সারা দেশে হাম এবং হামের উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২৫ জনে। ২৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১০৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৭৩০টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৯৫টি শিশু। সব মিলিয়ে এই সময়ে মোট ৮২৫টি শিশু মারা গেছে। সারা দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৫। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৫ হাজার ৫৫৫ জন। হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ১ লাখ ৭ হাজার ৬৫৪ জন রোগী। চিকিৎসা শেষে এদের মধ্যে ১ লাখ ৩ হাজার ৪৬৭ জন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে।
দেশের স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসা অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল মেডিকেল অক্সিজেন রোডম্যাপ (২০২৬–২০৩০)’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কর্মপরিকল্পনা তৈরির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে সভাপতি করে ২৭ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ ইমাম আলী রেজা। এতে স্বাস্থ্য ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বুয়েট এবং আইসিডিডিআর,বি-এর বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা যুক্ত আছেন। এই কমিটির প্রধান কাজ হলো চিকিৎসা অক্সিজেনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং একটি কার্যকর জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করা। এর মাধ্যমে দেশের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সহজলভ্যতা নিশ্চিতের পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত এক সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এই তথ্য জানান। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল রোডম্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ই-হেলথ কার্ড হলো নাগরিকদের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্বের সব রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও ওষুধের বিবরণ মুহূর্তেই দেখতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে গত দুই বছর ধরে এই ডিজিটাল রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীমসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ধূমপান, বায়ুদূষণ ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ৪৫ শতাংশ ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বুধবার (১৮ জুলাই) এ সংক্রান্ত একটি হালনাগাদ নির্দেশিকা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৫ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং প্রতি বছর নতুন করে আরও এক কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ হলো ডিমেনশিয়া। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা গেলেও ডব্লিউএইচও প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়িসুস জানিয়েছেন, এটি বার্ধক্যের কোনো অনিবার্য অংশ নয়; বরং সচেতনতার মাধ্যমে এর ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। ডিমেনশিয়ার কারণে মানুষের স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা ও দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এর সবচেয়ে সাধারণ রূপ হলো আলঝেইমার্স, যা মোট আক্রান্তের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, তামাক ও অ্যালকোহল সেবনের মতো অসংক্রামক ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে চললে এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা যায় বলে নতুন নির্দেশিকায় জোর দেওয়া হয়েছে।
স্মার্টওয়াচ দিয়ে হৃদস্পন্দন, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বা ঘুমের হিসাব রাখার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব যন্ত্র স্বাস্থ্যের প্রাথমিক ধারণা দিলেও তা কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য ডাক্তারি পরীক্ষার বিকল্প নয়। বিশেষ করে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া স্বল্পমূল্যের স্মার্টওয়াচের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে যেকোনো শারীরিক সমস্যায় সরাসরি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অ্যাপল, স্যামসাং বা গারমিনের মতো স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের স্মার্টওয়াচগুলো বিশ্রামের সময় হৃদস্পন্দন বা রক্তে অক্সিজেনের (SpO₂) কাছাকাছি সঠিক মাত্রা জানাতে পারে। তবে দ্রুত হাঁটা, হাতের অতিরিক্ত নড়াচড়া, ত্বকের রং কিংবা ঘড়ি ঢিলাভাবে পরার কারণে এই রিডিংয়ে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এছাড়া ইসিজি, ঘুমের ধরন, স্টেপ কাউন্ট বা ক্যালরি খরচের মতো সূচকগুলো সেন্সরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অনুমান করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টওয়াচের ক্যালরি খরচের হিসাবে ২০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত গরমিল হতে পারে। এগুলো হার্ট অ্যাটাক বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো জটিল রোগ নির্ণয়েও সক্ষম নয়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশের বাজারে ২ থেকে ৫ হাজার টাকায় যেসব চীনা বা নকল স্মার্টওয়াচ পাওয়া যায়, সেগুলোর স্বাস্থ্যগত ফিচারের কোনো ক্লিনিক্যাল ভিত্তি নেই। এগুলো রক্তচাপ বা রক্তে শর্করার মতো ভুয়া ফিচার দিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্ত করছে। তাই স্মার্টওয়াচকে কেবল ফিটনেসের প্রাথমিক সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার জন্য প্রচলিত মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপরই ভরসা রাখা উচিত।
দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও একজনের প্রাণহানি এবং নতুন করে ১৪০ জনের রোগটি শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ২৪৪ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন। অধিদপ্তর জানায়, মৃতদের মধ্যে ৯৫ জন নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি ৬৮৫ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এছাড়া আলোচিত সময়ে এক লাখেরও বেশি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিলেও, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের বড় অংশই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
বন্যা-পরবর্তী সম্ভাব্য রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার (১৭ জুলাই) চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ঢলু খালের ভাঙন এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ শেষে তিনি এ কথা জানান। তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সম্পূর্ণ পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। অর্থমন্ত্রী জানান, দুর্গত এলাকায় রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার বসতবাড়ি, সড়ক যোগাযোগ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চলমান এই সংকট কাটাতে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে এক লাখ ৫৫ হাজার পরিবারকে চালসহ বিভিন্ন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
চীনের সাংহাইয়ে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্মেলন (ডব্লিউএআইসি) ২০২৬’-এ যোগ দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। শুক্রবার (১৭ জুলাই) চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এই চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ, উদীয়মান প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তিবিদেরা আলোচনা করছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কাজাখস্তান, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানসহ জাতিসংঘের মহাসচিব বক্তব্য রাখেন। তারা এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল উন্নয়ন এবং এ খাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। এই আয়োজনে ডিজিটাল রূপান্তর ও স্মার্ট সুশাসন নিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরতে মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম একাধিক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবননির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে সরকারের সদিচ্ছা বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে প্রতিফলিত হবে।
টেসলা প্রধান ইলন মাস্কের রেকর্ড পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও ডিজিটাল অর্থনীতির চরিত্র বদলে যাওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রথাগত পণ্য উৎপাদন বা সম্পদের চেয়ে এখন ডেটা, অ্যালগরিদম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই অর্থনৈতিক ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানের এই নতুন ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণকে অনেক অর্থনীতিবিদ ‘টেকনো-ফিউডালিজম’ বা প্রযুক্তিগত সামন্তবাদ হিসেবে অভিহিত করছেন। অতীতে সম্পদের উৎস ছিল তেল, ইস্পাত বা ব্যাংক, কিন্তু বর্তমানের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন এক অবকাঠামো গড়ে তুলছে যা জনমত থেকে শুরু করে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। জেফ বেজোস বা মার্ক জাকারবার্গের মতো ‘ক্লাউডালিস্ট’রা এখন প্রথাগত পুঁজিবাদের সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক ডিজিটাল পরিসর তৈরি করেছেন, যেখানে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যই মুনাফার মূল কাঁচামাল। ব্যবহারকারীরা যখন এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন, তখন তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবর্তে অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক ডিজিটাল বাস্তুসংস্থানে প্রবেশ করেন, যা মালিকপক্ষের মুনাফা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলন মাস্কের মতো ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির রহস্য লুকানো রয়েছে তাদের সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে, যেখানে স্টারলিঙ্ক, স্পেসএক্স, এক্স (টুইটার) ও টেসলার ডেটা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। এই মডেল কোনো একক পণ্য বিক্রির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। যদিও অনেকে একে সামন্তবাদের আক্ষরিক পুনরাবৃত্তি না বলে পুঁজিবাদেরই আরও আগ্রাসী ও কেন্দ্রীভূত রূপ মনে করেন, তবুও এই ধারায় ধনকুবেরদের সম্পদের পাহাড় গড়া এবং বৈশ্বিক সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি দূর করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুরে ব্যবহৃত থার্ড-জেনারেশন প্রযুক্তির কারণে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এর নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান জানান, রূপপুরে অত্যাধুনিক Generation-III+ VVER-1200 প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা অতীতের সব পারমাণবিক দুর্ঘটনার শিক্ষা থেকে তৈরি। কেন্দ্রটিতে কোর ক্যাচার, প্যাসিভ হিট রিমুভাল সিস্টেম এবং ডাবল কন্টেইনমেন্টের মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম। কমিশনিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত কঠোর একটি শিল্পপ্রক্রিয়া, যা তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), আইএইএ (IAEA) এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো ধরনের কারিগরি দুর্বলতা নয়, বরং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রতিটি পরীক্ষা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তাই প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অপরাধ দমনে পুলিশ কর্মকর্তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। বৃহস্পতিবার রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে ৪২তম ক্যাডেট এসআই ব্যাচের সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে তিনি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর বিশেষ জোর দেন। সাইবার অপরাধসহ আধুনিক ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিয়ত নিজেদের আপডেট থাকারও কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। এবারের সমাপনী কুচকাওয়াজে ১৯ জন নারীসহ মোট ৫০০ জন শিক্ষানবিশ ক্যাডেট এসআই অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আইজিপি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী পাঁচ প্রশিক্ষণার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন এবং পুলিশ সদস্যদের সততা ও নিষ্ঠার সাথে জনগণের সেবায় কাজ করার আহ্বান জানান। আইজিপি উল্লেখ করেন, বর্তমানে সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবেলায় পুলিশের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনুষ্ঠানে পুলিশ একাডেমির অধ্যক্ষ ও অতিরিক্ত আইজিপি জিএম আজিজুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে এসব ক্যাডেটরা দুই বছরের মাঠ পর্যায়ের বাস্তব প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন ইউনিটে পদায়িত হবেন।
মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর আইনি লড়াইয়ের উত্তাপের মধ্যেই বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) স্মার্টফোন বাজারে আনার ঘোষণা দিল চীন। সোমবার সাংহাইতে আয়োজিত এক ইভেন্টে 'স্টেপফান' নামের একটি স্টার্টআপ তাদের নতুন ‘স্টেপএক্স নিও’ ফোনটি সবার সামনে নিয়ে এসেছে। নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘স্টেপ এওএস’ এবং ‘স্টেপ আমু’ এআই এজেন্টের সমন্বয়ে তৈরি এই ফোনটি ব্যবহারকারীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ পরিচালনা করতে সক্ষম। মাইক্রোসফটের প্রাক্তন কর্মীদের তৈরি এই এআই স্টার্টআপের দাবি, সাধারণ স্মার্টফোনের মতো এই ফোনে আলাদা করে অ্যাপ খোলার প্রয়োজন নেই। ‘স্টেপ আমু’ নামের এআই এজেন্টটি ভয়েস বা সাধারণ টেক্সট কমান্ডের মাধ্যমেই আর্থিক লেনদেন, ভ্রমণ ও অন্যান্য জটিল কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করতে পারে। ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াও কাজ করতে সক্ষম এই এআই মডেলটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের ভিত্তিতে তৈরি। বর্তমানে মার্কিন প্রযুক্তি বাজারে যখন অ্যাপল ও ওপেনএআই-এর মতো কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক গোপনীয়তা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন চীনের এই সাফল্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই স্মার্টফোনের দাম বা বাজারে আসার নির্দিষ্ট দিনক্ষণ নিয়ে এখনো কোনো ঘোষণা দেয়নি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্টেপফান।
