Breaking news
উপসম্পাদকীয়

আন্তর্জাতিক যুব দিবস : তারুণ্যের শক্তি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা

শফিকুল ইসলাম খোকন
শফিকুল ইসলাম খোকন সাংবাদিক, কলাম লেখক ও গবেষক পাথরঘাটা, বরগুনা
আগস্ট ১২, ২০২৬ • 0

আমরা কথায় কথায় বলি ‘যুবরাই শক্তি’, ‘যৌবন যার, যুদ্ধে যাওয়ার সময় তার’। আবার এটাও বলে থাকি, ‘তারুণ্য মানেই শক্তি, তারুণ্য মানেই সম্ভাবনা’। একটি দেশের বর্তমানকে গতিশীল এবং ভবিষ্যৎকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে যুবসমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তরুণদের সৃজনশীলতা, সাহস, উদ্ভাবনী চিন্তা ও কর্মক্ষমতা সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণদের অধিকার, সমস্যা, সম্ভাবনা এবং সমাজে তাদের অবদানকে গুরুত্ব দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালিত হয়। এই দিবস তরুণদের ক্ষমতায়ন, তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং তাদের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের একটি বিশাল অংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়। এসব সমস্যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি এবং যুবসমাজের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক যুব দিবসের সূচনা হয়। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১২ আগস্টকে আন্তর্জাতিক যুব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে।

 

প্রতিবছর দিবসটি উপলক্ষে একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। সেই প্রতিপাদ্যের আলোকে তরুণদের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা, সেমিনার, কর্মশালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে যুবসমাজের প্রতি রাষ্ট্র, সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।

 

তরুণরা একটি দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠী। তাদের মধ্যে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ, ঝুঁকি নেয়ার সাহস এবং পরিবর্তন গ্রহণের মানসিকতা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। ফলে সঠিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে তরুণরা দেশের অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশে তরুণদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-কমার্স, ডিজিটাল উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপের মতো নতুন ক্ষেত্রগুলোতে তরুণরা নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছে। একই সঙ্গে খেলাধুলা, সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায়ও তরুণদের সাফল্য দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।

 

বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রেও যুবসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি দক্ষ, শিক্ষিত ও কর্মমুখী হয়ে ওঠে, তাহলে তারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করতে পারে। তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা গেলে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে দেশের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

 

বাংলাদেশের তরুণরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা কার্যক্রম, কৃষি, শিক্ষা, গবেষণা, খেলাধুলা ও সামাজিক উদ্যোগ—সবখানেই তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। অনেক তরুণ চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। এটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

 

সম্ভাবনার পাশাপাশি তরুণদের সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। বেকারত্ব যুবসমাজের অন্যতম বড় সমস্যা। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরও অনেক তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় না। শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অনেক শিক্ষার্থী তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পায় না।

 

এ ছাড়া মাদকাসক্তি, কিশোর গ্যাং, অপরাধপ্রবণতা, সামাজিক বৈষম্য, অনলাইন আসক্তি, মানসিক চাপ ও হতাশাও অনেক তরুণের জীবনকে বাধাগ্রস্ত করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ভুল তথ্যের প্রভাবও তরুণদের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই শুধু শিক্ষিত করাই যথেষ্ট নয়; তরুণদের নৈতিকতা, মানবিকতা, মানসিক দৃঢ়তা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের শিক্ষাও দিতে হবে।

 

আমাদের সমাজে একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ঘরে আসতে হতো, এ জন্য মা-বাবার শাসন ছিল, যাতে করে ছেলেরা অপরাধ কাজে জড়িত না হয়। আজ তথ্যপ্রযুক্তি ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন হওয়ায় এখন আগের সেই দায়িত্ববোধ এবং সন্তানের প্রতি খেয়াল হারিয়ে গেছে। 

 

