প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষার প্রসার, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং শিক্ষকদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালিত হয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই দিনটি মূলত সেই সত্যটিকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও স্বপ্ন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একজন চিকিৎসক মানুষের শরীর সুস্থ করেন, একজন প্রকৌশলী অবকাঠামো নির্মাণ করেন; আর একজন শিক্ষক তৈরি করেন সেই মানুষকে, যে ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য সব দায়িত্ব পালন করবে। তাই শিক্ষকের অবদানকে কোনো নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা বা পদমর্যাদার মাপকাঠিতে পুরোপুরি মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটেছে এবং নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে দৃশ্যমান অগ্রগতি। প্রযুক্তির ব্যবহারও ধীরে ধীরে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হয়ে উঠছে। তবে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয় না। মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর মূল্যায়ন, উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ—এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ কম পাচ্ছে। মুখস্থনির্ভরতা, অতিরিক্ত গাইডনির্ভরতা, কোচিং-নির্ভরতা এবং ফলাফলকেন্দ্রিক মানসিকতা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে। ফলে শিক্ষাকে শুধু ভালো ফল অর্জনের মাধ্যম না বানিয়ে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও মানবিকতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা নয়। একজন আদর্শ শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রশ্ন করার সাহস, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলেন। তিনি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করেন, সম্ভাবনাকে বিকশিত করেন এবং ব্যর্থতার পরও নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেন। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও রাষ্ট্রনায়ক। তাই তাঁদের যথাযথভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত। তবে এ দায়িত্ব পালন করতে হলে শিক্ষককেও হতে হবে দক্ষ, আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন, প্রযুক্তিবান্ধব, নৈতিক ও মানবিক। শিক্ষককে যদি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষণ-পদ্ধতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও মূল্যায়ন কৌশল সম্পর্কে দক্ষ করে তোলা যায়, তাহলে শ্রেণিকক্ষ আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠবে। আমাদের সমাজে শিক্ষককে ঐতিহাসিকভাবেই শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। ‘শিক্ষক জাতির বিবেক’—এই কথাটি আমাদের সামাজিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই সামাজিক মর্যাদার অনেক সময় অসামঞ্জস্য দেখা যায়। একদিকে শিক্ষককে জাতি গঠনের প্রধান কারিগর বলা হয়, অন্যদিকে অনেক শিক্ষককে নানা ধরনের অপ্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক কাজ, অতিরিক্ত দায়িত্ব ও নানা সামাজিক চাপ সামলাতে হয়। এতে শিক্ষকতার মূল কাজ—শিক্ষাদান ও শিক্ষার্থীকে সময় দেয়া—ব্যাহত হতে পারে। শিক্ষকের মর্যাদা শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে নয়, নীতিনির্ধারণ, কর্মপরিবেশ, বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও সামাজিক আচরণেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। একজন শিক্ষক যেন সম্মানজনক জীবন যাপন করতে পারেন—এটি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। শিক্ষক যদি আর্থিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট কিংবা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাহলে তার পেশাগত মনোযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো নানা ধরনের আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের কাজের চাপ, সুযোগ-সুবিধা ও দায়িত্বের মধ্যে একটি ন্যায্য ভারসাম্য প্রয়োজন। শিক্ষকের সম্মানী শুধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রাপ্তি নয়; এটি শিক্ষার মানে বিনিয়োগ। একটি ভালো শ্রেণিকক্ষ শুধু বেঞ্চ, চেয়ার, বোর্ড ও ভবনের সমষ্টি নয়। সেখানে থাকতে হবে নিরাপদ, আনন্দময়, প্রশ্নবান্ধব ও বৈষম্যহীন পরিবেশ। শিক্ষার্থী যেন ভুল করতে