরটা হঠাৎই ভারহীন হয়ে পড়ল। নিঃশব্দে সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।   ‎ঘরজুড়ে তখন শুধু জানালার আলো, আর মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা সেই গাঢ় নীল শাড়ির আঁচল—যেন ভালোবাসার শেষ স্মৃতিটুকু আঁকড়ে ধরে সময়ও নীরবে কাঁদছিল।  

মরিয়ম মিথী মরিয়ম মিথী সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
সান্ডার তেল

হাটের ভিড় ঠেলে কলিমুল্লা এদিক-ওদিক দেখছে। মাঝে ঘাড়ে ঝোলানো হাজি গামছা দিয়ে চোখের গোল চশমার গ্লাসটি পরিষ্কার করে দেখছে। কিন্তু খোঁজে পাচ্ছে না। হাটের ভ্রাম্যমাণ পানের খিলি বিক্রেতা কয়েকবার তাকে দেখছে, কিন্তু দু-তিনবার দেখে কিছু মনে করেনি। চতুর্থবার হাটের গলিতে দেখে পানের খিলি বানানো বাদ দিয়ে একরকম পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে বলল, “কাক্কা কী খুঁজেন? সারা হাটে দেখলাম আপনি উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছেন?”   প্রশ্নগুলো শুনে করিমুল্লা ফোঁকলা দাঁত বের করে শুকনো হাসি দিয়ে বলল, “ওই সান্ডার তেল আলা কইগো বাবাজি?” উলটো প্রশ্ন শুনে পানের খিলিওয়ালা বলল, “ও এইটা! আমি তো মনে করলাম সোনা দানা টাকা কিছু হারাইছেন কি না।” কলিমুল্লা আবারও হাসি দিয়ে বলল, “কী কও বাবাজি, থামো আগে। ভিজে পাতি, চম্মন বাহার দিয়ে আগে এক খিলি পান দেও তো।” পানের ফেরিওয়ালা কোনো কথা না বাড়িয়ে পানের খিলি বানাতে লাগল। পান হাতে দেয়ার পর করিমুল্লা পানটি মুখে দিয়ে পিকটা ফেলে বলল, “দেখেছ ওই সান্ডার তেলওয়ালাকে? কদিন ধরে পুবেল বাতাসে মাঞ্জার বেদনা আর পায়ে টান ধরে। বাবাজি বলো তো দেখছ কি না?” বারবার একই প্রশ্ন শোনার পর পানের টাকা নেয়ার পর যেতে যেতে বলল, “আগের দিন ভুইলা যান কাক্কা, সান্ডার তেল টেলে আর কাম হয় না, ফার্মেসিতে যান বড়ি খান...”   কথা শুনে মুখটা নিচু করল করিমুল্লা। আজকের হাটে নতুন ধান বিক্রি করে মনটা খারাপ। খরচ যা হয়েছে, তার চেয়ে এবার ধান বিক্রি কম হয়েছে। তার মধ্যে ধানের ফড়িয়া দালাল ও ব্যাপারিরা মাপে বেশি তো নেয়, তার ওপর ধলতা, বাজারের খাজনা, তোলা সব মিলিয়ে ১৫ সের কম হলো ২ মণে। হায় রে দুনিয়া, খালি মাইরা নেয়। একা একা কথা বলতে বলতে বাহাজ হুজুরের বইয়ের দোকানে বসে।   হাটের এক কোণে মাটিতে মাদুর পেতে বই বিক্রি করে। করিমুল্লা প্রতি হাটে এখানে আসে, বই মানে কায়দা, সিপারা, পাঞ্জেগানা সুরা, কী করিলে কী হয়, নেয়ামুল কোরআন, সহি নামাজ শিক্ষা, খোয়াবনামা, সোনাভানের পুথি, জঙ্গনামা, সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামান, শিরি ফরহাদ পুথিগুলা বসে বসে চোখ বুলিয়ে হাতটি বাড়িয়ে খোয়াবনামা বইটি নিল। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দেখে বাহাজ হুজুরকে দাম জিজ্ঞেস করল। দাম সাড়ে তিন টাকা। হাতাকাটা পাঞ্জাবির নিচের পকেট থেকে খুঁজে নিয়ে গুনে টাকা দিয়ে উঠে পড়ে। মাজার ব্যথাটার জন্য ধীরে ধীরে ওঠে।   মাজার ব্যথায় আবার তার চোখ দুটি খু্ঁজতে থাকে সেই সান্ডার তেল। হাটের মানুষজন কমতে শুরু করেছে বাড়ি ফিরতে হবে। তাড়া আছে, কাচের বোতলে কেরোসিন নিতে হবে, তাই হাটে এসে সাহা বাবুর দোকানে রেখে এসেছিল। তার দেড় সের ওজনের বোতলটা অনেক দিনের। কোনো দিন দোকানে বদল হয়নি। অনেকে হাটে বোতল ভাঙে কিন্তু অনেক দিন হয় তার বোতলটা টিকে আছে। সাঁঝবেলা বউ হেরিকেনের চিমনি মুছে পরিষ্কার করে, তাতে ফিতা ভেঙে রাখে। প্রতি হাটে কেরোসিন নিয়ে আসে। সাহার দোকান থেকে কেরোসিন নিয়ে রাস্তার পাশে বসা তামাক পাতা কিনতে হবে। বাড়ির বুড়িটা এখনো পানে মতিহারি তামাক পাতা খায়, তাই প্রতি হাটের দিনে কয়েক পাতা কিনে থাকে। আজও কিনেছে। বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার সময় হাটের শেষ মাথায় নাপিত হাটির পাশে নানান ক্যানভাসে বসে শেষ সময়ে এখানে একটু খোঁজ নেয় করিমুল্লা। যদি মিলে যায় সান্ডার তেল!   এদিক-ওদিক খুঁজে এক জায়গায় ইঁদুর মারার বিষ, মাথার মলম, সাইবালির ফলের সিরাপ খুঁজতে খুঁজতে হাটের শেষ মাথায় গিয়ে বাবর আলীর দেখা পায়। সে সান্ডার তেল বিক্রি করে। ছোট ছোট বোতলে কালো বর্ণের সান্ডার তেল নিয়ে বসে আছে। সাথে বনরুই, শেকড় বাকড়, মৃগনাভিসহ নানান পদের জিনিস। করিমুল্লা প্রশ্ন করে, “অনেক খুঁজে তোমায় পাইলাম, দাও দুই শিশি সান্ডার তেল।” বাবর আলী ছোট দুই বোতল তেল একটি কাগজে বেঁধে দিতে দিতে বলল, “চাচা, দাম কইলে বাইরে গেছে।” শুনে একরকম হকচকিয়ে ওঠে করিমুল্লা, “কে, দাম বাড়াল কে? সান্ডা কি গরু যে তার গোস্ত মানুষে খায়?” বাবর আলী তার চিরচেনা বাবরি দুলিয়ে হাততালি দিয়ে বলল, “শুনেন চাচা, তাহলে একটু পাশে বহেন।” বলেই তার গল্পের ঝুড়ি খুলে দিল, “সান্ডা হইলো মরুভূমির প্রাণী। তারা ঘাস খায়। আগে তাদের ধইরে ধইরে মানুষ নানান ওষুধ ও তেল তৈরি করত। মরুভূমিতে থাকে বলে আগে আরবের গরির মানুষরা সান্ডা খাইত। খাওয়া হারাম না হালাল তাও জানি না। তবে একবার শুনছিলাম, এইটা খাওয়া নাকি মাকরুহ।”   কথা শুনে করিমুল্লা উঠতে চাচ্ছে। এক রকম হাত ধরে জোর করে আবার বসাল বাবর আলী, “আসল কতা হুনেন, তারপর গরির আরবরা যখন এইটা খাইয়া মজা পাইছিল, তখন নজর পড়ল শেখ আর কফিলদের। তারা আবরের ওই গরিব লোক, যারা বেদুইন, তাদের মুখের আহার কাইড়া নিয়া শেখ আর কফিলরা মজা করে খায়। তারা মরুভূমিতে তাঁবু তুলে বালুর ভেতর থেকে রাইতে সান্ডা ধরে খায়। ওই জন্যই দাম বাড়ছে চাচা!”   করিমুল্লা গল্প শুনতে শুনতে একরকম বিরক্ত হয়ে বলে, “কয় ট্যাহা নিবা কও? এতো কথা শুনার সময় কই, হাটবেলা পার করলাম তোমারে খুঁইজ্যা। এখন বাকি সময় গেল গল্প শুইনা।” বাবর আলী বলল, “দুই শিশি বিশ ট্যাহা দেন। দশ ট্যাহার জিনিস বিশ ট্যাহা!”   হাটের শেষ বেলা পশ্চিমের সূর্যটা লাল বর্ণ হয়ে উঠেছে। ভাঙা হাটের মানুষ বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। মানুষের কাতারে হাঁটছে করিমুল্লা। পূর্ব বায়ু বেড়েছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে বাতের ব্যথাগুলো বেড়ে গেছে। তাই মাজা বাঁকিয়ে চলছে। সাঁঝের বেলা শেষ রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে তার বউকে দিয়ে মাজা, পা, ঘাড়ে সান্ডার তেল মালিশ করছে। ঘরের পুবের জানালা খোলা। ঝিরিঝিরি বাতাস আসছে। ঘুমের ঘোরে চলে গেছে করিমুল্লা। মরুভূমির চাঁদনি রাত। মোটা কার্পেট পাড়া তাঁবুতে শুয়ে আছে। কেটলিভরা গাওয়া ঘি, খেজুর, থালাভরা সান্ডার মাংস আর গরম খবুজ রুটি।   আরবীয় পোশাক পরা করিমুল্লা। সান্ডার মাংস আর খবুজ রুটি খেতে খেতে হঠাৎ তাঁবু থেকে একটি সান্ডা শরীরে পড়ে; লাফ দিয়ে চমকে উঠে ঘুম ভেঙে যায়। বুকে হাত দিয়ে দেখে, একটি টিকটিকি তার বুকের ওপর পড়ে আছে। দেখে শরীর শিউরে উঠে। করিমুল্লা তার জরাজীর্ণ ঘরের সিলিংয়ের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। হেরিকেনের আলোটি মিট মিট করে জ্বলছে।  

জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
কুঁড়িতে ঝরা ফুল

বিকেল পাঁচটা বাজলেই পাড়ার মাঠে ছেলেদের চেঁচামেচি শুরু হতো। কিন্তু সুজনের সেদিকে তাকানোর সময় ছিল না। বারো বছরের সুজনের হাতে তখন ফুটবল বা বইয়ের বদলে থাকত পাঁচ কেজির এক ভারী চায়ের কেটলি।   ​বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের তিনটে মুখের অন্ন জোগাতে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে তাকে নামতে হয়েছিল মোড়ের চায়ের দোকানে। অথচ সুজনের পড়ার টেবিলে বসে অঙ্কের কোণে কাটাকুটি খেলার বয়স ছিল এটি। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে লেখা মৌলিক অধিকার, শিক্ষা কিংবা আনন্দের কথাগুলো সুজনের চেনা জগৎ থেকে বহু দূরে হারিয়ে গিয়েছিল। শৈশবটা যেন রূপ নেয় এক দীর্ঘমেয়াদি বন্দিদশায়—যেখানে অধিকার মানে বিলাসিতা, আর টিকে থাকাটাই একমাত্র সত্য। ​ বছরের পর বছর কাটে। হাড়ভাঙা খাটুনি আর সমাজের অবজ্ঞা সইতে সইতে সুজনের ভেতরে জন্ম নিতে থাকে এক তীব্র ক্ষোভ ও বিষণ্নতা। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা বা দক্ষতা না থাকায় বড় হয়ে সে কোনো সম্মানজনক চাকরি পেল না। যে বয়সে এক একজন তরুণের রঙিন ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সুজন তখন বেকারত্বের চরম অভিশাপে দিশেহারা।   ​হতাশা আর অভাবের তাড়নায় সুজনের সঙ্গী হয় পাড়ার কিছু বিপথগামী তরুণ। প্রথমে ছোটখাটো ছিনতাই, তারপর আস্তে আস্তে বড় অপরাধের অন্ধকার গলিতে পা বাড়ায় সে। যে হাতে একসময় কলম থাকার কথা ছিল, সেই হাত এখন অভ্যস্ত হয়ে ওঠে অন্যায়ের শেকলে। ​ একদিন রাতে কাজ সেরে ফেরার পথে এক প্রবীণ শিক্ষক সুজনকে দেখে চিনতে পেরে আক্ষেপ করে বললেন, “সুজন, তুই তো অনেক বুদ্ধিমান ছেলে ছিলি! তোর জীবনটা এমন অন্ধকার পথে শেষ হয়ে গেল?” সুজন কেবল মলিন হেসে উত্তর দিয়েছিল, “স্যার, যে ফুল কুঁড়িতেই ঝরে যায়, তা কি আর সুন্দর হয়ে ফোটার সুযোগ পায়? আমাগো শৈশবটাই তো কেউ ফুটতে দিল না, এখন এই ঝরে পড়া পাপড়ি দিয়ে সুবাস পাবেন কই?”