যুবসমাজের উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত করে না; এটি তাকে চিন্তা করতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং সমস্যার সমাধান করতে শেখায়। তাই তরুণদের এমন শিক্ষা দিতে হবে, যা তাদের বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম করে তুলবে।

 

বর্তমান সময়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান, উদ্যোক্তা দক্ষতা এবং সৃজনশীল চিন্তার ওপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের পরিবর্তে বাস্তব দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে।

 

তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সরকারি ও বেসরকারি খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যদিও বিগত কয়েক বছর ধরে তরুণদের জন্য সরকারসহ উন্নয়ন সংস্থাগুলো কাজ করছে। একজন তরুণ উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করেন না; তিনি অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। ফলে উদ্যোক্তা সংস্কৃতির বিকাশ বেকারত্ব কমানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও তরুণদের ভূমিকা অপরিসীম। পরিবেশ রক্ষা, বৃক্ষরোপণ, রক্তদান, দারিদ্র্য দূরীকরণ, দুর্যোগ মোকাবেলা, শিক্ষাসেবা ও জনসচেতনতা তৈরির মতো বিভিন্ন কার্যক্রমে তরুণরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে পারে। তাদের উদ্যম ও সংগঠিত শক্তি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

 

উন্নত ও মানবিক একটি সমাজ গঠনের জন্য তরুণদের মধ্যে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি করতে হবে। মতের ভিন্নতা থাকলেও অন্যের মতকে সম্মান করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। মাদকমুক্ত ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গড়তে তরুণদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

 

ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি তরুণদের জন্য যেমন বড় সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি কিছু ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তরুণরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে। অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্র তাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির অপব্যবহার, সাইবার অপরাধ, ভুয়া তথ্য এবং অনলাইন আসক্তি থেকে তরুণদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রযুক্তিকে বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও সৃজনশীল কাজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

 

তরুণদের শুধু ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখলে চলবে না, তাদের বর্তমানের অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে তরুণদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। পরিবারকে তরুণদের স্বপ্ন ও মতামতকে সম্মান করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে এবং রাষ্ট্রকে নিরাপদ ও সমান সুযোগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

 

পরিশেষে বলতে চাই, আন্তর্জাতিক যুব দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, তরুণরা কোনো দেশের বোঝা নয়, বরং তারা একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে একটি দেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতার সুযোগ নিশ্চিত করা মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা।

 

আজকের তরুণরাই আগামী দিনের শিক্ষক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, কৃষিবিদ, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ ও নেতৃত্বের আসনে বসবে। তাই তাদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিতে হবে, স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ তৈরি করে দিতে হবে এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে।

 

তারুণ্যকে যদি সঠিক শিক্ষা, নৈতিকতা, দক্ষতা ও সুযোগ দিয়ে বিকশিত করা যায়, তাহলে তরুণরাই গড়ে তুলতে পারে সমৃদ্ধ, মানবিক, বৈষম্যহীন ও উন্নত একটি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক যুব দিবস তাই শুধু একটি দিবস নয়—এটি তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।

