বাংলা ভাষার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরতম ভাষা হলো আঞ্চলিক ভাষা। নির্দিষ্ট এলাকার গণমানুষের নিত্যদিনের কথাবার্তাকেই আঞ্চলিক ভাষা বলা হয়। শুদ্ধ নয়, নয় স্মার্ট; তবুও কেমন যেন মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে থাকে এই ভাষা। মায়ের মুখের ভাষাই আমাদের প্রাণ। আমাদের শেকড়ের গোড়াপত্তন।
ভৌগোলিক সীমানায় প্রতিটি এলাকার ভাষা একেক রকম। বাংলাদেশের জেলা, এমনকি উপজেলা হিসেবেও আঞ্চলিক ভাষার দারুণ পার্থক্য দেখা যায়। দেশের প্রতিটি গ্রামেই ভাষার বৈচিত্র্য রয়েছে। এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের ব্যবহারিক কথ্য ভাষার পার্থক্য সহজেই বোঝা যায়। বাংলা ভাষায় এগুলো কোনো বিকৃতি নয়; বরং এগুলোই বাংলা ভাষার অলংকার। কেউ কেউ এই ভাষাকে উপভাষা বললেও আসলে এগুলো বাঙালির সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।
বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষার সংখ্যা কত, তার পরিসংখ্যান থাকলেও গ্রাম থেকে পাড়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তাই সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৭৪ বছরের এই দেশে আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে তেমন বড় পরিসরে গবেষণা বা কাজ হয়নি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ৪২ থেকে ৪৪টি আঞ্চলিক ভাষার তথ্য পাওয়া যায় (সূত্র : ইথনোলগ)। তবে এই হিসাব জেলাভিত্তিক। এর বাইরেও শত শত অঞ্চলের নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রয়েছে। ঢাকায় ঢাকাইয়া, সিলেট অঞ্চলে সিলেটি, চট্টগ্রামে চাটগাঁইয়া, বরিশালে বরিশাল্লা, বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে রংপুরি, ময়মনসিংহে ময়মনসিংহী—প্রতিটি অঞ্চলের ভাষায় উচ্চারণ, টান, শব্দ ও ধ্বনির পার্থক্য ভিন্নতা থাকে।
আসলে বাংলা ভাষায় প্রধানত পাঁচটি উপভাষা বা আঞ্চলিক ধারার কথা বলা হয়—রাঢ়ী, বঙ্গালী, বরেন্দ্রী, কামরূপী ও ঝাড়খণ্ডী। তবে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের কথ্যরূপে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা রয়েছে।
এতসব আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি রয়েছে এ দেশের পাহাড় ও সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা। তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমানে প্রায় ২০টির মতো নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার লিখিত রূপ রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে বহু কথ্য ভাষা। বাংলাদেশে ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতি রয়েছে, যাদের নিজস্ব বৈচিত্র্যময় ভাষা ও সংস্কৃতি বিদ্যমান। এর মধ্যে চাকমা, মারমা (পালি), সাঁওতালি, গারো (আচিক), ত্রিপুরা (ককবরক), ওরাওঁ (কুরুখ/সাদ্রি), খাসিয়া ও মণিপুরি ভাষা উল্লেখযোগ্য। তবে অনেক ভাষাই বর্তমানে বিলুপ্তির পথে (সূত্র : বিবিসি)।
এসব নৃ-গোষ্ঠী ছাড়াও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব ঠার ভাষা ব্যবহার করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঢাকার সাভারসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেদে সম্প্রদায়, জামালপুর অঞ্চলে সান্দার সম্প্রদায়, মান্তা ও নার্গাসী সম্প্রদায় প্রভৃতি। এ ছাড়া আরকাটি, মাল্লা, মুচি সম্প্রদায়সহ আরও কিছু ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর নিজস্ব কথ্যভাষা বা ঠার ভাষায় কথা বলে হয়ে থাকে। তার পরিমাণও কম নয়।
ইদানীং সমাজ পরিবর্তন ও আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কমে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যময় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আমাদের শেকড় থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে এই অলংকার। আঞ্চলিক ভাষা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে আধুনিকতার নামে স্মার্টনেস ও হীনম্মন্যতা অনেকাংশে দায়ী।
শৈশব থেকেই প্রমিত বাংলার ওপর অতিরিক্ত জোর দেয়াও আঞ্চলিক ভাষার প্রতি অবজ্ঞার একটি কারণ। তা ছাড়া আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ফলে নিজেকে গেঁয়ো বা অস্মার্ট ভাবার প্রবণতা থেকেও অনেকে নিজে থেকেই এই ভাষা থেকে সরে আসে।
আরও একটি কারণ হলো ফোনেটিক ‘বাংলিশ’। এই সংমিশ্র বা মোটা দাগে ‘বৃহন্নলা’ ভাষা যেমন বাংলা ভাষার শুদ্ধ রূপকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তেমনি মুখে মুখে উচ্চারিত আঞ্চলিক ভাষাকেও কোণঠাসা করে দিচ্ছে। বাংলা ও ইংরেজি শব্দের বিকৃত মিশ্রণে এক বহুরূপী ভাষা ইদানীং নতুন প্রজন্মের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা এবং আমাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা কি ভূলুণ্ঠিত হবে? এ প্রশ্ন এখনই আমাদের ভাবতে হবে।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।
একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবার শুধু সন্তানকেই হারায় না; হারায় নিরাপত্তাবোধ, মানসিক শান্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। উদ্বিগ্ন বাবা-মা সন্তানের ছবি হাতে থানায় জিডি করছেন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ছড়াচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের ব্যবস্থা কত দ্রুত, কার্যকর ও নিরাপদভাবে সাড়া দিতে পারে? আর শিশুদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও শোষণ থেকে রক্ষার দায়িত্বই-বা কার? সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫,৭১৭টি শিশু নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৩,৬৭৯টি শিশু উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২,০৩৮টি শিশু এখনো নিখোঁজ রয়েছে। তবে জিডির সংখ্যা কেবল নথিভুক্ত ঘটনাই তুলে ধরে; প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে, কারণ কিছু ঘটনা হালনাগাদ হয় না, আবার অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না। সব নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা একধরনের নয়। কোনো শিশু পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে; আবার কেউ অপহরণ, পাচার, যৌন নির্যাতন বা শোষণের শিকার হতে পারে। তাই শুধু কতজন নিখোঁজ হলো তা জানাই যথেষ্ট নয়; জানতে হবে কেন তারা নিখোঁজ হচ্ছে, এরপর তাদের কী ঘটছে এবং তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি কতটা কার্যকর। ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়া, সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। শিশুরা নিজেকে সুরক্ষিত রাখার সক্ষমতা সব সময় রাখে না; তাকে সহজেই প্রলোভন, ভয় বা প্রতারণার মাধ্যমে কোথাও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দরিদ্র শিশু, পথশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু এবং পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ঘটনা জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বিলম্ব হলে অপরাধীরা শিশুকে সরিয়ে নিতে বা পাচারের সুযোগ পেতে পারে। জিডি নেয়াই পুলিশের চূড়ান্ত কাজ নয়, বরং কাজের শুরু। অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুর বয়স, ছবি, সর্বশেষ অবস্থান ও ঝুঁকির বিষয় দ্রুত মূল্যায়ন করে অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন। সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা-মা পুলিশের কাছে গেলে উদাসীনতা, সন্দেহ বা অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করতে হবে। পুলিশ ও পরিবারের সম্পর্ক হওয়া উচিত সহায়ক, সম্মানজনক ও মানবিক। প্রতিটি থানায় প্রশিক্ষিত শিশু সুরক্ষা ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন, যিনি পরিবারকে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানাবেন, নিয়মিত তথ্য দেবেন এবং প্রয়োজনে সমাজসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবেন। অসহায় মা-বাবার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কেউ তাঁদের কথা শুনছে এবং সন্তানের সন্ধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। নিখোঁজ শিশু ফিরে এলে পরিবার স্বস্তি পায়, কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। শিশুটি কোথায় ছিল? কার সঙ্গে ছিল? তাকে কি নির্যাতন, ভয়ভীতি, জোরজবরদস্তি বা শোষণের শিকার হতে হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে; শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করা, ভয় দেখানো বা দায়ী করা যাবে না। তার প্রয়োজন হতে পারে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ পুনর্বাসন। মূল ঝুঁকি চিহ্নিত না করে শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিলে সে আবার একই বিপদে পড়তে পারে। যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা ও নীরবতা বড় বাধা। সামাজিক কলঙ্ক বা পারিবারিক অসম্মানের ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না; কখনো শিশুকেই দোষারোপ করা হয়। এই সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। শিশুদের শেখাতে হবে, তাদের ভয় দেখানো বা অস্বস্তিতে ফেলার অধিকার কারোর নেই। কেউ ভয় দেখালে, উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করলে কিংবা গোপন কিছু রাখতে বললে শিশুকে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ককে জানাতে হবে। আর শিশু যখন কথা বলবে, বড়দের তা গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। স্কুল ও মাদ্রাসা হতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ও। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতি থাকা এবং শিক্ষক-কর্মীদের নির্যাতনের লক্ষণ শনাক্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রতিক্রিয়া ও শিশুর গোপনীয়তা রক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। অনলাইন নিরাপত্তা শিক্ষাও জরুরি। একটি কার্যকর জাতীয় তথ্যব্যবস্থা থাকলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দ্রুত তথ্য বিনিময় সম্ভব হবে। আইনসম্মতভাবে সিসিটিভি ফুটেজও সহায়ক হতে পারে। ঢাকার কোনো থানায় শিশু নিখোঁজ হলে সেই তথ্য যেন একটি থানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; শিশুকে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে জানাতে হবে। হেলফ লাইন-১০৯৮ সম্পর্কে সবাইকে জানতে হবে। এটি শিশু সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। কিন্তু গ্রামীণ এলাকার কতজন অভিভাবক ও শিশু এই নম্বরটি জানে? স্কুল, মাদ্রাসা, হাসপাতাল, ইউনিয়ন পরিষদ, বাস টার্মিনাল ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমস্থলে ১০৯৮ নম্বর দৃশ্যমানভাবে প্রচার করা উচিত। শিশুদের কাছে বার্তা হোক সহজ—বিপদে নীরব থেকো না, সাহায্য চাও। শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব শুধু পুলিশ বা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আদালত, এনজিও, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং গণমাধ্যম—সবারই ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শনাক্ত ও পরিবারকে সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। গণমাধ্যমকে নিখোঁজ শিশুর সংবাদ প্রকাশের সময় তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও গোপনীয়তা বিবেচনা করতে হবে; এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা শিশুটিকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হবে এমন সমাজ গড়া, যেখানে কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার আগেই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা যায়। এমন সমাজ চাই, যেখানে শিশু ঘরে নিরাপদ বোধ করবে, স্কুলে সুরক্ষিত থাকবে, অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে জানবে এবং নির্যাতনের কথা ভয় ছাড়াই বলতে পারবে। আর শিশু যখন মুখ খুলবে, তাকে দোষী নয়—সুরক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার অধিকারী হিসেবে দেখতে হবে। শিশু অধিকার দিবস ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গত ৫ অক্টোবর ২০২৬ দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের সুদৃঢ় অঙ্গীকার বলে উল্লেখ করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন এই বাণী সত্যিকার অর্থে অনুধাবনপূর্বক বাস্তবায়ন করে। শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তার অধিকার। তাই কোনো শিশু নিখোঁজ হলে শুধু প্রশ্ন করা উচিত নয়, ‘শিশুটি কোথায়?’ আরও জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ল?’ আমাদের প্রতিক্রিয়া যেন দেরিতে না হয়, কারণ শিশুর জন্য প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়া জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—তাকে নিরাপদ রাখা। আর সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
তথ্য শব্দের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। তথ্য বলতে কোনো ব্যক্তি, বিষয়, ঘটনা, প্রতিষ্ঠান বা বস্তুর সম্পর্কে পাওয়া জ্ঞান, বিবরণ, উপাত্ত বা সংবাদকে বোঝায়। সহজভাবে বললে, কোনো বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য যে তথ্য বা বিবরণ পাওয়া যায়, সেটিই তথ্য। তথ্য শুধু কিছু কাগজপত্র, পরিসংখ্যান কিংবা সরকারি নথির নাম নয়। তথ্য হলো নাগরিকের ক্ষমতা। একজন নাগরিক যখন জানতে পারেন তাঁর এলাকার রাস্তা নির্মাণে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, একটি প্রকল্পের কাজ কবে শেষ হওয়ার কথা, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে কতজন নিয়োগ পেয়েছেন, কিংবা জনস্বার্থের কোনো সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হয়েছে—তখন তিনি শুধু একটি তথ্য জানছেন না; তিনি রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি চাইবার সক্ষমতা অর্জন করছেন। এ কারণেই ২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবসের গুরুত্ব এত বেশি। জাতিসংঘ ২০১৯ সালে ২৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘International Day for Universal Access to Information’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। UNESCO-ও