ভয় না পায়, প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ না করে এবং নিজের মতপ্রকাশের সুযোগ পায়—এমন পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। একইভাবে শিক্ষককেও এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারেন। প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান ও ভাষা-ল্যাব, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ শিক্ষার পরিবেশকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে প্রযুক্তি কখনো শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং প্রযুক্তি হবে শিক্ষকের সহায়ক শক্তি। শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি শিক্ষকের দায়িত্বের কথাও বলতে হবে। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা হলেও এটি একই সঙ্গে একটি বড় দায়িত্ব। শিক্ষককে সময়নিষ্ঠ হতে হবে, নিয়মিত পাঠ প্রস্তুতি নিতে হবে, শিক্ষার্থীর প্রতি ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সমান মর্যাদা দিতে হবে। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষককে শুধু বইয়ের জ্ঞান জানলেই চলবে না। তাঁকে জানতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক শিক্ষণ-পদ্ধতি, মানসিক স্বাস্থ্য, যোগাযোগ দক্ষতা এবং পরিবর্তিত কর্মজগতের প্রয়োজনীয়তা। শিক্ষকদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তাঁরা চান সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন-ভাতা, পেশাগত নিরাপত্তা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ পদোন্নতি, প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ এবং সামাজিক মর্যাদা। তাঁরা চান না যে শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বিচার করা হোক। একজন শিক্ষার্থী কতটা ভালো মানুষ হলো, কতটা যুক্তিবাদী হলো, কতটা দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠল—এসবও শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হোক। একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বোধহয় কোনো পদোন্নতি, পুরস্কার বা আর্থিক সুবিধা নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—একদিন তাঁর কোনো শিক্ষার্থী এসে বলবে, “স্যার, আপনার কথা আমি আজও মনে রেখেছি।” একজন শিক্ষক যখন দেখেন তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সমাজের জন্য কাজ করছে, মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে—তখন সেই আনন্দের সঙ্গে অন্য কোনো অর্জনের তুলনা চলে না। তবে এই মানসিক প্রাপ্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও প্রয়োজন। ভালো কাজের জন্য শিক্ষককে সম্মাননা, গবেষণার সুযোগ, পেশাগত উন্নয়ন এবং নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়া হলে শিক্ষকতা আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মবাজার শিক্ষার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে শুধু তথ্য জানলেই হবে না; তাকে হতে হবে সমস্যা সমাধানকারী, সৃজনশীল, যোগাযোগে দক্ষ, প্রযুক্তিবান্ধব এবং নৈতিকভাবে সচেতন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকবেন শিক্ষক। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষককে শুধু ‘বিষয়ের শিক্ষক’ নয়, বরং শিক্ষার্থীর মেন্টর, পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পেশাগত উন্নয়নের সুস্পষ্ট পথ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর একটি দিন নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার একটি সুযোগ। শিক্ষককে সম্মান করতে হলে শুধু কথায় নয়, কাজে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষকের মর্যাদা বাড়াতে হবে, কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে, ন্যায্য সম্মানি নিশ্চিত করতে হবে এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও মনে রাখতে হবে—তাঁরা শুধু একটি চাকরি করছেন না; তাঁরা একটি প্রজন্ম নির্মাণ করছেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—শিক্ষককে শুধু সম্মান নয়, সম্মানজনক অবস্থান দিতে হবে; শুধু প্রত্যাশা নয়, প্রয়োজনীয় সুযোগও দিতে হবে; শুধু দায়িত্ব নয়, দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। তবেই শিক্ষক দিবসের উদযাপন হবে অর্থবহ, আর শিক্ষার ভবিষ্যৎ হবে আরও আলোকিত।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নবীন প্রজন্মের ওপর। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজনির্মাতা। তাই নবীনদের জাগরণ শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা রকম চ্যালেঞ্জ। তাই নবীনদের শুধু শিক্ষিত হলেই চলবে না; তাদের হতে হবে জ্ঞানী, বিবেকবান, দায়িত্বশীল ও মানবিক। শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে এবং সত্য-মিথ্যা বিচার করতে শেখায়। তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি জ্ঞানমূলক বই পড়তে হবে, প্রশ্ন করতে হবে এবং যুক্তি দিয়ে বিষয়কে বিচার করতে হবে। অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ না করে সত্য অনুসন্ধানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বিশ্বজ্ঞান অর্জনের জন্য অন্যান্য ভাষাও শেখা প্রয়োজন। ভাষা যত জানা যায়, জ্ঞানের তত বেশি দরজা খুলে যায়। সময় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই অলসতা, অকারণ আড্ডা কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে সময় নষ্ট না করে পড়াশোনা, সৃজনশীলতা, শরীরচর্চা ও আত্মউন্নয়নে সময় দিতে হবে। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে, তবে স্বপ্নের সঙ্গে থাকতে হবে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা। ব্যর্থতা এলে হতাশ না হয়ে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে—হোঁচট খাওয়া পরাজয় নয়; পড়ে গিয়ে আর না ওঠাই পরাজয়। জ্ঞান ও অর্থের চেয়ে মানুষের চরিত্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সত্যবাদিতা, সততা, বিনয়, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতাই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। লোভ, অহংকার ও হিংসা থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা না করে অনুপ্রেরণা নিতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ, মানুষ বড় হয় শুধু অর্থ-বিত্তে নয়, মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে। পিতা-মাতার ত্যাগ ও ভালোবাসার ঋণ অপরিসীম। তাঁদের সম্মান করা, যত্ন নেয়া এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানো সন্তানের দায়িত্ব। শিক্ষকরাও একজন শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের জ্ঞান, শাসন ও পরামর্শ জীবনের সঠিক পথ দেখাতে পারে। তাই পিতা-মাতা ও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নবীনদের জীবনের অন্যতম নৈতিক শিক্ষা হওয়া উচিত। কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধুত্বের প্রভাব গভীর। ভালো বন্ধু মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে; অসৎ সঙ্গ তাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। মাদক, নেশা ও অপরাধ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কাজে ব্যবহার করতে হবে; যেন প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করি। নিজেকে জয় করাই মানুষের বড় বিজয়। রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কথা বলার আগে ভাবতে হবে এবং ভুল হলে ক্ষমা চাইতে শিখতে হবে। নম্রতা ও আত্মসংযম মানুষের সৌন্দর্য বাড়ায়। একই সঙ্গে মানবিক হতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের কষ্ট বোঝা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি। দেশপ্রেম শুধু মুখের কথা নয়; এটি দায়িত্বশীল কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অন্যায়, অসততা ও দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে পারে। পরিবেশ রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব। বৃক্ষরোপণ, নদী-জলাশয় রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে নবীনদের এগিয়ে আসতে হবে। আজকের নবীনরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের জ্ঞান, চরিত্র, শ্রম ও মানবিকতার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে। তাই হে নবীন, জাগো। জ্ঞানকে করো তোমার আলো, সততাকে করো শক্তি, শ্রমকে করো হাতিয়ার এবং মানবতাকে করো জীবনের আদর্শ। পিতা-মাতাকে সম্মান করো, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করো, ভালো সঙ্গ গ্রহণ করো এবং নেশা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো—ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে পাওয়া যায় না, ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে হয়। আজকের ছোট্ট চারাই একদিন মহিরুহ হয়। তেমনি আজকের সচেতন নবীনই আগামী দিনের আলোকবর্তিকা। হে নবীন, জাগো—নিজেকে গড়ো, সমাজকে গড়ো, দেশকে গড়ো।