 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

উপসম্পাদকীয়

View more
হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়

কখনো কখনো একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না। সেটি আমাদের চারপাশের সমাজকে নিয়ে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে এনে দেয়। কুমিল্লার ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাটি তেমনই একটি প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছে।   এ হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। অপরাধের দায় যার, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু অপ্রতিমের মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে আমার মনে আরেকটি প্রশ্ন আসে, হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়? নিরাপত্তা কি শুধু বাবা-মায়ের দায়িত্ব? একজন মা তাঁর সন্তানকে যতই সতর্ক করুন, তিনি তো প্রতিটি রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। একজন বাবা সন্তানকে বিপদ চিনতে শেখাতে পারেন, কিন্তু সন্তানের চারপাশের প্রত্যেক মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।   শিশু যখন বাড়ির বাইরে যায়, তখন তার নিরাপত্তার একটি অংশ অদৃশ্যভাবে নির্ভর করে সেই সমাজের ওপর, যার মধ্য দিয়ে সে চলাচল করে। পাশের দোকানদার তাকে চেনেন কি না। প্রতিবেশী তাকে দেখলে খেয়াল করেন কি না।স্কুলের শিক্ষক জানেন কি না সে কার সঙ্গে মিশছে। স্থানীয় মানুষজন কোনো অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে সেটি গুরুত্ব দেন কি না। অর্থাৎ একটি শিশুর চারপাশে নিরাপত্তার একটি সামাজিক বলয় থাকার কথা। প্রশ্ন হলো, সেই বলয় কি আগের মতো শক্ত আছে? শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে, ঝুঁকি সাধারণত একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না।   যুক্তরাষ্ট্রের  সিডিসির যুব সহিংসতা-বিষয়ক গবেষণা-ভিত্তিক কাঠামোতে ব্যক্তি, পরিবার, সম্পর্ক, স্কুল, কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সমাজ — সব স্তরের ঝুঁকি ও সুরক্ষামূলক বিষয় বিবেচনা করা হয়। একই গবেষণায় দেখা যায়, পরিবার বা পরিবারের বাইরের দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে দৃঢ় সংযোগ, বাবা-মায়ের সঙ্গে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারা এবং স্কুলে ইতিবাচক সম্পর্ক কিশোরদের জন্য সুরক্ষামূলক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু নজরদারির বিষয় নয়। সংযোগও নিরাপত্তা। একটি শিশু যদি জানে, বিপদে পড়লে কার কাছে যাবে, কার সঙ্গে কথা বলবে এবং কে তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনবে, তাহলে তার চারপাশে একটি অদৃশ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি হয়। এই জায়গাটিই হয়তো আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।   তবে আগের দিনের সমাজকে নিখুঁত করে দেখার কোনো কারণ নেই। তখনো অপরাধ ছিল, ঝুঁকি ছিল, শিশু নির্যাতন ছিল। তবু একটি বিষয় ছিল, অনেক ক্ষেত্রে মানুষ একে অন্যকে চিনত। একটি শিশু কার সন্তান, কোন বাড়িতে থাকে, কোন স্কুলে পড়ে, এসব তথ্য অনেকের জানা থাকত। এখন শহুরে জীবনে আমরা একই ভবনে থাকি, কিন্তু একে অন্যকে চিনি না। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে জানি না। আমাদের সন্তানের সঙ্গে কারা মিশছে, সব সময় জানি না। আমাদের সন্তানের বন্ধুর বড় ভাই কে, সে কোথায় যায়, কী করে—এসবও অনেক সময় আমাদের অজানা থেকে যায়।   এটি শুধু সামাজিক পরিবর্তন নয়; এটি নিরাপত্তার কাঠামোকেও বদলে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে পরিবার থেকে কমিউনিটি এবং বৃহত্তর সামাজিক পরিবেশ পর্যন্ত একাধিক স্তরে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ শিশুর সুরক্ষা কোনো একক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।   অপ্রতিমের ঘটনাটি আমাদের আরেকটি বিষয় ভাবায়, প্রথম দিকে ঘটনাটি আইফোন ছিনিয়ে নেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে তদন্তে অপ্রতিমের সঙ্গে তার চেয়ে বয়সে বড় কয়েকজনের যোগাযোগ, কথিত বন্ধুত্বের বিষয়ও সামনে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গেছে। তদন্তকারীরা এ সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। এ তথ্যগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। শিশুর নিরাপত্তা শুধু অপরিচিত মানুষ থেকে তাকে দূরে রাখার বিষয় নয়।   