Breaking news

শিক্ষক

আমাদের গুরুকুল : আমার শিক্ষাগুরু

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে...   সূর্য উদয়ের সাথে সাথে যার মুখ দিয়ে ওপরের শব্দগুলো উচ্চারিত হতো আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সাথে সাথে উচ্চারণ করতাম, সেই আমাদের গুরুকুলের গুরু দেবেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ। আমাদের শিক্ষাজীবনের গুরু মহাশয়। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে সামান্য একটুকরো জায়গায় ছিল আমাদের গুরুকুল। মাটির দেয়ালের ওপর ছনের ছাউনি ঘর। সামান্য উঠোন। মাটিতে আসন পেতে ছিল আমাদের পড়ার স্থান। আজ সেখানে মাটির ঘরও নেই গুরুও নেই।   আমাদের গুরুকুল ছিল পূর্বমুখী। গাছগাছালি ছায়াঘেরা সুনিবিড় শান্ত পাখি ডাকা সকালে শুরু হতো আমাদের পাঠদান। শ্যামবর্ণের চেহারার দীপ্ত চোখের জ্যোতি ভোরের আলোর সাথে ছড়িয়ে দিতেন আমাদের পাঠদানে। কাঠের খড়ম পায়ে সামান্য জলচৌকিতে বসেই পড়াতেন আমাদের। জন্মের পর থেকে খড়ি দেয়ার পর আমরা প্রতিদিন ভোরে পাঠদান নিতাম গুরুকুলে। শাসন আদর মেশানো ছিল গুরুশিক্ষা। জীবনের সঠিক শিক্ষার বীজ বপন করে সুন্দর সত্য মানবিক গুণাবলি দিয়ে পরিচর্যা করে চারা গজানোই ছিল তাঁর মূল শিক্ষা। আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে চাকরি জীবনে গুরু মহাশয়কে ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারিনি তাঁর আদর্শ। আজ না ফেরার দেশে তিনি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে গুরু মহাশয়কে হাজারও প্রণাম।  

অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0
বিশ্ব শিক্ষক দিবস : দায়িত্ব, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষার প্রসার, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই দিনটি মূলত সেই সত্যটিকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়।   একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও স্বপ্ন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন চিকিৎসক মানুষের শরীর সুস্থ করেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন; আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষকে, যে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য সব দায়িত্ব পালন করবে। তাই শিক্ষকের অবদানকে কোনো নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা বা পদমর্যাদার মাপকাঠিতে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে এবং নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে দৃশ্যমান অগ্রগতি। প্রযুক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে। তবে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয় না। মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর মূল্যায়ন, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ কম পাচ্ছে। মুখস্থনির্ভরতা, অতিরিক্ত গাইডনির্ভরতা, কোচিং-নির্ভরতা এবং ফলাফলকেন্দ্রিক মানসিকতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে। ফলে শিক্ষাকে শুধু ভালো ফল অর্জনের মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।   শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলেন। তিনি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করেন, সম্ভাবনাকে বিকশিত করেন এবং ব্যর্থতার পরও নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেন।   আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাঁদের যথাযথভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত। তবে এ দায়িত্ব পালন করতে হলে শিক্ষককেও হতে হবে দক্ষ, আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রযুক্তিবান্ধব, নৈতিক ও মানবিক। শিক্ষককে যদি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও মূল্যায়ন কৌশল সম্পর্কে দক্ষ করে তোলা যায়, তাহলে শ্রেণিকক্ষ আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠবে। আমাদের সমাজে শিক্ষককে ঐতিহাসিকভাবেই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। ‘শিক্ষক জাতির বিবেক’—এই কথাটি আমাদের সামাজিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই সামাজিক মর্যাদার অনেক সময় অসামঞ্জস্য দেখা যায়।   একদিকে শিক্ষককে জাতি গঠনের প্রধান কারিগর বলা হয়, অন্যদিকে অনেক শিক্ষককে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক কাজ, অতিরিক্ত দায়িত্ব ও নানা সামাজিক চাপ সামলাতে হয়। এতে শিক্ষকতার মূল কাজ—শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীকে সময় দেয়া—ব্যাহত হতে পারে। শিক্ষকের মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, নীতিনির্ধারণ, কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও সামাজিক আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষক যেন সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারেন—এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। শিক্ষক যদি আর্থিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে তার পেশাগত মনোযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো নানা ধরনের আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কাজের চাপ, সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্বের মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য প্রয়োজন। শিক্ষকের সম্মানী শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়; এটি শিক্ষার মানে বিনিয়োগ। একটি ভালো শ্রেণিকক্ষ শুধু বেঞ্চ, চেয়ার, বোর্ড ও ভবনের সমষ্টি নয়। সেখানে থাকতে হবে নিরাপদ, আনন্দময়, প্রশ্নবান্ধব ও বৈষম্যহীন পরিবেশ। শিক্ষার্থী যেন ভুল করতে ভয় না পায়, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ না করে এবং নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ পায়—এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একইভাবে শিক্ষককেও এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন।   প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ও ভাষা-ল্যাব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ শিক্ষার পরিবেশকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে প্রযুক্তি কখনো শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের সহায়ক শক্তি। শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি শিক্ষকের দায়িত্বের কথাও বলতে হবে। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হলেও এটি একই সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব। শিক্ষককে সময়নিষ্ঠ হতে হবে, নিয়মিত পাঠ প্রস্তুতি নিতে হবে, শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষককে শুধু বইয়ের জ্ঞান জানলেই চলবে না। তাঁকে জানতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, মানসিক স্বাস্থ্য, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পরিবর্তিত কর্মজগতের প্রয়োজনীয়তা। শিক্ষকদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তাঁরা চান সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন-ভাতা, পেশাগত নিরাপত্তা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ এবং সামাজিক মর্যাদা। তাঁরা চান না যে শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা হোক। একজন শিক্ষার্থী কতটা ভালো মানুষ হলো, কতটা যুক্তিবাদী হলো, কতটা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠল—এসবও শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হোক। একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় কোনো পদোন্নতি, পুরস্কার বা আর্থিক সুবিধা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—একদিন তাঁর কোনো শিক্ষার্থী এসে বলবে, “স্যার, আপনার কথা আমি আজও মনে রেখেছি।”   একজন শিক্ষক যখন দেখেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাজের জন্য কাজ করছে, মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে—তখন সেই আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনো অর্জনের তুলনা চলে না। তবে এই মানসিক প্রাপ্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও প্রয়োজন। ভালো কাজের জন্য শিক্ষককে সম্মাননা, গবেষণার সুযোগ, পেশাগত উন্নয়ন এবং নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষকতা আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার শিক্ষার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য জানলেই হবে না; তাকে হতে হবে সমস্যা সমাধানকারী, সৃজনশীল, যোগাযোগে দক্ষ, প্রযুক্তিবান্ধব এবং নৈতিকভাবে সচেতন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবেন শিক্ষক। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে শুধু ‘বিষয়ের শিক্ষক’ নয়, বরং শিক্ষার্থীর মেন্টর, পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুস্পষ্ট পথ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর একটি দিন নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। শিক্ষককে সম্মান করতে হলে শুধু কথায় নয়, কাজে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা বাড়াতে হবে, কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে, ন্যায্য সম্মানি নিশ্চিত করতে হবে এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে—তাঁরা শুধু একটি চাকরি করছেন না; তাঁরা একটি প্রজন্ম নির্মাণ করছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—শিক্ষককে শুধু সম্মান নয়, সম্মানজনক অবস্থান দিতে হবে; শুধু প্রত্যাশা নয়, প্রয়োজনীয় সুযোগও দিতে হবে; শুধু দায়িত্ব নয়, দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই শিক্ষক দিবসের উদযাপন হবে অর্থবহ, আর শিক্ষার ভবিষ্যৎ হবে আরও আলোকিত।   

