Breaking news
ফিচার

বাইপোলার ডিসঅর্ডার : মনের যত্নে খাবারও কি গুরুত্বপূর্ণ

রাইসা মেহজাবীন
রাইসা মেহজাবীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নিউট্রিশন ফর চেঞ্জ, ঢাকা
অক্টোবর ১৯, ২০২৬ • 0

বাইপোলার ডিসঅর্ডার একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে ব্যক্তির মেজাজ, শক্তি, ঘুম, চিন্তাভাবনা ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ও কম ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অর্থাৎ ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার পর্ব দেখা যায়; আবার কখনো গভীর বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। এর চিকিৎসায় ওষুধ ও সাইকোথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি জীবনযাপন, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম এবং খাদ্যাভ্যাসও সামগ্রিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা ডায়েট বাইপোলার ডিসঅর্ডার সারিয়ে দিতে পারে না। পুষ্টি চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং এটি চিকিৎসার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।

 

মস্তিষ্ক শরীরের অত্যন্ত সক্রিয় একটি অঙ্গ। এর স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা এবং বিপাকীয় জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

 

তাই বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ‘মুড ঠিক করার খাবার’ খোঁজার পরিবর্তে একটি সুষম, বৈচিত্র্যময় ও নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ছোলা, পূর্ণশস্য, মাছ, ডিম, পরিমিত পরিমাণে মাংস, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারের পরিমাণ কমানো উপকারী।

 

বাংলাদেশি খাদ্যসংস্কৃতিতে ভাত বা রুটি বাদ দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এর সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, ডাল, মাছ বা অন্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস যুক্ত করা যেতে পারে।

 

মাছের তেলে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্ক ও হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ, যেমন সার্ডিন, ম্যাকারেল বা অন্যান্য স্থানীয়ভাবে পাওয়া মাছ এর ভালো উৎস হতে পারে।

 

বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং কিছু গবেষণায় বিষণ্নতার উপসর্গে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে প্রমাণ এখনো এমন নয় যে ওমেগা-৩-কে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের স্বতন্ত্র চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।

 

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, অতিরিক্ত ক্যালরি কমানো বা অনিয়মিত খাবারের অভ্যাস শরীরের শক্তি ও ক্ষুধার স্বাভাবিক ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে ঘুমের অনিয়মও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে, ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার সময় ঘুমের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন, এনার্জি ড্রিংক বা রাতের দিকে বেশি চা-কফি গ্রহণ ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

 

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ ক্ষুধা, ওজন, রক্তে শর্করা, রক্তের চর্বি বা অন্যান্য বিপাকীয় সূচকে পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ওজন, রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ ও লিপিড প্রোফাইলসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সূচক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

 

বিশেষ সতর্কতার বিষয় হলো লিথিয়াম। লিথিয়াম গ্রহণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীরে পানিশূন্যতা এবং সোডিয়াম গ্রহণে বড় ধরনের পরিবর্তন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই লিথিয়াম গ্রহণের সময় নিজের ইচ্ছায় লবণ বা পানি গ্রহণের পরিমাণে বড় পরিবর্তন আনা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

 

বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ব্যবহৃত কিছু ওষুধের কারণে কারও ওজন বাড়তে পারে। তাই ওজন বৃদ্ধি হলে ব্যক্তিকে শুধু ‘কম খেতে হবে’ বা ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ওজন ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, ওষুধের প্রভাব এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা।

 

বাইপোলার ডিসঅর্ডার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, হারবাল পণ্য, ডিটক্স ডায়েট, দীর্ঘমেয়াদি উপবাস বা বিশেষ ডায়েটকে ‘প্রাকৃতিক চিকিৎসা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। এসব দাবির অনেকগুলোর পেছনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশেষ করে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো মানসিক রোগের ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।

 

বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী, পুষ্টিবিদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণের সময় তার ওষুধ, বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওজন, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং খাদ্যসংস্কৃতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

 

সবশেষে মনে রাখতে হবে, খাদ্য বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসার বিকল্প নয়; তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস চিকিৎসার পাশাপাশি শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।

 

মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং একটি স্থিতিশীল জীবনযাপন সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

 

0 Comments

Popular post
চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

ন-নামা

না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ।   না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে   নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন।   নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার।   নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।  