তথ্যপ্রাপ্তিকে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি নতুন নয়। ২০০৯ সালে প্রণীত তথ্য অধিকার আইন নাগরিককে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার দিয়েছে। আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকার রয়েছে এবং অনুরোধের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথ্য দিতে বাধ্য। একই আইনে সরকারি কর্তৃপক্ষকে তাদের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকের কাছে সহজলভ্য করার কথাও বলা হয়েছে। আইনের কাগজে-কলমে এই অধিকার যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—বাস্তবে নাগরিক কতটা সেই অধিকার ভোগ করতে পারছেন? জনগণও এ বিষয়ে কতটা জানে? তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন কোন দপ্তরে যেতে হবে, কোন প্রক্রিয়ার তথ্য পেতে হবে, আদৌ কি জনগণ সেটা জানে? তথ্য অধিকার আইনের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো, নাগরিককে তথ্যের জন্য অনুগ্রহপ্রার্থী না রেখে অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক নাগরিক এখনো সরকারি অফিসে তথ্য চাইতে গেলে মনে করেন, তিনি যেন কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন। কোথায় আবেদন করতে হবে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে, কত দিনের মধ্যে তথ্য পাওয়ার কথা, তথ্য না পেলে কোথায় আপিল করতে হবে—এসব বিষয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা সীমিত। আইন অনুযায়ী তথ্য চাওয়ার জন্য লিখিত, ইলেকট্রনিক বা ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। সাধারণ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেয়ার কথা; একাধিক ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট হলে সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ ব্যবস্থা আছে। প্রশ্ন হলো, ব্যবস্থাটি কি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে যথেষ্ট সহজ, পরিচিত ও কার্যকর হয়ে উঠেছে? আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা কাজ করেছে—সরকারি তথ্য মানেই যেন অফিসের সম্পদ। নাগরিক চাইলে কিছু তথ্য দেয়া যাবে, না চাইলে দেয়া হবে না। তথ্য অধিকার আইন এ ধারণার জায়গায় একটি ভিন্ন দর্শন দাঁড় করিয়েছে। রাষ্ট্রের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প এবং জনস্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য জনগণের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখাই স্বাভাবিক নয়; বরং নির্দিষ্ট আইনগত ব্যতিক্রম ছাড়া তথ্য উন্মুক্ত রাখাই স্বাভাবিক হওয়ার কথা। আইনের ৬ ধারায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম এবং সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকদের কাছে সহজলভ্য করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিককে প্রতিটি তথ্যের জন্য আলাদা করে আবেদন করতে হবে—এমন ব্যবস্থা আইনটির মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সুশাসনের জায়গায় এখানেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার : তথ্য চাওয়ার পর দেয়া নয়, প্রয়োজনীয় তথ্য আগে থেকেই প্রকাশ করা। এখানেও আইনে পথ দেখানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্য না পাওয়া গেলে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আপিলের সুযোগ রয়েছে। এরপর প্রয়োজন হলে তথ্য কমিশনে অভিযোগ করার ব্যবস্থাও রয়েছে। তথ্য কমিশনের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যও দেখায় যে তথ্য অধিকার নিয়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আবেদন, অভিযোগ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে। কমিশনের একটি প্রতিবেদনে মোট ৩৬,২৭৭টি বিষয়ে নিষ্পত্তির তথ্য রয়েছে; সেখানে কিছু ক্ষেত্রে তথ্য চাওয়া আইনটির আওতাভুক্ত নয়, কোথাও যথাযথ কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়নি, কোথাও আপিল করা হয়নি—এমন নানা কারণও উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তথ্য অধিকার এখন আর কেবল সেমিনার বা দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা নয়; নাগরিকরা বাস্তবেই এই আইনি কাঠামো ব্যবহার করছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বোঝা যায়, আইনটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে নাগরিকের জ্ঞান, সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যাটি শুধু তথ্য না দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তথ্যের অস্তিত্বই নাগরিকের কাছে অজানা। কোনো দপ্তরে কী তথ্য আছে, কে সেই তথ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কোন তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করার কথা—এসব পরিষ্কার না হলে তথ্য অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আরেকটি বিষয় হলো তথ্যের ভাষা। কোনো সরকারি ওয়েবসাইটে শত শত পৃষ্ঠার নথি আপলোড করা হলো, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি বুঝতেই না পারেন সেখানে কী আছে, তাহলে সেটিকে কার্যকর তথ্যপ্রকাশ বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত? তথ্য প্রকাশের সঙ্গে তাই তথ্যের ব্যবহারযোগ্যতা যুক্ত করতে হবে। একটি প্রকল্পের বাজেট প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ নয়। কত টাকা বরাদ্দ, কত টাকা খরচ, কাজের অগ্রগতি কত, ঠিকাদার কে, কাজের মেয়াদ কত—এসব তথ্য যদি সহজ ভাষায়, নিয়মিত এবং অনুসন্ধানযোগ্যভাবে প্রকাশ করা হয়, তখনই তথ্য জনগণের কাজে লাগে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সভা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, সেমিনার হয়েছে, ব্যানার-ফেস্টুনে তথ্য অধিকারের কথা লেখা হয়েছে। এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু দিবসটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—একজন সাধারণ নাগরিক কি কোনো সরকারি দপ্তরে গিয়ে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই তথ্য চাইতে পারেন? তিনি কি জানেন, তথ্য না পেলে তাঁর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী? তিনি কি জানেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে? তিনি কি এমন তথ্য সহজেই অনলাইনে পান, যা তাঁকে আলাদা করে আবেদন করতে হয় না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—তথ্য চাওয়ার কারণে তিনি কি নিজেকে হয়রানির শিকার বা অপ্রয়োজনীয় জটিলতার মুখোমুখি মনে করেন? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই বলে দেবে, আমরা আইন কতটা পেয়েছি আর অধিকার কতটা পেয়েছি। তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের জন্য তিনটি জায়গায় পরিবর্তন জরুরি— প্রথমত, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ বাড়াতে হবে। জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট, ক্রয়, প্রকল্প, সিদ্ধান্ত, জনবল, সেবা ও ব্যয়ের তথ্য নিয়মিত এবং সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা দরকার। দ্বিতীয়ত, তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে হবে। একজন গ্রামের কৃষক, একজন শিক্ষার্থী, একজন সাংবাদিক কিংবা একজন সাধারণ নাগরিক যেন তথ্য চাওয়ার জন্য জটিল প্রশাসনিক ভাষা বা প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল না হন। তৃতীয়ত, তথ্য দিতে অনীহার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। তথ্য গোপন করার প্রবণতা নয়, তথ্য প্রকাশের সংস্কৃতিই হতে হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক আচরণ। কারণ তথ্য অধিকার কোনো বিশেষ শ্রেণির অধিকার নয়। এটি সাংবাদিকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন কৃষকেরও প্রয়োজন; একজন গবেষকের যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন শিক্ষার্থী বা স্থানীয় নাগরিকেরও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিকভাবে ২০২৪ সালের তথ্য অধিকার দিবসের মূল আলোচনায়ও সরকারি খাতে তথ্য অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। UNESCO বলেছে, তথ্য অধিকারকে সরকারি সংস্থাগুলোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতির মধ্যে মূলধারায় নিয়ে আসাই বাস্তব অগ্রগতির অন্যতম লক্ষ্য। পরিশেষে তথ্য অধিকার দিবসে তাই শুধু এ প্রশ্ন করলে হবে না—‘তথ্য অধিকার আছে কি?’ উত্তর আমরা জানি—আছে। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন আছে, তথ্য কমিশন আছে, তথ্য চাওয়ার বিধান আছে, আপিল ও অভিযোগের ব্যবস্থাও আছে। এখন আসল প্রশ্ন হলো—এই অধিকার কতটা সহজে, কতটা নির্ভয়ে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণকে তথ্য দেয়ার অর্থ রাষ্ট্রের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানো। কারণ অন্ধকারে গুজব জন্ম নেয়, সন্দেহ বাড়ে। আলোয় আসে প্রশ্ন। আর প্রশ্নের উত্তরদায়ী রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তাই ২৮ সেপ্টেম্বরের সবচেয়ে জরুরি বার্তা হতে পারে একটাই, ‘তথ্য দেয়ার দরজা খোলা’ বললেই হবে না; সেই দরজা দিয়ে সাধারণ নাগরিক যেন সত্যিই ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন—সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে আমাদের শহর, যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্পাঞ্চল, আবাসন ও জীবনযাত্রা। একের পর এক সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা ও নগর