Breaking news

উপসম্পাদকীয়

শিশুর মৃত্যু, ভুল চিকিৎসা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি

কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। এখন কর্তব্য অবহেলাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া বা তার পক্ষে সাফাই গেয়ে তাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে সেটি নেহাতই অপপ্রয়াস। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের সামনে দাঁড়ানো সেই আয়না, যা আমাদের সিস্টেমের নগ্নতাকে রূঢ়ভাবে প্রকাশ করে। এ সত্যের দর্পণে আমরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসার মান, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও দেখতে পাই।   সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর এক নামি-দামি হাসপাতালে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের করুণ মৃত্যু চিকিৎসাব্যবস্থায় কথিত অবহেলা নিয়ে জনমনে আবারও একটি ভয়ংকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের এই তথাকথিত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটুকু নিরাপদ?   আভানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুরোনো শঙ্কাকে নতুন করে সামনে আনলেও এর সিলসিলা বহুকাল ধরে জারি রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর প্রসবব্যবস্থা, শিশুর অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং এ সম্পর্কে উদাসীনতা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। সিস্টেমের নগ্ন মারপ্যাঁচের খেসারত ইতোমধ্যে হামের মহামারির মধ্য দিয়ে দেশের অগণিত শিশু জীবন দিয়ে চুকিয়েছে। সেই রেশ মিটতে না মিটতেই আভানের ঘটনা জনমনে ভয়ংকর ধাক্কা দিয়েছে।   শিশুটির পরিবারের পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রয়োগে গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার নেগেটিভ ফল আসার পরও কেন শিশুটিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হলো, কেন তার শারীরিক অবস্থার প্রকৃত হালচাল পরিবারের কাছে গোপন করা হলো, এসব প্রশ্ন কেবল আভানের পরিবার নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারকেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া, মনে আতঙ্কের ঢেউ।   আভানের মৃত্যুর নেপথ্যে আসল কোন সত্য লুকিয়ে আছে, চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল কি না, শিশুটিকে দেয়া চিকিৎসা সিদ্ধান্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, এসবের জবাব কেবল সঠিক তদন্তেই উদঘাটন সম্ভব। তাই অভিযোগ সত্য ধরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও অন্যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য উদঘাটনের অধিকার। আর এই অধিকার জনগণের। জনগণের এই যৌক্তিক দাবিকে মাথা পেতে নিয়ে সঠিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করাই একটি দক্ষ রাষ্ট্র প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।   একজন রোগীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারের প্রথম স্বাভাবিক কৌতূহল হবে, ‘কেন?’ অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ‘কেন’র জবাব খুঁজে পাওয়ার পথ মোটেও স্বচ্ছ ও সরল নয়, বরং অস্বচ্ছতায় ভরা এক প্যাঁচালো গোলকধাঁধা। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, হাসপাতালের আইসিইউসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যক্তিদের মুনাফালিপ্সার মতো অভিযোগও আলোচনায় আসে।   প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক, চিকিৎসা কি কেবল সেবা, নাকি অধিকার? বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৬.৫, যা ২০২৪ সালে হ্রাস পেয়ে ৩০.৫ এ দাঁড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এই অগ্রগতি একই সঙ্গে আমাদের সামনে নতুন দায়িত্বের ভিত তৈরি করেছে। শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারা যদি প্রথম সাফল্য হয়, তবে তার পরের সাফল্য হবে নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা।   ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে প্রায় ২২। অর্থাৎ শিশুমৃত্যু কমলেও ঝুঁকি আজও রয়ে গেছে। তবে এই ঝুঁকি কেবল রোগের নয়, ব্যবস্থারও। ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অদক্ষতা, ওষুধের ভুল প্রয়োগ, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবারের কাছে গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক মানের সঙ্গে সম্পৃক্ত।   স্বাস্থ্যসেবা বলতে কেবল হাসপাতাল তৈরি করে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরে তোলাকে বোঝায় না। কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল বিষয় হলো সঠিক রোগ নির্ণয়, দক্ষ জনবল, যথাযথ চিকিৎসা প্রোটোকল, পর্যবেক্ষণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভুল হলে তার সঠিক জবাবদিহি।   চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানও আমাদের দেশের অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। ২০২৫ সালের ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫৪/১০০ এবং প্রায় ৪১.৭ শতাংশ মানুষ নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর আরেকটি বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রকাশনায় দেখা যায়, দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজেকেই বহন করতে হয়।   অতএব, মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সময় কেবল অসুস্থতার ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকির এক অদৃশ্য মানসিক বোঝাও বহন করে। একটি শিশুর চিকিৎসা ব্যর্থ হলে পরিবার কেবল সন্তানকে হারায় না, অনেক পরিবার একই সঙ্গে হারায় সঞ্চয়, ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়, এমনকি জীবনের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর্থিক বিনিময়ে যে চিকিৎসাসেবা আমরা পাই, তার সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, আস্থা ও মৌলিক অধিকার।   পৃথিবীর কোনো দেশেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে গরমিল একেবারেই নেই, এমন নয়। একজন চিকিৎসকও রক্তমাংসে গড়া মানুষ। রোগ নির্ণয়ে জটিলতা থাকতেই পারে। চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাও বলে, চিকিৎসাজনিত জটিলতা ও অবহেলা এক নয়। সুতরাং এগুলোকে ‘লেজে গোবরে মেখে’ এক করে দেখার সুযোগ নেই।   কোনো রোগী মারা গেলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসককে দায়ী করাও ভুল, আবার ভুল চিকিৎসা বা কর্তব্য অবহেলার অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও অগ্রহণযোগ্য। এই ধোঁয়াশা দূর করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো।   ২০২৬ সালের প্রকাশিত এক আইনবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে রোগীর পরিবারের কাছে তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চিকিৎসাজনিত অ্যাডভার্স ইভেন্ট প্রকাশের জন্য বর্তমানে সুস্পষ্ট স্ট্যাটুটরি ডিউটি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।   এখানেই এখন বিশেষভাবে ভাবতে হবে। রোগীর স্বজন তাদের সন্তান বা স্বজনের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে তার সঠিক জবাব পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ‘এটা জটিলতা ছিল’ অথবা ‘আমরা সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী করেছি’ বলে দায়সারা জবাব দিয়ে দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।   রোগীর পরিবারের সংশয় কাটাতে চিকিৎসার নথি, ওষুধের তালিকা, পরীক্ষার ফল, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা ও নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক অভিযোগ দাখিল করার পর কতটা সহজে, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিকার পাবেন?   শুধু অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়। গুরুতর চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নথি সংরক্ষণ এবং পরিবারের কাছে তা প্রদানের নিশ্চয়তা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, হাসপাতাল ও চিকিৎসকের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ, অবহেলা প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি মানে চিকিৎসকদের ভয় দেখানো নয়, বরং ভুলের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসার পরিবেশ তৈরি করা।   আমাদের মাঝে সামাজিক স্মৃতির এক অদ্ভুত সমস্যা বিরাজমান। একটি শিশু মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম নেয় ক্ষোভ। মানুষ বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। কয়েক দিন কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়। অতঃপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে ভুলিয়ে দেয়। হিসাবের খাতায় যোগ হয় কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু ওই সংখ্যার নেপথ্যে থাকে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।   আভান হয়তো কোনো পরিসংখ্যানের একটি অংশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরিবারের কাছে সে নিছক কোনো সংখ্যা নয়। সে ছিল একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী। এই আবেগটাকেই রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। হতে হবে সংবেদনশীল।   স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য বলতে কয়টি হাসপাতাল মাথা তুলেছে, কতটি অত্যাধুনিক আইসিইউ আছে, কতজন দক্ষ চিকিৎসক আছেন, শুধু তা দিয়ে সাফল্য বিচার করলে গোটা গণিতটাই ভুল হবে। এই সাফল্য পরিমাপ করতে হবে একজন সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা অকপটে বলতে পারছেন কি না এবং সত্য জানতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে কি না, তার ওপর।   একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে রোগীকে শুধু রোগী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হয়। আমরা চাইব, আভানের মৃত্যুর এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায় দ্রুত নির্ধারিত হোক। অভিযোগে অসততা থাকলে সেটিও সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠুক। তবে কোনো অবস্থাতেই সত্যকে যেন আরেকটি শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কবরের আঁধারে দাফন হতে না হয়। কারণ, আজকের প্রশ্নটি শুধু আভানের জন্য নয়, আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্য।   ‘হাসপাতালের ফটক পেরুলে একজন নাগরিক কি কেবলই চিকিৎসাটুকুই পাবেন, নাকি তার সঙ্গে নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারেরও ন্যায্য ভাগীদার হবেন?’ এ প্রশ্নের জবাব না মিললে অঢেল উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার মাঝেও প্রশ্নটি আমাদের উত্ত্যক্ত করেই চলবে, ‘আমরা কি তবে সব সময়ই শেষ অবধি কেবল হিসাবের খাতার এক মামুলি সংখ্যাই রয়ে যাব?’

সোনিয়া তাসনিম সোনিয়া তাসনিম অক্টোবর ৭, ২০২৬ 0
অপার সম্ভাবনাময় জেলা কুড়িগ্রাম : প্রয়োজন শুধু সঠিক উদ্যোগ

কুড়িগ্রামের মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে সংকট কোনো নতুন শব্দ নয়। নদীভাঙন, বন্যা, দারিদ্র্য কিংবা কর্মসংস্থানের অভাব—এসবের সঙ্গে এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই করে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংকটের ধরনও বদলেছে। এখন কৃষকের দুশ্চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার পাওয়ার অনিশ্চয়তা, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম, তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকের বিস্তার এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। প্রশ্ন হলো এত সংকটের মধ্যেও কুড়িগ্রামের মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটি কোথায়?   সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সারের সংকট। আমন মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাটেও সারের দাবিতে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন। কোথাও কৃষকেরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।   এখানে বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখা দরকার। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেলায় সারের বরাদ্দ ও সরবরাহ রয়েছে এবং অতিরিক্ত চাহিদা, বিতরণব্যবস্থা ও আস্থার সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। আবার কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রয়োজনের মুহূর্তে ডিলারের কাছে গিয়ে তাঁরা সার পাচ্ছেন না। অর্থাৎ কাগজে বরাদ্দ থাকলেই হবে না; সঠিক সময়ে, সঠিক কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোই মূল কথা।   একজন কৃষকের কাছে কয়েক দিন দেরিতে পাওয়া সারও অনেক সময় কার্যত না পাওয়ার সমান। কারণ, কৃষির মৌসুম অপেক্ষা করে না। ধান বা সবজির প্রয়োজনীয় সময় চলে গেলে পরে পাওয়া সার দিয়ে সেই ক্ষতি সব সময় পূরণ করা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। অক্টোবরেও এসব দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।   কুড়িগ্রামের মতো কৃষিনির্ভর জেলায় এর প্রভাব শুধু পাম্পের তেলের দাম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না। জমি চাষ, সেচ, ফসল পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে। কৃষককে তখন একদিকে সার ও অন্যান্য উপকরণের খরচ সামলাতে হয়, অন্যদিকে উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে বাড়তি পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ কোথায় গিয়ে পড়ে? কৃষক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তা—সবাই তার অংশ বহন করে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্ভবত কুড়িগ্রামের তরুণ সমাজ।   আমাদের জেলার বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম। কিন্তু তাদের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে অনেকেই কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে চলে যায়। কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট যে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা, বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তার চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে, জেলায় দারিদ্র্যের হার ৭০.৮ শতাংশ।   একজন তরুণ নিজের জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র গেলে সেটিকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। অনেকের জন্য এটি প্রয়োজনের সিদ্ধান্ত। নিজের এলাকায় যদি একটি সম্মানজনক চাকরি, ব্যবসার সুযোগ কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে কেন একজন তরুণ পরিবার ছেড়ে হাজার কিলোমিটার দূরে যেতে চাইবে? আর কর্মসংস্থানের অভাবের সঙ্গে যখন হতাশা যুক্ত হয়, তখন আরেকটি বিপদ সামনে আসে—মাদক ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড।   কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ গাঁজা, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক জব্দ হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও ফুলবাড়ী সীমান্তে মাদক জব্দের খবর এসেছে। একই মাসে ফুলবাড়ীতে ট্যাপেন্টাডলসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।   এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখলে চলবে না। একজন তরুণ কেন মাদকের দিকে যাচ্ছে, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, বেকারত্ব, হতাশা—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রাখতে পারে।   মাদক ঠেকাতে আইন প্রয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অভিযান দিয়ে একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা যাবে না। তাদের সামনে বিকল্প জীবন তৈরি করতে হবে। খেলাধুলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান—এসবও মাদকবিরোধী লড়াইয়ের অংশ হওয়া উচিত।   আরেকটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে ভাবায়—শিক্ষা। একটি জেলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু কুড়িগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের খবর নতুন নয়। রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে ৬০টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৮ জন—৩২টি পদ শূন্য। এতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়েও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের আগস্টের এক প্রতিবেদনে কুড়িগ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩৬৬টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।   আমরা যদি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে চাই, কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ করে তুলতে চাই, তাহলে প্রথমেই তাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকবিহীন বা শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়-কলেজ দিয়ে দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের পুরোনো চক্র। নদীভাঙনে মানুষ জমি হারায়, বসতভিটা হারায়, কখনো জীবিকার শেষ অবলম্বনটুকুও হারায়। তারপর নতুন জায়গায় গিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। এই বাস্তুচ্যুতি শুধু একটি পরিবারের বর্তমানকে নয়, সন্তানের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করে।   তাই কুড়িগ্রামের সংকটকে আলাদা আলাদা বাক্সে রেখে দেখলে হবে না। কৃষকের সারসংকট, জ্বালানির বাড়তি খরচ, কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকের বিস্তার, শিক্ষার দুর্বলতা এবং নদীভাঙন—সবগুলো একে অন্যের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত।   সমাধানও তাই হতে হবে সমন্বিতভাবে। প্রথমত, কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময় সারের স্বচ্ছ ও কার্যকর বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে, কারা পাচ্ছে এবং কৃষক কেন লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না—এসব প্রশ্নের জবাবদিহি থাকতে হবে।   দ্বিতীয়ত, কুড়িগ্রামে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। শুধু ধান বা সবজি উৎপাদন করলেই হবে না; সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে।   তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সব তরুণ সরকারি চাকরি করবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং কৃষিভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।   চতুর্থত, মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে শুধু অভিযাননির্ভর না করে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের নিজেদেরও এতে যুক্ত করতে হবে।   সবশেষে প্রয়োজন কুড়িগ্রামকে শুধু সমস্যার জেলা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার জেলা হিসেবে দেখা।কুড়িগ্রামের কৃষি আছে, নদী আছে, সীমান্তবাণিজ্যের সম্ভাবনা আছে, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। সবচেয়ে বড় কথা—এই জেলার মানুষ পরিশ্রম করতে জানে। প্রয়োজন শুধু সেই পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা।   আমরা কুড়িগ্রামবাসী করুণা চাই না। আমরা চাই সমান সুযোগ। কৃষক যেন প্রয়োজনের সময় সার পান, শ্রমিক যেন কাজ পান, তরুণ যেন নিজের এলাকায় ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন, শিক্ষার্থী যেন শিক্ষক সংকটে পিছিয়ে না পড়ে এবং কোনো পরিবার যেন মাদকের কারণে তার সন্তানকে হারানোর ভয় না পায়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা।   কুড়িগ্রামের মানুষ বহুদিন ধরে সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। এখন সময় শুধু সংকট গুনে যাওয়ার নয়; সংকটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটার। কুড়িগ্রাম পিছিয়ে থাকার জেলা নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগ পেলে এই জেলাই হতে পারে উত্তরের সম্ভাবনার অন্যতম কেন্দ্র।   প্রশ্নটা তাই কুড়িগ্রাম কতটা পিছিয়ে—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কুড়িগ্রামকে এগিয়ে নিতে আমরা এখন কতটা আন্তরিক?  

হেদায়েতুল ইসলাম খান হেদায়েতুল ইসলাম খান অক্টোবর ৭, ২০২৬ 0
বাংলাদেশে বিরল খনিজের সন্ধান : বহু খাতের অর্থনৈতিক বিপ্লবের সম্ভাবনা

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সম্ভাব্য উপস্থিতি চিহ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রজুড়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর যৌথ অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফল বলছে—বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অজানা খনিজ সম্পদের দেশ হিসেবে নতুনভাবে উন্মোচিত হতে চলেছে।   এ ক্ষেত্রে সোনাদিয়া খনিজ সম্পদের ওপর একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জার্নাল ডিসকভার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টান বিশ্ববিদ্যালয়; এবং বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোঃ সাকাউথ হোসেন, মোঃ শাহরিয়ার রহমান,গোলাম তকি এবং মাফতিহা জাহান। তাঁদের গবেষণা বাংলাদেশের সোনাদিয়া দ্বীপের ভারী খনিজ পদার্থের ভূ-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং রিজার্ভ অনুমান শীর্ষক দ্বীপের নানান দিক অন্বেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এর ভারী খনিজ সম্পদের আয়তন। গবেষকদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক মূল্য এবং লুকানো মজুদের ভূতাত্ত্বিক তাৎপর্য নিম্নরূপ : সোনাদিয়া কক্সবাজার জেলার মহেশখালী থানার ছোট একটি দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় নয় বর্গকিলোমিটারের বিস্তৃত। দ্বীপটি ম্যানগ্রোভ। উপকূলীয় সমন্বয়ে গঠিত এবং এর চারদিকে পানি। এর পৃষ্ঠের নিচে ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল ও মোনাজাইটের মতো ভারী খনিজ পদার্থের মজুদ আছে। সোনাদিয়ায় এই মূল্যবান খনিজ পদার্থের অনুমানিক মজুদ প্রায় ৭ লাখ টন, যার মধ্যে গারনেট ও ইলমেনাইট সবচেয়ে বেশি।   বাংলাদেশে ১৯৮০ দশক থেকে ভূতাত্ত্বিক জরিপের কাজ শুরু হয়। তবে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) প্রায় ২০ বছর ধরে খনিজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে খনিজের সন্ধান পেয়েছেন। জিএসবি গবেষকদের মতে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহের পাহাড়ি ঢলের আসা পলি, নদী অববাহিকার বালু, জেগে ওঠা চর এবং কয়লা খনি থেকে বিরল বা ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে।   জিএসবির অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, “২০১৬ সালে যুমনা নদীর বালুতে আমরা ভারী আকরিকের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিরল বা ভারী মৃত্তিকা মৌল পেয়েছি। এবং সঙ্গে কিছু মাত্রায় লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম ও থরিয়াম পেয়েছি।” শুধু তা-ই নয়, দেশের সব কটি নদীতেই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমনকি দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে পাওয়া কয়লা ও ছাইয়েও বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর পরে ধরলা নদীর বালু পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে জিএসপির গবেষকরা স্যামারিয়াম, ইউরেনিয়াম,গ্যাভালিয়াম, টারবিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মত বিরল মৃত্তিকা মৌলের সন্ধান পাওয়া গেছে।   গবেষক মোঃ আলী আকবর বলেন, মূলত বালুতে থাকা খনিজ মোনাজাইট ও জিরকনের সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা মৌলের উপস্থিতি প্রমাণ মিলেছে। প্রতি কেজি বালুতে ৬০ থেকে ১৭৬ মিলিগ্রাম এসব মৌলের উপস্থিতি পেঁয়েছেন। তবে ধরলা নদীতে পাওয়া বিরল খনিজ বাণিজ্যিকভাবে কতটা উত্তোলনযোগ্য, তা জানাতে পারেননি জিএসবি গবেষকরা। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ১০০ মিলিগ্রামের ওপর হলে উত্তোলনযোগ্য হয়। দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়ায় গবেষকরা কয়লা গবেষণা করে দেখেছেন, পোড়া কয়লা ছাইয়ের ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিগ্রাম বিরল খনিজের উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকরা সোনাদিয়ার বালি গবেষণা করে দেখেছেন ৫১.৫২ শতাংশ গারনেট, ৩৮.১৪ শতাংশ ইলমেনাইট, ৫.৭৪ শতাংশ ম্যাগনেটাইট, ১.০১ শতাংশ জিরকন, ৩.৫৭ শতাংশ রুটাইল এবং ০.১ শতাংশ মোনাজাইট পাওয়া যায়।   বেশ কয়েক বছর যাবৎ স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ে জরিপে ব্রহ্মপুত্র ও যুমনা নদীর বালুতে রুটাইল, গারনেট, জিরকন, ম্যাগনেটাইটসহ মূল্যবান খনিজ পদার্থের উপস্থিতির নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে। এরপর সোনাদিয়া দ্বীপের টিলাগুলোতে গবেষণা করে দেখা গেছে, ভারী খনিজের পদার্থের ঘনত্ব সমুদ্রের সৈকতের অংশের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলের  তুলনায়। গবেষকদের অনুমান অনুসারে টিলাগুলোতে প্রায় গারনেট ২৭৬,৮৬৮ টন, ইলমেনাইট আছে ১০,২৫,৫৫৮ টন, জিরকন ১৫৮,১১৭ টন, লিউকক্সিন ৯৬৭০৯ টন, ম্যাগনেটাইট ৮০,৫৯৯ টন, মোনাজাইট ১৭৩৫২ টন। তবে উপকূল অঞ্চল ও পশ্চাৎপসরণ অঞ্চলের পরিমাণে তারতম্য রয়েছে।   গবেষণা করে দেখা গেছে যে সমুদ্রের স্রোত, ঢেউ এবং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার  কারণে ক্রমাগত পলি জমা হওয়ার ফলে সোনাদিয়া খনিজ মজুতকে ভবিষ্যতে আরও আশাব্যঞ্জক করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। দেশের প্রয়োজনের তুলনায় আহরণের পরিমাণ খুব কম। এর ফলে দেশের প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে কয়লা, খনিজ তেল, চুনাপাথর, চিনামাটি, তামা, সিলিকা বালু, পারমাণবিক খনিজ পদার্থ জিরকন, মোনাজাইট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, লিউকক্সিন প্রভৃতি। এ ছাড়া গন্ধক, নুড়িপাথর, খনিজবালি, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ লবণ, কঠিন শিলা, সর্বাপেক্ষা সহজ ও হালকা হাইড্রো- কার্বন মিথেন। আন্তর্জাতিকভাবে ১৭টি মৌলের একটি গ্রুপ হলো বিরল বা ভারী খনিজ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির নামকরণ অনুযায়ী, পর্যায় সারণির ল্যান্থানাইড সিরিজের ১৫টি মৌলের ল্যান্থানাম, সিরিয়াম, প্লাসিয়োডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, প্রমিথিয়াম, স্যারিয়াম, ইউরোপিয়াম, গ্যাডোলিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হোলসিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইটারবিয়াম,  লুটোশিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম একত্রে বিরাল খনিজ বলছে যুক্তরাষ্ট্রের জিওসায়েন্স ইনস্টিটিউট সংস্থাটি।   আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প প্রতিরক্ষা খাতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিরল খনিজের ব্যবহার আছে। যেমন মুঠোফোন, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড, টেলিভিশনের এলইডি ডিসপ্লে তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি যেমন লেজার, রাডার, সোলার সিস্টেম, জেট ইঞ্জিন, মিশাইল সিস্টেম, যুদ্ধবিমান, রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বেশ কয়েকটি দেশের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ১৭টি বিরল মৌলের মধো ৮ থেকে ১১টি মৌল বিদ্যমান। পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বিরল মৌল নেই। তার মধ্যে বর্তমান বিশ্বে ৮০ শতাংশ খনিজ চীন নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটিতে ৪ কোটি ৪০ লাখ টন বিরল খনিজ মজুদ আছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্রাজিল, যার মজুদ আছে ২ কোটি ১০ লাখ টন। তা ছাড়া ভারতের ৬৯ লাখ  টন, অস্ট্রেলিয়ায় ৫৭ লাখ টন, রাশিয়ার ৩৮ লাখ টন, ভিয়েতনামের ৩৫ লাখ টন মজুত আছে। ২০২৪ সালে চীন খনিজ উৎপাদন করেছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন। আমেরিকা উৎপাদন করেছে মাত্র ৪৫ হাজার টন।   বিশ্বের যে সব দেশে খনিজ সম্পদ  আছে এবং উত্তোলনে সক্ষম, সে দেশের অর্থনীতি সাসটেইনেবল। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, যারা খনিজের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সৌদি আরবে খনিজ তেল জিডিপির ৫০ শতাংশ অবদান রাখে। রাশিয়ায় জিডিপির ২০ শতাংশ, ইরান জিডিপির ২৩ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে বিশাল অর্থনীতির দ্বার উন্মোচনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, জিএসবি দেশে আট ধরনের আবিষ্কৃত আর্থিক বাজার মূল্যের হিসাব নিরূপণ করেছে ২ কোটি ২৬ হাজার ১৪০ কোটি ডলার, বাংলা টাকায় কনভার্ট করলে দাঁড়ায় ২৪১.৯৭ ট্রিলিয়ন টাকা।   বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে কয়লা মজুদ আছে, যার পরিমাণ ৭২৫ কোটি টন। যার বর্তমান বাজার মূল্য আসবে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। পিট কয়লা মজুদের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। চুনা পাথর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫২৭ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে ৭৫ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। এভাবে আর অন্য সব খনিজের পরিমাণ যোগ করলে বিশাল পরিমাণ অর্থ দাঁড়াবে।   জিএসবি গবেষকদের মতে, ভারী খনিজ ও অন্যান্য খনিজ  উত্তোলন ও প্রক্রিজাত করা সম্ভব হলে দেশে প্রতিবছর ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। ভারী বা বিরল ও অন্য সব খনিজ গবেষণা ও প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে আনা সম্ভব হলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশে পরিগণিত হবে।  