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

শরৎ

শরতের আকাশ যেন সাদা মেঘের ভেলা শরতে স্বচ্ছ সরোবরে দলবেঁধে মেটে রাজহাঁস খেলে ডুব-সাঁতারের খেলা।   শরতের মাঠে মাঠে মাথা নেড়ে দোলে শুভ্র রঙের কাশ শরতের নীল আকাশে উড়ে বেড়ায় লাল ঝুঁটি ভূঁতিহাস।   শরতে পথে পথে ফোটে শিউলি, শেফালি ও টগর শরতে তালের পিঠা উৎসবে মাতে পল্লি থেকে নগর। শরতে হাওর বিলে পদ্ম শাপলা মুখ বের করে হাসে। শরতে ভোরের শিশির মিশে থাকে সবুজ দূর্বাঘাসে।  

ফিচার

View more
বাইপোলার ডিসঅর্ডার : মনের যত্নে খাবারও কি গুরুত্বপূর্ণ

বাইপোলার ডিসঅর্ডার একটি জটিল মানসিক স্বাস্থ্যগত অবস্থা, যেখানে ব্যক্তির মেজাজ, শক্তি, ঘুম, চিন্তাভাবনা ও আচরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্য ও কম ঘুমের প্রয়োজনীয়তা অর্থাৎ ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার পর্ব দেখা যায়; আবার কখনো গভীর বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। এর চিকিৎসায় ওষুধ ও সাইকোথেরাপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর পাশাপাশি জীবনযাপন, ঘুম, শারীরিক কার্যক্রম এবং খাদ্যাভ্যাসও সামগ্রিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।   তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন, কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা ডায়েট বাইপোলার ডিসঅর্ডার সারিয়ে দিতে পারে না। পুষ্টি চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং এটি চিকিৎসার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।   মস্তিষ্ক শরীরের অত্যন্ত সক্রিয় একটি অঙ্গ। এর স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি, প্রোটিন, প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা এবং বিপাকীয় জটিলতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।   তাই বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ‘মুড ঠিক করার খাবার’ খোঁজার পরিবর্তে একটি সুষম, বৈচিত্র্যময় ও নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।   শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, ছোলা, পূর্ণশস্য, মাছ, ডিম, পরিমিত পরিমাণে মাংস, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারের পরিমাণ কমানো উপকারী।   বাংলাদেশি খাদ্যসংস্কৃতিতে ভাত বা রুটি বাদ দেয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এর সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি, ডাল, মাছ বা অন্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস যুক্ত করা যেতে পারে।   মাছের তেলে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্ক ও হৃৎস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ, যেমন সার্ডিন, ম্যাকারেল বা অন্যান্য স্থানীয়ভাবে পাওয়া মাছ এর ভালো উৎস হতে পারে।   বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট নিয়ে গবেষণা হয়েছে এবং কিছু গবেষণায় বিষণ্নতার উপসর্গে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে প্রমাণ এখনো এমন নয় যে ওমেগা-৩-কে বাইপোলার ডিসঅর্ডারের স্বতন্ত্র চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়।   দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, অতিরিক্ত ক্যালরি কমানো বা অনিয়মিত খাবারের অভ্যাস শরীরের শক্তি ও ক্ষুধার স্বাভাবিক ছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে ঘুমের অনিয়মও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বিশেষ করে, ম্যানিয়া বা হাইপোম্যানিয়ার সময় ঘুমের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন, এনার্জি ড্রিংক বা রাতের দিকে বেশি চা-কফি গ্রহণ ঘুমের সমস্যা বাড়াতে পারে। তাই নিয়মিত খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।   বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ওষুধ ক্ষুধা, ওজন, রক্তে শর্করা, রক্তের চর্বি বা অন্যান্য বিপাকীয় সূচকে পরিবর্তন আনতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় ওজন, রক্তচাপ, রক্তে গ্লুকোজ ও লিপিড প্রোফাইলসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সূচক পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।   বিশেষ সতর্কতার বিষয় হলো লিথিয়াম। লিথিয়াম গ্রহণকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে শরীরে পানিশূন্যতা এবং সোডিয়াম গ্রহণে বড় ধরনের পরিবর্তন সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই লিথিয়াম গ্রহণের সময় নিজের ইচ্ছায় লবণ বা পানি গ্রহণের পরিমাণে বড় পরিবর্তন আনা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।   বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ব্যবহৃত কিছু ওষুধের কারণে কারও ওজন বাড়তে পারে। তাই ওজন বৃদ্ধি হলে ব্যক্তিকে শুধু ‘কম খেতে হবে’ বা ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ হিসেবে দেখা উচিত নয়। ওজন ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, ওষুধের প্রভাব এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা।   বাইপোলার ডিসঅর্ডার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, হারবাল পণ্য, ডিটক্স ডায়েট, দীর্ঘমেয়াদি উপবাস বা বিশেষ ডায়েটকে ‘প্রাকৃতিক চিকিৎসা’ হিসেবে প্রচার করা হয়। এসব দাবির অনেকগুলোর পেছনে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশেষ করে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো মানসিক রোগের ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।   বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী, পুষ্টিবিদ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণের সময় তার ওষুধ, বয়স, শারীরিক অবস্থা, ওজন, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং খাদ্যসংস্কৃতি বিবেচনায় নেওয়া উচিত।   সবশেষে মনে রাখতে হবে, খাদ্য বাইপোলার ডিসঅর্ডারের চিকিৎসার বিকল্প নয়; তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস চিকিৎসার পাশাপাশি শরীর ও মস্তিষ্কের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।   মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নে নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, শারীরিক কার্যক্রম, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং একটি স্থিতিশীল জীবনযাপন সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।  

