Breaking news
সাহিত্যকথন কবিতা গল্প

সাহিত্যকথন

মহাবিশ্বের ক্যানভাস

অসীম নীল আকাশের নিচে আমাদের এ পৃথিবী যেন এক বিশাল নাট্যমঞ্চের ক্ষুদ্র চরিত্র মাত্র। এই মঞ্চের আসল নায়ক হলো মহাবিশ্ব আর তার কেন্দ্রে যে শক্তির অবিরাম উৎস, সে হলো নক্ষত্রসমূহ। আমাদের সূর্য সেই অসংখ্য নক্ষত্রের মধ্যে একটি সাধারণ সদস্য হলেও তার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে আমাদের জীবন, সময়, ঋতু এবং অস্তিত্বের প্রতিটি সূক্ষ্ম সুর। সূর্যকে ঘিরে গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু, উল্কা, গ্রহাণু নিয়ে যে জগৎ, তাকেই আমরা সৌরজগৎ বলি।   রাতে যখন আমরা আকাশের দিকে তাকাই, তখন যে অসংখ্য নক্ষত্রের ঝিলিমিলি আলো দেখা যায়, প্রতিটি আসলে সূর্যের মতোই জ্বলন্ত অগ্নিগোলক। কিন্তু তারা এত দূরে থাকে যে তাদের আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে বহু বছর সময় নেয়। এই আলোকে বলা হয় আলোকবর্ষের দূরত্ব। কোনো নক্ষত্রের আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, সেটাই তার দূরত্বের পরিমাপ। এভাবে আমরা বুঝতে পারি যে মহাবিশ্বের বিস্তার কত অসীম!   সূর্যের জন্ম নিয়েও বিজ্ঞানীদের নানা মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে এক বিশাল গ্যাস ও ধূলিকণার মেঘ সংকুচিত হয়ে সূর্যের সৃষ্টি হয়। এই মেঘকে বলা হয় নীহারিকা। সৌরজগতের ৯৯.৮% ভর সূর্য একাই বহন করে। বাকি ০.২% মিলে অন্যান্য গ্রহ। মহাকর্ষ বলের প্রভাবে এই নীহারিকার কেন্দ্র ধীরে ধীরে ঘনীভূত হয়ে উত্তপ্ত হতে থাকে। তাপমাত্রা এত বেড়ে যায় যে সেখানে হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হতে শুরু করে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন। এই ফিউশন থেকেই উৎপন্ন হয় বিপুল পরিমাণ শক্তি, যার আলো ও তাপ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।    সূর্যের চারপাশে যে গ্রহগুলো ঘুরছে, তাদের উৎপত্তিও সেই একই নীহারিকা থেকে। সূর্য যখন গঠিত হচ্ছিল, তখন তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান গ্যাস ও ধূলিকণাগুরো ছোট ছোট পিণ্ডে পরিণত হয়। এই পিণ্ডগুলো ক্রমে বড় হয়ে গ্রহে রূপ নেয়। পৃথিবীও সেই প্রক্রিয়ারই একটি ফল। প্রথমে এটি ছিল অগ্নিগোলকের মতো উত্তপ্ত, পরে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে কঠিন পৃষ্ঠ তৈরি হয়। অনেকে বলেন, প্রতিটি নক্ষত্রের বিকাশের বিশেষ অবস্থায় ক্রমশ এমন একটা সময় আসে, যখন সে পাকা শিমুল ফলের মতো ফেটে গিয়ে প্রচণ্ড বেগে চারদিকে পুঞ্জ পুঞ্জ অগ্নিবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। কোনো কোনো নক্ষত্র থেকে হঠাৎ জ্বলন্ত গ্যাস বেরিয়ে আসতেও দেখা যায়। পুরো মহাবিশ্বে তারার সংখ্যা প্রায় এক কোয়াড্রিলিয়ন অর্থাৎ একের পর ২৪টি শূন্য। আমাদের গ্রহের নিকটবর্তী তারা হলো প্রক্সিমা সেন্টারাই (৪.২৫ আলোকবর্ষ) ও আলফা সেন্টারাই (৪.৩৭ আলোকবর্ষ)।   সূর্যের রয়েছে আটটি গ্রহ, আর গ্রহগুলোয় রয়েছে ১৪৬টি চাঁদ। এ ছাড়া আছে একগুচ্ছ ধূমকেতু, গ্রহাণু ও মহাকাশ শিলা, বরফ এবং প্লুটোর মতো বেশ কয়েকটি বামন গ্রহ। আটটি গ্রহ হলো বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন। পৃথিবী বাদে সবই রোমান দেবতা ও দেবীর নামানুসারে রাখা হয়েছে। মানে মিথোলজি আর অ্যাস্ট্রোনমি একে অপরের সাথে দারুণভাবে জড়িত। বুধ গ্রহ সূর্যের সবচেয়ে কাছে অবস্থিত। নেপচুন সবচেয়ে দূরে। সৌরজগতের সব গ্রহ, গ্রহাণু ও ধূমকেতু আমাদের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তারা সূর্যের চারপাশে একটি সমতল বৃত্তে ভ্রমণ করে, যাকে উপবৃত্ত বলা হয়। সূর্যের চারপাশে যেতে পৃথিবীর হিসাবে এক বছর সময় লাগে। বুধ মাত্র ৮৮ দিনের মধ্যে সূর্যের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। সূর্যের চারপাশে একবার ভ্রমণ করতে সবচেয়ে বিখ্যাত বামন গ্রহ প্লুটোর ২৪৮ বছর সময় লাগে।   চাঁদগুলো গ্রহগুলোকে প্রদক্ষিণ করে। এই মুহূর্তে বৃহস্পতি গ্রহের রয়েছে সবচেয়ে বেশি চাঁদ, ৫০টি। বুধ ও শুক্রের কোনো চাঁদ নেই। পৃথিবীর একটি চাঁদ আছে। এটি আমাদের রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। সূর্য অবশ্যই আমাদের দিনের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল বস্তু। এটি চাঁদ, গ্রহ, ধূমকেতু ও গ্রহাণুগুলোকে আলোকিত করে।   গ্রহগুলোর গতির মধ্যে একটি আশ্চর্য নিয়ম লক্ষ করা যায়। তারা সবাই প্রায় একই সমতলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে এবং একই দিকে ঘুরছে। এই নিয়ম থেকে বোঝা যায় যে তাদের উৎপত্তি একত্রে এবং একই উৎস থেকে। সূর্যের মহাকর্ষ বল তাদের বেঁধে রেখেছে, কিন্তু তাদের নিজস্ব গতির জন্যই তারা সূর্যের মধ্যে পড়ে যায় না। এই ভারসাম্যই সৃষ্টি করেছে সৌরজগতের স্থিতি।   সূর্য নিজেও স্থির নয়। সে নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে। সূর্যের এই ঘূর্ণনের সময়কাল প্রায় ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পরিবর্তিত হয়। এর কারণ সূর্য কোনো কঠিন বস্তু নয়, বরং গ্যাসীয়। তাই তার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ঘোরে। সূর্যের পৃষ্ঠে যে কালো দাগ দেখা যায়, সেগুলো আসলে তুলনামূলক ঠান্ডা অঞ্চল। এই দাগগুলোর সংখ্যা সময়ের সঙ্গে বাড়ে ও কমে, এবং প্রায় ১১ বছরের একটি চক্র অনুসরণ করে। এই সূর্যকলঙ্কের প্রভাব পৃথিবীর ওপরও পড়ে। আবহাওয়া, বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন, এমনকি বিদ্যুৎচৌম্বকীয় তরঙ্গের আচরণেও এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। বিজ্ঞানীরা গাছের বয়স নির্ণয়ের মাধ্যমে অতীতের সূর্যকলঙ্কের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন। গাছের গুঁড়ির বৃত্তাকার রেখাগুলোর ঘনত্ব দেখে বোঝা যায় কোন বছরে সূর্যের কার্যকলাপ কেমন ছিল।   মহাবিশ্বের আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো এর প্রসারণ। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। অর্থাৎ নক্ষত্রসমূহ একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এ ধারণার ভিত্তি হলো, গ্যালাক্সিগুলোর আলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে তারা আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই প্রসারণের ফলে অতীতে নক্ষত্রগুলো আরও কাছাকাছি ছিল বলে অনুমান করা হয়। এই অবস্থায় নক্ষত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের সম্ভাবনা বেশি ছিল। এমন সংঘর্ষ থেকে বিশাল শক্তির বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা নতুন নক্ষত্র বা গ্রহের জন্ম দিতে পারে। আবার কোনো কোনো নক্ষত্র নিজের মধ্যেই বিস্ফোরিত হয়ে সুপারনোভা সৃষ্টি করে। এই বিস্ফোরণে নক্ষত্রের উপাদান ছড়িয়ে পড়ে মহাশূন্যে, যা থেকে নতুন নক্ষত্রমণ্ডলী গড়ে উঠতে পারে।   নক্ষত্রের অভ্যন্তরে যে শক্তির উৎপত্তি, তা এক আশ্চর্য প্রক্রিয়ার ফল। হাইড্রোজেন পরমাণুগুলো একত্র হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে, এবং এ প্রক্রিয়ায় কিছু ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ অনুযায়ী ভর ও শক্তি পরস্পরের রূপান্তরযোগ্য। এই ক্ষুদ্র ভরের পরিবর্তন থেকেই উৎপন্ন হয় বিপুল শক্তি। সূর্য প্রতিনিয়ত তার ভর থেকে শক্তি হারাচ্ছে। তবুও তার ভাণ্ডার এত বিশাল যে আরও কোটি কোটি বছর ধরে সে আলো ও তাপ ছড়াতে পারবে। কিন্তু একসময় তার জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে। তখন সে লাল দানবে পরিণত হবে এবং পরে সংকুচিত হয়ে সাদা বামন নক্ষত্রে রূপ নেবে।   এই বিশাল মহাবিশ্বে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তবুও এই ক্ষুদ্র পৃথিবীতেই জীবনের বিকাশ ঘটেছে, যা আমাদের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর! সূর্যের আলো, তাপ, এবং স্থিতিশীলতা ছাড়া এ জীবন সম্ভব হতো না। তাই সূর্য শুধু একটি নক্ষত্র নয়, আমাদের জীবনের মূল উৎস। মহাবিশ্বের উৎপত্তি, বিস্তার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন এটি একসময় ধ্বংস হয়ে যাবে, কেউ বলেন এটি চিরকাল প্রসারিত হতে থাকবে। আবার কেউ মনে করেন সৃষ্টি ও ধ্বংস একসঙ্গে চলছে। এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর এখনো অজানা।   বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে, মহাবিশ্ব আরও প্রায় ২২ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী ৩০ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত বাঁচার সম্ভাবনার কথা বলেন। তার মানে, মহাবিশ্বের জন্মের পর থেকে ১৩ বিলিয়নের বেশি সময় চলে গেছে এবং আরও ২২ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকলে মহাবিশ্বের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সময়কালকে বলা যাবে ৩৫ বিলিয়ন বছর।   একটি বিষয় নিশ্চিত, আমরা যতই জানার চেষ্টা করি, মহাবিশ্ব ততই আমাদের সামনে নতুন রহস্য উন্মোচন করে। আমাদের জ্ঞান যত বাড়ে, ততই বুঝতে পারি কত কিছু অজানা রয়ে গেছে। এই অজানার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের কৌতূহল, আমাদের অনুসন্ধান, এবং আমাদের অস্তিত্বের গভীর অর্থ। এই বিশাল জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষ তার ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে যে বিশাল সত্যকে ধরার চেষ্টা করছে, সেটাই মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় সাহস। বিজ্ঞান সেই সাহসেরই এক রূপ, যা আমাদের অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে যেতে চায়।  

মুমতাহিনা মেহনাজ অনিভা মুমতাহিনা মেহনাজ অনিভা অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
ছবি : কাঙ্গাল প্রেসের জীর্ণ কুটির
উনিশ শতকের তিন বাতিঘর

উনিশ শতকের বাংলার সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী ও ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু অঞ্চলটি ছিল এক অনন্য জ্ঞানপীঠ। এ বাংলায়, বিশেষত কুষ্টিয়া অঞ্চলের হতদরিদ্র কৃষককুলের ওপর ইংরেজ এবং এ-দেশীয় অত্যাচারী জমিদারদের অত্যাচারের খড়্গ যখন নেমে এসেছিল, সেই দুঃসময়ে আমৃত্যু প্রতিবাদী সাংবাদিক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার মানবিক তাড়নায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কৃষকদের পাশে। মফসসল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ও পূর্ব বাংলার প্রথম পত্রিকা ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র জনক হিতকরী পত্রিকার সম্পাদক আজ প্রায় পৌনে ২০০ বছর পরও মানুষের মনে জাগ্রত হয়ে আছেন।   একদিকে কাঙাল হরিনাথের আপসহীন গ্রামীণ সাংবাদিকতা, অন্যদিকে মহাত্মা লালন শাহের জাতহীন মরমিয়া সুর এবং মীর মশাররফ হোসেনের ক্ষুরধার সাহিত্যিক লেখনী—এই তিন বাতিঘরের মেলবন্ধন তৎকালীন ঔপনিবেশিক শোষণ ও জমিদারতান্ত্রিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তিনজনের পথ আলাদা মনে হলেও অন্তরের অন্দরমহলে তাঁদের সম্পর্কটি ছিল এক আত্মিক ও ঐতিহাসিক সখ্যের পরম দলিল। তবে ইতিহাসের পাতায় এই তিন মনীষী আজ যে গৌরবের আসনে ভূষিত, তাঁদের ব্যক্তিজীবনের উপাখ্যান ছিল চরম কষ্ট, ক্লেশ আর নির্মম অগ্নিপরীক্ষায় জর্জরিত। দুঃখের অতল সাগর পাড়ি দিয়েই তাঁরা একেকজন বাতিঘর হয়ে উঠেছিলেন।   ১৮৩৩ সালে জন্ম নেয়া কাঙাল হরিনাথ ছিলেন লালনের চেয়ে বয়সে ছোট। অত্যন্ত শিশুবয়সেই মা-বাবাকে হারিয়ে সম্পূর্ণ এতিম হওয়া হরিনাথের শৈশব কেটেছে অনাহারে-অর্ধাহারে। ক্ষুধা মেটাতে অনেক সময় মানুষের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা ‘পান্তা ভাত, জামিরের (লেবু) পাতা আর লবণ’ খেয়ে তাঁকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেলেও সহপাঠীদের বই আর ব্রাহ্মসমাজের ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা পড়ে নিজে নিজে চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। জীবিকার তাগিদে দৈনিক মাত্র দুই পয়সা মাইনেতে কাপড়ের দোকানে শিশুশ্রমিকের কাজও করতে হয়েছে তাঁকে। ঠিক একইভাবে মহাত্মা লালন শাহের জীবনও ছিল এক চরম ট্র্যাজেডি। তীর্থভ্রমণে গিয়ে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে যখন তিনি  মৃতপ্রায়, তখন তাঁকে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মুসলমান পরিবারে আশ্রয় পাওয়ায় তৎকালীন হিন্দু সমাজ তাঁকে আর গ্রহণ করেনি। সমাজচ্যুত, কুলহীন ও জাতহীন হওয়ার সেই তীব্র মনঃকষ্ট ও একাকিত্বকেই লালন রূপান্তর করেছিলেন তাঁর জাত-পাতহীন পরম মরমিয়া দর্শনে।   অন্যদিকে সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিলেও ‘বিষাদসিন্ধু’র রচেরিতা মীর মশাররফ হোসেনের জীবনের শেষভাগ কেটেছে তীব্র পারিবারিক অশান্তি, মামলা-মোকদ্দমা আর চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে।   ক্লেশ জড়ানো জীবনের এই অভিন্ন সুর এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই লালন ও কাঙালকে পরস্পরের ঘনিষ্ঠ করেছিল। লালন মাঝেমধ্যে কুমারখালীতে কাঙাল-কুটিরে আসতেন, আর কাঙালও দলবল নিয়ে যেতেন ছেঁউড়িয়ায়। শিষ্যদের দল বেঁধে আসতে দেখে লালন তখন গ্রামীণ বাৎসল্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠতেন, “ওরে আমার পুনা (পোনা) মাছের ঝাঁক এসেছে।” এই লড়াইয়ে হরিনাথ একা ছিলেন না; জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী যখনই হরিনাথকে আক্রমণ করতে উদ্যত হতো, মহাত্মা লালন শাহ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে তাঁর সুরক্ষায় ঢাল হয়ে দাঁড়াতেন। এই ঐতিহাসিক বলয়ের সখ্যের প্রমাণ ছড়িয়ে ছিল শিলাইদহের পদ্মাবক্ষেও।   প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর ‘লালন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ১৮৮৯ সালের ৫ মে শিলাইদহের বোটে দামি চেয়ারে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুনদাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের যে ঐতিহাসিক রেখাচিত্র বা স্কেচ এঁকেছিলেন, তা-ই আজ লালনের একমাত্র প্রামাণ্য অবয়ব। যেখানে দেখা যায় বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া  লাঠি হাতে এক লালনকে। অথচ এই আসল ছবিটির কথা দীর্ঘদিন কেউ জানতে না পারায় ১৯১৬ সালে নন্দলাল বসুর আঁকা একটি কাল্পনিক প্রতিকৃতিই দীর্ঘদিন ধরে লালন শাহের চেহারা হিসেবে সব বইয়ে ছাপা হয়ে আসছিল। লালনের এই মরমিয়া দর্শন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও এতটাই মজিয়েছিল যে, তিনি লালনের ‘অচিন পাখি’ গানের অন্তর্নিহিত ভাবকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন এবং ১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন মহাসভায় প্রদত্ত তাঁর ‘The Philosophy of Our People’ শীর্ষক ঐতিহাসিক অভিভাষণে তা উদ্ধৃত করে এক আধ্যাত্মিকতার পরম ছোঁয়া বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন।   কুমারখালীতে কাঙাল হরিনাথের নিজের হাতে গড়া পূর্ব বাংলার প্রথম মুদ্রণালয় ‘এমএন প্রেস’ ছিল এই মনীষীদের মূল মিলনমেলা। কুমারখালীতে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করতে আসা পণ্ডিত দয়াল শিরোমণির কাছে ব্যাকরণ শেখা হরিনাথ পরবর্তী সময়ে শৈশবে মারা যাওয়া এক প্রিয় বন্ধুর নামে এই প্রেসের নামকরণ করেছিলেন। রাজশাহীর রানি স্বর্ণকুমারীর অর্থ আনুকূল্যে নিলামে ৬০০ টাকায় কেনা লন্ডনের ‘ক্লাইম্যান ডিক্সন কোং’-এর (মডেল ১৭০৬) এই প্রেসের ঘরেই লালন শাহ ও মীর মশাররফ হোসেন একসাথে বসতেন। এই প্রেস থেকেই মীর মশাররফের অমর সৃষ্টি ‘বিষাদসিন্ধু’, কাঙাল হরিনাথের নিজের ‘বিজয় বসন্ত’সহ ১৮টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি ফকির লালন শাহর প্রায় ২১টি লালনগীতি বই আকারে প্রথম এই এমএন প্রেস থেকেই আলো দেখেছিল।   লালন শাহের গুরু হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুর গ্রামের পরম দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের জাত-পাতহীন সর্বজনীন মানবধর্মের যে মূল বাণী, ‘মানুষে মানুষে কোনো ভেদ নেই’—তা হরিনাথ ও মশাররফ উভয়ের চেতনাকেই ভীষণভাবে তাড়িত করেছিল। মাঠপর্যায়ের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং সমকালীন বিভিন্ন তথ্যচিত্র অনুযায়ী, ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয়া পেশায় পালকি বাহক ও অন্তরাল-নিবাসী মহান সাধক সিরাজ সাঁই-ই ছিলেন লালন-মানস গঠনের মূল আঁতুড়ঘর।   ১৯১০ সালে প্রকাশিত গবেষক বসন্তকুমার পালের ঐতিহাসিক ‘মহাত্মা লালন ফকির’ গ্রন্থে লালনের শিষ্যদের বরাতে সিরাজ সাঁইয়ের দীক্ষাগুরু হওয়ার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা-ই পরবর্তী সময়ে লালন-মানসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যৌবনের শুরুতে মুমূর্ষু লালনকে বাঁচিয়ে তুলে তিনি যে অসাম্প্রদায়িক বিশ্বদর্শনের বীজ বুনে দিয়েছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফকেও তাড়িত করে। যার ফলে ১৮৯০ সালে লালন শাহের তিরোধানের মাত্র পনেরো দিন পর, ৩১ অক্টোবর মীর মশাররফ হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত ঐতিহাসিক ‘হিতকরী’ পত্রিকায় লালনকে নিয়ে প্রথম প্রামাণ্য জীবনীমূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেখানে মশাররফ হোসেন লিখেছিলেন, “লালন ফকীরের নাম এ অঞ্চলে কাহারও শুনিতে বাকী নাই... ইহাকে আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি; আলাপ করিয়া বড়ই প্রীত হইয়াছি।” লালন ও মশাররফের এই প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ আলাপ ও সখ্যের প্রামাণ্য ইতিহাস এবং লালন যে দর্শনকে একতারার সুরে আখড়ায় বেঁধে রেখেছিলেন, কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফ হোসেন তাঁদের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মাধ্যমে তাকে সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন।   তবে ইতিহাসের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের বর্তমান বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মন বিষণ্নতায় ভরে ওঠে। সম্প্রতি কুমারখালীতে সরকারনির্মিত অত্যাধুনিক ও নান্দনিক ‘কাঙাল হরিনাথ জাদুঘর’ দেখতে গিয়েছিলাম। ২০১৭ সালে চালু হওয়া এই আধুনিক ভবনে সুবিন্যস্ত হস্তলিপি, সরঞ্জাম ও ব্লকের সম্ভার দেখে মন ভরে উঠলেও এক চরম সত্য জানার পর তা বিষাদে রূপ নেয়। জাদুঘরে টিকেট কেটে দর্শনার্থীরা যে মুদ্রণযন্ত্র ও ধাতব অক্ষরের বাক্সটি দেখেন, সেটি আসলে কাঙালের ব্যবহৃত মূল যন্ত্র নয়, তা কেবলই একটি সদৃশ মডেলমাত্র! প্রসঙ্গত লালনের সরাসরি ভাবশিষ্য গগন হরকরা বিশ্বকবির শিলাইদহ পোস্ট অফিসের প্রধান রানার বা হরকরা, যিনি গানের সুরে সুরে চিঠি বিলি করতেন, তাঁর ইতিহাস চাপা পড়ে গেছে শিলাইদহের মাটিতেই।   আসল ইতিহাস ও ঐতিহ্য আজও পড়ে আছে জাদুঘর থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে কুণ্ডুপাড়ার জরাজীর্ণ, ধ্বংসপ্রায় কাঙাল কুটিরে। সেখানে কাঙাল হরিনাথের চতুর্থ পর্যায়ক্রমের বংশধর শ্রী অশোক মজুমদারের স্ত্রী ষাটোর্ধ্ব গীতারানী মজুমদারের চাবির টানে যখন এমএন প্রেসের স্যাঁতসেঁতে, গুমোট ঘরটি খোলে, তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক করুণ দৃশ্য। মেঝেটি অমসৃণ, ওপরের টিনের চালা ফুটো হয়ে ভেঙে পড়ার দশা। অথচ এই ভাঙা ঘরের কোণেই অবহেলায় পড়ে আছে কাঙাল হরিনাথ, লালন শাহ আর মীর মশাররফের স্মৃতিধন্য সেই আসল ঐতিহ্যের মূল ছাপাখানা ও অক্ষরের বাক্স। বংশধরদের কর্মসংস্থান, আবাসন ও সামান্য কিছু দাবিদাওয়া সরকার আমলে না নেয়ায় এই অমূল্য জাতীয় সম্পদ আজও অরক্ষিত ও ধ্বংসের মুখে।   আজকের বৈষয়িক ও কর্পোরেট সাংবাদিকতার যুগে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই তিন বাতিঘরের অবিনাশী সখ্য এবং বর্তমানের এই অদ্ভুত বৈপরীত্য আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সুধীর চক্রবর্তী তাঁর গ্রন্থে আক্ষেপ করেছিলেন যে, আমাদের প্রথাগত ইতিহাস বা সংবাদমাধ্যম বরাবরই এই লৌকিক সাধকদের ব্রাত্য করে রেখেছে। অথচ লালন তাঁর গানে ‘পেঁচোপেঁচি’ বা ‘আলীক কুহকের’ মতো গ্রামীণ অন্ধ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আজীবন গেয়েছেন, ‘মানুষ হয়ে মানুষ চেনো / মানুষ হয়ে মানুষ মানো’।   বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা ও সাহিত্য কেবল শুষ্ক তথ্যের আদান-প্রদান নয়, তার পেছনে যদি লালন-সিরাজ সাঁইয়ের এই আধ্যাত্মিক সততা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সুফিবাদের অহিংস দর্শন না থাকে, তবে তা সমাজকে প্রকৃত আলো দিতে পারে না। সামান্য দূরত্বের ব্যবধানে নান্দনিক ভবনে নকলের প্রদর্শনী আর ভাঙা ঘরে আসলের অবলুপ্তি—আমাদের জাতীয় উদাসীনতারই এক চরম দলিল। হরিশপুরের ধুলোবালি থেকে কুমারখালীর কাঙাল প্রেস—ইতিহাসের এই তিন বাতিঘরের আসল আলোটুকু বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।  

মাকসুদুল হক মাকসুদুল হক অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0
নজরুলের চোখে প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের সমাজ

বাংলাদেশের কবিদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) সবচেয়ে জনপ্রিয়, যশখ্যাতি ও শিল্পনৈপুণ কবি। রবীন্দ্র যুগে রবীন্দ্র বলয় থেকে মুক্ত হয়ে ব্যতিক্রমী ও প্রতিবাদী কবিতা লিখে খুবই অল্প সময়ে নজরুল যশখ্যাতি অর্জন করেন। ব্রিটিশ শাসকের শোষণের বিরুদ্ধে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা লেখা হলেও এই কবিতা এবং অন্যান্য কবিতা যুগ যুগান্তরে সমসাময়িক হয়ে থাকবে।   যুগ থেকে যুগান্তর, কাল থেকে কালান্তর নজরুলের কবিতা সমসাময়িক। নজরুল শুধু বিদ্রোহী ছিলেন তেমন নয়, আপাদমস্তক একজন প্রেমিকও ছিলেন। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে যেমন উঠে এসেছে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ, তেমনি ‘দোলনচাঁপা’তে ফুটে উঠেছে রোমান্টিক প্রণয়। এই বিদ্রোহী কবির জীবনেও প্রেম এসেছে এবং রাঙিয়েছে তাঁর ক্ষণিকের জীবন। কিন্তু প্রেমটা রূপ না পেয়ে বিদ্রোহীটায় রূপায়িত হয়েছে কবির জীবনে। নজরুলই একমাত্র কবি, যাঁর কবিতায় প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যের দেখা পাওয়া যায়। তাঁর বাস্তব জীবনেও তিনি যে সাম্যের সুর তুলেছিলেন,সেই সাম্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।   ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে নজরুলই প্রথম কাগজে কলমে লিখে প্রতিবাদ করেন। তাঁর বিদ্রোহী কবিতায় তাদের অবসান চেয়েছেন। চেয়েছেন তাদের ধ্বংস করতে। তাদের আইনের অনিয়ম উশৃঙ্খল তিনি সাইক্লোনের মতো তাণ্ডব চালিয়ে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। হাজার মাইল দূর থেকে ভরা তরি দিয়ে নিয়ে আসা শোষণের অস্ত্র ভরাডুবি করতে চান। তাঁর কবিতায় একদিকে আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো দাও দাও করে জলে উঠে আবার অন্যদিকে ভারতবাসীকে প্রেমের সুধা পান করিয়ে সাম্যের গান শোনান। নজরুল জাতিকে আপন সুরের মূর্ছনায় মুক্তি দিতে চেয়েছেন। তিনি ‘আপনাকে’ ছাড়া কাউকে কুর্নিশও করেন না। জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ও বাঁচাতে শেখালেন, শিখিয়েছেনও। বিদ্রোহী কবিতায় তার মনোভাব এমন— বল বীর— বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রীর।   তিনি বিনয়কে প্রশ্রয় দিতে চান না। যে বিনয় মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্রে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায় না তাকে তিনি নৃশংস করে দিতে চান। কবির ভাষায়— আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস মহাপ্রলয়ে আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর!   তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ কাব্য একদিকে রাজনৈতিক বিদ্রোহী মনোভাব, অন্যদিকে ব্রিটিশদের ভয়ের কারণ। অগ্নিবীণা কাব্যই বাঙালিসহ পুরো ভারতবাসীকে প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। সংগ্রাম ও বিপ্লব ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব নয়, সেটা নজরুল বুঝতে পেরেছেন। সে জন্য তাঁর প্রথম কাব্যও বিপ্লবী। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে নজরুল আঙুল তুলে প্রতিবাদ করেছেন। ‘প্রলয়োল্লাস’-এ তিনি বলেন— তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! ঐ নতুনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়। তোরা সব জয়ধ্বনি কর!   ‘রক্তাম্বরধারিণী মা’ কবিতায় তিনি বাঙালি নারীর অন্তর্জালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অগ্নিশ্বেতের যশ তুলে দিয়েছেন। তিনি বলেন— রক্তাম্বর পর মা এবার জলে পুড়ে যার শ্বেত বসন। দেখি ঐ করে সাজে মা কেমন বাজে তরবারি ঝনন-ধন সিঁথির সিঁথু মুছে ফেল মাগো জ্বাল সেথা জ্বাল কা্ল চিতা।   ‘ধূমকেতু’ কবিতায়ও তাঁর বিদ্রোহ মনোভাবকে উপেক্ষিত করতে পারেননি। ‘ধূমকেতু’ কবিতায় যে বিপ্লবী চেতনা নজরুলের, তা স্পষ্ট ভীম ভাসমান মাইনের মতোই।  তিনি বলেন— আমি যুগে যুগে আসি আসিয়াছি পুন মহাবিপ্লব হেতু! এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু সাত-সাতশো নরক জ্বালা জ্বলে মম ললাটে।  মম ধূম-কুণ্ডলী করেছে শিবের ত্রিনয়ন ঘন ঘোলাটে।   নজরুলের নাম শুনলেই আমাদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা পোষণ করে তিনি একজন বিদ্রোহী কবি। কিন্তু নজরুল একজন সত্যিকারের প্রেমিক, তা খুবই অল্প চোখে পড়ে। বিদ্রোহের মধ্যেও তিনি প্রেমকে রূপায়িত করেছেন। প্রেম মানুষকে করে মানবিক। প্রেমকে তিনি ভুলে যেতে পারেননি। ‘দোলনচাঁপা’ কাব্যে তার প্রেমের প্রতিফলন ঘটেছে। আর এই প্রেমের পেছনে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যেই পরিবর্তন হয়েছে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করে বলেন— হে রস শেখর কবি, তব জন্মদিনে আমি কয়ে যাব মোর নবজন্ম-কথা। আনন্দ সুন্দর তব মধুর পরশে অগ্নিগিরি-গিরি মল্লিকার ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে! জুড়ায়েছে সব দাহ জ্বালা।   এ কাব্যে প্রেমের বেদনা, প্রেমকে মহিমান্বিত করা এবং প্রেমের আনন্দ অনুভব করা নিয়ে কবির রোমান্টিকতার পরিচয় ফুটে ওঠে। বাদল দিনে প্রেমিকাকে বলেন— ব্যাকুল বনরাজি বসিছে ক্ষণে ক্ষণে সজনী! মন আজি গুমরে মনে মনে। বিদরে হিয়া মম  বিদেশে প্রিয়তম এজনু পাখী সম  বরিষা জর-জর।   ‘চৈতী হাওয়া’ কবিতায় কবির প্রেমিকাকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে। এক চৈত্রে প্রেমিকার সাথে হাত ধরে পুকুরঘাটে হেঁটেছেন, পাখির সুর শুনেছেন। কিন্তু পরবর্তী চৈত্রে প্রেমিকার শূন্যতা অনুভব করে কবি বলে— বইছে আবার চৈতী হাওয়া গুমরে ওঠে মন পেয়েছিলাম এমনি হাওয়ায় তোমার পরশমন।   দিঘির পাড়ে যেমন ফুল ফুটে দিঘিকে সাময়িক সুন্দর করে তোলে, তেমনি কবির জীবনকেও প্রেম এসে রং তুলেছিল। কিন্তু তা ছিল ক্ষণিকের মতো। কবি বলেন— শূন্য ছিল নিতল দিঘির শীতল কালোজল কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথার নীলোৎপল?   নজরুলই প্রথম কবি, যিনি সাম্যের কবিতা লিখে সব ধর্মের ভেদাভেদকে ভুলে মানবতাকে ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। শুধু স্থান দিয়েই ক্লান্ত হননি, বাস্তব জীবনেও তার প্রভাব দেখা যায় নার্গিসের পর প্রমিলাকে বিয়ে করা এবং সন্তানদের নাম রাখা। এমন সাহসী ও মানবতাবাদী কবি বাংলা সাহিত্যে বিরল। ধর্মের নামে এই ভারতবর্ষে তথা বাঙালিদের মধ্যে এক সাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ বোনেন, যার ফলে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে দেশান্তর হতে হয়েছে। রাস্তায় মৃত্যুর লাশে ভর্তি ছিল। নজরুলের মনে এসবের দাগ কাটে এবং তিনি সব ধর্মকে না দেখে মানুষের চোখে দেখে সাম্যের গান গেয়েছেন।   ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় তিনি বলেন— গাহি সাম্যের গান— যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান।   মানুষ পরিচয়কে তিনি বড় করে দেখেছেন। কেননা মানুষই মানুষকে কাছে টেনে নেয়। কিন্তু ধর্মের নামে অধার্মিকের সাম্প্রদায়িকতা মানুষকে বলি করে। তাই নজরুল তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় বলেন— গাহি সাম্যের গান— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি সবদেশে, সবকালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।   নজরুলের তিনটি কাব্য (অগ্নিবীণা, দোলনচাঁপা ও সাম্যবাদ) বাংলা সাহিত্যে অমর ও শাশ্বত। প্রেম, দ্রোহ ও সাম্যচর্চা কবিজীবনকে করেছে ভিন্ন মাত্রার ভিন্ন শিল্পী। অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে সংসারের দায়িত্ব এবং লেটো দলে যোগদান কবির জীবনকে মুক্ত করে তুলেছে। তরুণ বয়সেই নজরুল তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তাঁকে বিদ্রোহ করে তুলেছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের শাসন নজরুলকে বিদ্রোহী করে তুলেছিল। অঞ্চলের প্রভাবও নজরুলের মধ্যে প্রভাবিত করেছে। আসানসোলের চুরুলিয়া অঞ্চল ছিল রুক্ষ এবং কিছুটা ফসলহীনতার। ফলে নজরুলের মনোভাবও সেভাবে গড়ে ওঠে।   আধুনিক সময়ে নজরুলকে নিয়ে এবং তাঁর সাহিত্য নিয়ে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তা ফলশ্রুতি নয়। এই কবিকে নিয়ে আরও বিস্তৃত এবং গবেষণা করা উচিত। তাঁর কবিতার ফলে সাহিত্য নতুন ধারার রূপায়ণ হয়েছে। নজরুলের সাম্যের সমাজ ইউরোপীয় ভাবধারার নয়, বরং হাজার বছরের ভারতীয় ভাবধারার সাম্যের সমাজ। এই সাম্য তখন পর্যন্ত ছিল, যখন বিদেশিরা ভারত উপমহাদেশে আসেনি। বাইরে থেকে এসে তারা ভারতীয় সাম্যকে বিনষ্ট করে দিয়েছে। নজরুল সেই সাম্যকে উজ্জীবিত করতে সারা জীবন আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। যতদিন না নজরুলের এই সাম্য প্রতিষ্ঠা হবে, ততদিন সাম্প্রদায়িকতা আমাদের গ্রাস করবে।   কবিতার শব্দ যেন একেকটা আগুনের গোলা। প্রেমের শব্দগুলো যেন স্বর্গীয় সুখাচ্ছন্দে লেখা। নজরুলকে নিয়ে এই সময়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন।      