নুসরাত জাহান বুশরা নুসরাত জাহান বুশরা সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
সাপুড়িনী

কিছু কিছু ছোট্ট ঘটনার অনুতাপ মনের মাঝে দাগ ফেলে যায় চিরকালের মতো। তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। বাবার পোস্টিং ছিল এক গ্রামীণ এলাকায়। আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, সেখানে বাড়িওয়ালা আর বাড়িওয়ালার ভাইয়ের বাড়ি মিলে মাঝখানে বিশাল এক উঠান ছিল।   শীতকাল শুরু হওয়ার আর কিছুদিন বাকি। এমনই একদিন সেই উঠানে ভোরের দিকে এসে হাজির হয় বয়স্ক এক মহিলা। জীর্ণশির্ণ পাতলা শরীর, সাথে দুটো বাক্স আর একটা পাতলা কম্বলের কাপড়ে বাঁধা একটা লাল পুঁটলি। বাড়িওয়ালা মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ পড়ে আসার সময় ওনাকে উঠানের এক কোণায় গাছের সাথে হেলান দেয়া অবস্থায় দেখতে পেয়ে ভিক্ষুক ভেবে বাড়ির কাজের খালাকে দিয়ে ওনার জন্য চাল দিয়ে পাঠান।   ভিক্ষার চালটুকু তিনি সাদরে গ্রহণ করেন। বেলা বাড়তে থাকে। উনি পুঁটলি থেকে কী যেন একটা বের করে খান। তারপর বাক্স দুটো থেকে দুটো ছোট ছোট সাপ বের করে সাপের খেলা দেখাতে শুরু করেন। সাপের খেলা দেখে বাড়ির শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই ওনাকে ঘিরে ধরে। সাপুড়িনী মুখ দিয়ে অস্পষ্ট সুরে নিজের খেয়ালে গান গাচ্ছেন আর সাপের খেলা দেখাচ্ছেন। মাঝে মাঝে বীণ বাজিয়ে সাপগুলোকে নাচাচ্ছেন। আর তা দেখে সবার আনন্দের শেষ নেই। একসময় আমাদের বাড়িওয়ালি আন্টি সাপুড়িনীকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী গো, তুমি কডাই থাই আচ্চেন?” সাপুরড়িনীর মুখে জবাব নেই।   বাড়িওয়ালি আন্টি হাস্যোজ্জ্বল মুখে আবার বলে ওঠেন, “মুকোত আও নাই ক্যানবা।” তবুও জবাব না পেয়ে আন্টি চলে যান। সবাই তখনো সাপের খেলা দেখছিল।   দুপুরের দিকে আন্টি এসে সাপুড়িনীকে খাবার সাধেন কিন্তু সাপুড়িনী ইশারায় না জবাব দেন। বিকেলের একটু আগে আগে আমি আমার ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে সাপুড়িনীর কাছে যাই সাপের খেলা দেখতে। গিয়ে দেখি, সাপুড়িনী সাপ দুটো বাক্সে ভরে তিনি গাছে হেলান দিয়ে আছেন আপন মনে। আমাকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিড় বিড় করে কী যেন বললেন। কথার মর্মার্থ এই হবে হয়তো, উনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, এই বাচ্চা সাপের খেলা দেখবে?   তারপর বাক্স থেকে একটা সাপ এক হাতে নিয়ে পুঁটলিতে আরেক হাত ঢুকিয়ে একটা আধমরা ছোট ব্যাঙ বের করে সাপের মুখে গুঁজে দিলেন। সাপটা গোগ্রাসে ব্যাঙটা গিলল। আরেকটা সাপের সাথেও একই কাজ করলেন। তারপর সাপ দুটো বাক্সে ভরে পুঁটলি থেকে একটা কলা বের করে নিজে খেতে শুরু করলেন। আমি এসব দেখে ভয়ে ভাইকে নিয়ে ছুটে ঘরে গেলাম। সবকিছু দূর থেকে বাড়িওয়ালি আন্টি দেখে আংকেলকে বললেন সাপুড়িনী মহিলাটাকে তাড়িয়ে দিতে। কি না কি উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন কে জানে। এনাকে তো এই এলাকায় কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না।   আংকেল গিয়ে ভালোভাবে সাপুড়িনীকে চলে যেতে বললেন, কিন্তু তাঁর কোনো জবাব নেই। জবাব না পেয়ে আংকেল ওনার বড় ভাইকে ডাক দিয়ে বললেন, “ভাই, এই সাপেন্নিডাক অ্যাত্থাই ভাগে দেও তো।” ডাক শুনে ওনার বড় ভাই এলেন। সাপুড়িনীকে বিদায় করতে হবে এখনই। তাঁর কাছে বীণ আছে, রাতের বেলা বীণ বাজিয়ে যদি সাপ ডেকে আনে, তখন কী হবে!   আংকেলের বড় ভাই অনেকবার বলা সত্ত্বেও সাপুড়িনীর মুখে টুঁ শব্দ নেই। শেষে আংকেল হুমকি দিলেন বাড়ি থেকে না গেলে সাপ দুটো মেরে ফেলবেন। এই শুনে সাপুড়িনীর মুখে কথা ফুটল। তিনি বললেন, সন্ধ্যায় চলে যাবেন।   সাপুড়িনীর কথায় বিশ্বাস নেই। সন্ধ্যায় যদি আবার বেঁকে বসেন, বাড়ি থেকে না যান! আংকেল আর আংকেলের ভাই জোর করে সাপুড়িনীর থেকে সাপ দুটো ছিনিয়ে নিলেন। সাপ দুটো ছিনিয়ে নেয়ার পর সাপুড়িনী আবার আগের মতো নিস্তেজ হয়ে পড়লেন। মুখ দিয়ে শুধু বললেন, “সন্দের সম যাম।”   ওনারা সাপুড়িনীর কথায় কান না দিয়ে তাঁর সামনেই সাপ দুটোকে পিটিয়ে মারলেন। তারপর পাশের জঙ্গলে পুঁতে রেখে এলেন। এর মধ্যে চিল্লাচিল্লির আওয়াজ শুনে বাড়ির সবাই এসে হাজির। আংকেলের ভাই বারবার সাপুড়িনীকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য বলছেন, কিন্তু সাপুড়িনী চুপ। উপায় না পেয়ে উনি একটা বাঁশের লাঠি দিয়ে সাপুড়িনীর পিঠে একটা আঘাত করেন। এতে সাপুড়িনী আঁতকে ওঠেন। ওনার আঁতকে ওঠার আওয়াজ শুনে আমার বুঁকের ভেতরটা যেন কেমন একটা করে ওঠে। তারপর শুরু হয় একের পর এক মার। মারতে মারতে যেন আধমরা করে ফেলছিলেন। তখন আমার ছুটে গিয়ে বলতে ইচ্ছা হচ্ছিল, ওনাকে আর মারবেন না, সন্ধ্যা হলে উনি ঠিকই চলে যাবেন। আর না গেলে তখন দেখা যাবে কী করা যায়, কিন্তু এখনের মতো ছেড়ে দিন সাপুড়িনীকে। কিন্তু দ্বিধায় পড়ে কথাগুলো আর বলা হয়নি। আমিও বাকি লোকদের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ সাপুড়িনীর মার খাওয়া দেখছিলাম।   তখন বিকেল প্রায় শেষের দিকে। সাপুড়িনীকে মারতে মারতে ওনারা হাঁপিয়ে গেছেন। অনেক টানাহ্যাঁচড়া করেও ওনাকে বাড়ি থেকে বের করতে পারেনি কেউ। কোথা থেকে যেন এক অদ্ভুত শক্তি পেয়ে গেছেন সাপুড়িনী। এত মার খেয়েও তাকে কেউ বাড়িছাড়া করাতে পারল না। সবাই সাপুড়িনীর মার খাওয়া দেখে ক্লান্ত হয়ে ঘরে চলে যায়। আর উঠানের ওই কোণাতেই পড়ে থাকেন বৃদ্ধ সাপুড়িনী।   সূর্য ডুবে গেছে পশ্চিম আকাশে। অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিক। মাগরিবের আজান পড়ল। সাপুড়িনী তাঁর লাল পুঁটলি আর ফাঁকা দুটো সাপের বাক্স নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।   সাপুড়িনি তার কথা রেখেছেন। সন্ধ্যা হতেই বাড়ি ছেড়েছেন, কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই হারাতে হয়েছে অনেক কিছু। পড়ে শুনেছি, সাপুড়িনী নাকি এই বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারের সামনে পাগলার মাজার নামের এক মাজার আছে, সেখানে যান। তারপর সেদিন রাতেই মারা যান। তারপর ওনার লাশ কে দাফন করে, কোথায় দাফন করে, সেটা আর শোনা হয়নি।

সুমাইয়া জাহান সিনথী সুমাইয়া জাহান সিনথী সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
শূন্যতার অপেক্ষা

মিনতি প্রতিদিন বিকেলে একই বাসস্টপে এসে দাঁড়াত। চারপাশে অসংখ্য মানুষ আসত, যেত, তবুও তাদের ভিড়ের মাঝেও তার মনে হতো, কোথাও যেন একটা শূন্যতা রয়ে গেছে। বাস আসত, থামত, আবার চলে যেত। শুধু তার অপেক্ষাটুকু থেকে যেত একই জায়গায়।   একদিন পুরোনো একটি বাস এসে থামল। মিনতি একদৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। অচেনা মুখগুলো একে একে চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। একদিন এক ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনা তার পুরো পরিবারকে কেড়ে নিয়েছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, কিছু মানুষও বুঝি এমনই—জীবনে আসে, কিছুটা পথ পাশাপাশি চলে, তারপর কোনো এক অজানা গন্তব্যে হারিয়ে যায়।   পাশ থেকে একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন?” মিনতি কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃদু হাসল, “হয়তো। তবে জানি না, কার জন্য।” ছেলেটি বলল, “তবুও অপেক্ষা করছেন?” মিনতি চলে যাওয়া বাসটির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “কিছু অপেক্ষার জন্য কোনো মানুষ থাকে না। তবুও শূন্য অপেক্ষারা থেকে যায়।”   বাসটি চলে গেল। চারপাশ আবার নীরব হয়ে এলো। মিনতি দাঁড়িয়ে রইল। কারণ সে জানত, সব অপেক্ষার শেষ ফিরে পাওয়া নয়; কিছু অপেক্ষা মানুষকে শিখিয়ে যায়, কীভাবে শূন্যতাকেও আপন করে নিতে হয়।

সপ্তর্ষী বিশ্বাস সপ্তর্ষী বিশ্বাস সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
অবশেষে তুমি

​বিকেলের তপ্ত রোদটা যখন ইট-কাঠের দালানে ঢলে পড়ে, তখন শাকিলের দিনটা যেন নতুন করে শুরু হয়। সকালে মেসেজ কুরিয়ারের ছোটখাটো কাজ সেরে বিকেলে তাকে ছুটতে হয় গলির ভেতরের সেই একতলা বাসাটার দিকে। গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করা হয়ে ওঠেনি, অল্প বিদ্যা আর অদম্য জেদ নিয়েই ঢাকা শহরে শাকিলের সংগ্রাম। কাজের ফাঁকে তিনটে প্রাইমারি স্কুলের শিশুকে পড়িয়ে যে কটা টাকা পায়, তা দিয়ে নিজের শহরের খরচ চালিয়ে গ্রামের বুড়ো বাবার হাতে কিছু তুলে দিতে পারে—এটাই তার আপাতত পরম তৃপ্তি।   ​শহরের রূপ বিচিত্র। এখানে রোজ কত শত মানুষ আসে, কত রঙিন আলো জ্বলছে, আবার নিভেও যায়। শাকিল এই চাকচিক্যের ভিড়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই ভালোবাসে। তবে পুরুষ হিসেবে তার একধরনের শান্ত আর দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব আছে, যা খুব সহজেই মানুষের চোখ টানে। যে পরিবারে পড়াতে যায়, সেখানকার বড় মেয়ে রিয়া মাঝে মাঝেই চা দেয়ার বাহানায় পড়াশোনার ছলে বসে থাকে। একদিন বেশ স্পষ্ট করেই বলেছিল, “শাকিল ভাই, আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি অন্য ছেলেদের মতো নন।”   ​শাকিল সেদিন মুচকি হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেছিল, “পড়াশোনা আর কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি রিয়া, ভালো লাগা-ভালোবাসার মতো বিলাসী ভাবনার সময় আমার ঘড়িতে মেপে দেয়া নেই।”   ​সরাসরি ‘না’ বলে কাউকে আঘাত করার মতো রূঢ় সে নয়, তাই কথা ঘুরিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই তার পুরোনো কৌশল। কারণ, শাকিলের একটাই লক্ষ্য—আগে নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো, পরিবারকে একটু স্বস্তির মুখ দেখানো। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রেম বা মোহে নিজেকে জড়ানো তার সাধ্যের বাইরে। ​কিন্তু মন তো আর সব সময় হিসাব মেনে চলে না।   ​সব নিয়ম এলোমেলো হয়ে গেল তন্নীকে দেখে। তন্নী ওই বাড়িরই দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়, গ্রামের মেয়ে, শহরের কলেজে ভর্তি হতে এসেছে। দেখতে খুব অসাধারণ কিছু না হলেও তার ভেতরে একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ছিল। খুব ছোটখাটো বিষয়ে তন্নীর মায়া আর বিচক্ষণতা শাকিলকে অবাক করত। শিশুদের পড়ানোর সময় তন্নী যখন নিঃশব্দে এক গ্লাস জল রেখে যেত, কিংবা শিশুগুলোর ভুলত্রুটি মায়ামাখা গলায় শুধরে দিত—শাকিল মুগ্ধ হয়ে শুধু চেয়ে থাকত। তন্নীর স্বাবলম্বী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা আর বিনয় শাকিলের হৃদয়ের কোনো এক গোপনে গভীর দোলা দিয়েছিল।   ​যে শাকিল কখনো কোনো মেয়ের দিকে দ্বিতীয়বার তাকাত না, সে এখন পড়ার টেবিল থেকে লুকিয়ে তন্নীকে খোঁজে। তন্নী হাসলে তার মনে হয় বিকেলের এই ধুলোবালি মাখা শহরটাও যেন একমুহূর্তে শান্ত হয়ে গেছে। ​কিন্তু শাকিল তার এই ভালো লাগার কথা তন্নীকে কোনো দিন বলতে পারেনি। না সরাসরি, না কোনো ইশারায়। নিজের বর্তমান অপ্রতুল আয়, অসম্পূর্ণ শিক্ষা আর কাঁধে চেপে থাকা হাজারটা দায়িত্ব তাকে বারবার থামিয়ে দেয়। ভালো লাগার প্রকাশ মানেই তো একটা বড় অঙ্গীকার, যা দেয়ার মতো সামর্থ্য তার এখনো হয়নি।   ​আজও পড়া শেষে টেবিল থেকে ওঠার সময় তন্নী সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে শাকিলের ফেলে যাওয়া ডায়েরিটা তুলে দিয়ে বলল, “আজ তো আপনার ডায়েরিটা ফেলে যাচ্ছিলেন, শাকিল ভাই।”   ​শাকিল হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা নিল। তন্নীর চোখে চোখ পড়তেই বুকের ভেতরটা অচেনা এক ঝড়ে কেঁপে উঠল। কত কি বলতে ইচ্ছে করল! ইচ্ছে করল বলতে, ‘তুমি পাশে থাকলে এই কঠিন শহরটাকেও আমার খুব আপন মনে হয়।’ ​কিন্তু মুখ ফুটে বের হলো শুধু, “ধন্যবাদ, তন্নী।”   ​তন্নী একটু হেসে ভেতরের ঘরে চলে গেল। শাকিল গলি পেরিয়ে মূল রাস্তায় এসে দাঁড়াল। শহরের ব্যস্ত ট্রাফিকের লাইট জ্বলছে আর নিভছে। শাকিল পকেটে হাত দিয়ে বুকভরে নিশ্বাস নিল। সে জানে, এই ভালো লাগা সে বুকের গভীরেই চেপে রাখবে, অন্তত যতদিন না সে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে। ​ কবে সে মনের সব আগল ভেঙে এই না-বলা কথাগুলো তন্নীকে বলতে পারবে? সেই সাহসের পুঁজি জমা করার লড়াইয়ে শাকিল আবার নিজেকে সঁপে দিল শহরের কোলাহলে। তাদের এই মিষ্টি, অনুচ্চারিত প্রেম রয়ে গেল বিকেলের এক অমলিন, অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে।   ​পাঁচটি বছর যেন ঝড়ের বেগে কেটে গেল। ​এই পাঁচ বছরে ঢাকা শহরের ট্রাফিক বদলেছে, কত উঁচু দালান মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, আর শাকিলের জীবনটাও পাল্টে গেছে অনেকটাই। অদম্য চেষ্টা আর রাতের পর রাত এক করে পরিশ্রম করার ফল সে পেয়েছে। ছোটখাটো কাজ আর টিউশনি ছেড়ে শাকিল এখন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে কর্মরত। গ্রামের বাড়িতে বাবার হাতে এখন আর দেনার বোঝা নেই, বরং ছোট বোনের পড়ার খরচ সে নিজেই চালায়। শাকিল এখন আর সেই দিশেহারা তরুণ নয়, সে এখন স্বাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী এক পুরুষ।   এত কিছুর পরও শাকিলের বুকের ভেতর একটা জায়গা সব সময় খালি রয়ে গিয়েছিল। বহু চেনা-অচেনা মুখের ভিড়েও সে একটা মুখকে কখনো ভুলতে পারেনি—তন্নী। পড়ানোর পাঠ চুকিয়ে সে যখন ওই বাসা ছেড়েছিল, তন্নীর সেই মায়াবী চোখজোড়া শেষবারের মতো তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। শাকিল তা বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করে চলে এসেছিল শুধু নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার জন্য।   ​আজ অফিসে একটা বড় প্রজেক্টের কাজে শাকিলকে যেতে হয়েছে ধানমন্ডির এক স্বনামধন্য সামাজিক উন্নয়ন সংস্থায়। মিটিং শেষ করে করিডর দিয়ে বের হওয়ার সময় হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠ শুনে শাকিল থমকে দাঁড়াল। ​“শিশুদের এই ড্রয়িং ওয়ার্কশপের তালিকাটা একটু দেখে দিন না...” ​কণ্ঠটা শুনেই শাকিলের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল। ​দরজার পাশে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে তন্নী! শাড়ি পরা, চশমার আড়ালে সেই আগের মতোই স্নিগ্ধ এক জোড়া চোখ। তন্নীও হঠাৎ নজর ফেরাতেই শাকিলকে দেখতে পেল। মুহূর্তের জন্য পুরো করিডরটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।   “শাকিল ভাই...” তন্নীর গলা দিয়ে সামান্য আওয়াজ বের হলো, যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না সে। ​শাকিল হালকা হেসে এগিয়ে এল, “কেমন আছ তন্নী? বহু বছর পর...” “আমি... আমি ভালো আছি। আপনি এখানে?” তন্নীর চোখে বিস্ময় আর আনন্দের এক অদ্ভুত মিশ্রণ।   ​মিটিং শেষে দুজনে এসে বসল কাছের এক শান্ত ক্যাফেতে। কথায় কথায় জানতে পারল, তন্নী পড়াশোনা শেষ করে এই প্রতিষ্ঠানেই শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। সেও আর আগের সেই ছোট মেয়েটি নেই, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে।   ​চা পানের ফাঁকে তন্নী একটু হেসে বলল, “আপনার সেই পুরোনো ডায়েরিটা কিন্তু এখনো আমার কাছে আছে শাকিল ভাই। সেদিন আপনি ফেলে গিয়েছিলেন, আর কোনো দিন ফেরত নিতে আসেননি।” ​শাকিল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তন্নীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। আজকের শাকিলের চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো হীনম্মন্যতা নেই। ​“সেদিন ডায়েরিটা হয়তো ইচ্ছা করেই ফেলে গিয়েছিলাম তন্নী, যাতে কোনো না কোনো বাহানায় তোমার কাছে ফিরে আসার একটা সুযোগ থাকে”, শাকিলের কণ্ঠ গভীর ও স্পষ্ট। ​তন্নী একটু চমকে উঠে শাকিলের দিকে তাকাল।   ​শাকিল এক মুহূর্ত থামল, তারপর খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “তখন আমার নিজের বলতে কিছু ছিল না, কাঁধে ছিল অনেক দায়িত্ব। তাই মনের ভেতরে থাকা অনুভূতির কথাগুলো বলতে পারিনি। ভেবেছিলাম, নিজেকে যোগ্য করে তবেই বলব। আজ কি সেই না-বলা কথাগুলো শোনার সময় হবে তোমার?”   ​তন্নীর চোখ দুটো জলে ভরে উঠল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একচিলতে মিষ্টি হাসি। সে মাথা নিচু করে শুধু বলল, “আমি তো এ কথাগুলো শোনার জন্যই এতদিন কারও দিকে তাকাইনি শাকিল ভাই।”