অবকাঠামো আমাদের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এই অগ্রগতি প্রয়োজনীয়, কারণ উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশের মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু উন্নয়নের এই যাত্রার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে মাটি, পানি, নদী, বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর আমাদের জীবন দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। পরিবেশকে ধ্বংস করে উন্নয়ন অথবা উন্নয়ন থামিয়ে পরিবেশ রক্ষা — এই চিরন্তন দ্বন্দ্বের অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন দর্শন, যেখানে অর্থনীতি এগোবে, মানুষের জীবনমান উন্নত হবে এবং একই সঙ্গে প্রকৃতিও তার প্রয়োজনীয় জায়গা পাবে। একটি রাস্তা নির্মাণের পর যদি বর্ষায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, একটি শিল্পকারখানার বর্জ্যপানি যদি নদী বা খালকে দূষিত করে, কিংবা একটি শহর গড়ে উঠতে গিয়ে প্রাকৃতিক জলাধার হারিয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফলের পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত দায়ও তৈরি হয়। সেই দায় শেষ পর্যন্ত আমাদের সমাজকেই বহন করতে হয়। এ কারণে পরিবেশকে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ের একটি আনুষ্ঠানিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকল্পের ধারণা ও পরিকল্পনার শুরু থেকেই পরিবেশকে বিবেচনায় নিতে হয়। প্রকল্প কোথায় হবে, কীভাবে হবে, কতটুকু জমি ব্যবহার করবে, পানি ও জ্বালানি কীভাবে ব্যবহৃত হবে, বর্জ্য কোথায় যাবে, স্থানীয় মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু ঝুঁকি কী হতে পারে, এসব বিষয় প্রকল্পের ধারণা ও পরিকল্পনার শুরু থেকেই বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। এ জায়গাতেই পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ বা এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের (ইআইএ) গুরুত্ব। এতে শুধু পরিবেশ রক্ষা হয় না; প্রকল্পের স্থায়িত্ব, কার্যকারিতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বাড়ে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ইআইএ কোনো প্রকল্পকে থামানোর হাতিয়ার নয়; বরং প্রকল্পকে আরও ভালোভাবে করার একটি সুযোগ। একটি নির্মাণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্ষার পানি কোথা দিয়ে যাবে, কোথায় জলাবদ্ধতা হতে পারে, কৃষিজমি ও জলাশয়ের ওপর কী প্রভাব পড়বে এবং স্থানীয় মানুষের চলাচল কীভাবে বজায় থাকবে — এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে একটি শিল্পপ্রকল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি বর্জ্যপানি শোধন, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, কঠিন ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রকল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে শুধু পরিকল্পনা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়নই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। নির্মাণকাজে ধুলা, শব্দ ও কম্পন নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক ও জ্বালানির নিরাপদ সংরক্ষণ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (EMP) তাই কেবল প্রতিবেদনের একটি অধ্যায় নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকর নির্দেশিকা। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যত বেশি সমন্বয় থাকবে, উন্নয়ন তত বেশি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই হবে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ইআইএর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নতুন অবকাঠামোকে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের উপযোগী করে গড়ে তোলা জরুরি। জলবায়ু সহনশীলতা এখন টেকসই অবকাঠামোর অন্যতম মৌলিক শর্ত। ইআইএর মাধ্যমে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি চিহ্নিত করে অবকাঠামোর নকশা, পানি নিষ্কাশন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নির্মাণসামগ্রী নির্বাচন ও জরুরি প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। দ্রুত নগরায়ণের ফলে বাংলাদেশের শহরগুলোতে খাল, জলাভূমি ও পানি ধারণের প্রাকৃতিক স্থান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, বাড়ছে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি। এর সমাধান শুধু বড় ড্রেন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পানি প্রবাহ, পানি ধারণ ও পানি নিষ্কাশনের পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। ইআইএর মাধ্যমে প্রকল্পের নকশা