শহীদুল ইসলাম শুভ শহীদুল ইসলাম শুভ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
কেতকী কুশারী ডাইসন : দুই ভাষা, দুই ভূগোলের মধ্যে এক সেতুর অবসান

বাংলা সাহিত্য আজ এক গভীর ক্ষতির সম্মুখীন। প্রয়াত হলেন কবি, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, অনুবাদক, গবেষক ও সাহিত্যসমালোচক কেতকী কুশারী ডাইসন (১৯৪০–২০২৬)। ৮৬ বছর বয়সে তাঁর প্রয়াণ শুধু একজন বিশিষ্ট লেখকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র বৌদ্ধিক পরিসরের অবসান। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর স্বামী রবার্ট ডাইসন এবং দুই পুত্র ভার্জিল পূজারী ডাইসন ও ইগর নীলাদ্রি ডাইসন তাঁকে রেখে গেছেন।   কেতকী কুশারী ডাইসন ছিলেন এমন এক লেখক, যাঁকে কোনো একটি ভূগোল, ভাষা বা সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করা যায় না। তিনি কলকাতায় জন্মেছিলেন, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গভীরে বেড়ে উঠেছিলেন, পরে অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ব্রিটেনে স্থায়ী হন। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব কখনো তাঁকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং প্রবাসের দূরত্ব তাঁর বাংলা-সত্তাকে আরও গভীর, আরও আত্মসচেতন করে তুলেছিল। তাঁর নিজের ভাষায়, তাঁর লেখক-পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দ্বিভাষিকতা ও দ্বিসাংস্কৃতিকতা—বাংলা ও ইংরেজি, ভারত ও ব্রিটেন, দেশ ও প্রবাসের মধ্যে এক সক্রিয় যাতায়াত।    তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা খুব অল্প বয়সেই। ষাটের দশক থেকে তিনি বাংলা সাহিত্যপত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন; দেশ-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। ছাত্রজীবন থেকেই সম্পাদনা ও সাহিত্যচর্চায় তাঁর আগ্রহ ছিল। বাংলা কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, ইংরেজি কবিতা, অনুবাদ, গবেষণা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ ছিল। তাঁর রচনার তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সাহিত্যিক ঘরানার লেখক ছিলেন না; তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বহুমাত্রিক।    কেতকীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর দ্বিভাষিক সত্তা। বাংলা ও ইংরেজিকে তিনি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাষা হিসেবে দেখেননি। বরং দুই ভাষাকে তিনি দুটি আলাদা জানালা হিসেবে ব্যবহার করেছেন—যে জানালা দিয়ে একই পৃথিবীকে ভিন্ন ভিন্ন আলোয় দেখা যায়। তাঁর বাংলা যেমন প্রবাসের অভিজ্ঞতা বহন করেছে, তেমনই তাঁর ইংরেজি লেখার মধ্যে ভারতীয়, বিশেষত বাঙালি সাংস্কৃতিক স্মৃতি প্রবলভাবে উপস্থিত থেকেছে। এ কারণেই তাঁকে শুধু ‘প্রবাসী বাঙালি লেখক’ বলা যথেষ্ট নয়। তিনি ছিলেন এক অর্থে দেশান্তরিত হয়েও মাতৃভাষার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করা এক সাহিত্যিক।   তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি কখনো বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। প্রকৃতি, প্রেম, নারী, শরীর, মাতৃত্ব, যুদ্ধ, হিংসা, অভিবাসন, সাংস্কৃতিক পরিচয়—সবই তাঁর কবিতার বিষয় হয়েছে। তাঁর ইংরেজি কবিতা দ জুন মাগ্নিফিসিয়েন্ট এর মতো রচনায় ব্যক্তিগত প্রকৃতিচেতনা হঠাৎ যুদ্ধ ও মানবিক বর্বরতার ভয়াবহতার সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড়ায়। এই বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতাকে নিছক আত্মকথন থেকে বৃহত্তর মানবিক বিবেকের কবিতায় পরিণত করেছে।    বাংলা সাহিত্যে তাঁর উপন্যাস ও অন্যান্য গদ্যরচনাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’, ‘নারী’, ‘নগরী’, ‘জল ফুঁড়ে আগুন’, ‘তিসিডোর’, ‘চলন্ত নির্মাণ’, ‘ভাবনার ভাস্কর্য’, ‘শিকড় বাকড়’ প্রভৃতি রচনায় ব্যক্তিমানুষ, সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জটিল সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়েছে। তিসিডোর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—বাংলা সাহিত্য, ইউরোপীয় জীবন এবং স্মৃতির নানা স্তরকে এক বহুস্বরিক কাঠামোয় নিয়ে আসার এক অভিনব প্রয়াস। তাঁর নাটকগুলোও তাঁর বহুমাত্রিক সাহিত্যিক প্রতিভার পরিচায়ক।   তবে কেতকী কুশারী ডাইসনের সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি নিঃসন্দেহে রবীন্দ্র-গবেষণা ও অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা বাংলা ও আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অধ্যায়কে নতুনভাবে উন্মোচিত করেছে।  রবীন্দ্রনাথের শিল্প, বিশেষত তাঁর চিত্রকলা নিয়েও তিনি গভীরভাবে কাজ করেছেন।   রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি ভাষার বৃহত্তর পাঠকমণ্ডলীর কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। তিনি অনুবাদকে কেবল ভাষান্তর হিসেবে দেখেননি; তাঁর কাছে অনুবাদ ছিল সংস্কৃতির মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠার একটি সৃজনশীল কাজ। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও অন্যান্য রচনার তাঁর ইংরেজি অনুবাদ বিভিন্ন সংকলন ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে।   কেতকী কুশারী ডাইসনের সাহিত্যচিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীবাদ, অভিবাসন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতাকে তিনি কেবল নস্টালজিয়ার বিষয় করেননি। বরং প্রশ্ন তুলেছেন—একজন মানুষ যখন এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে যায়, তখন তার পরিচয় কীভাবে বদলায়? মাতৃভাষা কি ভৌগোলিক সীমান্ত পেরিয়ে টিকে থাকতে পারে? নারী কি একই সঙ্গে পরিবার, সমাজ, দেশ, ভাষা ও ব্যক্তিসত্তার নানা প্রত্যাশা বহন করতে পারে?   এই প্রশ্নগুলোই তাঁকে তাঁর সময়ের অনেক লেখকের থেকে পৃথক করেছে। তাঁর সাহিত্য ছিল পরিচয়ের রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন, কিন্তু কখনো সরল রাজনৈতিক স্লোগানে পর্যবসিত হয়নি।   তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে একধরনের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা ছিল। তিনি প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে সহজে মেনে নিতেন না। বাংলা সাহিত্যকে তিনি ভালোবাসতেন, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের আত্মতুষ্টিকে প্রশ্ন করতেও দ্বিধা করেননি। ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন, কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি দায় কখনো বিসর্জন দেননি। প্রবাসে থেকেও বাংলা পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। ফলে ‘দেশে থাকা’ এবং ‘দেশের বাইরে থাকা’—এই প্রচলিত দ্বৈততাকে তাঁর জীবন ও সাহিত্য অনেকটাই অস্বীকার করেছে।    তাঁর জীবন যেন নিজেই একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক যাত্রা—কলকাতা থেকে অক্সফোর্ড, বাংলা থেকে ইংরেজি, ভারত থেকে ব্রিটেন, ব্যক্তিগত স্মৃতি থেকে বিশ্ব-ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথ থেকে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, নারী-অভিজ্ঞতা থেকে অভিবাসী-পরিচয়। কিন্তু এসব যাত্রার কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—আমি কে, এবং কোন ভাষায় আমি আমার অস্তিত্বকে সবচেয়ে সত্য করে বলতে পারি? সম্ভবত এখানেই কেতকী কুশারী ডাইসনের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক উত্তরাধিকার।   আজ তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য একজন লেখককে হারাল, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে গেল। প্রবাসী সাহিত্য মানে কেবল দেশকে মনে করা নয়; দ্বিভাষিক সাহিত্য মানে কেবল দুটি ভাষায় লেখা নয়; অনুবাদ মানে কেবল এক ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় বসানো নয়। এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে নতুন পরিচয়, নতুন পাঠ এবং নতুন সাংস্কৃতিক সংলাপ সৃষ্টি করা যায়—কেতকী কুশারী ডাইসনের জীবন ও সাহিত্য তারই প্রমাণ।   তিনি চলে গেলেন, কিন্তু বাংলা ভাষার সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক, তা কোনো ভূগোলের সীমান্তে থেমে থাকবে না। তাঁর কবিতা, তাঁর গবেষণা, তাঁর রবীন্দ্রচর্চা, তাঁর অনুবাদ, তাঁর নারীবাদী ও প্রবাসী চেতনা, তাঁর দ্বিভাষিক সাহিত্যকর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনবে।   কিছু মানুষ মৃত্যুর পর অনুপস্থিত হন; কিছু মানুষ মৃত্যুর পর আরও গভীরভাবে উপস্থিত হয়ে ওঠেন। কেতকী কুশারী ডাইসন সেই দ্বিতীয় দলের মানুষ। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। বাংলা সাহিত্যের এক বিশ্বনাগরিক কণ্ঠের প্রতি শেষ প্রণাম।

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
হিটলার : ধ্বংস ও সৃষ্টি

মানব ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ব্যক্তিদের একজন হলেন অ্যাডলফ হিটলার, যাঁর নাম লেখা আছে কলঙ্কের কালিতে। হিটলারকে নিষ্ঠুর খলনায়ক হিসেবে চিন্তা করাটা যতটা সহজ, তার চেয়েও কঠিন একজন শিল্পী হিসেবে কল্পনা করা। হ্যাঁ, লাখ মানুষের প্রাণ হননকারী হিটলারের মধ্যেও লুকিয়ে ছিল এক শিল্পীমন। বলাই বাহুল্য যে হিটলার যদি সুযোগ পেতেন তার চরিত্রের এই দিকটি উন্মোচন করার, তাহলে ইতিহাসের গতিপথ হতো ভিন্ন।   অ্যালুইস হিটলারের তৃতীয় স্ত্রী ক্লারার গর্ভে ১৮৮৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন হিটলার। ছোটবেলা থেকেই ছিল তাঁর উগ্র মেজাজ, হরহামেশাই বাকবিতণ্ডায় জড়াতেন বাবার সাথে। অনেক মারও খেতেন বাবার হাতে। অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে জার্মান জাতীয়তাবাদের ভূত ঢুকে গিয়েছিল, যদিও তিনি জন্মসূত্রে অস্ট্রিয়ান; হাবসবার্গ রাজতন্ত্র তখন তাঁর মৃত্যুশয্যায়। তাই তরুণদের মাঝে ওইরূপ মনোভাব খুব একটা বিরল ছিল না।   মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে বড়সড় ধাক্কা খান তিনি। ততদিনে হিটলার সোজা কথায় বখে গিয়েছিলেন। তাই ওই বয়সে বাড়ি ছাড়তে চাইলে তার মা-ও আর বাধা দেননি। স্কুলও ছেড়ে দিলেন তিনি। অবশেষে ১৯০৭ সালে লিন্জ ছেড়ে পাড়ি জমালেন ভিয়েনায়; উদ্দেশ্য চিত্রকলা অধ্যয়ন করবেন। এতিম ভাতা আর মায়ের সাহায্যে আবেদন করলেন ‘Academy of Fine Arts Vienna’-তে, কিন্তু ভাগ্য তার প্রতি ছিল নির্দয়। একবার নয় বরং দুবার প্রত্যাখ্যান করা হয় তাঁকে। তাঁর চিত্রকর্ম দেখে পরিচালক পরামর্শ দিয়েছিলেন হিটলারের উচিত স্থাপত্যবিদ্যায় অধ্যয়ন করা; কিন্তু সেটা করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা তাঁর ছিল না। একই বছর মাকে হারিয়ে একদম ছন্নছাড়া হয়ে পড়েন তিনি।   তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন আজকের প্রতিপাদ্য নয়, বরং চলুন ঢুঁ মারা যাক তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্মের দুনিয়ায়। ‘Academy of Fine Arts Vienna’-র পরিচালক কেন হিটলারকে স্থাপত্যবিদ্যা পড়ার জন্য বলেছিলেন, তা তাঁর চিত্রকর্মের ‘সাবজেক্ট ম্যাটার’-এর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তিনি ভবন, স্থাপত্য আর ল্যান্ডস্কেপ আঁকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। বলা হয়, তিনি গ্রেকো-রোমান ক্লাসিজম, ইতালীয় রেনেসান্স এবং নিও-ক্লাসিজম দ্বারা বেশ গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। রুডলফ ফন আল্ট যিনি তাঁর ভাবগুরু ছিলেন, তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন।   ১৯১৪ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে যোগ দেন প্রথম মহাযুদ্ধে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জার্মান ফ্রন্টিয়ারে তিনি, তাঁর কাজ ছিল বার্তা আদান-প্রদান করা। পশ্চিম রণাঙ্গনের ধ্বংসের মধ্যেও খাতা আর পেন্সিল নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটত তাঁর ছবি এঁকে। যুদ্ধ শেষের সাথে সাথে যেন মৃত্যু ঘটল তাঁর শিল্পসত্তার; পুরোদমে নেমে পড়লেন রাজনীতিতে। ভাইমার প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে কঠিন অবস্থান, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং সবশেষে ভোটের মাধ্যমে জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়া; এক অবিশ্বাস্য উত্থান পর্ব।   হিটলারের মৃত্যুর পর তাঁর আঁকা বিশাল সংখ্যক ছবি মার্কিন সেনারা জব্দ করে নিয়ে যায় আমেরিকায়। যদিও তা সাধারণ প্রদর্শনের অনুমতি পায় না। বাকি অনেক ছবি ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের সংগ্রহে আছে, যা বিভিন্ন সময়ে নিলামে বিক্রি হয়েছে। ২০১৫ সালে তাঁর আঁকা ১৪টি চিত্রকর্মের একটি সংগ্রহ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। একক সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হওয়া চিত্রকর্মটি হলো ‘Standesamt und Altes Rathaus München’, যার দাম উঠেছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ডলার।   হিটলার শিল্পী হিসেবে বরেণ্য বা উচ্চমার্গীয় ছিলেন কি না তা তর্কের বিষয়, তবে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধের উদ্দেশ্য হরো হিটলারের শিল্পী মনের উদ্ঘাটন করা। শিল্প এমন এক বস্তু, যা সৃষ্টি ও ধ্বংস দুইয়ের মাঝেই বিরাজমান।

মোহাম্মদ মিনহাজ মোহাম্মদ মিনহাজ অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
বিত্তের উপাসনা বনাম চিত্তের আলো

মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় দুটি চালিকাশক্তি সব সময় সমান্তরালভাবে কাজ করেছে। একটি হলো অর্থ বা বস্তুগত ক্ষমতা, অন্যটি হলো জ্ঞান বা মননশীল প্রজ্ঞা। কিন্তু সভ্যতার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব সব সময়ই দৃশ্যমান ও তাৎক্ষণিক বৈষয়িক লাভের পেছনে ছুটেছে। ফলে জ্ঞানীর অমূল্য প্রজ্ঞা ও দিকনির্দেশনা যেখানে নির্জনতায় গুমরে মরে, সেখানে ধনীর আঙিনা মুখরিত থাকে চাটুকার, অন্বেষী ও সুবিধাবাদীদের কোলাহলে। টাকাওয়ালা মানুষের কাছে সমাজের এই অন্ধ ভিড় জমানো এবং জ্ঞানী ব্যক্তির একাকিত্ব কেবল সাময়িক কোনো প্রবণতা নয়, এটি একটি ক্ষয়িষ্ণু সমাজের নৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ।   মানুষ স্বভাবতই অভাবী এবং সে সব সময় তার বর্তমান ও ভবিষ্যতের বস্তুগত নিরাপত্তা খোঁজে। টাকা মানুষকে তাৎক্ষণিক জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্য, ক্ষমতা এবং কৃত্রিম সামাজিক মর্যাদা এনে দেয়। এই লোভ ও জাগতিক নিরাপত্তার তাগিদেই মানুষ ধনীর চত্বরে ভিড় জমায়। এই চিরন্তন মানবীয় দুর্বলতা নিয়ে গ্রিক দার্শনিক প্লেটো  বলেছিলেন, “টাকা মানুষের চরিত্রের আসল রূপ প্রকাশ করে না, বরং মানুষের ভেতরের লোভ আর স্বার্থপরতাকে টেনে বের করে।” ধনীর চারপাশে যে মানুষের ঢল আমরা দেখি, তা মূলত ব্যক্তির প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নয়; বরং তার বিত্তের প্রতি স্বার্থান্বেষী মানুষের লোভের নগ্ন প্রতিফলন।   বাঙালি সমাজ, সাহিত্য ও দর্শনে অর্থের চেয়ে বিদ্যা এবং মনের সমৃদ্ধিকে সব সময়ই উচ্চে স্থান দেয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতার এই নির্মম রূপটি আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের কলমেও বারবার ক্ষোভের সাথে উঠে এসেছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের এই বাহ্যিক ধন-সম্পদের পেছনে ছোটার অন্ধত্বকে ইঙ্গিত করে তাঁর ‘কণিকা’ কাব্যে লিখেছিলেন : উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে তিনি মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।   রবীন্দ্রনাথ আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, টাকা মানুষকে সাময়িক অহংকার দিতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরের আত্মিক শূন্যতা দূর করতে পারে না। তাঁর মতে, “ধনীর ধন তো কেবল একটা বাহ্য বস্তু, তা মানুষের আত্মাকে তৃপ্ত করতে পারে না। মানুষের আসল পরিচয় তার অন্তরের ঐশ্বর্যে।”   একইভাবে সাম্যের কবি ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাজের এই বৈষম্য ও চাটুকারিতার স্বভাবকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তিনি তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন : পূজারী, দুয়ার খোলো ক্ষুধার ঠাকুর দুয়ারে দাঁড়ায়ে পূজার সময় হলো! ...মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,  নহে কিছু মহীয়ান!   নজরুল বুঝিয়েছেন যে, সমাজ ও রাষ্ট্র টাকার মোহে অন্ধ হয়ে জীবন্ত মানুষকে অবহেলা করে, অথচ পাথরের দেবতা বা ধনীর প্রাসাদে গিয়ে ভিড় জমায়। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী তাঁর ‘সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থে মানুষের এই রূপকে ‘জীবসত্তা’ বনাম ‘মানব সত্তা’র লড়াই হিসেবে দেখিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “অর্থচিন্তার নিগড়ে বন্দি মানুষ কেবল টিকে থাকার লড়াই করে, সে প্রকৃত মানুষের মতো বাঁচতে পারে না। শিক্ষার আসল কাজ জ্ঞান পরিবেশন নয়, মূল্যবোধ সৃষ্টি করা।”   জ্ঞানী ব্যক্তিরা সমাজকে আলোর পথ দেখান, কিন্তু সেই আলো গ্রহণ করার মতো মানসিক প্রস্তুতি বা সক্ষমতা সবার থাকে না। জ্ঞান মানুষকে রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যা প্রায়শই তেতো বা কঠিন হয়। অন্যদিকে ধনী বা ক্ষমতাবানের সান্নিধ্য মানুষকে আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে চাটুকারিতার সুযোগ দেয়। বিখ্যাত কালজয়ী শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক ফ্রান্সিস বেকন  শিক্ষার উদ্দেশ্য ও মানুষের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “কিছু মানুষ কেবল কৌতূহল মেটাতে জ্ঞান অর্জন করে, কিছু মানুষ সুনাম ও আভিজাত্য দেখানোর জন্য, আবার অনেকে কেবল অর্থ উপার্জনের জীবিকা হিসেবে; কিন্তু খুব কম মানুষই আছে, যারা মানবকল্যাণে প্রজ্ঞার সঠিক ব্যবহার করার জন্য জ্ঞান চর্চা করে।”   এ বিষয়ে বিশ্বখ্যাত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ একটি চমৎকার খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন, “অধিকাংশ মানুষ বছরে দুই বা তিনবারের বেশি চিন্তা করে না; আমি সপ্তাহে একবার বা দুবার চিন্তা করে বিশ্বখ্যাত হয়েছি।” অর্থাৎ চিন্তাশীল বা জ্ঞানী মানুষের সংখ্যা সমাজে সব সময়ই কম। তাই সাধারণ সমাজ জ্ঞানের মূল্য সহজে বুঝতে পারে না এবং জ্ঞানীর সান্নিধ্য এড়িয়ে চলে, কারণ জ্ঞানচর্চায় ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন হয়, যা অলস মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।   ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও চিন্তাবিদ ইমাম আল-গাজ্জালি মানুষের এই প্রবণতাকে আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “মূর্খরা ধন-সম্পদকে সম্মান করে, আর জ্ঞানীরা সম্মান করে গুণ ও চরিত্রকে। সমাজের পতন তখনই ঘটে, যখন মূর্খদের সংখ্যা জ্ঞানীদের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায়।” তাঁর এই উক্তি প্রমাণ করে যে, সমাজে যখন নৈতিক মূল্যবোধের পতন ঘটে, তখন মানুষ শুধু বাহ্যিক জাঁকজমক বা টাকার পরিমাপ দিয়ে মানুষের যোগ্যতা বিচার করতে শুরু করে।   তবে ইতিহাসের সত্য এই যে, ধনীর সম্পদ আজ আছে, কাল ফুরিয়ে যেতে পারে। দেউলিয়া ধনীর পাশে পরদিন আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু জ্ঞানীর সম্পদ কখনো ক্ষয় হয় না। এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ পি জে আব্দুল কালাম বলেছিলেন, “জ্ঞান হলো এমন এক সম্পদ, যা কেউ কেড়ে নিতে পারে না, আর এটি বিতরণের মাধ্যমে কেবল বৃদ্ধিই পায়।”   ধনীর প্রভাব তার জীবদ্দশায় বা তার অর্থের স্থায়িত্ব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু সক্রেটিস, অ্যারিস্টটল, বার্নাড শ, ফ্রান্সিস বেকন বা রবীন্দ্রনাথের মতো জ্ঞানীরা শত শত বছর ধরে মানবজাতিকে পথ দেখাচ্ছেন। মৃত্যুর পরও মানুষ তাঁদের জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে বাঁচে, অথচ তৎকালীন বহু কোটিপতির নাম আজ ইতিহাসের ধূলিকণায় হারিয়ে গেছে।   টাকাওয়ালা মানুষের কাছে অন্ধের মতো ভিড় জমানো একটি সাময়িক সামাজিক ব্যাধি ও নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। একটি টেকসই, উন্নত ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনে অর্থের চেয়ে প্রজ্ঞার গুরুত্ব অনেক বেশি। চাটুকারিতার সংস্কৃতি বর্জন করে যেদিন সমাজ প্রকৃত জ্ঞানীদের মূল্যায়ন করতে শিখবে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ও নীতি নির্ধারণে প্রজ্ঞার জয় হবে, সেদিনই মানবতার প্রকৃত মুক্তি ঘটবে। বিত্তের চেয়ে চিত্তের আলোই মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখে এই সত্যটি যত দ্রুত আমরা সমষ্টিগতভাবে উপলব্ধি করতে পারব, সমাজের পচন তত দ্রুত রোধ করা সম্ভব হবে।    

নাজমা আশেকীন শাওন নাজমা আশেকীন শাওন অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
জুতা নিয়ে যত কথা

পোশাক-পরিচ্ছদ মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। মানুষ পোশাকের সাথে ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তোলার জন্য যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়, তা হলো জুতা। জামা-কাপড়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জুতা মানুষকে যেমন ব্যক্তিত্ববান করে, তেমনি করে তোলে আকর্ষণীয়। এমন কোনো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ পাওয়া যাবে না, যে কোট-টাইয়ের সাথে স্যান্ডেল পরে। আবার এমন রুচিহীন কাউকে পাওয়া যাবে না, যে পায়জামা-পাঞ্জাবির সাথে বুট জুতা পরে। বুট জুতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোটা পোশাকের সাথে যতটা মানানসই, পায়জামা-পাঞ্জাবর সাথে ততটাই বেমানান। শেরওয়ানির সাথে এক বিশেষ ধরনের রাজকীয় জুতার আভিজাত্য বরকে মুহূর্তের মধ্যেই রাজপুত্র বানিয়ে ফেলে।   শীতকালে কাপড়ের জুতার কদর বেড়ে যায়। বর্তমানে সচেতন মানুষ হাঁটার জন্য বাহারি রকমের কেডস পরে। জুতা নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনার শেষ নেই। পায়ের সমস্যাজনিত কারণে বাজারে ডক্টর সু নামে বিশেষ একধরনের জুতা পাওয়া যায়। ছোট শিশুরা হাঁটতে শিখলে তাদের পরিয়ে দেয়া হয় বাঁশিওয়ালা জুতা। কোনো কারণে বাঁশি বন্ধ হলে শিশু বন্ধ করে হাঁটা এবং শুরু করে কান্না। আজ থেকে প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে গ্রামের মুরুব্বিরা প্লাস্টিকের একধরনের শু পরতেন, যা নাগরা জুতা নামে পরিচিত ছিল। নাগরা জুতার আধুনিক সংস্করণই মনে হয় লোফার, যা বর্তমানে কচিশীল মানুষের পছন্দের তালিকার শীর্ষে।   শীতকালে নরম তুলাজাতীয় কাপড় দিয়ে একধরনের জুতা বানানো হয়, যা রুমের মধ্যে ব্যবহার করা খুব আরামদায়ক। গ্রামের আধুনিক কৃষক মাঠে কাদায় কাজ করার জন্য হাঁটু পর্যন্ত লম্বা প্লাস্টিকের যে জুতা ব্যবহার করে, তাকে গামবুট বলে। খেলার মাঠে ফুটবলাররা তাঁদের খেলার নৈপুণ্য বৃদ্ধির জন্য বুট পরে খেলেন, যার তলদেশে লোহার স্পাইক থাকে, যা দৌড়ানোর জন্য বিশেষভাবে কাজে লাগে। জুতা পায়ে পরার সামগ্রী হলেও বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারস্বরূপ গোল্ডেন বুট অতিশয় গৌরবের বিষয়। অতীতে মানুষ জুতা পরতই না বললে চলে, আর বর্তমানে মানুষ জুতা খোলে না বললেই চলে। ঘরে-বাইরে এমনকি জুতা পায়ে দিয়েই আধুনিক সভ্য মানুষ বাথরুমে গোসল পর্যন্ত করে। সুতরাং এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, জুতা মানুষের নিত্যসঙ্গী।   নিকট অতীতে গ্রাম্য সালিশে শাস্তিস্বরূপ অপরাধীকে জুতার বাড়ি দেয়া হতো। অপরাধের মাত্রা খুব বেশি হলে তখন অপরাধীর গলায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রামজুড়ে ঘোরানো হতো। এটা অপরাধীর জন্য চরম অবমাননাকর ছিল। গ্রামীণ অপরাধ দমনে সেই সময়কার গ্রাম্য বিচারকরা এই জুতাকেই শাস্তির মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করতেন। অনেক ছিঁচকে চোর কিংবা অপরাধী অপরাধ করে ঘটনাস্থলে জুতা ফেলে যেত, যার মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হতো। জুতার মাধ্যমে খারাপ লোককে শায়েস্তা করার দৃষ্টান্ত গ্রামের সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব দরবারেও দেখা যায়। জর্জ জুনিয়র বুশের প্রতি প্রচণ্ডভাবে ক্ষিপ্ত এক যুবক তাঁর পায়ের জুতা খুলে বক্তৃতা দানকালে জর্জ বুশের দিকে ছুড়ে মারেন। বিশ্ব মিডিয়ায় বিশ্ব মোড়লকে হেনস্তা করার এমন খবর গুরুত্বের সাথে জায়গা করে নেয়। শুধু তা-ই ন,য় প্রতিবাদের অস্ত্রস্বরূপ সেই জুতা চড়া দামে নিলামে বিক্রি হয়।   এই জুতা শুধু অপরাধী ও অপরাধকর্মের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং আধ্যাত্মিক গুরু, ধর্মীয় পুরোহিত, কামেল পির সাহেবদের জুতার খুবই কদর। ভক্তরা তাঁদের নেতা কিংবা পির সাহেবকে জুতা পরিয়ে দেয়া কিংবা জুতা খুলে দেয়ার সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের বিষয় মনে করে। অনেকে আবার জুতা টেনে বড় নেতাও হয়ে যায়।   পৃথিবীজুড়ে গরুর চামড়ার জুতার খুবই চাহিদা। একসময় আমাদের দেশে এক কেজি গরুর মাংসের মূল্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা ছিল। সেই সময়ে একটি বড় সাইজের গরুর চামড়ার মূল্য ছিল ৩০০০ থেকে ৪০০০ টাকা। এ প্রসঙ্গে আরও বলা যেতে পারে, সেই সময়ে এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে। বর্তমানে ছিনতাইকারীরা যেমন রাস্তাঘাটে মহিলাদের গলার চেইন, কানের দুল, ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই করে, সেই সময়ে নিষ্ঠুর কিছু মানুষ শুধু চামড়ার জন্য তাজা গরু ছিলে চামড়া নিয়ে যেত আর চামড়াবিহীন গরু ফেলে যেত।   বর্তমান সময়ে জুতা চুরির ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। বিশেষ করে, জুতাচোররা মসজিদকে তাদের এই অপকর্মের জন্য উপযুক্ত স্থান মনে করে। শহরের ব্যস্ত এলাকার মসজিদগুলোয় জুতা চুরির ঘটনা বেশি ঘটে। এ চুরি ঠেকানোর জন্য মসজিদ কমিটির নানামুখী উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো। মসজিদের ভেতরে প্রতিটি কাতারের মাঝে জুতা রাখার বাক্স স্থাপন, মসজিদগুলোতে জুতা সংরক্ষণের জন্য আলাদা কর্নার ও লোক নিয়োজিত রাখা ইত্যাদি। জুতা রেখে টোকেন নিয়ে নামাজিরা মসজিদে প্রবেশ করেন। এ ছাড়া মুসল্লিদের সচেতন করার জন্য নানা রকম স্টিকার লাগানো থাকে। যেমন ‘জুতাচোর হতে সাবধান’, ‘নিজ দায়িত্বে জুতা রাখুন’।   শুধু মসজিদে নয়, বাসাবাড়ি থেকে প্রতিনিয়ত জুতা চুরি হয়। পুরোনো হাঁড়ি, পাতিল, কাপড়, খাতা ও প্লাস্টিকের ভাঙা জিনিস কেনার হকার থাকলেও পুরোনো জুতা কেনার হকার শহর কিংবা গ্রামে দেখা যায় না। তার পরও শহরের ফুটওভার ব্রিজের নিচে বড় বড় রাস্তার পাশে পুরোনো জুতার শত শত দোকান লক্ষ করা যায়। তাহলে এই পুরোনো জুতাগুলো বিক্রেতা কীভাবে এবং কার কাছ থেকে সংগ্রহ করে ব্যবসা করছে, তা সত্যিই চিন্তার বিষয়।   জুতা নিয়ে যেমন অনেক প্রবাদ-প্রবচন আছে, সেই সাথে অনেক বিখ্যাত সাহিত্যকর্মও আছে। গরু মেরে জুতা দান  প্রবাদটি কে না জানে? নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রবাদটি কমবেশি সবার জানা। মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ‘অলুক্ষনে জুতা’ বাংলা সাহিত্যের একটি অসাধারণ গল্প। আর কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ রম্য কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে অনন্য সম্পদ। এই রম্য কবিতায় জুতা আবিষ্কারের অন্তরালে কবি একটি সমস্যা ও তার সমাধানের বিচিত্র আয়োজন, ছন্দ ও রূপকের যে ব্যবহার করেছেন, তা পাঠকের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করে বিশেষভাবে। পাশাপাশি অতি সামান্য বিষয়ও একজন রাজার কৌতূহল ও মন্ত্রিপরিষদের দুর্ভাবনা ও দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে, তা এ কবিতায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। রাজ্যের সর্বশক্তি নিয়োগ করেও যখন সমস্যার সমাধানে মন্ত্রীবর্গ ব্যর্থ, তখন এই চরম সংকটে রাজপরিষদের সকলের দুর্ভাবনা দূর করার জন্য সমাজের অস্পৃশ্য চর্মকারের বুদ্ধিমত্তায় জুতা আবিষ্কারের কাব্যিক বর্ণনা ও দার্শনিক সত্য প্রকাশে বিশ্বকবির অসাধারণ দূরদর্শিতার পরিচয় মেলে।   বর্তমানে ফিলিস্তিনের মুসলমানদের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণ, নির্বিচারে মানুষ হত্যা, বিশেষ করে নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর এমন করুণ দৃশ্য সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। বিবেকবান মানুষের অন্তরে যে কান্নার রোল বাজছে, তা আজ বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সারা পৃথিবীর মুসলমান এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়। মুসলমানদের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাইতুল আকসা মসজিদ পুনরুদ্ধার প্রত্যেক মুসলমানের মনের দাবি। স্বাধীন ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের গাজাবাসী আবার তাদের স্বপ্নের আবাসন গড়ে তুলবে এটাই মুসলমানের প্রত্যাশা। এই অন্যায়ের প্রতিবাদস্বরূপ আইনশৃঙ্খলার অবনতি কিংবা হঠকারী কোনো কাজ করা উচিত না। কিন্তু কিছু সুযোগসন্ধানী, লোভী ও মোটা বুদ্ধির মানুষ, যারা প্রতিবাদের নামে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিভিন্ন জুতার দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটিয়েছে, ইসলামি দৃষ্টিতে এটা প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। তাই সকলের উচিত, এ বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা।  

মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬ 0
‎শিল্পের মহাকাব্যিক পুনরাবৃত্তি

শিল্পের সুতোয় বাঁধা অনুভূতির কোনো ক্ষয় নেই। নদী তার জলপ্রবাহ বদলে ফেললেও মোহনার টান যেমন অটুট থাকে, নাট্যমঞ্চের আত্মিক বন্ধনও ঠিক তেমনই চিরন্তন।    ‎দীর্ঘ ২৬টি বছর পেরিয়ে সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণে আবারও মিলিত হলো একদল মানুষ, যাদের একদিন একই মঞ্চ, একই স্বপ্ন আর একই নাট্যসাধনা একসূত্রে বেঁধেছিল।বর্তমানের সঙ্গে অতীতের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধ রচিত হলো সেখানে। ‎ ‎স্মৃতির সূত্র ধরে ফিরে যেতে হয় ২০০০ সালের সেই দিনগুলোতে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমি, ফরিদপুরের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল তিন মাস মেয়াদি এক নিবিড় প্রযোজনাভিত্তিক নাট্যকর্মশালা।  ‎ ‎সেই নাট্যযজ্ঞের পলিমাটি থেকেই জন্ম নিয়েছিল কালজয়ী প্রযোজনা ‘বাগদী ধীরুয়াল’। নাট্যরচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন ওই কর্মশালার মুখ্য প্রশিক্ষক, বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় ড.আরিফ হায়দার স্যার। তাঁর নির্দেশনায় নব্বই দিনের কায়িক ও আত্মিক সাধনা ফরিদপুরের একদল তরুণ নাট্যপ্রাণ মানুষের ভেতরে যে শিল্পবীজ রোপণ করেছিল, সময়ের ঝড়-ঝাঁপটা কিংবা দূরত্ব—কোনো কিছুই তা নিঃশেষ করতে পারেনি। দুই যুগ পর তারই সবুজ পাতা আবার দৃশ্যমান হলো স্মৃতির আলোয়। ‎ ‘বাগদী ধীরুয়াল’ দলের শেকড়ের কাছে ফেরা, গুরুর পাদপীঠে নাট্যশিষ্যদের বিনম্র প্রত্যাবর্তন। একদিন যাঁর হাত ধরে মঞ্চের ভাষা ও শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধতা শেখা হয়েছিল, তাঁর সান্নিধ্যে ফিরে এসে প্রত্যেকেই যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া একটি অংশ পুনরুদ্ধার করল। ‎ ‎হয়তো কারও চুলে রুপালি রেখা, কারও মুখে বয়সের ছাপ, কিন্তু মঞ্চের স্মৃতিতে তারা তখনো সেই ২০০০ সালের তরুণেরা—স্বপ্নে উজ্জ্বল, নাটকের নেশায় বিভোর। গুরুর সাথে শিষ্যদের সেই  মিলনমেলায় অলক্ষে থমকে দাঁড়িয়েছিল সময় নিজে; মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসেছিল একটি পুরোনো সকাল, একটি মহড়া, একটি মঞ্চ, কিছু অমলিন মুখ। ‎ ‎সময়ের মহাকাব্যে কিছু অধ্যায় লেখা হয় কালি দিয়ে, আর কিছু লেখা হয় মানুষের হৃদয়ে। এই পুনর্মিলন সেই হৃদয়লিখিত অধ্যায়গুলোরই একটি। বাংলা নাট্যাঙ্গনের ইতিহাসে চিরকাল এক মহাকাব্যিক অধ্যায় হয়ে বেঁচে থাকবে। ‎