শেখ সাবারুল ইসলাম শেখ সাবারুল ইসলাম সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
প্রবাসী আব্বাস

ভোর পাঁচটা। অ্যালার্ম বাজার আগেই ঘুম ভেঙে যায় আব্বাসের। ঘুম ভাঙে না, আসলে তাকে ঘুম থেকে টেনে তোলে দায়িত্ব। ছোট্ট ঘরটায় আরও পাঁচজন শ্রমিক ঘুমিয়ে আছে। কেউ মেঝেতে, কেউ পাতলা বিছানায়। আব্বাস চুপচাপ উঠে বসে। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। অন্ধকার। তারপর মোবাইলটা হাতে নেয়। স্ক্রিনে মেয়ের ছবি। ছবিটা দেখে ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে ওঠে।   মেয়েটার বয়স তখন মাত্র চার বছর, যখন আব্বাস বিদেশে এসেছিল। এখন সে এগারো। সাত বছরে মেয়েটা বড় হয়েছে, কিন্তু বাবার হাত ধরে হাঁটতে শেখেনি। আব্বাস ধীরে ধীরে উঠে মুখে পানি দেয়। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখে, গত রাতের বেঁচে থাকা দুটো বিস্কুট। একটা খেয়ে আরেকটা রেখে দেয়। দুপুরে যদি বেশি ক্ষুধা লাগে!   সকাল ছয়টা থেকে কাজ শুরু। প্রচণ্ড রোদ। মাথার ওপর হেলমেট, শরীরজুড়ে ধুলো আর ঘাম। এক হাতে ভারী যন্ত্র, অন্য হাতে নিজের শরীরের ভার। কখনো মাথা ঘোরে। কখনো মনে হয়, আর পারবে না। কিন্তু পাশের শ্রমিক যখন বলে, “আব্বাস, একটু দ্রুত করো!” তখন দাঁত চেপে আবার কাজ শুরু করে। কারণ সে জানে, আজ কাজ বন্ধ হলে আজকের মজুরি বন্ধ। আজকের মজুরি বন্ধ হলে মেয়ের স্কুলের টাকা আটকে যাবে। আর মেয়ের স্কুলের টাকা আটকে গেলে ভিডিও কলে মেয়েটা হয়তো বলবে, “আব্বু, আমার বেতনটা দাওনি কেন?” এই একটা প্রশ্নই আব্বাসকে আবার দাঁড় করিয়ে দেয়।   একদিন দুপুরে প্রচণ্ড গরমে কাজ করতে করতে আব্বাস হঠাৎ বসে পড়ল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা। পাশের একজন পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, “কী হয়েছে?” আব্বাস মাথা নেড়ে বলল, “কিছু না। সকালে খাওয়া হয়নি।” পাশের জন প্রশ্ন করল, “কেন?” আব্বাস হেসে বলল, “টাকা দেশে পাঠিয়ে দিয়েছি।”   লোকটা আর কিছু বলল না। কারণ, প্রবাসীদের কষ্টের অনেক গল্প মুখে বলতে হয় না। চোখ দেখলেই বোঝা যায়।   মাসের শেষ দিন। বেতন হাতে পেয়েই আব্বাস প্রথমে টাকা গুনল না। সরাসরি মোবাইল বের করে দেশে টাকা পাঠিয়ে দিল। মেয়ের স্কুলের ফি। মায়ের ওষুধ। সংসারের বাজার। বাড়ির কিস্তি। সব পাঠানোর পর নিজের অ্যাকাউন্টে পড়ে রইল সামান্য কিছু টাকা। আব্বাস কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজেকেই বলল, ‘এই মাসেও তোকে কিছু কিনে দেয়া হলো না রে আব্বাস।’ তারপর সে হেসে ফেলল।কারণ, নিজের জন্য কিছু কেনার অভ্যাসটাই তার নেই।   রাতে মেয়ের ফোন এলো, “আব্বু?” “হ্যাঁ মা।” “তুমি কী করো সারা দিন?” আব্বাস একটু থেমে বলল, “কাজ করি।” মেয়ের প্রশ্ন, “অনেক কষ্ট হয়, না?” আব্বাস জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “না মা। একদম না।” মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তুমি মিথ্যা বলছ।” আব্বাস অবাক। সে বলল, “কেন রে মা?” মেয়ে বলল, “তোমার চোখ লাল।” আব্বাস সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নিল। মেয়ের চোখে যেন নিজের কষ্টটা ধরা না পড়ে। সে বলল, “কাল ভালো ঘুম হয়নি তো, তাই লাল।” মেয়েটা বলল, “আব্বু, তুমি দেশে চলে আসো না।” আব্বাস হেসে বলল, “আর একটু টাকা জমাই মা। তারপর একটা সুন্দর ঘর বানাব। তোমার জন্য আলাদা একটা পড়ার ঘর থাকবে।” মেয়েটা বলল, “আমার পড়ার ঘর লাগবে না।” “তাহলে?” “তুমি থাকলেই হবে।” কথাটা শুনে আব্বাস আর কথা বলতে পারল না। ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েটা বলল, “আব্বু, তুমি আছ?” আব্বাস চোখ মুছে উত্তর দিল, “হ্যাঁ মা। আব্বু তো আছিই।” কিন্তু সেই রাতে আব্বাস অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। চুপচাপ। যেন পাশের ঘুমন্ত মানুষগুলোও তার কান্না শুনে না ফেলে।   কয়েক মাস পর আব্বাসের বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। স্ত্রী ফোন করে বলল, “তুমি আসবে না?” আব্বাস বলল, “আসব। অবশ্যই আসব।” সে মালিকের কাছে ছুটি চাইল। কিন্তু মালিক বলল, “এখন গেলে কাজের ক্ষতি হবে।” আব্বাস হাতজোড় করে বলল, “স্যার, আমার বাবা হাসপাতালে। আমি শুধু একবার দেখে আসব।” অনেক অনুরোধের পর ছুটি পেল। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে ফোন এল। স্ত্রীর কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আব্বাস… তুমি আর এসো না।” আব্বাসের বুকটা কেঁপে উঠল। সে বলল, “কেন, কী হয়েছে? ” “আব্বা আর নেই।”   গাড়ির ভেতর বসে আব্বাস কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। তারপর মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল, “বাবা, আমি আসছিলাম…” তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল হাতে ধরা টিকেটের ওপর। সেই টিকেট আর কাজে লাগেনি।   বাবাকে হারানোর পর আব্বাস আরও বেশি কাজ করতে শুরু করল। কারণ, কান্না করার সময় তার ছিল না। মায়ের ওষুধ লাগবে। মেয়ের স্কুল আছে। স্ত্রীর সংসার আছে। স্বপ্নের বাড়িটাও এখনো পুরো হয়নি। দিনের পর দিন সে রোদে পুড়ল। রাতে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় ফেলল। কখনো জ্বর নিয়েও কাজে গেল। কখনো পায়ে ব্যথা নিয়েও ভারী জিনিস তুলল। কখনো নিজের পকেটে টাকা না থাকলেও দেশে টাকা পাঠাল। কারণ, তার কাছে নিজের কষ্টের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজন বড় ছিল।   অবশেষে সাত বছর পর বাড়িটা তৈরি হলো। দোতলা নয়। বড় কোনো অট্টালিকাও নয়। ছোট্ট একটা পাকা বাড়ি। সামনে একটি বারান্দা। বারান্দার এক কোণে মেয়ের জন্য একটি চেয়ার। আব্বাস ভিডিও কলে বাড়িটা দেখে বলল, “মা, কেমন হয়েছে?” মেয়েটা বলল, “খুব সুন্দর।” তারপর একটু থেমে বলল, “কিন্তু একটা জিনিস নেই।” “কী?” “তুমি।” আব্বাস হাসতে চাইল। পারল না।   সেদিন রাতে আব্বাস তার পুরোনো ব্যাগটা বের করল, সাত বছর আগে যে ব্যাগ নিয়ে বিদেশে এসেছিল। ব্যাগের ভেতর এখনো মেয়ের ছোট্ট একটা ফিতা রাখা। মেয়েটা যাওয়ার দিন বাবার হাতে দিয়েছিল। আব্বাস ফিতাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল। তারপর নিজের কাছে বলল, ‘আর কত? আর কত রাত অন্যের দেশে? আর কত ঈদ ভিডিও কলে? আর কত জন্মদিন মোবাইলের পর্দায়? আর কতবার নিজের কান্না লুকিয়ে বলতে হবে, আমি ভালো আছি।’   পরদিন সে দেশে ফেরার টিকেট কাটল। বিমান থেকে নামার পর আব্বাস দেখল, দূরে তার মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সে এগারো বছরের। আব্বাসকে দেখেই মেয়েটা দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। আব্বাস মেয়েকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে কাঁদতে লাগল। মেয়েটা বলল, “আব্বু, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে?” আব্বাস কিছু বলতে পারল না। শুধু মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল, “তোমাদের স্বপ্নের পেছনে ছিলাম মা।” মেয়েটা বাবার হাত ধরে বলল, “এবার আর কোথাও যেয়ো না।”   আব্বাস আকাশের দিকে তাকাল। চোখের পানি মুছে মৃদু হেসে বলল, “না মা। এবার আব্বু এখানেই থাকবে।”   কারণ আব্বাস বুঝে গেছে, টাকা দিয়ে ঘর বানানো যায়, কিন্তু ঘরে ফেরার সময়টা টাকা দিয়ে কেনা যায় না।    

নাসিম উদ্দীন আহম্মেদ নাসিম উদ্দীন আহম্মেদ সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
হারানো দিনের খোঁজে