আমাদের পরিচিত মানুষদের সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। শিশু কার সঙ্গে মিশছে, কার কথায় কোথাও যাচ্ছে, কে তাকে প্রভাবিত করছে—এসব নিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে এমন সম্পর্ক থাকা দরকার, যেখানে শিশু ভয় না পেয়ে সত্যি কথা বলতে পারে। কারণ, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কখনো কখনো শিশুকে আরও গোপনীয় করে তুলতে পারে। নিরাপত্তার জন্য তাই শুধু নজরদারি নয়, প্রয়োজন বিশ্বাসের সম্পর্ক।   একটি শিশুকে রক্ষা করার জন্য আমাদের হয়তো আরও বেশি সিসিটিভি দরকার, আরও কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থা দরকার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি দরকার। কিন্তু এর পাশাপাশি দরকার মানুষ। এমন শিক্ষক, যিনি বুঝতে পারবেন কোনো শিশু হঠাৎ বদলে গেছে। এমন বাবা-মা, যাঁদের সঙ্গে সন্তান নিজের অস্বস্তির কথা বলতে পারে। এমন প্রতিবেশী, যিনি কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে ‘এটা আমার বিষয় নয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। এমন কমিউনিটি, যেখানে অস্বাভাবিক কিছু দেখলে মানুষ প্রশ্ন করতে দ্বিধা করবে না; এবং এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে একটি শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কারণ, নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না। নিরাপত্তা তৈরি হয় সম্পর্ক দিয়ে।   অপ্রতিমের মৃত্যুর পর হয়তো অনেক বাবা-মা সন্তানকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করবেন। কোথায় যাবে, কার সঙ্গে যাবে, কখন ফিরবে—সবকিছু আরও কঠোরভাবে নির্ধারণ করবেন। তাঁদের ভয়কে অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমরা যদি প্রতিটি ট্র্যাজেডির পর শিশুদের স্বাধীনতা কমিয়ে দিই, অথচ সমাজের নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন না তুলি, তাহলে আমরা সমস্যার বোঝা শিশুর ওপরই চাপিয়ে দিই। একটি শিশু কেন স্বাধীনভাবে বাইরে যেতে পারবে না? কেন তাকে সব সময় ভয় নিয়ে চলতে হবে? কেন নিরাপদ থাকার জন্য তার পৃথিবী ছোট করতে হবে? বরং আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারি না, যেখানে একটি শিশু স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠবে এবং একই সঙ্গে তার চারপাশে থাকবে দায়িত্বশীল মানুষের একটি নিরাপত্তার বলয়?   অপ্রতিমকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না। তার পরিবার যে শূন্যতার মধ্যে পড়েছে, সেটিও কোনো বিচার পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু তার মৃত্যুর পর যদি আমরা শুধু অপরাধীর শাস্তি দাবি করে থেমে যাই, তাহলে একটি বড় সুযোগ হারাব। আমাদের দেখতে হবে কোথায় কোথায় সামাজিক সংযোগ দুর্বল হচ্ছে। কোথায় শিশুরা বড়দের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কোথায় কমিউনিটি একে অন্যের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়ছে। কোথায় আমরা নিরাপত্তাকে শুধু ক্যামেরা, তালা আর পাহারার মধ্যে সীমাবদ্ধ করছি। কারণ, একটি শিশুর নিরাপত্তার প্রথম প্রাচীর সব সময় দেয়াল নয়। কখনো সেটি একজন মা। কখনো একজন শিক্ষক। কখনো একজন প্রতিবেশী। কখনো একজন বন্ধু। কখনো এমন একজন অপরিচিত মানুষ, যিনি বিপদ দেখে এগিয়ে আসেন।   অপ্রতিমের মৃত্যু তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে না; এটি আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলোরও হিসাব চায়। আমরা কি এখনো এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে পথে একটি শিশুকে দেখলে তাকে শুধু ‘অন্যের সন্তান’ বলে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে নিজের সন্তানের মতো নিরাপদে বাড়ি ফেরার দায়িত্বটুকু অনুভব করি? নাকি পাশাপাশি বসবাস করতে করতে আমরা এতটাই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি যে, একটি শিশুকে ঘিরে আজও অনেক মানুষ থাকে, অথচ তাকে আগলে রাখার মতো একটি সামাজিক নিরাপত্তার বলয় থাকে না?   অপ্রতিমের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। তবে একই সঙ্গে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক নিরাপত্তার বলয়টিকেও পুনর্গঠন করতে হবে। কারণ, একটি শিশুকে নিরাপদ রাখা কেবল তার ওপর নজরদারি বাড়ানোর বিষয় নয়; এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল সমাজ, যেখানে একটি শিশুর নিরাপত্তা তার পরিবারের একার দায়িত্ব না হয়ে আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব হয়ে ওঠে।