‎শাহ্ জাহাঙ্গীর ‎শাহ্ জাহাঙ্গীর সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬ 0
শব্দের বাতিঘর ও চিরসবুজ নাবিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

​বাংলা সাহিত্যের বিশাল ও বৈচিত্র্যময় আকাশে যে কজন নক্ষত্র নিজের আলোয় পুরো একটি যুগকে উদ্ভাসিত করেছেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার ও কলামিস্ট। কিন্তু এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি ছিলেন আধুনিক বাঙালির মনন, প্রেম ও আবেগের অবিসংবাদিত রাজপুত্র। বিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রবিন্দুতে। তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যিনি ধ্রুপদি আভিজাত্য আর আধুনিক নাগরিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে একই সুতোয় বেঁধেছিলেন অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায়। ৭ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে বাংলা ভাষার এই চিরসবুজ নাবিকের স্মৃতির উদ্দেশে রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।   ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, অবিভক্ত বাংলার মাদারীপুরে (বর্তমান বাংলাদেশ)। পরবর্তী সময়ে দেশভাগের সময় পরিবারকে নিয়ে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। শৈশব ও কৈশোরের এই স্থানান্তরের বেদনা এবং উত্তর-কলকাতার গলিতে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। সিটি কলেজ থেকে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর শেষ করার পর তিনি সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকেই জীবনের প্রধান ব্রত হিসেবে বেছে নেন। ​ ১৯৫৩ সালে মাত্র কয়েকজন তরুণ কবিবন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রকাশ করেন কবিতাবিষয়ক পত্রিকা ‘কৃত্তিবাস’। এই পত্রিকা প্রকাশ বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ-উত্তর বাংলা কবিতায় যে আড়ষ্টতা ও জড়তা তৈরি হয়েছিল, ‘কৃত্তিবাস’-এর কবিরা তাকে ভেঙে চুরমার করে দেন। সুনীলের সম্পাদনায় ও নেতৃত্বে বাংলা কবিতা পেল এক নতুন ভাষা, যা ছিল মুখের ভাষার কাছাকাছি, কিন্তু সৃষ্টিতে তীব্র ও ধারালো। ​ ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মূলত কবি। তিনি নিজেও বলতেন, কবিতা তাঁর প্রথম ও প্রধান প্রেম। তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘একা এবং কয়েকজন’ (১৯৫৮) প্রকাশিত হওয়ার পরই আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা ও নাগরিক ক্লান্তি, প্রেম ও বিদ্রোহ পাশাপাশি অবস্থান করেছে। ​ তবে সুনীলের কবিপরিচয়ের কথা বলতে গেলে যে নামটি অবধারিতভাবে চলে আসে, তা হলো ‘নীরা’। নীরা কোনো বাস্তব নারী, নাকি কবির কল্পনার এক অধরা প্রতীক—তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাঙালি পাঠকের কাছে নীরা হয়ে উঠেছেন চিরন্তন প্রেম ও সৌন্দর্যের রূপক। “নীরা, তুমি অন্য ঘরে চাবি বন্ধ করে বসে আছো...।” কিংবা, “তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি অন্তত চারশো বছর বেঁচে থাকতে চাই।”   ​এ রকম পঙক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি প্রেমের যে তীব্রতা প্রকাশ করেছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মজুড়ে বাঙালির প্রেমের প্রকাশকে প্রভাবিত করেছে। নীরার প্রতি কবির আকুলতা, অধিকারবোধ এবং একই সঙ্গে একধরনের দার্শনিক দূরত্ব সুনীলের কবিতাকে কালজয়ী রূপ দিয়েছে।   ​কবিতা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও কথাসাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অবদান বাংলা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ হয়ে উঠেছে। তাঁর ইতিহাসভিত্তিক সামাজিক উপন্যাসগুলো বাংলা কথাসাহিত্যের অমূল্য রত্ন।   ​‘সেই সময়’ : উনিশ শতকের নবজাগরণকালীন কলকাতাকে কেন্দ্র করে রচিত এই মহাকাব্যিক উপন্যাসটি সুনীলকে কথাসাহিত্যিক হিসেবে অমরত্ব এনে দেয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো ঐতিহাসিক চরিত্রদের পাশাপাশি কল্পিত চরিত্র নবকুমারকে ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানা পাঠককে মুগ্ধ করে। এই উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।   ‘​প্রথম আলো’ : ‘সেই সময়’-এর পরবর্তী অধ্যায় হিসেবে রচিত এই উপন্যাসে বিশ শতকের সূচনালগ্ন, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, তরুণ রবীন্দ্রনাথের মনন গঠন এবং ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রাথমিক দিনগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে।   ‘​পূর্ব-পশ্চিম’ : দেশভাগ, ১৯৪৭-এর দেশত্যাগ, ওপারে ফেলে আসা স্মৃতি এবং এপারে উদবাস্তু জীবনের যন্ত্রণা ও লড়াইকে ভিত্তি করে রচিত তিন প্রজন্মের এক বিরাট দলিল এই উপন্যাস। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা, নকশাল আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—সবই এখানে উঠে এসেছে পরম মমতায়।   ​এ ছাড়া ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র মতো উপন্যাসগুলোতে আধুনিক নাগরিক জীবনের সংকট, বেকারত্ব, হতাশা ও প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আকুলতা যেভাবে ধরা পড়েছে, তা চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়কেও আকৃষ্ট করেছিল। সত্যজিৎ রায় এ দুটি উপন্যাস নিয়ে বিশ্বমানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।   ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক জীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক ছিল তাঁর ছদ্মনাম ‘নীললোহিত’। নীললোহিত কেবল একটি ছদ্মনাম ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র চরিত্র। ছাব্বিশ-সাতাশ বছরের এক তরুণ, যার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, পকেটে টাকা নেই, কিন্তু বুকভরা আছে জীবনকে ভালোবাসার অসীম রসদ।   ​নীললোহিতের জবানীতে লেখা উপন্যাস ও গল্পগুলোতে রয়েছে এক অদ্ভুত ধরনের মুক্তি ও বাোহেমিয়ান জীবনবোধ। জীবনের ছোট ছোট আনন্দকে খুঁজে নেয়া, ছকবাঁধা সামাজিক নিয়মকে ভেঙে উদার দিগন্তের দিকে হেঁটে যাওয়া—এসবই নীললোহিত পাঠকদের শিখিয়েছে। ‘নীললোহিত’ রূপ ধরে সুনীল তরুণদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে সমস্ত অহংকার ত্যাগ করে মানুষকে ভালোবাসতে হয়। এ ছাড়া ‘সনাতন পাঠক’ ও ‘নীলু’ ছদ্মনামেও তিনি অসংখ্য ধারালো নিবন্ধ ও কলাম লিখেছেন।   ​বাঙালি কিশোর-কিশোরীদের কল্পনার জগৎকে অ্যাডভেঞ্চার আর রহস্যে ভরিয়ে তোলার জন্য সুনীলের অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর সৃষ্ট ‘কাকাবাবু’ (রাজা রায়চৌধুরী) এবং তাঁর ভাইপো ‘সন্তু’ জুটির গল্প শোনেনি বা পড়েনি, এমন বাঙালি বিরল।   ​প্রতিবন্ধকতা যে মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে কিছুই নয়, তার সেরা উদাহরণ কাকাবাবু। একটি পা কৃত্রিম হওয়া সত্ত্বেও ক্রাচ বগলে নিয়ে তিনি ভারতের জঙ্গল থেকে শুরু করে মিসরের পিরামিড কিংবা সবুজ দ্বীপের রহস্য ভেদ করতে ছুটে গিয়েছেন। ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’, ‘মিসর রহস্য’, ‘পাহাড় চূড়ায় আতঙ্ক’, ‘জঙ্গলের মধ্যে এক হোটেল’-এর মতো গল্পগুলো একদিকে যেমন কিশোর মনকে রোমাঞ্চিত করেছে, অন্যদিকে তাদের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান বাড়াতে সাহায্য করেছে।   ​সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর ভাষার সাবলীলতা। তিনি কঠিন ও গূঢ় তত্ত্বকে অত্যন্ত সাধারণ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করতে পারতেন। তাঁর গদ্যের মধ্যে ছিল কবিতার মতো এক অন্তর্নিহিত ছন্দ। অতিরিক্ত অলংকার ব্যবহার না করেও কীভাবে কেবল শব্দের সঠিক প্রয়োগে একটি দৃশ্য বা আবেগকে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা তাঁর রচনা পড়লে বোঝা যায়।   ​সাহিত্যিক হিসেবে সাফল্যের পাশাপাশি তিনি ছিলেন এক অনন্য সংগঠক। দীর্ঘদিন তিনি সাহিত্য আকাদেমির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করা, তাঁদের লেখা পড়া এবং বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক দরবারে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।   ​২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু একজন প্রকৃত লেখকের কি সত্যিই কোনো মৃত্যু হয়? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর অজস্র রচনা, কবিতা, উপন্যাস ও চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বাঙালির জীবনচর্চায় বেঁচে আছেন। ​ আজকের এই যান্ত্রিক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে, যখন মানবিক সম্পর্কগুলো ম্লান হতে বসেছে, তখন সুনীলের কবিতা আমাদের শেখায় একটু থামতে, নতুন করে প্রেমে পড়তে। যখন সমাজ ইতিহাসে শেকড় খোঁজে, তখন তাঁর সেই সময় বা ‘প্রথম আলো’ আমাদের পথ দেখায়। আর যখন মন চায় ক্লান্তি ভুলে দূর দিগন্তে হারিয়ে যেতে, তখন নীললোহিত বা কাকাবাবু আমাদের সঙ্গী হন।   ​হে শব্দের বাতিঘর, আপনার সৃষ্টি আমাদের অনুভূতির জগৎকে সমৃদ্ধ করেছে, আমাদের কল্পনাকে ডানা দিয়েছে। আপনার জন্মদিনে আমাদের এই একটাই প্রার্থনা—বাংলা ভাষা যত দিন থাকবে, তত দিন আপনি বাঙালির হৃদয়ে চিরসবুজ হয়ে থাকবেন। আপনার স্মৃতির প্রতি জানাই আমাদের অতল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।     ড. শিবাশিস মুখার্জী অধ্যাপক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬ 0
সুফিবাদ : আত্মশুদ্ধি, মানবপ্রেম ও শান্তির দর্শন

সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানীর সাক্ষাৎকার সাক্ষাৎকার গ্রহণ : তৌসিফ রেজা আশরাফী   তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদ বলতে আমরা মূলত কী বুঝি? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : সুফিবাদ ইসলামের আধ্যাত্মিক ও আত্মশুদ্ধির পথ। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা, আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও সহমর্মিতার মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করা। সুফিবাদ শুধু কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়; বরং এটি মানুষের চরিত্র ও অন্তরকে পরিবর্তনের একটি সাধনা। তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদের কেন্দ্রে আত্মশুদ্ধির বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তার অন্তরের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। হিংসা, অহংকার, লোভ, বিদ্বেষ ও আত্মম্ভরিতা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে এসব প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে তাকওয়া, বিনয়, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর স্মরণকে জীবনের অংশ করে নিতে হয়। একজন মানুষ যখন নিজের নফসকে সংশোধন করতে পারে, তখন তার আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। তৌসিফ রেজা আশরাফী : বর্তমান সময়ে যখন সমাজে হিংসা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, তখন সুফিবাদের প্রাসঙ্গিকতা কতটা? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : সুফিবাদের প্রাসঙ্গিকতা আজ অত্যন্ত বেশি। কারণ সুফিবাদ মানুষকে ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য এবং প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমার শিক্ষা দেয়। মানুষ যদি নিজের অন্তরকে সংশোধন করে এবং অন্যের অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করে, তাহলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা তৈরি করাই সুফিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।   তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদ কি শুধু ব্যক্তিগত সাধনার বিষয়, নাকি এর সামাজিক দিকও রয়েছে? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : সুফিবাদ ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতারও শিক্ষা দেয়। একজন সত্যিকারের সাধক শুধু নিজের জন্য চিন্তা করেন না। তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেন, বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করেন এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। মানুষের সেবা ও মানবকল্যাণ সুফি ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তৌসিফ রেজা আশরাফী : তরুণ প্রজন্মের কাছে সুফিবাদের কী বার্তা রয়েছে? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : তরুণদের প্রথমে নিজেদের চরিত্র গঠন করতে হবে। জ্ঞান অর্জন, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধকে জীবনের ভিত্তি করতে হবে। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি আত্মিক ও নৈতিক উন্নতিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণরা যদি নিজেদের মধ্যে সত্য, ন্যায়, বিনয় ও মানবপ্রেম প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে তারাই একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণে নেতৃত্ব দিতে পারবে।   তৌসিফ রেজা আশরাফী : সুফিবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যদি এক বাক্যে বলতে হয়, সেটি কী? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথে মানুষের ভালোবাসা ও সেবা করতে হবে। অন্তরকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ, যে হৃদয়ে আল্লাহর স্মরণ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা রয়েছে, সেই হৃদয়ই প্রকৃত শান্তির সন্ধান পায়।   তৌসিফ রেজা আশরাফী : শেষ প্রশ্ন, বর্তমান বিশ্বের অশান্ত পরিবেশে মানুষের জন্য আপনার বার্তা কী? সৈয়দ শাহ আহমদ জামাল আশরাফ আশরাফী আল জিলানী : মানুষকে আগে নিজের অন্তরের দিকে তাকাতে হবে। অন্যকে পরিবর্তন করার আগে নিজেকে পরিবর্তন করা জরুরি। ঘৃণা দিয়ে ঘৃণা দূর করা যায় না, বরং ভালোবাসা, ন্যায়, ক্ষমা ও সহমর্মিতার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আল্লাহর স্মরণ, আত্মশুদ্ধি এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই হতে পারে একজন মানুষের সুন্দর জীবনের পথ।  

তৌসিফ রেজা আশরাফী তৌসিফ রেজা আশরাফী সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬ 0
ছবি : রাখি বন্ধন
রাখি বন্ধন : সংকীর্ণতা পেরিয়ে সর্বজনীন সামাজিক উৎসব

তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে সূর্য যেমন ধরার করে আলোক-রাখী জড়ায় প্রাতে॥ তোমার আশিস আমার কাজে সফল হবে বিশ্ব-মাঝে জ্বলবে তোমার দীপ্ত শিখা আমার সকল বেদনাতে॥   —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর   রাখি বন্ধন কেবল ভাই-বোনের ভালোবাসার দিন নয়, এটি এখন এক বৃহৎ সামাজিক ও মানবিক উৎসব। এই উৎসবের মূলমন্ত্র হলো ঐক্য, সুরক্ষা ও ভালোবাসা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাখি বন্ধনের রূপ বদলেছে। প্রাচীনকালে এটি মূলত ধর্মীয় ও সুরক্ষার আচার ছিল। আজ এটি সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার দিন।   রাখি শব্দের অর্থ ‘সুরক্ষার বন্ধন’। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, এই উৎসবের শেকড় অনেক গভীরে ছড়িয়ে আছে।  মহাভারতে কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর ঘটনার কথা অনেকেই জানেন। কৃষ্ণের আঙুল কেটে রক্ত পড়ার সময় দ্রৌপদী নিজের শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তাঁর হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণ সেই ঋণ রক্ষা করেছিলেন। এ ছাড়া দেবতা ও অসুরের যুদ্ধের সময় ইন্দ্রাণীর হাতে বিষ্ণুর দেয়া সুরক্ষার সুতোর কথাও পুরাণে পাওয়া যায়। মোগল আমলে রানি কর্মাবতী মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে রাখি পাঠিয়ে ভাই হিসেবে ডেকেছিলেন এবং বিপদের দিনে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। হুমায়ুন  সেই সম্মান রেখেছিলেন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাখি কোনো নির্দিষ্ট একটি ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল বিপদে পাশে দাঁড়ানোর এবং সম্মান জানানোর একটি মাধ্যম।   শুরুতে রাখি বন্ধন মূলত বৈদিক আচার-অনুষ্ঠান এবং সনাতন ধর্মের রীতিনীতির মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত শক্তি ছিল সর্বজনীন। যখনই কোনো সমাজ সংকটে পড়েছে, তখন ধর্মের দেয়াল ভেঙে মানুষ এই উৎসবকে আপন করে নিয়েছে। একটি সুতো মানুষের জাত, ধর্ম বা গোত্র দেখে বাঁধা হয় না। এই সর্বজনীন সত্যটি ধীরে ধীরে মানুষের মনে রেখাপাত করতে শুরু করে।   রাখি বন্ধনকে আজকের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐক্যের রূপ দেয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।  ব্রিটিশ সরকার যখন বাংলাকে ভাগ করতে চাইল, তখন বাঙালিরা এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।  হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করার চক্রান্ত রুখে দিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধন উৎসবকে হাতিয়ার করেন। তিনি নির্দেশ দেন, সবাই যেন একে অপরের হাতে হলুদ সুতো বেঁধে দেন। এটি ছিল ভাই-বোনের সম্পর্ক ছাড়াও সমাজের সব মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের প্রতীক।  কবিগুরু লিখেছিলেন, “বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল... পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।” এই আন্দোলনের মাধ্যমেই রাখি বন্ধন কেবল ভাই-বোনের ঘরের কোণ থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথে, মানুষের মিছিলে এবং সর্বজনীন সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়।   আজকের দিনে রাখি বন্ধন মানেই জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। সুতো বাঁধার এই প্রথা শিখিয়ে দেয় যে আমরা সবাই একে অপরের সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়েছি। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সব ধর্মের মানুষ আজ এই উৎসবে শামিল হয়। শুধু ভাই-বোন নয়, বন্ধু, শিক্ষক, প্রতিবেশী কিংবা সমাজের যেকোনো চেনা-অচেনা মানুষের হাতে রাখী পরিয়ে ভালোবাসার বার্তা দেয়া হয়।অনেক সময় গাছ বাঁচানোর বার্তা দিতে গাছেও রাখি পরানো হয়। আবার পরিবেশ রক্ষায় বা পথশিশুদের সুরক্ষায় দিনটি পালন করা হয়।   আজকের এই আধুনিক ও যান্ত্রিক যুগে মানুষের মধ্যে দূরত্ব বেড়েই চলেছে। স্বার্থপরতা যখন সমাজকে গ্রাস করছে, ঠিক তখনই রাখি বন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয় সম্পর্কের উষ্ণতা। রাখি পরানোর অর্থ শুধু ভাই কর্তৃক বোনকে রক্ষা করা নয়, বরং সমাজের প্রত্যেক নারীকে সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়া। ব্যস্ততার ফাঁকে এই একটি দিন পুরোনো সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন করে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়ার সুযোগ করে দেয়।  বাজারে এখন নানা ডিজাইনের ডিজিটাল ও আধুনিক রাখি পাওয়া যায়। কেনাকাটা বাড়লেও এর মূল আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই দায়িত্ব।   বর্তমান রাখিতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে সনাতনী ও রাজস্থানি মীনাকারি আর্টের ছোঁয়া, যেখানে সোনা বা রুপার প্রলেপের পাশাপাশি ফুটিয়ে তোলা হয় নিখুঁত ফ্লোরাল মোটিফ। সুতির সুতো, কাঠ, মাটির তৈরি টেরাকোটা ও প্রাকৃতিক রং দিয়ে তৈরি ইকো-ফ্রেন্ডলি রাখি এখন দারুণ জনপ্রিয়। কুন্দন, পলিমার ক্লে, রত্নপাথর, মুক্তা ও চুমকির কারুকাজে রাখিগুলো গয়নার মতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ধর্মীয় প্রতীকের পাশাপাশি ইভিল আই, ময়ূরের পাখা কিংবা জ্যামিতিক নকশার সমসাময়িক বিমূর্ত রূপ রাখিতে যোগ করেছে আধুনিকতার আভিজাত্য।   রাখি বন্ধন আজ আর শুধু একটি ধর্মীয় উপাচার বা সংস্কার নয়। এটি প্রেম, প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব ও মানবতার এক চিরন্তন উৎসব। ধর্ম মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু রাখি সেই বিভেদ মুছে দিয়ে মানুষের হাতকে এক করে দেয়। সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে রাখি আজ বিশ্বমানবতার প্রতীক। এই উৎসব আমাদের শেখায়—আমরা একা নই, আমরা সবাই সবার পাশে আছি।

বিধান চন্দ্র সান্যাল বিধান চন্দ্র সান্যাল আগস্ট ২৭, ২০২৬ 0
কবি অরুণ মিত্র
নীরবতার নন্দনতত্ত্ব : অরুণ মিত্রের কাব্যে অস্তিত্ব, ভাষা ও মানবতাবাদ

কবি অরুণ মিত্র  ১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর যশোরে জন্মগ্রহণ করে ২০০০ সালের ২২ আগস্ট কলকাতায় তাঁর প্রয়াণ পর্যন্ত তিনি শুধু কবিতা লেখেননি; তিনি বাংলা ভাষার সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের, বিশেষত ফরাসি সাহিত্য-সংস্কৃতির এক গভীর সংলাপ নির্মাণ করেছিলেন। কবি, অনুবাদক, অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন বাংলা সাহিত্যকে একদিকে যেমন দেশীয় আধুনিকতার ভেতরের দিকে নিয়ে গেছে, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক মানবিকতার বিস্তৃত পরিসরের সঙ্গেও যুক্ত করেছে।   তাঁর কাব্যগ্রন্থের দীর্ঘ তালিকা—‘প্রান্তরেখা থেকে উৎসের দিকে’, ‘ঘনিষ্ঠ তাপ’, ‘মঞ্চের বাইরে’, ‘শুধু রাতের শব্দ নয়’, ‘প্রথম পলি শেষ পাথর’, ‘খুঁজতে খুঁজতে এত দূর’, ‘যদিও আগুন ঝড় ধসাভাঙা’, ‘এই অমৃত এই গরল’, ‘অন্ধকার যতক্ষণ জেগে থাকে’, ‘ভাঙনের মাটি’ প্রভৃতি—প্রমাণ করে যে তাঁর কাব্যজীবন কোনো একক মুহূর্তের সৃষ্টিশীল বিস্ফোরণ নয়; এটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে নিজের সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে এবং মানুষের সঙ্গে এক অবিচ্ছিন্ন কথোপকথন।   অরুণ মিত্রের কাব্যকে পূর্ণভাবে উপলব্ধি করতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হয় যে তিনি বাংলা কবিতায় একধরনের নীরব বিপ্লবের নাম। এই বিপ্লবের কোনো পতাকা নেই, কোনো উচ্চকণ্ঠ স্লোগান নেই, নেই আত্মপ্রচারের তীব্র আকাঙ্ক্ষা; অথচ তাঁর দীর্ঘ কাব্যজীবনের দিকে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, বাংলা কবিতার আধুনিক মনন, মানবিক বোধ এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্যচেতনার ইতিহাসে তাঁর অবস্থান কত গভীর ও স্থায়ী।   অরুণ মিত্রের কবিতার সবচেয়ে গভীর বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর নীরবতা। কিন্তু এই নীরবতাকে যদি কেবল কম কথা বলার প্রবণতা বলে বুঝি, তবে তাঁর কবিতার প্রকৃত তাৎপর্য অধরা থেকে যাবে। তাঁর নীরবতা আসলে একটি নন্দনতাত্ত্বিক নির্বাচন, একটি নৈতিক অবস্থান এবং একই সঙ্গে একটি দার্শনিক ভঙ্গি। তিনি জানতেন, সব সত্যকে উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না; কিছু সত্য শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহারে বরং ক্ষীণ হয়ে যায়। তাই তাঁর কবিতায় উচ্চারণের পাশাপাশি অনুচ্চারণেরও একটি নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে।   তিনি যা বলেন, তার চেয়েও কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি যা বলেন না। শব্দের মধ্যবর্তী বিরতি, বাক্যের শেষে থেমে যাওয়া, চিত্রকল্পের অসম্পূর্ণতা, অনুভূতির অনির্দিষ্টতা—এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে তাঁর কবিতায় একটি নীরব পরিসর তৈরি হয়। সেই পরিসরেই পাঠকের নিজস্ব অনুভূতি এসে জায়গা করে নেয়।   এখানেই অরুণ মিত্রের কাব্য আধুনিক পাঠতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে—পাঠের অর্থ কখনো সম্পূর্ণভাবে লেখকের হাতে আবদ্ধ থাকে না। তাঁর কবিতার নীরব ফাঁকগুলো পাঠককে সক্রিয় করে। পাঠক কেবল কবির বক্তব্য গ্রহণ করে না; বরং সে নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, ইতিহাস এবং অনুভূতি নিয়ে কবিতার ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে কবিতা হয়ে ওঠে একটি উন্মুক্ত অর্থক্ষেত্র।   অরুণ মিত্রের কবিতায় অস্তিত্বের প্রশ্ন কোনো বিমূর্ত দার্শনিক তত্ত্ব হিসেবে আসে না; তা আসে জীবনের খুব কাছ থেকে, মানুষের প্রতিদিনের যাপন থেকে। সে রক্তমাংসের মানুষ, যে সকালে ঘুম থেকে ওঠে, পথ চলে, অপেক্ষা করে, ভালোবাসে, হারায়, স্মরণ করে, ক্লান্ত হয়, ইতিহাসের অভিঘাতে আহত হয় এবং সমস্ত অনিশ্চয়তার মধ্যেও বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।   এই বেঁচে থাকা তাঁর কাছে নিছক বেঁচে থাকা নয়; এটি একধরনের নৈতিক ও অস্তিত্বগত সিদ্ধান্ত। মানুষ যখন সবকিছু হারিয়েও বেঁচে থাকে, তখন তার সেই বেঁচে থাকাই একটি বক্তব্য হয়ে ওঠে। অরুণ মিত্রের কবিতায় এই বক্তব্য কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়; বরং খুব নিচু স্বরে উচ্চারিত। যেন মানুষ নিজেকেই বলছে—আমি এখনো আছি, এখনো অনুভব করি, এখনো স্মরণ করি, এখনো অন্য মানুষের দিকে তাকাতে পারি।   এ কারণেই তাঁর কবিতায় ‘অস্তিত্ব’ কোনো বিচ্ছিন্ন দার্শনিক ধারণা নয়। অস্তিত্ব তাঁর কবিতায় শরীর, স্মৃতি, সম্পর্ক, ইতিহাস এবং সময়ের মধ্যে বসবাসকারী একটি অভিজ্ঞতা। মানুষ তার শরীর নিয়ে পৃথিবীতে উপস্থিত; তার শরীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্লান্ত হয়, ভালোবাসে, স্পর্শ করে, দূরে সরে যায়, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু শরীরের মধ্যেই স্মৃতি বাস করে এবং স্মৃতির মধ্যেই ব্যক্তি তার নিজের অস্তিত্বকে পুনর্গঠন করে। ফলে অরুণ মিত্রের মানুষকে বোঝার জন্য শুধু ‘আমি কে?’ প্রশ্নটি যথেষ্ট নয়; তার সঙ্গে যুক্ত হয়—‘আমি কোথায়?’, ‘কাদের সঙ্গে?’, ‘কী ইতিহাসের মধ্যে?’, ‘কী স্মৃতি বহন করে?’ এবং ‘এই পৃথিবীর প্রতি আমার দায়িত্ব কী?’   এখানেই তাঁর কাব্যে অস্তিত্ববাদী পাঠের সম্ভাবনা তৈরি হয়। অবশ্যই অরুণ মিত্রকে সরাসরি সার্ত্র, কামু বা হাইডেগারের সমান্তরালে বসানো যাবে না। কামুর অসারতার দর্শনও তাঁর কবিতার ঘোষিত ভিত্তি নয়। কিন্তু মানুষের অনিশ্চয়তা, নিঃসঙ্গতা, স্বাধীনতা, দায়িত্ব, সীমাবদ্ধতা এবং মৃত্যুচেতনার প্রতি তাঁর সংবেদনশীলতা এমন একটি দার্শনিক সংবেদনসমষ্টি তৈরি করে, যার মধ্যে অস্তিত্ববাদী পাঠ অর্থবহ হয়ে ওঠে।   সার্ত্রের কাছে মানুষ তার নিজের নির্বাচন ও দায়িত্বের মাধ্যমে নিজেকে নির্মাণ করে। মানুষ কোনো পূর্বনির্ধারিত সত্তা নিয়ে পৃথিবীতে আসে না; সে তার কাজ, সিদ্ধান্ত এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে নিজেকে তৈরি করে। অরুণ মিত্রের কবিতায় এ ধারণার সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় সাদৃশ্য দেখা যায়, যদিও তা সরাসরি সার্ত্রবাদী নয়।   তাঁর মানুষ পরিস্থিতির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রক নয়—ইতিহাস, সমাজ, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সম্পর্ক ও স্মৃতি তাকে সীমাবদ্ধ করে। কিন্তু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় নয়। সে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, কীভাবে অন্যের যন্ত্রণা অনুভব করবে, কীভাবে স্মৃতিকে বহন করবে, কীভাবে ভালোবাসবে—এই নৈতিক ক্ষেত্রটুকু তার নিজের। এই সীমাবদ্ধ স্বাধীনতার মধ্যেই অরুণ মিত্রের মানুষের মর্যাদা।   এখানে স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকীর্ণ অর্থে দেখা উচিত নয়। এটি একটি অন্তর্গত স্বাধীনতা—নিজের মানবিকতা বজায় রাখার স্বাধীনতা। পৃথিবী নিষ্ঠুর হতে পারে, ইতিহাস মানুষের বিরুদ্ধে যেতে পারে, ক্ষমতা মানুষকে পিষে দিতে পারে; কিন্তু অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার ক্ষমতাটি মানুষ নিজের মধ্যে রক্ষা করতে পারে।   অরুণ মিত্রের মানবিকতা সম্ভবত এখানেই সবচেয়ে শক্তিশালী। তিনি এমন এক মানুষকে কল্পনা করেন না যে সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে ফেলেছে; বরং এমন একজন মানুষকে দেখেন, যে প্রতিকূলতার মধ্যেও সম্পূর্ণ নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি।   এ কারণেই তাঁর মানুষের দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মানুষ সর্বশক্তিমান নয়। সে ভয় পায়, কাঁদে, হারায়, একা হয়ে যায়, ভুল করে, কখনো পরাজিত হয়। কিন্তু পরাজয় তার মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেয় না। বরং পরাজয়ের মুহূর্তেই তার মানবিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।   তাঁর নিঃসঙ্গতা কোনো আত্মবিলাপ নয়। এটি এমন এক অন্তরাবস্থা, যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গে মুখোমুখি হয়। আধুনিক নগরসভ্যতার মধ্যে মানুষ ক্রমাগত মানুষের সংস্পর্শে থেকেও একা হয়ে পড়ে—এই আপাতবিরোধ তাঁর কবিতার অন্তর্গত অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।   তাঁর নিঃসঙ্গ মানুষ পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে দেখার জন্য কিছুটা পিছিয়ে দাঁড়ায়। সে পালিয়ে যায় না, বরং দেখে। সে চিৎকার করে না, বরং শোনে। সে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না, বরং প্রশ্নকে বহন করে। এই ‘দাঁড়িয়ে থাকা’ তাঁর কাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রতীক হিসেবে পড়া যায়।   আধুনিক সভ্যতার দ্রুততার বিপরীতে এই দাঁড়িয়ে থাকা নিজেই একধরনের প্রতিরোধ। যে যুগে সবকিছু দ্রুত বিচার করতে হয়, দ্রুত মতামত দিতে হয়, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, সেখানে থেমে দেখা এবং ভাবা একটি গভীর নৈতিক কাজ। অরুণ মিত্রের কবিতার ধীরতা তাই নিষ্ক্রিয়তা নয়; বরং সক্রিয় মননের লক্ষণ।   তাঁর রাজনৈতিক চেতনাও এই নীরবতার মধ্যেই কাজ করে। যুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ, ঔপনিবেশিকতার অভিজ্ঞতা, স্বাধীনতার উত্তাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং মানুষের ওপর ক্ষমতার চাপ—এসব তাঁর সময়ের বাস্তবতা। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিকতা সরল স্লোগানে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর রাজনৈতিক বোধের কেন্দ্র মানুষ। ফলে রাজনীতি তাঁর কবিতায় কোনো বিমূর্ত মতাদর্শের ভাষা নয়; বরং মানুষের জীবনযন্ত্রণার ভাষা।   তাঁর কাব্যভাষার দিকে তাকালে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে—স্বচ্ছতার ভেতরে জটিলতা। তাঁর শব্দগুলো অনেক সময় সহজ, পরিচিত ও দৈনন্দিন; কিন্তু তাদের বিন্যাস ও পারস্পরিক সম্পর্ক একটি গভীর অর্থপরিসর তৈরি করে। একটি শব্দ কেবল অভিধানগত অর্থ বহন করে না; তার সঙ্গে যুক্ত হয় স্মৃতি, ইতিহাস, অনুভূতি, সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।   এই দিকটি ভাষাতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সসুরের ‘সূচক’ ও ‘সূচিত’-এর সম্পর্কের আলোকে ভাবলে দেখা যায় যে অরুণ মিত্রের কবিতায় কোনো শব্দ সম্পূর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট অর্থের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। প্রসঙ্গ পরিবর্তিত হলে শব্দের অর্থক্ষেত্রও পরিবর্তিত হয়।   একটি ‘রাত’ কেবল সময়ের একটি অংশ নয়; তা হতে পারে স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, ইতিহাস, ভয় কিংবা অপেক্ষার প্রতীক। একটি ‘মাটি’ কেবল ভূগোল নয়; তা হতে পারে জন্ম, শ্রম, ক্ষয়, ইতিহাস এবং মানুষের অস্তিত্বের চিহ্ন। অর্থাৎ শব্দ তাঁর কবিতায় সম্পর্কনির্ভর এবং প্রসঙ্গনির্ভর।   এ কারণে তাঁর কবিতাকে একটি অর্থজাল হিসেবেও পড়া যায়। শব্দ একা অর্থ তৈরি করে না; অন্য শব্দের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অর্থের ঘনত্ব বাড়ায়। তাঁর কাব্যভাষায় তাই অর্থক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাটি, আলো, অন্ধকার, রাত, পথ, জল, শরীর, স্মৃতি, তাপ, ভাঙন—এ ধরনের শব্দ একে অপরকে প্রতিধ্বনিত করে একটি বৃহত্তর অর্থজগৎ তৈরি করতে পারে।   তাঁর কবিতার বাক্যবিন্যাসও এই অর্থনির্মাণের অংশ। বিরতি, অসম্পূর্ণতা, বাক্যের দৈর্ঘ্য, পুনরাবৃত্তি এবং চিত্রকল্পের বিন্যাস—সবকিছুই অর্থ তৈরি করে। কবিতায় পঙ্‌ক্তিবিচ্ছেদ কখনো নিছক ছন্দগত নয়; তা ভাবের বিরতি তৈরি করতে পারে। একটি বাক্য যেখানে শেষ হতে পারত, সেখানে থেমে যাওয়া পাঠককে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।   এখানে অরুণ মিত্রের কবিতার সঙ্গে আধুনিক পাঠক-প্রতিক্রিয়া তত্ত্বের একটি সম্ভাব্য সংলাপ তৈরি হয়। পাঠক আর নিষ্ক্রিয় ভোক্তা নয়; সে অর্থ-উৎপাদনের অংশীদার। কবিতার যে অংশ অনুচ্চারিত থাকে, পাঠক তার নিজস্ব অনুভূতি দিয়ে তা পূরণ করে। ফলে একই কবিতা বিভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।   অরুণ মিত্রের প্রেমভাবনাও তাঁর মানবতাবাদী কাব্যচিন্তার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রেমকে কেবল ব্যক্তিগত আবেগের পরিসরে আবদ্ধ করলে তার গভীরতা বোঝা যায় না। তাঁর প্রেমে আকর্ষণ যেমন আছে, তেমনি দূরত্বও আছে; উপস্থিতি যেমন আছে, তেমনি অনুপস্থিতির স্মৃতিও আছে। প্রেম তাঁর কাছে দখল নয়, অন্যের অস্তিত্বকে স্বীকার করা।   এই অর্থে তাঁর প্রেমের দর্শন অধিকারবোধের বদলে সহাবস্থানের দর্শন। অন্য মানুষকে নিজের করে নেয়া নয়, অন্য মানুষের স্বাধীন অস্তিত্বকে অনুভব করা—এই মানবিক বোধ প্রেমকে একটি নৈতিক মাত্রা দেয়।   এইখানে তাঁর প্রেমদর্শনের সঙ্গে মার্টিন বুবারের ‘আমি–তুমি’ ধারণার একটি তুলনামূলক সম্পর্ক তৈরি করা যায়। অন্য মানুষকে বস্তু হিসেবে না দেখে ‘তুমি’ হিসেবে দেখা—অর্থাৎ তাকে নিজের প্রয়োজনের বস্তু না বানিয়ে তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে স্বীকার করা—অরুণ মিত্রের মানবিক প্রেমের সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। অবশ্যই এটিকে সরাসরি প্রভাব বা দার্শনিক সূত্র হিসেবে দাবি করা যাবে না; বরং তুলনামূলক দার্শনিক পাঠ হিসেবে এটি অর্থবহ।   অরুণ মিত্রের অনুবাদক-সত্তা তাঁর মৌলিক কবিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং বলা যায়, অনুবাদ তাঁর কাব্যিক দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। তিনি ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক ও অনুবাদক ছিলেন এবং ফরাসি কবিতা ও সাহিত্যের সঙ্গে বাংলার গভীর যোগাযোগ স্থাপনে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।   অনুবাদ তাঁর কাছে নিছক ভাষাগত স্থানান্তর ছিল না। একটি ভাষার শব্দকে অন্য ভাষায় বসিয়ে দিলেই অনুবাদ সম্পূর্ণ হয় না; কবিতার অন্তর্গত ছন্দস্পন্দন, নীরবতা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি, আবেগের তাপমাত্রা এবং দার্শনিক অনুরণনও নতুন ভাষায় পুনর্গঠিত করতে হয়। এই অর্থে অরুণ মিত্রের অনুবাদকে একটি সৃজনশীল পুনর্ভাষ্য হিসেবে দেখা যেতে পারে।   অরুণ মিত্রের কবিতায় ‘আলো’ ও ‘অন্ধকার’-এর দ্বন্দ্বকে তাই সরল শুভ ও অশুভের দ্বন্দ্ব হিসেবে পড়া উচিত নয়। তাঁর অন্ধকারের মধ্যে আলো থাকে, আবার আলোর মধ্যেও অন্ধকারের স্মৃতি থাকে। মানুষ সম্পূর্ণ আলোকিত নয়; আবার সম্পূর্ণ অন্ধকারেও নয়। এই মধ্যবর্তী অঞ্চলই তাঁর কবিতার মানবিক ভূগোল।   এই দৃষ্টিতে তাঁর কবিতার ‘ভাঙন’ও গুরুত্বপূর্ণ। ভাঙন মানে কেবল ধ্বংস নয়; ভাঙনের মধ্যেই নতুন অর্থের জন্ম হতে পারে। মাটি মানে শেকড়; পলি মানে সময়ের সঞ্চয়; পাথর মানে স্থায়িত্ব; ভাঙন মানে ইতিহাসের আঘাত; অন্ধকার মানে অনিশ্চয়তা; আর অমৃত ও গরল একই জীবনের দুই সম্ভাবনা।   আজকের সময়ে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এখানেই সবচেয়ে তীব্র। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন শব্দের অভাব নেই, কিন্তু অর্থের সংকট আছে; যোগাযোগের অভাব নেই, কিন্তু বোঝাপড়ার অভাব আছে; মতামতের অভাব নেই, কিন্তু মননের অবকাশ কমে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্রমাগত তথ্যপ্রবাহ এবং দৃশ্যমানতার সংস্কৃতির মধ্যে অরুণ মিত্রের কবিতা আমাদের ধীর হতে শেখায়।   তাঁর কবিতা যেন আমাদের কানে খুব নিচু স্বরে বলে—প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানানো জরুরি নয়; কখনো কখনো প্রথম কাজ হলো দেখা, তারপর অনুভব করা, তারপর ভাবা।   এই ‘ধীরতা’ আসলে তাঁর কাব্যের একটি নৈতিক শিক্ষা। কারণ, ধীরে দেখা মানে অন্যকে বিচার করার আগে তাকে বোঝার চেষ্টা করা। ধীরে পড়া মানে শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসকে শোনা। ধীরে বাঁচা মানে নিজের অস্তিত্বকে কেবল উৎপাদন ও সাফল্যের মাপকাঠিতে না মাপা।   শেষ পর্যন্ত অরুণ মিত্রের অস্তিত্ববাদী মানবতাবাদের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু গভীর বিশ্বাস—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে। তার সাফল্যের আগে তার দুর্বলতাকে, তার পরিচয়ের আগে তার যন্ত্রণাকে, তার রাজনৈতিক অবস্থানের আগে তার মানবিক অস্তিত্বকে দেখতে হবে। এই দৃষ্টিই তাঁর কবিতাকে শুধু সাহিত্যিক নয়, নৈতিকও করে তোলে।   তাঁর মানুষ কোনো পূর্ণ মানুষ নয়; সে অসম্পূর্ণ। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতাই তার সত্য। সে সব প্রশ্নের উত্তর জানে না; তবু প্রশ্ন করে। সে ভবিষ্যৎ জানে না; তবু অপেক্ষা করে। সে মৃত্যু এড়াতে পারে না; তবু ভালোবাসে। সে ইতিহাসকে থামাতে পারে না; তবু নিজের মানবিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করে। এই অসম্ভবের মধ্যেই তার অস্তিত্বের সৌন্দর্য।   অতএব, অরুণ মিত্রের কাব্যে অস্তিত্ববাদ কোনো ধার করা দর্শন নয়; বরং জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা একটি সম্ভাব্য পাঠ। তাঁর কবিতার মানুষ অস্তিত্বের অর্থ আগে থেকে জানে না; সে বেঁচে থাকার মধ্য দিয়ে অর্থ খুঁজে নেয়। তার কাছে জীবন কোনো সমাধান-করা সমীকরণ নয়; বরং একটি খোলা প্রশ্ন। আর কবিতা সেই প্রশ্নকে মুছে দেয় না, বরং তাকে আরও গভীর করে।   মানুষ বেঁচে থাকে, কারণ তার কাছে সব উত্তর আছে বলে নয়; বরং এখনো কিছু প্রশ্ন করার আছে বলেই। আর অরুণ মিত্রের কবিতা সেই প্রশ্নগুলোকে নীরবে, দীর্ঘদিন, মানুষের ভেতরে জীবিত রাখে।   অরুণ মিত্র সেই জীবন্ত কবিতারই কবি। তাঁর নীরবতা আমাদের সময়ের কোলাহলের বিরুদ্ধে এক গভীর মানবিক প্রতিবাদ; তাঁর সংযম অতিরঞ্জনের বিরুদ্ধে এক নৈতিক অবস্থান; তাঁর মানবতাবাদ মানুষের প্রতি মানুষের শেষ আস্থার প্রকাশ।   তাই তাঁর কবিতা পড়া মানে শুধু একজন কবিকে স্মরণ করা নয়—নিজের ভেতরে এখনো যে মানুষটি বেঁচে আছে, তার সঙ্গে একবার নীরবে দেখা করা। এবং সেই সাক্ষাতের শেষে হয়তো কোনো উচ্চারণ থাকে না। শুধু থাকে— একটি দীর্ঘ নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই কোনো এক অদৃশ্য আলো ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে।

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী আগস্ট ২৪, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
চলচ্চিত্রে কাজী নজরুল ইসলাম : বহুমুখী প্রতিভার সংযোজন

আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষ আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী ও মানবতাবাদী  কবি। গান, কবিতা, গল্প, নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। যেখানে তিনি একাধারে গীতিকার, সংগীত পরিচালক, কাহিনিকার, সুরকার ও নির্মাতা হয়ে কাজ করেছেন। অভিনয় করেছেন দাপটের সঙ্গে।   নজরুলের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম, কবিতা ও গল্প অবলম্বনে পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মিত হয়েছে। তাঁর ‘পদ্মগোখরা’ গল্প অবলম্বনে ‘সুখ দুঃখ’  ও ‘মায়ার বাঁধন’ এবং উপন্যাস অবলম্বনে ‘মেহের নেগার’-এর (২০০৫) মতো চলচ্চিত্র নজরুল স্বভাবে ছিলেন আজীবন অস্থির, চঞ্চল।   বাংলা চলচ্চিত্রে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা ও পরিচালক হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০ থেকে ২২টি চলচ্চিত্রে সরাসরি সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে কাজ করেন। ম্যাডান থিয়েটার্স ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ‘সুর ভাণ্ডারী’ বা প্রধান সুরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উচ্চাঙ্গ সংগীত, বাউল, ভাটিয়ালিসহ বিভিন্ন লোকসুরকে চলচ্চিত্রের উপযোগী করে সর্বজনীন রূপ দেন। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি আব্বাসউদ্দীন আহমদসহ অন্য বিশিষ্টজনদের নিয়ে ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামক একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে থেমে থাকেননি তিনি। তাই শুধুই অভিনয় আর পরিচালনা নয়, রীতিমতো প্রশিক্ষকের কাজ করতেন নজরুল। সহশিল্পীদের অভিনয় শেখাতেন, গান তুলে দিতেন শিল্পীদের। এমনকি উচ্চারণও ঠিক করে দিতেন। ত্রিশের দশকে নজরুল পার্সি মালিকানাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্সের ‘সুর ভাঙারি’ পদে নিযুক্ত হন। পদটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরে সেই সময়ের নামকরা প্রযোজক পিরোজ ম্যাডান ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।   এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ধ্রুব’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। পুরাণের কাহিনি নিয়ে গিরিশচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘ধ্রুব চরিত’ অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। নজরুল এ ছবির গান লেখেন এবং সংগীত পরিচালনা করেন। তিনি দেবর্ষি নারদের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং একটি গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৩৪ সালের ১ জানুয়ারি ‘ধ্রুব’ মুক্তি পায়। ওই চলচ্চিত্রে নিজেকে একেবারে নতুন রূপে উপস্থাপন করেছিলেন। যেমন স্বর্গের সংবাদবাহক ও দেবর্ষি নারদের চরিত্রে সব সময় দেখা যায় জটাধারী, দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ একজনের চেহারা। কিন্তু নারদ নজরুল ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। তাঁর নারদ এক সুদর্শন যুবক। হাসি হাসি মুখ। চুড়ো করে মালা বাঁধা ঝাঁকড়া চুল, ক্লিন শেভড। পরনে সিল্কের লম্বা কুর্তা, গলায় মালা। চলচ্চিত্রের পর্দায় এভাবেই নারদরূপে আবির্ভূত হলেন নজরুল।   নারদ চরিত্রে নজরুলের সাজসজ্জা নিয়ে সে সময় পত্রিকায় সমালোচনা হয়েছিল যথেষ্ট। পাত্তা দেননি নজরুল। নজরুল তাঁর জবাব দেন। তিনি বলেন, “আমি চিরতরুণ ও চিরসুন্দর নারদের রূপই দেয়ার চেষ্টা করেছি।” ম্যাডান থিয়েটার্স বিভিন্নভাবে নজরুলের প্রাপ্য সম্মানী নিয়ে প্রতারণা করায় ১৯৩৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন তিনি। নজরুল নিজে পরিচালনা করেছেন ‘ধূপছায়া’ নামের একটি চলচ্চিত্র। ‘ধূপছায়া’তে দেবতা বিষ্ণুর চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। ১৯৩১ সালে অমর চৌধুরী পরিচালিত সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাইষষ্ঠী’তে সুরকারের ভূমিকায় কাজ করেন নজরুল। ১৯৩১ সালের ১১ এপ্রিল জে এফ ম্যাডান কোম্পানির সবাক চিত্র ‘জামাইষষ্ঠী’ ক্রাউন সিনেমা হলে মুক্তি পায়। ছবিটির পরিচালনায় ছিলেন অমর চৌধুরী। একই বছর বাংলা সবাক চিত্র ‘জলসা’য় নজরুল নিজের একটি গান গেয়েছিলেন এবং ‘নারী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় ‘সাপুড়ে’। এর কাহিনিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। পরিচালক দেবকী বসু। বেদে সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক এ সিনেমা দারুণ ব্যবসা সফল হয়েছিল।   বেদেজীবন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য নজরুল বেশ কিছুদিন বেদে দলের সঙ্গে ছিলেন। ‘সাপুড়া’ নামে সিনেমাটির হিন্দি রিমেকও হয়েছিল। তার সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন নজরুল। ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেন নজরুল। তিনি এবং পরিচালক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ছিলেন এ ছবির গীতিকার। ‘পাতালপুরী’ সিনেমাটি কয়লাখনির শ্রমিক এবং সেই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। এ ছবির জন্য ‘ঝুমুর’ সুরে গান রচনা করেন নজরুল। তিনি কয়লাখনি অঞ্চল সম্পর্কে জানার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ১৯৩৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গৃহদাহ’ সিনেমার সুরকার ছিলেন নজরুল। এ ছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন রাইচাঁদ বড়াল। ১৯৩৭ সালে মুক্তি পায় রহস্য কাহিনিভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘গ্রহের ফের’। এ ছবির সংগীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন নজরুল।   ১৯৩৭ সালের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাপতি’। কবি বিদ্যাপতির জীবনীভিত্তিক এ ছবির মূল গল্প ছিল নজরুলের। যদিও চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনায় ছিলেন দেবকী বসু। ছবিটির সুরকার ছিলেন নজরুল ও রাইচাঁদ বড়াল। মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির বিভিন্ন কবিতায় নজরুলের সুরদানের কাজ ছিল অসাধারণ। বাংলা ‘বিদ্যাপতি’র সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দিতে নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’। ১৯৪২ সালে নির্মিত ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। পরে ‘চৌরঙ্গী’ হিন্দিতে নির্মিত হলে সেই ছবির জন্য সাতটি হিন্দি গান লেখেন নজরুল। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলরুবা’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। ১৯৪১-৪২ সালে ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। এ সিনেমার জন্য তিনি ১৫টি গান লেখেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিনেমাটি আর মুক্তি পায়নি।   চলচ্চিত্র ব্যবসায়ও নাম লিখিয়েছিলেন নজরুল। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় নজরুল ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গঠন করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীর, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ মোদাব্বের, আজিজুল ইসলাম, সারওয়ার হোসেন, আজিজুল হক প্রমুখ। তাঁর অসুস্থতার সময় এবং মৃত্যুর পর অনেক সিনেমায় তাঁর গান ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক জায়গায় তাঁর ও উত্তরাধিকারীদের অনুমতির তোয়াক্কাও করা হয়নি। তবে অধিকাংশ ছবিতেই নজরুলসংগীতের ব্যবহার দর্শকপ্রিয় হয়েছে।   ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমায় ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা...’ গানটি অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। একইভাবে ‘জীবন থেকে নেয়া’ সিনেমায় ‘কারার ওই লৌহকপাট...’ গানটির ব্যবহার ছিল অসাধারণ। ‘লায়লা-মজনু’ সিনেমায় ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া, মজনু গো আঁখি খোলো...’ গানটির সার্থক ব্যবহার দর্শকপ্রিয়তা অর্জন  করেছিল। নজরুলের ‘মেহের নেগার’ গল্প অবলম্বনে ২০০৬ সালে একটি সিনেমা নির্মিত হয়। সিনেমাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন মুশফিকুর রহমান ও মৌসুমী। চলচ্চিত্রে প্রধান দুই চরিত্র—কাশ্মীরের তরুণী মেহের নেগারের চরিত্রে মৌসুমী এবং আফগান যুবক ইউসুফের ভূমিকায় ফেরদৌস অভিনয় করেন।   এ সময় আরেকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় নজরুলের গল্প ‘রাক্ষসী’ অবলম্বনে। ‘রাক্ষুসী’ সিনেমার পরিচালক মতিন রহমান। তিনটি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন রোজিনা, পূর্ণিমা ও ফেরদৌস। এর আগে নজরুলের গল্প ‘জ্বিনের বাদশাহ’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন বাপ্পারাজ। নজরুলের উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ এবং গল্প ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাঁর দুটি কবিতা ‘লিচু চোর’ এবং ‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’ অবলম্বনে শিশুদের জন্য দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে। ‘চৌরঙ্গী’ সিনেমার গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলরুবা’ সিনেমার গীতিকার ও সুরকার ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ হিন্দিতে নির্মিত হলে সেই সিনেমার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন নজরুল। ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। মস্তিষ্কের জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর বাকরুদ্ধ ছিলেন তিনি। ১৯৭৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। নজরুলের অসুস্থতার সময় এবং মৃত্যুর পর অনেক সিনেমায় তাঁর গান ব্যবহার করা হয়েছে।   পরবর্তীকালে নজরুলের গল্প ও উপন্যাস নিয়ে প্রচুর টিভি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে আশির দশকে ধারাবাহিক নাটক হয়েছে নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস অবলম্বনে। এতে মেজবউ চরিত্রে অভিনয় করেন রোকেয়া রফিক বেবী। নজরুল অসুস্থ হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অর্থায়নে ১৯৫৬-৫৭ সালে নির্মিত হয় ‘বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম’। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘বিদ্রোহী কবি’। ১৯৭২ সালে ভারত সরকারের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’।   বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৮০-৮১ সালে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের প্রযোজনায় নির্মিত হয় ‘কবি নজরুল’। বিবিসি টিভি চ্যানেল ফোর থেকে নির্মিত হয় ‘কাজী নজরুল ইসলাম’। কানাডার চলচ্চিত্র পরিচালক ফিলিপ স্পারেল নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘নজরুল’। কিংবদন্তি শিল্পী শচীন দেব বর্মণের গাওয়া নজরুলের একটি বিখ্যাত গান, ‘চোখ গেল চোখ গেল/ কেন ডাকিস রে/ চোখ গেল পাখি রে...’। গানটি ১৯৪১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘নন্দিন ‘তে সংযোজিত হয়। শচীন দেবের কণ্ঠে ওই সময় নজরুলের আরও একটি কালোত্তীর্ণ গান ‘পদ্মার ঢেউ রে, মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা...’ রেকর্ড করা হয়। তবে গানটি ওই ছবিতে নেয়া হয়নি। ‘চৌরঙ্গী’ ছবির জন্য ‘রুমঝুম ঝুমঝুম/খেজুর পাতার নূপুর বাজায়ে/ কে যায় যায়..’ গানটিও নজরুল লেখেন ও সুরারোপ করেন। এই ছবিতে নজরুল প্রায় আটটি গান লেখেন এবং সংগীত পরিচালনাও করেন। ছবিটি প্রথমে হিন্দিতে নির্মিত হয়। মাস দুয়েকের ব্যবধানে বাংলা ভাষায়ও মুক্তি পায়। ‘গ্রহের ফের’, ‘দিকশূল’ ও ‘অভিনয় নয়’ ছবি তিনটির জন্য যথাক্রমে ছটি, দুটি এবং একটি করে গান রচনা এবং সুরারোপ করেছেন নজরুল। অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের তুলনায় চলচ্চিত্রে নজরুল যেন এক  অগুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। কিন্তু এই বহুমুখী প্রতিভার স্পর্শে চলচ্চিত্রও যে ঋদ্ধ হয়েছে এ কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।  

এস ডি সুব্রত এস ডি সুব্রত আগস্ট ১৮, ২০২৬ 0
বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর সাহিত্যকীর্তি : এক অন্তহীন চেতনার প্রবহমান ধারা

উনিশ শতকের রেনেসাঁস বা নবজাগরণের আলোয় যখন বাংলা তথা ভারতীয় সমাজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল, ঠিক সেই ক্ষণে আবির্ভূত হয়েছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর লেখনীর জাদুকরি স্পর্শে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কেবল পরাধীনতার গ্লানি ও স্থবিরতা থেকে মুক্তিই পায়নি, বরং লাভ করেছিল এক রমণীয় আধুনিকতা এবং সুদূরপ্রসারী দার্শনিক ভিত্তি।   “যেকালে বঙ্কিমের নবীনা প্রতিভা লক্ষ্মীরূপে সুধাভাণ্ড হস্তে লইয়া বাংলাদেশের সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন, তখনকার প্রাচীন লোকেরা বঙ্কিমের রচনাকে সসম্মান আনন্দের সহিত অভ্যর্থনা করেন নাই।...”  —রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৮৯৪) লেখক পরিচয়ের বাইরে একজন দৃঢ়চেতা, বাস্তববাদী ও দায়িত্বশীল মানুষ ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনকালে সরকারি চাকরি করেও তিনি দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখেছিলেন। তাঁর প্রখর মেধা, কর্তব্যপরায়ণতা ও স্পষ্টবাদিতা তাঁকে সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।  তিনি দীর্ঘকাল ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টরের কাজ করেছেন। কাজে ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও কড়া। ব্রিটিশ সাহেবদের অন্যায় আচরণ তিনি কখনো মেনে নেননি। নিজের আত্মসম্মান বাঁচাতে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে আপস করেননি।  তিনি সমাজের অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সব সময় সরাসরি কথা বলেছেন।    বঙ্কিমচন্দ্র  শুধু সাহিত্য লেখেননি, দেশের মানুষকে ভাবতে শিখিয়েছেন। তাঁর ভেতরে কাজ করত এক গভীর জাতীয়তাবাদী চেতনা। সাহিত্য ও ধর্মের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও সমাজ সংস্কার নিয়েও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ও আধুনিক চিন্তা। জীবনের শেষভাগে বাঙালি সমাজ তাঁকে ‘ঋষি’ হিসেবে শ্রদ্ধা করতে শুরু করে। তাঁর ব্যক্তিত্বে একধরনের গাম্ভীর্য ও দূরদর্শিতা ছিল।    ১৮৬৫ সালে ‘দুর্গেশনন্দিনী’ উপন্যাসের আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে যে নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন, তা কালক্রমে বাঙালির মনন ও চেতনার মণিকোঠায় স্থায়ী আসন অধিকার করে নেয়। বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যভাবনা নিছক বিনোদনের খোরাক ছিল না; বরং তা ছিল আত্মপরিচয়ের অন্বেষণ, সমাজসংস্কার, নীতিবোধ জাগরণ এবং স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক ঋদ্ধ মানসপ্রসূত সাধনা। ইউরোপীয় শিক্ষা ও দর্শনের সঙ্গে প্রাচ্যের সনাতন সংস্কৃতির এক অপূর্ব সেতুবন্ধ ঘটিয়েছিলেন তিনি, যা তাঁর উপন্যাস ও মননশীল প্রবন্ধে রূপ পরিগ্রহ করেছিল এক অসামান্য শিল্পরূপ। তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিধি ছিল বহুমুখী—ইতিহাসের রোমাঞ্চ থেকে শুরু করে গার্হস্থ্য জীবনের সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব, প্রেমের উদাত্ত আকুলতা থেকে জীবনের চরম ট্র্যাজেডি এবং সেখান থেকে ধর্ম ও দর্শনের গম্ভীর তত্ত্বালোচনায় তাঁর পদচারণ ছিল সমান সাবলীল।   বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যভাবনার কেন্দ্রে ছিল ‘সত্য ও ধর্ম’। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সাহিত্যের মূল লক্ষ্য কেবল মনোরঞ্জন নয়, বরং মানুষের চরিত্র গঠন ও শুভবুদ্ধির জাগরণ। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলোতে যেমন অতীত গৌরব ও জাতীয় জাগরণের সুর বেজে উঠেছে, তেমনি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসে মানবমনের জটিল আবেগ ও পঙ্কিলতার বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের নিসর্গপ্রকৃতির পটভূমিকায় রহস্যময় মানবাত্মার একাকী ক্রন্দন কিংবা ‘বিষবৃক্ষ’ ও ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর মতো উপন্যাসে দাম্পত্য জীবনের ভাঙন, অবৈধ প্রেম ও অনুশোচনার দহন—সবকিছুতেই রয়েছে এক গভীর সাহিত্যরস।   বঙ্কিমচন্দ্র মানুষের অন্তরের গূঢ় প্রবৃত্তিকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি জানতেন ভালোবাসা এক অদ্ভুত শক্তি, যা মন জানে, হৃদয় জানে, দেহ জানে কিন্তু ভাষা জানে না। এই না-জানা অনুভূতির নিখুঁত প্রকাশ তাঁর নারী চরিত্রগুলোর মাঝে এক অনন্য মহিমা লাভ করেছে। কপালকুণ্ডলা, সূর্যমুখী, ভ্রমর কিংবা শৈবলিনী—প্রত্যেকেই যেন রক্তমাংসের মানুষ হয়েও কোনো এক চিরন্তন বেদনার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর গদ্যশৈলী ছিল ঝরঝরে, সংস্কৃতগন্ধী অথচ অত্যন্ত গতিশীল ও মার্জিত। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে কঠিন বাংলায় রোমান্টিক কল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার মিশেল ঘটাতে হয়। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি শুধু লেখক তৈরি করেননি, বরং বাঙালি পাঠকের মনে রুচিবোধ ও সাহিত্যচেতনা সৃষ্টি করেছিলেন। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তিনি অনুভব করেছিলেন যে একটি জাতিকে জাগাতে হলে তার নিজস্ব ভাষায় সাহিত্যচর্চার বিকল্প নেই।   তাঁর রাষ্ট্র ও সমাজভাবনা বিশেষ করে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যে দেশপ্রেমের মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে, তা পরাধীন ভারতের মুক্তিসংগ্রামে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল। এই উপন্যাসের পাতায় জন্ম নিয়েছিল অমর সুর ও বাণী—‘বন্দে মাতরম্’, যা কালক্রমে ভারতের জাতীয় মন্ত্রে পরিণত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র ভারতকে কেবল একটি ভূখণ্ড হিসেবে দেখেননি, তাকে মাতৃরূপে কল্পনা করে দেশমাতৃকার বন্দনা করেছিলেন। তাঁর এই স্বদেশভাবনা বা স্বাদেশ্য চিন্তা কোনো সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক উদাত্ত প্রাণশক্তি।    বিশিষ্ট ও প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের একক পথপ্রদর্শক ও সাহিত্যসম্রাট। রবীন্দ্রনাধ ঠাকুর থেকে শুরু করে শ্রী অরবিন্দ ও আধুনিক সমালোচকেরা তাঁর শিল্পকলা, সমাজচেতনা ও জাতীয়তাবাদী প্রভাবের গভীর মূল্যায়ন করেছেন।  বঙ্কিমচন্দ্রকে বাংলা উপন্যাসের পথপ্রদর্শক ও মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেছেন, বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যকে পরের দুয়ার থেকে মুক্ত করে স্বনির্ভর ও স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর মতে, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের চরিত্রগুলো জীবন্ত, গতিশীল এবং বাঙালি পাঠকের মানসপটে চিরস্মরণীয়।   শ্রী অরবিন্দ বঙ্কিমচন্দ্রকে শুধু একজন সাহিত্যিক নন, বরং জাতির আত্মাকে জাগিয়ে তোলা এক মহান দ্রষ্টা হিসেবে দেখেছেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর দেশবাসীকে একটি ভাষা, একটি সাহিত্য এবং একটি জাতিসত্তা উপহার দিয়েছেন। ‘আনন্দমঠ’ ও ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রের মধ্য দিয়ে জাতীয় মুক্তির যে বীজ তিনি রোপণ করেছিলেন, তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন অরবিন্দ।    আধুনিক ও প্রগতিশীল সমালোচকদের দৃষ্টিতে বঙ্কিমচন্দ্র রোমান্টিক কল্পনার গণ্ডি ছাড়িয়ে সমাজ সংস্কার, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে উপন্যাসে স্থান দিয়েছেন। কেউ কেউ তাঁর কিছু উপন্যাসে সাম্প্রদায়িক ও হিন্দু পুনরুত্থানবাদী চেতনার অতি-প্রকাশ নিয়েও সমালোচনা করেছেন, যা সমকালীন ও পরবর্তী যুগের ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্যিকদের মধ্যে ভিন্ন চিন্তার জন্ম দিয়েছিল।  তাঁর গদ্যশৈলী ও ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার সম্পাদনা বাংলা ভাষা ও মননকে আধুনিক রূপ দানে অনন্য ভূমিকা রেখেছে বলে সমালোচকেরা একমত।   জীবনের অন্তিম পর্বে এসে তিনি ধর্মতত্ত্ব, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও কৃষ্ণচরিত্র নিয়ে গভীর মননশীল গবেষণা করেন। এগুলোর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে কর্মযোগ ও লোকসংগ্রহই মানুষের পরম ধর্ম। সাহিত্যসম্রাট হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের এই সামগ্রিক সৃষ্টি শুধু উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং বিশ শতক এবং তারও পরবর্তী সাহিত্যিকদের মনে জোগাল এক অফুরন্ত প্রেরণা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বহু প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক বঙ্কিমী ভাবনার উত্তরাধিকার বহন করেছেন। মানুষের জীবনের চরম সত্য, ধর্মীয় নিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শিল্পসৌন্দর্যের এক অনুপম সুষমায় বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যকীর্তি চিরকালের মতো ধন্য হয়ে আছে।   আধুনিক বাংলা গদ্য ও উপন্যাসের ভিত্তি স্থাপনকারী, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব বর্তমান যুগেও সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মননশীল ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও গভীর। তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র জাতীয় চেতনা গঠনে চিরকালীন প্রেরণা জোগালেও তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার কেবল দেশপ্রেমেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আমাদের মনন ও সমাজচিন্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।  

বিধান চন্দ্র সান্যাল বিধান চন্দ্র সান্যাল আগস্ট ১৭, ২০২৬ 0
শতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য

মহাকালের বহমান স্রোতে শতবর্ষ এক ক্ষুদ্র ক্ষণমাত্র। কোনো কোনো জীবন এই স্বল্প পরিসরেই সময়ের গায়ে এমন এক স্থায়ী স্বাক্ষর এঁকে দিয়ে যায়, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অম্লান থাকে। বাংলা সাহিত্যাকাশে সুকান্ত ভট্টাচার্য তেমনই এক নক্ষত্র। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষের এই মহালগ্নে দাঁড়িয়ে গত এক শতকের বাংলা কাব্যপ্রবাহের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। কী বিপুল দ্রোহ, আর কী গভীর মমতায় তিনি সাজিয়েছিলেন তাঁর পঙক্তিমালা!   ​কল্লোল-উত্তর বাংলা কবিতায় যখন একধরনের নাগরিক ক্লান্তি, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতাশা আর নিভৃত ব্যাকুলতার মেলা বসেছিল, ঠিক তখন উল্কাপিণ্ডের মতো সুকান্তের আগমন। তিনি কবিতাকে নন্দনতাত্ত্বিক কারুকাজ বা কল্পনার দূরবর্তী নক্ষত্রলোক থেকে টেনে নামিয়েছেন রাজপথের রূঢ় বাস্তবের মাটিতে।    ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝালসানো রুটি।   চাঁদের মতো সনাতন রূপকও তাঁর হাতে হয়ে ওঠে বুভুক্ষু মানুষের জঠরজ্বালার প্রতীক। ‘রানার'-এর ক্লান্ত পদক্ষেপের আড়ালে তিনি আঁকেন শ্রমজীবী মানুষের অবমূল্যায়িত জীবনের নিখুঁত কোলাজ আর ‘আঠারো বছর বয়স’-এ স্পন্দিত করে তোলেন যৌবনের দুর্জয় আত্মপ্রত্যয়কে।   ​আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, সুকান্ত কি কেবল অতীতের কোনো বিপ্লবী অধ্যায়? উত্তর হলো—না। বিশ্বজুড়ে আজও শোষণ, বৈষম্য আর প্রাচুর্যের পাশে দারিদ্র্যের বৈপরীত্য। আজ যখন নতুন প্রজন্ম এক অবক্ষয়গ্রস্ত জীর্ণ পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দিশা খোঁজে, তখন সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’ তাদের চিরন্তন দিশারী হয়ে ওঠে : এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান... চলে যাব— তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ  প্রাণপণে পৃথিবীর আবর্জনা পরিষ্কার করে যাব।   ​শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আজ বাংলা কবিতার এই অনন্য অগ্নিপুরুষকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম। শতাব্দী পেরিয়েও তাঁর কলম আজও আমাদের প্রাত্যহিক লড়াইয়ের অদম্য অনুপ্রেরণা।     শাহ্ জাহাঙ্গীর  ফরিদপুর। 

‎শাহ্ জাহাঙ্গীর ‎শাহ্ জাহাঙ্গীর আগস্ট ১৫, ২০২৬ 0
যে নেশা আমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনে

মানুষ যখন কোনো কিছুর প্রতি গভীরভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে, তখন তার চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালো-মন্দের বোধ—সবকিছুই ধীরে ধীরে সেই আসক্তির বিষয়টিকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। নিজের বলে যেন আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তার ভাবনা, অনুভব, আনন্দ, বিষাদ, অপেক্ষা—সবকিছুর মধ্যেই সেই একটি বিষয় মিশে থাকে। পৃথিবীতে আরও কত কিছু ঘটে যায়, কত মানুষ আসে-যায়, কত সম্পর্ক তৈরি হয়, ভেঙে যায়, তবু তার মন পড়ে থাকে সেই এক জায়গাতেই। সে তখন সেই আসক্তির বিষয়েই এমনভাবে বুঁদ হয়ে থাকে যে, তার নিজের সত্তাটুকুও যেন ধীরে ধীরে সেই আসক্তির মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।   আমাকে কবে যে কবিতা লেখার নেশা এভাবে পেয়ে বসেছিল, মনে নেই। শুধু মনে আছে, একদিন শব্দের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বদলে গেল। আগে শব্দ দিয়ে কিছু বলতে চাইতাম। পরে বুঝলাম, শব্দেরও নিজস্ব জীবন আছে। তারা কখনো আমার কথা বলে, কখনো আমার অজানা কথাগুলো বলে। কখনো এমন কিছু প্রকাশ করে দেয়, যা আমি নিজেই জানতাম না যে আমার ভেতরে এতদিন ধরে বাস করছে। সেখান থেকেই হয়তো শুরু।   তারপর যত এগিয়েছি, ততই দেখেছি, এ পথের কোনো শেষ নেই। একটি কবিতা লিখে মনে হয়েছে, এবার বুঝি একটু কাছে পৌঁছেছি। তারপর সেই কবিতাই আবার আমাকে আরও দূরের কোনো গেটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গেট  খুলেছি, তার ওপারে আরেক গেট। আরও একটু এগিয়েছি, আরও অচেনা কোনো পৃথিবী সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সৃষ্টির পথ বোধহয় এমনই।   এখানে পৌঁছে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আছে শুধু এগিয়ে যাওয়া। শুরুতে মানুষ ভাবে, সে সৃষ্টি করছে। পরে একদিন তার মনে হয়, আসলে সৃষ্টিই তাকে তৈরি করছে।   একটি কবিতা লিখতে গিয়ে মানুষ শুধু কবিতা লেখে না, নিজের ভেতরের অন্ধকারের সঙ্গে দেখা করে। নিজের অহংকারকে চিনতে শেখে। নিজের ভয়কে স্পর্শ করে। নিজের ভালোবাসার গভীরতা মাপে। কখনো নিজের ক্ষতকে নতুন করে আবিষ্কার করে, কখনো এমন আনন্দের সন্ধান পায়, যার কোনো নামই সে আগে জানত না। এ কারণেই হয়তো সত্যিকারের সৃষ্টিশীলতা কখনো নিছক বিনোদন হয়ে থাকে না। এটা মানুষকে বদলে দেয়। তবে সেই বদলে যাওয়ার পথ খুব সহজ নয়।   ভালোবাসতে হয়। হারাতে হয়। প্রত্যাখ্যাত হতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। ভুল করতে হয়। আবার শুরু করতে হয়। পৃথিবীকে শুধু চোখ দিয়ে দেখলে হয় না, তাকে অনুভব করতে হয়। মানুষের মুখের আড়ালে তার নীরবতাকে শুনতে হয়। একটি গাছের ছায়ায় যেমন ইতিহাস থাকে, তেমনি একজন মানুষের নীরবতার মধ্যেও থাকে অগণিত অপ্রকাশিত গল্প। সেই গল্পগুলো একদিন এসে শব্দের দরজায় কড়া নাড়ে। তখন কবিতা লেখা হয়।   কবিতা হয়তো কোনো উত্তর দেয় না। বরং আরও ভালো প্রশ্ন করতে শেখায়। আর এই শেখাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। কারণ, জীবন আমাদের বারবার বোঝাতে চায়—আমরা যতটা জানি, তার চেয়ে অনেক বেশি আমরা জানি না। অথচ সেই না-জানার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বিস্ময়। যে মানুষ বিস্মিত হতে পারে, সে এখনো বেঁচে আছে। যে মানুষ নতুন কিছু শেখার জন্য নিজের পুরোনো বিশ্বাসকে ভাঙতে পারে, সে এখনো তরুণ। কবিতা আমাকে সেই তরুণ থাকার শিক্ষাই দিয়েছে।   বয়স বাড়তে পারে, কিন্তু বিস্ময় যেন না মরে। ক্লান্তি আসতে পারে, কিন্তু কৌতূহল যেন না মরে। সবকিছু ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছে হতে পারে, কিন্তু সৃষ্টির কাছে ফিরে আসার দরজাটি যেন বন্ধ না হয়। আর কবিতার সঙ্গে আমার সম্পর্কের সবচেয়ে আশ্চর্য জায়গাটা হয়তো এখানেই। কবিতা আমাকে কখনো ছেড়ে যায়নি।   আমি তাকে অবহেলা করেছি, তবু সে অপেক্ষা করেছে। আমি দূরে সরে গেছি, তবু সে কোথাও না কোথাও আমার জন্য একটি শব্দ রেখে দিয়েছে। আমি যখন মানুষের কাছে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরেছি, তখন কবিতা আমাকে কোনো প্রশ্ন না করে জায়গা দিয়েছে। কোনো অভিযোগ নেই। কোনো হিসাব নেই। কোনো শর্ত নেই। আছে শুধু ফিরে আসার একটি দরজা। তাই আজ মনে হয়, কবিতা আমার কোনো অর্জন নয়। বরং কবিতার কাছে আমি নিজেই এক আজীবন শিক্ষার্থী।   আমি যত লিখি, তত বুঝি—আরও কত কিছু শেখার বাকি। যত জানি, ততই নিজের অজ্ঞতার বিস্তার দেখতে পাই। যত গভীরে যাই, তত বুঝি গভীরতার কোনো শেষ নেই। এই উপলব্ধিটাই হয়তো সাধনার প্রথম সত্য। সত্যিকারের সাধনা মানুষকে বড় করে না, বরং তাকে বিনম্র করে। সে শেখায়, আমি এখনো পথে আছি। এখনো শিখছি। এখনো ভুল করছি। এখনো নতুন করে শুরু করতে পারি।   হয়তো একদিন আমার লেখা কেউ পড়বে না। হয়তো আমার কোনো শব্দের কোনো পাঠক থাকবে না। হয়তো আমার লেখা কোনো কবিতাই সময়ের দীর্ঘ নদী পার হয়ে যেতে পারবে না। তবু লিখব। কারণ, সব সৃষ্টি পৃথিবীকে দেখানোর জন্য হয় না। কিছু সৃষ্টি নিজের ভেতরের মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিছু কাজের কোনো বাহ্যিক পুরস্কার নেই, অথচ সেই কাজ না করলে নিজের কাছেই পরাজিত হতে হয়। কবিতা আমার কাছে তেমনই এক প্রয়োজন। তাই এখন আর কবিতাকে নেশা বলতেও ভয় হয়।   নেশা মানুষকে নিজের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়। আর কবিতা আমাকে প্রতিবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। হয়তো এটাই তার সবচেয়ে বড় মায়া। জীবনে অনেক কিছুই একদিন আমাদের ছেড়ে যায়—মানুষ, সম্পর্ক, সময়, যৌবন, অভিমান, প্রিয় জায়গা, প্রিয় মুখ। কিন্তু কিছু কিছু ভালোবাসা আমাদের ছেড়ে যায় না। তারা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়, গভীর হয়, পরিণত হয় এবং একসময় আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে যায়। কবিতা আমার কাছে তেমনই।   তাই যদি কপালে কোনো নিয়তি লেখা থেকেই থাকে, তবে আমি চাই সেখানে এইটুকুই লেখা থাক— আমি আজীবন কবিতার কাছে ফিরে যাব। আজীবন তার ছাত্র হয়ে থাকব। আজীবন তার কাছে একটু একটু করে নিজেকে আবিষ্কার করব।   আর যদি সত্যিই কোনো গোলামি বেছে নেয়ার সুযোগ থাকে, তবে আমি কবিতারই গোলামি বেছে নেব।কারণ, এমন গোলামি মানুষকে ছোট করে না। বরং নিজের সমস্ত অহংকার থেকে মুক্ত করে দেয়। কবিতার কাছে এমন পরাধীনতাই হয়তো মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।

সাঈদুর রহমান লিটন সাঈদুর রহমান লিটন আগস্ট ১৫, ২০২৬ 0
আত্ম অন্বেষণ ও মানবিক অনুভবের চিঠি : ‘শুধু মাধবীর জন্য’

বাংলা সাহিত্যে চিঠি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি আত্মপ্রকাশেরও একটি অনন্য শিল্পরূপ। ব্যক্তিগত অনুভূতি, স্মৃতি, প্রেম, বেদনা বা জীবনবোধ চিঠির ভাষায় এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা পাঠকের সঙ্গে এক নিবিড় মানসিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মো. আসাদুজ্জামানের ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইটি সমকালীন বাংলা গদ্যে একটি ভিন্নমাত্রার সংযোজন।   মুক্ত গদ্যের এই সংকলনে লেখক ব্যক্তিগত অনুভূতির ভেতর দিয়ে মানবজীবনের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা, সম্পর্কের সূক্ষ্মতা এবং সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। বইটির শিরোনামই পাঠকের কৌতূহল জাগায়। ‘মাধবী’ কে? কোনো বাস্তব মানুষ নাকি একটি প্রতীক? বইয়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়, ‘মাধবী’ কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একধরনের মানসিক আশ্রয়, এমন এক শ্রোতা, যার কাছে মানুষ নিজের অপ্রকাশিত কথাগুলো বলতে চায়। এই প্রতীকী নির্মাণ বইটির নান্দনিকতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রত্যেক পাঠক নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে ‘মাধবী’কে নতুন অর্থে আবিষ্কার করার সুযোগ পান।   ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইটির প্রধান শক্তি এর ভাষা। লেখক অলংকারের ভারে ভাষাকে ক্লান্ত করেননি; বরং সহজ, সংযত ও আন্তরিক বাক্যবিন্যাসে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। কোথাও কোথাও ভাষা কাব্যিক, আবার কোথাও তা নিঃশব্দ স্বীকারোক্তির মতো। এই ভাষাশৈলী পাঠককে দ্রুত আকৃষ্ট করে এবং লেখকের ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে, তরুণ পাঠকদের জন্য ভাষার এই স্বাভাবিকতা বইটিকে সহজপাঠ্য করে তুলেছে। গ্রন্থটির বিষয়বৈচিত্র্যও লক্ষণীয়। ভালোবাসা এখানে কেবল রোমান্টিক আবেগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের প্রতি মমত্ব, দায়িত্ববোধ, সময়ের নির্মমতা, স্মৃতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং সমাজ-রাষ্ট্র সম্পর্কে লেখকের উপলব্ধিও এতে স্থান পেয়েছে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতার সংমিশ্রণ বইটির ভাবনার পরিসরকে বিস্তৃত করেছে। লেখক নিজস্ব অনুভূতির বৃত্ত অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক প্রশ্নের দিকেও দৃষ্টি দিয়েছেন।   চিঠির ভঙ্গিতে লেখা হওয়ায় প্রতিটি রচনা যেন পাঠকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় পরিণত হয়েছে। এই অন্তরঙ্গতা বইটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখক কোথাও বক্তা নন, কোথাও শিক্ষকও নন; বরং একজন সহযাত্রী, যিনি জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান। ফলে পাঠকও নিজের জীবনকে লেখার ভেতরে খুঁজে পান। এই সংযোগই বইটির সাহিত্যিক সার্থকতার অন্যতম কারণ। তবে বইটির সীমাবদ্ধতাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। যারা দৃঢ় প্লট, নাটকীয় সংঘাত বা চরিত্রনির্ভর উপন্যাসের প্রত্যাশা নিয়ে বইটি পড়বেন, তাঁরা হয়তো কিছুটা ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবেন। এটি মূলত অনুভূতি ও চিন্তার গদ্য; এখানে ঘটনার চেয়ে উপলব্ধির গুরুত্ব বেশি। কিছু লেখায় আবেগের পুনরাবৃত্তিও অনুভূত হতে পারে। তবে মুক্ত গদ্যের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় এই পুনরাবৃত্তি লেখকের ভাবনার ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে হয়।   সমকালীন বাংলা সাহিত্যে মুক্ত গদ্যের চর্চা খুব বিস্তৃত নয়। সেই বিবেচনায় ‘শুধু মাধবীর জন্য’ একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। বইটি পাঠককে কেবল আবেগাপ্লুত করে না; বরং তাকে আত্মসমালোচনা, আত্ম অন্বেষণ এবং মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এর পাঠ এক বসায় শেষ করার নয়; বরং ধীরে ধীরে, বিরতি নিয়ে, প্রতিটি লেখার ভেতরের স্তরগুলো অনুভব করার। সব মিলিয়ে ‘শুধু মাধবীর জন্য’ এমন একটি গ্রন্থ, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়েছে। সহজ ভাষা, আন্তরিক প্রকাশভঙ্গি এবং চিন্তার গভীরতা বইটিকে পাঠযোগ্য করে তুলেছে। সমকালীন বাংলা গদ্যে এটি এমন একটি সংযোজন, যা পাঠকের কাছে আত্ম অন্বেষণের একটি নীরব আহ্বান হয়ে ওঠে। সাহিত্যপ্রেমী, বিশেষত মুক্ত গদ্য ও জীবনঘনিষ্ঠ রচনার অনুরাগীদের জন্য বইটি নিঃসন্দেহে আগ্রহের বিষয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ গ্রন্থের পাঠ নতুন নতুন ব্যাখ্যার জন্ম দেবে এমন প্রত্যাশা অমূলক নয়।   ‘শুধু মাধবীর জন্য’ প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। বইটির প্রকাশনা মান পরিচ্ছন্ন ও যত্নশীল। উন্নত কাগজ, সুস্পষ্ট মুদ্রণ, পরিমিত অলংকরণ ও নান্দনিক প্রচ্ছদ গ্রন্থটির সাহিত্যিক আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পাঠের সুবিধা ও নান্দনিক উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রকাশকের পেশাদারত্ব লক্ষণীয়। ফলে বিষয়বস্তুর পাশাপাশি গ্রন্থটির বাহ্যিক নির্মাণও পাঠকের কাছে একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।    

ড. লিপন মুস্তাফিজ ড. লিপন মুস্তাফিজ আগস্ট ১৩, ২০২৬ 0
বার্নট সুগার : অবনী দোশির উপন্যাসের একটি বিশদ সমালোচনা

সমকালীন ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যে যে কয়েকটি উপন্যাস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক সাহিত্যমহলে গভীর আলোড়ন তুলেছিল, অবনী দোশির ‘বার্নট সুগার’ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসটি প্রথমে ভারতে ‘গার্ল ইন হোয়াইট কটন’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল। পরে এটি যুক্তরাজ্যে ‘বার্নট সুগার’ নামে প্রকাশিত হওয়ার পর ২০২০ সালের মর্যাদাপূর্ণ বুকার প্রাইজের চূড়ান্ত সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান লাভ করে।   একই বছর বুকার প্রাইজ অর্জন করে ডাউগ্লাস স্টুর্টের ‘শাগি বেন’, কিন্তু ‘বার্নট সুগার’ তার অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, তীক্ষ্ণ ভাষাশৈলী এবং মা–মেয়ের সম্পর্কের সাহসী ও নির্মোহ উপস্থাপনার জন্য বিশ্বজুড়ে সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নেয়। এই উপন্যাসের মাধ্যমে অবনী দোশি সমকালীন ভারতীয় প্রবাসী ইংরেজি কথাসাহিত্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর অভিষেক উপন্যাস ‘বার্নট সুগার’ ২০২০ সালের বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়ে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ স্বীকৃতি অর্জন করে। তাঁর এই সাফল্য সমকালীন ভারতীয় প্রবাসী ইংরেজি কথাসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।   ‘বার্নট সুগার’ মূলত মা–মেয়ের সম্পর্কের গল্প হলেও এর পরিসর অনেক বৃহত্তর। এটি স্মৃতি, পরিচয়, মানসিক আঘাত, মাতৃত্ব, ক্ষমতা, অপরাধবোধ, শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমার অসম্ভবতার এক গভীর সাহিত্যিক অনুসন্ধান। উপন্যাসটি পাঠককে এমন এক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে ভালোবাসা কখনো নিঃশর্ত নয়, পরিবার সব সময় নিরাপদ আশ্রয় নয়, আর মাতৃত্ব কোনো পবিত্র ও প্রশ্নাতীত প্রতিষ্ঠানও নয়।   উপন্যাসের কথক অন্তরা। তার মা তারা একজন স্বাধীনচেতা, বিদ্রোহী এবং প্রচলিত সামাজিক নিয়মের প্রতি উদাসীন নারী। তিনি স্বামীকে ছেড়ে এক আধ্যাত্মিক আশ্রমে আশ্রয় নেন এবং ছোট্ট অন্তরাকে নিয়ে এক অনিশ্চিত জীবনের সূচনা করেন। সেই আশ্রমজীবন, দারিদ্র্য, অবহেলা, অনিরাপত্তা ও মানসিক অস্থিরতা অন্তরার শৈশবকে গভীরভাবে ক্ষত-বিক্ষত করে। বহু বছর পর যখন তাঁরা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি হারাতে শুরু করেন, তখন ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই অন্তরাকেই তাঁর পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে হয়। এখান থেকেই উপন্যাসটি এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন তোলে—যে মা কখনো সন্তানের প্রতি দায়িত্বশীল ছিলেন না, সেই মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব কতখানি?   অবনী দোশির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো তিনি মা–মেয়ের সম্পর্ককে কোনো আবেগময় আদর্শের মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। ভারতীয় সমাজে মাতৃত্বকে দেবীতুল্য মর্যাদা দেয়ার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু ‘বার্নট সুগার’ সেই ধারণাকে প্রশ্ন করে। তাঁরা নিঃস্বার্থ মা হতে চান না; তিনি নিজের স্বাধীনতা, নিজের শরীর এবং নিজের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন। অন্যদিকে অন্তরা মায়ের প্রতি একই সঙ্গে ভালোবাসা, ঘৃণা, করুণা ও প্রতিশোধস্পৃহা অনুভব করে। এই দ্বৈত অনুভূতির জটিলতাই উপন্যাসটিকে অসাধারণ মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দিয়েছে। এখানে ভালোবাসা ও ঘৃণা পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং একই সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য দুই দিক।   উপন্যাসের আরেকটি কেন্দ্রীয় বিষয় হলো স্মৃতি। তাঁরা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ফলে স্মৃতি হারাতে থাকেন। কিন্তু অন্তরা অতীতের প্রতিটি ক্ষত, প্রতিটি অবহেলা এবং প্রতিটি অপমান মনে রাখতে চায়। ফলে স্মৃতি এখানে কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়; এটি ক্ষমতার ক্ষেত্র। যে ভুলে যায় সে কি অপরাধ থেকে মুক্তি পায়? আর যে ভুলতে পারে না, সে কি কখনো মুক্ত হতে পারে? অবনী দোশি স্মৃতিকে নির্ভুল সত্য হিসেবে দেখান না; বরং তিনি দেখান যে স্মৃতি নিজেই একটি পুনর্নির্মাণ, যেখানে বাস্তবতা, কল্পনা, অভিমান ও সময় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসটিকে স্মৃতি-অধ্যয়নের আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত করে।   নারীবাদী সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রেও ‘বার্নট সুগার’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। তারা চরিত্রটি সমাজনির্ধারিত ‘আদর্শ মা’-এর ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে। তিনি আত্মত্যাগের প্রতীক নন; তিনি নিজের জীবনকে নিজের শর্তে বাঁচতে চান। ফলে মাতৃত্ব এখানে কোনো সহজাত নারীগুণ নয়, বরং সামাজিক প্রত্যাশা, ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘর্ষের ক্ষেত্র। সিমোন দ্য বোভোয়ার ও অ্যাড্রিয়েন রিচের মাতৃত্ব-সংক্রান্ত তাত্ত্বিক আলোচনার সঙ্গে এই উপন্যাসের বহুস্তরীয় সংলাপ লক্ষ করা যায়। একই সঙ্গে জুলিয়া ক্রিস্তেভার মাতৃত্ব-সংক্রান্ত ভাবনাও এখানে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, কারণ উপন্যাসটি মা ও সন্তানের সম্পর্ককে গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করে।   মনোবিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিকোণ থেকেও ‘বার্নট সুগার’ একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুস্তরীয় উপন্যাস। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের দমিত স্মৃতির ধারণা অনুযায়ী, শৈশবের মানসিক আঘাত বা ট্রমা কখনো সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না; বরং তা অবচেতনে সঞ্চিত থেকে পরবর্তী জীবনের আচরণ, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অন্তরার ক্ষেত্রেও আমরা দেখি, মায়ের অবহেলা, অনিশ্চিত শৈশব, নিরাপত্তাহীনতা ও ভালোবাসার অভাব তার ব্যক্তিত্বের গভীরে এমনভাবে প্রোথিত হয়েছে যে, প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও সে ওই ট্রমার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তার প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং নিজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি অতীতের সেই ক্ষত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।   জাক লাকাঁর আকাঙ্ক্ষা ও অভাবের তত্ত্ব এই উপন্যাসের পাঠকে আরও গভীর করে। লাকাঁর মতে, মানুষের আকাঙ্ক্ষা কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয় না; বরং তা এক চিরস্থায়ী অভাববোধ থেকে জন্ম নেয়। অন্তরার জীবনেও এই অভাবের কেন্দ্রবিন্দু হলো মাতৃস্নেহ ও স্বীকৃতি। সে একদিকে মায়ের প্রতি গভীর ক্ষোভ পোষণ করে, তাকে প্রত্যাখ্যান করতে চায়, অন্যদিকে একই মায়ের কাছ থেকেই ভালোবাসা, স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা কামনা করে। এই পরস্পরবিরোধী মানসিক অবস্থানই তাকে ক্রমাগত দ্বিধাগ্রস্ত, অস্থির ও অস্তিত্বগত সংকটে নিমজ্জিত করে।   বস্তু-সম্পর্ক তত্ত্বের আলোকে উপন্যাসটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেলানি ক্লাইন ও ডোনাল্ড উইনিকটের মতো মনোবিশ্লেষকদের মতে, শিশুর প্রথম সম্পর্ক—বিশেষত মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক—পরবর্তী জীবনের সমস্ত আন্তঃ ব্যক্তিক সম্পর্কের ভিত্তি নির্মাণ করে। অন্তরার ক্ষেত্রে সেই প্রাথমিক সম্পর্ক নিরাপদ, স্নেহময় বা স্থিতিশীল ছিল না; বরং ছিল অনিশ্চয়তা, অবহেলা এবং আবেগগত বিচ্ছিন্নতায় পরিপূর্ণ। ফলে সে পরিণত বয়সেও সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সংগ্রাম করে। তার বিবাহিত জীবন, মাতৃত্ব নিয়ে সংশয়, এমনকি নিজের শরীর ও পরিচয় সম্পর্কে তার দ্বিধাও শৈশবের সেই অসম্পূর্ণ সম্পর্কেরই প্রতিফলন।   এ কারণেই ‘বার্নট সুগার’ কেবল একটি মা–মেয়ের সম্পর্কের কাহিনি নয়; এটি ট্রমার উত্তরাধিকার, দমিত স্মৃতির প্রত্যাবর্তন এবং অবচেতনের জটিল কার্যপ্রণালির এক সূক্ষ্ম সাহিত্যিক বিশ্লেষণ। অবনী দোশি দেখিয়েছেন, মানুষ অনেক সময় অতীতকে ভুলে যেতে চাইলেও অবচেতন কখনো তা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হতে দেয় না। বরং সেই দমিত স্মৃতিই বারবার বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে, সম্পর্ককে জটিল করে তোলে এবং ব্যক্তিসত্তাকে বিভক্ত করে। অন্তরার চরিত্র তাই একদিকে ক্ষতবিক্ষত শিশুর, অন্যদিকে স্বীকৃতির জন্য আজীবন সংগ্রামরত এক প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রতীক।   উপন্যাসে শরীর ও যৌনতাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্তরার বিবাহিত জীবন, মাতৃত্ব নিয়ে তার সংশয় এবং নিজের শরীর সম্পর্কে তার অস্বস্তি সবই শৈশবের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। শরীর এখানে কেবল জৈবিক সত্তা নয়; এটি স্মৃতি, ক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা এবং নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। এ কারণে উপন্যাসটি নারী-অভিজ্ঞতার গভীর ও জটিল রূপ তুলে ধরে।   অবনী দোশির ভাষাশৈলী সংযত, ধারালো ও কাব্যিক। অল্প শব্দে তিনি গভীর মানসিক অস্থিরতা নির্মাণ করেন। প্রথম পুরুষে বর্ণিত হওয়ায় পাঠক সরাসরি অন্তরার চেতনার মধ্যে প্রবেশ করেন। কিন্তু সেই বয়ানও সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। ফলে পাঠক বারবার প্রশ্ন করেন—আমরা কি সত্যিই যা পড়ছি, তা-ই সত্য? এই ‘অনির্ভরযোগ্য কথক’-এর কৌশল উপন্যাসটিকে আরও জটিল ও শিল্পসম্মত করে তুলেছে।   উপন্যাসের শিরোনাম ‘বার্নট সুগার’ নিজেই একটি শক্তিশালী প্রতীক। চিনি মিষ্টতার প্রতীক, কিন্তু পুড়ে গেলে সেই মিষ্টতাই তিক্ততায় রূপান্তরিত হয়। মা–মেয়ের সম্পর্কও তেমন—ভালোবাসা আছে, কিন্তু সেই ভালোবাসা ক্ষত, অভিমান এবং অপূর্ণতার আগুনে দগ্ধ হয়ে তিক্ত হয়ে উঠেছে। অতীতের স্মৃতিও পোড়া চিনির মতো—মুছে যায় না, বরং স্থায়ী দাগ রেখে যায়।   উপন্যাসটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আশ্রম-পর্ব আরও বিস্তৃত হতে পারত, কয়েকটি পার্শ্বচরিত্র আরও বিকশিত হতে পারত এবং সমাপ্তি অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তবে এই অসম্পূর্ণতাই লেখিকার শিল্পকৌশলের অংশ। কারণ, বাস্তব জীবনেও সব সম্পর্কের সমাধান হয় না, সব ক্ষত সারে না এবং সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না।   সবশেষে বলা যায়, ‘বার্নট সুগার’ এমন একটি উপন্যাস, যা পাঠকের মানসিক স্বস্তিকে ভেঙে দেয় এবং তাকে সম্পর্ক, স্মৃতি, মাতৃত্ব ও পরিচয় সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এটি কোনো সহজ পারিবারিক কাহিনি নয়; বরং মানুষের অন্তর্জগতের অন্ধকার, দমিত স্মৃতি এবং আবেগের জটিলতার এক অসাধারণ সাহিত্যিক অনুসন্ধান। অবনী দোশি দেখিয়েছেন যে পরিবারের ভেতরে যেমন ভালোবাসা জন্ম নেয়, তেমনি জন্ম নেয় নীরব সহিংসতা, অপরাধবোধ ও অমোচনীয় মানসিক ক্ষত। সাহিত্যিক গুণ, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভাষার অভিনব ব্যবহারের জন্য বার্নট সুগার নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, যা দীর্ঘদিন ধরে গবেষক, সমালোচক ও সাধারণ পাঠকের আলোচনায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।  

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী আগস্ট ১২, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
প্রয়াণে নয়, চিরজাগরূক রবীন্দ্রনাথ

মৃত্যু মানবজীবনের সবচেয়ে নিশ্চিত ঘটনা। তবু সব মৃত্যু সমান অর্থ বহন করে না। অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু একটি জীবনের সমাপ্তি; কিন্তু কিছু মানুষের মৃত্যু তাঁদের জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং তাঁদের ভাবনার নতুন জন্ম। ইতিহাসে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম, যাঁদের শারীরিক অনুপস্থিতি তাঁদের বৌদ্ধিক ও নৈতিক উপস্থিতিকে আরও বিস্তৃত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর প্রয়াণকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্বকে সংকুচিত করা হয়; বরং তা মানবচেতনার ধারাবাহিক বিকাশের একটি অনন্ত অধ্যায়।   রবীন্দ্রনাথকে বোঝার সবচেয়ে বড় বাধা হলো তাঁকে কেবল ‘কবি’ হিসেবে পাঠ করা। তিনি মূলত একজন দার্শনিক শিল্পী। তাঁর কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক কিংবা প্রবন্ধ অন্তঃসলিল প্রবাহে কাজ করেছে একটি সুসংহত জীবনদর্শন। সেই দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের আত্মবিকাশ, স্বাধীন চেতনা, সৌন্দর্যের উপলব্ধি এবং বিশ্বমানবতার ধারণা। তাই তাঁর সাহিত্য কেবল নন্দনতত্ত্বের বিষয় নয়; এটি অস্তিত্ব, নৈতিকতা ও সভ্যতার প্রশ্নও উত্থাপন করে।   রবীন্দ্রচিন্তার অন্যতম ভিত্তি হলো উপনিষদীয় দর্শনের আধুনিক ব্যাখ্যা। উপনিষদ মানুষকে শেখায়, জগতের বহুত্বের ভেতরে একত্বের সন্ধান করতে। রবীন্দ্রনাথ এ তত্ত্বকে নিছক ধর্মীয় উপলব্ধি হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি একে মানবজীবনের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ভিত্তিতে রূপ দিয়েছেন। তাঁর কাছে ঈশ্বর কোনো দূরবর্তী অতিপ্রাকৃত সত্তা নন; বরং মানুষের সৃজনশীলতা, প্রেম, সত্যবোধ ও কল্যাণচেতনার মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকাশ। ফলে তাঁর মানবতাবাদ ধর্মবিরোধী নয়, আবার ধর্মীয় সংকীর্ণতারও ঊর্ধ্বে।   এ কারণেই রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদ সম্পর্কেও একটি মৌলিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তিনি দেশকে ভালোবেসেছেন, কিন্তু অন্ধ জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করেননি। তাঁর আশঙ্কা ছিল, জাতীয়তাবাদ যখন মানবতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তখন তা সংঘাত, ঘৃণা ও ক্ষমতার রাজনীতির জন্ম দেয়। তাঁর কাছে দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ ছিল মানুষের মর্যাদা রক্ষা, সংস্কৃতির বিকাশ এবং স্বাধীন চিন্তার চর্চা। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বিশ্বেও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক, যেখানে পরিচয়ের রাজনীতি প্রায়ই মানবিক মূল্যবোধকে আড়াল করে দেয়।   রবীন্দ্রনাথের স্বাধীনতার ধারণাও ছিল বহুমাত্রিক। রাজনৈতিক স্বাধীনতা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই চূড়ান্ত নয়। তিনি মনে করতেন, মানুষ যদি ভয়, লোভ, কুসংস্কার ও অহংকারের কাছে বন্দী থাকে, তাহলে রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও ব্যক্তি স্বাধীন হয় না। তাঁর ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কেবল একটি কাব্যিক প্রার্থনা নয়; এটি মুক্ত সমাজ নির্মাণের নৈতিক দর্শন। এখানে স্বাধীনতা মানে কেবল শাসকের পরিবর্তন নয়, বরং চেতনার রূপান্তর।   প্রকৃতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা আধুনিক পরিবেশ-দর্শনের সঙ্গেও বিস্ময়করভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি প্রকৃতিকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখেননি; বরং সহাবস্থানের এক জীবন্ত সম্পর্ক হিসেবে দেখেছেন। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি হলে মানুষের আত্মিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়। এই উপলব্ধি আজকের জলবায়ু সংকটের যুগে নতুন অর্থ পায়। তাই রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-ভাবনা কেবল কাব্যিক রোমান্টিকতা নয়; এটি একটি নৈতিক অবস্থান।   রবীন্দ্রনাথের শিল্পদর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সৌন্দর্য ও সত্যের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের কাজ কেবল বিনোদন দেয়া নয়; মানুষের চেতনাকে প্রসারিত করা। যে শিল্প মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায় না, অন্যের বেদনা অনুভব করতে শেখায় না, কিংবা সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় না, সেই শিল্প তার পূর্ণতা অর্জন করে না। তাই তাঁর সাহিত্য আমাদের আবেগকে স্পর্শ করার পাশাপাশি আমাদের বিবেককেও জাগ্রত করে।   শিক্ষা সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথের চিন্তা আজও যুগান্তকারী। তিনি পরীক্ষাকেন্দ্রিক মুখস্থ বিদ্যার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর মতে, শিক্ষা এমন হওয়া উচিত, যা মানুষের কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ককে বিকশিত করে। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল কর্মসংস্থান নয়; পূর্ণ মানুষ তৈরি করা। বর্তমান সময়ে যখন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে কেবল প্রতিযোগিতা ও পেশাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, তখন রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।   রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবস তাই কেবল স্মরণসভা বা ফুল অর্পণের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। আমরা কি তাঁর সাহিত্যকে কেবল সাংস্কৃতিক আচার হিসেবে পালন করছি, নাকি তাঁর দর্শনকে আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ধারণ করছি? আমরা কি স্বাধীন চিন্তার চর্চা করছি, নাকি মতাদর্শের সংকীর্ণতায় নিজেদের বন্দী করছি? আমরা কি মানুষের মধ্যে মানুষকে দেখতে শিখেছি, নাকি পরিচয়ের দেয়াল আরও উঁচু করছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে কতটা জীবন্ত।   রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর রচনাসম্ভার নয়; তাঁর জাগ্রত চেতনা। বই সংরক্ষণ করা সহজ, কিন্তু চিন্তা ধারণ করা কঠিন। তাঁর গান গাওয়া সহজ, কিন্তু তাঁর মানবতাবাদকে জীবনে বাস্তবায়ন করা কঠিন। তাঁর কবিতা আবৃত্তি করা সহজ, কিন্তু তাঁর মতো মুক্তমনা হয়ে ওঠা কঠিন। তাই তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা আনুষ্ঠানিক স্মরণে নয়; তাঁর দর্শনের সক্রিয় অনুশীলনে।   রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু ঘটেছে ১৯৪১ সালের একটি দিনে; কিন্তু তাঁর উপস্থিতি কোনো তারিখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বেঁচে আছেন মানুষের মুক্ত চিন্তায়, ন্যায়বোধে, শিল্পসৃষ্টিতে, প্রকৃতিপ্রেমে এবং মানবতার প্রতি অটল বিশ্বাসে। যতদিন মানুষ নিজেকে অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবিক সত্যের সন্ধান করবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথ কোনো অতীত নন; তিনি হবেন ভবিষ্যতেরও পথপ্রদর্শক।   রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণকে স্মরণ করার সর্বোত্তম উপায় শোক প্রকাশ নয়; বরং তাঁর দর্শনের আলোয় নিজেদের পুনর্নির্মাণ করা। কারণ, রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত একজন কবির নাম নয়, তিনি এমন এক চেতনার নাম, যা মানুষকে তার সীমা অতিক্রম করে অসীমের দিকে যাত্রা করতে শেখায়।    

শরিফুল রোমান শরিফুল রোমান আগস্ট ৮, ২০২৬ 0
ওডিসি চলচ্চিত্রের প্রতীকী ছবি
ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ওডিসি’ : সময়, স্মৃতি, আত্মপরিচয় ও মানুষের অনন্ত প্রত্যাবর্তনের এক চলচ্চিত্র-দর্শন