তারেক মাহমুদ তারেক মাহমুদ অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0
তথ্য অধিকার আছে, তথ্য পাওয়ার অধিকার কতটা কার্যকর

তথ্য শব্দের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। তথ্য বলতে কোনো ব্যক্তি, বিষয়, ঘটনা, প্রতিষ্ঠান বা বস্তুর সম্পর্কে পাওয়া জ্ঞান, বিবরণ, উপাত্ত বা সংবাদকে বোঝায়। সহজভাবে বললে, কোনো বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য যে তথ্য বা বিবরণ পাওয়া যায়, সেটিই তথ্য।   তথ্য শুধু কিছু কাগজপত্র, পরিসংখ্যান কিংবা সরকারি নথির নাম নয়। তথ্য হলো নাগরিকের ক্ষমতা। একজন নাগরিক যখন জানতে পারেন তাঁর এলাকার রাস্তা নির্মাণে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, একটি প্রকল্পের কাজ কবে শেষ হওয়ার কথা, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, কিংবা জনস্বার্থের কোনো সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হয়েছে—তখন তিনি শুধু একটি তথ্য জানছেন না; তিনি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইবার সক্ষমতা অর্জন করছেন।   এ কারণেই ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসের গুরুত্ব এত বেশি। জাতিসংঘ ২০১৯ সালে ২৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘International Day for Universal Access to Information’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। UNESCO-ও তথ্যপ্রাপ্তিকে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।   বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি নতুন নয়। ২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার রয়েছে এবং অনুরোধের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে বাধ্য। একই আইনে সরকারি কর্তৃপক্ষকে তাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকের কাছে সহজলভ্য করার কথাও বলা হয়েছে। আইনের কাগজে-কলমে এই অধিকার যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাস্তবে নাগরিক কতটা সেই অধিকার ভোগ করতে পারছেন? জনগণও এ বিষয়ে কতটা জানে? তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন দপ্তরে যেতে হবে, কোন প্রক্রিয়ার তথ্য পেতে হবে, আদৌ কি জনগণ সেটা জানে?   তথ্য অধিকার আইনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো, নাগরিককে তথ্যের জন্য অনুগ্রহপ্রার্থী না রেখে অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক নাগরিক এখনো সরকারি অফিসে তথ্য চাইতে গেলে মনে করেন, তিনি যেন কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন। কোথায় আবেদন করতে হবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে, কত দিনের মধ্যে তথ্য পাওয়ার কথা, তথ্য না পেলে কোথায় আপিল করতে হবে—এসব বিষয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা সীমিত। আইন অনুযায়ী তথ্য চাওয়ার জন্য লিখিত, ইলেকট্রনিক বা ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। সাধারণ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেয়ার কথা; একাধিক ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট হলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ ব্যবস্থা আছে। প্রশ্ন হলো, ব্যবস্থাটি কি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে যথেষ্ট সহজ, পরিচিত ও কার্যকর হয়ে উঠেছে?   আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা কাজ করেছে—সরকারি তথ্য মানেই যেন অফিসের সম্পদ। নাগরিক চাইলে কিছু তথ্য দেয়া যাবে, না চাইলে দেয়া হবে না। তথ্য অধিকার আইন এ ধারণার জায়গায় একটি ভিন্ন দর্শন দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প এবং জনস্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখাই স্বাভাবিক নয়; বরং নির্দিষ্ট আইনগত ব্যতিক্রম ছাড়া তথ্য উন্মুক্ত রাখাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা।   আইনের ৬ ধারায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম এবং সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকদের কাছে সহজলভ্য করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে—এমন ব্যবস্থা আইনটির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সুশাসনের জায়গায় এখানেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার : তথ্য চাওয়ার পর দেয়া নয়, প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই প্রকাশ করা।   এখানেও আইনে পথ দেখানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়া গেলে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আপিলের সুযোগ রয়েছে। এরপর প্রয়োজন হলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার ব্যবস্থাও রয়েছে। তথ্য কমিশনের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যও দেখায় যে তথ্য অধিকার নিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন, অভিযোগ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। কমিশনের একটি প্রতিবেদনে মোট ৩৬,২৭৭টি বিষয়ে নিষ্পত্তির তথ্য রয়েছে; সেখানে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য চাওয়া আইনটির আওতাভুক্ত নয়, কোথাও যথাযথ কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়নি, কোথাও আপিল করা হয়নি—এমন নানা কারণও উল্লেখ করা হয়েছে।   এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তথ্য অধিকার এখন আর কেবল সেমিনার বা দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা নয়; নাগরিকরা বাস্তবেই এই আইনি কাঠামো ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বোঝা যায়, আইনটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে নাগরিকের জ্ঞান, সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।   সমস্যাটি শুধু তথ্য না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তথ্যের অস্তিত্বই নাগরিকের কাছে অজানা। কোনো দপ্তরে কী তথ্য আছে, কে সেই তথ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কোন তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করার কথা—এসব পরিষ্কার না হলে তথ্য অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে।   আরেকটি বিষয় হলো তথ্যের ভাষা। কোনো সরকারি ওয়েবসাইটে শত শত পৃষ্ঠার নথি আপলোড করা হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি বুঝতেই না পারেন সেখানে কী আছে, তাহলে সেটিকে কার্যকর তথ্যপ্রকাশ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? তথ্য প্রকাশের সঙ্গে তাই তথ্যের ব্যবহারযোগ্যতা যুক্ত করতে হবে।   একটি প্রকল্পের বাজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। কত টাকা বরাদ্দ, কত টাকা খরচ, কাজের অগ্রগতি কত, ঠিকাদার কে, কাজের মেয়াদ কত—এসব তথ্য যদি সহজ ভাষায়, নিয়মিত এবং অনুসন্ধানযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়, তখনই তথ্য জনগণের কাজে লাগে।   গত ২৮ সেপ্টেম্বর সভা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, সেমিনার হয়েছে, ব্যানার-ফেস্টুনে তথ্য অধিকারের কথা লেখা হয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু দিবসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—একজন সাধারণ নাগরিক কি কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই তথ্য চাইতে পারেন? তিনি কি জানেন, তথ্য না পেলে তাঁর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী? তিনি কি জানেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে? তিনি কি এমন তথ্য সহজেই অনলাইনে পান, যা তাঁকে আলাদা করে আবেদন করতে হয় না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তথ্য চাওয়ার কারণে তিনি কি নিজেকে হয়রানির শিকার বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি মনে করেন? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেবে, আমরা আইন কতটা পেয়েছি আর অধিকার কতটা পেয়েছি।   তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য তিনটি জায়গায় পরিবর্তন জরুরি— প্রথমত, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ বাড়াতে হবে। জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট, ক্রয়, প্রকল্প, সিদ্ধান্ত, জনবল, সেবা ও ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত এবং সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে হবে। একজন গ্রামের কৃষক, একজন শিক্ষার্থী, একজন সাংবাদিক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক যেন তথ্য চাওয়ার জন্য জটিল প্রশাসনিক ভাষা বা প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল না হন। তৃতীয়ত, তথ্য দিতে অনীহার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। তথ্য গোপন করার প্রবণতা নয়, তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতিই হতে হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক আচরণ। কারণ তথ্য অধিকার কোনো বিশেষ শ্রেণির অধিকার নয়। এটি সাংবাদিকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন কৃষকেরও প্রয়োজন; একজন গবেষকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন শিক্ষার্থী বা স্থানীয় নাগরিকেরও প্রয়োজন।   আন্তর্জাতিকভাবে ২০২৪ সালের তথ্য অধিকার দিবসের মূল আলোচনায়ও সরকারি খাতে তথ্য অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। UNESCO বলেছে, তথ্য অধিকারকে সরকারি সংস্থাগুলোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মধ্যে মূলধারায় নিয়ে আসাই বাস্তব অগ্রগতির অন্যতম লক্ষ্য।   পরিশেষে তথ্য অধিকার দিবসে তাই শুধু এ প্রশ্ন করলে হবে না—‘তথ্য অধিকার আছে কি?’ উত্তর আমরা জানি—আছে। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন আছে, তথ্য কমিশন আছে, তথ্য চাওয়ার বিধান আছে, আপিল ও অভিযোগের ব্যবস্থাও আছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো—এই অধিকার কতটা সহজে, কতটা নির্ভয়ে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণকে তথ্য দেয়ার অর্থ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানো। কারণ অন্ধকারে গুজব জন্ম নেয়, সন্দেহ বাড়ে।   আলোয় আসে প্রশ্ন। আর প্রশ্নের উত্তরদায়ী রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তাই ২৮ সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে জরুরি বার্তা হতে পারে একটাই, ‘তথ্য দেয়ার দরজা খোলা’ বললেই হবে না; সেই দরজা দিয়ে সাধারণ নাগরিক যেন সত্যিই ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন—সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।  

শফিকুল ইসলাম খোকন শফিকুল ইসলাম খোকন অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0
আত্মহত্যা : নেপথ্যে কারণ, সংকট ও প্রতিকার

আত্মহত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই আত্মহত্যার খবর চোখে পড়ে। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্ক—বিভিন্ন বয়সের মানুষ নানা ধরনের মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক সংকটে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিভিন্ন প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে আত্মহত্যাকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৬৪ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ১৯৪ জনই ছিলেন স্কুলশিক্ষার্থী। এ ধরনের তথ্য আমাদের শিক্ষা ও পরিবারব্যবস্থার পাশাপাশি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গভীরভাবে নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।   দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও আত্মহত্যার হার নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। ঝিনাইদহ তার একটি উদাহরণ। ১৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলার ছয় উপজেলায় গত এক বছরে ৩৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাকটিভিটিজের (সোভা) তথ্য অনুযায়ী, জেলাটিতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০০ মানুষ আত্মহত্যা করেন। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহে ৩,১৫২ জন আত্মহত্যা করেছেন এবং এ সময়ে প্রায় ২২,০০০ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলেও সংগঠনটির তথ্যের বরাত দিয়ে জানা যায়।   আত্মহত্যার পেছনে কোনো একক কারণকে দায়ী করা যায় না। ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক সংকট, মাদকাসক্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সহিংসতার অভিজ্ঞতা কিংবা তীব্র মানসিক চাপ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তির মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা এর পূর্ববর্তী কোনো সংকেত দেখা দিলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া প্রয়োজন।   এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—আত্মহত্যাকে ব্যক্তির দুর্বলতা, কাপুরুষতা বা একক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। এর পেছনে অনেক সময় জটিল মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক সংকট কাজ করে। তাই সংকটে থাকা একজন মানুষের প্রয়োজন বিচার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি ও সহায়তা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তান বা পরিবারের সদস্যের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে। মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনতে হবে, উপহাস বা তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে। সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তার কাছে পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।   শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা, কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে আত্মহত্যার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে, যাতে সংবাদ পরিবেশন কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।   ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে পারস্পরিক সহমর্মিতা, মানবিকতা ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মাদকের বিস্তার, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য সামাজিক সংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।   সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আত্মহত্যা প্রতিরোধকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব। একজন মানুষ যখন গভীর সংকটে থাকেন, তখন তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁকে একা না রাখা এবং প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ তাই শুধু একটি জীবন বাঁচানোর উদ্যোগ নয়; এটি একটি সহমর্মী ও মানবিক সমাজ গড়ার দায়িত্বও।  

রাহাদ মাহমুদ রাহাদ মাহমুদ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
ছাদবাগান : গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা ও বিস্তারের উপায়

মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার অন্যতম হলো খাদ্য। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের খাবার গ্রহণ করে। কিন্তু নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, শহরাঞ্চলে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমির সংকটও বাড়ছে।   বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১.৬৬ শতাংশ শহরাঞ্চলে বসবাস করে। ফলে সীমিত জায়গার মধ্যে খাদ্য উৎপাদনের নতুন উপায় খুঁজে বের করা প্রয়োজন।   এই অবস্থায় ছাদবাগান হতে পারে একটি কার্যকর উদ্যোগ। বাড়ির ছাদ কিংবা আশপাশের সামান্য খালি জায়গাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করা সম্ভব। অল্প জায়গাতেও টব, ড্রাম বা জিও ব্যাগে লালশাক, পুঁইশাক, করলা, পেঁপে, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি চাষ করা যায়। নিজের বাগানে উৎপাদনের ক্ষেত্রে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হওয়ায় নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে পরিবারের জন্য তাজা ও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ শাকসবজি পাওয়ার পাশাপাশি বাজারনির্ভরতা কিছুটা কমানো যায়।   ছাদবাগান এখন শুধু শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে নগর কৃষির একটি অংশ হয়ে উঠছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন উদ্যোগেও নগর কৃষিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে অনেকেই ছাদবাগানকে কেন্দ্র করে চারা, কলম, ফল ও সবজি উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে আয় করছেন। ফলে ছাদবাগান একদিকে যেমন পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণে সহায়তা করছে, অন্যদিকে কিছু মানুষের জন্য আয়ের নতুন সুযোগও তৈরি করছে।   ছাদবাগানে এখন প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণের ব্যবহারও বাড়ছে। জিও ব্যাগ মাটির ভারী টবের তুলনায় হালকা হওয়ায় ছাদবাগানে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি উন্নত ড্রেনেজ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা ব্যবহার করে ছাদে পানি জমে থাকা ও আর্দ্রতাজনিত সমস্যা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন উদ্যোক্তা ও বাগানপ্রেমী আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে সীমিত জায়গায় অধিক উৎপাদনের চেষ্টা করছেন। ‘শেকড় প্রযুক্তি’ নামের একটি নতুন পদ্ধতিও ছাদবাগানপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনায় এসেছে, যা উদ্ভিদের শেকড়ের ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে প্রচার করা হচ্ছে।   ছাদবাগানে এখন শুধু সাধারণ শাকসবজি নয়, ড্রাগন ফল, থাই পেয়ারা, মাল্টা, বারোমাসি আম, ডালিমসহ বিভিন্ন ফলের গাছ চাষের উদাহরণও দেখা যায়। পাশাপাশি টমেটো, ক্যাপসিকাম, করলা, লাউসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে একটি পরিবারের খাদ্যতালিকায় তাজা শাকসবজি ও ফল যুক্ত করার সুযোগ বাড়ছে।   ছাদবাগানের গুরুত্ব শুধু খাদ্য উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রমবর্ধমান কংক্রিটের শহরে ছাদে গাছপালা থাকলে বাড়ির পরিবেশ সবুজ ও সুন্দর হয়। গাছপালা ছাদকে তুলনামূলকভাবে শীতল রাখতে সহায়তা করতে পারে এবং নগরের সবুজায়নেও ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে গাছের পরিচর্যা মানুষের অবসর সময়কে আনন্দময় করে এবং মানসিক প্রশান্তিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।   তবে ছাদবাগানের বিস্তার ঘটাতে হলে প্রথমে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ তৈরি করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ছাদবাগান বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। কীভাবে কম জায়গায় সহজ পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা যায়, কীভাবে নিরাপদ সার ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনা করা যায় এবং কীভাবে ছাদের পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা যায়—এসব বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কম দামে বীজ, চারা, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করা হলে সাধারণ মানুষ আরও উৎসাহিত হবে।   পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে পরিকল্পিতভাবে বাগান করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিতে পারে। সফল ছাদবাগানিদের পুরস্কার ও স্বীকৃতি দেয়া এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সফল উদ্যোগগুলো তুলে ধরাও মানুষের আগ্রহ বাড়াতে পারে।   নিরাপদ খাদ্য, পারিবারিক সাশ্রয়, নগর সবুজায়ন এবং সুন্দর জীবনযাপনের জন্য ছাদবাগানের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। তাই ছাদবাগানকে শুধু শখ হিসেবে না দেখে নগর কৃষির একটি কার্যকর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাড়ির সামান্য খালি ছাদকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন পরিবারের জন্য তাজা খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব, অন্যদিকে তেমনি শহরের সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখা যায়। এখন প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতার মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করা।  

নুসরাত জাহান নাফশী নুসরাত জাহান নাফশী অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
চীনের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ ও আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিপ্লবের সংকট : একটি মার্কসবাদী-লেনিনবাদী মূল্যায়ন

বর্তমান বিশ্ব-ভূরাজনীতিতে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবস্থান অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে। মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, আজ তার শাসনদণ্ডে আসীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)। অথচ একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল নির্যাস থেকে এই পার্টির দূরত্ব আকাশচুম্বী। যে রাষ্ট্রকে একসময় বৈশ্বিক শোষিত মানুষের আলোকবর্তিকা মনে করা হতো, তা আজ আন্তর্জাতিক সর্বহারা আন্দোলন এবং বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে প্রায় সম্পূর্ণ নির্বিকার।   মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এবং লেনিনীয়  তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আধুনিক চীন আর কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এক নতুন রূপ, যা নিজের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে বিশ্ব পুঁজিবাদের পরিকাঠামোকেই টিকিয়ে রাখছে এবং শক্তিশালী করছে।   মার্কসীয় তত্ত্বের মূল ভিত্তি হলো উৎপাদন সম্পর্কের পরিবর্তন এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের ওপর শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক মডেল, যাকে তারা ‘চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র’ বলে দাবি করে, তা মূলত পুঁজিবাদেরই একটি পরিমার্জিত রূপ। ডেন জিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে চীন বিশ্ববাজারের জন্য সস্তা শ্রমের কারখানায় পরিণত হয়েছে। বহুজাতিক পুঁজির অবাধ প্রবেশ এবং দেশীয় পুঁজিবাদের বিকাশের ফলে সেখানে উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাতের প্রক্রিয়াটি পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বের মতোই নির্মম। একটি নামমাত্র কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে সেখানে কোটিপতির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ শ্রমিকরা তীব্র শোষণ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। মার্কস ও এঙ্গেলসের ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর মূল বাণী ছিল বুর্জোয়া শ্রেণির উচ্ছেদ এবং সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। অথচ আধুনিক চীনে বুর্জোয়া শ্রেণিকে পার্টির সদস্যপদ দিয়ে শাসনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করা হয়েছে, যা লেনিনীয় পার্টি কাঠামোর সম্পূর্ণ লঙ্ঘন।   লেনিনের কালজয়ী গ্রন্থ ‘সাম্রাজ্যবাদ : পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’-এর মানদণ্ডে চীনের বর্তমান আন্তর্জাতিক ভূমিকা বিচার করা অপরিহার্য। লেনিন দেখিয়েছিলেন কীভাবে পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ দেশকে উদ্বৃত্ত পুঁজি রপ্তানির দিকে ঠেলে দেয়, যা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের জন্ম দেয়। চীনের বর্তমান ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পটিকে এই লেনিনীয় তত্ত্বের আলোকেই বুঝতে হবে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনুন্নত দেশগুলোতে চীন যে বিশাল অঙ্কের ঋণ ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করছে, তার মূল উদ্দেশ্য বৈশ্বিক শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি বা সমাজতান্ত্রিক সংহতি নয়। বরং এর লক্ষ্য হলো নিজের উদ্বৃত্ত পুঁজির বিনিয়োগ ক্ষেত্র তৈরি করা, কাঁচামালের উৎস নিশ্চিত করা এবং নতুন বাজার দখল করা। ঋণফাঁদের এই কূটনীতি মূলত নব্য-সাম্রাজ্যবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ, যা শোষিত দেশগুলোর শ্রমিক ও কৃষক শ্রেণিকে পুঁজির নতুন এক আন্তর্জাতিক জাঁতাকলে পিষ্ট করছে।   আন্তর্জাতিক কমিউনিজমের স্বার্থের প্রতি চীনের এই চরম উদাসীনতা ও নির্বিকার ভাব কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া নীতির যৌক্তিক পরিণতি। মার্কসবাদ স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করে যে, শ্রমিকের কোনো দেশ নেই এবং মুক্তি কেবল আন্তর্জাতিক বিপ্লবের মাধ্যমেই সম্ভব। লেনিনও তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল গঠনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সর্বহারা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান চীনা নেতৃত্ব বিশ্বজুড়ে কোনো সমাজতান্ত্রিক বা প্রগতিশীল আন্দোলনকে সমর্থন করা তো দূরের কথা, বরং অনেক দেশে প্রতিক্রিয়াশীল ও নিপীড়ক পুঁজিপতি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। যেখানেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে চীনের স্বার্থের সংঘাত ঘটছে, সেখানে চীন কোনো বিকল্প সমাজতান্ত্রিক আদর্শ তুলে ধরছে না, বরং অন্য একটি পুঁজিপতি শক্তি হিসেবে নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটি স্পষ্টতই আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতিকে বিসর্জন দিয়ে সংকীর্ণ বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের চর্চা।   শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থের চেয়ে চীনের কাছে আজ বড় হয়ে উঠেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং বৈশ্বিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা। চীন আজ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের প্রধান চালিকাশক্তি এবং মার্কিন ও ইউরোপীয় পুঁজির প্রধান অংশীদার। ফলে বিশ্ব পুঁজিবাদের যেকোনো সংকট চীনের নিজস্ব অর্থনীতিকে নাড়া দেয়। এই আন্তঃনির্ভরশীলতার কারণে চীন কখনোই বিশ্ব পুঁজিবাদের পতন চায় না, বরং এই ব্যবস্থার সংস্কার করে সেখানে নিজের অংশীদারিত্ব ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। শোষিত মানুষের বৈপ্লবিক চেতনাকে জাগ্রত করার পরিবর্তে চীন তাদের শান্ত রাখার এবং বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরেই মানিয়ে নেয়ার বার্তা দেয়। এটি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিপ্লবী সারবত্তাকে হরণ করে তাকে একটি নির্জীব, সংশোধনবাদী তত্ত্বে রূপান্তর করার শামিল।   পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্বে চীন যে ক্ষমতার প্রদর্শন করছে, তা সর্বহারা শ্রেণির ক্ষমতা নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন পুঁজির ক্ষমতা। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি এখন সর্বহারা শ্রেণির অগ্রগামী দল নয়, বরং তা রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র ও উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছে।   বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ যখন মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও করপোরেট শোষণে জর্জরিত, তখন চীনের মতো একটি বিশাল শক্তির এই নির্বিকার ও সুবিধাবাদী ভূমিকা আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য এক বড় ধাক্কা। মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এই সত্যকে উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি যে, লাল পতাকার আড়ালে লুকানো এই রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ কোনোভাবেই বিশ্ব মুক্তিকামী মানুষের বন্ধু হতে পারে না। সত্যিকারের সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে বৈশ্বিক সর্বহারা শ্রেণিকে চীনের এই সংশোধনবাদী ও নব্য-সাম্রাজ্যবাদী রূপকে চিনে নিয়েই নতুন করে বিপ্লবের পথ অন্বেষণ করতে হবে।  

