কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। এখন কর্তব্য অবহেলাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া বা তার পক্ষে সাফাই গেয়ে তাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে সেটি নেহাতই অপপ্রয়াস। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের সামনে দাঁড়ানো সেই আয়না, যা আমাদের সিস্টেমের নগ্নতাকে রূঢ়ভাবে প্রকাশ করে। এ সত্যের দর্পণে আমরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসার মান, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও দেখতে পাই।
সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর এক নামি-দামি হাসপাতালে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের করুণ মৃত্যু চিকিৎসাব্যবস্থায় কথিত অবহেলা নিয়ে জনমনে আবারও একটি ভয়ংকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের এই তথাকথিত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটুকু নিরাপদ?
আভানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুরোনো শঙ্কাকে নতুন করে সামনে আনলেও এর সিলসিলা বহুকাল ধরে জারি রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর প্রসবব্যবস্থা, শিশুর অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং এ সম্পর্কে উদাসীনতা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। সিস্টেমের নগ্ন মারপ্যাঁচের খেসারত ইতোমধ্যে হামের মহামারির মধ্য দিয়ে দেশের অগণিত শিশু জীবন দিয়ে চুকিয়েছে। সেই রেশ মিটতে না মিটতেই আভানের ঘটনা জনমনে ভয়ংকর ধাক্কা দিয়েছে।
শিশুটির পরিবারের পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রয়োগে গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার নেগেটিভ ফল আসার পরও কেন শিশুটিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হলো, কেন তার শারীরিক অবস্থার প্রকৃত হালচাল পরিবারের কাছে গোপন করা হলো, এসব প্রশ্ন কেবল আভানের পরিবার নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারকেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া, মনে আতঙ্কের ঢেউ।
আভানের মৃত্যুর নেপথ্যে আসল কোন সত্য লুকিয়ে আছে, চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল কি না, শিশুটিকে দেয়া চিকিৎসা সিদ্ধান্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, এসবের জবাব কেবল সঠিক তদন্তেই উদঘাটন সম্ভব। তাই অভিযোগ সত্য ধরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও অন্যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য উদঘাটনের অধিকার। আর এই অধিকার জনগণের। জনগণের এই যৌক্তিক দাবিকে মাথা পেতে নিয়ে সঠিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করাই একটি দক্ষ রাষ্ট্র প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
একজন রোগীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারের প্রথম স্বাভাবিক কৌতূহল হবে, ‘কেন?’ অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ‘কেন’র জবাব খুঁজে পাওয়ার পথ মোটেও স্বচ্ছ ও সরল নয়, বরং অস্বচ্ছতায় ভরা এক প্যাঁচালো গোলকধাঁধা। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, হাসপাতালের আইসিইউসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যক্তিদের মুনাফালিপ্সার মতো অভিযোগও আলোচনায় আসে।
প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক, চিকিৎসা কি কেবল সেবা, নাকি অধিকার? বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৬.৫, যা ২০২৪ সালে হ্রাস পেয়ে ৩০.৫ এ দাঁড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এই অগ্রগতি একই সঙ্গে আমাদের সামনে নতুন দায়িত্বের ভিত তৈরি করেছে। শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারা যদি প্রথম সাফল্য হয়, তবে তার পরের সাফল্য হবে নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে প্রায় ২২। অর্থাৎ শিশুমৃত্যু কমলেও ঝুঁকি আজও রয়ে গেছে। তবে এই ঝুঁকি কেবল রোগের নয়, ব্যবস্থারও। ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অদক্ষতা, ওষুধের ভুল প্রয়োগ, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবারের কাছে গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক মানের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
স্বাস্থ্যসেবা বলতে কেবল হাসপাতাল তৈরি করে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরে তোলাকে বোঝায় না। কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল বিষয় হলো সঠিক রোগ নির্ণয়, দক্ষ জনবল, যথাযথ চিকিৎসা প্রোটোকল, পর্যবেক্ষণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভুল হলে তার সঠিক জবাবদিহি।
চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানও আমাদের দেশের অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। ২০২৫ সালের ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫৪/১০০ এবং প্রায় ৪১.৭ শতাংশ মানুষ নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর আরেকটি বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রকাশনায় দেখা যায়, দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজেকেই বহন করতে হয়।