অক্টোবর ৫, ২০২৬ 0
মহান শিক্ষা দিবস : আমাদের শিক্ষা হোক বিশ্ব মানের

শিক্ষার ক্রমাগত উন্নয়ন একটি আন্দোলন, একটি প্রচেষ্টা। একটি টেকসই শিক্ষা, একটি ন্যায্য এবং দক্ষতার শিক্ষা একটি সমাজ ও দেশকে খুব চমৎকারভাবে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়। শিক্ষা মানব মনের ইতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।   শিক্ষাই সেই শক্তি, যা সমাজ থেকে কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অপশক্তি ও বিশৃঙ্খলতা দূর করতে সাহায্য করে। সে কারণে প্রতিটি দেশের উন্নয়নের মূল শর্ত শিক্ষিত মানুষের হার বৃদ্ধি করা। তবে লক্ষ রাখতে হবে যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন বাস্তবায়িত হয় এবং শিক্ষার প্রায়োগিক উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা না হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস পালিত হয়। শিক্ষা অবশ্যই মহান কিন্তু এর বর্তমান প্রয়োগ কতজন মহান মানুষ তৈরি করতে পারছে, তা নিয়েই রয়েছে সংশয়।   শিক্ষা যদি পণ্য হয়, তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, যা আজকের সমাজে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নামি-দামি সব দালানকোঠা, দামি দামি স্কুলড্রেস, বড় বড় ল্যাব ইত্যাদি আরও বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন হরহামেশাই চোখে পড়ে। তো সেসব প্রতিষ্ঠানে কোন বছরে কত ভালো ফল হয়েছে, তার একটা ফর্দও তুলে ধরা হয়। কিন্তু কোথাও দেখা যায় না সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে কতজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে বের হয়েছে তার কোনো হিসাব দিয়েছে। আসলে মানুষ হওয়ার জন্য কোনো বিজ্ঞাপন দরকার হয় না। ওই মানুষ করাটাই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য, অন্যগুলো কেবল বাহ্যিক আড়ম্বর।   ভালো ফলের নিশ্চয়তা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দেয়, কিন্তু মানুষ করার নিশ্চয়তা আজকাল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দেয় না। তাই শিক্ষা এখন অনেক ক্ষেত্রেই পণ্য। বাজার দরে লাভ-ক্ষতি হিসাব করা হয়। কোন বিভাগে পড়ালেখ করলে কত দামি চাকরি পাওয়া যায় আর সেখানে কী পরিমাণ বেতন, সেসব দিয়েই সন্তানের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করা হয়। বিবেক বিসর্জন দিয়ে হাত পেতে ঘুষ নিয়ে মনুষ্যত্ব বিক্রি করে জীবন পার করেও কোনো অনুশোচনা হয় না। সেটাই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। শিক্ষার উদ্দেশ্য তো এটা কোনোকালেই ছিল না। হাত পেতে ঘুষ নিতে যে বিবেক বাধা দেয় না, সেই বিবেকের দায় শিক্ষার নয়। শিক্ষা নামে আধুনিক রমরমা বাণিজ্যের। শিক্ষা এখন এটাই। কতজন মানুষ হলো, এসব দেখে আর কী হবে! বিদ্যা ও বিদ্বান টাকায় বিক্রি হয়। শিক্ষা তার, টাকা আছে যার। টাকা নেই, শিক্ষা পাওয়া যাবে না।     শিক্ষা যতটা মহান, একজন শিক্ষার্থীকে ততটাই মহান করার উদ্দেশ্যেই তা ধাবিত হওয়া উচিত। কোনোভাবেই কেবল পাস করা বা শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করা বা চাকরি করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। কারণ, মহান শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি সামান্যতম ভিন্ন খাতেও প্রবাহিত হয়, তাহলে সেই দেশের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক হবে না। আমাদের আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে তো?   