বিধান চন্দ্র সান্যাল বিধান চন্দ্র সান্যাল অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
মানবতার সংকট : সভ্যতার বড় চ্যালেঞ্জ

মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে যে গুণটি সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেয়, তা হলো মানবতা। মানবতা কেবল দয়া বা সহানুভূতি নয়; বরং এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধার সমন্বয়। এই মানবিক মূল্যবোধই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো বর্তমান সময়ে সেই মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোর উন্নয়নের দৌড়ে এগিয়ে গেলেও মানবতার জায়গাটি অনেক ক্ষেত্রে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। ফলে মানবতার সংকট আজ সভ্যতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।   সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার বদলে অনেকেই দাঁড়িয়ে শুধু ভিডিও ধারণ করে। বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। শুধু তা-ই নয়, বড় শহরগুলোতে অভাবী মানুষের প্রতি উদাসীনতা, বৃদ্ধ বা অসহায়দের অবহেলা—এসব ঘটনা মানবতার অবক্ষয়কে প্রকাশ করছে।  এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত উদাসীনতার পরিচয় দেয় না, বরং আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বের সংকটও প্রমাণ করে।   মানবতার সংকটের আরেকটি কারণ হলো সামাজিক বৈষম্য, প্রতিযোগিতা ও স্বার্থপর জীবনযাত্রা। মানুষ এখন নিজের স্বার্থ রক্ষায় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে অন্যের কষ্ট বা দুর্দশার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। বড় শহরের চাকরি প্রতিযোগিতা, ধনী-গরিবের পার্থক্য, ক্ষমতার লোভ—এসব সামাজিক বাস্তবতা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা এবং নৈতিক বোধকে ক্রমেই ক্ষুণ্ন করছে। অর্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেকেই মানবিক মূল্যবোধকে তুচ্ছ মনে করছে। ফলে সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।   মানবিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ—এই তিনটি স্তরে শিক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ভালো ফলাফল বা চাকরি নিশ্চিত করাকেই লক্ষ্যবস্তু করে ফেলেছে। ফলে শিক্ষিত হওয়া মানেই মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হওয়া নয়। পরিবারেও শিশুদের নৈতিক শিক্ষা কম, আবেগ ও সহমর্মিতা গড়ে তোলার পরিবেশ সীমিত। এই শিক্ষা ও পরিবেশের ঘাটতি সমাজে মানবতার সংকটকে আরও তীব্র করছে।   মানবিক অবক্ষয় শুধু ব্যক্তিগত আচরণে নয়; এটি গুরুতর সামাজিক অপরাধের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ধর্ষণ, মাদকাসক্তি, যৌন নিপীড়ন, শিশু শ্রম—এসব কেলেঙ্কারি এবং সামাজিক অনৈতিকতার মূল কারণের মধ্যে অন্যতম হলো মানবিকতার অভাব। ধর্ষণ কখনোই একটি মানবিক মানুষ করতে পারে না; এটি মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ। এ ছাড়া মাদকাসক্ত যুবকের সংখ্যা বৃদ্ধি, অপরাধ প্রবণতা ও সামাজিক অশান্তির পেছনেও মানবিক সংবেদনশীলতার অভাব দায়ী।   মানবতার সংকট মোকাবেলায় সমাজের প্রতিটি স্তরের দায়িত্ব অপরিহার্য। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিশুকাল থেকেই শিশুদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা জরুরি। সমাজে সচেতন উদাহরণ ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে, যাতে মানুষ মানবিক আচরণের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারে।   একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের জন্য মানবতার বিকল্প নেই। মানবতা থাকলে সমাজে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি পায়, সহযোগিতা শক্তিশালী হয়, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। সভ্যতার প্রকৃত অগ্রগতি কেবল প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক উন্নয়নে নয়; বরং মানুষের হৃদয়ে মানবতার বিকাশে নিহিত। তাই মানবতার আলোকে জাগ্রত রাখা আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। মানবতা বেঁচে থাকলে তবেই সভ্যতা সত্যিকার অর্থে টিকে থাকবে।  

মো. আমিনুর রহমান মো. আমিনুর রহমান সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0
নীরব মহামারি আত্মহত্যা প্রতিরোধে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ

সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে এই দিনে আত্মহত্যার মতো বেদনাদায়ক পথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য সংগঠনগুলো সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করে। চলতি বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য—‘একত্রে আমরা আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারি’ (আমরা পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারি)।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় প্রাণ হারান। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ নিজেদের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা আর্থিক শ্রেণির সমস্যা নয়; উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল—সব সমাজেই এই নীরব ব্যাধি চেপে বসেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও ছবিটা স্বস্তিদায়ক নয়। তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।​   মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কেউ হঠাৎ করে আত্মহত্যা করেন না। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তিনি কোনো না কোনোভাবে তাঁর অসহায়ত্ব ও মানসিক কষ্টের ইঙ্গিত দেন। অথচ আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কুসংস্কারের কারণে মানসিক সমস্যাকে এখনো ‘পাগলামি’ বলে ছোট করা হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের কষ্টের কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করার সাহস পান না। বিষণ্ণতা কিংবা মানসিক উদ্বেগকে চিকিৎসাযোগ্য রোগ হিসেবে মেনে না নেয়াটাই এ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।   ​আত্মহত্যা রোধে কেবল আনুষ্ঠানিক চিকিৎসাসেবা যথেষ্ট নয়; দরকার পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ বাড়ানো, তরুণদের মানসিক চাহিদাকে গুরুত্ব দেয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। আসুন, অবহেলা বন্ধ করি, পরিচিত কারোর ব্যবহারে অস্বাভাবিক হতাশা বা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। আপনার একটি সহানুভূতিশীল কান ও সহমর্মিতার হাত হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে একটি অমূল্য প্রাণ।    

মো: রনি চৌধুরী মো: রনি চৌধুরী সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
বিশ্ব শিক্ষক দিবস : দায়িত্ব, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষার প্রসার, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই দিনটি মূলত সেই সত্যটিকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।   একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও স্বপ্ন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন চিকিৎসক মানুষের শরীর সুস্থ করেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন; আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষকে, যে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য সব দায়িত্ব পালন করবে। তাই শিক্ষকের অবদানকে কোনো নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা বা পদমর্যাদার মাপকাঠিতে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে এবং নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে দৃশ্যমান অগ্রগতি। প্রযুক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে। তবে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয় না। মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর মূল্যায়ন, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ কম পাচ্ছে। মুখস্থনির্ভরতা, অতিরিক্ত গাইডনির্ভরতা, কোচিং-নির্ভরতা এবং ফলাফলকেন্দ্রিক মানসিকতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে। ফলে শিক্ষাকে শুধু ভালো ফল অর্জনের মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।   শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলেন। তিনি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করেন, সম্ভাবনাকে বিকশিত করেন এবং ব্যর্থতার পরও নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেন।   আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাঁদের যথাযথভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত। তবে এ দায়িত্ব পালন করতে হলে শিক্ষককেও হতে হবে দক্ষ, আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রযুক্তিবান্ধব, নৈতিক ও মানবিক। শিক্ষককে যদি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও মূল্যায়ন কৌশল সম্পর্কে দক্ষ করে তোলা যায়, তাহলে শ্রেণিকক্ষ আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠবে। আমাদের সমাজে শিক্ষককে ঐতিহাসিকভাবেই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। ‘শিক্ষক জাতির বিবেক’—এই কথাটি আমাদের সামাজিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই সামাজিক মর্যাদার অনেক সময় অসামঞ্জস্য দেখা যায়।   একদিকে শিক্ষককে জাতি গঠনের প্রধান কারিগর বলা হয়, অন্যদিকে অনেক শিক্ষককে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক কাজ, অতিরিক্ত দায়িত্ব ও নানা সামাজিক চাপ সামলাতে হয়। এতে শিক্ষকতার মূল কাজ—শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীকে সময় দেয়া—ব্যাহত হতে পারে। শিক্ষকের মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, নীতিনির্ধারণ, কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও সামাজিক আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষক যেন সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারেন—এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। শিক্ষক যদি আর্থিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে তার পেশাগত মনোযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো নানা ধরনের আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কাজের চাপ, সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্বের মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য প্রয়োজন। শিক্ষকের সম্মানী শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়; এটি শিক্ষার মানে বিনিয়োগ। একটি ভালো শ্রেণিকক্ষ শুধু বেঞ্চ, চেয়ার, বোর্ড ও ভবনের সমষ্টি নয়। সেখানে থাকতে হবে নিরাপদ, আনন্দময়, প্রশ্নবান্ধব ও বৈষম্যহীন পরিবেশ। শিক্ষার্থী যেন ভুল করতে ভয় না পায়, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ না করে এবং নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ পায়—এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একইভাবে শিক্ষককেও এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন।   প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ও ভাষা-ল্যাব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ শিক্ষার পরিবেশকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে প্রযুক্তি কখনো শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের সহায়ক শক্তি। শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি শিক্ষকের দায়িত্বের কথাও বলতে হবে। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হলেও এটি একই সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব। শিক্ষককে সময়নিষ্ঠ হতে হবে, নিয়মিত পাঠ প্রস্তুতি নিতে হবে, শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষককে শুধু বইয়ের জ্ঞান জানলেই চলবে না। তাঁকে জানতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, মানসিক স্বাস্থ্য, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পরিবর্তিত কর্মজগতের প্রয়োজনীয়তা। শিক্ষকদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তাঁরা চান সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন-ভাতা, পেশাগত নিরাপত্তা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ এবং সামাজিক মর্যাদা। তাঁরা চান না যে শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা হোক। একজন শিক্ষার্থী কতটা ভালো মানুষ হলো, কতটা যুক্তিবাদী হলো, কতটা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠল—এসবও শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হোক। একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় কোনো পদোন্নতি, পুরস্কার বা আর্থিক সুবিধা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—একদিন তাঁর কোনো শিক্ষার্থী এসে বলবে, “স্যার, আপনার কথা আমি আজও মনে রেখেছি।”   একজন শিক্ষক যখন দেখেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাজের জন্য কাজ করছে, মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে—তখন সেই আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনো অর্জনের তুলনা চলে না। তবে এই মানসিক প্রাপ্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও প্রয়োজন। ভালো কাজের জন্য শিক্ষককে সম্মাননা, গবেষণার সুযোগ, পেশাগত উন্নয়ন এবং নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষকতা আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার শিক্ষার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য জানলেই হবে না; তাকে হতে হবে সমস্যা সমাধানকারী, সৃজনশীল, যোগাযোগে দক্ষ, প্রযুক্তিবান্ধব এবং নৈতিকভাবে সচেতন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবেন শিক্ষক। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে শুধু ‘বিষয়ের শিক্ষক’ নয়, বরং শিক্ষার্থীর মেন্টর, পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুস্পষ্ট পথ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর একটি দিন নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। শিক্ষককে সম্মান করতে হলে শুধু কথায় নয়, কাজে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা বাড়াতে হবে, কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে, ন্যায্য সম্মানি নিশ্চিত করতে হবে এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে—তাঁরা শুধু একটি চাকরি করছেন না; তাঁরা একটি প্রজন্ম নির্মাণ করছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—শিক্ষককে শুধু সম্মান নয়, সম্মানজনক অবস্থান দিতে হবে; শুধু প্রত্যাশা নয়, প্রয়োজনীয় সুযোগও দিতে হবে; শুধু দায়িত্ব নয়, দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই শিক্ষক দিবসের উদযাপন হবে অর্থবহ, আর শিক্ষার ভবিষ্যৎ হবে আরও আলোকিত।   

মোঃ নুরুল ইসলাম নিলয় মোঃ নুরুল ইসলাম নিলয় অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0
প্রকৃতির ভারসাম্যে টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ : ইআইএর ভূমিকা

  বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে আমাদের শহর, যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চল, আবাসন ও জীবনযাত্রা। একের পর এক সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও নগর অবকাঠামো আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এই অগ্রগতি প্রয়োজনীয়, কারণ উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু উন্নয়নের এই যাত্রার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে মাটি, পানি, নদী, বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর আমাদের জীবন দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।   পরিবেশকে ধ্বংস করে উন্নয়ন অথবা উন্নয়ন থামিয়ে পরিবেশ রক্ষা — এই চিরন্তন দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন দর্শন, যেখানে অর্থনীতি এগোবে, মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং একই সঙ্গে প্রকৃতিও তার প্রয়োজনীয় জায়গা পাবে। একটি রাস্তা নির্মাণের পর যদি বর্ষায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, একটি শিল্পকারখানার বর্জ্যপানি যদি নদী বা খালকে দূষিত করে, কিংবা একটি শহর গড়ে উঠতে গিয়ে প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফলের পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত দায়ও তৈরি হয়। সেই দায় শেষ পর্যন্ত আমাদের সমাজকেই বহন করতে হয়।   এ কারণে পরিবেশকে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ের একটি আনুষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকল্পের ধারণা ও পরিকল্পনার শুরু থেকেই পরিবেশকে বিবেচনায় নিতে হয়। প্রকল্প কোথায় হবে, কীভাবে হবে, কতটুকু জমি ব্যবহার করবে, পানি ও জ্বালানি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, বর্জ্য কোথায় যাবে, স্থানীয় মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি কী হতে পারে, এসব বিষয় প্রকল্পের ধারণা ও পরিকল্পনার শুরু থেকেই বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এ জায়গাতেই পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের (ইআইএ) গুরুত্ব। এতে শুধু পরিবেশ রক্ষা হয় না; প্রকল্পের স্থায়িত্ব, কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়ে।   প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ইআইএ কোনো প্রকল্পকে থামানোর হাতিয়ার নয়; বরং প্রকল্পকে আরও ভালোভাবে করার একটি সুযোগ। একটি নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্ষার পানি কোথা দিয়ে যাবে, কোথায় জলাবদ্ধতা হতে পারে, কৃষিজমি ও জলাশয়ের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং স্থানীয় মানুষের চলাচল কীভাবে বজায় থাকবে — এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে একটি শিল্পপ্রকল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্যপানি শোধন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, কঠিন ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে শুধু পরিকল্পনা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়নই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। নির্মাণকাজে ধুলা, শব্দ ও কম্পন নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক ও জ্বালানির নিরাপদ সংরক্ষণ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (EMP) তাই কেবল প্রতিবেদনের একটি অধ্যায় নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকর নির্দেশিকা। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যত বেশি সমন্বয় থাকবে, উন্নয়ন তত বেশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হবে।     বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ইআইএর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নতুন অবকাঠামোকে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের উপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি। জলবায়ু সহনশীলতা এখন টেকসই অবকাঠামোর অন্যতম মৌলিক শর্ত। ইআইএর মাধ্যমে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি চিহ্নিত করে অবকাঠামোর নকশা, পানি নিষ্কাশন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নির্মাণসামগ্রী নির্বাচন ও জরুরি প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব।   দ্রুত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের শহরগুলোতে খাল, জলাভূমি ও পানি ধারণের প্রাকৃতিক স্থান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, বাড়ছে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি। এর সমাধান শুধু বড় ড্রেন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পানি প্রবাহ, পানি ধারণ ও পানি নিষ্কাশনের পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। ইআইএর মাধ্যমে প্রকল্পের নকশা ও নিষ্কাশন পরিকল্পনার পর্যায়েই সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিত করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে নতুন কংক্রিট অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে একটি খাল, জলাভূমি বা প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণই অধিক কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে।   শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও পরিবেশকে ব্যয় হিসেবে নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কম পানি ও জ্বালানি ব্যবহার, কম বর্জ্য উৎপাদন, wastewater treatment, emission control, cleaner production এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ একটি আধুনিক শিল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ইআইএর মাধ্যমে এসব বিষয়কে শুধু compliance requirement হিসেবে নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি resource efficiency ও operational sustainability এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পরিবেশগত দক্ষতা বাড়লে দূষণ কমার পাশাপাশি সম্পদের অপচয় কমতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও বাড়তে পারে।   ইআইএর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো stakeholder engagement। একটি এলাকার স্থানীয় মানুষ অনেক সময় এমন তথ্য জানেন, যা শুধু technical survey থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। কোন খাল বর্ষায় সক্রিয় থাকে, কোথায় পানি জমে, কোন রাস্তা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, কোন জলাশয় স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, এসব তথ্য প্রকল্পের বাস্তব ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই meaningful stakeholder engagement শুধু অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি ইআইএকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও স্থানীয় প্রেক্ষাপটসম্মত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।   তবে সব পরিবেশগত প্রভাব সব সময় পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্ভাব্য প্রভাবগুলো আগে থেকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ইআইএর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ পায়, প্রভাব শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে mitigation, monitoring, stakeholder engagement এবং corrective action পর্যন্ত। ফলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা একটি বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম না হয়ে প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রের অংশ হয়ে ওঠে।   সবশেষে, একটি প্রকল্পকে শুধু নির্মাণ শেষ হওয়ার দিন দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় বহু বছর পরে যখন অবকাঠামোটি কার্যকর থাকে, স্থানীয় পরিবেশ নিরাপদ থাকে, মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত হয় এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যেও প্রকল্পটি টিকে থাকে। তাই পরিকল্পনা থেকে নকশা, নির্মাণ থেকে পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত পুরো জীবনচক্রেই পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইআইএর প্রকৃত মূল্য এখানেই; এটি উন্নয়নকে থামায় না বরং উন্নয়নকে আরও সচেতন, দূরদর্শী এবং দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ তৈরি করে।   বাংলাদেশের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে; এখন প্রয়োজন সেই উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেয়া। এমন উন্নয়ন, যেখানে সড়ক হবে কিন্তু পানি চলাচলের পথ বন্ধ হবে না; শিল্প হবে কিন্তু নদী দূষিত হবে না; শহর বড় হবে কিন্তু জলাভূমি হারিয়ে যাবে না; নতুন অবকাঠামো হবে কিন্তু সামান্য বন্যা বা তাপপ্রবাহেই অচল হয়ে পড়বে না। ইআইএর মতো বৈজ্ঞানিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া সেই উন্নয়নের পথকে আরও টেকসই, দূরদর্শী ও পরিবেশসম্মত করে তুলতে পারে।   উন্নয়ন হোক, তবে প্রকৃতির হাত ধরে। কারণ নদী, খাল, জলাভূমি, বন, মাটি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্য উন্নয়নের পথে কোনো বাধা নয়। এগুলোই আমাদের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে উন্নয়ন এগিয়ে চলে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন আগামী দিনের বোঝা না হয় বরং ইআইএর মাধ্যমে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ, জলবায়ু সহনশীল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশের ভিত্তি ভিত্তি গড়ে তোলে।  

হৃদয় হাসান হৃদয় হাসান অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
ছবি : বিবিসির সৌজন্যে
মুয়াম্মার গাদ্দাফি : শাসন, ষড়যন্ত্র ও পতন

লিবিয়ার সির্ত শহরের নিকটবর্তী এক কৃষক-বেদুইন পরিবারে ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। অন্য শিশুদের নিয়ে তিনিও তাঁর নিজ গ্রামে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষালাভ করেন। সাবহার প্রিপারেটরি স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা ও ইউনিভার্সিটি অব লিবিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি বেনগাজির সামরিক একাডেমিতে যোগদান করেন।   সময়টি ছিল ১৯৬০-এর দশক, যখন রাজতান্ত্রিকভাবে লিবিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল রাজা ইদ্রিস আল-সেনুসি। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় আশির কাছাকাছি। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি তুরস্কে অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাষ্ট্রের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন ক্রাউন প্রিন্স হাসান আল-রিদা আল-মাহদি আস-সেনুসি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও তাঁর কিছু সহযোগী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধমে রাজা ইদ্রিস আল-সেনুসিকে উৎখাত করেন। এর পেছনে কারণ ছিল গাদ্দাফি রাজতন্ত্রের ঘোরবিরোধী ছিলেন এবং ইদ্রিসের পশ্চিমাপন্থী নীতির বিরোধিতা করতেন। লিবিয়ায় তখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ছিল এবং আরব জাতীয়তাবাদী মহলে ইদ্রিস সরকারের পশ্চিমাপন্থী অবস্থান নিয়ে সমালোচনা ছিল।   এদিকে গাদ্দাফি কোনো রকম প্রতিরোধ-রক্তপাত ব্যতিরেকেই ক্ষমতা দখল করেন এবং রাজতন্ত্র বিলুপ্তির ঘোষণা করে লিবিয়ান আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষমতা দখলের পর তিনি আমেরিকান ও ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলোকে বিতাড়িত করেন এবং তেল সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করেন। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন নির্মাণের মাধ্যমে সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। ইসলামি ও সমাজতান্ত্রিক ধারণার সমন্বয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের প্রচার করেন। এর অংশ হিসেবে মদ্যপান, নাইট ক্লাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং কিছু খ্রিস্টান গির্জা বন্ধ করে দেন।   তিনি আরব দেশগুলোকে সমন্বিত শক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করেন। সাম্রাজ্যবাদ ও যায়নবাদ-বিরোধিতা এবং ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে পশ্চিমাদের সঙ্গে তাঁর বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৯৭০ সালে তিনি ইসরায়েলবিরোধী মুজাহিদদের অর্থায়নের জন্য ‘জিহাদ ফান্ড’ চালু করেন এবং প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করেন। এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি লিবিয়ার সমর্থন এবং পরবর্তী সময়ে কথিত সন্ত্রাসবাদে লিবিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ লিবিয়ার ওপর বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।   পশ্চিমা ও ন্যাটোর পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিবিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনগাজিতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তা বড় আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয় National Transitional Council (NTC)। দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসনকে কারণ হিসেবে বিক্ষোভকারীরা উল্লেখ করে। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, গুলি ও হত্যাকাণ্ড চালান।   এদিকে কাতার, ফ্রান্স, আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ এনটিসি ও গাদ্দাফিবিরোধী বাহিনীকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে এবং ন্যাটো বিমান হামলা পরিচালনা করে।   ২০ অক্টোবর সকাল প্রায় সাড়ে আটটা বা সাড়ে নয়টার দিকে গাদ্দাফির অনুগতদের একটি বড় বহরে ন্যাটো বিমান হামলা চালায়। হামলার পর গাদ্দাফি ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী প্রাণে রক্ষা পান এবং তাঁরা একটি রাস্তার নিচের ড্রেনেজ পাইপের ভেতর আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে গাদ্দাফিবিরোধীরা তাঁকে খুঁজে পেতে সক্ষম হয় এবং তারা গাদ্দাফি ও তাঁর সহযোগীদের আটক করে। প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গাদ্দাফিকে জীবিত অবস্থায় আটক করার পর তাঁকে মারধর ও গুলিবর্ষণ করে। কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান।   বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গাদ্দাফির মরদেহ মিসরাতার একটি হিমায়িত সংরক্ষণাগারে প্রায় চার দিন জনসাধারণের দেখার জন্য রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মরুভূমির অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হয়।   প্রায় নয় মাসের আন্দোলন, বিদ্রোহ ও পশ্চিমা হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘ চার দশকের শাসনক্ষমতার। গাদ্দাফি তাঁর জীবদ্দশায় দেশ ও জাতির জন্য যে কর্মযজ্ঞ করেছেন, তা অবিস্মরণীয়। তাঁর সময়কার সামাজিক জীবনে যে স্থিতি ও শান্তি দেখা গিয়েছিল, গাদ্দাফি হত্যাকাণ্ডের পর দেড়-দশকেও তা দেখা যাওয়া তো দেখা যায়নি। ফলে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর দরিদ্রতা। পশ্চিমা ও জায়নবাদী চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে তারা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, তার মাসুল আজ পর্যন্ত তারা দিচ্ছে।  