অতএব, মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সময় কেবল অসুস্থতার ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকির এক অদৃশ্য মানসিক বোঝাও বহন করে। একটি শিশুর চিকিৎসা ব্যর্থ হলে পরিবার কেবল সন্তানকে হারায় না, অনেক পরিবার একই সঙ্গে হারায় সঞ্চয়, ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়, এমনকি জীবনের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর্থিক বিনিময়ে যে চিকিৎসাসেবা আমরা পাই, তার সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, আস্থা ও মৌলিক অধিকার।
পৃথিবীর কোনো দেশেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে গরমিল একেবারেই নেই, এমন নয়। একজন চিকিৎসকও রক্তমাংসে গড়া মানুষ। রোগ নির্ণয়ে জটিলতা থাকতেই পারে। চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাও বলে, চিকিৎসাজনিত জটিলতা ও অবহেলা এক নয়। সুতরাং এগুলোকে ‘লেজে গোবরে মেখে’ এক করে দেখার সুযোগ নেই।
কোনো রোগী মারা গেলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসককে দায়ী করাও ভুল, আবার ভুল চিকিৎসা বা কর্তব্য অবহেলার অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও অগ্রহণযোগ্য। এই ধোঁয়াশা দূর করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো।
২০২৬ সালের প্রকাশিত এক আইনবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে রোগীর পরিবারের কাছে তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চিকিৎসাজনিত অ্যাডভার্স ইভেন্ট প্রকাশের জন্য বর্তমানে সুস্পষ্ট স্ট্যাটুটরি ডিউটি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।
এখানেই এখন বিশেষভাবে ভাবতে হবে। রোগীর স্বজন তাদের সন্তান বা স্বজনের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে তার সঠিক জবাব পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ‘এটা জটিলতা ছিল’ অথবা ‘আমরা সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী করেছি’ বলে দায়সারা জবাব দিয়ে দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
রোগীর পরিবারের সংশয় কাটাতে চিকিৎসার নথি, ওষুধের তালিকা, পরীক্ষার ফল, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা ও নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক অভিযোগ দাখিল করার পর কতটা সহজে, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিকার পাবেন?
শুধু অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়। গুরুতর চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নথি সংরক্ষণ এবং পরিবারের কাছে তা প্রদানের নিশ্চয়তা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, হাসপাতাল ও চিকিৎসকের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ, অবহেলা প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি মানে চিকিৎসকদের ভয় দেখানো নয়, বরং ভুলের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসার পরিবেশ তৈরি করা।
আমাদের মাঝে সামাজিক স্মৃতির এক অদ্ভুত সমস্যা বিরাজমান। একটি শিশু মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম নেয় ক্ষোভ। মানুষ বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। কয়েক দিন কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়। অতঃপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে ভুলিয়ে দেয়। হিসাবের খাতায় যোগ হয় কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু ওই সংখ্যার নেপথ্যে থাকে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।
আভান হয়তো কোনো পরিসংখ্যানের একটি অংশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরিবারের কাছে সে নিছক কোনো সংখ্যা নয়। সে ছিল একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী। এই আবেগটাকেই রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। হতে হবে সংবেদনশীল।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য বলতে কয়টি হাসপাতাল মাথা তুলেছে, কতটি অত্যাধুনিক আইসিইউ আছে, কতজন দক্ষ চিকিৎসক আছেন, শুধু তা দিয়ে সাফল্য বিচার করলে গোটা গণিতটাই ভুল হবে। এই সাফল্য পরিমাপ করতে হবে একজন সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা অকপটে বলতে পারছেন কি না এবং সত্য জানতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে কি না, তার ওপর।
একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে রোগীকে শুধু রোগী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হয়। আমরা চাইব, আভানের মৃত্যুর এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায় দ্রুত নির্ধারিত হোক। অভিযোগে অসততা থাকলে সেটিও সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠুক। তবে কোনো অবস্থাতেই সত্যকে যেন আরেকটি শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কবরের আঁধারে দাফন হতে না হয়। কারণ, আজকের প্রশ্নটি শুধু আভানের জন্য নয়, আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্য।
‘হাসপাতালের ফটক পেরুলে একজন নাগরিক কি কেবলই চিকিৎসাটুকুই পাবেন, নাকি তার সঙ্গে নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারেরও ন্যায্য ভাগীদার হবেন?’ এ প্রশ্নের জবাব না মিললে অঢেল উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার মাঝেও প্রশ্নটি আমাদের উত্ত্যক্ত করেই চলবে, ‘আমরা কি তবে সব সময়ই শেষ অবধি কেবল হিসাবের খাতার এক মামুলি সংখ্যাই রয়ে যাব?’