বৃদ্ধ অরূপবাবু তাঁর ড্রয়িংরুমে বসে পুরোনো দিনের ক্যাসেট প্লেয়ারে গ্রামোফোনের গান শুনছিলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো মোহে আচ্ছন্ন হয়ে যেন তিনি শুনে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা পুরোনো স্মৃতির ডায়েরি উল্টাতে উল্টাতে তাঁর মনে পড়ে গেল সেই শৈশবের সোনালি দিনগুলোর কথা, হারিয়ে যাওয়া সেই শান্ত বিকেল এবং হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা।   জীবনের পদে পদে হারিয়ে ফেলা সেই সব মানুষ, যাঁরা একসময় তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী ছিলেন। ফেলে আসা সেই সব স্মৃতি, যা একসময় মধুর ছিল। এসব মনে করতে করতে তাঁর মন অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে ভাবতে থাকে কী করে তিনি এত দিন ভুলে ছিলেন। শহরের এই যান্ত্রিক ও কোলাহলপূর্ণ জীবনে তিনি যেন নিজের শেকড় এবং সেই ফেলে আসা দিনগুলোর নিখাদ আনন্দকেই খুঁজছিলেন।   শহরের কোলাহল আর ব্যস্ত জীবন থেকে ছুটি নিয়ে অরূপবাবু একদিন ব্যাগ গুছিয়ে সোজা চলে গেলেন নিজের গ্রামে। ফিরে যেতে চাইলেন নিজের ফেলে আসা দিনগুলোতে। গ্রামে পৌঁছুতেই যেন তিনি কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করলেন। বর্তমানের সাথে অতীতের মিল খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন প্রতি মুহূর্তে। গ্রামের পুব দিকের চিরপরিচিত সেই ছোট্ট কাঁচা রাস্তাটায় এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। রাস্তার দুপাশে বসার বেঞ্চি এবং সারি সারি ফুলের গাছ যেন পরিবেশই পাল্টে দিয়েছে। অথচ একসময় এই রাস্তাগুলোর পাশ দিয়েই ছিল বনজঙ্গল। সে পথ দিয়েই তাঁর কত স্মৃতি যেন আজ ধুলোয় ম্লান হয়ে গেছে।   শীতের সকালে একসময় এ পথ দিয়েই সকালের শিশির ভিজে স্কুলে যেত অরূপবাবু । কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে চকচকে নতুন বইয়ের গন্ধ সবকিছুই কত উজ্জ্বল মনে হতো তখন। আর পাশে শৈশবের সকল পরিচিত মুখ। সেই মুখগুলো যেন আজ কোথায় হারিয়ে গেছে। আজ এত বছর পর সেই একই পথে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। শহরের ব্যস্ত জীবন তাঁকে ক্লান্ত করেছে। কোলাহল, প্রতিযোগিতা আর যান্ত্রিক নিয়মে তিনি যেন নিজের ভেতরকার মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলেছিলেন এতদিন।   হঠাৎ চোখে পড়ে, পুরোনো তালগাছের নিচে কয়েকটি শিশু খেলা করছে। তাদের হাসির শব্দ শুনে মনে হলো, সময় হয়তো সত্যিই থেমে গেছে এখানে। অরূপবাবুর  বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কষ্ট জমে উঠল। তিনি যেন নিজের হারানো শৈশবকে ওই ছেলে-মেয়েদের চোখে খুঁজে পেলেন।   একসময় তিনিও তাঁর বন্ধুদের সাথে এভাবে খুনসুটিতে মেতে উঠতেন। গ্রীষ্মের দিনের ধুলোবালিতে একাকার হয়ে যখন তিনি নদীতে গোসলে মেতে উঠতেন, অপর পাশে বাবার বকুনি আর মায়ের শাসন যেন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। মায়ের কথা ভাবতেই তাঁর বুকটা ভারী হয়ে আসে। মা তাঁদের ছেড়ে অনেক আগেই চলে গেছেন। তিনি ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলেন। মাঠের ঘাসের গন্ধে মনে হলো, জীবনের আসল সৌন্দর্য শহরের উঁচু দালানে নয়, বরং এমন ছোট্ট মুহূর্তের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে।   বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটাও যেন আজ বার্ধক্যে নুয়ে পড়েছে। নদীর পানি শুকিয়ে গেছে। অথচ তাঁদের শৈশবে যেন নদীটির ভরা যৌবন ছিল। নৌকার পালে হওয়া দিতে দিতে কত শত মাঝি যে এই নদী পাড়ি দিয়েছে তা শুধুই অজানা। নদীর সাথে সাথে সেই মাঝিরা তাঁর শৈশব আর শৈশবের বন্ধুরাও যেন আজ বিলীন হয়ে গেছে। ফেলে যাওয়া দিনগুলোর চেয়ে সুন্দরতম অধ্যায় জীবনে আর কিছুই হতে পারে না।   সামনে যা আসে, তা তো দায়িত্বের বোঝা। এসব ভাবতে ভাবতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। আকাশে সূর্য ডুবছিল, লালচে আলো চারপাশকে রঙে ভরিয়ে দিচ্ছিল। অরূপবাবু অতীতের সাথে বর্তমানকে মেলাতে গিয়ে যেন হিমশিম খেলেন। একসময় এ গ্রামেই যেন লোকজন রেডিওতে খবর শুনত, সাদা-কালো বিটিভির সেই নব্বই দশকের বিনোদনের জন্য মুখিয়ে থাকত। সেসব যেন আজ কল্পনা শুধু। এখন ঘরে ঘরে আধুনিকতার ছোঁয়া যেন অতীতের সবকিছু ভুলিয়ে দেয়।   অরূপবাবু মনে মনে ভাবতে থাকলেন আবার তিনি ফিরে আসবেন এখানে। হয়তো পুরোপুরি ফিরে আসা সম্ভব নয়, কিন্তু অন্তত হৃদয়ের একটি টুকরো এই গ্রামের মাঠে রেখে যাবেন, যাতে যেকোনো সময় ফিরে এসে খুঁজে নিতে পারেন নিজের হারানো দিনগুলো।    

সাদিয়া হোসাইন সাদিয়া হোসাইন সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
গরান বনের বিধবা

সুন্দরবনের মানুষগুলো জোয়ার-ভাটার হিসাব শুধু নদীর জন্য রাখে না। তাদের জীবনেরও জোয়ার আছে, ভাটা আছে। কখনো নদী মাছ দেয়, কখনো কাঁকড়া। কখনো গোলপাতা দিয়ে ঘর বাঁধা যায়, আবার কখনো সেই নদীই কারও স্বামী, কারও বাবা, কারও ছেলেকে গ্রাস করে নেয়। মৌসুমি এসব হিসাব ছোটবেলা থেকেই জানে। তবুও সে আজও নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ, নদীর ওপারে সুন্দরবন। আর এই সুন্দরবনের ভেতরেই একদিন তার সর্বস্ব হারিয়ে গিয়েছিল। মৌসুমির বয়স কত, সে নিজেও ঠিক জানে না। চল্লিশ পেরিয়েছে হয়তো। চেহারায় বয়সের চেয়ে বেশি ক্লান্তি। চোখের কোণে স্থায়ী হয়ে আছে বহু বছরের অনিদ্রা। চুলে পাক ধরেছে। পরনে সব সময় একটা পুরোনো লালপেড়ে সাদা শাড়ি। হাতে লাল-সাদা কাচের চুড়ি নেই। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। গ্রামের মানুষ তাকে নাম ধরে খুব কমই ডাকে। সবাই বলে, ‘বাঘবিধবা’। মৌসুমি প্রথম প্রথম শব্দটা শুনলে চুপ করে থাকত। এখন আর কানে নেয় না। তবে একটা সময় ছিল, যখন শব্দটা তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধত। সেদিন সকালে তার স্বামী জাহাঙ্গীর বলেছিল, “ফিরতে দেরি হইতে পারে।” মৌসুমি ভাত বেড়ে দিয়ে বলেছিল, “দেরি কইরো না। রাইতে জোয়ার বড় হইব।” জাহাঙ্গীর হেসে বলেছিল, “জোয়ার আমারে খাইব না। তোমার জইন্য কাঁকড়া ধইরা আইমু।” মৌসুমি তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “কথা কম কও। যাওয়ার সময় ভালো কথা কইয়া যাও।” জাহাঙ্গীর হেসে উঠেছিল, “ভালো কথা আবার কী? যে কথা দিয়া যায়, সে ফিরবই।” জাহাঙ্গীর তখন আর কিছু বলেনি। শুধু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার পেছনে তাকিয়েছিল। সেই তাকানোটা আজও মৌসুমির মনে আছে। তারপর নৌকা চলে গিয়েছিল। জাহাঙ্গীর আর ফেরেনি। সুন্দরবনে মধু আনতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে তার মৃত্যু হয়েছিল। সঙ্গে থাকা লোকগুলো ফিরে এসেছিল। তারা শুধু বলেছিল, “বাঘে টান দিয়া নিয়া গেছে।” কেউ পুরো ঘটনা বলতে পারেনি। কেউ বলতে পারেনি, জাহাঙ্গীর শেষ মুহূর্তে কী বলেছিল। কেউ বলতে পারেনি, সে ভয় পেয়েছিল কি না। শুধু তার একটা রক্তমাখা গামছা আর ভাঙা মধুর পাত্র ফিরে এসেছিল। তার পর থেকেই মৌসুমি ‘বাঘবিধবা’। স্বামী মারা যাওয়ার পর গ্রামের মাতব্বর তাকে বলেছিল, “এখন থেকে সাবধানে চলবা। একা মাইয়া মানুষ।” মৌসুমি তখন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। তার একটাই প্রশ্ন ছিল, “আমার পোলা-মাইয়ারে কে খাওয়াইব?” কেউ উত্তর দেয়নি। তার ছেলে জাফরের বয়স তখন দশ। মেয়ে মিতুর সাত। সংসার থেমে যায়নি। ভাত রান্না করতে হয়েছে। স্কুলের খাতা কিনতে হয়েছে। অসুখ হলে ওষুধ আনতে হয়েছে। বর্ষায় ঘরের চাল ফুটো হলে সেটাও ঠিক করতে হয়েছে। মৌসুমি প্রথমে অন্যের বাড়িতে কাজ নিল। তারপর নদীর ধারে কাঁকড়া বাছাইয়ের কাজ। কখনো শুঁটকি শুকিয়েছে। কখনো জাল সেলাই করেছে। অনেক রাতে কাজ শেষে ঘরে ফিরলে জাফর মায়ের পাশে বসে থাকত। একদিন সে মাকে বলেছিল, “আম্মা, তুমি সুন্দরবনে আর যাইও না।” মৌসুমি হেসে বলেছিল, “আমি সুন্দরবনে যাই না রে। সুন্দরবনই আমার ঘরে আসে।” ছেলেটা কথাটার মানে বুঝতে পারেনি। বছর কয়েক পর জাফর শহরে চলে গেল। গার্মেন্টসে কাজ পেল। মাস শেষে টাকা পাঠাত। মিতুর বিয়ে হয়ে গেল পাশের গ্রামে। মৌসুমি একা হয়ে গেল। তবু সে প্রতি সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে এসে বসত। জোয়ারের পানি বাড়তে দেখত। দূরে গাছগুলোর কালো ছায়া দেখত। কখনো কোনো নৌকা ফিরতে দেখলে বুকের ভেতর অকারণে ধক করে উঠত। তারপর নিজেই মনে মনে বলত, “এই বয়সে আর কার জন্যে অপেক্ষা করিস, মৌসুমি?” একদিন সেখানে তার সঙ্গে দেখা হলো রিদমের। রিদম শহর থেকে এসেছিল সুন্দরবনের মানুষের জীবন নিয়ে ছবি তুলতে। হাতে ক্যামেরা। গলায় ব্যাগ। চোখে কৌতূহল। সে মৌসুমিকে দেখে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি এখানে থাকেন?” মৌসুমি বলল, “হ।” “আপনার নাম?” “মৌসুমি।” “আপনার স্বামী?” মৌসুমি নদীর দিকে তাকাল, “নাই।” রিদম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর আস্তে বলল, “কীভাবে?” মৌসুমি এবার তার দিকে তাকাল, “বাঘে নিয়া গেছে।”   রিদম ক্যামেরাটা নামিয়ে ফেলল। “আপনি কি বাঘকে ভয় পান?” মৌসুমি একটু হাসল, “বাঘ রে না “ “তাহলে?” “মানুষরে।” রিদম অবাক হলো। মৌসুমি নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “বাঘ একবারে মারে আর মাইনষে ধীরে ধীরে মারে।” রিদম কথাটার উত্তর খুঁজে পেল না। মৌসুমি বলল, “বাঘ আমার স্বামী রে নিয়া গেছে। কিন্তু তার পরে যে জীবনটা আমারে টানতে হইছে, ওইটা কি কম বাঘ?” সেদিন রিদম আর কোনো ছবি তুলল না। পরদিন আবার এল। তার পরও এল। মৌসুমি তাকে সুন্দরবনের গল্প বলতে শুরু করল। কোন গাছের নিচে বাঘের পায়ের ছাপ দেখা যায়। কোন খালে জোয়ার দ্রুত ওঠে। কোথায় কাঁকড়া বেশি। কোন মৌয়াল কখন বনে ঢোকে। একদিন রিদম জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি চান আপনার ছেলে এই কাজ করুক?” মৌসুমি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল, “না।”, “কেন?”, “আমি স্বামী হারাইছি। ছেলে রে হারাইতে চাই না।” কিছুক্ষণ পর বলল, “কিন্তু সবাই তো আমার মতো ভাগ্যবান না। পেটের দায়ে মানুষ বনে যায়।” “আপনি কি মনে করেন তাদের জন্য কিছু করা দরকার?” মৌসুমি এবার নদীর দিকে না তাকিয়ে সরাসরি রিদমের দিকে তাকাল। “দরকার না?” তার গলায় রাগ ছিল। “বাঘের হাত থেইকা বাঁচার জন্য মানুষকে বন্দুক দিলে হইব না। পেটের ক্ষুধার হাত থেইকাও তো বাঁচাইতে হইব।” রিদম কথাটা লিখে নিল। কয়েক মাস পর সে আবার গ্রামে ফিরে এল। সঙ্গে কিছু মানুষ। তারা গ্রামের কয়েকজন বিধবা নারীকে নিয়ে একটা ছোট সমিতি করল। কাঁকড়া পরিষ্কার ও প্যাকেটজাত করা, শুকনো মাছ তৈরি, মধু প্রক্রিয়াজাত করা এমন কাজ শুরু হলো। মৌসুমি প্রথম দিন কাজ করতে এসে বলেছিল, “এইগুলা কি আসলেই চলব?” রিদম বলেছিল, “চেষ্টা করলে চলবে।” মৌসুমি হেসেছিল, “চেষ্টা তো আমি বহু বছর ধরেই করি।” তারপর একদিন সমিতির ঘরের সামনে একটা কাঠের সাইনবোর্ড লাগানো হলো। লেখা ‘আরণ্যক’। মৌসুমি অনেকক্ষণ বোর্ডটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “নামটা ভালো।” সেদিন সন্ধ্যায় মৌসুমি আবার নদীর ঘাটে গেল। সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে। পানির ওপর লাল আলো পড়েছে। দূরে সুন্দরবন অন্ধকার হয়ে আসছে। মৌসুমি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিল। তারপর খুব আস্তে বলল, “জাহাঙ্গীর, তুই কই আছিস জানি না। কিন্তু তোরে হারাইয়া আমি শেষ হই নাই।”   নদী কোনো উত্তর দিল না। শুধু ভাটার পানি ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। মৌসুমি উঠে দাঁড়াল। তারপর বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে দেখল, রাস্তার পাশে কয়েকজন নারী বসে জাল গুছাচ্ছে। তাদের মধ্যে আরেকজনের স্বামীও বাঘের আক্রমণে মারা গেছে। আরেকজনের বাবা ফেরেনি বন থেকে। তারা সবাই এখন একসঙ্গে কাজ করে। মৌসুমি থামল। বলল, “কাল সকালে তাড়াতাড়ি আইসো। নতুন অর্ডার আসছে।” একজন নারী হেসে বলল, “আপা, আপনি না থাকলে আমরা পারতাম?” মৌসুমি একটু চুপ করে থেকে বলল, “আমি একা কিছুই পারতাম না। আমরা একসঙ্গে পারছি।” সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে মৌসুমি বহু বছর পর তার পুরোনো কাঠের বাক্সটা খুলল। ভেতরে জাহাঙ্গীরের সেই পুরোনো গামছাটা এখনো রাখা। আর একটা ছোট মধুর পাত্র। মৌসুমি পাত্রটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল মধুর পাত্রটার নিচে। সেখানে শুকিয়ে শক্ত হয়ে লেগে থাকা মাটির মধ্যে একটা ছোট কাগজের টুকরো আটকে আছে। মৌসুমির বুক কেঁপে উঠল। এত বছর ধরে সে পাত্রটা খুলেছে, ধুয়েছে, আবার রেখে দিয়েছে। কাগজটা কখনো দেখেনি। কাঁপা হাতে সে কাগজটা বের করল। কাগজে মাত্র কয়েকটি শব্দ। ‘মৌসুমি, যদি ফিরতে না পারি, জাফররে শহরে পাঠাইও। ও যেন আমার মতো বনে না আসে।’ মৌসুমি স্থির হয়ে বসে রইল। এত বছর ধরে সে ভেবেছিল, জাহাঙ্গীর শুধু সংসারের জন্য সুন্দরবনে গিয়েছিল। আজ প্রথমবার বুঝল, যাওয়ার আগের রাতেও জাহাঙ্গীর তার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবেছিল। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এবার সেই কান্নায় শুধু স্বামী হারানোর শোক ছিল না। ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। সে কাগজটা ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “তুই কথা রাখছিস জাহাঙ্গীর। জাফর আর বনে যায় নাই।”  