আমরা শিক্ষিত জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাথে সাথে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি না তো? দিন যাওয়ার সাথে সাথে আজকালকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে থেকে বই পড়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। সারা দিন মুখ বুজে মোবাইলের স্ক্রিনে ফেসবুক ঘাঁটতে যে আনন্দ জ্ঞান লাভে আর ততটা আনন্দ পায় না। তাই তো নতুন বই পেলে যে একধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়, তা ঠিক আছে কিন্তু কয়েক মাস যেতেই সেই মুগ্ধতা আর থাকছে না। মূল বই থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ঝুঁকছে গাইড বই, লেকচার শিট, প্রাইভেট পড়া এসবের প্রতি। এসব কিছুই অবশ্য পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য। পাস করা, ভালো ফল করা এসবই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য। অবশ্য আজকালকার সচেতন অভিভাবক মাত্রই সন্তানের ভালো ফল আশা করে। আমিও করি। কিন্তু ভালো ফল করতে গিয়ে যদি পাঠ্য বইয়ের বদলে গাইড বা প্রাইভেট বা লেকচার শিটের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়, তাহলে সেটা একদম ভালো কথা নয়। তারপর আবার এসবের বাইরে গিয়ে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, কবিতা এসবের ভেতরের যে জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার আছে, তার খোঁজ এরা করছে না। তার কারণও কি শুধুই পরীক্ষায় ভালো ফল? ফলে জ্ঞান হয়ে পড়ছে সীমাবদ্ধ। সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে মুক্ত আকাশের সন্ধান মেলে কি? শুধু পাস করা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে (প্রাইভেট বা কোচিংয়ে বেশি সময়) ভালো ফল করা যায় বৈকি, তবে প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কি? মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মুক্ত জ্ঞানের চর্চা থাকা আবশ্যক।   যখন দেখি বইয়ের বদলে ক্লাসের বাইরে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই টিভি সিরিয়াল দেখে, মোবাইল বা ট্যাবে গেমস খেলে বা অপ্রয়োজনীয় কিছু ওয়েবসাইটে ঢুকে সময় কাটাচ্ছে, তাতে আমি মর্মাহত হই। কারণ, এতে তাৎক্ষণিক মনের আনন্দ মিটছে বৈকি, কিন্তু মাথার ভেতর থেকে বই পড়ার ধৈর্যটা কমে যায়। বিষয়টা এমন যে একজন ছাত্র যখন তার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে যে তীব্র আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে  থাকে, সেই আগ্রহ যদি বইয়ের পৃষ্ঠার প্রতি থাকত, তাহলে কত ভালোই না লাগত। তবে বিষয়টা শুধু আমার ভালো লাগা বা মন্দ লাগার না, বিষয়টা জাতির ভবিষ্যতের।   আমাদের মোবাইলের দরকার আছে, কিন্তু মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ুয়া একজনের দিনের কয়েক ঘণ্টা মোবাইলের সাথে কাটানো কতটা প্রয়োজন আছে, তা বোধগম্য নয়। এর অর্থ আমি প্রযুক্তির বিপক্ষে নই। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানবসভ্যতা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার তো চিন্তা একে সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপর। ব্যর্থতা শিক্ষার হয় না, ব্যর্থতা হয় শিক্ষার নীতিনির্ধারকদের। কোচিংনির্ভর, প্রাইভেটনির্ভর, গাইডনির্ভর শিক্ষা নিয়ে কতদূর অগ্রসর হওয়া যাবে, তা বলা মুশকিল। এসব রাহু থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করে শিক্ষার উদ্দেশ্য সাধনের দিকে এগুতে হবে। তাতেই যে জাতির মঙ্গল হবে।   মহান শিক্ষা দিবস পালনের উদ্দেশ্য শিক্ষাকে আরও কার্যকরভাবে জনকল্যাণে প্রয়োগ করা। শিক্ষার সাথে জড়িয়ে আছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এ দুইয়ের সম্মিলন শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সম্পদ তৈরি করার একটি মাধ্যম। একটি প্রজন্ম, যাদের এই শিক্ষা দিয়ে বড় করা হচ্ছে, তাদের যথোপযুক্ত করে গড়ে তোলা। নতুন নতুন সিদ্ধান্ত সব সময় না নিয়ে খুব দ্রুত পরিবর্তন না করে কোনো বিষয় ভালোভাবে যাচাই করা দরকার। সমগ্র শিক্ষাকে একটি সরলরৈখিক দাগে উপস্থিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হবে বিশ্বমানের, বিশ্ব থেকে পিছিয়ে থাকবে না এটাই প্রত্যাশা।  