একটি দেশের নাগরিক হিসেবে জনগণের কিছু মৌলিক অধিকার থাকে। শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি। চিকিৎসা তার মধ্যে অন্যতম। মানুষকে সুস্থ সবলভাবে বাঁচতে হলে তার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে সরকার নানা জায়গায় সরকারি হাসপাতাল নির্মাণ করেছে। তবে কি শুধু হাসপাতাল নির্মাণেই জনগণ রোগ থেকে মুক্তি পাবে? না। জনগণকে তার প্রাপ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন সরকারি হাসপাতালের সঠিক কার্য পরিচালনা। কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে না পারলে জনগণের ভোগান্তি বাড়তে থাকে। সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে টাকা খরচ করে নিজের চিকিৎসা করাতে পারে না। নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত লোকেদের রোগ হলে তাদের ভরসা কেবলই সরকারি হাসপাতালগুলো। তবে সরকারি হাসপাতালগুলো যেন অনিয়মের বেড়াজালে বন্দী। কেবল রোগীর আধিক্য বেশি, সেই অনুযায়ী ডাক্তার কম। রোগীকে পোহাতে হয় অসহ্য যন্ত্রণা অনিশ্চয়তার সাথে। কোনো সময় নেই সিট কিংবা নেই ডাক্তার। দিনের পর দিন রোগী ভর্তি থেকেও বড় ডাক্তারের দেখা নেই। পাশাপাশি চলছে সিট বাণিজ্য, এ যেন সিন্ডিকেটের লীলাখেলা। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও দালালের মাধ্যমে টাকা প্রদান করে একটি সিট পেতে হয়, নাহয় দিতে হয় কোনো রেফারেন্স। হাসপাতালের বারান্দায় কাটাতে হয় রাতের পর রাত। একটি তথ্য সংগ্রহ বা এক একটি টোকেন সংগ্রহ করতে রোগীকে দাঁড়াতে হয় ১০০, ২০০ জনের সিরিয়ালে। এ যেন রোগ ভালো করার বদলে আরও রোগী হওয়ার উপক্রম। কোনো জটিল রোগের টেস্ট করানোর জন্য দৌড়াতে হয় প্রাইভেট হাসপাতালের দোরগোড়ায়; গুনতে হয় হাজার হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালের টেস্টের অপেক্ষায় বসে থাকলে রোগীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি বিভাগে নেই জরুরি বা ইনস্ট্যান্ট সমাধান, নেই পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, যেখানে বসে রোগী অপেক্ষা করবে, নেই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, যা খেয়ে রোগী বা তার স্বজন একটু পিপাসা মিটাবে, নেই স্বাস্থ্যকর কোনো পরিবেশ। হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর অবস্থান এবং যথাতথা অবাধ মানুষের যাতায়াত। এ কেমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ? নেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোনো ওয়াশরুম। হাসপাতালগুলোর ফ্রেশ রুমে ফ্রেশ হওয়ার বদলে যেতে হয় নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। নেই নিয়ম-নীতির বালাই। কোনো হাসপাতালে তো চলছে আরেকটি মরণ ফাঁদ। বহুতল হাসপাতালের ভবনের জন্য দেয়া হয়েছে লিফট, কিন্তু লিফটের ধারণক্ষমতার বাইরে রোগীরা উঠে যাচ্ছে। নেই জীবনের মায়া, দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতন হওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই। ডাক্তারদের অবহেলা, অনিয়ম, দুর্নীতির মাঝে ভুগতে হয় রোগীকে। বিশেষ করে, সদর উপজেলা পর্যায়ের গ্রাম অঞ্চলের হাসপাতালে রোগীরা সুচিকিৎসার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় হাসপাতালে এসে একরাশ হতাশা আর ভোগান্তি নিয়ে ফিরে যায়। এর সমাধান সম্ভব কেবলই সরকারের সজাগ দৃষ্টি আর সঠিক ব্যবস্থাপনায়। রোগীর বিভিন্ন টোকেন সংগ্রহ পদ্ধতির কাজটা স্মার্টভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে, যেন রোগীকে ২, ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়। হাসপাতালগুলোর ওয়াশরুম ব্যবস্থা আরও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা করতে হবে। বহুতল ভবনবিশিষ্ট হাসপাতালে লিফটব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। হাসপাতালে মানুষের যাতায়াতে নিয়ম-শৃঙ্খলাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। জুতা নিয়ে প্রবেশ, মাস্ক পরিধান ইত্যাদি বিষয়গুলোতে আরও বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। হাসপাতালে জটিল রোগ নির্ণয়ের টেস্ট করানোর ব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে। সেই সাথে হাসপাতালে পর্যাপ্ত সরকারি ডাক্তার নিয়োগ করতে হবে, যাতে রোগীর চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়। জরুরি বিভাগগুলোর সেবা আরও উন্নত করতে হবে, যেন জরুরি রোগী সাথে সাথেই সেবা পেতে সক্ষম হয়।