এম সাফায়াত হোসেন এম সাফায়াত হোসেন অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি : ৫৬ বছরের পথচলা ও আগামীর প্রত্যয়

খাদ্য ঘাটতির দেশে বাড়তি উৎপাদন কীভাবে সম্ভব হলো, সে গল্প কি আমরা জানি? খাদ্য নিরাপত্তা এ দেশে চালের নিরাপত্তার সমার্থক। দিনে দুই থেকে তিনবার যে জাতির পাতে ভাত ওঠে, তার ভাতের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব যে প্রতিষ্ঠানের কাঁধে, সেটি বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)।   বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী ব্রি গত ১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি ৫৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। ১৯৭০ সালের ১ অক্টোবর ‘পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের সংসদীয় আইনে নতুন নাম পায়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভদিনে ব্রির কয়েকটি যুগান্তকারী সাফল্যের গল্প পাঠকের সামনে তুলে ধরতে এই আয়োজন।   গত সাড়ে পাঁচ দশকে ব্রির সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে চালের উৎপাদন চার গুণেরও বেশি উন্নীতকরণ। ব্রি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে দেশে মোট চালের উৎপাদন ছিল ৯.৭৭ মিলিয়ন টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০.৬৩ মিলিয়ন টনে, অর্থাৎ চালের উৎপাদন গত সাড়ে পাঁচ দশকে বেড়েছে চার গুণেরও বেশি। এই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিনগুণ, আবাদি জমি কমেছে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উন্নত জাত ও প্রযুক্তির হাত ধরে। বর্তমানে মোট উৎপাদনের ৫৩ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, ৪০ শতাংশ আমন থেকে এবং ৭ শতাংশ আউশ থেকে। কৃষকের মাঠেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। ব্রির তথ্যমতে, আউশ মৌসুমে ব্রির জাতের গ্রহণযোগ্যতা ৭৩.৩১ শতাংশ, আমনে ৫৮.৪৩ শতাংশ এবং বোরোতে ৫৭.২৯ শতাংশ। ব্রির জাত চাষ করে কৃষকের ফলন ৪০ শতাংশ এবং আয় ৮৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।   দেশি জাতের স্বল্প ফলন থেকে ব্রি উদ্ভাবিত উফশী জাত বৈচিত্র্যে এসেছে এই কাঙিক্ষত সমাধান। ব্রি এ পর্যন্ত ১২৭টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে ১১৭টি ইনব্রিড ও ১০টি হাইব্রিড। এর মধ্যে জলবায়ুর ঘাতসহনশীল ৪০টি, পুষ্টিসমৃদ্ধ ৩০টি, সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের ১৪টি, জিংক সমৃদ্ধ ৭টি, স্বল্প গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের লো-জিআই চাল ৪টি এবং রোগ প্রতিরোধী ২টি। ব্রি উদ্ভাবিত ২৩টি জাত ১৪টি দেশে চাষ হচ্ছে, যা দেশের গবেষণার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।   ব্রি উদ্ভাবিত কয়েকটি জাত দেশের কৃষির চেহারা বদলে দিয়েছে। বিআর৩ ও বিআর১১, ৪৯, ৮৭, ১০৩ আমনে এবং ব্রি ধান২৮, ২৯, ৮৮, ৮৯, ৯২,১০২,১০৮ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৮ বোরোতে দশকের পর দশক ধরে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রেখেছে। উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা মোকাবেলায় আগাম পাকা ব্রি ধান৩৩ গরিব চাষির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ড্রাম সিডার দিয়ে সরাসরি বপন করলে এটি ১০০ দিনের মধ্যেই পাকে, যা মঙ্গা দূরীকরণে জাদুর কাঠি হিসেবে কাজ করেছে।   সাম্প্রতিক জাতগুলোতেও বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। ব্রি ধান১১৪ ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী। ব্রি ধান১১৫ ভিটামিন-ই ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ। ব্রি ধান১১৬ গড়ে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দেয়। লবণসহিষ্ণু ব্রি ধান১১৭ উপকূলে হেক্টরপ্রতি ৮.৬ টন ফলন দিতে পারে এবং সম্পূর্ণ জীবনচক্রে ১০ ডিএস/মি. লবণাক্ততা সহ্য করে। হাওরাঞ্চলের জন্য ঠান্ডাসহিষ্ণু ও আগাম জাত ব্রি ধান১১৮ উদ্ভাবিত হয়েছে। এ বছর আগাম বন্যায় প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই জাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হাইব্রিডের মধ্যে ব্রি হাইব্রিড ধান৮ হেক্টরপ্রতি ১০.৫ থেকে ১১ টন এবং লবণসহিষ্ণু ব্রি হাইব্রিড ধান১০ অনুকূল পরিবেশে ৯.৭ থেকে ১০.৭ টন ফলন দিতে সক্ষম।   ব্রি এখন ধানের জাত উদ্ভাবনে প্রজনন কর্মসূচিতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ৩২টি টার্গেট প্রোডাক্ট প্রোফাইল তৈরি হয়েছে এবং প্রজনন চক্র সাড়ে তিন থেকে চার বছর কমানো হয়েছে। প্রায় ৪ হাজার জেনোটাইপের পূর্ণ জিনোম ফিঙ্গারপ্রিন্টিং সম্পন্ন হয়েছে। ৪ লাখেরও বেশি ফিক্সড লাইন উদ্ভাবিত হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ জাতের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করবে।   সম্পদ সাশ্রয় ও পরিবেশ রক্ষায়ও সরাসরি বপন পদ্ধতিতে (ডিএসআর) জলমগ্ন পদ্ধতির তুলনায় মিথেন নির্গমন ৩৪ শতাংশ হ্রাস করছে। যদিও ধান চাষে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের চেয়ে প্রশমন হয় বেশি। ব্রির দানাদার ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্রে ৩০-৩৫ শতাংশ সার সাশ্রয় হয়, ফলন ৫-১২ শতাংশ বাড়ে এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে। সেচে সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় এডব্লিউডি ব্যবস্থা কৃষকের খরচ সাশ্রয় করছে।   কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ব্রি এ পর্যন্ত ৫৪টি যন্ত্র উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বীজ বপন, রোপণ, আগাছা দমন ও মাড়াই যন্ত্র এবং কম্বাইন হারভেস্টার। বীজ বপনের পাওয়ার সিড সোয়ারের দাম প্রায় ৮০ হাজার টাকা এবং তা দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে দেশীয় কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আমদানি নির্ভরতা কমেছে। যন্ত্র উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।   ডিজিটাল সেবায়ও ব্রি এগিয়েছে অনেকখানি। মাঠের পোকামাকড় ও রোগ পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে। রয়েছে ধানের জাতের স্মার্ট প্রোফাইলিং অ্যাপ ও বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংক। ব্রির এগ্রামেট সেবা ও কল সেন্টারে জুন-জুলাই ২০২৬ সময়ে মোট ১ হাজার ৬৫৭টি কল এসেছে, যার বেশির ভাগই সহায়তা ডেস্কসংক্রান্ত। সার ব্যবস্থাপনা, রোগ ও পোকামাকড় নিয়েও কৃষকেরা প্রশ্ন করেছেন।   ভালো জাত মাঠে পৌঁছাতে চাই মানসম্পন্ন বীজ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রি ১৩০টি জাতের নিউক্লিয়াস বীজ সংরক্ষণ করেছে এবং ২৩২ টন ব্রিডার বীজ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১২৫টি সিডনেট অংশীদারকে প্রায় ২০০ টন বীজ প্রতিবছরই বিতরণ করা হচ্ছে। ধান বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে গত পাঁচ বছরে ব্রি মোট ৫১ হাজার ৪২০ জন অংশীজনকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যার মধ্যে কৃষক ৪২ হাজার ২০৪ জন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ব্রি মোট ২৯টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, জাতীয় কৃষি পুরস্কার (স্বর্ণ) এবং ব্র্যাক ব্যাংক ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ডস। ব্রির অবদান অর্থনৈতিক বিচারেও লাভজনক। ধান গবেষণায় বিনিয়োগের প্রতিদান নিয়ে পাঁচটি গবেষণা হয়েছে। সেগুলোর হিসাবে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগে ফেরত এসেছে ২৬ থেকে ৫৪ টাকা।   দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে বছরে ১.১২ শতাংশ হারে, আবাদি জমি কমছে ০.২৪ শতাংশ হারে, আর তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতি দশকে প্রায় ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্রির ভাষায়, খাদ্য নিরাপত্তা কোনো স্থায়ী অর্জন নয়, একে টেকসই করতে নিরন্তর প্রচেষ্টা দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার তাগিদও রয়েছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করার জন্য ব্রি কয়েকটি কৌশল হাতে নিয়েছে। কৃষকের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ টন ধরে দেশের চাহিদা মেটাতে অন্তত ৬.২৯ মিলিয়ন হেক্টর নিট আবাদি জমি রক্ষার কৌশল নিয়ে কাজ করছে ব্রি। ব্রির মতে, জেনেটিক গেইনের গতি বছরে অন্তত ৪৪ কেজি বা হেক্টর হারে বাড়ানো দরকার। ২০৫০ সালের মধ্যে ১.৩৮ মিলিয়ন হেক্টর পতিত জমিতে ধান চাষ করে বাড়তি ১.০৬ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি ৪.৪৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে উন্নত শস্যবিন্যাস চালু করে আরও ৪.০৪ মিলিয়ন টন বাড়তি ধান উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।   গবেষণার অগ্রাধিকারে রয়েছে স্পিড ব্রিডিং, জিনোমিক প্রেডিকশন ও হ্যাপলোটাইপভিত্তিক প্রজননের মতো আধুনিক কৌশল। এ ছাড়া রয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ও স্বাস্থ্যকর জাত, জলবায়ু সহনশীলতা, যান্ত্রিকীকরণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সম্প্রসারণ। চলমান গবেষণায় সি৪ রাইস, জিনোম এডিটিংয়ের মাধ্যমে লবণাক্ততা সহনশীলতা ও ব্লাস্ট প্রতিরোধ এবং টু-লাইন হাইব্রিড প্রজনন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। উচ্চ আয়ের জন্য মূল্য সংযোজিত ধানজাত পণ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাইস ভ্যালু চেইন গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।   দিনে দিনে প্রতিষ্ঠানটির পরিধিও বাড়ছে। বর্তমানে ১৯টি গবেষণা বিভাগ এবং সদর দপ্তরের বাইরে ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জে আরও ৬টি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬টি স্যাটেলাইট স্টেশন স্থাপনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে । এতে স্থানভিত্তিক ধানের জাত উদ্ভাবন ও কৃষকের সমস্যার সমাধান আরও সহজ হবে।   তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা না বললেই নয়। এর মধ্যে অপর্যাপ্ত জনবল, পদোন্নতি ও চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত জটিলতা, এবং গবেষণা বরাদ্দের অপ্রতুলতা উল্লেখযোগ্য। ব্রির অনুমোদিত ৩১৮টি বিজ্ঞানী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৭১ জন। যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি টাকার বিনিয়োগ বহুগুণ হয়ে ফেরে, তার গবেষণা ও জনবলে বিনিয়োগ বাড়ানোই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ৫৬ বছর আগে যে প্রতিষ্ঠান কয়েকজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টায় যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা দেশের কোটি মানুষের পাতে ভাত পৌঁছানোর নেপথ্য শক্তি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্রির সব বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কৃষককে অভিনন্দন। জলবায়ু পরিবর্তন ও জমি সংকটের যুগে ব্রির ওপর প্রত্যাশা আরও বাড়বে, আর সেই প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন সময়োপযোগী রাষ্ট্রীয় সহায়তা।   ড. এম আব্দুল মোমিন কৃষিবিদ ও কৃষি সাংবাদিক এবং ঊর্ধ্বতন যোগাযোগ কর্মকর্তা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গাজীপুর      

ড. এম আব্দুল মোমিন ড. এম আব্দুল মোমিন অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
প্রবৃত্তির টানে নয়, পবিত্রতার পথে হোক শারীরিক সম্পর্ক

মানুষের জীবনে আকর্ষণ, ভালোবাসা ও শারীরিক চাহিদার প্রবৃত্তি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু স্বাভাবিক প্রবৃত্তি থাকলেই তার প্রতিটি চাহিদা পূরণ করা বৈধ হয়ে যায় না। মানুষকে আল্লাহ বিবেক, বুদ্ধি ও নৈতিকতার বোধ দিয়েছেন। তাই প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে সঠিক পথে পরিচালনা করাই মানুষের দায়িত্ব।   ইসলাম শারীরিক চাহিদার প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করেনি। বরং বিয়ের মাধ্যমে নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্ককে মর্যাদা দিয়েছে এবং শারীরিক চাহিদার জন্য একটি দায়িত্বশীল ও পবিত্র কাঠামো নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে সেই সীমার বাইরে শারীরিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে।   লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গে কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি নারীদের বাদ দিয়ে পুরুষদের কাছে কামতৃপ্তির জন্য আসো? বরং তোমরা সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” (সুরা আল-আ’রাফ, ৭:৮১)   অন্য আয়াতে এসেছে, “তোমরা কি সৃষ্টিজগতের মানুষের মধ্য থেকে পুরুষদের কাছে গমন করো এবং তোমাদের রব তোমাদের জন্য যে স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, তাদের ছেড়ে দাও?” (সুরা আশ-শু’আরা, ২৬:১৬৫–১৬৬)   কোরআনের এসব আয়াতের আলোকে ইসলামি ফিকহে পুরুষ-পুরুষের শারীরিক চাহিদা পূরণকে বৈধ বলা হয়নি। একজন মুসলিমের জন্য তাই এ ধরনের শারীরিক চাহিদার আচরণ থেকে বিরত থাকা জরুরি। তবে এ বিষয়ে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন—মনের অনুভূতি আর ইচ্ছাকৃত কাজ এক নয়।   কোনো মানুষের মনে অনিচ্ছাকৃত কোনো আকর্ষণ বা চিন্তা আসতে পারে। এমন অনিচ্ছাকৃত অনুভূতির জন্য মানুষকে গুনাহগার বলা যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ তাঁর উম্মতের অন্তরে উদিত এমন চিন্তা ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ তারা তা কথা বা কাজে প্রকাশ না করে।” (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি নিজের ভেতরের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতার সঙ্গে সংগ্রাম করলে তাকে অপমান বা ঘৃণা করা নয়; বরং আত্মসংযম ও সংশোধনের পথে সহযোগিতা করাই মানবিক ও নৈতিক আচরণ।   দুই পুরুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, মমতা ও সহযোগিতা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। একজন বন্ধু অন্য বন্ধুর বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারে, তাকে সম্মান করতে পারে, তার প্রতি আন্তরিক হতে পারে। এসব স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্ক। কিন্তু কোনো সম্পর্ক যখন শারীরিক চাহিদা পূরণের কামনা ও আচরণের দিকে চলে যায়, তখন সেটি আর সাধারণ বন্ধুত্বের পর্যায়ে থাকে না। শরিয়তের বিধান তখন ভিন্নভাবে প্রযোজ্য হয়।   ইসলাম তাই শুধু শারীরিক চাহিদা পূরণের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করেনি; বরং তার পূর্ববর্তী বিষয়গুলোতেও সংযমের শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, “মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে।” (সুরা আন-নূর, ২৪:৩০)   সব ইচ্ছা পূরণ করাই স্বাধীনতা নয়। আধুনিক সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। মানুষ রাগ করতে পারে, কিন্তু রাগের কারণে অন্যায় করতে পারে না। ক্ষুধা লাগতে পারে, কিন্তু যা ইচ্ছা তা খাওয়া বৈধ নয়। একইভাবে শারীরিক চাহিদার আকর্ষণ থাকলেও সেই আকর্ষণের প্রতিটি দাবি পূরণ করা বৈধ হয়ে যায় না।   ইসলাম মানুষকে প্রবৃত্তিহীন করতে চায় না। বরং প্রবৃত্তিকে নৈতিকতার অধীন করতে চায়। নিজের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা দুর্বলতা নয়; বরং আত্মশক্তির পরিচয়।   স্বাস্থ্য ও সামাজিক বাস্তবতায় শারীরিক চাহিদা পূরণের আচরণে কিছু ধরনের যৌনবাহিত সংক্রমণসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকতে পারে। তাই যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। তবে ধর্মীয় আলোচনায় যাচাইহীন বা অতিরঞ্জিত চিকিৎসাবিষয়ক দাবি করা উচিত নয়। এর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের দায়িত্বও রয়েছে। তরুণদের শুধু ভয় দেখানো নয়; তাদের নৈতিকতা, আত্মসংযম, বিয়ের পবিত্রতা এবং দায়িত্বশীল জীবন সম্পর্কে সঠিক শিক্ষা দেয়া প্রয়োজন। সঠিক শিক্ষা ও সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ অনেক ভুল পথ থেকে মানুষকে দূরে রাখতে পারে।   ইসলাম কোনো হারাম কাজকে বৈধতা দেয় না। কিন্তু কোনো মানুষ ভুল করলে তাকে চিরদিনের জন্য প্রত্যাখ্যান করতেও শেখায় না। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।” (সুরা আল-বাকারা, ২:২২২) তাই কেউ ভুল পথে চলে গেলে তার সামনে তাওবা ও সংশোধনের পথ খোলা রাখতে হবে। নসিহত হতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সহমর্মিতার সঙ্গে। অপমান, উপহাস বা নির্যাতন কোনো মানুষকে সংশোধনের উত্তম পদ্ধতি নয়।   আমাদের অবস্থান তাই স্পষ্ট হওয়া দরকার—ইসলামে পুরুষ-পুরুষের শারীরিক চাহিদা পূরণ বৈধ নয়। কিন্তু এমন প্রবণতার সঙ্গে সংগ্রামরত মানুষকে অপমান বা নির্যাতন করাও ইসলামের শিক্ষা নয়।   পবিত্রতা শুধু শরীরের বিষয় নয়। পবিত্রতা চোখের, মনের, চিন্তার, আচরণের এবং চরিত্রেরও বিষয়। মানুষ তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী, যখন সে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে ন্যায় ও আল্লাহর বিধানের পথে চলতে পারে।   আল্লাহ আমাদের দৃষ্টি, মন, চরিত্র ও জীবনকে পবিত্র রাখুন এবং সব ধরনের অন্যায় থেকে হেফাজত করুন। আমিন।  

আসাদুল্লাহ সোলায়মান আসাদুল্লাহ সোলায়মান অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
পথশিশু : ঠিকানাহীন শৈশবের অসমাপ্ত সমীকরণ