প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের ‘ওডিসি’ কেবল পাশ্চাত্য সাহিত্যের একটি ভিত্তিপ্রস্তর নয়, এটি মানবসভ্যতার আত্ম-অনুসন্ধানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য। ট্রয় যুদ্ধের পর ওডিসিউসের দশ বছরের দীর্ঘ প্রত্যাবর্তনের কাহিনি প্রকৃতপক্ষে মানুষের অস্তিত্ব, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা, দায়িত্ব, প্রেম এবং আত্মপরিচয়ের অন্তহীন অভিযাত্রার রূপক। ক্রিস্টোফার নোলান এই মহাকাব্যকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে গিয়ে শুধু একটি প্রাচীন কাহিনির পুনর্নির্মাণ করেননি; বরং একবিংশ শতাব্দীর দর্শকের সামনে নতুনভাবে প্রশ্ন তুলেছেন—মানুষ কি সত্যিই কখনো নিজের ঘরে ফিরে আসে, নাকি সারা জীবন নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তারই সন্ধান করে?   নোলানের চলচ্চিত্রজীবন শুরু থেকেই সময়, স্মৃতি ও বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে এক অবিরাম অনুসন্ধানের ইতিহাস। ‘মেমেন্টো’-তে স্মৃতির ভঙ্গুরতা, ‘ইনসেপশন’-এ স্বপ্নের বহুস্তর, ‘ইন্টারস্টেলার’-এ সময়ের আপেক্ষিকতা, ‘টেনেট’-এ সময়ের বিপরীত প্রবাহ এবং ‘ওপেনহাইমার’-এ ইতিহাস, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব—এই ধারাবাহিক অনুসন্ধানেরই স্বাভাবিক পরিণতি ‘ওডিসি’। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, হোমারের মহাকাব্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ মানুষের মৌলিক প্রশ্ন কখনো পুরোনো হয় না।   এই চলচ্চিত্রে ওডিসিউসকে কোনো অলৌকিক বা অপরাজেয় বীর হিসেবে দেখানো হয় না। তিনি যুদ্ধজয়ী হলেও অন্তরে বিধ্বস্ত একজন মানুষ। যুদ্ধের স্মৃতি, নিহত সহযোদ্ধাদের মুখ, অপরাধবোধ এবং দীর্ঘ বিচ্ছেদের যন্ত্রণা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়। নোলান যুদ্ধকে বীরত্বের গৌরব হিসেবে নয়, বরং মানুষের মানসিক ভাঙনের নির্মম অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞানের আলোকে ওডিসিউস এক যুদ্ধোত্তর মানসিক আঘাতে বিধ্বস্ত মানুষ, যার প্রত্যাবর্তনের পথ কেবল ভৌগোলিক নয়, গভীরভাবে আত্মিক।   চলচ্চিত্রটির কেন্দ্রে রয়েছে সময়। নোলানের চলচ্চিত্রে সময় কখনো ঘড়ির কাঁটার হিসাব নয়; এটি স্মৃতির প্রবাহ, অনুভূতির বিস্তার এবং অস্তিত্বের এক গভীর মাত্রা। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এখানে একে অপরের মধ্যে প্রবাহিত হয়। দর্শকও ওডিসিউসের মতো সময়ের এক জটিল গোলকধাঁধায় প্রবেশ করে। ফলে ‘ওডিসি’ কেবল সমুদ্রযাত্রার কাহিনি নয়; এটি স্মৃতি ও চেতনার স্থাপত্য নির্মাণের এক অসাধারণ শিল্পরূপ।   মনোবিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকেও চলচ্চিত্রটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, দমিত স্মৃতি কখনো সম্পূর্ণ বিলীন হয় না; তা বারবার ফিরে আসে। ওডিসিউসের ক্ষেত্রেও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার অবচেতন মনকে নিরন্তর আলোড়িত করে। কার্ল গুস্তাভ জুং-এর মতে, তার এই যাত্রা কেবল নায়কের অভিযান নয়; এটি আত্মসত্তার পূর্ণ বিকাশের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। জ্যাক লাকাঁর ধারণা অনুযায়ী মানুষের আকাঙ্ক্ষা কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্ত হয় না; তাই ইথাকায় ফিরে এসেও ওডিসিউসের অনুসন্ধান শেষ হয় না। নোলান এই মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক স্তরগুলোকে সংলাপের চেয়ে দৃশ্য, নীরবতা এবং প্রতীকের মাধ্যমে অধিক শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করেছেন।   অ্যারিস্টটলের ‘কাব্যতত্ত্ব’ অনুসারে মহৎ ট্র্যাজেডির উদ্দেশ্য হলো দর্শকের মনে করুণা ও ভয়ের উদ্রেক ঘটিয়ে মানসিক পরিশুদ্ধি ঘটানো। ‘ওডিসি’ প্রচলিত অর্থে ট্র্যাজেডি নয়, কিন্তু এর আবেগীয় অভিঘাত সেই মানসিক পরিশুদ্ধির সমতুল্য। কারণ, দর্শক উপলব্ধি করে—জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ পথ বাইরের পৃথিবীতে নয়; নিজের অন্তর্জগতের দিকে।   চিত্রগ্রহণ চলচ্চিত্রটির অন্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তি। সমুদ্র এখানে শুধু জলরাশি নয়; এটি নিয়তি, অনিশ্চয়তা এবং মানুষের অজানা ভবিষ্যতের প্রতীক। বিশাল প্রাকৃতিক দৃশ্যের সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতা এবং তার অদম্য বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা বারবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলো-অন্ধকারের বিন্যাস, দীর্ঘ নীরব দৃশ্য এবং বাস্তব লোকেশনের মহিমা চলচ্চিত্রটিকে এক মহাকাব্যিক দৃশ্যকাব্যে রূপান্তরিত করেছে।   চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘বাড়ি’ ধারণার পুনর্ব্যাখ্যা। নোলানের কাছে ইথাকা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয়; এটি স্মৃতি, সম্পর্ক, ক্ষমা এবং আত্মপরিচয়ের সম্মিলিত প্রতীক। তাই ওডিসিউসের প্রত্যাবর্তন আসলে নিজের ভেতরের মানুষটির কাছে ফিরে আসার প্রতীক।   এই চলচ্চিত্রে নারীরাও কেবল অপেক্ষমাণ চরিত্র নন; পেনেলোপ ধৈর্য, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক। তিনি নিষ্ক্রিয় নন; বরং সময়ের বিরুদ্ধে নিজের মর্যাদা ও পরিচয় রক্ষার এক নীরব সংগ্রামী। এই উপস্থাপনার মাধ্যমে নোলান মহাকাব্যটিকে সমকালীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুনভাবে পাঠ করেছেন।   সবশেষে বলা যায়, ‘ওডিসি’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি সভ্যতার স্মৃতির সঙ্গে আধুনিক মানুষের এক গভীর সংলাপ। এখানে যুদ্ধ আছে, কিন্তু যুদ্ধের চেয়েও বড় হলো ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা। এখানে সমুদ্র আছে, কিন্তু সমুদ্রের চেয়েও গভীর মানুষের মন। এখানে ইথাকা আছে, কিন্তু ইথাকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ সেই মানুষটি, যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অবশেষে নিজেকে চিনতে শেখে।   ক্রিস্টোফার নোলান আবারও প্রমাণ করেছেন যে মহান চলচ্চিত্র কেবল গল্প বলে না; তা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও জীবনদর্শনকে রূপান্তরিত করে। ‘ওডিসি’ সেই বিরল সৃষ্টি, যা প্রদর্শন শেষ হওয়ার পরও দর্শকের অন্তরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে—একটি প্রশ্নের মতো, একটি স্মৃতির মতো, অথবা বহু বছর পর নিজের ঘরে ফিরে আসার এক নিঃশব্দ অথচ গভীর অনুভূতির মতো।  

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী আগস্ট ৮, ২০২৬ 0
মায়া অ্যাঞ্জেলো, সৌজন্যে : বিবিসি রেডিও
‘খাঁচামুক্ত গায়ক কবি’ মায়া অ্যাঞ্জেলোর রচনা আত্মমর্যাদার এক দীর্ঘ মহাকাব্য

মায়া অ্যাঞ্জেলো ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী সাহিত্যিক কণ্ঠস্বর। তিনি শুধু কবি নন, ছিলেন স্মৃতিকথাকার, মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী, অভিনেত্রী, গায়িকা এবং নিপীড়িত মানুষের আত্মার ভাষ্যকার। তাঁর জীবন ছিল যন্ত্রণা, বর্ণবিদ্বেষ, নীরবতা, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও জয়ের এক দীর্ঘ মহাকাব্য।   তাঁকে ‘খাঁচামুক্ত গায়ক কবি’ বলা যথার্থ, কারণ তিনি সমাজ, বর্ণবাদ, লিঙ্গবৈষম্য ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে নিজের কণ্ঠকে মুক্ত করেছিলেন। তাঁর কবিতা শুধু শব্দ নয়, প্রতিবাদ, মুক্তি ও আত্মমর্যাদার সংগীত। ১৯২৮ সালে সেন্ট লুই মিসৌরি শহরে মার্গারিট অ্যানি জনসন নামে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তাঁকে বর্ণবিদ্বেষ এবং পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যে বড় হতে হয়। মাত্র আট বছর বয়সে যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁকে দীর্ঘদিনের নীরবতার দিকে ঠেলে দেয়।   মায়া এঞ্জেলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে, তাঁর কণ্ঠস্বরই মৃত্যু ডেকে এনেছে। কিন্তু এই নীরবতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক শক্তির উৎস হয়ে ওঠে। বইয়ের মধ্যে তিনি আশ্রয় খুঁজে পান। সাহিত্য, সংগীত, ভাষা ও ছন্দ তাঁর অন্তর্জগৎকে নতুনভাবে নির্মাণ করে।   মায়া এঞ্জেলো আত্মজীবনী, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, চিত্রনাট্যসহ এক বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার সৃষ্টি করেছেন। যদিও তাঁকে সাধারণত উপন্যাসের চেয়ে আত্মজীবনীমূলক রচনা ও কবিতার জন্য বেশি পরিচিত মনে করা হয়, তাঁর লিখনী আধুনিক আমেরিকান সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।   তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ  ‘আই নো হোয়াই দ্য কেজেড বার্ড সিঙ্জ’ । এরপর প্রকাশিত হয় ‘গেদার টুগেদার ইন মাই নেম’, ‘সিঙ্গিং অ্যান্ড সুইঙ্গিং’ ও ‘গেটিং মেরি লাইক খ্রিস্টমাস’ এবং ‘দ্য হার্ট অব আ ওম্যান’। এসব রচনায় ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর ইতিহাস ও সংগ্রাম একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।   তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতা সংকলনের মধ্যে রয়েছে ‘জাস্ট গিভ মা আ কুল ড্রিঙ্ক অব ওয়াটার’, ‘স্টিল আই রাইজ’, ‘ওয়াই ডন্ট ইউ সিঙ’ এবং ‘আই শ্যাল নট বি মুভড’ । তাঁর কবিতা ‘স্টিল আই রাইজ’ ও ‘ফিনোমেনাল ওম্যান’ আজও বিশ্বজুড়ে সাহস, মর্যাদা, নারীমুক্তি ও দমন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। যে মেয়ে দীর্ঘদিন কথা বলেননি, তিনিই পরে হয়ে উঠলেন বিশ্বের অন্যতম উচ্চকণ্ঠ কবি। এই রূপান্তরই মায়া অ্যাঞ্জেলোর জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক দিক।   ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনী ‘আই নো হোয়াই দ্য কেজেড বার্ড সিঙ্জ’ শুধু সাহিত্য নয়, মানবমুক্তির দলিল। ‘খাঁচাবন্দী পাখি’ এখানে নিপীড়িত মানুষের প্রতীক, যে স্বাধীনতার জন্য গান গায়। সেই পাখি শেষ পর্যন্ত খাঁচা ভেঙে আকাশে উড়ে যায়। মায়া অ্যাঞ্জেলো নিজেই ছিলেন সেই মুক্ত পাখি। তাঁর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ছন্দ, সংগীতধর্মিতা ও মৌখিক শক্তি। তিনি গায়িকা, নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ফলে তাঁর কবিতায় উচ্চারণের এক নাটকীয় শক্তি দেখা যায়। তাঁর কবিতা পড়ার চেয়ে শুনলে আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়। আফ্রিকান-আমেরিকান সংগীত, ব্লুজ, গসপেল এবং কৃষ্ণাঙ্গ মৌখিক ঐতিহ্যের শক্তি তাঁর কবিতায় স্পষ্ট।   তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘স্টিল আই রাইজ’ মানবমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাসের এক অমর সংগীত। শত অপমান, অত্যাচার ও অবমূল্যায়নের মধ্যেও কবি ঘোষণা করেন, “আমি আবার উঠব।” এই কবিতা শুধু ব্যক্তিগত জয়ের কথা বলে না, নিপীড়িত মানুষের সমষ্টিগত আত্মমর্যাদার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে। নারীবাদ, কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলন ও মানবমুক্তির প্রতীক হিসেবে এ কবিতা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।   আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘ফিনোমেনাল ওম্যান’ নারীর আত্মবিশ্বাস ও অন্তর্গত সৌন্দর্যের এক অনন্য উদযাপন। সমাজ যে সৌন্দর্যের কৃত্রিম মাপকাঠি তৈরি করেছে, মায়া অ্যাঞ্জেলো তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর কাছে নারী মানে শক্তি, আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিত্ব ও অন্তর্গত দীপ্তি। এই কবিতা অসংখ্য নারীর কাছে আত্মবিশ্বাসের উৎস হয়ে উঠেছে।   বিংশ শতাব্দীর  অত্যন্ত প্রভাবশালী আমেরিকান কবি মায়া অ্যাঞ্জেলো মূলত স্মৃতিকথাকার ও নাগরিক অধিকারকর্মী। তাঁর কবিতাগুলোয় মূলত সাহস, আত্মসম্মান, বর্ণবাদ, ভালোবাসা ও নারীত্বের মতো গভীর বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে। ‘স্টিল আই রাইজ’ তাঁর অন্যতম সেরা এবং জনপ্রিয় কবিতা। সমস্ত বাধা, অপমান এবং ইতিহাস-লব্ধ যন্ত্রণা পেরিয়ে একজন মানুষের মাথা উঁচু করে ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছাই হলো এ কবিতার মূল বার্তা।   ‘ফেনোমিনাল ওম্যান’ আত্মপ্রেম ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে লেখা চমৎকার একটি কবিতা। সমাজের তৈরি সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে নিজেকে না বেঁধেও যে একজন নারী অসাধারণ বা 'ফেনোমিনাল' হয়ে উঠতে পারে, তা এখানে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ‘টাচড বাই অ্যান অ্যাঞ্জেল’ ভালোবাসা এবং ভালোবাসার নিরাময় ক্ষমতা নিয়ে লেখা একটি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ কবিতা। নিঃসঙ্গতা ও ভয়ের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে ভালোবাসাকে গ্রহণ করার সাহস নিয়ে এটি আলোচনা করে। ‘কেইজড বার্ড’ একটি বন্দী পাখি এবং একটি স্বাধীন পাখির জীবনের বৈপরীত্য তুলে ধরে রচিত। এর মাধ্যমে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের বঞ্চনা ও স্বাধীনতার আকুতি রূপক অর্থে বুঝিয়েছেন। হিউম্যান ফ্যামিলি কবিতায় কবি মানবজাতির বৈচিত্র্য এবং তাদের মধ্যকার গভীর মিলগুলোকে তুলে ধরেছেন।   মায়া অ্যাঞ্জেলোর আত্মজীবনীমূলক রচনাগুলো আমেরিকান সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তাঁর আগে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের জীবন এত খোলামেলা ও সাহসিকতার সঙ্গে সাহিত্যে খুব কমই উঠে এসেছিল। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে ইতিহাসের দলিলে পরিণত করেছেন। তাঁর লেখায় বর্ণবিদ্বেষ, দারিদ্র্য, অপমান, প্রেম, মাতৃত্ব, সংগ্রাম ও আত্মমুক্তির এক গভীর মানবিক চিত্র ফুটে ওঠে। মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ম্যালকম একসের মতো কিংবদন্তি নেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে আরও তীক্ষ্ণ ও মানবিক করে তুলেছে। তিনি সাহিত্যকে কখনো নিছক সৌন্দর্যের চর্চা হিসেবে দেখেননি; বরং তা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অস্ত্র।মায়া অ্যাঞ্জেলো কিছু সময় আফ্রিকাতেও কাটিয়েছিলেন, বিশেষত ঘানাতে। আফ্রিকার অভিজ্ঞতা তাঁর কৃষ্ণাঙ্গ পরিচয় এবং বিশ্বদৃষ্টিকে আরও গভীর করে। তিনি বুঝতে পারেন যে বর্ণবাদ শুধু আমেরিকার সমস্যা নয়, এটি ইতিহাস ও উপনিবেশবাদের দীর্ঘ ছায়া।   তাঁর লেখার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো দুর্বলতার মধ্যেও শক্তির প্রকাশ। তিনি নিজের ক্ষত লুকাননি। বরং সেই যন্ত্রণাকেই সাহস ও শিল্পে রূপান্তর করেছেন। এই সততা পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় অত্যাচার মানুষকে ভাঙতে পারে, কিন্তু আত্মাকে পরাজিত করতে পারে না। ১৯৯৩ সালে  বিল ক্লিন্টনের প্রেসিডেন্ট অভিষেকে তিনি ‘অন দ্য পালস অব মর্নিং’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। সেই মুহূর্তে তিনি শুধু কবি নন, আমেরিকার নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর কণ্ঠে ছিল ইতিহাসের গভীরতা এবং ভবিষ্যতের আশা।   মায়া অ্যাঞ্জেলোর ভাষা সহজ অথচ গভীর। তিনি জটিলতার আড়ালে নিজেকে লুকাননি। তাঁর কবিতার শক্তি এসেছে স্পষ্টতা, সংগীতধর্মিতা ও আবেগের সত্যতা থেকে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য মানুষের সঙ্গে কথা বলবে, তাকে দূরে ঠেলে দেবে না। আজও তাঁর প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। নারী আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন, কৃষ্ণাঙ্গ সাহিত্য ও আত্মজীবনীমূলক সাহিত্যে তাঁর অবদান অনন্য। অসংখ্য লেখক, বিশেষত নারী ও প্রান্তিক মানুষেরা তাঁর কাছ থেকে সাহস পেয়েছেন নিজের কণ্ঠ খুঁজে নিতে।   ২০১৪ সালে কবির মৃত্যু হলেও তাঁর কণ্ঠ আজও জীবন্ত। তাঁর কবিতা নিপীড়িত মানুষকে সাহস দেয়, ভাঙা মনকে আশার আলো দেখায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, শব্দ মানুষের আত্মাকে মুক্ত করতে পারে। মায়া অ্যাঞ্জেলো সত্যিই ছিলেন এক ‘খাঁচামুক্ত গায়ক কবি’। কোনো অত্যাচার, বর্ণবাদ, দারিদ্র্য বা নীরবতা তাঁকে বন্দী করে রাখতে পারেনি। তিনি বারবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, নিজের কণ্ঠকে মুক্ত করেছেন এবং সেই কণ্ঠকে সমগ্র মানবতার কণ্ঠে পরিণত করেছেন। তাঁর কবিতা আজও উড়ে বেড়ায় মুক্ত পাখির মতো—স্বাধীনতার, মর্যাদার এবং অদম্য মানবআত্মার প্রতীক হয়ে।  

ড. রতন ভট্টাচার্য ড. রতন ভট্টাচার্য আগস্ট ৬, ২০২৬ 0
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বর্ষার প্রভাব

বাংলাদেশে বর্ষা এলে প্রত্যেক মানুষের জীবনধারা বদলে যায়। গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে মুক্তি আর প্রকৃতির সজীবতা নতুনরূপে সবার প্রাণে সঞ্চার করে বিপুল আনন্দানুভূতি। প্রকৃতির এই ভিন্নরূপের প্রভাব যাপিত জীবনে যেমন পড়ে, তেমনি শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও পড়ে। কবি কালিদাস বর্ষার মেঘকে দূত করে তাঁর মানসপ্রিয়ার কাছে পাঠাতে চেয়েছেন। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি তাঁর কাব্যের নাম দিয়েছিলেন ‘মেঘদূত’।   বর্ষায় মেঘের ছুটাছুটি আর নান্দনিক বৃষ্টিধারা শুধু কবি-সাহিত্যিক ও শিল্পীমনেই প্রভাব ফেলে না, সাধারণ মানুষের মনকেও করে তোলে চঞ্চল। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ থেকে শুরু করে বর্তমানের নবীন কবির কবিতা খুঁজলেও বর্ষার দু-একটি পঙক্তি খুঁজে পাওয়া যাবেই। বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋতু পর্যায়ের অনেক গান ও কবিতা লিখেছেন। এই ঋতু পর্যায়ের গানগুলোর মধ্যে বর্ষার গানই প্রাধান্য পেয়েছে।   বর্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সংখ্যাও কম নয়। ‘নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে, ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে’ কিংবা ‘বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝর, আউশের ক্ষেত জলে ভর ভর’ এ রকম অসংখ্য কবিতায় কবিগুরু বর্ষার রূপ ও বাঙালির যাপিত জীবনে বর্ষার প্রভাব তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। বর্ষা এলেই আমরা সবাই রবীন্দ্রনাথের সেই ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটি না গেয়ে থাকতে পারি না এবং এ গানের মাধ্যমেই আমরা কদম ফুলের শুভেচ্ছা জানিয়ে বর্ষাকে অভিনন্দিত করি। বর্ষার বৃষ্টিধারার রূপে মুগ্ধ প্রেমিক মনের আকুতি হয় এ রকম - এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন কাছে যাব কবে পাব ওগো তোমার নিমন্ত্রণ।   বাংলা কবিতায় বর্ষাবন্দনার শেষ নেই। প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বর্ষা ও বৃষ্টি বাংলা কবিতার প্রধান উপাদান হয়ে আছে। ফলে সব কবিই বর্ষাকে নিয়ে দু-একটি কবিতা রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বৃষ্টির দিনে’ কবিতায় বলেছেন - এমন দিনে তারে বলা যায় এমন ঘনঘোর বরিষায় এমন মেঘস্বরে বাদল ঝরঝরে তপনহীন ঘন তমসায়।   বৃষ্টির অপরূপ দৃশ্য ও মায়াবি রূপ আমাদের মোহিত করে, আন্দোলিত করে, শিহরিত করে। আষাঢ়-শ্রাবণে বাঙালির জীবনে থাকে অনন্ত অবসর। এ সময় ভাটিয়ালি, মুর্শিদিসহ নানা লোকগানের আসর জমে গ্রামে-গঞ্জে। বাংলার শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বর্ষার প্রভাব তাই সুদূরপ্রসারী। আমরা যদি ঋতুভিত্তিক গান ও কবিতার একটি তালিকা করি, তাহলে দেখা যাবে সেখানে বর্ষার গান ও কবিতার সংখ্যাই বেশি। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ও জসীমউদ্দীন তাঁদের রচনায় বর্ষাকে মহিমান্বিত করেছেন।   তিরিশের কবিরাও প্রভাবিত হয়েছেন বর্ষার রূপবৈচিত্র্যে। বর্তমানের কবিরাও বর্ষাকে কবিতার বাইরে রাখতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ জমিদারি সূত্রে বাংলাদেশের শিলাইদহ, পতিসর, শাহজাদপুরে আসতেন নদীপথেই। দুকূল প্লাবিত নদীপথে বর্ষার রূপবৈচিত্র্য কবিকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, বর্ষাই তাঁর প্রিয় ঋতু হয়ে উঠেছিল। ফলে আমরা দেখতে পাই তাঁর ‘গীত বিতান’ গানের সংকলনে শুধু বর্ষা নিয়েই গানের সংখ্যা ১২০টি।   বর্ষায় নদীগুলো কানায় কানায় ভরে যায়। রূপ বদলায় প্রকৃতি। কাজের ব্যস্ততা কমে যায়। কবিমনে রোমান্টিকতার জন্ম হয়। লেখা হয় প্রেম, বিরহ আর প্রিয়মিলনের কবিতা। একদিকে গরমের দাপট কমে যায়, অন্যদিকে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি নতুনভাবে সজীব হয়ে ওঠে। জুঁই, কামিনী, দোলনচাঁপা, রজনীগন্ধা, বেলি, কদম-কেয়াসহ আরও অনেক ফুলের সমারোহে ভরে যায় প্রকৃতি। পুকুরে, খালে-বিলে ফোটে রঙিন পদ্মফুল। মাছেরা নতুন পানি পেয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। এই মোহনীয় দৃশ্য কবিমনকে ভাবুক ও ঋদ্ধ করে তোলে। স্বাভাবিক যাপিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। তাই তো রবীন্দ্রনাথ বলেন - আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে জানি নে জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।   বর্ষা নিয়ে কবি জসীমউদ্দীনের ভাবনার শিল্পরূপ পেয়েছে তাঁর ‘পল্লী বর্ষা’ কবিতায়। বর্ষা পল্লীর জনজীবন ও প্রকৃতিকে কীভাবে প্রভাবিত করে এবং বর্ষা এলে গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনধারা কীভাবে বদলে যায়, সে বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর এ কবিতায় - গাঁয়ের চাষীরা মিলিয়াছে আসি মোড়লের দলিজায় গল্প গানে কী জাগাইতে চাহে আজিকার দিনটায় কেউ বসে বসে বাখারী চাঁচিছে, কেউ পাকাইছে রশি কেউবা নতুন দোয়াড়ীর গায়ে চাকা বাঁধে কষি কষি। মাঝখানে বসে গাঁয়ের বৃদ্ধ করুণ ভাটির সুরে আমির সাধুর কাহিনী কহিছে সারাটি দলিজা জুড়ে বাহিরে নাচিছে ঝর ঝর জল, গুরু গুরু মেঘ ডাকে এসবের মাঝে রূপকথা যেন আর এক রূপে আঁকে।   জসীমউদ্দীনের এ কবিতায় আমরা বর্ষায় গ্রামীণ জনজীবনের পরিবর্তন লক্ষ করি। মূলত হেমন্তের মুগ্ধতায় আন্দোলিত কবি জীবনানন্দ দাশও তাঁর কবিতায় বর্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। বাংলা ভাষার আধুনিক ও শুদ্ধতম এ কবি নিসর্গ ও নির্জনতাকে ভালোবেসেছেন। বর্ষার প্রতিও তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে ‘এ জল ভালো লাগে’ কবিতায়। এ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ বর্ষাকে তুলে ধরেছেন আরেক ভিন্নরূপে। তাঁর কাব্য ভাষায় - এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রুপালি জল কত দিন এসে ধুয়েছে আমার দেহ বুলায়ে দিয়েছে চুল চোখের উপরে তার শান্ত স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে আবেগের ভরে ঠোঁটে এসে চুমো দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে; এই জল ভালো লাগে; নীলপাতা মৃদু ঘাস রৌদ্রের দেশে ফিঙ্গা যেমন তার দিনগুলো ভালোবেসে- বনের ভেতর বার বার উড়ে যায়, তেমনি গোপন প্রেমে এই জল ঝরে আমার দেহের পরে আমার চোখের পরে ধানের আবেশে...’   জীবনানন্দ সব সময়ে প্রকৃতি ও জীবনকে একই সমান্তরালে নিয়ে আসেন। তাঁর এ কবিতায়ও বর্ষা ও ব্যক্তিজীবন একাকার হয়ে আছে।   বর্ষা নিয়ে কবি মহাদেব সাহার কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে দারুণ রোমান্টিকতা। তাঁর কাব্য ভাষায় -   আমার কিন্তু বৃষ্টি খুব ভালো লাগে, বৃষ্টি আমার শৈশবের মতো মেয়েরা ভিজতে চায় বৃষ্টিতে, ভিজুক না মেয়েরা জলে না নামলে পদ্মফুল ফুটবে কেন!   এই হলো বর্ষার দার্শনিক রূপ। বর্ষা শুধু বৃষ্টি নয়; বর্ষা মানে ঘন-কালো মেঘের ছুটাছুটি, বর্ষা মানে দুকূল প্লাবিত নদী, নালা, খাল-বিল; বর্ষা মানে উত্তাল ঢেউ আর যৌবন-জোয়ারের পূর্ণতা। তাই বর্ষার কবিতায় আমরা দিগন্ত প্লাবিত আকুল আবেগের সন্ধান পাই।   শুধু কবিতায় নয়; আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় শিল্পমাধ্যম ছোটগল্পেও আমরা বর্ষার রূপবৈচিত্র্য ও প্রভাব দেখতে পাই। কবিতার পরিমিতিবোধে যে সীমাবদ্ধতা থাকে, সেটি ছাপিয়ে গল্পের আঙ্গিকে বর্ষা আরও বেশি সম্প্রসারিত ভাবের ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে। বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য গল্পে প্লাবিত বন্যা, বর্ষার জল, ঝড় ও ভারী বর্ষণের চিত্র দেখা যায়।   সমকালীন বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পে মৌসুমের প্রথম বৃষ্টির একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। “এই মনোরম মনোটোনাস শহরে অনেক দিন পর আজ সুন্দর বৃষ্টি হলো। রাত এগারোটা পার হয় হয়, এখনো রাস্তার রিকশা চলছে ছল ছল করে যেনো গোটিয়ার বিলে কেউ নৌকা বাইছে।... আমার জানলায় রোদন-রূপসী বৃষ্টির মাতাল মিউজিক, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি, বিষাদবর্ণ দেয়াল; অনেক দিন পর আজ আমার ভারি ভালো লাগছে।”   বর্ষার কোনো একটি মুহূর্ত কীভাবে মনকে মোহিত করে, সেই অনুভূতি খুঁজে পাওয়া যায় নাসির উদ্দীন বাকীর ‘বৃষ্টির গল্প’ নামক গল্পে। গল্পের বর্ণনায়, “শ্রাবণের রাত। সেই বিকেল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। জানালার গ্লাসে জমেছে ফোঁটায় ফোঁটায় জল। আবার গল্পের বইয়ে মনোযোগ দেই। রাত বাড়ে। ঘোর বর্ষার রাত।”   বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় উঠান উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণে, দৃশ্যকল্প তৈরিতে, কথোপকথনে বর্ষার প্রসঙ্গ বারবার আসতে দেখা যায়। মানিক বধ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’, হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’সহ অনেক উপন্যাসেই বর্ষার অনুপম দৃশ্যের বর্ণনা আছে। সৃজনশীল কাব্য-গান ও গল্প-উপন্যাসের মতো মননশীল প্রবন্ধেও খুঁজে পাওয়া যায় বর্ষার নান্দনিক বর্ণনা।   প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘বর্ষা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যে, যেদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় সমগ্র আকাশ বর্ষায় ভরে গিয়েছে। মাথার উপর থেকে অবিরাম অবিরল অবিচ্ছিন্ন বৃষ্টির ধারা পড়ছে। সে ধারা এতো সূক্ষ্ম নয় যে চোখ এড়িয়ে যায়, অথচ এতো স্থল নয় যে তা চোখ জুড়ে থাকে। আর কানে আসছে তার একটানা আওয়াজ; সে আওয়াজ কখনো মনে হয় নদীর কূলুধ্বনি, কখনো মনে হয় তা পাতার মর্মর।” এভাবেই বর্ষা প্রভাবিত করে চলে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগৎকে।   বর্ষা এমনই এক ঋতু; যার বৈচিত্র্যময় রূপের বর্ণনা পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেও শেষ করা যাবে না। বর্ষা প্রকৃতির দশ দিককেই মোহিত করে। তবে বর্ষার কিছু বিষাদময় রূপও আছে। একটানা বর্ষণে অনেক সময় নদীভাঙন, ভূমিধস হয়। কৃষকের স্বপ্নের শস্য ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। নিম্ন আয়ের দিনমজুরেরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। তাই যারা দিন এনে দিন খায়, বর্ষা তাদের জন্য দারুণ দুশ্চিন্তার কারণ হয়। ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হলে নগরবাসীর দুর্ভোগ বেড়ে যায়। বর্ষার এই নেতিবাচকতা উপেক্ষা করেই বাংলা সাহিত্যে বর্ষার রূপমাধুরী বর্ণিত হয়েছে নানাভাবে। বর্ষার কবিতা ও গান যুগ যুগ ধরে পাঠক-শ্রোতাদের মননে ও হৃদয়ে আনন্দ-বেদনা, ভাব ও ভাবনার জন্ম দিয়েছে। তাই যাপিত জীবনে বর্ষার আবেদন চিরন্তন। 

ড. আলী রেজা ড. আলী রেজা আগস্ট ৪, ২০২৬ 0
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম ও শেষ রেল ভ্রমণ