অক্টোবর ৯, ২০২৬ 0

বদলে যাওয়া জলবায়ুতে বিপর্যস্ত শিশুদের জীবন

শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ : কতটা প্রস্তুত আমাদের সমাজ

অপার সম্ভাবনাময় জেলা কুড়িগ্রাম : প্রয়োজন শুধু সঠিক উদ্যোগ

শিশুর মৃত্যু, ভুল চিকিৎসা এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি

কথায় আছে, ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। এখন কর্তব্য অবহেলাকে দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া বা তার পক্ষে সাফাই গেয়ে তাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করা হলে সেটি নেহাতই অপপ্রয়াস। একটি শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, বরং এটি আমাদের সামনে দাঁড়ানো সেই আয়না, যা আমাদের সিস্টেমের নগ্নতাকে রূঢ়ভাবে প্রকাশ করে। এ সত্যের দর্পণে আমরা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসার মান, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি এবং রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রশ্নও দেখতে পাই।   সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালীর এক নামি-দামি হাসপাতালে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের করুণ মৃত্যু চিকিৎসাব্যবস্থায় কথিত অবহেলা নিয়ে জনমনে আবারও একটি ভয়ংকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রের এই তথাকথিত উন্নত স্বাস্থ্যসেবা খাতে আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটুকু নিরাপদ?   আভানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুরোনো শঙ্কাকে নতুন করে সামনে আনলেও এর সিলসিলা বহুকাল ধরে জারি রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর প্রসবব্যবস্থা, শিশুর অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবা এবং এ সম্পর্কে উদাসীনতা আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। সিস্টেমের নগ্ন মারপ্যাঁচের খেসারত ইতোমধ্যে হামের মহামারির মধ্য দিয়ে দেশের অগণিত শিশু জীবন দিয়ে চুকিয়েছে। সেই রেশ মিটতে না মিটতেই আভানের ঘটনা জনমনে ভয়ংকর ধাক্কা দিয়েছে।   শিশুটির পরিবারের পক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, চিকিৎসায় অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রয়োগে গাফিলতির কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার নেগেটিভ ফল আসার পরও কেন শিশুটিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা দেয়া হলো, কেন তার শারীরিক অবস্থার প্রকৃত হালচাল পরিবারের কাছে গোপন করা হলো, এসব প্রশ্ন কেবল আভানের পরিবার নয়, বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারকেই ভাবিয়ে তুলেছে। তাদের চোখে অবিশ্বাসের ছায়া, মনে আতঙ্কের ঢেউ।   আভানের মৃত্যুর নেপথ্যে আসল কোন সত্য লুকিয়ে আছে, চিকিৎসায় গাফিলতি ছিল কি না, শিশুটিকে দেয়া চিকিৎসা সিদ্ধান্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না, এসবের জবাব কেবল সঠিক তদন্তেই উদঘাটন সম্ভব। তাই অভিযোগ সত্য ধরে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগকে উপেক্ষা করাও অন্যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য উদঘাটনের অধিকার। আর এই অধিকার জনগণের। জনগণের এই যৌক্তিক দাবিকে মাথা পেতে নিয়ে সঠিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করাই একটি দক্ষ রাষ্ট্র প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।   একজন রোগীর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলে তার পরিবারের প্রথম স্বাভাবিক কৌতূহল হবে, ‘কেন?’ অথচ আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এই ‘কেন’র জবাব খুঁজে পাওয়ার পথ মোটেও স্বচ্ছ ও সরল নয়, বরং অস্বচ্ছতায় ভরা এক প্যাঁচালো গোলকধাঁধা। এর নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাব, হাসপাতালের আইসিইউসহ চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যক্তিদের মুনাফালিপ্সার মতো অভিযোগও আলোচনায় আসে।   