মুমতাহিনা মেহনাজ অনিভা মুমতাহিনা মেহনাজ অনিভা সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬ 0
গঙ্গার নৌকায় আমার ভবিষ্যৎ

শিরায় শিরায় আমার অসহ্য যন্ত্রণা। না পাওয়ার তীব্র বেদনা। মানুষ যখন স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে, একাকিত্বে পার করে দেয় গোটা জীবন। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে এর জন্য আমি ভাগ্য দেবতা বা সৃষ্টিকর্তাকে দোষারোপ করব না। মেনে নিয়েছি, সবার জন্য সবকিছু নয়। কিন্তু কেন আমার এই অকাল ব্যর্থতা? কী ঘটেছিল আমার সাথে? জানতে ফিরে যেতে হবে আমার আঠারো বছরের কিশোর জীবনে।   বয়স তখন আঠারো। বাংলাদেশ থেকে নদীনালা পেরিয়ে কত দিনের ক্লান্তিকর যাত্রা অতিক্রম করে স্বপ্ন চোখে নিয়ে কলকাতায় এসেছিলাম। আজ আমার জন্য একটা বিশেষ দিন। কারণ, আজ আমার স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজ আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বই আকারে প্রকাশ হবে। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! এ জন্য আমি ভোর ভোর রওনা দিলাম কলকাতার বাবুঘাট থেকে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ওপারে হুগলির এক ছাপাখানায় আমার কাব্যগ্রন্থ ছাপা হচ্ছে। ঘাট থেকে আমি এক বজরা নৌকায় রওনা দিলাম, মাঝিরা জোয়ারের টান বুঝে নৌকা ছেড়ে দিল।   গঙ্গার বুক চিরে নৌকা এগিয়ে চলল উত্তর দিকে, হুগলির উদ্দেশে। শীতের ভোর, তার ওপর তুলার মতো সাদা কুয়াশায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ খেয়াল করলাম, নৌকার ছইয়ের নিচে অন্য কোণে একজন বৃদ্ধ বসে আছেন। লোকটা কখন নৌকায় উঠেছেন আমি খেয়ালই করিনি। বৃদ্ধের পরনে মলিন ধুতি, কাঁধে একটা চাদর, আর চোখের কোণে জমে আছে এক মহাসমুদ্র ক্লান্তি।   বৃদ্ধ লোকটি আমার হাতে থাকা পাণ্ডুলিপির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো উপহাস ছিল না, ছিল গভীর এক মায়া। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “প্রথম বই ছাপাতে যাচ্ছ?” আমি অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বইটার নাম রেখেছি ‘স্বপ্নপূরণ’।   বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসটা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। নিজের শূন্য হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে বললেন, “‘স্বপ্নপূরণ’, একদিন আমিও ঠিক এই পথটা দিয়ে গিয়েছিলাম বাবা। আমার বুকেও এমন একটা পাণ্ডুলিপি ছিল। ভেবেছিলাম অক্ষরের হাত ধরে অমর হয়ে যাব। কিন্তু এই শহর বড় নির্মম। প্রথম ধাক্কাতেই আমি ভেঙে পড়েছিলাম। প্রকাশক যখন ফিরিয়ে দিল, আমি আর কলম তুলিনি। আজ আমি এক ব্যর্থ লেখক, যার নাম কেউ মনে রাখেনি।”   বৃদ্ধের কথা শুনে এক অজানা ভয়ে আমি পাণ্ডুলিপিটা আরও জোরে আঁকড়ে ধরলাম। এরপর বৃদ্ধ আমার দিকে এগিয়ে এলেন, তাঁর হাতটা আমার কাঁধে রাখলেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই হাতের স্পর্শে কোনো উত্তাপ ছিল না, কিন্তু এক অলৌকিক আশ্বাস ছিল।   তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু তুমি ব্যর্থ হয়ো না আমার মতো। মনে রেখো, এই শহর তোমার পরীক্ষা নেবে। চারপাশের মানুষ তোমাকে বলবে তোমার দ্বারা কিছু হবে না। প্রকাশকের ঘরের বন্ধ দরজা দেখে কখনো ফিরে এসো না। যদি প্রথমবার ব্যর্থ হও, তবে দ্বিগুণ জেদ নিয়ে আবার লিখবে। অক্ষরের চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু হয় না। নিজের স্বপ্নের অমর্যাদা করো না, কিশোর।”   বৃদ্ধের কথাগুলো যেন গঙ্গার ঢেউয়ের মতো আমার মগজে আছড়ে পড়ল। এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে মনে হলো, এই বৃদ্ধ যেন আমার কত চেনা, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। কয়েক মুহূর্ত পর একটা বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটা যখন কেঁপে উঠল, আমি চোখ মেলে বললাম, আপনি...   ছইয়ের নিচে আর কেউ ছিল না। মাঝিরা আপন মনে দাঁড় টেনে চলেছে। আমি চমকে উঠে মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমার পাশে যে বৃদ্ধ বসেছিলেন, উনি কোথায় গেলেন? মাঝনদীতে নামলেন নাকি?” মাঝি অবাক হয়ে বলল, “কী যে বলেন বাবু, ঘাটে আপনি একলাই উঠছেন। এই গাঙে নাও ছাড়ার পর কোনো মানুষ তো দূর, একটা পাখিও নৌকায় বসে নাই। আপনি চোখের ভুল দেখছেন।”   আমার সর্বাঙ্গে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। বাতাসে এখনো সেই বৃদ্ধের চাদরের সুবাস লেগে আছে, আমি ভ্রম ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম।   হুগলির ঘাটে যখন আমাদের বজরা এসে ভিড়ল, দুপুরের কড়া রোদ তখন গঙ্গার জলে ঝিলমিল করছে। নৌকা থেকে নেমেই আমার চোখ গেল ছাপাখানার ঠিক পাশে থাকা শ্রী রামকৃষ্ণের রসভাণ্ডারের দিকে। এখানকার রসগোল্লা যেমন স্বাদ তেমনি বিখ্যাত। কলকাতায় এসেছি আর এখানকার রসগোল্লার স্বাদ নিইনি, এমনটা কখনো ঘটেনি। ভাবলাম, বইটা প্রকাশ হয়ে গেলেই এখান থেকে পাঁচ শ রসগোল্লা নিয়ে যাব, গ্রামের সবাইকে মুখমিষ্টি করাব।   এরপর বুকের ভেতর একরাশ আনন্দ আর উত্তেজনা নিয়ে আমি ছাপাখানায় প্রবেশ করি। ভেতরে ঢুকতেই বড় বড় প্রেসের ক্যাচক্যাচ শব্দ আর তাজা কালির গন্ধ আমাকে স্বাগত জানাল। সেখানে কাজ করছিলেন কয়েকজন বাঙালি কর্মচারী। আমি হাসিমুখে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কাজ কতদূর? আমার কথা শুনে সবাই না চেনার ভান করে বলল, “কে আপনি মশাই? কীসের বই, প্রমাণ দিন?”   আমি আমার পরিচয় দিয়ে নথিপত্রসহ পাণ্ডুলিপির কথা বলতে লাগলাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করল এবং বলল এই বই অন্য একজনের নামে আছে। এরপর ভেতর থেকে ভারী বুটের শব্দ তুলে বেরিয়ে এলেন এক ইংরেজ সাহেব, নাম তার হ্যানসন রিওয়ার্ড। সাহেব কুটিল হাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙা বাংলায় বললেন, “হেই ইয়াং ম্যান, তুমি যে ‘স্বপ্নপূরণ’ বইটির কথা বলিতেছ, সেইটার রিয়েল লেখক আমি। এই যে দেখো।”   চামড়ায় বাঁধানো সেই বইয়ের ওপরে জ্বলজ্বল করছে নাম ‘স্বপ্নপূরণ’। কিন্তু নিচে লেখকের জায়গায় লেখা হ্যানসন রিওয়ার্ড। আমার নিজের রক্ত জল করা লেখা, রাতের পর রাত জেগে তৈরি করা উপন্যাস এভাবে চুরি হয়ে গেছে! পাণ্ডুলিপিটা নিতে গেলেই সাহেব হুংকার দিয়ে ওঠেন, এরপর দারোয়ানকে ডেকে বলেন, “এই আদমি আমার গল্প চুরি করিতে আসিয়াছে, একে বন্দী করো।”   এরপর মিথ্যে অপবাদে আমাকে কপিরাইট মামলায় ফাঁসানো হলো। সেই আঠারো শতকের কোম্পানির আদালতে আমার মতো এক নিঃস্ব বাঙালি লেখকের কথা শোনার মতো কেউই ছিল না। বিচারে আমার সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হলো।   হুগলির অন্ধকার জেলের চার দেয়ালের মধ্যে যখন আমাকে বন্দী করা হলো, আমার চোখের জল তখন শুকিয়ে পাথর। জেলার সাহেবকে অনেক অনুরোধ করে আমার এই বন্দিদশার কথা জানিয়ে দেশের ঠিকানায় একটা চিঠি পাঠালাম। আমার এই তিন কুলে শুধু একজনই ছিল, আমার বৃদ্ধা দাদি। মা-বাবা হারা এই হতভাগাকে দাদিই বুকে আগলে বড় করেছিলেন।   দীর্ঘ সাত বছর আমি জেলের ভেতর তিল তিল করে মরেছি। আমার যৌবন, আমার স্বপ্ন, আমার গল্প সব ওই সাহেব লুটে নিয়েছে। কারাবাস অবস্থায় আমি খবর পেতাম, আমার রক্ত জল করা সেই লেখা ‘স্বপ্নপূরণ’ এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে। আর পাঠকেরা ইংরেজ সাহেবের প্রশংসা করছে। সাহেবদের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। মুক্তির পর বহু কষ্টে সেই বইয়ের একটা কপি কিনেছিলাম। পাতা ওল্টাতেই আমার বুকটা ভেঙে দুমড়ে গেল। ভেতরের প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা লাইন আমার নিজের! অথচ মলাটের ওপর লেখকের নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে সেই জালিয়াত হ্যানসন রিওয়ার্ডের নাম।   সাত বছর পর যখন জেলের লোহার দরজাটা খুলল, তখন আমি এক চলৎশক্তিহীন যুবক। ভাঙা শরীর আর শূন্য বুক নিয়ে আমি আবার নদীপথ পেরিয়ে নিজের দেশে ফিরে এলাম। গ্রামের চেনা মেঠোপথ ধরে যখন আমার জীর্ণ বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালাম, চারদিকে খাঁ খাঁ করছে। ঘরের চাল ভেঙে পড়েছে, আগাছায় ভরে গেছে ভিটে। প্রতিবেশীদের মুখ থেকেই শুনলাম সেই চরম সত্যটা। আমার কারাবাসের খবর দিয়ে পাঠানো সেই চিঠিটা পৌঁছানোর ঠিক এক মাসের মাথায় আমার শোকে আমার দাদি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।   আমার উঠোনের এক কোণে দাদির সেই নীরব কবরটার সামনে আমি হাঁটু গেড়ে বসলাম। আজ আমার বই প্রকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে স্বপ্নের জন্য আমি সবকিছু হারিয়েছি, সেই স্বপ্নপূরণ আজ এক ইংরেজ সাহেবের অট্টালিকার আলমারিতে বন্দী। আর আমার আসল স্বপ্নটা চিরকালের মতো ঘুমিয়ে আছে এই মাটির নিচে।   এরপর আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে আসি সিলেটের পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ের পাদদেশে নিজের হাতে একটা কুটির তৈরি করি। নিজের পরিশ্রমে চাষাবাদ করি, আর তাতেই যা জোটে তাই দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করি। আর যখনই মেঘ জমে পাহাড়ে, চারপাশ শান্ত হয়ে আসে, আমি আমার সেই চেনা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসি। আমি উপলব্ধি করেছি, একজন সত্যিকারের লেখকের সার্থকতা কেবল প্রকাশনা বা খ্যাতির চাকচিক্যের মধ্যে নয়, লেখকের বাস তো মানুষের হৃদয়ে, তার নিজের আত্মায়।   এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। সেদিন বিকেলে পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আমি সূর্যাস্ত দেখছিলাম। হঠাৎ আমার পেছনে একটা চেনা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। চমকে ঘুরে তাকাতেই আমার শরীর হিম হয়ে গেল! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই গঙ্গার নৌকার বৃদ্ধ লোকটি। ঠিক সেই মলিন ধুতি, কাঁধের চাদর।   বৃদ্ধ বিষণ্ণ হাসি হেসে গম্ভীর গলায় বললেন, “কী রে বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ ছিলাম রে! আমি তোকে সেদিন ওই নৌকায় বসেই কত সাবধান করেছিলাম, কিন্তু তুই আমার কথা মানলি না। খ্যাতির মোহে অন্ধ হয়ে তুই ওই নরকের শহরে পা দিলি, আর আজ সব হারালি।”   বৃদ্ধের শেষ কথাগুলো পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। আমার চোখের সামনে এক তীব্র আলোর ঝলকানির মতো সব সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম সেদিনের সেই বৃদ্ধ কোনো অলীক ভ্রম ছিল না। ওটা ছিল আমারই ভবিষ্যৎ রূপ। আর সেই ব্যর্থ, সর্বস্ব হারানো লেখক আর কেউ ছিল না, সে আমি নিজেই ছিলাম।   হঠাৎ করেই বৃদ্ধের অবয়বটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। পাহাড়ের চূড়ায় আমি আবার একা হয়ে গেলাম। এখন এই জনহীন কুটিরে বসে আমি শুধু ভাবি, মাঝে মধ্যে ভবিষ্যৎও আমাদের বর্তমানে আসে, আমাদের সাবধান করতে, কিন্তু আমরা বোঝার আগেই সবকিছু শেষ হয়ে যায়। বিধির বিধান কখনো খণ্ডানো যায় না।  