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
কুড়িগ্রামের মানুষ হিসেবে আমাদের কাছে সংকট কোনো নতুন শব্দ নয়। নদীভাঙন, বন্যা, দারিদ্র্য কিংবা কর্মসংস্থানের অভাব—এসবের সঙ্গে এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই করে আসছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংকটের ধরনও বদলেছে। এখন কৃষকের দুশ্চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সার পাওয়ার অনিশ্চয়তা, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম, তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকের বিস্তার এবং শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। প্রশ্ন হলো এত সংকটের মধ্যেও কুড়িগ্রামের মানুষের প্রত্যাশার জায়গাটি কোথায়? সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সারের সংকট। আমন মৌসুমে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাটেও সারের দাবিতে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করেছিলেন। কোথাও কৃষকেরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। এখানে বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখা দরকার। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জেলায় সারের বরাদ্দ ও সরবরাহ রয়েছে এবং অতিরিক্ত চাহিদা, বিতরণব্যবস্থা ও আস্থার সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। আবার কৃষকের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রয়োজনের মুহূর্তে ডিলারের কাছে গিয়ে তাঁরা সার পাচ্ছেন না। অর্থাৎ কাগজে বরাদ্দ থাকলেই হবে না; সঠিক সময়ে, সঠিক কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোই মূল কথা। একজন কৃষকের কাছে কয়েক দিন দেরিতে পাওয়া সারও অনেক সময় কার্যত না পাওয়ার সমান। কারণ, কৃষির মৌসুম অপেক্ষা করে না। ধান বা সবজির প্রয়োজনীয় সময় চলে গেলে পরে পাওয়া সার দিয়ে সেই ক্ষতি সব সময় পূরণ করা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। অক্টোবরেও এসব দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। কুড়িগ্রামের মতো কৃষিনির্ভর জেলায় এর প্রভাব শুধু পাম্পের তেলের দাম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না। জমি চাষ, সেচ, ফসল পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়ে। কৃষককে তখন একদিকে সার ও অন্যান্য উপকরণের খরচ সামলাতে হয়, অন্যদিকে উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে বাড়তি পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ কোথায় গিয়ে পড়ে? কৃষক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ভোক্তা—সবাই তার অংশ বহন করে। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সম্ভবত কুড়িগ্রামের তরুণ সমাজ। আমাদের জেলার বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম। কিন্তু তাদের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। ফলে অনেকেই কাজের সন্ধানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে চলে যায়। কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট যে দীর্ঘদিনের বাস্তবতা, বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে তার চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে, জেলায় দারিদ্র্যের হার ৭০.৮ শতাংশ। একজন তরুণ নিজের জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র গেলে সেটিকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। অনেকের জন্য এটি প্রয়োজনের সিদ্ধান্ত। নিজের এলাকায় যদি একটি সম্মানজনক চাকরি, ব্যবসার সুযোগ কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়, তাহলে কেন একজন তরুণ পরিবার ছেড়ে হাজার কিলোমিটার দূরে যেতে চাইবে? আর কর্মসংস্থানের অভাবের সঙ্গে যখন হতাশা যুক্ত হয়, তখন আরেকটি বিপদ সামনে আসে—মাদক ও বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ড। কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ গাঁজা, ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক জব্দ হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও ফুলবাড়ী সীমান্তে মাদক জব্দের খবর এসেছে। একই মাসে ফুলবাড়ীতে ট্যাপেন্টাডলসহ দুজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলার দৃষ্টিতে বিষয়টি দেখলে চলবে না। একজন তরুণ কেন মাদকের দিকে যাচ্ছে, সেটিও আমাদের ভাবতে হবে। পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, বেকারত্ব, হতাশা—সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। মাদক