শহর প্রতিদিন বড় হয়। উঁচু হয় দালান, বাড়ে গাড়ির সংখ্যা, বদলে যায় রাস্তার চেহারা। কিন্তু এই একই শহরের কোনো এক ফুটপাতের কোণে, ব্যস্ত কোনো সিগন্যালের পাশে কিংবা রেললাইনের ধারে থমকে থাকে কিছু ছোট্ট জীবন। তাদের হাতে বই নেই, কাঁধে স্কুলব্যাগ নেই, নেই নিরাপদ ঘরে ফেরার তাড়া। আছে শুধু দিন পার করার তাগিদ। তারা পথশিশু। নামের আগে কিংবা পরে পরিচয়ের যত শব্দই বসানো হোক, তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তারা এমন এক শৈশবের সন্তান, যে শৈশব তার স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।   শৈশব মানেই হওয়ার কথা পরিবার, স্কুল,খেলাধুলা, বন্ধুত্ব, গল্প, স্বপ্ন আর নিশ্চিন্ত ঘুম। অথচ পথশিশুর কাছে শৈশবের অর্থ অনেক সময় একেবারেই ভিন্ন। সকাল শুরু হয় খাবারের সন্ধানে, দিন কাটে মানুষের দয়ার অপেক্ষায়, কখনো ভিক্ষায়, কখনো ছোটখাটো কাজে, কখনো রাস্তায় পড়ে থাকা কিছু কুড়িয়ে বিক্রি করে। রাত এলে ফুটপাত, স্টেশন কিংবা কোনো পরিত্যক্ত জায়গাই হয়ে ওঠে ঘর। যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা মা-বাবা, পরিবার ও বিদ্যালয়, সে বয়সেই কারও কারও পৃথিবী হয়ে ওঠে রাস্তা।   এই রাস্তারও নিজস্ব নিয়ম আছে। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়, আগামীকাল নিশ্চিত নয়, এমনকি পরের বেলার খাবারটুকুও নিশ্চিত নয়। রাত নামলে ফুটপাতের কোনো একটি কোণ হয়তো তার ঘুমানোর জায়গা। কিন্তু সেই ঘুমে নিশ্চিন্ততা থাকে না। কখন কে তাড়িয়ে দেবে, কখন কী বিপদ আসবে, সকালে উঠে খাবার জুটবে কি না — এসব প্রশ্নের উত্তর তার জানা থাকে না। তাই পথশিশুর জীবন যেন প্রতিদিন নতুন করে লেখা একটি অসমাপ্ত সমীকরণ। এই সমীকরণে অজানা রয়ে যায় খাবার, আশ্রয়, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ। হিসাব মেলাতে মেলাতে একসময় হয়তো শৈশবটাই হারিয়ে যায়।   পথশিশু হওয়ার পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, বাবা-মায়ের অসহায়ত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব, গ্রাম থেকে শহরে এসে টিকে থাকার সংগ্রাম, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা অভিভাবকহীনতা, বিভিন্ন বাস্তবতা একটি শিশুকে ধীরে ধীরে পথের দিকে ঠেলে দেয়। কেউ পরিবারসহ রাস্তায় থাকে, কেউ পরিবারের জন্য উপার্জন করতে বের হয় আবার কেউ পরিবার থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি পথশিশুর গল্প আলাদা। কেউ হয়তো জানে না আগামীকাল কোথায় থাকবে, কেউ জানে না আজ রাতে খাবার পাবে কি না। শহরের ব্যস্ত মানুষ তাদের প্রতিদিন দেখে কিন্তু তাদের জীবনের গল্প খুব কম মানুষই জানতে চায়।   সিগন্যালে লাল আলো জ্বলে উঠলেই শহরের ব্যস্ততার মাঝখানে কয়েকটি ছোট মুখ দেখা যায়। কেউ বোতলজাত পানি হাতে গাড়ির কাছে যায়, কেউ ফুলের মালা বা একগুচ্ছ ফুল এগিয়ে দেয়, কেউ বাদামের প্যাকেট বিক্রি করে, কেউ চকলেট কিংবা ছোটখাটো জিনিস নিয়ে দাঁড়ায়। আবার কোথাও কোথাও শিশুদের হাতে দেখা যায় সিগারেটের প্যাকেট ও পান, যা তারা গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করে। কেউ পণ্য বিক্রি করে, কেউ হাত বাড়িয়ে টাকা চায়, কেউ আবার গাড়ির কাচ পরিষ্কার করে কয়েকটি টাকা পাওয়ার চেষ্টা করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের এই ছোট্ট ব্যবসা শেষ হয়ে যায়। আলো সবুজ হলে গাড়িগুলো ছুটে যায়, তারাও ছুটে যায় পরের গাড়ির দিকে। আমাদের কাছে হয়তো এটি রাস্তার স্বাভাবিক দৃশ্য কিন্তু শিশুটির কাছে এই কয়েক সেকেন্ডই তার দিনের আয়ের একটি অংশ। যে বয়সে তাকে স্কুলের টিফিনের টাকা নিয়ে ভাবার কথা সেই বয়সেই তাকে ভাবতে হয় কীভাবে আজকের খাবারের টাকা জোগাড় করবে।   একটি শিশু যখন গাড়ির কাচে টোকা দিয়ে কিছু টাকা চায়, আমরা হয়তো বিরক্ত হই। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিই, কেউ জানালা তুলে দিই, কেউ আবার সামান্য টাকা দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করি। কিন্তু খুব কম সময়ই আমরা ভাবি, শিশুটি এখানে কেন? তার আজ স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল কি না, গত রাতে সে কোথায় ঘুমিয়েছে, আজ সে কী খাবে, অথবা বড় হয়ে সে কী হতে চায় — এসব প্রশ্ন আমাদের ব্যস্ত জীবনে খুব কমই জায়গা পায়। আমরা পথশিশুকে দেখি কিন্তু তার জীবন দেখি না। তার হাতে থাকা ফুল দেখি কিন্তু ফুল বিক্রি করার প্রয়োজনটা দেখি না। তার বাড়ানো হাত দেখি কিন্তু কেন সেই হাতটি বইয়ের বদলে সাহায্যের জন্য বাড়ানো হয়েছে, সেই প্রশ্ন করি না। তার ময়লা জামা দেখি কিন্তু কেন সে সেই জামা পরে আছে, তা জানতে চাই না। এখানেই সমাজের অবহেলার সবচেয়ে কঠিন চিত্রটি দেখা যায়। সহানুভূতি হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য আসে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চিন্তা কতটা আসে?   শিক্ষা থেকে দূরত্ব পথশিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। বিদ্যালয়ের দরজা হয়তো তাদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ নয় কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ তাদের জন্য অনেক কঠিন। কারণ, ক্ষুধার সঙ্গে শিক্ষার প্রতিযোগিতায় ক্ষুধাই আগে জিতে যায়। যে শিশুর কাছে আজকের খাবার অনিশ্চিত, তার কাছে আগামী দিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি বিলাসিতার মতো মনে হতে পারে। তাই বইয়ের জায়গা নেয় কাজ, খেলার জায়গা নেয় দায়িত্ব, আর স্বপ্নের জায়গা দখল করে বেঁচে থাকার তাগিদ। একটি শিশু যখন পানি, ফুল, বাদাম, চকলেট কিংবা অন্য কোনো পণ্য বিক্রি করে দিনের বড় একটি সময় কাটায়, তখন তার পড়াশোনার জন্য সময় ও সুযোগ দুটোই সংকুচিত হয়ে আসে। একটি শিশুর হাতে যদি বইয়ের বদলে প্রতিদিন জীবিকার বোঝা তুলে দেওয়া হয়, তবে তার কাছ থেকে নিখুঁত ভবিষ্যৎ আশা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?   শিক্ষা ও নিরাপত্তা থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা শিশুর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ছোটখাটো শ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তারা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করে, যেখানে ভুল মানুষ ও ভুল পথের প্রভাব সহজেই তাদের জীবনে ঢুকে যেতে পারে। এখানেই আসে আরেকটি আশঙ্কা, অপরাধের জগতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। অপরাধী হয়ে কেউ জন্মায় না। কিন্তু একটি অনিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সমাজের দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা একটি শিশুকে অপরাধপ্রবণ পরিবেশের কাছে অসহায় করে তুলতে পারে। রাস্তায় থাকা শিশুরা কখনো কখনো মাদক, চুরি, ছিনতাই, পাচার কিংবা বিভিন্ন অপরাধচক্রের প্রলোভন ও শোষণের শিকার হতে পারে। প্রথমে হয়তো সামান্য কিছু কাজ, পরে নির্ভরতা, তারপর ধীরে ধীরে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, এভাবেই একটি শিশুর সামনে থাকা সম্ভাবনার দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার, পথশিশু মানেই অপরাধী নয়। বরং অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা একটি শিশুকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সমাজের নিজের দায়ের দিকে তাকানো প্রয়োজন। যে শিশুকে আমরা স্কুলে পৌঁছে দিতে পারিনি, নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারিনি, পরিবারকে সহায়তা করতে পারিনি, তার জীবনে ভুল মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে পারিনি, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কতটা দায়িত্বশীল ছিলাম, সেই প্রশ্নও আমাদের নিজেদের করতে হবে।   পথশিশুদের নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক উদ্যোগ দেখা যায়। কেউ খাবার দেয়, কেউ পোশাক দেয়, কেউ একদিনের জন্য আনন্দের আয়োজন করে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যাটি কি সেখানে শেষ হয়ে যায়? একবেলার খাবার একটি দিনের ক্ষুধা কমাতে পারে, একটি নতুন জামা একটি দিনের আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু একটি শিশুকে সত্যিকার অর্থে পথ থেকে বের করে আনতে প্রয়োজন আরও অনেক কিছু। প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি, মানসিক সহায়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কারণ, ক্ষুধার্ত শিশুকে খাবার দেওয়া জরুরি কিন্তু কেন সে প্রতিদিন ক্ষুধার্ত থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি। রাস্তায় ঘুমানো শিশুকে কম্বল দেওয়া মানবিক কিন্তু কেন তার ঘর নেই, সেই সমস্যার সমাধান আরও জরুরি। দয়া একটি দিনের কষ্ট কমাতে পারে কিন্তু সুযোগ পারে একটি জীবন বদলে দিতে।   আমাদের শহরের ফুটপাতগুলো শুধু ইট-পাথরের জায়গা নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতার আয়না। একদিকে কাচের ভবন, অন্যদিকে প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে রাত কাটানো শিশু। একদিকে উন্নয়নের গতি, অন্যদিকে সেই উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকা শৈশব। এই বৈপরীত্য আমাদের সময়ের একটি কঠিন সত্য। তবে একটি পথশিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো শুধু দারিদ্র্য নয়, তার সবচেয়ে বড় সংকট হতে পারে সম্ভাবনার অপচয়। যে শিশুটি হয়তো ভালো শিক্ষক হতে পারত, চিকিৎসক হতে পারত, শিল্পী হতে পারত, কিংবা কেবল একজন সৎ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকারী মানুষ হতে পারত, তার সম্ভাবনা প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়। সমাজের চোখে সে হয়তো শুধু ফুটপাতের একটি শিশু, কিন্তু তার নিজের চোখে হয়তো এখনো একটি স্বপ্ন বেঁচে আছে। সেই স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়, শুধু সরকারের নয়, শুধু কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরও নয়। এটি সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ, একটি শিশুর ঠিকানা শুধু একটি ঘর নয়। তার ঠিকানা হওয়া উচিত নিরাপত্তা, শিক্ষা, পরিবার, মর্যাদা এবং স্বপ্নের ভেতর।    

জেবিয়া নাছরিন জেবিয়া নাছরিন অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
‎শিশু নিখোঁজ ও হত্যা শুধুই সংখ্যা নয়, একটি অশনিসংকেত

‎মানবাধিকার বলতে বোঝানো হয় সেই সব অধিকারকে, যা একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হওয়া ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস অনুযায়ী মানুষের ৩০টি অধিকারের ধারা আছে, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। যেমন : স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার, কাউকে নির্যাতন না করা, কাউকে পরাধীনতার মধ্যে রাখা যাবে না ইত্যাদি। ‎ ‎সমাজ গঠন হয় পরিবার নিয়ে। আর সেই পরিবারের সূচনা হয় শিশু থেকে। শিশু সামাজিকীকরণের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করে পরিবার গড়ে তোলে এবং সমাজ, দেশ গঠনে অবদান রাখে। বাংলাদেশে বর্তমানে ১৪ বছর পর্যন্ত প্রায় ৪ কোটি ৮৬ লাখের মতো শিশু ও কিশোর আছে। তারা কোনো না কোনোভাবে মানবাধিকার সংকটে ভুগছে। ‎ ‎সম্প্রতি  অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে সারা দেশের মানুষের বিবেক স্তব্ধ হওয়ার পাশাপাশি স্তব্ধ হয়েছে মানবাধিকার। কেন এত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, আর হত্যা বেড়ে চলছে? শিশু নিখোঁজ আর হত্যা কেবল একটি সংখ্যা নয়, তা জানিয়ে দিচ্ছে শিশুরা তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।   ‎শিশুদের বিকাশ শুরু হয় ছোটবেলা থেকে। চারপাশের পরিবেশ তাদের প্রভাবিত করে। মস্তিষ্কের বিকাশ হয় প্রায় ৬ বছর পর্যন্ত। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ হওয়ার আগেই তারা নিখোঁজ হচ্ছে এবং হত্যাও হচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত ০ থেকে ৯ বছর পর্যন্ত শিশু নিখোঁজ হয়েছে ৪৭৪টি এবং ১০ থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত নিখোঁজ হয়েছে ১৫,২৪৩টি। বিভিন্ন তথ্য বলছে, নিখোঁজের পর হত্যাসহ নানা কারণে গত আট মাসে ১৫৫টির মৃত্যু হয়েছে। তাই বলা যেতে পারে, শিশু ও কিশোররা মানবাধিকারের চরম সংকটের মুখে পতিত হচ্ছে। ‎ ‎কেন এত নিখোঁজ আর হত্যা হচ্ছে এ প্রশ্ন জাগেনি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম আছে। মূলত এর পেছনে নানা রকম কারণ রয়েছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এই তিনটি দিকের সংহতি না থাকায় এমন ঘটনাপ্রবাহ প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। ‎ রাষ্ট্রের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে শিশু নিখোঁজ ও হত্যাকাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা দুর্বল নীতিমালার কারণে সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। আর তাই নীতিমালা প্রয়োজনে পরিবর্তন করে হলেও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। হত্যার সাথে জড়িতরা যদি কিশোর বয়সেরও হয়, সে ক্ষেত্রে অপরাধের নীতিমালা সংশোধন করা প্রয়োজন। কেননা তারা পূর্ণ বালক তথা ১৮ বছরের আগেই যদি হত্যার মতো কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে নাবালকদের শর্ত তারা ধারণ করে না। এভাবে কিশোর বয়স থেকে তাদের এ ঘটনাপ্রবাহ থেকে একপর্যায়ে বড় বড় অপরাধের সাথে যুক্ত হওয়ার দিকে ধাবিত হয়। মানবাধিকার তখনই নিশ্চিত হবে, যখন যেকোনো বয়সের অপরাধী হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের জন্য একই নীতিমালার অধীনে আইনের প্রক্রিয়ায় আসবে। অতীতের তুলনায় বর্তমান সময় ও পরিবেশ বিবেচনায় নীতিমালার সংশোধন করা যেতে পারে। ‎ ‎আবার শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে হারানোর পরে ১ ঘণ্টাকে বলা হয় গোল্ডেন আওয়ার। এ সময়ের মধ্যে সঠিক পদক্ষেপ না নেয়া হতে পারে অন্যতম একটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা।   ‎সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় আর প্রতিকূল পরিবেশ শিশু নিখোঁজ ও হত্যার পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে।নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ কখনো এসব কাজে জড়িত হতে পারে না। এমনকি সমাজে যখন সন্ত্রাস, মানুষের মাঝে হিংসাত্মক মনোভাব পোষণ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট ইত্যাদি থাকে, তখন এ ধরনের মানবাধিকারবিরোধী কাজে মানুষ জড়িয়ে পড়ার একটি আশঙ্কা তৈরি হয়।   পরিবারকে ধরা হয় প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিচালিত হতে হবে। সে ক্ষেত্রে পিতা-মাতাসহ সবাইকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। সাধারণ যারা ৯ বছর পর্যন্ত শিশু রয়েছে, তাদের মধ্যে নানাবিধ কারণে নিখোঁজ হলেও নিজেদের পরিচয় সঠিকভাবে বলতে না পারার কারণে পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারে না। তাই প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান থেকে শিশুরা প্রকৃত শিক্ষা পেলে অবশ্যই নিখোঁজসংক্রান্ত বিষয়টিকে সহজে সমাধান করা যেতে পারে। ‎ ‎তাহলে এই শিশু নিখোঁজ ও হত্যা রোধ করতে কার বেশি দায়িত্ব? পরিবার, সমাজ নাকি রাষ্ট্রের? প্রথমত রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে। কেননা রাষ্ট্রের আইন ও নীতিমালা কঠোর হলে শিশু হত্যার মতো ঘটনা কমে আসবে। নিখোঁজের ক্ষেত্রে যদি বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করে গোল্ডেন আওয়ারকে কাজে লাগাানো যায়, তাহলে নিখোঁজসংক্রান্ত সমস্যা সহজে সমাধান হবে। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে নিখোঁজ ব্যক্তিকে দ্রুত খুঁজে পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকে সব জায়গায় যদি এ-সংক্রান্ত পাঠ ও করণীয় বিষয়ে ধারণা দেয়া হয়, তাহলে এই মানবাধিকার লঙ্ঘনবিষয়ক ধারণা থেকে শিশু অবস্থাতেই সতর্ক থাকবে। সভা, সেমিনার, টিভিতে শিশু নিখোঁজসহ হত্যাবিষয়ক বিভিন্ন প্রামাণ্য চিত্র উপস্থাপন করা যেতে পারে। অভিভাবকদের ধাপে ধাপে এ-সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ‎ এ ক্ষেত্রে সমাজেরও দায়িত্ব আছে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মসজিদ, গির্জা, মন্দির ইত্যাদি জায়গাতে মানবাধিকার বিষয়ে সবাইকে জানাতে হবে। বিভিন্ন এনজিও ও সামাজিক সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। ভালো কাজগুলোতে মানুষকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে নৈতিকতার প্রসার ঘটাতে হবে। কিন্তু সবার আগে পরিবারকে সচেতন হতে হবে। নিজেদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের মধ্যে সম্পর্ক আরও বেশি দৃঢ় করতে হবে।মানবাধিকারের সঠিক দিকগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে, শিশু অবস্থা থেকে সেসব ধারণা তৈরি করত হবে। ‎ আমি মনে করি, এ সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের দায়িত্ব সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলেই কেবল এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব। ‎  

মো. রিমেল মো. রিমেল অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
প্রবীণ দিবসে প্রবীণের ভাবনা

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।   কবিতাটি আপাতদৃষ্টিতে রোমান্টিকতা আর বেদনা বিধুরতার অনুপম দৃষ্টান্ত হইলেও এর গুঢ় রহস্য আরও ব্যাপক। জীবনানন্দ দাশ দিনশেষে অন্ধকারে মুখোমুখি বসিয়া জীবনের সব লেনদেন শেষ করিতে চাহিয়াছিলেন। পারিয়াছিলেন কি না তাহা লইয়া গবেষণা হইতে পারে। কিন্তু আমরা যান্ত্রিক ট্রামের নিচে তাহার দেহদান চাক্ষুষ করিয়াছি। কবিতাটির এই কয়েকটি চরণ আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে স্মরণ করিয়া কিছুটা বিশ্লেষণে প্রয়াসী হইয়াছি।   প্রবীণদের লইয়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে নানাবিধ কল্যাণমুখী ও সেবাধর্মী সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ লক্ষ করা যায়। প্রবীণদের চাহিদা, তাঁহাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা লইয়া চিন্তার অনেক ক্ষেত্র উন্মোচিত হইয়াছে। আর অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশে প্রবীণদের বোঝা হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।   আমাদের মতো উন্নয়নকামী দেশগুলোতে প্রবীণদের লইয়া অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করা হইলেও এখনো অনেক কিছু করার বাকি রহিয়াছে। বৈশ্বিক গ্রামের সার্বিকতাকে মাথায় লইয়া জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে প্রবীণদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করিবার পাশাপাশি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন বিষয় লইয়া গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ইহার অনুবৃত্তিক্রমে ১৯৯১ সাল হইতে প্রতিবছরের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে দেশে দেশে পালিত হইয়া আসিতেছে।   আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্ব ব্যক্তিকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হইলেও আমাদের দেশে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিকে প্রবীণ বলিয়া ধরা হইয়া থাকে। বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছরের উপরে হওয়ায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে। সেই হিসেবে দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা প্রায় সোয়া কোটি হইতে পারে।   আমাদের দেশের প্রবীণদের সমস্যাগুলো আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কিছুটা ভিন্ন হইলেও মোটা দাগে সারা বিশ্বের প্রবীণদের সমস্যা একই রকম। ইহাদের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানসিক, পারিবারিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যাই প্রকট। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে কর্মসংস্থান একটি বড় সমস্যা। সঙ্গত কারণে প্রবীণরা ইহার অন্যতম ভুক্তভোগী। এখনকার বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি বলিয়া স্বীকৃত বাস্তবতা। সামাজিক সমস্যা আবহমানকাল হইতে জারি থাকিলেও ইদানীং ইহার নানাবিধ সাইড ইফেক্ট দেখা যাইতেছে। আগে প্রবীণরা অবসর জীবনযাপনে সামাজিক বিশেষ মর্যাদা পাইত। এই প্রাপ্তি তাঁহাদের মানসিক দৃঢ়তা জোগাইত।   এখনো যে তাঁহাদের উপযোগিতা রহিয়াছে তাহা অনুভব করিত। এখন ইহাতে যথেষ্ট ভাটা পরিলক্ষিত হইতেছে। অন্যদিকে তাঁহাদের উপযোগী সামাজিক বিনোদনের ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হইতেছে না। দিনে দিনে পরিবারের আকার ছোট হইয়া যাওয়ায় এবং অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে পরিবারের সক্ষম জনবলের উদয়াস্ত বাহিরে কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকার কারণে পরিবার মধ্যে তাঁহাদের বিনোদনের সুযোগ হইতেছে না। তাই কেবল ধর্মকর্মের মধ্যেই তাঁহাদের আত্মীক বিনোদন খুঁজিয়া লইতে হয়। মানসিক সমস্যা প্রবীণের জন্য আরেক বড় সমস্যা।   একসময় পরিবারের স্টিয়ারিং হাতে থাকিলেও প্রবীণতা তাঁহাকে অবসরের কঠিন বাস্তবতায় লইয়া যায়। তখন হঠাৎ করিয়া পরিবারের মধ্যে তাঁহার গুরুত্ব হ্রাস পাইলে মনস্তাত্ত্বিক যাতনা শুরু হয়। সমাজ তাঁহাকে উপেক্ষা করিতেছে, যথাযথ গুরুত্ব দিতেছে না বা সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখিতেছে না এই বোধ তাঁহাকে মানসিকভাবে সারাক্ষণ যন্ত্রণা দেয়। আর এইসবের সবকিছুকে ছাপাইয়া স্বাস্থ্যগত দিক তাঁহাকে পর্যুদস্ত করিয়া ফেলে।   আমাদের মতো দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রতুল না। সহজলভ্যও না। আবার তাহা যথেষ্ট ব্যয়বহুলও বটে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার গণ্ডি সম্প্রসারিত না হইলে প্রবীণের এই ভোগান্তির শেষ হইবে না।   মোটা দাগে আমাদের মতো দেশে প্রবীণদের চাহিদা খুব সীমিত। যেমন : মানসিক, সামাজিক, মনস্তাত্তিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, স্বাস্থ্যগত ও ধর্মকর্মের প্রবীণের সমস্যাগুলো হইল পরিবারে গুরুত্ব না থাকা, রাগ বৃদ্ধি পাওয়া, নালিশের প্রবণতা বৃদ্ধি, একাকিত্ব, সমাজ হইতে বিচ্ছিন্নতা, কথা বেশি বলার প্রবণতা, নিজেকে পরিবারের বোঝা মনে করা, ঘন ঘন অপমান বোধ জাগ্রত হওয়া, অবহেলার শিকার বলিয়া নিজেকে মনে করা প্রভৃতি। বিপরীতে প্রবীণের সম্ভাবনাও প্রচুর। অনেকেই হয়তো ইহাতে হাস্যরসের উপাদান খুঁজিয়া বেড়াইবেন, কিন্তু বিষয়টি এতটা হাল্কা নয়।   প্রবীণের অভিজ্ঞতা অনুজদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তাঁহাদের অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ বা যুক্তিসঙ্গত মতামত হইতে উপকৃত হইতে পারে। পরিবারের ছোট শিশুদের দেখভাল করার ক্ষেত্রে তাঁহারা আন্তরিক সেবা প্রদান করিতে পারেন। যাহা মোটা টাকার বিনিময়েও কেয়ার গিভারের নিকট হইতে আশা করা যায় না। নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রকৃষ্ট শিক্ষকের দায়িত্বও তাঁহারা পালন করিতে পারেন। ইহা ছাড়া সমাজের ও পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে পারিবারিক, সামাজিক কাইজ্যা-ফ্যাসাদ ও বিরোধ নিষ্পত্তিতেও তাঁহারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখিতে পারেন।   প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয়। যদিও বয়ষ্ক ভাতাসহ সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর পরিধি বৃদ্ধি পাইতেছে। তবু তাহা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। সরকারি-বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বিকাশমান হইলেও এই ব্যবস্থা আমাদের সমাজব্যবস্থায় সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায় নাই। এই ব্যবস্থার দুই দিকই ধারাল। বৃদ্ধাশ্রমব্যবস্থা প্রবীণদের জন্য সুখকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা হইতে পারে না।   সমাজ ও পরিবারকেই প্রবীণদের দায়িত্ব লইতে হইবে। ইহার জন্য নানাবিধ অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসেবাগত নতুন নতুন প্রণোদনা দেওয়া যাইতে পারে। বিদ্যমান সেবা সুবিধার সম্প্রসারণ করা আবশ্যক। রাষ্ট্রকে এই খাতে অতি আবশ্যিকভাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করিতে হইবে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে প্রবীণদের এই চাহিদা ন্যূনতম। সর্বোপরি, প্রবীণদের প্রতি সামাজিক মনোযোগ আরও বৃদ্ধি করিতে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি করিতে হইবে। বয়স ও পটেনশিয়ালিটি বিবেচনায় তাঁহাদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং ও কর্মক্ষেত্র তালাশ করিতে হইবে।   মোটকথা, প্রবীণবান্ধব সামাজিক একটা আবহ তৈরি করিতে হইবে। প্রবীণের স্নেহ ছায়ায়, অভিজ্ঞতাপুষ্ট দিক নির্দেশনায় কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী প্রাণের আনন্দে জাগ্রত হউক ইহাই আজকের এই দিনে সবার কাম্য। প্রবীণের প্রত্যাশাও তাই। নতুবা জীবনানন্দ দাশের মতো দিন শেষে অন্ধকার আসিলেও মুখোমুখি থাকিবে একরাশ হতাশা আর যাতনা।  