নিহার সজল নিহার সজল সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬ 0
গন্তব্য

জ্ঞান ফিরতেই শুঁটকি মাছের তীব্র গন্ধ এসে নাকে লাগল বিশ্বজিতের। শরীরটা ঝিম ধরে আছে। ব্যথায় চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। মাথার ওপরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজছে অনবরত। গাড়িটা থেমে আছে।   শুঁটকির গন্ধের কারণে একটা জায়গার কথা মাথায় এল, এটা তো সৈয়দপুর বাস টার্মিনাল! এই জায়গা তার অতি পরিচিত। যখন নীলফামারীতে কাজ করত, তখন অসংখ্যবার তাকে এদিক দিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। বেশ কয়েকবার পূজার সময় পরিবারসহ এখান থেকে কেনাকাটা  করেছিল। একবার লাল রঙের একটা ফ্রক কিনেছিল মেয়ের জন্য। ওটা পরলে একদম পরির মতো লাগত মামণিটাকে! জামা পাওয়ার পর তার সে কী আনন্দ!   তার সঙ্গে কী হয়েছিল, তা মনে করার চেষ্টা করছে এখন। চোখ ঘুরিয়ে পায়ের কাছে স্ত্রীকে বসে থাকতে দেখল। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তার মেজ বোন, বড় ভাই আর... আর একমাত্র ভাগ্নেকেও দেখতে পেল যেন। দৃষ্টিবিভ্রম কি না, এখনো বোঝার চেষ্টা করছে। ঘোর লাগার মতো অনুভূতি, মুখের ভেতরটা নোনতা নোনতা, গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। খুব কষ্টে একবার ঢোক গিলে ওপরের দিকে তাকাল সে। “আল্লাই জানে, সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে কী হবে! কোন দেশে যে থাকি আমরা, ঘোড়ার ডিম! মানুষ অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনেও সাইড দিতে চায় না।” —সামনের সিটে বসা দুজন মানুষের কথোপকথন কানে এল বিশ্বজিতের। কণ্ঠ শুনে তাদের চিনতে পারল, ওরা তার সহকর্মী।   অ্যাম্বুলেন্সটা চলতে শুরু করেছে। সে যে চোখ খুলেছে, তা এখনো কেউ লক্ষ করেনি। ধীরে ধীরে সব মনে আসতে শুরু করছে। বিকেলে মিটিংয়ের মাঝখানে বসের নির্দেশে একটা রেজিস্টার আনতে বের হতে হলো। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে কেন যে বসেরা মিটিং ডাকেন, কে জানে! বিরক্তিকর, একটা উইকএন্ডের আগেও সময়মতো বাড়ি ফেরা যায় না। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল সে।   ঝিরঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। রোদে পুড়ে থাকা পিচঢালা রাস্তাগুলো বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে এবার একটু স্বস্তিই পেল বোধ হয়। যাক বাবা, কদিনের চলা ভ্যাপসা গরম থেকে তো বাঁচা গেল! মনে মনে বুলি আওড়াল বিশ্বজিৎ।   পকেটে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করছে। নিশ্চয়ই লাইন ম্যানেজার কল দিয়েছে। এই লোক পারে তো সেকেন্ডে সেকেন্ডে ফোন করে। কল ধরলেই নির্ঘাত বলবে, ‘এত দেরি করছেন কেন? দ্রুত আসেন!’   চলতি অবস্থায় মোটরসাইকেল থামিয়ে এখন আর ঝাড়ি খাওয়ার দরকার নাই। তাই এক্সিলারেটরে হালকা মোচড় দিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকল। হঠাৎ পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড ধাক্কা! ছিটকে মহাসড়কে পড়ার সময় শুধু দেখতে পেল, একটা অটোরিকশা ধেয়ে আসছে ওর দিকে। তারপর সব অন্ধকার।   “অ্যাই, মনে হয় আর বাঁচবেনি। ভেল্লা রক্ত বাইর হইসে বাগে... বা...আর পানজর খানও তো ভাঙিছে।” —ড্রেসিং করতে করতে ঠাকুরগাঁওয়ের জেনারেল হাসপাতালের কর্মীরা আঞ্চলিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে এসব বলাবলি করছিল। বাইক থেকে ছিটকে পড়ার পর শুধু এইটুকু স্মৃতি মনে আসছে এখন।   “এই বান্দীর পুত! দেখে চালাতে পারিস না? ড্রাইভারের জাতই না এগুলা।” —অ্যাম্বুলেন্সচালকের কর্কশ চিৎকারে বাস্তবে ফিরে এল বিশ্বজিৎ। সামনে কোনো গাড়ি হঠাৎ করে ঢুকে পড়েছে মনে হয়। শক্ত করে ব্রেক ধরায় সাসপেনশনে চাপ পড়ে বেশ একটা ঝাঁকি খেয়েছে অ্যাম্বুলেন্সটা। এই ঝাঁকিতেই যে অবস্থা! মনে হচ্ছে নাট-বল্টু সব খুলে আসবে। মাঝরাস্তায় বন্ধ হয়ে ঝামেলা পোহাতে না হলেই হয় এখন।   ক্রমেই শীতল হয়ে আসছে ওর শরীরটা। “তোমার কিচ্ছু হবে না গো! ভগবান নিশ্চয় আমাদের সহায় হবেন!” মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছিল ওর স্ত্রী। অনেক কষ্টে মুখ দিয়ে একটা কথা বের করতে পারল বিশ্বজিৎ, “ঠান্ডা! ঠান্ডা লাগছে আমার।”   অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে একটা কম্বল ছিল। সেটা গায়ের ওপর দিতে দিতে ওর স্ত্রী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শারীরিক যন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীর কান্না শুনতে খারাপ লাগছে তার। দুর্ঘটনাটা না ঘটলে বাড়ি ফিরতে পারত। হয়তো বউকে বলত, সীদল ভর্তা করতে দাও। শুকনো লঙ্কা দিয়ে বানানো ঝাল-ঝাল সীদল ভর্তা আর গরম ভাত হলে আগামীকালের ছুটির দিনটা ফাটাফাটি জমে উঠত তার।   “রংপুর মেডিক্যালে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে?” “কম করে হলেও কুড়ি মিনিট তো লাগবে। তা অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার কোনো ব্যবস্থা হলো কি দাদা?” তারপর একটু নীরবতা। বড়দা আর সহকর্মীর এই কথোপকথনগুলো লোহার পেরেকের মতো হৃদয়ে এসে বিঁধছে তার। এই বিপদের মুহূর্তে হঠাৎ চিকিৎসার এত খরচের জোগান যে কীভাবে হবে, তা ভেবে পাচ্ছে না বিশ্বজিৎ। “আচ্ছা দাদা, চিন্তা করবেন না। দেখি আমরা কতদূর কী করতে পারি।” —নীরবতা ভেঙে আবারও কথা বলে উঠল সহকর্মী। “জেলা ব্যবস্থাপক আপাতত কিছু টাকা দেবে বলেছে, সমস্যা নাই। আমরাও দিব সাধ্যমতো। কিছু টাকা হয়তো আমাদের স্বাস্থ্যবিমা কাভার দেবে, কিন্তু বাকিটা যে কীভাবে কী হবে কে জানে।”   ওর স্ত্রী তখনো চাপা গোঙানির মতো করে কাঁদছিল। “বৌদি, কান্না করবেন না, প্রার্থনা করেন।”—বললেন সেই সহকর্মী।   এ মুহূর্তে বিশ্বজিতের মনে হচ্ছে, সে একজন ফাঁসির আসামি। প্রিজন ভ্যানে করে তাকে নেয়া হচ্ছে অজানা গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নামলেই ফাঁসি কার্যকর করা হবে।   শ্বাসকষ্ট শুরু হচ্ছে। অক্সিজেনের নলটা কে যেন নাকে ঢুকিয়ে দিল, বুঝতে পারল না। বুকের ওপর পাথরের মতো ভারী কিছু একটা চেপে বসেছে। স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। স্ত্রীর কান্না, সহকর্মীদের কথা, অ্যাম্বুলেন্সের হর্ন—সবকিছু কেমন যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। আলো ক্ষীণ হয়ে আসছে।   খুব চেষ্টা করছে চোখ মেলে তাকানোর। পারছে না। তাহলে কি সে মারা যাচ্ছে? কয়েক ঘণ্টা আগেও তো জীবনটা স্বাভাবিক ছিল। জীবনের একটা সুন্দর গন্তব্য ছিল। অফিস থেকে বাড়িতে গিয়ে, মেয়েটাকে কোলে নিয়ে, বউকে বলত—আজ সীদল ভর্তা করো, গরম ভাত খাব!   অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত এগোচ্ছে। মহাসড়ক এখন মোটামুটি ফাঁকা। পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছে যার যার গন্তব্যে। কিন্তু তার গন্তব্য এখন কোথায়, সে জানে না। হয়তো হাসপাতালে গিয়ে জ্ঞান ফিরবে, হয়তো আর ফিরবে না। মানুষের আসল গন্তব্যই তো মৃত্যু, কিন্তু জীবনের গন্তব্য যে কখন, কীভাবে বদলে যায়, তা কি কেউ কখনো জানতে পারে?  

নুরুল্লাহ কামিল নুরুল্লাহ কামিল সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0
সোনার নূপুর