ঠেকাতে আইন প্রয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু অভিযান দিয়ে একটি প্রজন্মকে রক্ষা করা যাবে না। তাদের সামনে বিকল্প জীবন তৈরি করতে হবে। খেলাধুলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান—এসবও মাদকবিরোধী লড়াইয়ের অংশ হওয়া উচিত। আরেকটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে ভাবায়—শিক্ষা। একটি জেলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণিকক্ষে। কিন্তু কুড়িগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকটের খবর নতুন নয়। রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে ৬০টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৮ জন—৩২টি পদ শূন্য। এতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর পাঠদান ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে। প্রাথমিক পর্যায়েও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের আগস্টের এক প্রতিবেদনে কুড়িগ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৩৬৬টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। আমরা যদি তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে চাই, কর্মসংস্থানের জন্য দক্ষ করে তুলতে চাই, তাহলে প্রথমেই তাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকবিহীন বা শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়-কলেজ দিয়ে দক্ষ প্রজন্ম তৈরি করা কঠিন। এর সঙ্গে রয়েছে নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের পুরোনো চক্র। নদীভাঙনে মানুষ জমি হারায়, বসতভিটা হারায়, কখনো জীবিকার শেষ অবলম্বনটুকুও হারায়। তারপর নতুন জায়গায় গিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। এই বাস্তুচ্যুতি শুধু একটি পরিবারের বর্তমানকে নয়, সন্তানের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করে। তাই কুড়িগ্রামের সংকটকে আলাদা আলাদা বাক্সে রেখে দেখলে হবে না। কৃষকের সারসংকট, জ্বালানির বাড়তি খরচ, কর্মসংস্থানের অভাব, মাদকের বিস্তার, শিক্ষার দুর্বলতা এবং নদীভাঙন—সবগুলো একে অন্যের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। সমাধানও তাই হতে হবে সমন্বিতভাবে। প্রথমত, কৃষকের কাছে প্রয়োজনের সময় সারের স্বচ্ছ ও কার্যকর বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ কোথায় যাচ্ছে, কারা পাচ্ছে এবং কৃষক কেন লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাচ্ছেন না—এসব প্রশ্নের জবাবদিহি থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, কুড়িগ্রামে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলতে হবে। শুধু ধান বা সবজি উৎপাদন করলেই হবে না; সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে। তৃতীয়ত, তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। সব তরুণ সরকারি চাকরি করবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং কৃষিভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। চতুর্থত, মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে শুধু অভিযাননির্ভর না করে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের নিজেদেরও এতে যুক্ত করতে হবে। সবশেষে প্রয়োজন কুড়িগ্রামকে শুধু সমস্যার জেলা হিসেবে না দেখে সম্ভাবনার জেলা হিসেবে দেখা।কুড়িগ্রামের কৃষি আছে, নদী আছে, সীমান্তবাণিজ্যের সম্ভাবনা আছে, বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। সবচেয়ে বড় কথা—এই জেলার মানুষ পরিশ্রম করতে জানে। প্রয়োজন শুধু সেই পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। আমরা কুড়িগ্রামবাসী করুণা চাই না। আমরা চাই সমান সুযোগ। কৃষক যেন প্রয়োজনের সময় সার পান, শ্রমিক যেন কাজ পান, তরুণ যেন নিজের এলাকায় ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন, শিক্ষার্থী যেন শিক্ষক সংকটে পিছিয়ে না পড়ে এবং কোনো পরিবার যেন মাদকের কারণে তার সন্তানকে হারানোর ভয় না পায়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যাশা। কুড়িগ্রামের মানুষ বহুদিন ধরে সংকটের সঙ্গে লড়াই করছে। এখন সময় শুধু সংকট গুনে যাওয়ার নয়; সংকটের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটার। কুড়িগ্রাম পিছিয়ে থাকার জেলা নয়। বরং সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং বিনিয়োগ পেলে এই জেলাই হতে পারে উত্তরের সম্ভাবনার অন্যতম কেন্দ্র। প্রশ্নটা তাই কুড়িগ্রাম কতটা পিছিয়ে—তা নয়। প্রশ্ন হলো, কুড়িগ্রামকে এগিয়ে নিতে আমরা এখন কতটা আন্তরিক?