চীনে নিজস্ব এআই সেবা চালুর লক্ষ্যে আলিবাবা ও বাইদুর প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল। এই ঘোষণার পরপরই হংকংয়ের শেয়ারবাজারে দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাক ডিভাইসে এখন থেকে এই দুই প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে। চীনের সাইবারস্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্প্রতি অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সসহ সাতটি এআই সেবা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। এই চুক্তির আওতায় আলিবাবার ‘কিউয়েন এআই’ মডেল ব্যবহার করে ব্যবহারকারীরা ছবি ও টেক্সট প্রক্রিয়াজাত করার উন্নত সুবিধা পাবেন। অন্যদিকে, বাইদু আইফোন ডিভাইসের জন্য অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স ফিচার তৈরিতে কাজ করবে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যে এই অংশীদারিত্ব অ্যাপলের জন্য চীনের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (জেএটিআই) আয়োজিত ২২তম ওরিয়েন্টেশন কোর্সের জন্য ৪০ জন বিচারককে মনোনয়ন দিয়েছে আইন ও বিচার বিভাগ। রবিবার আইন মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ অধিশাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আগামী ১১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার জেএটিআই কেন্দ্রে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে মনোনীত বিচারকদের তালিকায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন। এছাড়া আইন বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর, আনসার ও ভিডিপি এবং কাস্টমস ট্রাইব্যুনালে কর্মরত বিচারিক কর্মকর্তারাও এই কোর্সে অংশ নেবেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন অংশগ্রহণকারীরা নিয়ম অনুযায়ী টিএ (ভ্রমণ ভাতা) ও ডিএ (দৈনিক ভাতা) পাবেন। মনোনীত বিচারকদের কোর্সে যোগ দেওয়ার আগে জেএটিআই-এর ওয়েবসাইট থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে নতুন আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ বিষয়ক এক জাতীয় অবহিতকরণ সভায় তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে পুলিশ, বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধীদের পরিবর্তনশীল কৌশলের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। সদ্য প্রণীত এই আইনটি মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোয় নতুন আইনটিকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে সরকার। সভায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে আইনটির বিধান ও প্রয়োগের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মন্তব্য করেছেন যে, এক টাকায় বিচার বিভাগ পরিচালনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সংসদে বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাই করে এক টাকা করার প্রস্তাবের জবাবে তিনি এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিচার বিভাগ অচল হয়ে দেশ একসময় পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মঞ্জুরির দাবি পেশ করেন আইনমন্ত্রী। এর বিপরীতে বিরোধী দলীয় সদস্যরা বিচার বিভাগের সংকট, মামলাজট এবং বাজেট স্বল্পতার কথা তুলে ধরে বরাদ্দ এক টাকা করার ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন। সভায় বিরোধী দলীয় কয়েকজন সংসদ সদস্য বিচারক সংকট এবং জিডিপিতে বিচার বিভাগের নামমাত্র বরাদ্দ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। সংসদ সদস্যদের এসব বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো স্ববিরোধী এবং কার্যপ্রণালি বিধির পরিপন্থি। তিনি বলেন, এক টাকা বরাদ্দ দিয়ে বিচার বিভাগ চালানোর কোনো বিকল্প প্রস্তাব সংসদ সদস্যরা দিতে পারেননি। সংসদ সদস্যদের দাবিকে ‘জনপ্রিয় কিন্তু ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী জানান, বর্তমান বাস্তবতায় এই বাজেট বিচার বিভাগের জন্য অপ্রতুল হলেও, তা মেনে নেওয়া ছাড়া আপাতত বিকল্প নেই। এরপর ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ করে মূল বরাদ্দ অনুমোদনের আহ্বান জানান তিনি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আজ জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট পেশ করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালন খাতে ১ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮৬ লাখ এবং উন্নয়ন খাতে ১৮৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো 'ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ'। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আইন বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৫৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা এবার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়াতে নতুন কার্ড প্রবর্তনের ঘোষণাও এসেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বিভাগে ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করেছেন। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই বরাদ্দ প্রায় ২৮ কোটি টাকা বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন খাতে ১ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ১৮৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আগে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বিভাগে ২ হাজার ১৫৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম এই বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রণীত এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদন শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। যথাযথ প্রস্তুতি এবং নথিপত্রের অভাবে মূলত এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবেদনের আগে কিছু সাধারণ ভুল সম্পর্কে সচেতন থাকলে ভিসা রিজেকশনের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। স্টুডেন্ট ভিসা বাতিলের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অসম্পূর্ণ নথিপত্র জমা দেওয়া, আবেদনপত্রে ভুল তথ্য প্রদান এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হওয়া। এছাড়া ভিসা সাক্ষাৎকারে আত্মবিশ্বাসের অভাব, দুর্বল একাডেমিক ফলাফল, শিক্ষা বা কর্মজীবনের দীর্ঘ বিরতির যৌক্তিক ব্যাখ্যা না থাকা, অসংগতিপূর্ণ কোর্স নির্বাচন এবং ভাষার দক্ষতার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারাও ভিসা বাতিলের বড় কারণ। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, আবেদনের আগে সব কাগজপত্র সঠিকভাবে যাচাই করা, সঠিক তথ্য প্রদান এবং সাক্ষাৎকারের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, পেশাগত সুযোগ কিংবা অভিবাসনের জন্য ইংরেজি ভাষার দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে আইইএলটিএস (IELTS) পরীক্ষা অপরিহার্য। বিশ্বের অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এই পরীক্ষার ফলকে মূল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে। তাই সঠিক পরিকল্পনা ও পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমেই কেবল পরীক্ষায় কাঙ্ক্ষিত স্কোর অর্জন করা সম্ভব। আইইএলটিএস মূলত একাডেমিক ও জেনারেল ট্রেনিং—এই দুই মডিউলে অনুষ্ঠিত হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য একাডেমিক এবং অভিবাসন বা চাকরির জন্য জেনারেল ট্রেনিং মডিউল বেছে নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আইডিপি এডুকেশনের মাধ্যমে অনলাইনে সহজেই রেজিস্ট্রেশন করা যায়। কম্পিউটার বা কাগজভিত্তিক—দুই পদ্ধতিতেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও, দ্রুত ফলের জন্য কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা বেছে নেওয়া সুবিধাজনক। পরীক্ষার চারটি অংশ—লিসেনিং, রিডিং, রাইটিং এবং স্পিকিং—মূলত ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা ও সময় ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়। ভালো স্কোরের জন্য নিয়মিত ইংরেজি সংবাদপত্র ও পডকাস্ট শোনার পাশাপাশি শব্দভাণ্ডার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এছাড়া পরীক্ষার আগে পূর্ণাঙ্গ মক টেস্ট দিলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হয়। মনে রাখবেন, শুধুমাত্র ব্যাকরণ জানলেই ভালো স্কোর নিশ্চিত করা যায় না, বরং প্রতিদিনের অনুশীলনই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদনের ক্ষেত্রে চাকরির অভিজ্ঞতা থাকা বা না থাকা নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই দ্বিধায় থাকেন। আসলে কেবল কর্মজীবনের মেয়াদের চেয়ে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যের সঙ্গে অর্জিত অভিজ্ঞতার প্রাসঙ্গিকতা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক কৌশলে কাজের অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করতে পারলে তা আবেদনের মান অনেকাংশে বাড়িয়ে দিতে পারে। অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘ সময় কাজ করলেই ভর্তির সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। কর্মক্ষেত্রে আপনি কী শিখেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতা কেন আপনাকে পুনরায় পড়াশোনায় ফিরতে উৎসাহিত করছে, তা ‘স্টেটমেন্ট অব পারপাস’ (SOP)-এ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। এমবিএ বা পাবলিক পলিসির মতো পেশাভিত্তিক ডিগ্রিতে পেশাগত অভিজ্ঞতার গুরুত্ব বেশি থাকলেও, গবেষণাভিত্তিক প্রোগ্রামে একাডেমিক সক্ষমতা ও গবেষণার আগ্রহকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। চাকরির কারণে পড়াশোনায় দীর্ঘ বিরতি থাকলে ভয়ের কিছু নেই; বরং এই সময়ে অর্জিত দক্ষতা ও পেশাগত পরিবর্তন স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করলে আবেদনটি শক্তিশালী হয়। এছাড়া সুপারিশপত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রোগ্রামের ধরন অনুযায়ী একাডেমিক শিক্ষক অথবা কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে তা সংগ্রহ করা উচিত। মনে রাখতে হবে, সিভিতে কাজের দীর্ঘ তালিকা না দিয়ে কেবল প্রাসঙ্গিক দায়িত্ব ও অর্জনগুলো উল্লেখ করাই বেশি কার্যকর।
বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য চট্টগ্রামে ‘গ্লোবাল এডুকেশন এক্সপো’ আয়োজন করতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পিএফইসি গ্লোবাল। আগামী ৪ আগস্ট সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নগরের রেডিসন ব্লু হোটেলে এই মেলা অনুষ্ঠিত হবে। এতে বিশ্বের জনপ্রিয় কয়েকটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও ভিসা প্রক্রিয়ার বিষয়ে সরাসরি পরামর্শ দেবেন। এক্সপোতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, আয়ারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে ভর্তি প্রক্রিয়া, বিষয় নির্বাচন, টিউশন ফি, বৃত্তির সুযোগ ও পড়াশোনা শেষে কাজের সম্ভাবনা নিয়ে সরাসরি আলোচনার সুযোগ পাবেন। অনুষ্ঠানে তাৎক্ষণিক ভর্তির আবেদন করলে শিক্ষার্থীদের জন্য থাকছে পাওয়ার ব্যাংক, আইইএলটিএস ও পিটিই কোর্সে ৫০ শতাংশ ছাড় এবং ভিসা প্রাপ্তদের জন্য অ্যাকশন ক্যামেরাসহ বিশেষ উপহার। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা পিএফইসি গ্লোবালের ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া জানতে পারবেন।
নিউজিল্যান্ডের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াইকাটো’ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ভাইস চ্যান্সেলরস ইন্টারন্যাশনাল এক্সেলেন্স স্কলারশিপ’ দিচ্ছে। এই বৃত্তির আওতায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার নিউজিল্যান্ড ডলার পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন। বাংলাদেশসহ যেকোনো দেশের শিক্ষার্থীরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য এই স্কলারশিপে আবেদন করতে পারবেন। হ্যামিল্টন ও তৌরাঙ্গা শহরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা, ব্যবসা, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। বৃত্তি পাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে একাডেমিক ফলাফলের প্রমাণ দিতে হবে এবং প্রথম বছরের টিউশন ফি পরিশোধের সক্ষমতা থাকতে হবে। তবে স্পনসরশিপের মাধ্যমে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা এই স্কলারশিপের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে পাসপোর্ট কপি, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, এসওপি (স্টেটমেন্ট অব পারপাস) এবং ইংরেজি ভাষার দক্ষতার সনদ। ভর্তি আবেদনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পোর্টাল থেকে স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ট্রাইমেস্টার অনুযায়ী আবেদনের সময়সীমা যথাক্রমে নভেম্বর, মে, আগস্ট এবং অক্টোবর মাসে নির্ধারিত রয়েছে। বিস্তারিত তথ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এটি কঠোর স্বাস্থ্যবিধি। ভিসা ও অ্যাডমিশনের মতো স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, কারণ সঠিক টিকাদান কর্মসূচির প্রমাণ ছাড়া ভর্তি প্রক্রিয়া ও কোর্স রেজিস্ট্রেশনে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এই টিকাগুলোর মূল লক্ষ্য হলো ক্যাম্পাসে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলা এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো। যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু নির্দিষ্ট টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে হাম, মাম্পস ও রুবেলার জন্য ‘এমএমআর’ টিকা, টিটেনাস ও ডিফথেরিয়ার জন্য ‘টিড্যাপ’ বুস্টার এবং চিকেনপক্স ও মেনিনগোকক্কাল টিকা অন্যতম। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ডরমিটরিতে বসবাসের ক্ষেত্রে মেনিনগোকক্কাল টিকা অপরিহার্য। এছাড়া শীতকালে ফ্লুর প্রকোপ এড়াতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দেয়। টিকা নেওয়া শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এর নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্টেশন সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। যেসব শিক্ষার্থীর আগের টিকাদান কার্ড বা স্বাস্থ্য রেকর্ড হারিয়ে গেছে, তাদের নতুন করে টিকা নেওয়া বা অ্যান্টিবডি টেস্টের পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সেন্টার বা হোস্টেল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার জন্য টিকার নাম, ডোজের সংখ্যা ও তারিখ উল্লেখ করে ডিজিটাল কপি বা পিডিএফ ফাইল তৈরি করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। ভিসার প্রস্তুতির মতোই স্বাস্থ্য সুরক্ষার নথিপত্র আগেভাগে গুছিয়ে রাখলে পরবর্তী সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি থেকে বাঁচা সম্ভব।
ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতার শর্ত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১ আগস্ট থেকে রেসিডেন্স পারমিট পাওয়া বা নবায়নের জন্য প্রতি মাসে অন্তত ৮৭৭ দশমিক ৫০ ইউরো আয়ের প্রমাণ দেখাতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য এই নিয়ম ছাড়াও বাড়তি টিউশন ফি ও আবাসন সহায়তা বাতিলের মতো কঠিন শর্ত আরোপ করেছে ফরাসি সরকার। আগে এই আর্থিক শর্ত ছিল ৬১৫ ইউরো, যা ২০০২ সালের পর এই প্রথম বাড়ানো হলো। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ন্যূনতম মজুরি (স্মিক) বাড়লে এই আর্থিক সীমার পরিমাণও স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করা হবে। এছাড়া ‘চুজ ফ্রান্স ফর হায়ার এডুকেশন’ পরিকল্পনার আওতায় অ-ইউরোপীয় শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়ানোর পাশাপাশি ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সরকারি বৃত্তিহীন শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা (এপিএল) বাতিল করা হয়েছে। সরকারি এসব সিদ্ধান্তের লক্ষ্য উচ্চশিক্ষার মান ও আর্থিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা হলেও, ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
তুরস্কে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন পূরণ করতে এখন আর আইইএলটিএস (IELTS) স্কোর নিয়ে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। দেশটির তিনটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে আইইএলটিএস ছাড়াই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে। একাডেমিক দক্ষতা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা সহজেই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তুরস্কের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারেন। বর্তমানে তুরস্ক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে, যেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি মিলছে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ডিগ্রি ও বৃত্তির সুবিধা। আইইএলটিএস ছাড়াই ভর্তির সুযোগ থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো: ১. বিলকেন্ট ইউনিভার্সিটি: আঙ্কারায় অবস্থিত এই অলাভজনক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য পরিচিত। মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য এখানে টিউশন ফি মওকুফসহ মাসিক উপবৃত্তি ও আবাসন সুবিধার সুযোগ রয়েছে। ২. বাহচেশেহির ইউনিভার্সিটি: ইস্তাম্বুলে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রকৌশল, মেডিসিন, আইন ও ব্যবসায় প্রশাসনের মতো শতাধিক বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। ৩. ইস্তাম্বুল মেডিপোল ইউনিভার্সিটি: স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যার জন্য পরিচিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাপক বৃত্তি প্রদান করে। নিজস্ব ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র থাকায় শিক্ষার্থীদের ইংরেজি দক্ষতা অর্জনেও এটি বেশ সহায়ক। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অবশ্যই প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া, ফি ও যোগ্যতার শর্তাবলি ভালোভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে আবেদন করলে ভর্তির সম্ভাবনা অনেকাংশেই বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিদেশি সাংবাদিকদের ভিসার মেয়াদ সীমিত করার নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন থেকে শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ চার বছর এবং বিদেশি সাংবাদিকরা সর্বোচ্চ ২৪০ দিন দেশটিতে বৈধভাবে অবস্থান করতে পারবেন। রেকর্ড সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থীর আগমন ও দীর্ঘমেয়াদী অবস্থানের ওপর নজরদারি বাড়াতে এই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের 'এফ' ভিসা, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির 'জে' ভিসা এবং বিদেশি সাংবাদিকদের 'আই' ভিসার ওপর নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ ২৪০ দিন এবং চীনের নাগরিকদের ক্ষেত্রে মাত্র ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্যমতে, বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিকের ওপর নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ায় এবং মেয়াদের চেয়ে বেশি সময় ধরে অবস্থান ঠেকানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদের পর অবস্থান করতে চাইলে এখন থেকে ট্রাভেল পারমিট নিয়ে নিজ দেশে ফিরে পুনরায় ভিসার আবেদন করতে হবে, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।