মন খারাপ নিয়ে সায়ান শান বাঁধানো ঘাটে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে বসে রইল। তার মন খারাপের সাথে সাথে অভিমানও আবার যোগ হয়েছে। এত বেলা হয়ে গেল, অথচ কেউ সায়ানের খোঁজখবর নিচ্ছে না। পেটে যে খিধের চোটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে, অথচ কারও চিন্তাই নেই সায়ানের জন্য।   এদিকে সায়ানও আবার লজ্জায় তার অভিমান ভুলে ঘরের ভেতর খাওয়ার জন্য যেতে পারছে না। তা ছাড়া পরপর দুরাত সায়ানের ঘুম হয়নি, এ জন্য সায়ানের কেমন জানি লাগছিল। সায়ানের ঘুম কীভাবে হবে, সে যে প্রতি রাতে দাদির গল্প না শুনে ঘুমাতে পারে না। পারলে তো সায়ান দিনের বেলায়ও দাদির কাছে গল্প শোনার বায়না ধরে। অবশ্য সায়ানের দাদি সায়ানকে ভীষণ ভালোবাসে। দাদি সারা দিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও সায়ানকে কিন্তু গল্প শোনাতে কখনো অনীহা প্রকাশ করে না। কিন্তু সায়ান যে দুদিন ধরে গল্প শুনতে পারছে না, এটা কারও মনে নেই। মা-টা ও কেমন। গল্প শুনতে চেয়েছে বলে কাল রাতে কী বকুনিই যে দিল।  ছোট্ট সায়ান তো আর বুঝতে পারে না, সায়ানের দাদি বাড়ি নেই বলে তার মায়ের থেকে অধিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে।   সায়ানের দাদির বড় বোনের ভীষণ অসুখ, তাই বোনকে দেখতে গেছে দাদি, সাথে আবার দাদাকেও নিয়ে গেছে। সায়ানের এখন স্কুল বন্ধ। তার সময়টা তাই এখন কাটতেই চাচ্ছে না। অনেক সময় সায়ান তার দাদার সাথে জমিতে গিয়ে দাদার কাজগুলো দেখে দেখে পাকনা পাকনা কথা বলে। দাদাও সায়ানকে ভীষণ ভালোবাসে। আর বাসবেই না কেন? সংসারে সায়ানই যে তাদের কাছে জীবন্ত খেলনার পুতুল।   ক্ষুধা নিয়ে সায়ান আর পুকুরঘাটে বসে থাকতে পারে না। সমস্ত অভিমান ফেলে দিয়ে সে ধীরে ধীরে মায়ের কাছে যায়। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে তার একটা গ্রাম্য ফুফি এসে মাকে সাহায্য করছে। বুঝতে পারে হয়তো এখন মায়ের মেজাজ ঠিক আছে। সে মায়ের আঁচল মুখে দিয়ে মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। সায়ানের কাছে মায়ের গন্ধটা ভীষণ ভালো লাগে। সে সব সময় মায়ের গা ঘেঁষতে চায়, মা কিন্তু ঘেঁষতে দেয় না শরীরে ঘাম থাকে বলে, কিন্তু মা দেখি আজকে সায়ানকে কিছু না বলে জড়িয়ে ধরল। আদর করে জিজ্ঞেস করল, “কী রে খিধে লাগেনি সায়ান সোনার?” সায়ান আস্তে করে মাথা নাড়ে, লেগেছে।   মায়ের জানি আজকে কী হলো বুঝতে পারে না, আজ কতদিন পরে মা মুরগির মাংস দিয়ে সায়ানকে ভাত খাইয়ে দিল। ছোট্ট সায়ান আসলে মায়ের যে প্রচুর কাজের চাপ থাকে বলে যে খাইয়ে দিতে পারে না এটা বুঝতে পারে না। সায়ানের কতই-বা বয়স। মাত্র আট বছর প্রায়। সে তো এখন নিজের হাতে খেতে পারে। ছোটবেলায় তো মা-ই সায়ানকে খাইয়ে দিত।   সায়ানের দাদি বাড়িতে নেই গুণে গুণে পাঁচ দিন হয়ে গেল। দাদা ফিরে এসেছে বাড়িতে কাজ আছে বলে। সায়ানের বাবাও আবার বাড়িতে থাকে না। সে কাজ নিয়ে ঢাকার বাইরে থাকে। অবশ্য সায়ান বাবাকেও ভীষণ ভালোবাসে, কিন্তু বাবা ও দাদা দুজনই গল্প বলতে জানে না বলে সায়ান দাদিকে একটু বেশি ভালোবাসে। তবে সেই দাদিও এখন নেই বলে রাতের বেলায় সায়ানের চোখের পাতায় ঘুম আসতে ভীষণ দেরি করে।    আজ রাতে সায়ান ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাদির ছবির সামনে গিয়ে বলে, “দাদি, তোমার সাথে কাট্টি আমার, আর কতদিন গল্প না শুনে ঘুমাব?” ভীষণ মন খারাপ নিয়ে সায়ান ঘুমাতে যাওয়ার মিনিট দশেক পরে  দেখে, তার দাদি তার বিছানায় বসে মিটিমিটি হাসছে। সায়ান তো তার দাদিকে দেখে ভীষণ খুশি হয়ে বায়না ধরল, অনেক দিন তোমার গল্প শুনি না। এবার গল্প বলা শুরু করো। দাদিও পান খাওয়া দাঁতের ফাঁকে হাসি রেখে গল্প বলা শুরু করল। সায়ান আবার দাদির পান খাওয়া খুব পছন্দ করে। কী সুন্দর খুশবু আসে দাদির পান খাওয়া মুখ থেকে। অনেক দিন পরে পানের খুসবু পেয়ে সায়ানের চোখের পাতা আপনাআপনি মুদে গেল। এদিকে দাদিও গল্প বলা শুরু করল, “এক ছিল পরি, তার আলতা পরা পায়ে পড়ে থাকত এক জোড়া সুন্দর কারুকাজ খচিত সোনার নূপুর। সেই পরি তার রাজ্যে ভীষণ হাসি খুশিতে দিন কাটাচ্ছিল।” সায়ান ঘুমের ঘোরে বলে, “তারপর।” দাদি আবারও বলা শুরু করল, “সেই পরি হঠাৎ একদিন উড়তে উড়তে পৃথিবীর বুকে একটা বড় দিঘি দেখতে পেল।” সায়ান আবার ঘুমের ঘোরে বলে, “আমাদের দিঘির মতো?” দাদি হেসে উঠে বলল, “ঠিক বলেছ, আমাদের দিঘির মতো। তো পরি দিঘির কাকচক্ষুর ন্যায় জল দেখে লোভ সামলাতে পারল না। সে জলে নেমে স্নান করতে শুরু করে দিল। কিন্তু পরিদের তো স্নান করা নিষেধ, কিন্তু সেই নিষেধ অমান্য করে পরি দিঘির জলে স্নান করতে গিয়ে তার একটা নূপুর হারিয়ে ফেলল। সেই পরি ভয়েই মরে যায়, কী করে সে তার রাজ্যে ফিরে যাবে। তার কঠিন বাবা যে রাজ্যে আর ঢুকতে দেবে না। সেই থেকে পরি আজও তার রাজ্যে ফিরে না গিয়ে দিঘির চারপাশে সারা দিন ঘুরে ঘুরে তার নূপুর খুঁজতে থাকে।”   গল্প শুনে সায়ানের মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায় পরির কথা ভেবে। সে তখনই মনে মনে শপথ করে, অতিসত্বর সে সাঁতার শেখা শুরু করে দিয়ে পরির নূপুর পরিকে খুঁজে দেবে। বিড়বিড় করে সেই কথা আবার দাদিকে বলতেও থাকে।    সায়ানের মা সকাল নয়টা বেজে যাওয়ায় সায়ানকে ঘুম থেকে ডাকতে গিয়ে দেখে, সায়ান বিড়বিড় করছে। সায়ানের মা ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি সায়ানের কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বর এল কি না। কপাল ঠান্ডা দেখে সায়ানকে ঘুম থেকে উঠে যেতে বলে, “তাড়াতাড়ি উঠে যা বাপ। আজ দুপুরেই তোর দাদি বাড়িতে চলে আসবে।”   ঘুমচোখে মায়ের কথা শুনে সায়ান বুঝতে পারে সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। দাদি হয়তো ঘুমের মধ্যে এসে গল্প শুনিয়ে সায়ানের রাগ ভাঙিয়ে দিল। সায়ান ঘুম থেকে উঠেই দাদির ছবির কাছে গিয়ে প্রতিজ্ঞা করল, সে দাদির সাথে কখনো রাগ করবে না, তবে সে সাঁতার শিখে অবশ্যই খুঁজে দেখবে সেই পরি তার নূপুর তাদের পুকুরে হারিয়ে ফেলছে কি না।   

স্মরণিকা চৌধুরী স্মরণিকা চৌধুরী সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0
৩৬ জুলাই : নিলয়ের নতুন জন্ম

তারিখটা ছিল ৯ জুলাই ২০২৪। নিলয়ের এইচএসসি পরীক্ষা চলছিল। সেদিন তার আইসিটি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, আর পরবর্তী পরীক্ষা ২৮ জুলাই। মাঝখানে বিশাল এক্সাম গ্যাপ। কী করবে বুঝতে না পেরে সে ফেসবুক স্ক্রল করছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ে নতুন এক আন্দোলন—কোটা সংস্কার আন্দোলন। বিষয়টি জানার আগ্রহে সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বড় ভাইকে ফোন করে। ভাই জানালেন, ৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে।   ১০ জুলাই সকালে ফেসবুকে নিলয় দেখতে পেল, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ মিছিল, সমাবেশ ও অবরোধ করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পক্ষে দাঁড়ানোর তীব্র ইচ্ছা তার মনে জন্ম নিল।   ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর এক বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। নিলয়ের মনেও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। পরদিন কলেজের মেসেঞ্জার গ্রুপে আন্দোলনে যাওয়ার পরিকল্পনা হলে নিলয় সম্মতি জানায় এবং বন্ধুদেরও আন্দোলনে যোগ দিতে আহ্বান করে।   এরপর রংপুরে একদিন কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইউনিফর্ম পরে রাজপথে নামে। রংপুর পুলিশ লাইন্স থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত মিছিল শেষে তারা আবার পুলিশ লাইন্সের সামনে এলে বাধার মুখে পড়ে। শুরু হয় লাঠিচার্জ ও ধরপাকড়। নিলয়ের দুই বন্ধু মেহেদী, রাকিবসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়। নিলয়ও আহত হয়; তার হাত ও পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে সে কোনোমতে মেসে ফিরে আসে।   ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ার পর নিলয় স্বপ্নে দেখে, সে মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। হঠাৎ গুলির শব্দ—তারপর সব অন্ধকার। ঘুম ভেঙে মোবাইল হাতে নিয়ে সে জানতে পারে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে শহিদ হয়েছেন। নজরুলের সেই পঙ্‌ক্তি, ‘বল বীর—চির উন্নত মম শীর’ যেন সেদিন নতুন অর্থ পেল।   এরপর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মেসের অন্যরা বাড়ি চলে গেলেও নিলয়, মাজহারুল, জিসান ও মাহির থেকে যায়। একদিন নিলয় ও মাজহারুল আন্দোলনে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। পুলিশি হামলা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলাকারীদের তাণ্ডবে চারদিক আতঙ্কে পরিণত হয়। পালানোর সময় নিলয় দেখতে পায়, মাজহারুল গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। কয়েকজনের সাহায্যে সে বন্ধুকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসে। এক সাহসী রিকশাচালক তাদের হাসপাতালে পৌঁছে দেন।   সেদিনের পর নিলয়ের মনে অপরাধবোধ জন্ম নেয়—আরও মানুষকে কেন সে সাহায্য করতে পারল না? কিন্তু সেই অপরাধবোধই তাকে বদলে দেয়। পরদিন আবার সে আন্দোলনে ফিরে যায়। এবার ভয়কে সঙ্গী করেই আহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে সাহায্য করতে থাকে। রাবার বুলেটের আঘাত, টিয়ারশেলের ধোঁয়া কিংবা মারধর—কিছুই তাকে আর থামাতে পারেনি।   অবশেষে আসে ৫ আগস্ট। দীর্ঘদিনের ভয়, রক্ত, কান্না ও সংগ্রামের পর যেন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। নিলয় ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে আকাশের দিকে তাকায়। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মনে গভীর শান্তি।   তার দীর্ঘশ্বাসটি ছিল সাধারণ কোনো দীর্ঘশ্বাস নয়—এটি ছিল ভয়কে জয় করে নিজের ভেতরের নতুন নিলয়কে আবিষ্কার করার পরম স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস।      

সামস ইসতিয়াক রাতুল সামস ইসতিয়াক রাতুল সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 1
অপূর্ণতা

আব্বা তখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। আমার বয়স মাত্র আটাশ। আমি তাঁর একমাত্র ছেলে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও আব্বার একটি ছোট্ট ইচ্ছে ছিল, পুত্রবধূকে দেখে যাওয়া।   ছোট খালু একদিন হাসপাতালে তাঁকে দেখতে গেলে আব্বা হঠাৎ তাঁর হাত দুটো শক্ত করে ধরে বললেন, “ভাই, একটু দেখো তো… আমার ছেলেটাকে একটা বিয়ে করিয়ে দিতে পারো কি না। আমি মরার আগে আমার পুত্রবধূকে একবার দেখে যেতে চাই।”   খালু বাড়ি ফিরে আর দেরি করলেন না। শুরু হলো পাত্রী দেখা। দু-এক দিনের মধ্যেই খবর এল খালুর পাশের বাড়ির প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের একমাত্র মেয়ে। শিক্ষিত, সুন্দর, ভদ্র — সবদিক থেকেই উপযুক্ত।   সেদিন বিকেল চারটায় আমরা মেয়েটিকে দেখতে গেলাম। সঙ্গে মা, খালা-খালু, মামা, খালাত ভাই-বোন আর আমি।আপ্যায়নের পর হঠাৎ খালাত বোনেরা দুষ্টুমি করে বলল, “ওদের দুজনকে একটু একা থাকতে দেয়া হোক। নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক।”   প্রস্তাব অনুযায়ী আমাদের দুজনকে ওপরের একটি ঘরে পাঠানো হলো। বাইরে থেকে খালাত ছোট বোন সিটকিনি লাগিয়ে দিল।   প্রথমে অস্বস্তি। তারপর কথা। কীভাবে যেন অল্প সময়েই অচেনা দুজন মানুষ একে অপরের কাছে নিজেদের মনের দরজা খুলে দিলাম। ভালো লাগা, ভয়, স্বপ্ন সব কথা। আমরা জেনে গেলাম, আজই আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা।   নিচ থেকে বারবার ডাক আসছিল, সময় হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কেউই ঘর থেকে বের হতে পারছিলাম না।   কী এক অদ্ভুত অজানা আবেগ আমাদের দুজনকে ঘিরে ফেলেছিল! শেষবারের মতো একে অপরের হাত ধরে রইলাম। বিদায়ের মুহূর্তে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম। চোখে চোখ রাখলাম। তারপর নিঃশব্দে একটি চুমু, যেন অচেনা জীবনের সঙ্গে পরিচয়ের প্রথম এবং শেষ স্বাক্ষর।   নিচে এসে আংটি বদল হলো। সবকিছু যখন প্রায় চূড়ান্ত, তখন হবু শ্বশুর বললেন, “ছেলের বোন-ভগ্নিপতি, চাচা-মামারা কেউ তো নেই। এক দিন পরে বিয়েটা হলে সবাই আসতে পারবে। আমাদের আরও একটু ভালো লাগবে।”   আমরা তাঁর কথায় আপত্তি করলাম না। পরদিন সকালে প্রায় বিশজনের বরযাত্রী নিয়ে আবার রওনা হলাম।   মেয়ের বাড়ির সামনে গিয়ে দেখি বিশাল বিয়ের গেট। বাড়িজুড়ে উৎসবের সাজ। আমাদের সঙ্গে থাকা মুরব্বিরা অবাক হয়ে বললেন, “ওরা তো অনেক আয়োজন করেছে! আমরা কি এমন আয়োজন করতে পারব?”   কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠেছিল। কিন্তু কয়েক মিনিট পর সেই আনন্দ যেন বিষ হয়ে গেল।   খালার বাড়িতে গিয়ে দেখি সবাই বিমর্ষ। কেউ কথা বলছে না। চোখাচোখি এড়িয়ে যাচ্ছে। শেষে খালু ধীরে ধীরে এসে আমার পাশে বসে বললেন, “বাবা, কষ্ট পেয়ো না। মেয়েটার বাবা খুব লোভী। গতকাল সন্ধ্যায় তোমাদের বিদায় দেয়ার পর এই গ্রামেরই এক চাকরিজীবী ছেলেকে ডেকে এনে মেয়েটার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।”   আমি কোনো কথা বলতে পারিনি। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, মানুষ কখনো কখনো কাঁদতেও পারে না। শুধু নির্বাক হয়ে যায়।   আমরা সেই বিয়ের গেটের সামনে থেকে কীভাবে ফিরে এসেছিলাম, আজও ঠিক মনে নেই। মনে আছে শুধু, সেদিন আমার সঙ্গে আমাদের পরিবারের মান-সম্মান, অপমান আর অদৃশ্য কিছু কান্নাও বাড়ি ফিরেছিল।   আব্বা ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হলেন। ছয় মাস পর আমি সেই মেয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামেই বিয়ে করলাম। সেই পরিবার ছিল ঐতিহ্য, সম্মান আর মর্যাদায় বহুগুণ এগিয়ে। আমার স্ত্রীও ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং সরকারি চাকরিজীবী।   জীবন ধীরে ধীরে নিজের গতিতে চলতে লাগল। তারপর পনেরো বছর কেটে গেল। একদিন হঠাৎ সেই প্রথম মেয়েটির সঙ্গে একটি হোটেলে দেখা। আমি কথা বলতে ইতস্তত করছিলাম। কিন্তু সে পারল না। আমার সামনে বসেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল।   “বিশ্বাস করো, সেদিনের জন্য আমি একটুও দায়ী ছিলাম না। মা আমার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু বাবা তাঁর জেদের কাছে আমাকে বাধ্য করেছিলেন। আমি অনেকবার নিজের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম।” কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল।   “এই পনেরো বছরে আমি এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে সুখী ভাবতে পারিনি। তোমাকে হারানোর পর বুঝেছি, মানুষ নিজের ভাগ্যকে সব সময় নিজের হাতে লিখতে পারে না।”   আমি নীরবে শুনছিলাম। সে চোখ মুছে বলল, “তুমি সুখে আছ, ভালো আছ, এই খবরটুকুই আমাকে এত বছর বাঁচিয়ে রেখেছে।”   সেদিন হোটেল থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে হলো, জীবনের কিছু গল্পের শেষ হয় না। কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে না থাকার জন্য। শুধু একটি অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য।   আর কিছু বিদায় থাকে, যার শব্দ শোনা যায় না, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি সারা জীবন বুকের ভেতর বাজতে থাকে।

জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0
সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

সজিত কুমার সজিত কুমার সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ 0
শেষ বিকেলের ছাদ

  ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডা শেষ করে বের হতেই বৃষ্টি নামল। অবন্তীর সঙ্গে কোনো ছাতা ছিল না। সে ভেবেছিল, হয়তো মিনিট দশেকের মধ্যে বৃষ্টি থেমে যাবে। কিন্তু শ্রাবণের বৃষ্টি কি আর এত সহজে থামে?   ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল নীলাদ্রী। হাতে একটি পুরোনো নীল রঙের ছাতা। “বাড়ি ফিরবে তো? এসো, অর্ধেক রাস্তা এগিয়ে দিই”, নীলাদ্রী সহজ গলায় বলল।   অবন্তী আর নীলাদ্রী একই বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর পড়েও কখনো খুব বেশি কথা বলেনি। দুজন যেন দুই মেরুর মানুষ। অবন্তী চুপচাপ, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা এক নিজস্ব পৃথিবীতে বাঁচতে ভালোবাসে। আর নীলাদ্রী—ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক চঞ্চল, প্রাণবন্ত নাম।   নীল ছাতার নিচে দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। বৃষ্টির একটানা শব্দে চারপাশে যেন তৈরি হলো এক অদ্ভুত নীরবতা। “তুমি সব সময় এত চুপচাপ কেন, অবন্তী?” হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ প্রশ্ন করল নীলাদ্রী। অবন্তী একটু হেসে বলল, “বলার মতো খুব বেশি কথা থাকে না হয়তো।” “কথা কি সব সময় বলতে হয়? কিছু কথা তো বুঝে নেয়ারও থাকে”, নীলাদ্রী মৃদু গলায় বলল। সেদিনের সেই দশ মিনিটের হাঁটাই ছিল তাদের গল্পের শুরুর রেখা।   এরপর ছোট ছোট কারণ তৈরি হতে লাগল। লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বসে বই পড়া, একসঙ্গে ক্যাম্পাসের টং দোকানে চা খাওয়া, ক্লাসের নোট আদান-প্রদান—সবকিছুই যেন অজান্তে তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে লাগল।   অবন্তী একদিন খেয়াল করল, নিজের চারপাশে তৈরি করে রাখা শক্ত দেয়ালগুলো সে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনছে—শুধু নীলাদ্রীর হাসির সামনে।   বছর ঘুরল। পড়াশোনা শেষ হলো। দুজনই আলাদা চাকরিতে যোগ দিল। শহরের ব্যস্ততা তাদের দিনের অনেকটা সময় কেড়ে নিলেও তাদের মধ্যকার সেই দূরত্ব আর বাড়ল না; বরং অদৃশ্য এক টানে তারা একে অপরের আরও কাছে থেকে গেল।   একদিন শেষ বিকেলে অবন্তীর ছাদের দরজায় কড়া নাড়ল নীলাদ্রী। আকাশ তখন হালকা লালচে আর বেগুনি রঙে রাঙা। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।   নীলাদ্রী পকেট থেকে ছোট্ট একটি নীল ফিতা বের করে অবন্তীর হাতে দিল। “এটা কী?” অবন্তী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। নীলাদ্রী মৃদু হেসে বলল, “সেই প্রথম দিনের কথা মনে আছে? তোমার সঙ্গে যে নীল ছাতাটার নিচে হেঁটেছিলাম? ছাতাটা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এই ফিতাটা আমি ফেলে দিইনি।” অবন্তী ফিতাটার দিকে তাকাল। তারপর তাকাল নীলাদ্রীর চোখের দিকে।   সেখানে ভালোবাসার কোনো বিরাট দাবি ছিল না। ছিল না কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতিও। ছিল শুধু হাজারটা সাধারণ মুহূর্ত একসঙ্গে কাটিয়ে দেয়ার এক নীরব আশ্বাস। নীলাদ্রী খুব শান্ত গলায় বলল, “সারাটা জীবন কি আমার সঙ্গে এই এক ছাতার নিচে হাঁটবে?” অবন্তী কিছু বলল না।   সে শুধু নীল ফিতাটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। তারপর ধীরে ধীরে নীলাদ্রীর কাঁধে মাথা রাখল।   দুজন নীরবে তাকিয়ে রইল দূর আকাশের দিকে। শেষ বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল, আর তাদের সামনে যেন খুলে যাচ্ছিল এক নতুন জীবনের দরজা।   কিছু অনুভূতির জন্য কবিতার প্রয়োজন হয় না। কিছু ভালোবাসার জন্য বড় কোনো প্রতিশ্রুতিও লাগে না। কখনো কখনো শুধু একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের নীরবে থেকে যাওয়ার বিশ্বাসই যথেষ্ট। আর সেই বিশ্বাসের নামই হয়তো ভালোবাসা।  

এস কে মামুন এস কে মামুন সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ 0
এক রাতের অচেনা সহযাত্রী

রাত তখন প্রায় নয়টা। বাসস্ট্যান্ডে কোনো বাস নেই। দু-চারটি অটো আর ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। আপাতত তিন ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে অটোতে উঠলাম। নিয়ম ছিল, ছয়জন যাত্রী না হলে অটো ছাড়বে না। কিন্তু একটু বেশি ভাড়া দিতে চাওয়ায় সেদিন মাত্র দুজন যাত্রী নিয়েই অটো ছেড়ে দিল—আমি আর এক অচেনা মেয়ে।   প্রথমে দুজনের মধ্যে তেমন কোনো কথা ছিল না। অন্ধকার পথ, অটোর ঝাঁকুনি আর চারপাশের নীরবতা আমাদের ঘিরে ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর কীভাবে যেন গল্প জমে উঠল। অচেনা মেয়েটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠল। জীবনের টুকরো টুকরো কথা, হাসি, স্বপ্ন আর নানান গল্পে তিন ঘণ্টার পথ কখন পেরিয়ে গেল, টেরই পেলাম না।   মাঝপথে নাশতার জন্য অটো থামল। আমরা দুজন রেস্টুরেন্টে বসলাম এবং ফালুদা খেলাম। বিলটা আমিই দিয়ে দিলাম। সে হয়তো একটু অবাক হয়েছিল। কিন্তু সেই অবাক চোখে কোনো অস্বস্তি ছিল না, বরং ছিল একধরনের আন্তরিকতা।   হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। অটোর ছাউনিতে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, ভেজা বাতাস আর অন্ধকার পথ—সবকিছু মিলিয়ে রাতটা কেমন যেন অন্য রকম হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, এই অপরিচিত মানুষটির সঙ্গে পরিচয়টা হয়তো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।   গল্পের ফাঁকে সে আমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি চাইল। আমার ফোনে ইন্টারনেট থাকায় আমিই তাকে রিকুয়েস্ট পাঠালাম। সে বলল— বাসায় ওয়াই-ফাই আছে। বাড়ি পৌঁছে রিকুয়েস্টটা গ্রহণ করব।   যাত্রা শেষে অটো ভাড়া দেয়ার সময় তার ভাড়াটাও দিয়ে দিলাম। সে কিছুটা সংকোচ নিয়ে বলল— আপনার এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল? আমি হেসে বললাম— কষ্ট নয়, ভালো লাগা।   কিন্তু যাত্রা তখনো শেষ হয়নি। অন্য একটি অটো পাওয়ার জন্য অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো। রাত প্রায় বারোটা। অবশেষে একটি অটো পাওয়া গেল। ভাড়া ছিল নিয়মের প্রায় দ্বিগুণ। তাতেও রাজি হলাম। আবারও দুজনে অটোতে উঠলাম।   শুরু হলো নতুন করে গল্প। পড়াশোনা, চাকরি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—কত কী নিয়ে যে কথা হলো! অল্প সময়ের পরিচয় কখন যেন আরও একটু আপন হয়ে উঠেছিল। কিছুক্ষণ পর তার গন্তব্য এসে গেল। সে অটো থেকে নেমে দাঁড়াল। বৃষ্টির পর ভেজা রাস্তায় হলুদ আলো পড়ছিল। বিদায়ের আগে সে একবার ফিরে তাকিয়ে মৃদু হেসেছিল কি না, আজও নিশ্চিত নই। তবে সেই মুহূর্তটা মনে গেঁথে আছে।   তারপর আমাদের পথ আলাদা হয়ে গেল। অটো আবার চলতে শুরু করল। এবার আমি একা। ড্রাইভার আমার দিকে তাকিয়ে বলল— ভাই, আপা কি আপনার পরিচিত? না। তাহলে তার ভাড়া দিতে চাইলেন যে? আমি একটু হেসে বললাম— গাড়িতে কথা বলতে বলতে পরিচয় হয়েছে। ভালো লেগেছে মানুষটাকে, তাই। আর আমি এমনই। ড্রাইভার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল— ভাই, আপনার মনে হয় অনেক টাকা? মোটেও না। আমার নিজের ভাড়া দেয়ার মতো টাকাও ছিল না। বন্ধুর কাছ থেকে বিকাশে এক হাজার টাকা ধার নিয়েছি। ড্রাইভার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— ভাই, এই স্বার্থপর দুনিয়ায় কেউ কারও জন্য এক ফোঁটা জলও খরচ করে না, এক ফাটা পয়সাও নয়। কেউ যদি করে, তাহলে নিশ্চয়ই তার পেছনে কোনো না কোনো স্বার্থ থাকে। আমি বললাম— সঠিক বলেছেন। কিন্তু আমি একটু আলাদা। ড্রাইভার মৃদু হেসে বলল— অন্য মানুষের কথা আর কী বলব! আমার আপন ছোট ভাই জমি রেজিস্ট্রি করার সময় এক সপ্তাহের কথা বলে বিশ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল। কিন্তু আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল, আমার টাকা আর ফেরত দেয়নি। এখন সে আমাকে শত্রু মনে করে। হ্যাঁ ভাই, মানুষ খুবই স্বার্থপর। আমিও জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। অনেক কষ্ট পেয়েছি, অনেক প্রতারণার শিকার হয়েছি। তবু নিজেকে বদলাতে পারিনি। কারণ, আমি বিশ্বাস করি—ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। ড্রাইভার আর কিছু বলল না। অটো এগিয়ে চলল। রাতের নিস্তব্ধতায় বৃষ্টির গন্ধ মিশে ছিল। জানালার বাইরে ছুটে চলা আলো-আঁধারির দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, কিছু মানুষ খুব অল্প সময়ের জন্য আমাদের জীবনে আসে, অথচ তাদের রেখে যাওয়া অনুভূতি অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়। রাত আড়াইটার দিকে বাড়ি ফিরলাম। ক্লান্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেও ঘুম আসছিল না। বারবার মনে পড়ছিল সেই অচেনা মেয়েটির হাসি, কথার ভঙ্গি আর বিদায়ের মুহূর্তটি।   আজ প্রায় ছয় মাস হয়ে গেছে। সে দিব্যি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আইডি চালাচ্ছে। অথচ আমার পাঠানো সেই রিকুয়েস্টটি এখনো গ্রহণ করেনি। হয়তো সে ভুলে গেছে সেই রাতের কথা। হয়তো তার কাছে সেটি ছিল স্রেফ একটি যাত্রা, কয়েকটি গল্প আর একজন অচেনা সহযাত্রী। কিন্তু আমার কাছে? সেটি ছিল এক রাতের অবিরাম গল্প—যেখানে পরিচয় ছিল ক্ষণিকের, মায়া ছিল অকারণ, আর ভালো লাগার কোনো হিসাব ছিল না।   কিছু মানুষ আমাদের জীবনে আসে, কয়েক ঘণ্টা পাশে বসে থাকে, তারপর অন্ধকার পথের কোনো এক মোড়ে নেমে যায়। তবু তাদের জন্য আমরা ভাড়া দিয়ে যাই—কখনো অটোর, কখনো মায়ার, আর কখনো স্মৃতির।    

মানিকুল ইসলাম মানিক মানিকুল ইসলাম মানিক সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬ 0
খেয়াল

অসময়ে পত্র শুকাইয়া ঝরিয়া গিয়াছে যেই বৃক্ষের, তাহার তলে বসিয়া খেয়াল হইল বৃক্ষটি তখনো মরে নাই; ক্বচিৎ দু-চারিটি সবুজ কিশলয় এখানে ওখানে উঁকি মারিতেছে। ইহাই কি তবে দুর্দশাগ্রস্ত মানবজীবনের স্বপ্নময়তা—প্রশ্ন উদিত হইল। নিশার ঘন অন্ধকারে কেমন ধূসর ভঙিমায় একমনে দাঁড়াইয়া রহিয়াছে; ঈষৎ মন্দ-মন্দ বাতাসে বোধ হইল শাখা খানিক দুলিতেছে। উহা কি মানবমনের রহস্যময়তা! যাহা চেতনার অতল গভীরে খেলা করিতেছে?   মানব যাহাতে আশা হারাইয়া ফেলে, হতাশায় নিমগ্ন হইয়া ভাবে, এই বুঝি পথের শেষ তখনো বিধাতা কি সুযোগ রাখিতে কৃপাবোধ করেন না! এমত সময় দূরের পত্রবহুল ঝাঁকড়া বৃক্ষরাজি দেখিতেই মনে হইল ইহার মনে কি ঈর্ষা জাগ্রত হয় না উহাদের অবলোকন করিয়া? তবে কি নীরবে সর্বংসহার উপদেশ দিবার হেতু ত্রিপথের ধারে পত্রশূন্য হইয়া আশা-আলোক বিচ্ছুরণ করিতে ইহার উপস্থিতি!   একদিন অবলোকিত হইবে ইহাই পত্রে-পুষ্পে ফুলিয়া উঠিতেছে। ইহার দানে ভরিয়া উঠিতেছে চারপাশ। অসময় কাটিয়া নবীন কিশলয়ে ভর করিয়া উদিত হইবে রক্তিম রবি, তাহার করে উজ্জ্বল হইয়া ঈর্ষা ধরাইবে পথচারীর মনে। সুজন, সেই দিন অবধি তোমাকে অপেক্ষা করিতেই হইবেক। এই আন্ধারে যাহার অস্তিত্ব বিলোপ বলিয়া ভ্রম হইতেছে, তাহাই তোমাকে দেখাবে আলোর পথ তদবধি কর্মে নিমিত্ত হও। আশা হারাইও না; এই কৃষ্ণপক্ষের নিশা অবসিত হইয়া আসিবে শুক্লপক্ষের ভোর; ব্যবধান কেবলই কিছু মুহূর্তের। শুভকামনা সতত...    

সুদীপ্ত হোসাইন সুদীপ্ত হোসাইন সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0