লিবিয়ার সির্ত শহরের নিকটবর্তী এক কৃষক-বেদুইন পরিবারে ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। অন্য শিশুদের নিয়ে তিনিও তাঁর নিজ গ্রামে প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষালাভ করেন। সাবহার প্রিপারেটরি স্কুলে মাধ্যমিক শিক্ষা ও ইউনিভার্সিটি অব লিবিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি বেনগাজির সামরিক একাডেমিতে যোগদান করেন। সময়টি ছিল ১৯৬০-এর দশক, যখন রাজতান্ত্রিকভাবে লিবিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল রাজা ইদ্রিস আল-সেনুসি। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় আশির কাছাকাছি। শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি তুরস্কে অবস্থান করছিলেন। এ সময় রাষ্ট্রের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন ক্রাউন প্রিন্স হাসান আল-রিদা আল-মাহদি আস-সেনুসি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফি ও তাঁর কিছু সহযোগী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধমে রাজা ইদ্রিস আল-সেনুসিকে উৎখাত করেন। এর পেছনে কারণ ছিল গাদ্দাফি রাজতন্ত্রের ঘোরবিরোধী ছিলেন এবং ইদ্রিসের পশ্চিমাপন্থী নীতির বিরোধিতা করতেন। লিবিয়ায় তখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটি ছিল এবং আরব জাতীয়তাবাদী মহলে ইদ্রিস সরকারের পশ্চিমাপন্থী অবস্থান নিয়ে সমালোচনা ছিল। এদিকে গাদ্দাফি কোনো রকম প্রতিরোধ-রক্তপাত ব্যতিরেকেই ক্ষমতা দখল করেন এবং রাজতন্ত্র বিলুপ্তির ঘোষণা করে লিবিয়ান আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। ক্ষমতা দখলের পর তিনি আমেরিকান ও ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলোকে বিতাড়িত করেন এবং তেল সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করেন। রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন নির্মাণের মাধ্যমে সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। ইসলামি ও সমাজতান্ত্রিক ধারণার সমন্বয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের প্রচার করেন। এর অংশ হিসেবে মদ্যপান, নাইট ক্লাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং কিছু খ্রিস্টান গির্জা বন্ধ করে দেন। তিনি আরব দেশগুলোকে সমন্বিত শক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করেন। সাম্রাজ্যবাদ ও যায়নবাদ-বিরোধিতা এবং ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের কারণে পশ্চিমাদের সঙ্গে তাঁর বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৯৭০ সালে তিনি ইসরায়েলবিরোধী মুজাহিদদের অর্থায়নের জন্য ‘জিহাদ ফান্ড’ চালু করেন এবং প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করেন। এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি লিবিয়ার সমর্থন এবং পরবর্তী সময়ে কথিত সন্ত্রাসবাদে লিবিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ লিবিয়ার ওপর বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পশ্চিমা ও ন্যাটোর পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে লিবিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি বেনগাজিতে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তা বড় আকার ধারণ করে। বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্যে গঠন করা হয় National Transitional Council (NTC)। দুর্নীতি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও দীর্ঘ একনায়কতান্ত্রিক শাসনকে কারণ হিসেবে বিক্ষোভকারীরা উল্লেখ করে। গাদ্দাফির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়ন, গুলি ও হত্যাকাণ্ড চালান। এদিকে কাতার, ফ্রান্স, আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ এনটিসি ও গাদ্দাফিবিরোধী বাহিনীকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে এবং