শিক্ষার ক্রমাগত উন্নয়ন একটি আন্দোলন, একটি প্রচেষ্টা। একটি টেকসই শিক্ষা, একটি ন্যায্য এবং দক্ষতার শিক্ষা একটি সমাজ ও দেশকে খুব চমৎকারভাবে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়। শিক্ষা মানব মনের ইতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শিক্ষাই সেই শক্তি, যা সমাজ থেকে কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অপশক্তি ও বিশৃঙ্খলতা দূর করতে সাহায্য করে। সে কারণে প্রতিটি দেশের উন্নয়নের মূল শর্ত শিক্ষিত মানুষের হার বৃদ্ধি করা। তবে লক্ষ রাখতে হবে যে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন বাস্তবায়িত হয় এবং শিক্ষার প্রায়োগিক উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা না হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস পালিত হয়। শিক্ষা অবশ্যই মহান কিন্তু এর বর্তমান প্রয়োগ কতজন মহান মানুষ তৈরি করতে পারছে, তা নিয়েই রয়েছে সংশয়। শিক্ষা যদি পণ্য হয়, তাহলে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে, যা আজকের সমাজে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। নামি-দামি সব দালানকোঠা, দামি দামি স্কুলড্রেস, বড় বড় ল্যাব ইত্যাদি আরও বহুবিধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন হরহামেশাই চোখে পড়ে। তো সেসব প্রতিষ্ঠানে কোন বছরে কত ভালো ফল হয়েছে, তার একটা ফর্দও তুলে ধরা হয়। কিন্তু কোথাও দেখা যায় না সেসব প্রতিষ্ঠান থেকে কতজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে বের হয়েছে তার কোনো হিসাব দিয়েছে। আসলে মানুষ হওয়ার জন্য কোনো বিজ্ঞাপন দরকার হয় না। ওই মানুষ করাটাই শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য, অন্যগুলো কেবল বাহ্যিক আড়ম্বর। ভালো ফলের নিশ্চয়তা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দেয়, কিন্তু মানুষ করার নিশ্চয়তা আজকাল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই দেয় না। তাই শিক্ষা এখন অনেক ক্ষেত্রেই পণ্য। বাজার দরে লাভ-ক্ষতি হিসাব করা হয়। কোন বিভাগে পড়ালেখ করলে কত দামি চাকরি পাওয়া যায় আর সেখানে কী পরিমাণ বেতন, সেসব দিয়েই সন্তানের ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করা হয়। বিবেক বিসর্জন দিয়ে হাত পেতে ঘুষ নিয়ে মনুষ্যত্ব বিক্রি করে জীবন পার করেও কোনো অনুশোচনা হয় না। সেটাই সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। শিক্ষার উদ্দেশ্য তো এটা কোনোকালেই ছিল না। হাত পেতে ঘুষ নিতে যে বিবেক বাধা দেয় না, সেই বিবেকের দায় শিক্ষার নয়। শিক্ষা নামে আধুনিক রমরমা বাণিজ্যের। শিক্ষা এখন এটাই। কতজন মানুষ হলো, এসব দেখে আর কী হবে! বিদ্যা ও বিদ্বান টাকায় বিক্রি হয়। শিক্ষা তার, টাকা আছে যার। টাকা নেই, শিক্ষা পাওয়া যাবে না। শিক্ষা যতটা মহান, একজন শিক্ষার্থীকে ততটাই মহান করার উদ্দেশ্যেই তা ধাবিত হওয়া উচিত। কোনোভাবেই কেবল পাস করা বা শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করা বা চাকরি করার উদ্দেশ্যে শিক্ষা পরিচালিত হওয়া উচিত নয়। কারণ, মহান শিক্ষার উদ্দেশ্য যদি সামান্যতম ভিন্ন খাতেও প্রবাহিত হয়, তাহলে সেই দেশের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক হবে না। আমাদের আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে তো? আমরা শিক্ষিত জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাথে সাথে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি না তো? দিন যাওয়ার সাথে সাথে আজকালকার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে থেকে বই পড়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। সারা দিন মুখ বুজে মোবাইলের স্ক্রিনে ফেসবুক ঘাঁটতে যে আনন্দ জ্ঞান লাভে আর ততটা আনন্দ পায় না। তাই তো নতুন বই পেলে যে একধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়, তা ঠিক আছে কিন্তু কয়েক মাস যেতেই সেই মুগ্ধতা আর থাকছে না। মূল বই থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। ঝুঁকছে গাইড বই, লেকচার শিট, প্রাইভেট পড়া এসবের প্রতি। এসব কিছুই অবশ্য পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য। পাস করা, ভালো ফল করা এসবই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য। অবশ্য আজকালকার সচেতন অভিভাবক মাত্রই সন্তানের ভালো ফল আশা করে। আমিও করি। কিন্তু ভালো ফল করতে গিয়ে যদি পাঠ্য বইয়ের বদলে গাইড বা প্রাইভেট বা লেকচার শিটের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়, তাহলে সেটা একদম ভালো কথা নয়। তারপর আবার এসবের বাইরে গিয়ে পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, কবিতা এসবের