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রমণপ্রিয় ছিলেন। তাঁর বহু চিঠিতে ভ্রমণের কথা ঠিকানাসহ পাওয়া যায়। তাঁর ভ্রমণের বাহন হিসেবে নানা জায়গায় রেল ভ্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। রেলযাত্রা তাঁর জীবনে কখনো বিস্ময়ের সঙ্গে জড়িয়ে, আবার কখনো-বা কৌতূহলের পথ ধরে, কখনো দুঃখের সঙ্গী হয়ে এসেছে ।   কবিগুরু প্রথম রেলে ভ্রমণ করেছিলেন ১৮৭৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি হাওড়া থেকে বোলপুর। কবির শেষ রেল ভ্রমণ ছিল ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই, তাঁর মৃত্যুর ১৪ দিন আগে একই পথে। কবিগুরু প্রথম রেলে ভ্রমণ করেন মাত্র ১১ বছর ৯ মাস বয়সে । সে সময় রেলে হাফ টিকেটের নিয়ম ছিল। যাত্রীর বয়স ১২ বছরের কম হলে তার জন্য হাফ টিকেট কাটার নিয়ম। কবিগুরুর বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই প্রথম শ্রেণির দুটি টিকেট কেটেছিলেন। নিজের জন্য একটি ফুল এবং রবির জন্য একটি হাফ টিকেট। এই হাফ টিকেট নিয়েই যাত্রাপথে ঘটেছিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।   ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা উল্লেখ আছে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ বইয়ে ‘হিমালয় যাত্রা’ অংশে । বয়সের তুলনায় রবীন্দ্রনাথের বৃদ্ধি কিছুটা বেশি তখন। ফলে হাফ টিকেট একবার পরীক্ষা করার পরও আবার আসেন পরীক্ষক। কিন্তু চলে যান কিছু না বলেই। পরবর্তী সময়ে স্বয়ং স্টেশন মাস্টার এসে জানান পুরো টিকেটের দাম দিতে হবে। রেগে গিয়ে সেই দাম মিটিয়ে আর বাকি পয়সা ফেরত নেননি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা। বরং স্টেশন মাস্টার বাকি টাকা ফেরত দিলে তা নিয়ে জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলে দেন। টাকা বাঁচাতে তিনি যে মিথ্যে বলেননি, তা বোঝাতেই এমনটা করেন।   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনস্মৃতি’ বইয়ের ‘হিমালয় যাত্র ‘ থেকে উদ্ধৃত, "পথের মধ্যে একটা ঘটনা ঘটিয়াছিল যেটা এখনো আমার মনে স্পষ্ট আঁকা রহিয়াছে। কোনো-একটা বড়ো স্টেশনে গাড়ি থামিয়াছে। টিকিট পরীক্ষক আসিয়া আমাদের টিকিট দেখিল । একবার আমার মুখের দিকে চাহিল । কী একটা সন্দেহ করিল কিন্তু বলিতে সাহস করিল না। কিছুক্ষণ পরে আর-একজন আসিল; উভয়ে আমাদের গাড়ির দরজার কাছে উসখুস করিয়া আবার চলিয়া গেল। তৃতীয়বারে বোধ হয় স্বয়ং স্টেশন মাস্টার আসিয়া উপস্থিত। আমার হাফ টিকিট পরীক্ষা করিয়া পিতাকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘এই ছেলেটির বয়স কি বারো বছরের অধিক নহে?’ পিতা কহিলেন, ‘না।’ তখন আমার বয়স এগারো। বয়সের চেয়ে নিশ্চয়ই আমার বৃদ্ধি কিছু বেশি হইয়াছিল। স্টেশন মাস্টার কহিল, ‘ইহার জন্য পুরা ভাড়া দিতে হইবে।’ আমার পিতার দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিল। তিনি বাক্স হইতে তখনই নোট বাহির করিয়া দিলেন। ভাড়ার টাকা বাদ দিয়া অবশিষ্ট টাকা যখন তাহারা ফিরাইয়া দিতে আসিল, তিনি সে-টাকা লইয়া ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিলেন, তাহা প্ল্যাটফর্মের পাথরের মেঝের উপর ছড়াইয়া পড়িয়া ঝনঝন করিয়া বাজিয়া উঠিল। স্টেশন মাস্টার অত্যন্ত  সংকুচিত হইয়া চলিয়া গেল; টাকা বাঁচাইবার জন্য পিতা যে মিথ্যা কথা বলিবেন, এ সন্দেহের ক্ষুদ্রতা তাহার মাথা হেঁট করিয়া দিল।"   জানা যায়, প্রথম যাত্রায় বেশ ভয়ের মধ্যে ছিলেন কবিগুরু । তাঁর ভয় পাওয়ার কারণ ভাগনে সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়ের বলে দেয়া কিছু কথা। সে আগে রেলগাড়িতে চড়েছে। তাঁর কথায়, “বিশেষ দক্ষতা না থাকিলে রেলগাড়িতে চড়া এক ভয়ঙ্কর সংকট। পা ফসকাইয়া গেলেই আর রক্ষা নাই। তারপর, গাড়ি যখন চলিতে আরম্ভ করে, তখন শরীরের সমস্ত শক্তিকে আশ্রয় করিয়া খুব জোর করিয়া বসা চাই, নহিলে এমন ভয়ঙ্কর ধাক্কা দেয় যে মানুষ কে-কোথায় ছিটকাইয়া পড়ে তাহার ঠিকানা পাওয়া যায় না।” তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি কবির প্রথম রেলে ভ্রমণে ।  সেই মুহূর্তে রেল যাত্রার কথা  ‘জীবনস্মৃতি’ বইয়ে  কবি বর্ণনা করেছেন এভাবে, "বিপদের একটুও আভাস না পাইয়া মনটা বিমর্ষ হইয়া গেল। গাড়ি ছুটিয়া চলিল; তরুশ্রেণির সবুজ-নীল পাড়-দেওয়া বিস্তীর্ণ মাঠ এবং ছায়াচ্ছন্ন গ্রামগুলি রেলগাড়ির দুই ধারে দুই ছবির ঝরনার মতো বেগে ছুটিতে লাগিল, যেন মরীচিকার বন্যা বহিয়া চলিয়াছে। সন্ধ্যার সময় বোলপুরে পৌঁছিলাম।"   বেশ দ্রুতবেগেই রেলগাড়ি রবিকে পৌঁছে দেয় বোলপুর। যেখানে ভবিষ্যতে শুরু হবে রবীন্দ্রনাথের এক বিশাল কর্মকাণ্ড। প্রথম রেল যাত্রায় সত্যপ্রসাদের কথামতো তেমন কিছু ঘটেনি বলে একটু মন খারাপও হয়েছিল রবির। রবীন্দ্রনাথের ঘর থেকে বাইরের পথে যাত্রার শুরু এভাবেই।‌ ঘরের চৌহদ্দি পৃথিবীর রূপ, রস ও গন্ধের সামনে এসে দাঁড়ানো — এই শুরুর  সঙ্গেও জুড়ে ছিল রেল যাত্রা।    এর পরের আরেকটি রেল যাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায় বিবাহিত বয়সে। ততদিনে ব্রিটেন থেকে ফিরেছেন পড়াশোনা শেষ না করেই। বিয়ে হলো মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে। এরপর সন্তান হওয়ার পর তাঁদের সপরিবার দার্জিলিং যাত্রা‌। সেবার আর বালক রবি নন তিনি। রবীন্দ্রনাথের সেই যাত্রায় বেশ ভালোই ধকল গিয়েছিল। কারণ, জমিদার পুত্রকে মালপত্র বের করা, ঠিক জায়গায় রাখা সমেত অনেক কিছুই করতে হয়েছে।   ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থে সে কথাই লিখছেন রবীন্দ্রনাথ। ইন্দিরা দেবীকে লেখা চিঠিতে বলছেন, “মেয়েদের এবং অন্যান্য জিনিসপত্র লেডিস কম্পার্টমেন্টে তোলা গেল” — কথাটা শুনতে যতটা সংক্ষেপ হলো, কাজে ঠিক তেমনটা হয়নি। ডাকাডাকি, হাঁকাহাঁকি, ছোটাছুটি নিতান্ত অল্প হয়নি। তবু বলেন, “আমি কিছুই করিনি অর্থাৎ একখান আস্ত মানুষ একেবারে আস্ত এরকম ক্ষেপে যেরকমটা হয় সেই প্রকার মূর্তি ধারণ করলে ঠিক পুরুষমানুষের উপযুক্ত হতো। কিন্তু এই দুদিনে আমি এত বাক্স খুলেছি এবং বন্ধ করেছি এবং বেঞ্চির নিচে ঠেলে গুঁজেছি এবং উক্ত স্থান থেকে টেনে বার করেছি, এত বাক্স এবং পুঁটুলির পিছনে আমি ফিরেছি এবং এত বাক্স এবং পুঁটুলিরা আমার পিছনে অভিশাপের মতো ফিরেছে, এত হারিয়েছে এবং এত ফের পাওয়া গেছে এবং এত পাওয়া যায়নি এবং পাবার জন্য এত চেষ্টা করা গেছে এবং যাচ্ছে যে কোন ছাব্বিশ বছর বয়সের ভদ্র সন্তানের অদৃষ্টে এমনটা ঘটেনি।”   সেবারের রেলযাত্রায় এত ধকল গিয়েছিল কবির যে, রীতিমতো তাঁর নাকি ‘বাক্সফোবিয়া’ হয়ে গিয়েছিল। বাক্স দেখলেই দাঁতে দাঁত লেগে যেত তাঁর। রেলযাত্রার এই দফার কথা বলার বিশেষ কারণ রয়েছে। তাঁর বহু বহু লেখার ভিড়ে এমন সংসারী রবীন্দ্রনাথের‌ দেখা পাওয়া বিরল। আর পাঁচজন বাঙালির মতোই নিজের স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে ঘুরতে চলেছেন তিনি। শুধু ঘুরতে চলেছেন বললেও ভুল হয়, পথেঘাটে ঠিক যে যে দায়িত্ব সামলাতে হয়, আর পাঁচটি পরিবারের পুরুষ বর্গকে, তাও সামলেছেন দক্ষভাবে।   চিঠির শেষে মুটের সঙ্গে মাল বওয়া নিয়ে দর-কষাকষির কথাও লিখেছেন। কৌতুহল, বিস্ময় ও আনন্দের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের রেলযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কিছু দুঃখের স্মৃতিও । ১৯০৭ সালের নভেম্বর মাস। মুঙ্গের থেকে খবর এল, কলেরায় আক্রান্ত হয়েছে শমীন্দ্রনাথ। শারীরিক দুর্বলতা থেকে সেরে ওঠার জন্য তাঁকে মুঙ্গের পাঠান কবি। রবীন্দ্রনাথের এই ছেলেটি ছোট  থেকে অনেকটা কবির প্রতিরূপ হয়ে উঠছিল। তাই কবিও একটু আলাদা চোখে দেখতেন ছেলেটিকে।   শমীর কলেরার খবর পেতেই রেলগাড়ি করে মুঙ্গের পথে ছুটেছিলেন  কবি। সঙ্গে কলকাতার অভিজ্ঞ চিকিৎসক। রেলগাড়ির সেই যাত্রা ছিল এক উদ্বিগ্ন পিতার। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে অন্য জগতে পাড়ি দেন শমীর। একের পর এক মৃত্যু রীতিমতো শোকগ্ৰস্ত করে তুলেছিল কবিকে। শমীর মৃত্যুতে স্তব্ধ হলেন কবি। পরে শমীর মৃত্যুর পর ছোট মেয়ে মীরাকে তিনি লেখেন, “শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি - সমস্তর মধ্যেই সব রয়ে গেছে, আমিও তারই মধ্যে....।”   যে দুঃখ তাঁকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, তাকেও ভেদ করে বেরিয়ে আসছেন এক অন্য রবীন্দ্রনাথ। এই উপলব্ধির মধ্যে দিয়ে সন্তানহারা পিতার এক যেন নতুন জন্ম হচ্ছে।  ১৯৪১-এর ২৫ জুলাই অসুস্থ কবিকে অস্ত্রোপচারের জন্য কলকাতায় নিয়ে আসা হবে স্থির হয়েছে। তখনকার ইআই রেলওয়ের অধিকর্তা এন সি ঘোষ কবির জন্য বিশেষ একটি সেলুন কারের ব্যব্যস্থা করে দিয়েছিলেন। এই সেলুন কারটিতে ছিল চারটে ঘর — একটি শোয়ার ঘর, একটি ড্রয়িংরুম, একটি খাবার ঘর এবং একটি কিচেন। এ ছাড়া দুটো স্নানের ও ভৃত্যদের ঘর।   সেলুন কারের প্রতিটি ঘরে দুটো করে ফ্যান লাগানো। সেলুন কারটিকে আগের দিনই বোলপুর স্টেশনে নিয়ে আসা হয়েছিল। সকালে ট্রেন ছাড়ল, ট্রেনের কামরায় ছিলেন কন্যা মীরা দেবী, নাতনি নন্দিতা ও নির্মলকুমারী। প্রায় সত্তর বছরের শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যে যোগ, সেই স্থান ত্যাগের মুহূর্তে কবির মনে নিশ্চয়ই অফুরন্ত স্মৃতি এসে জড়ো হয়েছিল।   বোলপুর থেকে হাওড়ায় আসতে পৌনে সাত ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল। ২টা  ৪০ মিনিটে ট্রেন হাওড়ায় পৌঁছল। সেলুন কার থেকে স্ট্রেচারে করে কবিকে নামানো হলো।  যে পথে বাবার সঙ্গে কবির প্রথম রেলল ভ্রমণ শুরু, সেই পথেই তাঁর অন্তিম রেল যাত্রা। হাওড়া স্টেশন থেকে মোটরগাড়িতে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল কবিকে। এই জোড়াসাঁকো থেকে কবি আর কোনো দিনই সজ্ঞানে বেরোলেন না। রাখী পূর্ণিমার শেষে ৭ আগস্ট, ১৯৪১ (২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ সাল) দুপুর ১২টা দশে কবির পরলোকে যাত্রা।   বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ভারতীয় রেলের সম্পর্ক বহুদিনের। আর এ সম্পর্ককে বারবার শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে পূর্ব রেল। আজও তারা কবির শেষযাত্রার মর্মবেদনাকে ভুলতে পারেনি। ভুলতে পারেনি তাদেরই ব্যবস্থাপনায় কবির ব্যবহারধন্য সেই সেলুনটির কথা, যেটি চেপে কবি সেদিন চিকিৎসা করাতে কলকাতা গিয়েছিলেন, কিন্তু আর ফেরা হয়নি তাঁর! কবির শেষ যাত্রার স্মৃতিধন্য সেই রেলকামরাটি যথাযোগ্য সম্মানে ও মর্যাদায় আজও রাখা রয়েছে বোলপুর স্টেশনসংলগ্ন 'চিরন্তনী' রেল সংগ্রহশালায়। সেদিন কবি ব্যবহার করেছিলেন 'ইআইআর ২৩৭৭' কামরাটি। রেলের চিফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিবারণ চন্দ্র ঘোষ সেদিন এই সেলুনে কবির সঙ্গেই ছিলেন।    

এস ডি সুব্রত এস ডি সুব্রত আগস্ট ৪, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
অক্ষয় মালবেরি : স্মৃতি, প্রকৃতি ও অস্তিত্বের অন্তহীন উপাখ্যান

বাংলা সাহিত্যে এমন কিছু গ্রন্থ রয়েছে, যেগুলো কোনো নির্দিষ্ট সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেগুলো একই সঙ্গে আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, উপন্যাস, দর্শন, প্রকৃতিবিষয়ক রচনা এবং কাব্যিক গদ্যের সম্মিলিত রূপ হয়ে ওঠে। মণীন্দ্র গুপ্তের ‘অক্ষয় মালবেরি’ সেই বিরল গ্রন্থগুলোর অন্যতম। এটি কেবল একজন লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের বিবরণ নয়; বরং স্মৃতির ভেতর দিয়ে সময়, প্রকৃতি, মানুষ ও অস্তিত্বকে নতুনভাবে আবিষ্কারের এক অনন্য সাহিত্যিক যাত্রা।   এ বই পড়তে পড়তে মনে হয়, লেখক কোনো কাহিনি বলছেন না; তিনি যেন তাঁর চেতনার গভীরে জমে থাকা আলো-ছায়া, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ ও অনুভূতিগুলোকে ভাষায় রূপ দিচ্ছেন। ফলে ‘অক্ষয় মালবেরি’ পড়া মানে কেবল একটি বই পড়া নয়, বরং একটি স্মৃতিলোকের মধ্যে প্রবেশ করা।   প্রচলিত আত্মজীবনী সাধারণত ঘটনাক্রম অনুসরণ করে। জন্ম, পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন, সাফল্য—এই ধারাবাহিকতাই সেখানে মুখ্য। কিন্তু মণীন্দ্র গুপ্ত এই রীতিকে ভেঙে দিয়েছেন। তাঁর কাছে জীবনের সত্য কোনো কালানুক্রমিক তথ্য নয়; জীবনের সত্য লুকিয়ে থাকে সেই সব মুহূর্তে, যেগুলো অকারণে আমাদের মনে থেকে যায়। একটি গাছের ছায়া, বর্ষার গন্ধ, নদীর জলে ভাসা আলো, কোনো বৃদ্ধার মুখ, কোনো পাখির ডাক—এসবই মানুষের আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। তাই বইটির বয়ানও স্মৃতির স্বাভাবিক প্রবাহে এগোয়; যেন মানুষের মন যেমন মনে রাখে, বইটিও তেমনই গড়ে উঠেছে।   এ গ্রন্থের কেন্দ্রে রয়েছে শৈশব, কিন্তু এটি নস্টালজিয়ার শৈশব নয়। এটি সেই শৈশব, যেখানে পৃথিবীকে প্রথমবারের মতো বিস্ময়ে দেখা হয়। শিশুমনের কাছে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি নদী, প্রতিটি প্রাণী যেন এক-একটি রহস্য। লেখক সেই বিস্ময়কে হারাতে দেননি। বহু বছর পর প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় দাঁড়িয়েও তিনি সেই শিশুর চোখ দিয়েই পৃথিবীকে দেখেন। এ কারণেই ‘অক্ষয় মালবেরি’র শৈশব কখনো অতীত হয়ে যায় না; তা বর্তমানের মধ্যেই বেঁচে থাকে।   গ্রন্থটির নাম নিজেই একটি শক্তিশালী প্রতীক। মালবেরি বা তুতগাছ এখানে শুধু একটি গাছ নয়; এটি স্মৃতির বৃক্ষ। ‘অক্ষয়’ শব্দটি সেই স্মৃতির অবিনশ্বরতার প্রতীক। মানুষ সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, ঘরবাড়ি বদলে যায়, দেশ বদলে যায়, সম্পর্ক ভেঙে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। সেই অমোচনীয় স্মৃতিরই নাম ‘অক্ষয় মালবেরি’।   মণীন্দ্র গুপ্ত প্রকৃতিকে কখনো নিছক পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেন না। প্রকৃতি তাঁর কাছে এক জীবন্ত সত্তা। নদী, বন, কুয়াশা, বৃষ্টি, ঘাস, পাখি, পোকামাকড়—সবাই যেন মানুষের মতোই কথা বলে। লেখক প্রকৃতিকে দেখেন না; তিনি প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করেন। তাঁর গদ্যে প্রকৃতির এমন সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ রয়েছে যে পাঠকের মনে হয়, প্রতিটি দৃশ্য যেন চোখের সামনে ফুটে উঠছে। প্রকৃতি এখানে মানুষের বাইরের জগৎ নয়; মানুষের অন্তর্জগতেরই সম্প্রসারণ।   এ কারণেই অনেক সমালোচক মণীন্দ্র গুপ্তের প্রকৃতিচেতনাকে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু এই মিলের মধ্যেও একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিভূতিভূষণের প্রকৃতি মহাজাগতিক বিস্ময়ের দিকে নিয়ে যায়; মণীন্দ্র গুপ্তের প্রকৃতি মানুষের স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের দিকে ফিরে আসে। তাঁর প্রকৃতি বহির্বিশ্বের নয়, অন্তর্জগতের।   বইটির অন্যতম শক্তি তার মানুষ-দেখার ক্ষমতা। লেখক যাঁদের সঙ্গে দেখা করেছেন—গ্রামের সাধারণ মানুষ, আত্মীয়স্বজন, কৃষক, নৌকার মাঝি, পথিক, সৈনিক, প্রান্তিক মানুষ—তাঁদের প্রত্যেককে গভীর সহানুভূতির সঙ্গে দেখেছেন। তিনি কাউকে বিচার করেন না। তিনি মানুষের ভেতরের আলো-অন্ধকারকে উপলব্ধি করেন। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই বইটিকে অসাধারণ করে তোলে।   ‘অক্ষয় মালবেরি’তে স্থানও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বরিশালের গ্রাম, নদী, মাঠ, গাছপালা, আসামের বরাক উপত্যকা—সবকিছুই এমনভাবে উপস্থিত যে মনে হয় স্থান নিজেই কথা বলছে। এখানে ভূগোল কেবল মানচিত্র নয়; এটি মানুষের স্মৃতির অংশ। কোনো একটি বাড়ি, উঠোন, পুকুর কিংবা পথ শুধু স্থাপত্য নয়; তারা মানুষের জীবনের ইতিহাস বহন করে।   গ্রন্থের পরবর্তী অংশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং লেখকের সৈনিকজীবনের অভিজ্ঞতা এক নতুন মাত্রা যোগ করে। যুদ্ধ এখানে বীরত্বের কাহিনি নয়। যুদ্ধ মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা ও অস্তিত্বসংকটকে উন্মোচিত করে। রাষ্ট্রের বৃহৎ রাজনৈতিক ইতিহাসের ভেতরে একজন সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র অথচ গভীর অভিজ্ঞতাই লেখকের আগ্রহের কেন্দ্র।   মণীন্দ্র গুপ্তের ভাষা বাংলা গদ্যের এক অভিনব সম্পদ। তাঁর বাক্য কখনো দীর্ঘ, ধ্যানমগ্ন ও সুরেলা; কখনো সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ। তাঁর গদ্যে কবিতার ছন্দ রয়েছে, কিন্তু তা কখনো কৃত্রিম নয়। তিনি শব্দ দিয়ে ছবি আঁকেন, শব্দ দিয়ে গন্ধ সৃষ্টি করেন, শব্দ দিয়ে নীরবতাকেও দৃশ্যমান করে তোলেন। এই ভাষাশৈলীই ‘অক্ষয় মালবেরি’কে একটি অনন্য পাঠ-অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।   দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বইটি স্মৃতি ও সময়ের সম্পর্ক নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। মানুষের পরিচয় কি বর্তমান দ্বারা নির্ধারিত, নাকি স্মৃতি দ্বারা? সময় কি সরলরেখার মতো এগিয়ে চলে, নাকি মানুষের চেতনার মধ্যে অতীত ও বর্তমান একসঙ্গে বাস করে? মণীন্দ্র গুপ্ত সরাসরি কোনো উত্তর দেন না; তিনি পাঠককে সেই প্রশ্নগুলোর মধ্যে বসবাস করতে শেখান। এদিক থেকে বইটিকে অস্তিত্ববাদী পাঠেও বিশ্লেষণ করা যায়।   ফেনোমেনোলজির আলোকে দেখলে ‘অক্ষয় মালবেরি’ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এডমুন্ড হুসার্ল ও মরিস মার্লো-পন্তি যে ‘lived experience’ বা জীবিত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, মণীন্দ্র গুপ্ত তারই সাহিত্যিক রূপ নির্মাণ করেছেন। তাঁর কাছে বাস্তবতা কোনো বাহ্যিক বস্তু নয়; বাস্তবতা মানুষের অনুভবের মধ্যেই জন্ম নেয়। একটি গাছ, একটি নদী বা একটি বিকেলের আলো তখন কেবল বস্তু থাকে না; তারা মানুষের অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে।   স্মৃতিবিষয়ক আধুনিক আলোচনায় মার্সেল প্রুস্তের নাম যেমন অনিবার্য, তেমনি বাংলা সাহিত্যে সেই স্মৃতির নন্দনতত্ত্বকে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছেন মণীন্দ্র গুপ্ত। প্রুস্ত যেমন স্বাদের মাধ্যমে স্মৃতির দ্বার খুলেছিলেন, মণীন্দ্র গুপ্ত তেমনি প্রকৃতি, গন্ধ, শব্দ ও আলোকে স্মৃতির বাহন করেছেন। ফলে তাঁর গদ্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অতিক্রম করে সর্বজনীন মানব-অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।   বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘অক্ষয় মালবেরি’ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে, কারণ এটি কোনো সাহিত্যিক ফ্যাশন অনুসরণ করে লেখা নয়। এটি এক গভীর জীবনানুভূতির ফল। এ বই পড়লে বোঝা যায়, একজন লেখকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর কল্পনা নয়; তাঁর দেখার ক্ষমতা। মণীন্দ্র গুপ্ত সেই দেখাকে এমন এক শিল্পে রূপ দিয়েছেন, যা পাঠককে নিজের জীবনের প্রতিও নতুন করে তাকাতে বাধ্য করে।   আজকের দ্রুতগতির প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে ‘অক্ষয় মালবেরি’ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ, এ বই আমাদের শেখায় মানুষের জীবন কেবল সাফল্য, কর্মজীবন বা ইতিহাসের বড় ঘটনায় গঠিত হয় না; মানুষের জীবন গড়ে ওঠে তার ছোট ছোট অভিজ্ঞতা, শৈশবের স্মৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক, মানুষের প্রতি মমতা এবং হারিয়ে যাওয়া সময়ের ভেতর দিয়ে।   অক্ষয় মালবেরি শেষ পর্যন্ত একটি গভীর মানবিক বই। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যে মানুষ নিজের স্মৃতিকে হারায়, সে নিজের পরিচয়ও হারায়। যে মানুষ প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, সে নিজের ভেতরের নীরবতাকেও হারায়। আর যে মানুষ অতীতকে কেবল ইতিহাস হিসেবে দেখে, সে কখনো বুঝতে পারে না যে অতীত আসলে তার বর্তমানেরই আরেকটি নাম।   এ কারণেই ‘অক্ষয় মালবেরি’ কেবল একটি আত্মজীবনী নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব, স্মৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের এক অমর সাহিত্যিক দলিল। যতবার পড়া যায়, ততবারই বইটি নতুন অর্থ উন্মোচন করে। এই পুনরাবিষ্কারের ক্ষমতাই তাকে বাংলা সাহিত্যের এক চিরসবুজ ক্লাসিক করে তুলেছে।    

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী আগস্ট ৪, ২০২৬ 0
বাইশে শ্রাবণ : সৃষ্টির অনন্ত আলোয় চিরঞ্জীব রবীন্দ্রনাথ

শ্রাবণের আকাশে যখন কৃষ্ণমেঘের ঘনঘটা নামে, বৃষ্টিধারা নীরবে ধরণিকে স্নাত করে, তখন বাঙালির হৃদয়েও নেমে আসে এক গভীর বিষাদের সুর। কেননা বাইশে শ্রাবণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণপুরুষ রবিঠাকুর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনন্তের পথে যাত্রা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই প্রস্থান কোনো সমাপ্তির গল্প নয়; বরং এক চিরন্তন উপস্থিতির সূচনা। তিনি দেহে বিদায় নিয়েছেন, অথচ তাঁর সৃষ্টি, দর্শন ও মানবতার দীপ্তি আজও সমান উজ্জ্বল। তাই বাইশে শ্রাবণ কেবল শোকের দিন নয়; এটি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, আত্মজাগরণ এবং রবীন্দ্রচেতনাকে নতুন করে ধারণ করার এক অনন্য প্রেরণার দিন।   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অনন্য প্রতিভা, সৃজনশীল মনন ও বিশ্বমানবতার চেতনায় বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসভায় এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, শিক্ষাচিন্তা, দর্শন ও চিত্রকলা; সৃজনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর বিস্ময়কর অবদান বাংলা সংস্কৃতিকে করেছে সমৃদ্ধ, আর বিশ্বমানবতার সাংস্কৃতিক ভাণ্ডারকে করেছে আরও ঋদ্ধ। তাঁর সৃষ্টি কেবল বাংলা ভাষা বা বাঙালি জাতির সম্পদ নয়; এটি সমগ্র মানবসভ্যতার চিরন্তন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ।   তিনি লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।” এই অমর পঙক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর জীবনদর্শনের মর্মবাণী। তিনি এমন এক সমাজ ও বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষের চিন্তা হবে মুক্ত, জ্ঞান হবে অবাধ, সংকীর্ণতার প্রাচীর হবে ভেঙে চুরমার, আর মানবতা, সত্য ও ন্যায়বোধ হবে সভ্যতার সর্বোচ্চ ভিত্তি। তাঁর এই স্বপ্ন আজও আমাদের পথ দেখায়, বিবেককে জাগ্রত করে এবং একটি আলোকিত সমাজ নির্মাণের অনুপ্রেরণা জোগায়।   রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় তার মনুষ্যত্বে। তাই তাঁর সাহিত্য কখনো বিভাজন বা বিদ্বেষের ভাষা উচ্চারণ করে না; বরং ভালোবাসা, সহমর্মিতা, সৌন্দর্যবোধ ও বিশ্বমানবতার চেতনাকে জাগ্রত করে। তাঁর সৃষ্টিতে যেমন প্রকৃতির অনুপম সৌন্দর্য অনির্বচনীয় মাধুর্যে ধরা দিয়েছে, তেমনি মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, আশা-নিরাশা, আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও গভীর মানবিকতা ও শিল্পসুষমায় রূপ লাভ করেছে। সে কারণেই তাঁর সাহিত্য কেবল পাঠের বিষয় নয়; এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, জীবনবোধ ও মানবিক বিকাশের এক চিরন্তন আলোকধারা।   ১৯১৩ সালে ‘সং অফারিংস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার অর্জনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বসভায় এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। তাঁর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল। বাংলার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির প্রতি অকৃত্রিম প্রেম এবং জাতীয় চেতনাকে জাগিয়ে তোলার এ গানই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অন্যদিকে তাঁরই রচিত ‘জন গণ মন’ ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে একই কবির রচিত দুটি গান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এক অনন্য ও গৌরবময় দৃষ্টান্ত, যা তাঁর সৃষ্টিশক্তির সর্বজনীনতা ও বিশ্বজনীন আবেদনকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।   মৃত্যু সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর, উদার ও জীবনমুখী। তিনি লিখেছিলেন, “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান।” এই অমর উচ্চারণে মৃত্যুভয় নয়, বরং জীবনের পূর্ণতা, অনন্তের প্রতি আত্মসমর্পণ এবং চিরসুন্দরের সঙ্গে মিলনের এক অপূর্ব দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। তাই তাঁর নিজের মহাপ্রয়াণও যেন তাঁরই জীবনদর্শনের বাস্তব প্রতিফলন। আজকের পৃথিবী যখন হিংসা, অসহিষ্ণুতা, বিভাজন ও মূল্যবোধের সংকটে নানাভাবে বিপর্যস্ত, তখন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, দর্শন ও মানবতাবাদ আমাদের নতুন করে আলোর পথ দেখায়। তাঁর শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সভ্যতার প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, মানবতায়; প্রতিযোগিতায় নয়, সহমর্মিতায়; ঘৃণায় নয়, ভালোবাসায়। তাই বাইশে শ্রাবণ কেবল একজন কবির মহাপ্রয়াণের স্মরণদিবস নয়; এটি রবীন্দ্রচেতনাকে আত্মস্থ করারও এক মহামূল্যবান উপলক্ষ। তাঁর সৃষ্টিকে গভীরভাবে পাঠ করা, তাঁর মানবতাবাদকে জীবনের অনুশীলনে রূপ দেয়া এবং তাঁর মুক্তচিন্তার আলো আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়াই হতে পারে বিশ্বকবির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।   রবীন্দ্রনাথ দেহে অনুপস্থিত, কিন্তু তিনি আজও বেঁচে আছেন প্রতিটি বাংলা উচ্চারণে, প্রতিটি রবীন্দ্রসংগীতে, প্রতিটি কবিতার অনুভবে এবং প্রতিটি মানবিক স্বপ্নে। মানুষের জীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু, প্রেম থেকে বিরহ, আনন্দ থেকে বেদনা, পূজা থেকে প্রকৃতি, দেশপ্রেম থেকে বিশ্বমানবতা - জীবনের প্রায় প্রতিটি অনুভূতি, উপলক্ষ ও অনুষঙ্গকে তিনি তাঁর গান, কবিতা ও সাহিত্যে চিরন্তন শিল্পরূপ দিয়েছেন। তাই জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি আবেগে বাঙালি ফিরে যায় রবীন্দ্রনাথের কাছে। যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথও বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির অমলিন আলোয়, মানুষের হৃদয়ের অনিঃশেষ প্রেরণা হয়ে।   বাইশে শ্রাবণে তাঁর পবিত্র স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর অমর বাণী আমাদের চিত্তকে ভয়শূন্য করুক, বিবেককে জাগ্রত করুক এবং সত্য, সৌন্দর্য ও মানবতার আলোকময় পথে চলার অনুপ্রেরণা জোগাক চিরকাল। এটাই হবে বিশ্বকবির প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও প্রকৃত প্রণাম।  

লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া আগস্ট ৪, ২০২৬ 0
কবিতা-প্রেম করে বেঁচে থাকা : রোমিলা থাপারের জীবনদর্শন, ইতিহাসচর্চা এবং কবিতার অন্তর্জগৎ

ইতিহাস কেবল অতীতের বিবরণ নয়; ইতিহাস মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, বেদনা, প্রতিবাদ ও স্বপ্নের ধারাবাহিকতা। একজন প্রকৃত ইতিহাসবিদ তাই শুধু রাজা-রাজড়ার কাহিনি লেখেন না, তিনি মানুষের জীবনের গভীরে প্রবেশ করেন। সে কারণেই বিশ্বের অন্যতম প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপারের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘জাস্ট বিং’ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আশির দশক পেরিয়ে দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা, বিতর্ক, রাষ্ট্রের চাপ, বৌদ্ধিক সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পর তিনি কবিতার আশ্রয় নিয়েছেন। এটি কেবল একজন ইতিহাসবিদের কবিতা লেখা নয়; বরং ইতিহাসের ভাষা থেকে অনুভূতির ভাষায় এক গভীর যাত্রা।   রোমিলা থাপারের জীবন আমাদের শেখায় যে জ্ঞান কখনো একমাত্রিক নয়। ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান ও কবিতা—সবই মানুষের অস্তিত্বকে বোঝার ভিন্ন ভিন্ন জানালা। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভারতীয় ইতিহাসকে নতুনভাবে পড়তে শিখিয়েছেন। পৌরাণিক কাহিনি ও ঐতিহাসিক সত্যের পার্থক্য, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক, ধর্মের সামাজিক ভূমিকা, ক্ষমতার বিন্যাস—এসব বিষয় নিয়ে তাঁর কাজ ভারতীয় ইতিহাসচর্চাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কিন্তু এত দিন যিনি ইতিহাসের কঠোর দলিল নিয়ে কাজ করেছেন, তিনি হঠাৎ কবিতার কাছে কেন ফিরলেন?   সম্ভবত এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের ভেতরেই। ইতিহাস তথ্যের ভাষায় কথা বলে, কিন্তু মানুষের নিঃসঙ্গতা, ভালোবাসা, শোক কিংবা অপেক্ষার ভাষা অনেক সময় কবিতাই হয়ে ওঠে। ইতিহাস আমাদের বলে কী ঘটেছিল; কবিতা বলে সেই ঘটনার অভিঘাত মানুষের হৃদয়ে কীভাবে বেঁচে থাকে।   রোমিলা থাপার নিজেই একাধিকবার বলেছেন, ইতিহাসবিদের কাজ হলো প্রশ্ন করা। আর কবির কাজও প্রশ্ন করা—যদিও প্রশ্নের ধরন ভিন্ন। ইতিহাসের প্রশ্ন যুক্তির, কবিতার প্রশ্ন অনুভূতির। কিন্তু দুটোর লক্ষ্য একই—সত্যের সন্ধান। তাই তাঁর কবিতাগুলোও নিছক আবেগের প্রকাশ নয়; বরং সেগুলো সময়, স্মৃতি, মৃত্যু, একাকিত্ব ও মানবিকতার অনুসন্ধান।   আজকের পৃথিবীতে ইতিহাসকে প্রায়ই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অতীতকে বদলে বর্তমানের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা নতুন নয়। এ সময় রোমিলা থাপারের কবিতা যেন অন্য এক প্রতিরোধের ভাষা। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, ইতিহাসকে যেমন ক্ষমতার ভাষায় বন্দী করা যায় না, তেমনি মানুষের অনুভূতিকেও কোনো মতাদর্শের খাঁচায় আটকে রাখা যায় না। কবিতা সেই স্বাধীনতার নাম।   কবিতা কেন জরুরি? কারণ, মানুষ কেবল যুক্তির প্রাণী নয়। মানুষের জীবনে এমন অনেক অভিজ্ঞতা আছে, যা কোনো ইতিহাসগ্রন্থে লেখা যায় না। একটি যুদ্ধের তারিখ লেখা যায়, কিন্তু সেই যুদ্ধে সন্তান হারানো মায়ের নীরবতা লেখা যায় না। একটি দুর্ভিক্ষের পরিসংখ্যান দেয়া যায়, কিন্তু ক্ষুধার্ত শিশুর চোখের ভাষা ধরা যায় না। একটি সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের ইতিহাস লেখা যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাঙা স্বপ্নের ইতিহাস কে লেখে? কবিতা সেই অদৃশ্য ইতিহাসের ভাষা।   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “তথ্য সত্য নয়, সত্য তথ্যের চেয়েও বড়।” ইতিহাস তথ্যের ওপর দাঁড়ায়, কিন্তু কবিতা সেই বৃহত্তর সত্যকে স্পর্শ করে। রোমিলা থাপারের কাব্যচর্চা যেন সেই দুই সত্যের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ।   এখানেই তাঁর জীবন আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে যায়। একাডেমিক উৎকর্ষ মানেই অনুভূতিহীনতা নয়। বরং যত গভীর জ্ঞান, তত গভীর মানবিকতা। একজন ইতিহাসবিদ যখন কবিতা লেখেন, তখন বোঝা যায় যে জ্ঞানের শেষ পরিণতি অহংকার নয়, বিনয়। কারণ জ্ঞান যত বাড়ে, মানুষ তত বুঝতে শেখে যে পৃথিবীকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।   এই কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম ‘জাস্ট বিং’ — অর্থাৎ ‘শুধু থাকা’—নিজেই একটি দার্শনিক উচ্চারণ। আধুনিক সভ্যতা আমাদের প্রতিনিয়ত সফল হতে, উৎপাদন করতে, প্রতিযোগিতা করতে শেখায়। কিন্তু ‘শুধু থাকা’ এই অস্তিত্বের অভিজ্ঞতাই যেন আমরা ভুলে গেছি। মার্টিন হাইডেগার যেমন বলেছিলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো ‘বিং’ —অস্তিত্বের প্রশ্ন। রোমিলা থাপারের কবিতাও যেন সেই অস্তিত্বের নীরব অনুসন্ধান।   কবিতা তাঁর কাছে কোনো অলংকার নয়; বরং আত্মসংলাপ। ইতিহাসের নথি যেখানে শেষ হয়, সেখানে কবিতার শুরু। দলিলের বাইরে যে মানুষটি বেঁচে থাকে, কবিতা তারই ভাষা।   আজকের শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতার ওপর যত গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, মানববিদ্যার গুরুত্ব ততই কমছে। অথচ ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন ও কবিতা ছাড়া একটি সমাজ প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও মানবিকভাবে দরিদ্র হয়ে পড়ে। রোমিলা থাপারের এ কাব্যগ্রন্থ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিক্ষা কেবল তথ্য অর্জনের নাম নয়; শিক্ষা হলো সংবেদনশীল হওয়ার শিক্ষা।   তাঁর কবিতা তাই ব্যক্তিগত হলেও একই সঙ্গে রাজনৈতিক। কারণ, মানবিকতা নিজেই একটি রাজনৈতিক অবস্থান। ঘৃণা, বিভাজন ও মেরুকরণের সময় ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখাও একধরনের প্রতিরোধ।   শেষ পর্যন্ত, রোমিলা থাপারের ‘জাস্ট বিং’ আমাদের একটি গভীর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। ইতিহাস আমাদের শেখায় আমরা কোথা থেকে এসেছি; কবিতা শেখায় আমরা কেন এখনো মানুষ হয়ে বেঁচে আছি। এ দুইয়ের মিলনেই সৃষ্টি হয় এমন এক বৌদ্ধিক ও মানবিক পরিসর, যেখানে জ্ঞান কেবল মস্তিষ্কের বিষয় নয়, হৃদয়েরও বিষয়।   সম্ভবত সে কারণেই আশি পেরোনো এক ইতিহাসবিদ শেষ পর্যন্ত কবিতার কাছে ফিরে আসেন। কারণ, মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুঝতে শেখে—সব প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসে নেই, কিছু উত্তর কেবল কবিতার কাছেই থাকে। আর সেই উত্তরই আমাদের শেখায়, পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো উপাধি নয়; সবচেয়ে বড় পরিচয়—মানুষ হয়ে থাকা, জাস্ট বিং।    

ড. শিবাশিস মুখার্জী ড. শিবাশিস মুখার্জী আগস্ট ৩, ২০২৬ 0
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথের  মর্ত্যপ্রীতি : প্রেক্ষিত ‘সোনার তরী’ কাব্য