ন্যাটো বিমান হামলা পরিচালনা করে। ২০ অক্টোবর সকাল প্রায় সাড়ে আটটা বা সাড়ে নয়টার দিকে গাদ্দাফির অনুগতদের একটি বড় বহরে ন্যাটো বিমান হামলা চালায়। হামলার পর গাদ্দাফি ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী প্রাণে রক্ষা পান এবং তাঁরা একটি রাস্তার নিচের ড্রেনেজ পাইপের ভেতর আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে গাদ্দাফিবিরোধীরা তাঁকে খুঁজে পেতে সক্ষম হয় এবং তারা গাদ্দাফি ও তাঁর সহযোগীদের আটক করে। প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গাদ্দাফিকে জীবিত অবস্থায় আটক করার পর তাঁকে মারধর ও গুলিবর্ষণ করে। কিছুক্ষণ পর তিনি মারা যান। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গাদ্দাফির মরদেহ মিসরাতার একটি হিমায়িত সংরক্ষণাগারে প্রায় চার দিন জনসাধারণের দেখার জন্য রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মরুভূমির অজ্ঞাত স্থানে দাফন করা হয়। প্রায় নয় মাসের আন্দোলন, বিদ্রোহ ও পশ্চিমা হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে দীর্ঘ চার দশকের শাসনক্ষমতার। গাদ্দাফি তাঁর জীবদ্দশায় দেশ ও জাতির জন্য যে কর্মযজ্ঞ করেছেন, তা অবিস্মরণীয়। তাঁর সময়কার সামাজিক জীবনে যে স্থিতি ও শান্তি দেখা গিয়েছিল, গাদ্দাফি হত্যাকাণ্ডের পর দেড়-দশকেও তা দেখা যাওয়া তো দেখা যায়নি। ফলে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর দরিদ্রতা। পশ্চিমা ও জায়নবাদী চক্রান্তের ফাঁদে পড়ে তারা যে দুঃসাহস দেখিয়েছে, তার মাসুল আজ পর্যন্ত তারা দিচ্ছে।
শহর প্রতিদিন বড় হয়। উঁচু হয় দালান, বাড়ে গাড়ির সংখ্যা, বদলে যায় রাস্তার চেহারা। কিন্তু এই একই শহরের কোনো এক ফুটপাতের কোণে, ব্যস্ত কোনো সিগন্যালের পাশে কিংবা রেললাইনের ধারে থমকে থাকে কিছু ছোট্ট জীবন। তাদের হাতে বই নেই, কাঁধে স্কুলব্যাগ নেই, নেই নিরাপদ ঘরে ফেরার তাড়া। আছে শুধু দিন পার করার তাগিদ। তারা পথশিশু। নামের আগে কিংবা পরে পরিচয়ের যত শব্দই বসানো হোক, তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তারা এমন এক শৈশবের সন্তান, যে শৈশব তার স্বাভাবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। শৈশব মানেই হওয়ার কথা পরিবার, স্কুল,খেলাধুলা, বন্ধুত্ব, গল্প, স্বপ্ন আর নিশ্চিন্ত ঘুম। অথচ পথশিশুর কাছে শৈশবের অর্থ অনেক সময় একেবারেই ভিন্ন। সকাল শুরু হয় খাবারের সন্ধানে, দিন কাটে মানুষের দয়ার অপেক্ষায়, কখনো ভিক্ষায়, কখনো ছোটখাটো কাজে, কখনো রাস্তায় পড়ে থাকা কিছু কুড়িয়ে বিক্রি করে। রাত এলে ফুটপাত, স্টেশন কিংবা কোনো পরিত্যক্ত জায়গাই হয়ে ওঠে ঘর। যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা মা-বাবা, পরিবার ও বিদ্যালয়, সে বয়সেই কারও কারও পৃথিবী হয়ে ওঠে রাস্তা। এই রাস্তারও নিজস্ব নিয়ম আছে। এখানে নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়, আগামীকাল নিশ্চিত নয়, এমনকি পরের বেলার খাবারটুকুও নিশ্চিত নয়। রাত নামলে ফুটপাতের কোনো একটি কোণ হয়তো তার ঘুমানোর জায়গা। কিন্তু সেই ঘুমে নিশ্চিন্ততা থাকে না। কখন কে তাড়িয়ে দেবে, কখন কী বিপদ আসবে, সকালে উঠে খাবার জুটবে কি না — এসব প্রশ্নের উত্তর তার জানা থাকে না। তাই পথশিশুর জীবন যেন প্রতিদিন নতুন করে লেখা একটি অসমাপ্ত সমীকরণ। এই সমীকরণে অজানা রয়ে যায় খাবার, আশ্রয়, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ। হিসাব মেলাতে মেলাতে একসময় হয়তো শৈশবটাই হারিয়ে যায়। পথশিশু হওয়ার পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, বাবা-মায়ের অসহায়ত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব, গ্রাম থেকে শহরে এসে টিকে থাকার সংগ্রাম, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা অভিভাবকহীনতা, বিভিন্ন বাস্তবতা একটি শিশুকে ধীরে ধীরে পথের দিকে ঠেলে দেয়। কেউ পরিবারসহ রাস্তায় থাকে, কেউ পরিবারের জন্য উপার্জন করতে বের হয় আবার কেউ পরিবার থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি পথশিশুর গল্প আলাদা। কেউ হয়তো জানে না আগামীকাল কোথায় থাকবে, কেউ জানে না আজ রাতে খাবার পাবে কি না। শহরের ব্যস্ত মানুষ তাদের প্রতিদিন দেখে কিন্তু তাদের জীবনের গল্প খুব কম মানুষই জানতে চায়। সিগন্যালে লাল আলো জ্বলে উঠলেই শহরের ব্যস্ততার মাঝখানে কয়েকটি ছোট মুখ দেখা যায়। কেউ বোতলজাত পানি হাতে গাড়ির কাছে যায়, কেউ ফুলের মালা বা একগুচ্ছ ফুল এগিয়ে দেয়, কেউ বাদামের প্যাকেট বিক্রি করে, কেউ চকলেট কিংবা ছোটখাটো জিনিস নিয়ে দাঁড়ায়। আবার কোথাও কোথাও শিশুদের হাতে দেখা যায় সিগারেটের প্যাকেট ও পান, যা তারা গাড়ির জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বিক্রি করার চেষ্টা করে। কেউ পণ্য বিক্রি করে, কেউ হাত বাড়িয়ে টাকা চায়, কেউ আবার গাড়ির কাচ পরিষ্কার করে কয়েকটি টাকা পাওয়ার চেষ্টা করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের এই ছোট্ট ব্যবসা শেষ হয়ে যায়। আলো সবুজ হলে গাড়িগুলো ছুটে যায়, তারাও ছুটে যায় পরের গাড়ির দিকে। আমাদের কাছে হয়তো এটি রাস্তার স্বাভাবিক দৃশ্য কিন্তু শিশুটির কাছে এই কয়েক সেকেন্ডই তার দিনের আয়ের একটি অংশ। যে বয়সে তাকে স্কুলের টিফিনের টাকা নিয়ে ভাবার কথা সেই বয়সেই তাকে ভাবতে হয় কীভাবে আজকের খাবারের টাকা জোগাড় করবে। একটি শিশু যখন গাড়ির কাচে টোকা দিয়ে কিছু টাকা চায়, আমরা হয়তো বিরক্ত হই। কেউ মুখ ফিরিয়ে নিই, কেউ জানালা তুলে দিই, কেউ আবার সামান্য টাকা দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করি। কিন্তু খুব কম সময়ই আমরা ভাবি, শিশুটি এখানে কেন? তার আজ স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল কি না, গত রাতে সে কোথায় ঘুমিয়েছে, আজ সে কী খাবে, অথবা বড় হয়ে সে কী হতে চায় — এসব প্রশ্ন আমাদের ব্যস্ত জীবনে খুব কমই জায়গা পায়। আমরা পথশিশুকে দেখি কিন্তু তার জীবন দেখি না। তার হাতে থাকা ফুল দেখি কিন্তু ফুল বিক্রি করার প্রয়োজনটা দেখি না। তার বাড়ানো হাত দেখি কিন্তু কেন সেই হাতটি বইয়ের বদলে সাহায্যের জন্য বাড়ানো হয়েছে, সেই প্রশ্ন করি না। তার ময়লা জামা দেখি কিন্তু কেন সে সেই জামা পরে আছে, তা জানতে চাই না। এখানেই সমাজের অবহেলার সবচেয়ে কঠিন চিত্রটি দেখা যায়। সহানুভূতি হয়তো কয়েক মুহূর্তের জন্য আসে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের চিন্তা কতটা আসে? শিক্ষা থেকে দূরত্ব পথশিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি। বিদ্যালয়ের দরজা হয়তো তাদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ নয় কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ তাদের জন্য অনেক কঠিন। কারণ, ক্ষুধার সঙ্গে শিক্ষার প্রতিযোগিতায় ক্ষুধাই আগে জিতে যায়। যে শিশুর কাছে আজকের খাবার অনিশ্চিত, তার কাছে আগামী দিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি বিলাসিতার মতো মনে হতে পারে। তাই বইয়ের জায়গা নেয় কাজ, খেলার জায়গা নেয় দায়িত্ব, আর স্বপ্নের জায়গা দখল করে বেঁচে থাকার তাগিদ। একটি শিশু যখন পানি, ফুল, বাদাম, চকলেট কিংবা অন্য কোনো পণ্য বিক্রি করে দিনের বড় একটি সময় কাটায়, তখন তার পড়াশোনার জন্য সময় ও সুযোগ দুটোই সংকুচিত হয়ে আসে। একটি শিশুর হাতে যদি বইয়ের বদলে প্রতিদিন জীবিকার বোঝা তুলে দেওয়া হয়, তবে তার কাছ থেকে নিখুঁত ভবিষ্যৎ আশা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত? শিক্ষা ও নিরাপত্তা থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা শিশুর ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ছোটখাটো শ্রম, ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অনিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তারা এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করে, যেখানে