অক্টোবর ১৯, ২০২৬ 0

এআই ভিডিওর মোহে মিডিয়া

বিদ্যার্জন ও শিক্ষা

স্মৃতিময় সোনালি অতীত

রঙে রঙে আনন্দ

আনন্দের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। এর জন্য বিশেষ স্থান, কাল কিংবা পাত্রের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি সুন্দর মন, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনের বাস্তবতাকে সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা। অথচ আমাদের সমাজে এই উদার দৃষ্টিভঙ্গির অভাবই অনেক সময় চোখে পড়ে। ফলে আমরা নিজের প্রাপ্তির আনন্দ উপভোগ না করে অন্যের প্রাপ্তি দেখে আক্ষেপ করি। এটি হয়তো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু যারা এই সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন, তারাই প্রকৃত অর্থে প্রশান্ত, পরিতৃপ্ত ও সুখী জীবন যাপন করেন।   উন্নত দেশগুলোর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মানবিক সম্পর্ক, সৃজনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেই উদ্দেশ্যে স্কুলগুলোতে নিয়মিত নানা আয়োজন করা হয়—কখনো শিক্ষার্থীদের জন্য, কখনো অভিভাবকদের অংশগ্রহণে।  আমাদের সন্তানের স্কুলেও বিভিন্ন সময় এমন ব্যতিক্রমধর্মী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। সুযোগ পেলেই আমরা সেসব অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করি। এতে শিশুদের যেমন আনন্দ হয়, তেমনি অভিভাবকদের মধ্যেও পারস্পরিক পরিচয়, মতবিনিময় ও সৌহার্দ্যের একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়।    ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কে আমাদের সন্তানের স্কুলে ‘Parents Mingle’ নামে এমনই একটি আয়োজন হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে স্কুলে পৌঁছে দেখি, প্রতিটি আসনের সামনে রঙিন কাগজে মোড়ানো একটি করে উপহারের বাক্স রাখা আছে। নিয়ম ছিল—যিনি যে আসনে বসবেন, সেই বাক্সটিই হবে তাঁর।   আমি ও আমার স্ত্রী পাশাপাশি বসেছিলাম। বাক্স খুলতেই ভেতরে পেলাম একটি করে ফ্রেমে আঁকা ছবি এবং রং করার প্রয়োজনীয় উপকরণ। প্রত্যেকের জন্যই ছিল ভিন্ন ভিন্ন ছবি। আমার ভাগ্যে এলো একটি সুন্দর চিত্র, আর আমার স্ত্রীর ছবিটি ছিল আলাদা।   চারদিকে তাকিয়ে দেখি, সব অভিভাবকই শিশুর মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে নিজেদের ছবিতে রঙের ছোঁয়া দিচ্ছেন। কেউ গল্প করছেন, কেউ মিটিমিটি হাসছেন, আবার কেউ গভীর মনোযোগে রঙের পর রং বসিয়ে ছবিকে প্রাণবন্ত করে তুলছেন। আয়োজকেরা মাঝেমধ্যে এসে উৎসাহ দিচ্ছিলেন, স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করছিলেন এবং স্ন্যাকস পরিবেশন করছিলেন। প্রাণচঞ্চল সেই পরিবেশে সময় যেন ডানা মেলে উড়ে গেল।   কিছুক্ষণ পর ঘোষণা এলো—যিনি যে ছবিতে রং করেছেন, সেই ছবিটিই তাঁর। অর্থাৎ সবাই নিজেদের রঙে সাজানো চিত্রটি স্মারক হিসেবে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন। ঘোষণাটি শুনে মনের অজান্তেই বলে উঠলাম, ওয়াও! মুহূর্তেই উপলব্ধি করলাম, আনন্দ সৃষ্টি করতে খুব বড় কিছুর প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু সুন্দর একটি ভাবনা।   সেখানে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল না জয়-পরাজয়ের কোনো হিসাব। কেউ পরাজিত হননি, সবাই ছিলেন বিজয়ী। প্রত্যেকের হাতে ছিল নিজের সৃষ্টির আনন্দ, নিজের শ্রমের স্মৃতি এবং নিজের অর্জনের গর্ব। আয়োজকদের এই অনন্য চিন্তাভাবনা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে গেল।   এই ছোট্ট আয়োজন আমাকে নতুন একটি শিক্ষা দিয়েছে, নতুন প্রেরণাও জুগিয়েছে। আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নেয়া যায়। একটি সাধারণ রঙতুলিও মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে, নতুন সম্পর্কের সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে পারে এবং জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু নির্মল মুহূর্ত উপহার দিতে পারে।   এটি ছিল আমার জীবনের এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। আগে কখনো এভাবে বসে ছবি আঁকার সুযোগ হয়নি। রঙের পরতে পরতে যেন নিজেকেই নতুন করে আবিষ্কার করলাম। সেদিন উপলব্ধি করলাম, শিল্পী হওয়ার জন্য নিখুঁতভাবে আঁকতে জানতে হয় না;  প্রয়োজন শুধু আনন্দ নিয়ে রঙ ছড়িয়ে দেওয়ার সাহস।   হয়তো সেদিনই নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক নতুন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। সেই রঙিন সময় আজও মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ছবিগুলো অনেক সময় রঙে নয়, আনন্দে আঁকা হয়।        