প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক, চিকিৎসা কি কেবল সেবা, নাকি অধিকার? বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ছিল প্রতি হাজারে ১৪৬.৫, যা ২০২৪ সালে হ্রাস পেয়ে ৩০.৫ এ দাঁড়িয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু এই অগ্রগতি একই সঙ্গে আমাদের সামনে নতুন দায়িত্বের ভিত তৈরি করেছে। শিশুকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে পারা যদি প্রথম সাফল্য হয়, তবে তার পরের সাফল্য হবে নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা।   ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো নবজাতক মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে প্রায় ২২। অর্থাৎ শিশুমৃত্যু কমলেও ঝুঁকি আজও রয়ে গেছে। তবে এই ঝুঁকি কেবল রোগের নয়, ব্যবস্থারও। ভুল রোগ নির্ণয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, অদক্ষতা, ওষুধের ভুল প্রয়োগ, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবারের কাছে গোপন রাখার মতো বিষয়গুলো স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক মানের সঙ্গে সম্পৃক্ত।   স্বাস্থ্যসেবা বলতে কেবল হাসপাতাল তৈরি করে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে ভরে তোলাকে বোঝায় না। কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল বিষয় হলো সঠিক রোগ নির্ণয়, দক্ষ জনবল, যথাযথ চিকিৎসা প্রোটোকল, পর্যবেক্ষণ, তথ্যের স্বচ্ছতা, রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভুল হলে তার সঠিক জবাবদিহি।   চিকিৎসা ব্যয় সংকুলানও আমাদের দেশের অন্যতম কঠিন বাস্তবতা। ২০২৫ সালের ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫৪/১০০ এবং প্রায় ৪১.৭ শতাংশ মানুষ নিজ পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয় পরিচালনা করতে গিয়ে আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর আরেকটি বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রকাশনায় দেখা যায়, দেশের স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষকে নিজেকেই বহন করতে হয়।   অতএব, মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সময় কেবল অসুস্থতার ঝুঁকি নয়, অর্থনৈতিক ঝুঁকির এক অদৃশ্য মানসিক বোঝাও বহন করে। একটি শিশুর চিকিৎসা ব্যর্থ হলে পরিবার কেবল সন্তানকে হারায় না, অনেক পরিবার একই সঙ্গে হারায় সঞ্চয়, ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়, এমনকি জীবনের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করতে বাধ্য হয়। আর্থিক বিনিময়ে যে চিকিৎসাসেবা আমরা পাই, তার সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, আস্থা ও মৌলিক অধিকার।   পৃথিবীর কোনো দেশেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে গরমিল একেবারেই নেই, এমন নয়। একজন চিকিৎসকও রক্তমাংসে গড়া মানুষ। রোগ নির্ণয়ে জটিলতা থাকতেই পারে। চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়াও ঘটতে পারে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাও বলে, চিকিৎসাজনিত জটিলতা ও অবহেলা এক নয়। সুতরাং এগুলোকে ‘লেজে গোবরে মেখে’ এক করে দেখার সুযোগ নেই।   কোনো রোগী মারা গেলে তৎক্ষণাৎ চিকিৎসককে দায়ী করাও ভুল, আবার ভুল চিকিৎসা বা কর্তব্য অবহেলার অভিযোগ ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টাও অগ্রহণযোগ্য। এই ধোঁয়াশা দূর করতে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো।   ২০২৬ সালের প্রকাশিত এক আইনবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে রোগীর পরিবারের কাছে তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চিকিৎসাজনিত অ্যাডভার্স ইভেন্ট প্রকাশের জন্য বর্তমানে সুস্পষ্ট স্ট্যাটুটরি ডিউটি বা আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।   এখানেই এখন বিশেষভাবে ভাবতে হবে। রোগীর স্বজন তাদের সন্তান বা স্বজনের মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে তার সঠিক জবাব পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। ‘এটা জটিলতা ছিল’ অথবা ‘আমরা সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী করেছি’ বলে দায়সারা জবাব দিয়ে দায়িত্ব ও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।   