আনোয়ার হাকিম আনোয়ার হাকিম অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও বেকারত্ব সংকট : পরিবর্তনের এখনই সময়

​আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন অনতিবিলম্বে প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আমরা একসময় গভীর সাগরের অতলে হারিয়ে যাব। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা যেন কেবল গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার এক অফুরন্ত ভাণ্ডার, যার সাথে বাস্তব জীবনের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই।   ​আমাদের পাঠ্যপুস্তকে পড়ানো হয় কে প্লেন বানিয়েছে, কে গাড়ি তৈরি করেছে কিংবা কে কম্পিউটার আবিষ্কার করেছে—তাদের জীবনবৃত্তান্ত। অথচ এ তথ্যগুলো আমাদের বাস্তবিক জীবনে খুব একটা কাজে লাগে না। এর পরিবর্তে আমাদের শেখানো উচিত ছিল—কীভাবে একটি প্লেন তৈরি হয়, কীভাবে তা চালাতে হয় কিংবা কীভাবে গাড়ি বা কম্পিউটার তৈরি বা পরিচালনা করতে হয়। শুধু তা-ই নয়, প্রযুক্তির এ যুগে সেগুলোর আপডেট সংস্করণ বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কীভাবে করা সম্ভব, সেই কৌশলগুলো পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। যে শিক্ষা আমাদের জীবনের গতিধারা বাড়াতে সাহায্য করে না এবং প্রাত্যহিক জীবনে যার কোনো উপযোগিতা নেই, তা পড়িয়ে লাভ কী?   ​আমাদের প্রচলিত শিক্ষার অন্যতম বড় একটি ত্রুটি হলো, এটি পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীদের কোনো অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা বা সাপোর্ট দিতে পারে না। দীর্ঘ ২৭-২৮ বছর পড়াশোনা শেষ করে যখন একজন তরুণ সমাজের দরজায় কড়া নাড়ে, তখন সে নিজেকে সমাজের কাছে বোঝা ছাড়া আর কিছু মনে করে না। চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে গেলেই সবার আগে দুই থেকে তিন বছরের পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। প্রশ্ন জাগে, ২৭-২৮ বছর ধরে পড়াশোনা করে যদি অভিজ্ঞতা অর্জনই না হলো, তবে এ শিক্ষার সার্থকতা কোথায়?   ​শিক্ষাজীবন শেষে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুযোগ থাকে মাত্র দুই থেকে তিন বছর। এই সীমিত সময়ে একবুক আশা নিয়ে বসে থাকার পরও যখন কাঙ্ক্ষিত চাকরি মেলে না, তখন যুবকের পুরো জীবনটাই বরবাদ হয়ে যায়। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যদি এমন কিছু যুক্ত থাকত, যা দিয়ে চাকরি ছাড়াও জীবনযাপন করা সম্ভব হতো, কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি যদি কোনো নির্দিষ্ট কাজের ওপর দু-তিন বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকত, তবে পড়ালেখা শেষ করেই তরুণরা অনায়াসে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারত।   ​তাই কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন একজন শিক্ষার্থী অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে এবং চাকরির পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে নিজেই আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। শুধু তা-ই নয়, লেখাপড়া শেষ করে একজন শিক্ষার্থী যেন নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি আরও দু-চারজন বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, সেই মানসিকতা ও দক্ষতাও তার মধ্যে তৈরি করতে হবে।   ​এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিনা শর্তে ও বিনা জামানতে মাইক্রোলোন বা সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবেই যদি আমরা নীতি ও কাঠামো পরিবর্তন করে সামনে এগোতে পারি, তবে দেশ ও দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর হবে।   ​বেকারত্ব ও হতাশা কমার সাথে সাথে সমাজ থেকে অনেক বড় বড় অপরাধ দূর হয়ে যাবে। কারণ, এই বেকার যুবকেরাই একসময় চরম হতাশায় পড়ে মাদকের অন্ধকার জগতে পা বাড়ায়। পরবর্তী সময়ে মাদকের অর্থ সংগ্রহের জন্য চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি মাদকাসক্ত হয়ে মাতাল অবস্থায় খুন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধগুলোও তাদের দ্বারাই সংঘটিত হয়।   ​দেশের বেকারত্ব যত দ্রুত দূর হবে, দেশ ততই অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। সমাজ থেকে অপরাধ ও অপরাধীর সংখ্যা তখন শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। তাই রাষ্ট্র ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এখনই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।  

হাবিবুল্লাহ মোল্লা হাবিবুল্লাহ মোল্লা অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
‎‎নৈতিকতা, মানবতা ও শান্তির অনন্য আদর্শ‎ মহানবি (সা.)

‎মানবসভ্যতা আজ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সহিংসতা, বৈষম্য, অন্যায়, স্বার্থপরতা, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় সমাজজীবনে নানা সংকট তৈরি করছে। মানুষের হাতে যোগাযোগের শক্তি বেড়েছে, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ সেই অনুপাতে বাড়েনি।   সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষ মুহূর্তে একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারলেও পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহনশীলতার ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রে বিভাজন বাড়াচ্ছে। এমন বাস্তবতায় মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা মানবতার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দিশা। পবিত্র কোরআন তাঁকে ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা উত্তম আদর্শ হিসেবে উল্লেখ করেছে, “নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।” (সুরা আল-আহযাব, ৩৩:২১)‎‎‎   মহানবি (সা.)-এর চরিত্র সম্পর্কে কোরআনের মূল্যায়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সুরা আল-কলম, ৬৮:৪)। নবুয়তের আগেই মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে চিনত। তিনি অশ্লীল ও কদর্যভাষী ছিলেন না। সহিহ বুখারিতে তাঁর সুন্দর চরিত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা চরিত্রে সর্বোত্তম।” (সহিহ বুখারি, ৬০৩৫)। এতে স্পষ্ট হয়, মানুষের প্রকৃত মর্যাদা সততা, আমানতদারি ও সুন্দর আচরণে।‎‎   আল্লাহ বলেন, “আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।” (সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭)। তাঁর দয়া শুধু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রাণীর প্রতিও তিনি মমতা প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন। শিশুদের প্রতি তাঁর স্নেহ ও দয়ার কথা সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে (২৩১৮)। একটি বিড়ালকে আটকে রেখে খাবার না দেয়ার কারণে এক নারীর শাস্তির ঘটনাও হাদিসে এসেছে। তাই শিশু, বৃদ্ধ, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি সহমর্মিতা তাঁর শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।‎‎   কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহর রহমতেই মহানবি (সা.) মানুষের প্রতি কোমল ছিলেন; তিনি কঠোর হলে মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। একই আয়াতে ক্ষমা, মানুষের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা ও পরামর্শের নির্দেশ রয়েছে (সুরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি বহু নির্যাতনকারীকেও সাধারণ ক্ষমা করেন। তায়েফের কঠিন নির্যাতনের পরও তিনি তাদের ধ্বংসের বদলে হেদায়েতের প্রত্যাশা করেছিলেন। এ শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মতের অমিল মানেই শত্রুতা নয়।     শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে প্রতিবেশীর অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ বুখারিতে এসেছে, জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতেন যে মহানবি (সা.) মনে করেছিলেন, প্রতিবেশীকে হয়তো উত্তরাধিকারী করা হবে (৬০১৪)। আরও এসেছে, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, তার ইমানের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা রয়েছে (৬০১৬)। তাই প্রতিবেশীর নিরাপত্তা, অধিকার ও বিপদে সহযোগিতা সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তি।‎‎   মহানবি (সা.) পারিবারিক জীবনে ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর সন্তান ইবরাহিমকে কোলে নেয়া ও চুম্বন করার ঘটনা সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে (২৩১৬)। বিদায় হজের ভাষণেও নারীদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি যত্নশীল হওয়ার নির্দেশ পাওয়া যায় (সহিহ মুসলিম, ১২১৮)। পরিবারে নির্যাতন, অবহেলা ও অসম্মানের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা তাঁর শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।‎‎   মহানবি (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে মানুষের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানকে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় ঘোষণা করা হয় (সহিহ মুসলিম, ১৬৭৯)। এর মাধ্যমে মানবমর্যাদা ও অধিকার রক্ষার একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও আমানতদারি তাই অপরিহার্য।‎‎   একটি সমাজের মানবিকতা বোঝা যায় দুর্বল ও অসহায় মানুষের সঙ্গে তার আচরণে। মহানবি (সা.) মানুষের বংশ, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তে তাকওয়া ও চরিত্রের গুরুত্ব দিয়েছেন। অধীনস্থ মানুষের প্রতি সদাচরণ, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং সামর্থ্যের বাইরে কাজের বোঝা না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করাও তাই গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দায়িত্ব।     মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের কল্যাণের প্রতি দায়িত্ববোধ। সহিহ মুসলিমে এসেছে, যে ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের প্রতি কঠোরতা করে, তার জন্য সতর্কতা রয়েছে; আর কোমলতা ও সদাচরণের জন্য কল্যাণের দোয়া করা হয়েছে (১৮২৮)। তিনি বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকের অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে।” অর্থাৎ নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের অধিকার ও কল্যাণের দায়িত্বও।     ইসলাম বৈধভাবে সম্পদ অর্জনকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং সৎ উপার্জন, আমানতদারি, ন্যায়সংগত লেনদেন ও অসহায়ের অধিকার রক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে সুদ বাতিল এবং মানুষের সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তার কথা এসেছে (সহিহ মুসলিম, ১২১৮)। নবুয়তের আগেও মহানবি (সা.) ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘হিলফুল ফুজুল’-এ অংশ নিয়েছিলেন। প্রতারণা, দুর্নীতি ও শোষণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়ের পথে বাধা।   মহানবি (সা.)-এর জীবনে শান্তি, ন্যায় ও সহাবস্থানের বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধি, মদিনা সনদ ও মক্কা বিজয়ের সাধারণ ক্ষমা তাঁর শান্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রকৃত শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে নিরাপত্তা, অর্থনীতিতে ন্যায় এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান প্রতিষ্ঠার সমন্বিত ফল।   মহানবি (সা.)-এর জীবন শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি নৈতিক ও মানবিক জীবন গঠনের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমা, প্রতিবেশীর অধিকার, পারিবারিক মমতা, দুর্বল মানুষের প্রতি দায়িত্ব, ন্যায়বিচার, পরামর্শ ও সংযম—এসব মূল্যবোধ আজও সমাজের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান শুধু আলোচনা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবনে তাঁর শিক্ষার প্রয়োগে প্রকাশ পেতে পারে।‎‎   সর্বোপরি, মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন নৈতিকতা, মানবতা, ন্যায় ও শান্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নৈতিকতা শুধু ব্যক্তিগত গুণ নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুস্থতার ভিত্তি। তাই সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকা, মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখাই তাঁর আদর্শ অনুসরণের অন্যতম বাস্তব প্রকাশ।  

মো. জসিম উদ্দিন‎ মো. জসিম উদ্দিন‎ অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া এবং আমাদের বাস্তবতা

আইনের চোখে বিচারপূর্ব প্রত্যেক মানুষই নির্দোষ। অথচ আমাদের দেশে পেশাদার শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী কিংবা সাধারণ নাগরিকদের প্রায়ই হাতকড়া পরিয়ে জনসমক্ষে হাঁটিয়ে নেয়ার দৃশ্য নিয়মিত গণমাধ্যমে দেখা যায়, যা দৃষ্টিকটু ও চরম অপমানজনক।   ফৌজদারি কার্যবিধি বা পেনাল কোডে প্রতিটি গ্রেপ্তারের সময় হাতকড়া পরানো বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় এবং পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলের (পিআরবি) নির্দেশনা অনুযায়ী, হাতকড়ার ব্যবহার একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। এটি কেবল তখনই ব্যবহারযোগ্য, যখন আসামি অত্যন্ত হিংস্র, দুর্ধর্ষ অপরাধের সাথে জড়িত কিংবা পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে।   অন্যদিকে নারী, শিশু, বয়োবৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণকারী বা জামিনযোগ্য অপরাধের আসামিদের ক্ষেত্রে হাতকড়া পরানো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সর্বোচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে—গ্রেপ্তার মানেই আসামির ওপর অমানবিক বলপ্রয়োগ বা শাস্তিমূলক আচরণ নয়। অথচ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই এই আইনি মারপ্যাঁচ বা ত্বরিত পদক্ষেপের নামে একধরনের সামাজিক হেনস্তা করা হয়।   বিচার নিশ্চিত করার আগেই অভিযুক্তকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা আইনের শাসন ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মনে রাখতে হবে, আইনের প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি মানুষের ব্যক্তিগত সম্মান ও মানবাধিকার রক্ষা করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাতকড়া কোনো শাস্তির হাতিয়ার নয়, এটি কেবল নিরাপত্তার একটি বিশেষ ব্যবস্থা। তাই পেশাদার মর্যাদা ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রেখে পুলিশ প্রশাসনকে আরও সংবেদনশীল ও আইনানুগ হতে হবে।    

সাইফ সোহেল সাইফ সোহেল অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
ডেঙ্গু : মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধ নাকি আমাদের উদাসীনতার বিরুদ্ধে

ডেঙ্গু আমাদের কাছে আর নতুন কোনো রোগ নয়। প্রতিবছর বর্ষা এলেই আমরা ডেঙ্গুর কথা ভাবি, মশা নিধন অভিযান দেখি, সচেতনতামূলক প্রচারণা শুনি। হাসপাতালগুলোতে বাড়ে রোগীর চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে সতর্কবার্তা, বাসাবাড়িতে শুরু হয় মশারি, কয়েল ও স্প্রে ব্যবহারের তোড়জোড়। তারপর কিছুদিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেই আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাই। কিন্তু ডেঙ্গু ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে।   বাংলাদেশে চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনক। ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গুতে ৬৩ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৯০-এ পৌঁছেছে। শুধু ২১ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টাতেই ১,৬৫৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।   সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তার ঘটছে। ফলে ডেঙ্গুকে রাজধানীকেন্দ্রিক একটি মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। প্রশ্ন হলো—প্রতিবছর একই সময়ে একই সংকটের মুখোমুখি হয়েও আমরা কেন স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারছি না?   ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অনেকটা এমন হয়ে গেছে, যেন আগুন লাগার পর আমরা শুধু আগুন নেভানোর চেষ্টা করছি; কিন্তু আগুন লাগার কারণটি দূর করছি না। রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসা দেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার আগেই প্রশ্ন করতে হবে—যে পরিবেশে এডিস মশা জন্ম নিচ্ছে, সেটি আমরা কেন তৈরি হতে দিচ্ছি?   একটি ছোট প্লাস্টিকের পাত্রে জমে থাকা পানি, ছাদের টবে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনের পানি কিংবা অযত্নে পড়ে থাকা কোনো পাত্র—এসবই এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল। অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু হাসপাতালের বিছানায় হয় না; যুদ্ধটা শুরু করতে হয় আমাদের বাড়ির বারান্দা, ছাদ, রাস্তার পাশ, নির্মাণস্থল, ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ঘনবসতি, মানুষের চলাচল এবং অপর্যাপ্ত পানি, স্যানিটেশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ ডেঙ্গু কেবল একটি ভাইরাস বা একটি মশার গল্প নয়। এটি পরিবেশ, নগর ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানুষের আচরণের সম্মিলিত প্রতিফলন।   আমাদের আরেকটি বড় ভুল হলো—ডেঙ্গুকে কেবল ‘মশার কামড়ের রোগ’ হিসেবে দেখা। বাস্তবে এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকট। একজন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শুধু একজন রোগী আক্রান্ত হন না; একটি পরিবার অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে। একজন কর্মজীবী মানুষের কয়েক দিনের অসুস্থতা পরিবারের আয় কমিয়ে দিতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে। আর একজন মানুষের মৃত্যু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই ডেঙ্গুর পরিসংখ্যানকে শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।   ১৯০টি মৃত্যু মানে ১৯০টি পরিবারের শোক। ৬৩ হাজারের বেশি হাসপাতালে ভর্তি মানে হাজার হাজার পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। তবে ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোও সমাধান নয়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই যে গুরুতর অবস্থা হবে, তা নয়। কিন্তু অবহেলারও সুযোগ নেই। জ্বর হলে নিজের মতো করে অ্যান্টিবায়োটিক বা অপ্রয়োজনীয় ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষ করে, রোগের গতিপ্রকৃতি ও সতর্কতামূলক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। কারণ, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সময়মতো শনাক্তকরণ, সতর্কতামূলক লক্ষণ চিহ্নিত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।   এখানে চিকিৎসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসকরাও একা এ যুদ্ধ জিততে পারবেন না। একজন চিকিৎসক রোগীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারেন, হাসপাতাল চিকিৎসা দিতে পারে, কিন্তু বাইরে যদি প্রতিদিন নতুন নতুন এডিসের প্রজননস্থল তৈরি হয়, তাহলে হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে না। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।   শুধু অভিযান চালিয়ে, মাইকিং করে কিংবা কয়েক দিন পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন। প্রয়োজন নিয়মিত মশার উপস্থিতি ও প্রজননস্থল পর্যবেক্ষণ, বৈজ্ঞানিকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণস্থলে দায়িত্বশীলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘Integrated Vector Management’-এর ওপর গুরুত্ব দেয়—অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধন নয়; একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের মশার সংস্পর্শ কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে।   এখানে নাগরিকের ভূমিকাও কম নয়। নিজের বাসার আশপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা কোনো ছোট কাজ নয়। ছাদে, টবে বা পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমতে না দেওয়া একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। প্রতিবেশীর বাড়ির ছাদে পানি জমে থাকলে তাকে সতর্ক করাও দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণ।   স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ-মন্দির, বাজার, অফিস, কারখানা ও নির্মাণস্থল—প্রতিটি জায়গাকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের অংশ হতে হবে। WHO-এর সাম্প্রতিক বাংলাদেশভিত্তিক আলোচনাতেও সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য খাত ও জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা হাসপাতাল নয়—আমাদের নিজেদের ঘর ও আশপাশের পরিবেশ।   আজ যদি আমরা শুধু রোগী গুনতে থাকি, আগামীকাল সংখ্যাটা আরও বড় হতে পারে। কিন্তু আজ যদি প্রতিটি সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করি, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াই, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করি এবং চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিই, তাহলে ডেঙ্গুর বোঝা কমানোর বাস্তব সুযোগ রয়েছে।   ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে শুধু মশার বিরুদ্ধে নয়; এটি আমাদের অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা এবং দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধেও একটি যুদ্ধ। একটি এডিস মশা খুবই ছোট। কিন্তু সেই ছোট মশার জন্য যদি আমাদের অবহেলা বড় হয়ে ওঠে, তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।   ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, শুধু সিটি করপোরেশনের নয়, শুধু চিকিৎসকেরও নয়। এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু—‘কতজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো?’—এটা নয়। প্রশ্ন হলো—পরবর্তী রোগীটি যেন আক্রান্ত না হন, তার জন্য আমরা আজ কী করলাম?  

অমিতাভ হালদার অমিতাভ হালদার সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই : উপকূলের বাঁচা-মরার প্রশ্ন

জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম প্রভাবে আজ বিশ্বজুড়ে সংকট ঘনীভূত। এ সংকট উত্তরণে কার্বন নির্গমন কমানোর কোনো বিকল্প নেই। সম্প্রতি বৈশ্বিক কর্মসূচি ‘গ্লোবাল উইক অব অ্যাকশন’-এর অংশ হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন এবং আসন্ন কপ-৩১ এর প্রাক্কালে বরগুনার তিন উপজেলায় অনুষ্ঠিত হলো এক সুধী ও প্রতিবাদী মানববন্ধন। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনই’—এই স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে বরগুনা সদর, পাথরঘাটা ও তালতলীর জনপদ।   ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’, ওয়াটার কিপারস বাংলাদেশ, ধ্রুবতারা ইউথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনসহ স্থানীয় বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি কেবল একটি সাধারণ মানববন্ধন ছিল না; এটি ছিল উপকূলীয় মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। বরগুনা সদর রোড, পাথরঘাটার সোনালী বাজার এবং তালতলীর শুভ সন্ধ্যায় হাজারও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সাধারণ মানুষ এখন পরিবেশ ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি আর দেখতে চায় না।   মানববন্ধনে বক্তারা অত্যন্ত জোরালোভাবে কিছু সময়োপযোগী দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অর্থায়ন অবিলম্বে বন্ধ করা, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত ও সহজলভ্য তহবিল নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় দ্রুত ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর বাস্তবায়ন। বক্তারা বলেন, উপকূলীয় জেলা বরগুনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজ মারাত্মক ঝুঁকিতে। অথচ ধনী দেশগুলোর অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও জীবাশ্ম জ্বালানির অতি ব্যবহারের খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের।   পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে হলে কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকতে হবে। বরগুনার এই মানবিক ও পরিবেশবাদী আন্দোলন প্রমাণ করে, দেশের প্রান্তিক জনপদের মানুষ আজ জলবায়ু ন্যায্যতা ও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। সময় এসেছে নীতিনির্ধারকদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো আমলে নেয়ার। জীবাশ্ম জ্বালানির অন্ধকার যুগ পেরিয়ে একটি সবুজ, নির্মল ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়তে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।     মোঃ সাইফুল ইসলাম  সোহেল অ্যাডভোকেট জেলা আইনজীবী সমিতি বরগুনা এবং বিশেষ সংবাদদাতা  দৈনিক শেষ কথা, বরগুনা

সাইফ সোহেল সাইফ সোহেল সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬ 0
বিশ্বব্যাপী কমছে সুপেয় পানি : আমরা কতটুকু প্রস্তুত