অক্টোবর ১২, ২০২৬ 0

ভয়েস ওভার অ্যাক্টিং নিয়ে ক্যারিয়ার

কন্যারা স্বপ্ন বোনে, সমাজ কি তার দাম দিতে প্রস্তুত

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস এবং আমাদের করণীয়

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস : মাঠে মাঠে স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও আগামীর চ্যাম্পিয়ন

  বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম, মফস্বল কিংবা ছোট শহরের মাঠে প্রতিদিন অসংখ্য শিশু-কিশোর খেলাধুলা করে। কারও পায়ে থাকে ফুটবলের জাদু, কেউ দৌড়ে অন্যদের ছাড়িয়ে যায়, কেউ ব্যাট-বল হাতে দেখায় অসাধারণ সম্ভাবনা। কিন্তু প্রতিভা থাকলেও সবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয় না। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, সুযোগ-সুবিধার সংকট কিংবা সঠিক সময়ে প্রতিভা শনাক্ত না হওয়ার কারণে অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হারিয়ে যায়।   এই বাস্তবতায় ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তৃণমূল পর্যায় থেকে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করে তাদের ধাপে ধাপে উন্নত প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ক্রীড়া পরিদপ্তর কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে।   ‘নতুন কুঁড়ি’ নামটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রতিভা অন্বেষণের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। সেই ভাবনাকে ক্রীড়াঙ্গনে নিয়ে এসে নতুন প্রজন্মের সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’।   ২০২৬ সালের প্রথম আসরে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট—এই আটটি ইভেন্টের মাধ্যমে প্রতিভা যাচাই করা হয়। দ্বিতীয় আসরে আরও দুটি ইভেন্ট যুক্ত হয়েছে ভলিবল ও টেবিল টেনিস; এখন মোট ১০টি ইভেন্ট নিয়ে আয়োজিত হচ্ছে।    শুধু বড় শহর নয়, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায় থেকে খেলোয়াড় বাছাইয়ের কাঠামো তৈরি হওয়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিভাবানদের সামনে উঠে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।   বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই; বরং অনেক সময় প্রতিভা খুঁজে বের করার যথাযথ ব্যবস্থা থাকে না। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব এখানেই—এটি প্রতিভাকে মাঠ থেকে তুলে এনে একটি সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।   একজন শিশু হয়তো পরিবারের আর্থিক সমস্যার কারণে ঢাকায় গিয়ে কোনো একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিতে পারে না। কিন্তু তার গ্রামের মাঠেই যদি প্রতিভা শনাক্ত করা হয়, তাহলে তার সামনে জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার দরজা খুলে যেতে পারে।   এ ধরনের উদ্যোগ কেবল খেলোয়াড় তৈরি করে না; বরং একটি দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে। ভবিষ্যতে জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের জন্য খেলোয়াড় তৈরির ভিত গড়ে উঠতে পারে এখান থেকেই।   শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলার সবচেয়ে বড় সুফল হলো শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি। নিয়মিত খেলাধুলা শরীরকে সক্রিয় রাখে, সহনশীলতা বাড়ায় এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করে। তবে খেলাধুলার উপকারিতা শুধু শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাঠে একজন শিশু শেখে সময় মেনে চলতে, নিয়ম ও শৃঙ্খলা মানতে, জয়-পরাজয় মেনে নিতে, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে, নেতৃত্ব দিতে, প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে, চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে এবং ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করতে। ফলে একজন ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি একজন আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ক্ষেত্রেও খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।   বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোন, গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় কাটায়। এর ফলে শারীরিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাঠকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগও কমছে। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ মাঠকে আবার শিশু-কিশোরদের মিলনস্থলে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই এলাকার বিভিন্ন পরিবারের সন্তান একসঙ্গে খেলবে, প্রতিযোগিতা করবে এবং বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রীড়া সংগঠক, কোচ, রেফারি ও স্বেচ্ছাসেবকদেরও কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।   আমি নিজে একজন খেলোয়ার ছিলাম। সেখান থেকে ভলিবল রেফারি, কোচ, ক্রীড়া সংগঠক হয়েছি। আমি বিভিন্ন জায়গায় ভলিবল নিয়ে কাজ করার সময় লক্ষ করেছি, গ্রামের খেলোয়াররা শহরের খেলোয়াদের থেকে বেশি চাপ নিতে পারে এবং এদের মধ‍্যে প্রতিভা আছে। সেটিকে বিকাশিত করতে দরকার ভালো পরামর্শ ও সুযোগ। যেটি তৈরি করে দিচ্ছে নতুন কুড়ি স্পোর্টস।   আমাদের আশপাশের অনেক খেলোয়ার আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল, এটি একটি প্রতিবন্ধকতা। আমার তত্ত্বাবধানে একজন খেলোয়ার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র, সে লেখাপড়ার পাশাপাশি তার বাবার হোটেলে কাজ করছে। ফলে তার নিয়মিত প্র্যাকটিসে কিন্তু একটা প্রভাব পড়ছে এবং তার শারীরিক ও মানসিকভাবে একটা চাপ পড়ছে। অথচ সে কিন্তু একজন প্রতিভাবান খেলোয়ার। গত সিজনে সে খুলনা বিভাগীয় পর্যায় মার্শাল আর্ট (উশু) ৪৫+ ওজনে তৃতীয় হয়েছে।   বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস একটি নতুন সম্ভাবনার নাম। আজকের যে শিশু উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের একটি মাঠে দৌড়াচ্ছে, আগামী দিনে সেই শিশুই হয়তো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামবে। হয়তো কোনো একদিন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশিক্ষক, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, স্বচ্ছ বাছাই এবং নিয়মিত পরিচর্যা।   একটি কুঁড়িকে শুধু চিহ্নিত করলেই ফুল ফোটে না—তার জন্য প্রয়োজন মাটি, পানি, আলো ও পরিচর্যা। ঠিক তেমনি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এ যে প্রতিভাগুলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তাদের যথাযথ পরিচর্যা করতে পারলেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ফুটতে পারে নতুন নতুন সম্ভাবনার ফুল।   ‘নতুন কুঁড়ি’ তাই শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম নয়—এটি হতে পারে আগামীর চ্যাম্পিয়ন তৈরির একটি স্বপ্নযাত্রা।

অক্টোবর ১০, ২০২৬ 0
ছবিটি প্রথম আলো থেকে নেয়া

চাকমা সমাজে চুঙুলং পূজার গুরুত্ব ও সামাজিক বৈধতা

মহালয়া : অমর্ত্যলোকের আবাহন ও মর্ত্যের শারদ-স্পন্দন

কন্যাশিশু একটি প্রজন্মের ধারক : মূল্যায়ন কি আদৌ করছি