রোগীর পরিবারের সংশয় কাটাতে চিকিৎসার নথি, ওষুধের তালিকা, পরীক্ষার ফল, চিকিৎসা সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল চিকিৎসকদের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা ও নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তবে প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক অভিযোগ দাখিল করার পর কতটা সহজে, দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে প্রতিকার পাবেন?   শুধু অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়। গুরুতর চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত স্বাধীন তদন্ত, গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নথি সংরক্ষণ এবং পরিবারের কাছে তা প্রদানের নিশ্চয়তা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, হাসপাতাল ও চিকিৎসকের দায় আলাদাভাবে নির্ধারণ, অবহেলা প্রমাণিত হলে কার্যকর শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি। একই সঙ্গে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও চিকিৎসকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি মানে চিকিৎসকদের ভয় দেখানো নয়, বরং ভুলের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসার পরিবেশ তৈরি করা।   আমাদের মাঝে সামাজিক স্মৃতির এক অদ্ভুত সমস্যা বিরাজমান। একটি শিশু মারা গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে। জন্ম নেয় ক্ষোভ। মানুষ বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। কয়েক দিন কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়। অতঃপর নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে ভুলিয়ে দেয়। হিসাবের খাতায় যোগ হয় কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু ওই সংখ্যার নেপথ্যে থাকে একটি নাম, একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ।   আভান হয়তো কোনো পরিসংখ্যানের একটি অংশ হয়ে যাবে, কিন্তু তার পরিবারের কাছে সে নিছক কোনো সংখ্যা নয়। সে ছিল একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী। এই আবেগটাকেই রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে। হতে হবে সংবেদনশীল।   স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাফল্য বলতে কয়টি হাসপাতাল মাথা তুলেছে, কতটি অত্যাধুনিক আইসিইউ আছে, কতজন দক্ষ চিকিৎসক আছেন, শুধু তা দিয়ে সাফল্য বিচার করলে গোটা গণিতটাই ভুল হবে। এই সাফল্য পরিমাপ করতে হবে একজন সাধারণ মানুষ হাসপাতালে গিয়ে কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা অকপটে বলতে পারছেন কি না এবং সত্য জানতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে কি না, তার ওপর।   একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, সেখানে রোগীকে শুধু রোগী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হয়। আমরা চাইব, আভানের মৃত্যুর এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায় দ্রুত নির্ধারিত হোক। অভিযোগে অসততা থাকলে সেটিও সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠুক। তবে কোনো অবস্থাতেই সত্যকে যেন আরেকটি শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে কবরের আঁধারে দাফন হতে না হয়। কারণ, আজকের প্রশ্নটি শুধু আভানের জন্য নয়, আমার, আপনার এবং আমাদের সকলের জন্য।   ‘হাসপাতালের ফটক পেরুলে একজন নাগরিক কি কেবলই চিকিৎসাটুকুই পাবেন, নাকি তার সঙ্গে নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারেরও ন্যায্য ভাগীদার হবেন?’ এ প্রশ্নের জবাব না মিললে অঢেল উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থার মাঝেও প্রশ্নটি আমাদের উত্ত্যক্ত করেই চলবে, ‘আমরা কি তবে সব সময়ই শেষ অবধি কেবল হিসাবের খাতার এক মামুলি সংখ্যাই রয়ে যাব?’