ভুল মানুষ ও ভুল পথের প্রভাব সহজেই তাদের জীবনে ঢুকে যেতে পারে। এখানেই আসে আরেকটি আশঙ্কা, অপরাধের জগতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি। অপরাধী হয়ে কেউ জন্মায় না। কিন্তু একটি অনিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার অভাব, অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সমাজের দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা একটি শিশুকে অপরাধপ্রবণ পরিবেশের কাছে অসহায় করে তুলতে পারে। রাস্তায় থাকা শিশুরা কখনো কখনো মাদক, চুরি, ছিনতাই, পাচার কিংবা বিভিন্ন অপরাধচক্রের প্রলোভন ও শোষণের শিকার হতে পারে। প্রথমে হয়তো সামান্য কিছু কাজ, পরে নির্ভরতা, তারপর ধীরে ধীরে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, এভাবেই একটি শিশুর সামনে থাকা সম্ভাবনার দরজা একে একে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার, পথশিশু মানেই অপরাধী নয়। বরং অপরাধের ঝুঁকিতে থাকা একটি শিশুকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সমাজের নিজের দায়ের দিকে তাকানো প্রয়োজন। যে শিশুকে আমরা স্কুলে পৌঁছে দিতে পারিনি, নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারিনি, পরিবারকে সহায়তা করতে পারিনি, তার জীবনে ভুল মানুষের প্রবেশ ঠেকাতে পারিনি, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা কতটা দায়িত্বশীল ছিলাম, সেই প্রশ্নও আমাদের নিজেদের করতে হবে। পথশিশুদের নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক উদ্যোগ দেখা যায়। কেউ খাবার দেয়, কেউ পোশাক দেয়, কেউ একদিনের জন্য আনন্দের আয়োজন করে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যাটি কি সেখানে শেষ হয়ে যায়? একবেলার খাবার একটি দিনের ক্ষুধা কমাতে পারে, একটি নতুন জামা একটি দিনের আনন্দ দিতে পারে, কিন্তু একটি শিশুকে সত্যিকার অর্থে পথ থেকে বের করে আনতে প্রয়োজন আরও অনেক কিছু। প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, নিয়মিত শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি, মানসিক সহায়তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কারণ, ক্ষুধার্ত শিশুকে খাবার দেওয়া জরুরি কিন্তু কেন সে প্রতিদিন ক্ষুধার্ত থাকে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি। রাস্তায় ঘুমানো শিশুকে কম্বল দেওয়া মানবিক কিন্তু কেন তার ঘর নেই, সেই সমস্যার সমাধান আরও জরুরি। দয়া একটি দিনের কষ্ট কমাতে পারে কিন্তু সুযোগ পারে একটি জীবন বদলে দিতে। আমাদের শহরের ফুটপাতগুলো শুধু ইট-পাথরের জায়গা নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক বাস্তবতার আয়না। একদিকে কাচের ভবন, অন্যদিকে প্লাস্টিকের ছাউনির নিচে রাত কাটানো শিশু। একদিকে উন্নয়নের গতি, অন্যদিকে সেই উন্নয়নের বাইরে পড়ে থাকা শৈশব। এই বৈপরীত্য আমাদের সময়ের একটি কঠিন সত্য। তবে একটি পথশিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো শুধু দারিদ্র্য নয়, তার সবচেয়ে বড় সংকট হতে পারে সম্ভাবনার অপচয়। যে শিশুটি হয়তো ভালো শিক্ষক হতে পারত, চিকিৎসক হতে পারত, শিল্পী হতে পারত, কিংবা কেবল একজন সৎ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকারী মানুষ হতে পারত, তার সম্ভাবনা প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়। সমাজের চোখে সে হয়তো শুধু ফুটপাতের একটি শিশু, কিন্তু তার নিজের চোখে হয়তো এখনো একটি স্বপ্ন বেঁচে আছে। সেই স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু তার পরিবারের নয়, শুধু সরকারের নয়, শুধু কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনেরও নয়। এটি সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ, একটি শিশুর ঠিকানা শুধু একটি ঘর নয়। তার ঠিকানা হওয়া উচিত নিরাপত্তা, শিক্ষা, পরিবার, মর্যাদা এবং স্বপ্নের ভেতর।