আজকের পৃথিবী জ্বালানি, তেল ও গ্যাসের দখল, সরবরাহ এবং ভূ-রাজনীতি নিয়ে যতটা ব্যস্ত, হয়তো খুব দূরে নয় এমন এক সময়ে সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে যাবে। তখন প্রশ্ন হবে, কার কাছে কত তেল আছে নয়; বরং কার কাছে কতটুকু নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য স্বাদু পানি আছে।   একজন উন্নয়নকর্মী ও গবেষক  হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন বাস্তবতা, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং সামাজিক পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পানিসংকটের বিষয়টি আমাকে ক্রমেই বেশি ভাবায়। কারণ, পানি শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি খাদ্য, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, জীবিকা, অভিবাসন এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।   পৃথিবীতে পানি প্রচুর, কিন্তু মানুষের সরাসরি ব্যবহারের উপযোগী স্বাদু পানি অত্যন্ত সীমিত। তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন, নদী-খাল দখল ও দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নিরাপদ পানির ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।   আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পানিকে এমন একটি সম্পদ হিসেবে দেখি, যার কোনো শেষ নেই। কল খুললেই পানি আসে, এটাই আমাদের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। কিন্তু পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে পানি ইতোমধ্যে প্রতিদিনের সংগ্রামের নাম। কোথাও মানুষকে কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়, কোথাও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে, আবার কোথাও পানি আছে, কিন্তু তা পানযোগ্য নয়।   বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে আমাদের রয়েছে অসংখ্য নদী, খাল, জলাশয় ও বিশাল জলভূমি; অন্যদিকে নিরাপদ ও মিঠা পানির প্রাপ্যতা নিয়ে রয়েছে অঞ্চল ভেদে বড় বৈষম্য। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, হাওরাঞ্চলে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি, নগর এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্যে পানিদূষণ—সবকিছু মিলিয়ে ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তা একটি বড় উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।   পানির সংকট কখনো কখনো শুধু পানির সংকট থাকে না। পানি কমলে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। জীবিকা কমে গেলে মানুষ স্থানান্তরিত হয়। স্থানান্তর বাড়লে শহর ও সীমান্তে চাপ বাড়ে। আর সম্পদ যখন সীমিত হয়ে পড়ে, তখন সেই সম্পদের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে তৈরি হয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা।   আগামী দিনের সংঘাত হয়তো সব সময় বন্দুক বা যুদ্ধবিমান নিয়ে হবে না। সেটি হতে পারে নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, সীমান্তবর্তী জলসম্পদ নিয়ে, ভূগর্ভস্থ পানির মালিকানা নিয়ে, কিংবা কোনো অঞ্চলের মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিয়ে। পানি তখন শুধু পরিবেশগত ইস্যু থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে অর্থনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়।   আজ আমরা তেল-গ্যাসের মজুত নিয়ে দেশগুলোর শক্তি, অর্থনীতি ও কৌশল বিচার করি। ভবিষ্যতে হয়তো একইভাবে বিচার করতে হবে—কোন দেশের কতটুকু নিরাপদ স্বাদু পানি আছে, তাদের নদীগুলোর উৎস কোথায়, পানির পুনর্ভরণ কতটা হচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে তাদের পানিব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল। তবে ভবিষ্যৎকে ভয় পাওয়াই সমাধান নয়।   একজন উন্নয়নকর্মী ও নৃবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে আমার বিশ্বাস, পানিসংকটকে যুদ্ধের দিকে যাওয়ার আগে উন্নয়ন, সহযোগিতা ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোকাবেলা করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নদী ও জলাশয় রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পুনর্ব্যবহার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি পানি ব্যবহারে মানুষের সচেতনতা।   একই সঙ্গে পানি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পানি ব্যবস্থাপনা শুধু প্রকৌশলগত বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের অধিকার, সংস্কৃতি, জীবিকা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। সবচেয়ে বড় কথা, পানি নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনার জায়গাটি বদলাতে হবে। পানি কোনো সীমাহীন সম্পদ নয়। পানি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদও।   আজ আমরা যে নদী দূষিত করছি, যে জলাশয় ভরাট করছি, যে ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত তুলে নিচ্ছি, যে বৃষ্টির পানি নষ্ট হতে দিচ্ছি—তার মূল্য হয়তো আমাদের প্রজন্মকে পুরোপুরি দিতে হবে না। কিন্তু আমাদের সন্তানদের দিতে হতে পারে। তাই আমার কাছে পানি নিরাপত্তা শুধু একটি পরিবেশগত ইস্যু নয়। এটি মানবিক নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।   আজ যখন বিশ্ব তেল ও গ্যাসের জন্য প্রতিযোগিতা করছে, তখন আমাদের হয়তো আরেকটি প্রশ্ন করা উচিত— যেদিন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হবে নিরাপদ স্বাদু পানি, সেদিন আমরা কি প্রস্তুত থাকব? নাকি তখন আমরা বুঝতে পারব—তেলের বিকল্প হয়তো খুঁজে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু পানির বিকল্প নেই। তাই পানি সংরক্ষণ কোনো ভবিষ্যতের কর্মসূচি নয়; এটি আজকের উন্নয়ন অগ্রাধিকার।  

অনিন্দ্য সরকার অনিন্দ্য সরকার সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ 0
কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ 0
সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্য : ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের তিন অমীমাংসিত প্রশ্ন

ইতিহাস, ভূগোলের মানচিত্র পেরিয়ে বর্ণিল সংস্কৃতি, অর্থনীতির হিসাব ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ সবকিছু মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দর-কষাকষির দৌড়ে ভূরাজনৈতিক আলোচনার প্ল্যাটফর্মের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এগিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। ঘনিষ্ঠ এ দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের পরিসরের বিস্তৃতিওটাও আকর্ষণীয়৷ দীর্ঘ সীমান্ত থেকে অভিন্ন নদীর স্রোতের কলতান, বাণিজ্যের ঘোড়দৌড় পার করে যোগাযোগ থেকে সৌদামিনীর ঝলক কিংবা জ্বালানির সহযোগিতা সব মিলিয়ে যেকোনো এক দেশের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্য দেশের ওপর প্রভাব ফেলেই। বন্ধুবর এ দুই আলাদা মানচিত্রের মাঝে সখ্যতার সাথে কালে কালে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য প্রশ্নের। তাদের মাঝের বেশ কিছু প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে অমীমাংসিত৷ সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ অভিন্ন নদীর পানি এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এসবের মাঝে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন, যেহেতু ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দুটি দেশ পরস্পরের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত, তাই অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে মতপার্থক্য উপস্থিত থাকলেও পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও কূটনৈতিক স্বার্থে উভয় দেশের জন্য প্রয়োজন এই বিষয়গুলোকে সংঘাতের বিষয় হিসাবে বিবেচনা না করে আলোচনা ও তার বাস্তব সঠিক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এসবের ইতিবাচক মীমাংসা তৈরি করা৷ আলোচনার শুরুতে বলে নিই সীমান্তে নিরাপত্তা ও মানবিকতার ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি। মূলত ভারত ও বাংলাদেশ সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এবং এর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যও মোটেও সরল নয়। কোথাও নদীর খরস্রোত, কোথাও পরিপূর্ণ কৃষিজমি, কোথাও ঘনবসতি সীমান্তের দুই পাশের জনকূলের জীবনকে পরস্পরকে অত্যন্ত নিকটবর্তী করে তুলেছে। স্বাভাবিকভাবেই দুটি রাষ্ট্রের জন্য সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। চোরাচালানসহ মানবপাচার কিংবা মাদক ও অবৈধ পারাপার রুখে দিতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ ও তার যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। তবে ভুললে চলবে না, অতন্দ্র প্রহরীদের দায়িত্ব পালনকালে সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রার আশ্বাসও সম গুরুত্ব বহন করে। দুই দেশের সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতেও সীমান্তে প্রাণহানির হ্রাসের বিষয়টি তাই শিরোনামে উঠে এসেছে৷ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তে সংঘটিত এমন হত্যাকাণ্ডকে শূন্যে নামিয়ে আনার অপরিহার্যতা বিশেষভাবে উল্লিখিত হয়েছে। কারণ, এই সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কেবল নিরাপত্তা নয় বরং যেটি বেশি জরুরি তা হলো, মানবিক দৃষ্টিকোণ। তাই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পরবর্তীকালে দ্রুত তথ্য বিনিময় থেকে শুরু করে যৌথ তদন্ত এবং সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যোগাযোগ পরিস্থিতিকে জটিল হওয়ার আগেই নিয়ন্ত্রণে আনতে সমর্থ হবে৷ সুতরাং, এই বর্ডার লাইনকে যদি দুই দেশের বিভাজনরেখা হিসেবে দেখার পাশাপাশি সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনায় আনা যায়, সে ক্ষেত্রে সীমান্ত হাট, বৈধ স্থানীয় বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সর্বোপরি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কে ইতিবাচক ধারা আরও কার্যকর হিসেবে বিকশিত হবে। এবার আলোচনার খাত প্রবাহিত করব সেই অধ্যায়ে, যা নিয়ে নানা সময়ের পরিসরে দুটো দেশের মাঝে একটি মতপার্থক্যের দেয়াল মাথা তুলে নেয়। তা হলো এ দুটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যু পানি৷ জানিয়ে রাখি, এ দুই দেশ ৫৪টি নদী নিজেদের মাঝে ভাগ করো নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কেবল গঙ্গা ছাড়া অন্য কোনো অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে এখন অবধি কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি৷ তিস্তা এই জায়গায় সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। বস্তুত, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদের সময়সীমা ৩০ বছর৷ সেই হিসাবে ২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর চুক্তিটির ইতি টানার কথা। যার দরুণ চলতি বছরেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাটি নতুন গুঞ্জন তুলেছে কূটনৈতিক মহল থেকে সাধারণের কাতারে। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে নতুন বা সংশোধিত একটি চুক্তির প্রত্যাশা করছে, যাতে শুষ্ক মৌসুমে পানির ন্যায্য প্রবাহ নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি বর্ষায় অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে সৃষ্ট বন্যা বা প্লাবনের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও এই বিবেচনায় স্থান পায়। একটি বিষয় না বললেই নয়, ১৯৯৬ সালের নদীর গতি এবং ২০২৬ সালের নদীর প্রবাহ একই রূপে প্রকটিত নয়। বিগত তিন দশকে কৃষির ধরন, নদীর গতিপথ, পানির চাহিদা ও জনসংখ্যার পরিবর্তন আসায় ভবিষ্যতের স্বাক্ষরিত পানির চুক্তিকে কেবল পুরোনো হিসাবের পুনরাবৃত্তি করার ভুল ছকে না ফেলে এটিকে নতুন বাস্তবতার দৃষ্টিকোণের আলোকে তৈরি করা একান্ত অপরিহার্য। একই প্রশ্ন তিস্তার বেলাতেও সমান গুরুত্ব বহন করে। তিস্তা অববাহিকায় কৃষি, সেচ, মৎস ও মানুষের জীবন ও জীবিকা সরাসরি এই নদীর সাথে সংযুক্ত। দফায় দফায় এ সমস্যা আলোচনায় এলেও দীর্ঘদিনের আলাপচারিতার পরও এই নদীর পানি বণ্টন নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতায় আসা সম্ভব হয়নি৷ যার কারণে ভবিষ্যৎ পানি কূটনীতিতে গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীগুলোকেও একটি বৃহত্তর নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে৷ গুরুতর এই পানি সমস্যা সমাধানের পথ তবে কী? হ্যাঁ, পথ রয়েছে। তা হলো আরও বেশি তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা, বন্যার পূর্বাভাস, নদীর পানি প্রবাহের নিয়মিত তথ্য প্রকাশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে যৌথ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন৷ সঙ্গে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সমস্যা নিরসনের কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা৷ কারণ, নদী কোনো রাজনৈতিক সীমানা মেনে প্রবাহিত হয়,না, তার উদ্দাম প্রবাহ উজান ও ভাটিকে একই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার অংশ করে রাখে। এটাই প্রকৃতির খেয়াল। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝের অর্থনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বাণিজ্য। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক যোগাযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ সিলসিলা থাকলেও বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে বাংলাদেশের সামান্য হলেও উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের প্রয়োজনীয়তার কথাটি উঠে এসেছে৷ এখন বাংলাদেশের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ভারতের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ কী করে আরও সহজ করা সম্ভব? শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, মাননিয়ন্ত্রণ, কাস্টমস প্রক্রিয়া, পরিবহন ব্যয় ও সীমান্তের অবকাঠামো — এসব ক্ষেত্রে সম্বন্বয় যদি আরও বৃদ্ধি করা যায়, সে ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ও বৈচিত্র্য দুটোই বাড়িয়ে তোলা সম্ভব৷ অন্যদিকে ভারতের জন্যও বাংলাদেশ হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী বাজার৷ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে৷ সুতরাং, উভয় দেশের বাণিজ্য কেবলই আমদানি রপ্তানির হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়৷ তাই এটিকে এই হিসাবে আটকে না রেখে যৌথ বিনিয়োগ, উৎপাদন, সরবারাহ ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বৃহত্তর কাঠামোর মাঝে দেখাটা জরুরি। স্থলবন্দর, বর্ডার হাট এবং যোগাযোগের অবকাঠামো তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে এ দুই দেশের আলোচনায় স্থলবন্দরকে কার্যকর করার পাশাপাশি বন্ধ বা অচল থাকা বর্ডার হাট চালুর মতো বিষয়গুলোও হাইলাইট হচ্ছে। সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্য এই তিনটি বিষয়কে আপাতদৃষ্টিতে পৃথক বলে মনে হলেও বাস্তবে এরা পরস্পরের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বাণিজ্য ও যোগাযোগকে যেমন সহজ করে তোলে তেমনি নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা কৃষি ও সীমান্তবর্তী অর্থনীতিকে করে তুলতে পারে সুদৃঢ়। আবার এই বাণিজ্য ও মানুষের যোগাযোগ বাড়লে পারস্পরিক নির্ভরতার তৈরি হয়, যা কিনা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য আরও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ে দেয়। অতএব, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে শুধুই রাজনৈতিক সম্পর্ক হিসাবে বিচার করলে পূর্ণ বাস্তবতা আড়ালে রয়ে যাবে৷ এটি একই সাথে একটি নদীভিত্তিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক সম্পর্কের পরিসরে বেষ্টিত৷ দুই দেশের মাঝে সব বিষয়েই ঐকমত্য থাকবে, এমনটা সব সময় সম্ভব নয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কে পরিপক্বতাটা তখনই বোধগম্য হয়, যখন উভয়পক্ষের মাঝের মতপার্থক্যের বিষয়গুলোকে কী করে পরিচালনা করা হচ্ছে, সেই কূটনীতিক কলাকৌশলের ব্যবচ্ছেদ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে। নিয়মিত সংলাপ, তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও পারস্পরিক স্বার্থকে বিবেচনায় রেখে সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টাই সেই পথকে সহজ করে তুলতে পারে। সেই হিসাবেই চলতি বছরেই দুই দেশের মাঝে আরেকটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগ আসতে যাচ্ছে। ২০২৬ সাল বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশেষত, গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। ভারতের ভাষ্যানুযায়ী, পানিসংক্রান্ত বিষয়গুলো বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক কাঠামো ও যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে আলোচনা করাটা জরুরি। এমন অবস্থায় নতুন কোনো সমঝোতা হলে সেটি কেবল একটি চুক্তির নবায়ন না হয়ে আগামী কয়েক দশকের জন্য আরও বিস্তৃত নদী ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরিতে যেন সক্ষম হয়, এটি বিবেচনায় রাখলে উভয় দেশের কূটনীতিক দূরদর্শিতা প্রমাণ হবে। একইরূপে সীমান্তে প্রাণহানি কমানো, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা হ্রাস ও যোগাযোগ বৃদ্ধি দুই দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সম্পর্কের বাস্তব সুফল পৌঁছে দিতে সমর্থ হবে। অতএব, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সম্মুখে তাই এই প্রশ্ন কেবল কে কতটা পেল এই হিসাব কষলে উলুবনে মুক্তো ছড়ানোর মতো বিষয় হবে। বরং এই প্রশ্নটি হওয়া উচিত কী করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যায়, যেটি দিয়ে দুই দেশের সার্বভৌম স্বার্থ, মানুষের নিরাপত্তা, পরিবেশ, অর্থনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন একসঙ্গে বিবেচনা করা সম্ভব হবে। সীমান্ত, পানি ও বাণিজ্য — এই তিনটি অমীমাংসিত প্রশ্নকে তাই একই সঙ্গে তিনটি সম্ভাবনার দরজা হিসেবেও দেখাটা এখন বুদ্ধিমানের কাজ৷ আদতে পৃথিবীর যেসব দেশের মাঝে সীমান্ত ভাগাভাগি করে নেয়ার মতো বিষয়টি উপস্থিত, সেসব ক্ষেত্রেই এমন রাষ্ট্রগুলোকে নানাবিধ কূটনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। যেমন : চীনের সাথে ব্রুনেই, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেইয়ের মধ‍্যকার দক্ষিণ চীন সাগরের সামুদ্রিক সীমানা এবং দ্বীপ ও প্রবাল বিরোধ, দীর্ঘদিনের সীমান্ত ও নাগার্নো কারাবাখ-সংক্রান্ত বিরোধের সাথে যুঝছে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান। অতএব, এটি ভুরাজনীতির একটি বাস্তব সমস্যা। সুতরাং, বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি উপস্থিত। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এটি তাই অতি স্বাভাবিক চিত্র।    তাই এসব দরজা খুলে নিতে এখন অহেতুক উত্তেজনা নয়, বরং যা প্রয়োজন, তা হলো গঠনমূলক সংলাপ, অবস্থানের পরিবর্তে তথ্য এবং তাৎক্ষণিক সমাধানের বদলে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার চিন্তা এবং ইতিবাচক, স্বতস্ফূর্ত মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি৷ অহেতুক তর্ক নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান ও প্রতিটি নীতিমালার পেছনে থাকা যৌক্তিকতা৷ কারণ, প্রতিবেশী এ দুটি দেশের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এই বাস্তববাদী সহযোগিতার ওপরই৷  

সোনিয়া তাসনিম সোনিয়া তাসনিম সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
মানবিক মূল্যবোধের সংকটে আমাদের সমাজ

সমাজ মানুষের সম্মিলিত জীবনব্যবস্থা। মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াবে, বিপদে সহযোগিতা করবে, সুখে-দুঃখে অংশীদার হবে—এটাই একটি সুন্দর ও মানবিক সমাজের মূল ভিত্তি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজে নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা আধুনিক হয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হয়েছে, শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। অথচ প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি সত্যিই আগের চেয়ে বেশি মানবিক হতে পেরেছি?   বর্তমান সময়ে মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আছে, ইন্টারনেট আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে। মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। কিন্তু একই ঘরে বসবাস করেও অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিক যোগাযোগের অভাব দেখা যায়। কাছের মানুষ দূরে সরে যাচ্ছে, আর দূরের মানুষের সঙ্গে ভার্চুয়াল সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের কাছে এনেছে, কিন্তু কোথাও কোথাও হৃদয়ের দূরত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে।   আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়োজন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন, শিক্ষার প্রসার প্রয়োজন—এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়নও সমান জরুরি। একজন মানুষ কত টাকা উপার্জন করেন, কত বড় বাড়িতে থাকেন কিংবা কত দামি গাড়িতে চলেন—এসব দিয়ে তাঁর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা যায় না। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর আচরণে, তাঁর বিবেকবোধে, তাঁর সততায় এবং অন্য মানুষের প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতায়।   আজ সমাজে অসহিষ্ণুতা দিন দিন বাড়ছে। সামান্য মতের অমিল থেকেই অনেক সময় সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন মত দেখলেই কেউ কেউ অশালীন মন্তব্য করেন। অথচ মতের পার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয়। একজনের মতের সঙ্গে আরেকজনের মত না-ও মিলতে পারে। কিন্তু তাই বলে কাউকে অপমান করা, হেয় করা কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা কোনোভাবেই সুস্থ সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।   আমাদের পরিবারগুলোতেও মূল্যবোধের শিক্ষা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। একটি শিশু প্রথম শিক্ষা পায় পরিবার থেকে। বাবা-মায়ের আচরণ, কথা বলা, অন্যকে সম্মান করা, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ছোটদের প্রতি ভালোবাসা—এসবই শিশুর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানকে শুধু ভালো ফল করার জন্য চাপ দিলেই হবে না; তাকে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে। কারণ, একজন শিক্ষিত কিন্তু মূল্যবোধহীন মানুষ সমাজের জন্য কখনো কখনো বোঝা হয়ে উঠতে পারে।   শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে, বিবেককে জাগ্রত করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার চর্চা বাড়াতে হবে। শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়াবেন না; তার নিজের আচরণও শিক্ষার্থীদের জন্য আদর্শ হয়ে উঠতে হবে।   সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা, মিথ্যা, অন্যায় ও স্বার্থপরতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। আমরা প্রায়ই অন্যের দুর্নীতির সমালোচনা করি, কিন্তু নিজের ছোটখাটো অনিয়মকে স্বাভাবিক বলে মনে করি। এই দ্বৈত মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবর্তন চাইলে প্রথমে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। অন্যকে সৎ হওয়ার উপদেশ দেয়ার আগে নিজের জীবনে সততার চর্চা করা প্রয়োজন।   মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন আছে। অর্থ ছাড়া সংসার পরিচালনা করা কঠিন। কিন্তু অর্থই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি সম্পর্ক, ভালোবাসা, সম্মান ও মানবিকতার মূল্য বুঝতে হবে। একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপদগ্রস্ত কাউকে সাহায্য করা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেয়া কিংবা একজন দরিদ্র শিশুর পড়াশোনায় সহযোগিতা করা—এসব কাজ হয়তো ব্যাংক হিসাবে টাকা বাড়ায় না, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে সম্মান বাড়ায়।   বর্তমান সমাজে নারীর প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীকে শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হবে। নারীর মতামত, অধিকার ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একইভাবে পুরুষের প্রতিও দায়িত্ব ও সম্মানের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবারে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়া থাকলে অনেক সমস্যা শুরু হওয়ার আগেই সমাধান করা সম্ভব।   প্রবীণ মানুষদের প্রতিও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। যাঁরা জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবার ও সমাজের জন্য ব্যয় করেছেন, বার্ধক্যে তাঁদের একাকিত্বে ফেলে রাখা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। সন্তানদের উচিত বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। একইভাবে সমাজের অসহায়, প্রতিবন্ধী, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।   সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারেও আমাদের সচেতন হতে হবে। যাচাই না করে কোনো সংবাদ ছড়িয়ে দেয়া, গুজব ছড়ানো কিংবা কারও ব্যক্তিগত সম্মান ক্ষুণ্ন করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজারও মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি অন্যের সম্মান রক্ষার দায়িত্বও রয়েছে।   আমাদের দেশ তরুণদের দেশ। তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। তাই তরুণদের শুধু চাকরির পেছনে ছুটলে হবে না; দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি দেশ ও সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। মাদক, অপরাধ, সহিংসতা ও হতাশা থেকে তরুণদের দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।   একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নয়। এই দায়িত্ব আমাদের সবার। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে, প্রশাসন আইন প্রয়োগ করবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা দেবে—কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।   আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে একটু সচেতন হই, অন্যকে সম্মান করি, মিথ্যা ও অন্যায়কে প্রশ্রয় না দিই, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই এবং সন্তানদের মানবিকতার শিক্ষা দিই, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবেই। বড় পরিবর্তন অনেক সময় ছোট ছোট ভালো কাজ থেকেই শুরু হয়।   আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু উন্নত রাস্তা, বড় ভবন কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি নয়; প্রয়োজন উন্নত মনন ও মানবিক হৃদয়। উন্নত সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানুষের আচরণ। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের ভেতর থেকে পরিবর্তনের শুরু করি। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি এবং মানবিক মূল্যবোধকে জীবনের অন্যতম প্রধান আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। কারণ, শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন শুধু তার অর্থনীতি দিয়ে মাপা যায় না; মাপা যায় সেই দেশের মানুষ কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও মানবিক তার ওপর।  

মোঃ আমজাদ হোসেন মোঃ আমজাদ হোসেন সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
সৌরবিদ্যুতেই মিলবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান

সূর্যের আলো অফুরন্ত ও সম্ভাবনার। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট এবং বিদ্যুৎ সমস্যা দূর করা সম্ভব। দেশজুড়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ সংকট কাটাতে সরকার বিকল্প খুঁজছে, তবে সৌরশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে মিলবে এর বিকল্প সমাধান।   আমাদের দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা জ্বালানি আমদানিনির্ভর। পরিবেশ রক্ষায় সৌরবিদ্যুৎ  নিরাপদ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা, তাই সৌরবিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে  শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করবে। সেই সাথে জ্বালানি আমদানি-নির্ভরতা কমাবে। আগামী দিনে এটি একটি শক্তিশালী ও টেকসই বিদ্যুৎব্যবস্থা গড়ে তুলবে।   সরকার ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন কৌশল পত্র (২০২৬-২০৩০) গ্রহণ করেছে। ইডকল ও পিকেএসএফসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তাও প্রদান করেছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সহজ ঋণ, কর সুবিধা, নেট মিটারিং কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতি আমদানিতে ভ্যাট ১৭ শতাংশ কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে। এসব সিদ্ধান্তের ফলে দেশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।   সরকার নেট মিটারিং সিস্টেম চালু করেছে, যার মাধ্যমে ১০.৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ ক্রয় করবে সরকার। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের  অংশ হিসেবে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর যে লক্ষ্য নিয়েছে, সেখানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।   আবাসিক ভবনে রুফটপ সোলার স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে (৫ শতাংশ বা তার কম) ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সোলার সিস্টেম স্থাপনকারীদের বিনিয়োগ আয়করমুক্ত ঘোষণা করা যেতে পারে। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে গ্রাহকের কাছ থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সাড়ে দশ টাকা দরে কেনারও ঘোষণা দিয়েছে সরকার, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্রাহককে উৎসাহিত করবে।   আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বাসাবাড়িতে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘পিএম সূর্যঘর মুফত বিজলি যোজনা প্রকল্প’ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ২০২৬ সালের মার্চে ভারতের মোট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৫০.২৬ গিগাওয়াট এবং কেবল ২০২৫ সালে ভারতের জাতীয় গ্রিডে ৪৪ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। পিএম সূর্যঘর প্রকল্পের আওতায় এক থেকে তিন বা ততোধিক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৌর প্যানেল স্থাপনে ৭৮ হাজার রুপি প্রণোদনা দেয়া হয় এবং এর পাশাপাশি পিএম কুসুম নামে আরেকটি প্রকল্পের অধীনে বিদ্যুৎবিহীন এলাকায় ৬০ শতাংশ অনুদানে ১৪ লাখ সৌরবিদ্যুৎ চালিত কৃষি পাম্প স্থাপন, গ্রিডের অধিভুক্ত এলাকায় বিদ্যমান ৩৫ লাখ সেচপাম্পকে সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পে রূপান্তর এবং দুই মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে সহজ শর্তে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ প্রদান করা হয়।   বাংলাদেশেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা জনপ্রিয় ও বিস্তৃত করতে হলে অবশ্যই গ্রাহককে প্রণোদনা দিতে হবে এবং কৃষকদের সেচ পাম্প স্থাপনে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া উন্নত দেশ যেমন জার্মানি, জাপান, ভিয়েতনাম, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে ফিড-ইন-ট্যারিফ (এফআইটি) পদ্ধতি ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধন করেছে। এ ব্যবস্থায় সরকার দীর্ঘ মেয়াদে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ের নিশ্চয়তা দেয়।   ২০১৮ সালে ভিয়েতনামের সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল মাত্র ৮৬ মেগাওয়াট; ২০২৫ সালের শেষে তা প্রায় ১৯ গিগাওয়াটে। সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে করছাড় এবং ‘নেট-মিটারিং’ সুবিধার কারণে পাকিস্তানে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশেও এ পদ্ধতি অবলম্বন করে সৌরবিদ্যুৎতের ব্যাপক বিস্তার ঘটানো সম্ভব হবে।   সরকার জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল পত্র (২০২৬-২০৩০) ঘোষণা করেছে। কৌশল পত্র অনুযায়ী আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ২০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশব্যাপী সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা অবকাঠামোগত উন্নয়ন স্বল্পমূল্যে সৌরবিদ্যুৎতের যন্ত্রপাতি বাজারজাত করতে হবে। সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এর নেটওয়ার্ক জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে হবে। তাহলেই বিদ্যুৎ খাতে স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।    

আল আমিন নাহিদ আল আমিন নাহিদ সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
পে-স্কেল : বেতন বাড়লেই কি মানুষ ধনী হয়ে যায়

নতুন পে-স্কেলের খবরটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা চোখে পড়ছে। কেউ খুশি হয়েছেন, কেউ স্বস্তি পেয়েছেন, আবার কেউ বেশ কটাক্ষ করেই বলছেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের তো বেতন এমনিতেই ভালো, তার ওপর আবার এত বাড়ানো হলো কেন?’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কথাও দেখা যাচ্ছে, ‘সরকারি চাকরি করলেই তো জীবন সেট!’ এসব কথা পড়তে পড়তে আমার মনে একটি প্রশ্নই বারবার এসেছে, বেতন বাড়লেই কি একজন মানুষ ধনী হয়ে যায়?   আমার মনে হয়, বিষয়টিকে এত সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। নতুন জাতীয় পে-স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রেড ভেদে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে এই সংখ্যাগুলো দেখেই প্রত্যেক সরকারি চাকরিজীবীর হাতে রাতারাতি দ্বিগুণ বা তারও বেশি টাকা চলে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়। নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে; পূর্ণ বেতন বৃদ্ধি ২০২৭ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।   তার পরও সংবাদমাধ্যমে যখন বড় করে লেখা হয়—‘বেতন বাড়ল ১০০ শতাংশ’, ‘১৪২ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি’—তখন সাধারণ মানুষের চোখে বিষয়টি একটু অন্যভাবেই ধরা দিতে পারে। মনে হতে পারে, সরকারি চাকরিজীবীরা বুঝি এক লাফে অনেক বেশি ধনী হয়ে গেলেন। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, একজন সরকারি চাকরিজীবীর সংসারে বাজার খরচ কত? বাড়িভাড়া কত? সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত—সব মিলিয়ে মাস শেষে তাঁর হাতে কতটুকুই-বা থাকে?   অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো উচিত নয়। বরং দীর্ঘ সময় পর একটি নতুন বেতনকাঠামো এসেছে। ২০১৫ সালের পর নতুন পে-স্কেল কার্যকর হচ্ছে, আর এর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয়ও অনেক বেড়েছে। নতুন কাঠামো তৈরির সময় সরকারও মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা ও সরকারি আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনার কথা জানিয়েছে। তাহলে আপত্তিটা কোথায়?   আমার মনে হয়, আপত্তির জায়গাটা সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়ায় নয়; বরং একই সময়ে অন্যদের আয় কতটা বাড়ছে—সেই প্রশ্নে। একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লে তাঁর সংসারের আয় বাড়ে। কিন্তু একজন বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন কি একইভাবে বাড়ে? একজন দোকানের কর্মচারী, রিকশাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা নিম্নআয়ের পরিবারের আয় কি প্রতিবছর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে? সব সময় তো নয়।   জুলাই ২০২৬ সালে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—দুই ধরনের ব্যয়ের ক্ষেত্রেই মানুষের ওপর চাপ ছিল। অর্থাৎ একজনের আয় যদি বাড়ে, কিন্তু অন্যজনের আয় একই জায়গায় পড়ে থাকে এবং বাজারের খরচ বাড়তেই থাকে, তাহলে সেই মানুষের মনে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক—‘আমার জন্য কী?’ এই প্রশ্নকে উপেক্ষা করা উচিত নয়।   আবার সরকারি চাকরিজীবীদেরও এক কথায় ‘ধনী’ বলে দেয়া ঠিক নয়। সরকারি চাকরিতে থাকা মানেই সবার আয় এক নয়। একজন নিম্নগ্রেডের কর্মচারী এবং একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জীবনযাত্রার পার্থক্য যেমন আছে, তেমনি তাঁদের আর্থিক দায়িত্বেরও পার্থক্য আছে। তাই ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, সবাই ধনী হয়ে যাচ্ছে’—এমন সাধারণীকরণ যেমন ঠিক নয়, তেমনি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেই দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন ভাবাও ঠিক নয়। আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় বৈষম্যের অনুভূতিটা।   যখন একজন মানুষ দেখেন, তাঁর নিজের আয় বছরের পর বছর খুব বেশি বাড়ছে না, অথচ একই সময়ে অন্য একটি শ্রেণির আয় কাঠামোগতভাবে বাড়ছে, তখন তাঁর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। সেই ক্ষোভ থেকেই হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটাক্ষ আসে। কিন্তু সেই কটাক্ষের ভাষাও আমাদের ভেবে দেখা দরকার। কারণ, একজন সরকারি কর্মচারীও এই সমাজেরই মানুষ। তিনিও বাজারে গিয়ে একই দামে চাল-ডাল কেনেন, বাড়িভাড়া দেন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করেন, অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যয় দেন। তাঁর বেতন বাড়ার খবর দেখে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বিদ্রূপ করার আগে আমাদের মনে রাখা উচিত—বেতন বৃদ্ধি কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ নয়। তবে এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বড় হয়ে যায়।   যদি সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সংশোধন করা হয়, তাহলে একই সঙ্গে দেশের বেসরকারি ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কীভাবে বাড়ানো যায়, সে প্রশ্নও সামনে আসা প্রয়োজন। শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের আয় বাড়লেই তো একটি দেশের মানুষের জীবনমান বাড়ে না। বরং আমাদের এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দরকার, যেখানে একজন সরকারি কর্মচারী তাঁর ন্যায্য বেতন পাবেন, আবার একজন বেসরকারি চাকরিজীবীও ন্যায্য মজুরি পাওয়ার সুযোগ পাবেন; একজন শ্রমিকের আয়ও যেন দ্রব্যমূল্যের কাছে প্রতিনিয়ত হেরে না যায়। আর সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও আমার একটি ছোট প্রশ্ন আছে।   আমরা কি শুধু শতাংশের হিসাব দেখাব, নাকি সেই শতাংশের পেছনের বাস্তবতাটাও মানুষের সামনে তুলে ধরব? ‘১০০ শতাংশ বৃদ্ধি’ কিংবা ‘১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি’—শিরোনাম হিসেবে আকর্ষণীয়। কিন্তু একজন পাঠক যদি শুধু এই সংখ্যাটিই দেখেন, তাহলে তিনি হয়তো ভাববেন, প্রত্যেক সরকারি কর্মচারীর বেতন এক লাফে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। অথচ বাস্তবে নতুন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রেড ১–৯-এ বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ এবং গ্রেড ১০–২০-এ ৫০ শতাংশ কার্যকর হচ্ছে; ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে হার আরও বাড়বে এবং পূর্ণ বৃদ্ধি জুলাই ২০২৭ থেকে কার্যকর হবে। অন্যান্য সংশোধিত ভাতার পূর্ণ বাস্তবায়ন ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে। তাই সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রেও সংখ্যার পাশাপাশি ব্যাখ্যাটা জরুরি।   আমার কাছে নতুন পে-স্কেল আসলে শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ার গল্প নয়। এটি আমাদের সামনে আরেকটি বড় প্রশ্নও রেখে যায়, এ দেশের প্রত্যেক মানুষের আয় কি তার জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে?   সরকারি চাকরিজীবীরা তাঁদের প্রাপ্য বেতন পাবেন, এটা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি দেশের অন্য শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান নিয়েও রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। কারও বেতন বাড়লে তাকে হিংসে করার প্রয়োজন নেই। আবার কারও আয় বাড়েনি বলে তার কষ্টকেও ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।   শেষ পর্যন্ত পে-স্কেলের সাফল্য শুধু এই হিসাব দিয়ে মাপা উচিত নয় যে বেতন কত শতাংশ বেড়েছে। বরং বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন মানুষের মাসের শেষে আগের চেয়ে একটু বেশি স্বস্তি এসেছে কি না। কারণ, কাগজে বেতন বাড়া একটি সংখ্যা। কিন্তু মানুষের জীবনে স্বস্তি আসা—সেটিই তার আসল অর্থ।

লামিয়া হাসান লামিয়া হাসান সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণ

‎সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ, মেঘের রাজ্য সাজেক উপত্যকা, কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলরাশি আর নীলাচল-নীলগিরির নৈসর্গিক রূপকথা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে প্রকৃতির আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত সুউচ্চ পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল ও বন্য ঝরনা শুধু পর্যটকদের মনই ভোলায় না, বরং ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এটি দেশের সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চল। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই রূপসী সৌন্দর্যের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।   একদিকে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির তোরণ, অন্যদিকে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যু। এ দুইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ জাতীয় নিরাপত্তার এক মহা-কৌশলগত সংযোগস্থল। ‎ ‎পর্যটন সম্ভাবনার দিক দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির এক উদীয়মান চালিকাশক্তি হতে পারে। রাঙামাটির সাজেক উপত্যকা, ঝুলন্ত সেতু, বান্দরবানের দেবতাখুম, আলীকদমের মারায়ং তং এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা ও তারেং প্রতিবছর কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা সৃষ্টি করছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) নীতি অনুসরণ করে এ অঞ্চলে ইকো-ট্যুরিজম ও সামাজভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটালে স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সম্ভব। বিশেষ করে, পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল, হস্তশিল্প, অর্গানিক কৃষি এবং কটেজ ইন্ডাস্ট্রির সঠিক প্রসারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে। ‎ ‎অপার পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও বিকাশের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখানকার আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সশস্ত্র বাস্তবতা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংঘাত অবসানের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। চুক্তিপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপক্ষ পাহাড়ে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সীমান্ত সড়কসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও উপদলীয় কোন্দলের কারণে PCJSS (মূল), PCJSS (সংস্কার), UPDF (মূল), UPDF (গণতান্ত্রিক) এবং সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশ কিছু নতুন সশস্ত্র উপদলের উত্থান ঘটেছে। দেশের মূলধারার আইনি কাঠামো স্পর্শ না করে সশস্ত্র সহিংসতার পথ বেছে নেয়া এসব সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের অবৈধ কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার প্রবণতা পাহাড়ের সাধারণ জনজীবনকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। ‎ ‎আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় জনমানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করছে না, বরং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও পর্যটনের গতিকেও থামিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য, পর্যটনবাহী যানবাহন, ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গৃহস্থালি থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এই অবৈধ অর্থ দিয়ে আধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র কেনাই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পর্যটন ও অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় জায়গায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্পে অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করেন এবং বিপুল সম্ভাবনাময় একটি অর্থবহ অর্থনৈতিক জোন বারবার হোঁচট খাচ্ছে। ‎ ‎এ ধরনের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বর্তমানের চেয়ে আরও ব্যাপক হওয়া জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মিয়ানমারের সাথে ২৮৩ কিলোমিটার এবং ভারতের সাথে বিশাল দুর্গম সীমান্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র, অস্ত্র চোরাচালানি কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো যাতে পাহাড়ে আস্তানা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করে নিরাপত্তা বাহিনী। স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থার সুরক্ষাদান এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবির সার্বক্ষণিক সতর্ক নজরদারির বলেই হাজার হাজার পর্যটক প্রতিদিন দুর্গম পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে সক্ষম হন। ‎ ‎বহিঃশত্রুর হুমকি এবং আঞ্চলিক সীমান্ত সংঘাতের নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিধি ও কৌশলগত নজরদারি আরও ব্যাপক আকারে বাড়ানো দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে জান্তা সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর (আরাকান আর্মি) মধ্যকার সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে দুর্গম সীমান্ত এলাকা ও গভীর বনাঞ্চলে ড্রোন প্রযুক্তি, থার্মাল ইমেজিং ও আধুনিক নিরাপত্তা চৌকির পরিধি বাড়ানো আবশ্যক। অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশদ্বার বন্ধ করতে এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর গোপন আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্রের একটি প্রধান কৌশলগত দায়বদ্ধতা। ‎ ‎পাহাড়ের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে সুনির্দিষ্ট ও দ্বিমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। একদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত স্থানীয় সকল বাংলাদেশি অধিবাসীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে সকল প্রকার সশস্ত্র ও চাঁদাবাজ সংগঠনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক উপায়ে আলোচনার দরজা খোলা রেখেও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে সমূলে উৎপাটন করা ছাড়া পাহাড়ে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়। ‎ ‎পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ত্রিবেণী সংগম ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতা ত্যাগ করে দেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতর ফিরে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কড়া নজরদারি এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সহযোগিতায় পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি পুরোপুরি বন্ধ হলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অপার ভূমি হয়ে উঠবে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতির এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু।

এম মহাসিন মিয়া এম মহাসিন মিয়া সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে যে প্রজন্ম

একসময় বিকেল নামলেই ছেলে-মেয়েদের হাতে দেখা যেত বই। কেউ গল্পের বই নিয়ে বারান্দায় বসত, কেউ পরীক্ষার পড়া শেষ করে ডুবে যেত কোনো উপন্যাসের পাতায়। বইয়ের পাতার শব্দে, কাগজের গন্ধে, চরিত্রগুলোর সঙ্গে কল্পনার ভ্রমণে কেটে যেত দীর্ঘ বিকেল। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। হাতে বইয়ের বদলে জায়গা করে নিয়েছে স্মার্টফোন। চোখ আটকে থাকে ছোট্ট একটি পর্দায়, আর আঙুল ছুটে চলে এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে।   প্রযুক্তির এই সময়কে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। কয়েক সেকেন্ডেই পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়। জ্ঞান অর্জনের অসংখ্য দরজাও খুলে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তথ্যের এত দরজা খুলে যাওয়ার পরও আমরা কি বইয়ের দরজাটি ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিচ্ছি?   সমস্যাটি শুধু বই না পড়ার নয়; সমস্যাটি মনোযোগ হারানোরও। একটি বই পড়তে হলে দীর্ঘ সময় একই জায়গায় মন রাখতে হয়। একটি চরিত্রের সঙ্গে হাঁটতে হয়, একটি ঘটনার ভেতর ঢুকতে হয়, কখনো লেখকের একটি বাক্য নিয়ে থেমে ভাবতে হয়। বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট আমাদের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নতুন কিছু দেখার অভ্যাস তৈরি করছে। ফলে ধৈর্য ধরে দীর্ঘ লেখা পড়ার মানসিকতা অনেকের মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।   আজকের তরুণের হাতে তথ্যের অভাব নেই। বরং তথ্যের আধিক্যই কখনো কখনো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্চ করলেই উত্তর পাওয়া যায়, ভিডিও দেখলেই কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা যায়। কিন্তু তথ্য জানা আর জ্ঞান অর্জন এক বিষয় নয়। তথ্য আমাদের জানায় ‘কী’; বই অনেক সময় আমাদের ভাবতে শেখায় ‘কেন’ এবং ‘তারপর কী’।   বইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। একটি ভালো উপন্যাস শুধু গল্প বলে না; মানুষের মন বুঝতে শেখায়। একটি ইতিহাসের বই শুধু অতীতের ঘটনা জানায় না; বর্তমানকে বোঝার চোখ তৈরি করে। একটি দর্শনের বই সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বরং প্রশ্ন করতে শেখায়। আর কবিতার একটি পঙক্তি কখনো কখনো এমন অনুভূতির দরজা খুলে দেয়, যার অস্তিত্ব আমরা নিজের মধ্যেই আগে টের পাইনি।   পাঠাভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থারও কিছু ভূমিকা আছে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বই মানেই পরীক্ষার বই। পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়া যেন অতিরিক্ত কাজ। পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার চাপ, কোচিং, অ্যাসাইনমেন্ট এবং নানা ধরনের প্রতিযোগিতার মধ্যে আনন্দের জন্য বই পড়ার সময়টুকু হারিয়ে যায়। অথচ শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাওয়ার নাম হয়, তাহলে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অপূর্ণ থেকে যায়।   পরিবারের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু বই পড়বে কি না, তা শুধু তার ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে না। সে যদি ঘরে বড়দের বই পড়তে দেখে, বই নিয়ে আলোচনা শোনে, তাহলে তার মধ্যেও পাঠের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পরিবারের সবাই যদি অবসর পেলেই মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকে, শিশুর কাছে বইকে আকর্ষণীয় করে তোলা কঠিন।   তবে প্রযুক্তিকে বইয়ের শত্রু হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না। বরং প্রযুক্তিকে বইয়ের সহযোগী করা সম্ভব। এখন ই-বুক, অডিওবুক, অনলাইন লাইব্রেরি ও ডিজিটাল প্রকাশনার মাধ্যমে বই পড়ার সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি। একজন চাইলে নিজের মোবাইল ফোনেই হাজার হাজার বই বহন করতে পারে। প্রয়োজন শুধু ব্যবহারের অভ্যাসটি বদলানো।   প্রশ্ন হলো, আমরা দিনে কত সময় পর্দার দিকে তাকাই এবং তার কতটুকু সময় বইয়ের জন্য রাখি? দশ মিনিটের একটি ভিডিও দেখতে দেখতে কখন যে এক ঘণ্টা চলে যায়, আমরা অনেক সময় টেরই পাই না। অথচ দশ মিনিট বই পড়তে বসলে ঘড়ির কাঁটা যেন হঠাৎ ধীর হয়ে যায়। এই অভ্যাসের পরিবর্তনটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থেকেই শুরু হতে পারে।   প্রতিদিন মাত্র পনেরো বা বিশ মিনিট বই পড়া দিয়ে শুরু করা যায়। প্রথমে হয়তো মন বসবে না। কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই মোবাইল হাতে নিতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু অভ্যাস তৈরি হলে বইয়ের জগৎ ধীরে ধীরে নিজের দরজা খুলে দেয়। তখন বই পড়া আর দায়িত্ব মনে হয় না; বরং দিনের কোলাহল থেকে কয়েক মুহূর্তের আশ্রয় হয়ে ওঠে।   একটি প্রজন্ম কোন বই পড়ছে, তা দিয়ে শুধু তার সাহিত্য রুচি বোঝা যায় না; বোঝা যায় সে পৃথিবীকে কীভাবে দেখতে শিখছে। বই মানুষের ভেতরের জন্য জায়গা তৈরি করে। যে মানুষ কোনো গল্পের চরিত্রের দুঃখে কাঁদতে পারে, সে বাস্তব জীবনের মানুষের কষ্টও হয়তো একটু গভীরভাবে অনুভব করতে শেখে।   তাই বই থেকে দূরে সরে যাওয়া মানে শুধু লাইব্রেরির একটি তাক থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। কখনো কখনো এর অর্থ হতে পারে নিজের সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনের একটি দরজা বন্ধ করে দেয়া। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন পৃথিবী আমাদের ক্রমাগত কথা শোনাচ্ছে; বই আমাদের সেই ভিড়ের মধ্যে কিছুক্ষণ নীরব হতে শেখায়।   হয়তো আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোনটি সরিয়ে ফেলতে হবে না। শুধু তার পাশে একটি বই রাখতে হবে। স্ক্রল করার ফাঁকে একদিন যদি আমরা একটি পৃষ্ঠা পড়ি, তারপর দুটি, তারপর দশটি, তাহলেই হয়তো পরিবর্তনের শুরু। কারণ, বই কোনো পুরোনো অভ্যাস নয়। বই এমন এক নীরব বন্ধু, যে আমাদের সময় নেয় ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় একটি গভীরতর মন, বিস্তৃততর পৃথিবী এবং নিজের ভেতর তাকানোর সাহস।  

লিমন হেমরম লিমন হেমরম সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0