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
এসএসসির খাতা মূল্যায়নে গাফিলতিতে শিক্ষকদের শাস্তির আওতায় আনার নির্দেশ শিক্ষামন্ত্রীর

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে দায়িত্বে অবহেলাকারী শিক্ষকদের শাস্তির আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। তিনি উল্লেখ করেন, খাতা পুনঃনিরীক্ষণের মাধ্যমে তিন হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী নতুন করে জিপিএ-৫ পাওয়ায় মূল্যায়নের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।   দায়িত্বহীন পরীক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী জানান, অবহেলার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি পেতেই হবে। একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন, বিভিন্ন প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ও অতীতের অনিয়ম কাটিয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ডিসেম্বরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া হবে।   জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সেশনজটমুক্ত করার অঙ্গীকার করে মন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান উপযোগী করতে পাঠ্যক্রমে সংস্কার এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি আইন কলেজের পরীক্ষার ফরম পূরণে অতিরিক্ত ফি আদায়ের তীব্র সমালোচনা করে তিনি সতর্ক করেন, মন্ত্রণালয়ের নাম ভাঙিয়ে অন্যায্য আর্থিক সুবিধা নেয়া বরদাশত করা হবে না।   উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৫৭ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে ‘ভাইস-চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।  

সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ 0
কলেজ-শিক্ষক বনাম বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক : শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক নয়, শিক্ষার মানই হোক লক্ষ্য

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনে সরকারি কলেজের শিক্ষক বনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এমন তুলনামূলক বিতর্ক মাঝেমধ্যে দৃশ্যমান হয়। সম্প্রতি একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এটি আবারও আলোচনায় এসেছে। উভয় পক্ষই বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন।   সরকারি কলেজের শিক্ষকদের মতে, তাঁরা কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত অনেকে মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো গবেষণা, প্রকাশনা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা। দুই পক্ষের যুক্তির মধ্যেই কিছু বাস্তবতা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই তুলনা কি সত্যিই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়?   আমার মনে হয়, ‘কে শ্রেষ্ঠ’—এ প্রশ্নের চেয়ে ‘কে তাঁর দায়িত্বে কতটা দক্ষ, নিবেদিত ও কার্যকর’—এ প্রশ্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই ধরনের প্রতিষ্ঠান নয়, তাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষাদান-পদ্ধতি, দায়িত্ব, একাডেমিক পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যও এক নয়। ফলে একটির মানদণ্ড দিয়ে অন্যটিকে বিচার করা সব সময় যৌক্তিক নয়। শিক্ষকতার মর্যাদা পদবিতে নয়, সক্ষমতায়। একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার জন্য শুধু একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যথেষ্ট নয়। আবার শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ করাও একজন ভালো শিক্ষক হওয়ার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয় না।   প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা একজন প্রার্থীর জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতায় সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। কিন্তু শিক্ষকতা একটি দীর্ঘমেয়াদি পেশা। শ্রেণিকক্ষে জটিল বিষয় সহজ করে বোঝানো, শিক্ষার্থীর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈচিত্র্য বুঝতে পারা, মূল্যায়ন করা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, শিক্ষার্থীর প্রশ্নকে উৎসাহিত করা এবং নিজের জ্ঞানকে নিয়মিত নবায়ন করা—এসব দক্ষতা নিয়োগ পরীক্ষার বাইরের বিষয়। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক গবেষণা, জ্ঞান সৃষ্টি, উচ্চতর একাডেমিক অনুসন্ধান ইত্যাদি শিক্ষাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অর্থাৎ ‘নিয়োগের যোগ্যতা’ এবং ‘পেশাগত উৎকর্ষ’—দুটি একই বিষয় নয়।   বাংলাদেশের সরকারি কলেজের শিক্ষকরা সাধারণত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করেন। অনেক ক্ষেত্রে সীমিত অবকাঠামো, বড় শ্রেণি, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁদের অর্জন করতে হয়। প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষকতায় প্রবেশের বিষয়টি তাঁদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শক্তির জায়গা মূলত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান অনুসন্ধান, গবেষণা-পদ্ধতি, প্রকাশনা, একাডেমিক বিতর্ক, আন্তর্জাতিক জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে সংযোগ এবং নিজ ক্ষেত্রে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা ইত্যাদি। গবেষণাপত্রের সংখ্যার পাশাপাশি গবেষণার ফল শ্রেণিকক্ষে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি কতটা বিকশিত হচ্ছে এবং সমাজের সমস্যার সমাধানে গবেষণা কতটা ভূমিকা রাখছে—এসবও বিবেচনার ব্যাপার।   আমাদের সরকারি কলেজের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা অন্য যেকোনো স্তরের শিক্ষক—সবার ক্ষেত্রেই প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমি গত পাঁচ বছরে শিক্ষক হিসেবে কতটা শিখেছি? আমার শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? আমি গবেষণা বা পেশাগত জ্ঞানকে শ্রেণিকক্ষে কতটা ব্যবহার করছি? শিক্ষকতা এখন আর শুধু বক্তৃতার পেশা নয়। একুশ শতকের শিক্ষার্থীরা তথ্যের জন্য শুধু শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল নয়। তার হাতে ইন্টারনেট, ডিজিটাল লাইব্রেরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন কোর্স এবং বিশ্বের অসংখ্য জ্ঞানভাণ্ডার। তাই আজকের শিক্ষককে তথ্যের একমাত্র উৎস না হয়ে লার্নিং ডিজাইনার, মেন্টর, ফেসিলিটেটর ও ক্রিটিক্যাল থিংকার হতে হবে।   একজন শিক্ষক গবেষণা করলে তিনি নিজের বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে পারেন। তিনি শ্রেণিকক্ষে কাজ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের শেখার সমস্যা, ভুল ধারণা, মূল্যায়নের দুর্বলতা বা নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা করতে পারেন। অর্থাৎ গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। সরকারি কলেজেও গবেষণা হতে পারে। আবার শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য গবেষণা নয়, প্রয়োজন গুণগত গবেষণা। গবেষণার ফল যদি শিক্ষার্থীদের পাঠদানে প্রবেশ করে, তবে বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে জ্ঞান সৃষ্টির পাশাপাশি জ্ঞান বিতরণেরও কেন্দ্র হয়ে ওঠে।   সরকারি কলেজের শিক্ষকদেরও আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। শুধু নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রবেশের সাফল্য আর পেশাগত উৎকর্ষ অর্জন হলো দীর্ঘ যাত্রা। একজন শিক্ষককে নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে, আমি কি প্রযুক্তি ও এআইকে দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষায় ব্যবহার করি? আমি কি আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখি? আমার শিক্ষার্থীরা কি আমার ক্লাসের পর আরও জানতে আগ্রহী হয়? এসব আত্মজিজ্ঞাসাই শিক্ষককে এগিয়ে নিতে পারে।   আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা। শিক্ষার্থীরা যাতে বিশ্বমানের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, যোগাযোগক্ষমতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা নিয়ে দেশ ও বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়, ‘সরকারি কলেজের শিক্ষক শ্রেষ্ঠ, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক?’ প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘আমাদের শিক্ষকরা কি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার্থী তৈরি করতে প্রস্তুত?’ আরও বড় প্রশ্ন, আমরা কি আমাদের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ, প্রশিক্ষণ, গবেষণা-সুবিধা, একাডেমিক স্বাধীনতা ও পেশাগত পরিবেশ দিতে পারছি? প্রয়োজন একটি নতুন শিক্ষকতা সংস্কৃতি, যেখানে কেউ ছোট-বড় নন। শুধু নিয়োগ পরীক্ষা, ডিগ্রি, পদবি, গবেষণাপত্রের সংখ্যা কিংবা চাকরির বয়স—কোনো একটিকে শিক্ষকতার সামগ্রিক মানদণ্ড বানানো উচিত নয়। রাষ্ট্রকেও বুঝতে হবে—শিক্ষকের ওপর শুধু দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই হবে না, তাঁকে সময়, প্রশিক্ষণ, গবেষণা-সুযোগ, প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ দিতে হবে।   সরকারি কলেজের শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক—দুই ধারাই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাঁদের দায়িত্বের প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু জাতীয় লক্ষ্য এক। একজন ভালো সরকারি কলেজ-শিক্ষক হয়তো অসংখ্য শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করেন। একজন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক তাঁদের মধ্য থেকে গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক ও জ্ঞানস্রষ্টা তৈরি করেন। এ দুই ভূমিকা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং একই শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিক অংশ। তাই ‘কে বড়’—এই বিতর্কে না যাওয়াই ভালো। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্মানের। গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জনও সম্মানের। কিন্তু তার চেয়েও বড় সম্মান হলো নিজের পেশাগত দায়িত্ব সততা, দক্ষতা, আন্তরিকতা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে পালন করা এবং শিক্ষার্থীর জীবনকে আলোকিত করা।   সুতরাং, সরকারি কলেজ বনাম বিশ্ববিদ্যালয় নয়—প্রতিযোগিতা হোক অজ্ঞতার সঙ্গে জ্ঞানের, অদক্ষতার সঙ্গে দক্ষতার, স্থবিরতার সঙ্গে উদ্ভাবনের, অসততার সঙ্গে নৈতিকতার, আর সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সম্ভাবনার। তবেই শিক্ষকসমাজের মর্যাদা বাড়বে, উচ্চশিক্ষার মান বাড়বে এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।     ড. মো: বিল্লাল হোসেন উপাধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ।    

সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0