রবীন্দ্রপ্রতিভার বিস্ময়কর জাদুস্পর্শে বাংলা সাহিত্যে সোনার ফসল ফলেছে। বিহারীলাল চক্রবর্তীর মাধ্যমে বাংলা আধুনিক গীতিকবিতায় যে ধারার সূত্রপাত, রবীন্দ্রনাথের দিব্যপ্রতিভায় তা পূর্ণতা লাভ করেছে। সাহিত্য জোয়ারের স্বতঃস্ফূর্ততায় বেগবান হয়েছে। আর তখনই শোনা গেছে ঊর্মি-মুখর সমুদ্রের দিগন্ত বিস্তৃত কলকল্লোল। বিচিত্র রাগে রবীন্দ্রপ্রতিভা বিকশিত হলেও তাঁর লিখনী শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাব্যের ফুলই বেশি ফুটিয়েছে। প্রকৃতি প্রীতি, অধ্যাত্ম চিন্তা, বিশ্ববোধ, মানবিকতা, প্রেম প্রভৃতির পাশাপাশি মর্ত্যপ্রীতি তাঁর কাব্য-কলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, যা ‘সোনার তরী’ কাব্যে শতধারায় উৎসারিত। এ কাব্যে বাস্তব জগৎ ও জীবনের পরিসীমায় কবি প্রত্যাশিত সৌন্দর্যের সন্ধান লাভে তৎপর। এই উন্মুখতায় সাড়া দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতি ও বিশ্বমানব তাঁর একান্ত কাছের স্বজন হয়ে কথা বলেছে। কবিও আকুল দুবাহু বাড়িয়ে এদের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যমালার দীপ্র বৈভব বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য বৈষ্ণব তত্ত্বের রসভাষ্য। বৈষ্ণব মতে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির  মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক বিদ্যমান। এ সাহিত্যে জীবাত্মা রাধা ও পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের বিচিত্র প্রেমলীলার আশ্রয়ে সুগভীর ধর্মীয় তত্ত্ব ব্যক্ত হয়েছে। বৈষ্ণব কবিদের অনবদ্য প্রেম চিত্র পার্থিব মানব-মানবীরই প্রণয়ের প্রতিচ্ছবি, রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে উচ্চকণ্ঠ। তাঁর মতে, পার্থিব জগতের মানবিক প্রণয়লীলা থেকেই বৈষ্ণব পদাবলির উদ্ভব। এ বিষয়ে কবিতায় ফুটে উঠেছে ললিতমোহন অভিব্যক্তি — সত্য করে কহ মোরে হে বৈষ্ণব কবি কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি?... কে তোমারে বেঁধেছিল দুটি বাহু ডোরে? আপন হৃদয়ের অগাধ সাগরে রেখেছিল মগ্ন করি। এত প্রেম কথা রাধিকার চিত্ত দীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা চুরি  করি লইয়াছ কার মুখ কার আঁখি হতে? (বৈষ্ণব কবিতা) বৈষ্ণব পদাবলির হৃদয়রঞ্জক ব্যঞ্জনা বিষয়ে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "বৈষ্ণব কবিতা আমাদের মনকে যে এত মুগ্ধ করে, তাহার কারণ ইহা নহে যে তাহার মধ্যে দেব-দেবীর অপার্থিব প্রণয়ের চিত্র আছে, পরন্তু তাহার মধ্যে এই মর্ত্যের মানবীয় প্রণয়ের নানা লীলা সুন্দরভাবে দেবতার বেনামীতে প্রকাশ পাইয়াছে।" জগৎ ও জীবনের সহজতর বিকাশের দিকে দৃকপাত না করে সুদূরের প্রত্যাশা জীবনকে অর্থহীন করে তোলে। প্রকৃতির অন্তহীন ঐশ্বর্য এবং মানবজীবনের বহু বিচিত্র বিকাশের মধ্য দিয়েই বিশ্ব সৌন্দর্যের যথাযথ আস্বাদ লাভ করা সম্ভব। মর্ত্যের সৌন্দর্যকে অবহেলা করে আকাশের চাঁদের আকাঙ্ক্ষা কবির নেই। জীবন ও জগতের সৌন্দর্য মাধুর্যে কবি আপ্লুত। তাঁর কবিতা মর্ত্য জীবনানন্দে অনুরঞ্জিত— শশী নাহি চাই যদি ফিরে পাই আরবার এই জীবন। ( আকাশের চাঁদ) বিশ্বের সঙ্গে কবির সম্পর্ক জন্ম-জন্মান্তরের। পৃথিবী আপন বৈচিত্র্যের পসরা সাজিয়ে কবিকে আবাহন জানায়। কবিও ব্যাকুল কণ্ঠে বলে ওঠেন, “আমার পৃথিবী তুমি বহু বরষের।” (বসুন্ধরা) কেবল বিশ্বপ্রকৃতি নয়, বিশ্বমানবের মিলনমেলার জন্য কবি উদগ্রীব। স্বদেশ ও স্বজাতির ক্ষুদ্র সীমা অতিক্রম করে স্বতঃস্ফূর্ত হৃদয়ে বিশ্বের প্রাণ রসধারার অমিয় সাগরে সিনান করতে তিনি আকুল— হৃদয় আমার ক্রন্দন করে মানব হৃদয়ে মিশিতে নিখিলের সাথে মহারাজ পথে চলিতে দিবস-নিশীথে। (বিশ্বনৃত্য) শ্যামল ধরণির বরপুত্র কবির কাছে বৈকুণ্ঠের চেয়ে পৃথিবীর মাটি ও মানুষ অনেক বেশি আদরণীয়। রূপ, রস, গন্ধ, সৌন্দর্য, বৈভব তথা অপার মায়াজালে কবির নয়ন বিমুগ্ধ — ফুটিয়াছে ঝোপে ঝাড়ে নিরাকুল ফুলভারে বকুল-বাগান। কানায় কানায় পূর্ণ আমার পরান। (ভরা ভাদরে)   এই ভরা পরানের মূর্ছনায় সোনার তরী কাব্য হিল্লোলিত।    রবীন্দ্রনাথ নিজেকে প্রসারিত করে জল, স্থল, অন্তরীক্ষের প্রতিটি অবস্থার সৌন্দর্য আস্বাদনে উন্মুখ। তৃণ-লতা, গাছ-পালা, নদী-পর্বত, মেঘ-বৃষ্টি প্রভৃতির বিচিত্র জগতে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি আনন্দ উদ্বেল। বিভিন্ন দেশ ও জাতির  বহু রৈখিক পারিপার্শ্বিকতা বিচিত্র রাগিণীতে বাঁশি বাজায়। হৃদয়ের প্রত্যন্ত প্রদেশে কবি শোনেন সেই বাঁশির  ললিত ঝংকার। বিপুল আকুলতায় বলেন— ইচ্ছা করে আপনার করি যেখানে যা কিছু আছে; নদীস্রোতোনীরে আপনারে গলাইয়া দুই তীরে তীরে নব নব লোকালয়ে করে যাই দান... (বসুন্ধরা) অক্ষমা ধরিত্রী মাতা তাঁকে অনেক কিছুই দিতে পারেন না। এই অসম্পূর্ণ সুখের মাঝেই কবির পরম তৃপ্তি— যেখানে এসেছি আমি আমি সেথাকার দরিদ্র  সন্তান আমি দীন ধরণির। জন্মাবধি যা পেয়েছি সুখ দুঃখ ভার বহু ভাগ্য বলে তাই করিয়াছি স্থির। (অক্ষমা) কবির কাছে পৃথিবী স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। বিত্ত বৈভবের চমক না থাকলেও মাটির পৃথিবী কবির চির ভালোবাসার ধন— দরিদ্রা বলিয়া তোরে বেশি ভালবাসি হে ধরিত্রী স্নেহ তোর বেশি ভালো লাগে... (দরিদ্রা) এ বিষয়ে শ্রী প্রমথনাথ বিশী বলেন, "পৃথিবীতে সুখ দুঃখ দুই-ই আছে, সেই তো তাহার গৌরব, বস্তুত স্বর্গে সুখ আছে কিন্তু আনন্দ নাই, আনন্দ একান্তভাবে পার্থিব।...এই ভাবটি ‘সোনার তরী’র ‘দরিদ্রা’ কবিতায় আছে।" কবি অক্ষমা ও দরিদ্রা জননীকে ঘৃণা করে মুক্তির প্রত্যাশা করেন না। তাঁর মুক্তি  পৃথিবীতেই। পৃথিবীর আলো-বাতাসে অসংখ্য প্রাণের বিকাশে সহস্র বন্ধনমাঝেই মহানন্দ লাভে কবি উদগ্রীব। এ অপরূপ ধরাতল ছেড়ে কবি  আর কোথাও যেতে চান না। এই অনীহার মাঝে  মর্ত্যপ্রীতি কূলপ্লাবী নদীর মূর্ছনায় কান্ত মধুর— ভালোবাসিয়াছি আমি ধূলি মাটি তোর যে মর্ত্যকূলে  ঘৃণা করি তারে ছুটিব না স্বর্গে আর মুক্তি খুঁজিবারে। (আত্মসমর্পণ) বস্তুত  মর্ত্যপ্রীতি রবীন্দ্র কাব্য-ভাবনার  অন্যতম বৈশিষ্ট্য ।    ‘সোনার তরী’ কাব্য এই অনুভূতি শৈল্পিক বিভায় সমুজ্জ্বল। এ বিষয়ে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের মন্তব্য স্মরণযোগ্য, "কবি এই আবেগময় অনুভূতিকে কাব্যের ঐশ্বর্য দান করিয়াছেন। এই অনুভূতিই রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববোধের মূল প্রেরণা।"  

প্রফেসর জাহান আরা খাতুন প্রফেসর জাহান আরা খাতুন আগস্ট ২, ২০২৬ 0
প্যারিস মেইলের পথচলা শুভ হোক
প্যারিস মেইলের পথচলা শুভ হোক

ফ্রান্সপ্রবাসী শ্রদ্ধেয় মো. সালাহ উদ্দিন ভাই আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানালেন যে, ফ্রান্স থেকে ‘প্যারিস মেইল’ নামে বাংলা ভাষায় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। উদ্বোধনী সংখ্যার জন্য আমি যেন কোনো লেখা পাঠাই।   তাঁর সেই প্রস্তাব আমাকে আলোড়িত করেছে। আমার মতো অখ্যাত একজন ব্যক্তিকে লেখা পাঠানোর অনুরোধ করায় প্রকাশিতব্য নতুন পত্রিকার উদ্দেশে আমার নিজস্ব ভাবনার কয়েক লাইন সংশ্লিষ্ট পত্রিকার কর্তৃপক্ষ, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে শেয়ার করছি।   বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন যে, বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের সূচনা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অসম্ভব প্রতিভার ছোঁয়ায় আলোর মুখ দেখে। উচ্চাভিলাসী আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে প্রথম জীবনে তিনি সাহিত্য চর্চার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে গ্ৰহণ করেন। চলে যান ইউরোপীয় দেশ ফ্রান্সে। অবস্থান করতে থাকেন ভার্সাই নগরীতে। লিখে ফেলেন ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’।   ইংরেজি সাহিত্যে কালজয়ী হওয়ার যে সুপ্ত বাসনা তাঁর হৃদয়মাঝে আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল, ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ প্রকাশের পর তাঁর মোহ ভঙ্গ হয়। অতঃপর বাংলা সাহিত্যে তাঁর গর্বিত পদচারণ এবং মহাকাব্য, গীতিকাব্য, নাটক, সনেট, প্রহসন অসম্ভব মাত্রায় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সাহিত্যে প্রচলিত মিথ ভাঙার জন্য আত্মবাদী চিরন্তন সত্যকে পাঠকের কাছে মানবীয় মূল্যবোধ দ্বারা আড়োলিত করার শক্তি, সাহস ও প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখায় আমরা খুঁজে পাই।   ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বৈশ্বিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রের ভূমিকা বহু আগে থেকেই স্বীকৃত। ইতিহাসের অনেক অজানা বিষয় সংবাদপত্রের মহতী ভূমিকার কারণে মানব সমাজ জানতে পেরেছে। এই তো কিছুদিন আগে পরাশক্তি মার্কিন সমাজের নগ্নতাবাদ চরিত্র সম্পর্কে ‘এপেস্টেইন ফাইলস’ সামনে আসার মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংবাদপত্র হলো পরিবর্তিত সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে প্রতিনিয়ত যেসব ঘটনা ঘটে এবং আগে সংঘটিত ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য সূত্র ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্য সরবরাহ করা।   যুদ্ধের ভারাক্রান্ত মানচিত্র এবং তা থেকে উদ্ভূত রক্তক্ষরণ আমাদের অস্তিত্ববাদী চেতনার আশাবাদী স্বপ্নগুলো আজ বেদনার নীল তিমিরে শয্যাশায়ী। যৌবনের ফেরারি বয়ানগুলো দাসত্ববাদী ভাবনার শিরোনাম হয়ে মানবপ্রজাতির সেমেটিক সম্ভাবনাগুলো নিঃশেষ করে দিচ্ছে। ব্যর্থ গুগলের সর্বগ্ৰাসী এআই কর্পোরেশন প্রাতিষ্ঠানিক নির্লজ্জতার দানবিকতায় কেড়ে নিচ্ছে অন্তর্জগতের সমূহ সম্ভাবনা। লুপ্ত হচ্ছে শান্তিবাদী ধারণার সৃষ্টিশীল মৌলিক অভিপ্রায়। পুঁজিবাদের রক্তাক্ত ভয়াল থাবা কর্তৃত্ববাদী গোধূলির আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে পৃথিবীর বঞ্চিত মানুষের হিমোগ্লোবিন। হেমলকের বিষাক্ত বিষে শুভবোধের পুষ্পিত জীবনরস আজ প্রজননশাস্ত্রের ব্যর্থ পাদটীকা। এই সভ্যতার ভূখণ্ডে মানুষ আর শুনতে পায় না আজাদির বসন্তকাব্য। অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে মানবজাতির সামষ্টিক ভবিষ্যৎ।   বৈশ্বিক দুর্যোগের এই সন্ধিক্ষণে প্যারিস মেইল তার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে শুনে আমি অতিশয় আনন্দ অনুভব করছি। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করে এই পত্রিকা নিপীড়িত বিশ্বের মুখপত্র হিসেবে কাজ করবে, তা আমার বিশ্বাস। সমাজের অন্যায়, অসংগতি; রাষ্ট্রের ভুল ধরে কর্তৃত্ববাদী চরিত্র থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা এবং বৈশ্বিক অপরাধবোধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবে আশা করি এই পত্রিকা তার ভূমিকা পালন করবে। প্যারিস মেইলের পথচলা শুভ হোক তার জন্মদিনে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।    

এম এ ওয়াজেদ এম এ ওয়াজেদ জুলাই ২৪, ২০২৬ 0
শ্রোতা ও আবৃত্তিকার : একটি যৌথ অভিজ্ঞতা
শ্রোতা ও আবৃত্তিকার : একটি যৌথ অভিজ্ঞতা

আবৃত্তিতে যা-কিছু ঘটে, তা কখনো একা ঘটে না। একজন আবৃত্তিকার কবিতা বলেন, কিন্তু সেই কবিতার প্রকৃত জীবন শুরু হয় তখনই, যখন কেউ তা মন দিয়ে শোনে। শ্রোতা ও আবৃত্তিকার এ দুজনের মধ্যে একধরনের অদৃশ্য সংযোগ তৈরি হয়।   একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তিনি কেবল শব্দ উচ্চারণ করেন না; তিনি তাঁর অনুভূতি, তার কণ্ঠের উষ্ণতা এবং তার মনের অবস্থা শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেন। অন্যদিকে একজন শ্রোতা যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই কবিতা শোনেন, তখন সেই অনুভূতি তাঁর ভেতরে প্রবেশ করে। আদান-প্রদানের মধ্যেই আবৃত্তির আসল সৌন্দর্য।   অনেক সময় দেখা যায়, একটি ভালো আবৃত্তির সময় পুরো ঘর নিঃশব্দ হয়ে যায়। কেউ কথা বলে না, কেউ নড়াচড়া করে না। সবাই যেন একধরনের শান্ত মনোযোগে ডুবে থাকে। এই অভিজ্ঞতা অনেকটা ধ্যানের মতো। ধ্যানের সময় যেমন মানুষ নিজের ভেতরে মনোযোগ দেয়, আবৃত্তির সময়ও তেমন একটি মনোযোগ তৈরি হয়। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে সেই মনোযোগের কেন্দ্র হয় কবিতার শব্দ।   একজন আবৃত্তিকার যখন সত্যিই অনুভূতি নিয়ে কবিতা বলেন, তখন শ্রোতারাও ধীরে ধীরে সেই অনুভূতির ভেতরে প্রবেশ করেন। এ মুহূর্তে আবৃত্তি একটি সম্মিলিত অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। যেন সবাই একই তরঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।   মঞ্চের নীরবতা আবৃত্তির মঞ্চে একটি বিশেষ ধরনের নীরবতা থাকে। নীরবতা সাধারণ নীরবতার মতো নয়, প্রত্যাশার নীরবতা।   যখন একজন আবৃত্তিকার মঞ্চে ওঠেন, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য একটি নিস্তব্ধতা তৈরি হয়। সবাই অপেক্ষা করে কবিতার প্রথম শব্দ শোনার জন্য। অপেক্ষার মুহূর্তটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজন সচেতন আবৃত্তিকার এই মুহূর্তটিকে অনুভব করতে পারেন। তিনি যদি একটু চোখ বন্ধ করেন, অথবা কয়েক সেকেন্ড শান্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, তাহলে তিনি অনুভব করতে পারবেন পুরো ঘরের মনোযোগ তাঁর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।   মুহূর্তটি ধ্যানের মতো। কারণ, এখানে সবাই একই মুহূর্তে উপস্থিত। কেউ অতীতের কথা ভাবছে না, কেউ ভবিষ্যতের কথা ভাবছে না। সবাই শুধু অপেক্ষা করছে পরবর্তী শব্দের জন্য। নীরবতার মধ্যেই কবিতার জন্ম হয়। যখন প্রথম শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখন মনে হয় যেন সেই নীরবতার ভেতর থেকেই শব্দটি উঠে এসেছে এবং কবিতা শেষ হলে আবার সেই শব্দগুলো নীরবতার মধ্যেই ফিরে যায়। এই আসা-যাওয়ার মাঝেই আবৃত্তির সৌন্দর্য।   প্রতিধ্বনি ভালো একটি আবৃত্তি শেষ হওয়ার পর প্রায়ই দেখা যায়, কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না। শ্রোতারা চুপচাপ থাকে। নীরবতার মুহূর্তটি অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ, কবিতার শব্দগুলো তখনো বাতাসে ভাসছে। শ্রোতার মনে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি কাজ করছে। এই প্রতিধ্বনি অনেক সময় শব্দের থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়। কবিতা তখন আর কেবল কণ্ঠে থাকে না; এটি শ্রোতার অন্তরে স্থান করে নেয়। ধ্যানের ক্ষেত্রেও এমন অভিজ্ঞতা দেখা যায়। একটি গভীর ধ্যানের পরে মানুষ প্রায়ই কিছুক্ষণ নীরব থাকতে চায়, তখন মন খুব শান্ত থাকে। আবৃত্তির পরের নীরবতাও অনেকটা তেমন। নীরবতা আসলে কবিতার একটি অংশ। শব্দ যেখানে শেষ হয়, সেখানে অনুভূতি শুরু হয়।   আবৃত্তি একটি অন্তরযাত্রা অনেকেই মনে করেন, আবৃত্তি মানে কেবল সুন্দরভাবে কবিতা বলা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আবৃত্তি তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আবৃত্তি হতে পারে একটি অন্তরযাত্রা। যখন একজন আবৃত্তিকার একটি কবিতা গভীরভাবে অনুভব করেন, তখন সেই কবিতার ভাবনা তাঁর নিজের ভেতরেও আলোড়ন সৃষ্টি করে। তিনি নিজেই নতুনভাবে অনুভব করতে শুরু করেন। একটি কবিতা কখনো কখনো মানুষের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। কখনো একটি লাইন আমাদের নিজের স্মৃতিকে স্পর্শ করে। কখনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের কোনো গোপন অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। এই মুহূর্তে আবৃত্তি শুধু শিল্প নয়; এটি হয়ে ওঠে আত্ম-অনুসন্ধানের একটি পথ। আমরা শব্দের ভেতর দিয়ে নিজের হৃদয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করি।   ধ্যানের দরজা শব্দ, শ্বাস ও নীরবতা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আবৃত্তি এই তিনটি উপাদানকে একত্রে নিয়ে আসে। শব্দ আমাদের মনোযোগকে জাগিয়ে তোলে। শ্বাস আমাদের কণ্ঠকে ছন্দ দেয়। আর নীরবতা আমাদের অনুভূতিকে গভীর করে। এই তিনটি একত্রে একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে, যা অনেক সময় ধ্যানের কাছাকাছি। যদি আমরা সচেতনভাবে আবৃত্তি করি, যদি আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, এবং যদি আমরা নীরবতার মূল্য বুঝতে শিখি, তাহলে কবিতা আমাদের মনকে শান্ত করার একটি পথ হয়ে উঠতে পারে। ১. কীভাবে আবৃত্তির ভেতরে ধ্যানের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়; ২. কীভাবে শ্বাস ও কণ্ঠকে প্রস্তুত করা যায়; এবং ৩. কীভাবে কবিতা আমাদের অন্তরের নীরবতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।   কারণ, কখনো কখনো একটি কবিতার কয়েকটি শব্দই মানুষের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারে। আর সেই স্পর্শ থেকেই শুরু হতে পারে একটি নতুন যাত্রা — শব্দ থেকে নীরবতার দিকে, কণ্ঠ থেকে হৃদয়ের দিকে, এবং অনুভূতি থেকে ধ্যানের দিকে।   শব্দ থেকে নীরবতার পথে মানুষের জীবনে শব্দের উপস্থিতি চিরন্তন। জন্মের মুহূর্ত থেকে আমরা শব্দের মধ্যে বাঁচতে শুরু করি। প্রথম কান্না, প্রথম ডাক, প্রথম উচ্চারণ — সবকিছুই শব্দের মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।   শব্দ আমাদের অনুভূতির বাহন। আমরা আনন্দ প্রকাশ করি শব্দে, দুঃখ প্রকাশ করি শব্দে, ভালোবাসা জানাই শব্দে। কিন্তু শব্দের আরেকটি গভীর দিক আছে, যা আমরা সব সময় লক্ষ করি না। শব্দ আমাদের অন্তরের দরজাও খুলে দিতে পারে। কবিতা সেই দরজার একটি বিশেষ চাবি। কবিতা যখন আমরা পড়ি বা শুনি, তখন অনেক সময় এমন অনুভূতি জন্ম নেয়, যা সাধারণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। একটি ছোট্ট পঙক্তি হঠাৎ আমাদের মনে অদ্ভুত শান্তি এনে দিতে পারে। আবার কোনো একটি শব্দ আমাদের ভেতরের গভীর স্মৃতিকে স্পর্শ করতে পারে।   এ কারণেই কবিতা শুধু সাহিত্য নয়; এটি মানুষের অন্তরের একটি অভিজ্ঞতা। যখন সেই কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে উচ্চারিত হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। আবৃত্তি একটি বিশেষ শিল্প। এখানে শব্দ কেবল উচ্চারিত হয় না; শব্দ অনুভূত হয়, শ্বাসের সঙ্গে ছন্দ তৈরি করে, এবং নীরবতার সঙ্গে মিলেমিশে একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে।   একজন আবৃত্তিকার যখন কবিতা বলেন, তখন তিনি কেবল একটি লেখা পাঠ করেন না, তিনি সেই কবিতার অনুভূতিকে জীবন্ত করে তোলেন। এই জীবন্ত অভিজ্ঞতার ভেতরে আমরা কখনো কখনো এমন একধরনের শান্তি অনুভব করি, যা ধ্যানের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। ধ্যান বা মেডিটেশন সাধারণত আমরা ভাবি — চোখ বন্ধ করে বসে থাকা, মনকে শান্ত করার চেষ্টা করা, অথবা শ্বাসের দিকে মনোযোগ দেয়া। কিন্তু ধ্যানের মূল অর্থ আরও গভীর। ধ্যান হলো সচেতনতা। ধ্যান হলো বর্তমান মুহূর্তের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে থাকা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আবৃত্তিও একটি ধ্যানের পথ হতে পারে।   যখন আমরা একটি কবিতা ধীরে ধীরে আবৃত্তি করি, যখন আমরা প্রতিটি শব্দকে অনুভব করি, যখন আমরা শব্দের মাঝখানের নীরবতাকেও গ্রহণ করি, তখন আমাদের মন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। শব্দ তখন কেবল শব্দ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি যাত্রা। যাঁরা কবিতা ভালোবাসেন, যাঁরা শব্দের ভেতরে শান্তি খুঁজে পান, অথবা যাঁরা ধ্যানের নতুন একটি পথ খুঁজছেন। কারণ, কখনো কখনো ধ্যান শুরু হয় কোনো জটিল সাধনার মাধ্যমে নয়, বরং একটি সহজ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। একটি কবিতা শোনার মাধ্যমে।  

রবিশঙ্কর মৈত্রী রবিশঙ্কর মৈত্রী জুলাই ২০, ২০২৬ 0
আহা রে জীবন
আহা রে জীবন

জীবনকে একেকজন একেকভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করে। বয়স, লিঙ্গ, সময়, প্রতিবেশ ভেদে জীবনের সংজ্ঞা ভিন্ন হয়ে থাকে। একেবারে অশীতিপর বৃদ্ধাবস্থায় জরা-ব্যাধি যখন চতুর্দিক দিয়ে আক্রান্ত করে, যখন মুড়ি খাওয়ার মতো করে ওষুধ গিলতে হয়, হাসপাতাল আর ক্লিনিকে টানাহেঁচড়া করতে করতেই জান বের হওয়ার উপক্রম হয়, তীব্র শ্বাসকষ্টে অক্সিজেন মাস্ক বা সিলিন্ডারে মুখ গুঁজে রাখতে হয়, ডায়াবেটিসের প্রবল উৎপাতে কোনো চিকিৎসাই যখন স্বাভাবিকভাবে প্রয়োগ করা যায় না, তখন যাপিত জীবনের অর্থ আর যাই হোক তাতে মধুরতার লেশমাত্র থাকে না। তখন সেই জীবন ভারবাহী জীবন্ত লাশ হয়ে ওঠে, মনে হয় এ যাতনার অবসান হোক, মৃত্যু যেন এর চেয়ে অনেক বেশি প্রশান্তির। অথচ সুন্দর এ ভুবন ছেড়ে চলে যেতে কারও মন চায় না।   একটা জীবন সময়ের সাথে সাথে কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানসিক বিকাশের সাথে সাথে স্বপ্নের জাল বুনতে শেখায়। ছেলেবেলায় স্বপ্নেরা পুতুল খেলার মতো হরহামেশাই রঙিন প্রজাপতির মতো কেবলই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। তখন বাসের ড্রাইভারকে দেখে মনে হয় এটাই পৃথিবীর সেরা পেশা। আহা, আমি যদি হতে পারতাম! গাড়ি নিয়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতাম। আকাশ দিয়ে হাওয়াই জাহাজ উড়ে যেতে দেখলে মনে সাধ জাগত, আহা যদি পাইলট হতে পারতাম! মা-বাবা, পরিবার, সমাজ এসে তখনই ছবক দিয়ে বলত, ‘লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে’। সেটাকেই অভীষ্ট ধরে কত অধ্যবসায়, কত লেখাপড়া, কত কত পরীক্ষা! মাস্টার মশাইয়ের কানডলা খাওয়া, লজ্জার মাথা খেয়ে ক্লাসরুমে বা স্কুল বারান্দায় বা প্রচণ্ড রোদে স্কুলমাঠে প্রকাশ্যে নীলডাউন হয়ে বা দুই কান ধরে এক পা উঁচিয়ে অন্তহীন দাঁড়িয়ে থাকা ছিল যেন সুস্থ জীবনের প্রয়োজনে ‘স্বাভাবিক’।   পারিবারিক শিক্ষা তো ছিল আরও কঠোর। সবকিছু ওই মানুষ হিসেবে জীবন গড়ার জন্য। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে স্বপ্নের দ্রুত বাঁক পরিবর্তন হতে থাকে। পড়াশোনা শেষে বাস্তবের জগতে পা রেখেই জীবনের অর্থ কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি হয়। সেই থেকে স্বপ্নরা অধরা হতে শুরু করে।   জীবনজীবিকায় কেউ সফলকাম হয়, কেউ মন্দের ভালো হিসেবে ‘যা পাওয়া যায় তা-ই সই’ হিসেবে  মেনে নিতে বাধ্য হয়। সেখান থেকেই স্বপ্নের তেজস্বতা ম্রিয়মাণ হতে থাকে। সংসারে যারা কামিয়াব হতে পারে না, তাদের জন্য ওপরের আকাশ দেখা বারণ, তাদের জন্য পায়ের নিচের জমিন শক্ত কংক্রিটের মতো দুঃসহ হয়ে ওঠে। সংসারজীবনে প্রবেশের পর জীবনের  ‘লাইফ লাইন’ লাইভ সাপোর্টে থাকা রোগীর মনিটরের কার্ভের মতো অস্থিরমতি হয়ে ওঠে।   প্রেমে জীবনের অর্থ একরকম, সফলতায় এর পুলক ‘হ্যাপি টু দ্যা পাওয়ার ইনফিনিটি’। ব্যর্থতায় তা  মাঝ আকাশে বিধ্বস্ত বিমানের মতো ছিন্নভিন্ন। পেশাগত জীবনে কেউ রতি সুখের মতো চরম পুলকিত, কেউ সো সো, আর কেউ জন্ম থেকেই জ্বলছিবৎ। কেউ সফল স্বামী, কেউ পয়মন্ত বউ। কেউ অথর্ব গাধা, কেউ অপয়া। কেউ যেন শূন্যতাকেই বয়ে বেড়ায়, কেউ অল্পকে সম্বল করেই ভালো আছি বলাতে ধাতস্থ। কারও আছে অঢেল, অগণিত। কারও থোরা থোরা আর কারও তা অধরা। সবই একজীবনে পাশাপাশি চলার চালচিত্র।   একজীবনের জন্য আমাদের কত কিছুর আয়োজন! আমাদের বিদ্যা লাগে, ভালো সার্টিফিকেট লাগে। তার জন্য কত মেহনত, কত কিছুর জোগাড়পাতি লাগে। কারও চাকরি লাগে, কারও ব্যবসা। তা না হলে জীবন চলে না। তাই পরীক্ষা দিতে হয় পদে পদে। ঘাটে ঘাটে বিছানো প্রতিবন্ধকতা টপকাতে হয় জীবনব্যাপী। আমাদের সুখপাখি লাগে, তাই সুন্দরী বউ চাই। তার জন্য উপযুক্ততা লাগে। সে আরেক হিসাব। পরিবার লাগে। জেনেশুনে তার জোয়াল নিজ কাঁধে তুলে নিতে হয়। সেই জোয়াল আর কাঁধ থেকে নামানোর জো নেই। কেবলই সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতে হয়। ফেরার পথ নেই, সেই পথ অনিশ্চিত, বড়ই কঠিন, চড়া মাশুলযুক্ত।   তারাপদ রায়ের বিখ্যাত একটা কবিতার কয়েকটি চরণ স্মরণ না করে পারছি না : একটা জন্ম জোড়াতালির, ভাত-কাপড়ের তক্কে তক্কে একটা জীবন মাথা গোঁজার ফন্দি খোঁজে একটা জীবন বাক্স মাথায় ভুল শহরে ভুল ঠিকানায় ঘুরে ঘুরে একটা জন্ম এমনি এমনি কেটে গেল একটা জীবন দেখতে দেখতে চলে যাচ্ছে।   জীবন সায়াহ্নে হিসাব কষতে গিয়ে অনেকেরই হয়তো এরূপ মনে হতে পারে। কেউ অল্পতে তুষ্ট, কেউ বড় বেশি কৃতজ্ঞ। কেউ জীবনের ডেবিট-ক্রেডিটের ব্যালান্স কষতে গিয়ে হতাশ। মৃত্যুর অমোঘ নিয়মে চলে যেতে হয়, চলে যেতে হবে - এই বোধ আমাদের আত্মস্থ হয়ে আছে ছোটবেলা থেকেই। এই দেহ যখন লাশের উপাধি প্রাপ্ত হয়, তখন তা দেখে সবাই  আমরা বলে উঠি, আমরা তো আল্লাহর এবং নিশ্চয় আমরা তার দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী  (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। জীবনের এই অমোঘ সত্যকে মেনে নিয়ে মুহূর্তকাল থমকে দাঁড়াই। তারপরই বেগের তাড়নায়, পেছনে পড়ে থাকার ভয়ে দৌড়াতে থাকি ঊর্ধ্বশ্বাসে। এভাবেই আমরা একেকজন একেকভাবে জীবনকে টেনে নিয়ে যাই মৃত্যুর দিকে। কারও মধ্যে  অনুশোচনা হয়, পাথেয়র পরিমাণ কম বলে পরপারের ট্রেনে ওঠায় অজানা ভীতি জাগে। আফসোস দানা বাঁধে। কাফফারা দিয়েও হয়তো তার ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়।   আমরা এসবের সব জানি, কিন্তু রিপু আমাদের সার্বক্ষণিক সহযাত্রী হয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এদিক-সেদিক, দিগবিদিক। তখন বিবেকের ফ্যাকাল্টি মুমূর্ষু অবস্থায় থাকে। আবেগের পারদ টগবগে ঘোড়ার মতো দিগবিজয়ের নেশায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। যেন ফেরার পথ নেই, থামার কোনো নীতি নেই, বিরতি মানেই যেন পিছিয়ে পড়া।   সমাজ এগিয়েছে। সমাজচিত্র বদলেছে। সময়ের বরকত কমে যাচ্ছে। তৃপ্তির ব্যারোমিটার উল্লম্ফন যাত্রায় পেরেশান। বিবেক-বিবেচনা বোধ পার্থিব লাভালাভের ওপর নির্ভরশীল। বিবেকের চেয়ে দলের কথা, দলের চেয়ে নেতার কথা শিরোধার্য। নীতির রীতি এখন সিলেবাসের সবচেয়ে কম জায়গাজুড়ে থাকে। স্বার্থের কানাকড়িতে টান পড়লে খুনোখুনি কোনো ব্যাপার না। অমুকের গাড়ি-বাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে দেশে-বিদেশে। তাই আমারও চাই। পড়শীর বিশাল ব্যাংক ব্যালান্স দেশে কিংবা বিদেশে। আমারও থাকা চাই। তার দৌড় সুইস ব্যাংক হলে আমার তো নিদেনপক্ষে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্ডিয়া, ব্যাংককে হওয়া চাই।   টাকা কোথা থেকে আসে বা আসবে, তার নির্দিষ্ট কোনো খাত নেই, দৃশ্যমান কোনো সোর্স নেই। অফিসের পিওনের ক্যাশ শত কোটি, মহল্লার হেরোইনখোরের পুঁজি শত শত কোটি টাকা। তাদেরও বাড়ি আছে বিদেশে। তারাও ফি বছর হজ করে, একাধিক উমরাহ করে সপরিবার। টাকা এল কোত্থেকে তার তালাশ কেউ করে না। এমনকি স্ত্রী, পুত্র-কন্যা বা স্বজনরাও না। ভোগের টার্গেট ফিক্সড। তাই সাপ্লাইয়ের চ্যানেল চালু রাখতে সবাই পেরেশান।   দান মেরে দান-খয়রাত হচ্ছে প্রচুর। ছওয়াব কামাইয়ের এ হেন খাত নেই, যাতে অবদান নেই। কি শিক্ষিত কি অর্ধশিক্ষিত, দান মারায় কেউই পিছিয়ে নেই। সিন্ডিকেট আছে, ফেডারেশন আছে, সলিড স্ট্রাকচার্ড অলিগার্ক আছে। তাই ভয় নেই। যাদের আছে বুদ্ধি অতিশয়, যারা বুদ্ধিজীবী নামধারী, তাদের আবার আভিজাত্য আছে, নীতিকথাও আছে, আবার ভাগ-বাটোয়ারা জ্ঞানও টনটনে আছে।   রাজনীতিবিদদের কথার মাধুর্য অপরিসীম। ‘সুইট টকার’ হিসেবে তারা সমাজে পরম পূজনীয়। তাদের একই অঙ্গে একাধিক রূপ, এক মুখে শত কথা। তারা স্বপ্ন  জাগানিয়া। পাবলিক জেনেশুনে বিষ পান করে। আশাহত হয়। দুয়ো ধ্বনি দেয়। আবার কাছে ভেড়ে, অপুষ্ট হাত উঁচিয়ে শ্লোগানে শামিল হয়। না হয়ে উপায় নেই। দলছুট মানেই হারিয়ে যাওয়া, নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, আম-ছালা দুটোই হারানো।   সকল শ্রেণি-পেশাতেই একই দশা। তাই বলে কি ভালো লোক নেই? আছে। তারা আছে গৃহকোণে, ব্যাকবেঞ্চে, বাইরের পরিত্যক্ত মাঠে, নদীর কিনারায়, সংসারের ঘানি টানতে জোয়াল কাঁধে। সেখানে নিয়ম মেনে সূর্য ওঠে, দিনের পালাবদলে সন্ধ্যা নামে।   একটা জীবনে জন্য কত কি যে হচ্ছে, কত শত জারিজুরি যে করতে হচ্ছে তার হিসাব-কিতাব নেই। খেলারামরা খেলে যাচ্ছে। পাবলিক যে যেমন পারছে নিজের মতো করে খাচ্ছে। নীতি-নৈতিকতা কিতাবে লেখা আছে। যার যখন প্রয়োজন, তা থেকে চয়ন করে ভাষণ দিচ্ছে, বয়ান তৈরি করছে। কেউ শুনছে, কেউ মানছে, কেউ হাসছে, কেউ প্রলাপ জ্ঞানে উড়িয়ে দিচ্ছে। আর চামে চামে ঘোড়েল কামেলিয়েরা কাম করে যাচ্ছে। আহা রে জীবন!  

আনোয়ার হাকিম আনোয়ার হাকিম জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0