অক্টোবর ৭, ২০২৬ 0

বিশ্ব শিক্ষক দিবস : দায়িত্ব, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

তথ্য অধিকার আছে, তথ্য পাওয়ার অধিকার কতটা কার্যকর

ছবি : বিবিসির সৌজন্যে

মুয়াম্মার গাদ্দাফি : শাসন, ষড়যন্ত্র ও পতন

আত্মহত্যা : নেপথ্যে কারণ, সংকট ও প্রতিকার

আত্মহত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই আত্মহত্যার খবর চোখে পড়ে। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্ক—বিভিন্ন বয়সের মানুষ নানা ধরনের মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক সংকটে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছেন। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বিভিন্ন প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে আত্মহত্যাকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩৬৪ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ১৯৪ জনই ছিলেন স্কুলশিক্ষার্থী। এ ধরনের তথ্য আমাদের শিক্ষা ও পরিবারব্যবস্থার পাশাপাশি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গভীরভাবে নজর দেয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।   দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও আত্মহত্যার হার নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া যায়। ঝিনাইদহ তার একটি উদাহরণ। ১৭ জুলাই ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলার ছয় উপজেলায় গত এক বছরে ৩৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সোসাইটি ফর ভলান্টারি অ্যাকটিভিটিজের (সোভা) তথ্য অনুযায়ী, জেলাটিতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৪০০ মানুষ আত্মহত্যা করেন। ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ঝিনাইদহে ৩,১৫২ জন আত্মহত্যা করেছেন এবং এ সময়ে প্রায় ২২,০০০ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলেও সংগঠনটির তথ্যের বরাত দিয়ে জানা যায়।   আত্মহত্যার পেছনে কোনো একক কারণকে দায়ী করা যায় না। ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক সংকট, মাদকাসক্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, সহিংসতার অভিজ্ঞতা কিংবা তীব্র মানসিক চাপ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তির মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা এর পূর্ববর্তী কোনো সংকেত দেখা দিলেও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া প্রয়োজন।   এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি—আত্মহত্যাকে ব্যক্তির দুর্বলতা, কাপুরুষতা বা একক ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। এর পেছনে অনেক সময় জটিল মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিক সংকট কাজ করে। তাই সংকটে থাকা একজন মানুষের প্রয়োজন বিচার নয়, প্রয়োজন সহানুভূতি ও সহায়তা। আত্মহত্যা প্রতিরোধে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তান বা পরিবারের সদস্যের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হবে। মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনতে হবে, উপহাস বা তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে। সংকটের মুহূর্তে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তার কাছে পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।   শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হতে হবে। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা, কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে আত্মহত্যার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও সংবেদনশীলতা বজায় রাখতে হবে, যাতে সংবাদ পরিবেশন কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে।   ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে পারস্পরিক সহমর্মিতা, মানবিকতা ও জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বার্তা ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মাদকের বিস্তার, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য সামাজিক সংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।   সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আত্মহত্যা প্রতিরোধকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয় হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব। একজন মানুষ যখন গভীর সংকটে থাকেন, তখন তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁকে একা না রাখা এবং প্রয়োজনীয় পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আত্মহত্যা প্রতিরোধ তাই শুধু একটি জীবন বাঁচানোর উদ্যোগ নয়; এটি একটি সহমর্মী ও মানবিক সমাজ গড়ার দায়িত্বও।  

অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0

বাংলাদেশে বিরল খনিজের সন্ধান : বহু খাতের অর্থনৈতিক বিপ্লবের সম্ভাবনা

প্রকৃতির ভারসাম্যে টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ : ইআইএর ভূমিকা

পথশিশু : ঠিকানাহীন শৈশবের অসমাপ্ত সমীকরণ

সংশ্লিষ্ট খবর

উপসম্পাদকীয়

হারিয়ে যাচ্ছে কি আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার বলয়

অক্টোবর ৯, ২০২৬ 0