ও নিষ্কাশন পরিকল্পনার পর্যায়েই সম্ভাব্য সমস্যা চিহ্নিত করা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে নতুন কংক্রিট অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে একটি খাল, জলাভূমি বা প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণই অধিক কার্যকর ও টেকসই সমাধান হতে পারে। শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও পরিবেশকে ব্যয় হিসেবে নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কম পানি ও জ্বালানি ব্যবহার, কম বর্জ্য উৎপাদন, wastewater treatment, emission control, cleaner production এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ একটি আধুনিক শিল্পের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ইআইএর মাধ্যমে এসব বিষয়কে শুধু compliance requirement হিসেবে নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি resource efficiency ও operational sustainability এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পরিবেশগত দক্ষতা বাড়লে দূষণ কমার পাশাপাশি সম্পদের অপচয় কমতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বও বাড়তে পারে। ইআইএর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো stakeholder engagement। একটি এলাকার স্থানীয় মানুষ অনেক সময় এমন তথ্য জানেন, যা শুধু technical survey থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। কোন খাল বর্ষায় সক্রিয় থাকে, কোথায় পানি জমে, কোন রাস্তা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, কোন জলাশয় স্থানীয় জীবিকার সঙ্গে যুক্ত, এসব তথ্য প্রকল্পের বাস্তব ঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তাই meaningful stakeholder engagement শুধু অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি ইআইএকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও স্থানীয় প্রেক্ষাপটসম্মত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে সব পরিবেশগত প্রভাব সব সময় পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সম্ভাব্য প্রভাবগুলো আগে থেকে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ইআইএর মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি একটি কাঠামোবদ্ধ রূপ পায়, প্রভাব শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে mitigation, monitoring, stakeholder engagement এবং corrective action পর্যন্ত। ফলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা একটি বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম না হয়ে প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রের অংশ হয়ে ওঠে। সবশেষে, একটি প্রকল্পকে শুধু নির্মাণ শেষ হওয়ার দিন দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্য বোঝা যায় বহু বছর পরে যখন অবকাঠামোটি কার্যকর থাকে, স্থানীয় পরিবেশ নিরাপদ থাকে, মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত হয় এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মধ্যেও প্রকল্পটি টিকে থাকে। তাই পরিকল্পনা থেকে নকশা, নির্মাণ থেকে পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত পুরো জীবনচক্রেই পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ইআইএর প্রকৃত মূল্য এখানেই; এটি উন্নয়নকে থামায় না বরং উন্নয়নকে আরও সচেতন, দূরদর্শী এবং দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে; এখন প্রয়োজন সেই উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দেয়া। এমন উন্নয়ন, যেখানে সড়ক হবে কিন্তু পানি চলাচলের পথ বন্ধ হবে না; শিল্প হবে কিন্তু নদী দূষিত হবে না; শহর বড় হবে কিন্তু জলাভূমি হারিয়ে যাবে না; নতুন অবকাঠামো হবে কিন্তু সামান্য বন্যা বা তাপপ্রবাহেই অচল হয়ে পড়বে না। ইআইএর মতো বৈজ্ঞানিক ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া সেই উন্নয়নের পথকে আরও টেকসই, দূরদর্শী ও পরিবেশসম্মত করে তুলতে পারে। উন্নয়ন হোক, তবে প্রকৃতির হাত ধরে। কারণ নদী, খাল, জলাভূমি, বন, মাটি, বায়ু ও জীববৈচিত্র্য উন্নয়নের পথে কোনো বাধা নয়। এগুলোই আমাদের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি। প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে উন্নয়ন এগিয়ে চলে, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে মানুষের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন আগামী দিনের বোঝা না হয় বরং ইআইএর মাধ্যমে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, নিরাপদ, জলবায়ু সহনশীল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশের ভিত্তি ভিত্তি গড়ে তোলে।