ভেতরের যে জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার আছে, তার খোঁজ এরা করছে না। তার কারণও কি শুধুই পরীক্ষায় ভালো ফল? ফলে জ্ঞান হয়ে পড়ছে সীমাবদ্ধ। সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে মুক্ত আকাশের সন্ধান মেলে কি? শুধু পাস করা বা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে (প্রাইভেট বা কোচিংয়ে বেশি সময়) ভালো ফল করা যায় বৈকি, তবে প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় কি? মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মুক্ত জ্ঞানের চর্চা থাকা আবশ্যক। যখন দেখি বইয়ের বদলে ক্লাসের বাইরে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই টিভি সিরিয়াল দেখে, মোবাইল বা ট্যাবে গেমস খেলে বা অপ্রয়োজনীয় কিছু ওয়েবসাইটে ঢুকে সময় কাটাচ্ছে, তাতে আমি মর্মাহত হই। কারণ, এতে তাৎক্ষণিক মনের আনন্দ মিটছে বৈকি, কিন্তু মাথার ভেতর থেকে বই পড়ার ধৈর্যটা কমে যায়। বিষয়টা এমন যে একজন ছাত্র যখন তার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে যে তীব্র আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে, সেই আগ্রহ যদি বইয়ের পৃষ্ঠার প্রতি থাকত, তাহলে কত ভালোই না লাগত। তবে বিষয়টা শুধু আমার ভালো লাগা বা মন্দ লাগার না, বিষয়টা জাতির ভবিষ্যতের। আমাদের মোবাইলের দরকার আছে, কিন্তু মাধ্যমিক শ্রেণিতে পড়ুয়া একজনের দিনের কয়েক ঘণ্টা মোবাইলের সাথে কাটানো কতটা প্রয়োজন আছে, তা বোধগম্য নয়। এর অর্থ আমি প্রযুক্তির বিপক্ষে নই। বিজ্ঞানের আশীর্বাদে মানবসভ্যতা সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার তো চিন্তা একে সঠিকভাবে ব্যবহারের ওপর। ব্যর্থতা শিক্ষার হয় না, ব্যর্থতা হয় শিক্ষার নীতিনির্ধারকদের। কোচিংনির্ভর, প্রাইভেটনির্ভর, গাইডনির্ভর শিক্ষা নিয়ে কতদূর অগ্রসর হওয়া যাবে, তা বলা মুশকিল। এসব রাহু থেকে শিক্ষাকে মুক্ত করে শিক্ষার উদ্দেশ্য সাধনের দিকে এগুতে হবে। তাতেই যে জাতির মঙ্গল হবে। মহান শিক্ষা দিবস পালনের উদ্দেশ্য শিক্ষাকে আরও কার্যকরভাবে জনকল্যাণে প্রয়োগ করা। শিক্ষার সাথে জড়িয়ে আছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এ দুইয়ের সম্মিলন শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, শিক্ষা সম্পদ তৈরি করার একটি মাধ্যম। একটি প্রজন্ম, যাদের এই শিক্ষা দিয়ে বড় করা হচ্ছে, তাদের যথোপযুক্ত করে গড়ে তোলা। নতুন নতুন সিদ্ধান্ত সব সময় না নিয়ে খুব দ্রুত পরিবর্তন না করে কোনো বিষয় ভালোভাবে যাচাই করা দরকার। সমগ্র শিক্ষাকে একটি সরলরৈখিক দাগে উপস্থিত করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হবে বিশ্বমানের, বিশ্ব থেকে পিছিয়ে থাকবে না এটাই প্রত্যাশা।
পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন আমাদের সমাজে একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থীর এক বছরের পরিশ্রম কয়েকটি সংখ্যা, একটি গ্রেড বা একটি রোল নম্বরে এসে থামে। কে প্রথম, কে দ্বিতীয়, কার জিপিএ কত, কে কত নম্বর পেল — এসব প্রশ্নই যেন শিক্ষার প্রধান মাপকাঠি। ভালো ফল অবশ্যই গর্বের। কিন্তু ভালো ফল আর ভালো শিক্ষা এক বিষয় নয়। আমরা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষায় সফল হতে বেশি শেখাই। কোন প্রশ্ন আসতে পারে, কোন উত্তর মুখস্থ করতে হবে, কত নম্বর পাওয়া যাবে — এসব চিন্তা শেখার আনন্দকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয়। বই তখন জ্ঞান অন্বেষণের দরজা না হয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যখন নম্বর পাওয়াই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন শেখার আসল উদ্দেশ্যটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, ফলাফল তখন শিক্ষার্থীর আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম হওয়া শুধু একটি অবস্থান থাকে না, হয়ে ওঠে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ। ফলে একদিন সেই অবস্থান বদলে গেলে কেউ কেউ নিজের মূল্য নিয়েই প্রশ্ন করতে শুরু করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সাকিবুল ইসলাম রিফাতের ঘটনাটি আমাদের সেই জায়গাতেই থামিয়ে দেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত তার পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত রিফাত ধারাবাহিকভাবে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন এবং পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিও পেয়েছিলেন। অষ্টম শ্রেণিতে তার রোল নম্বর এক থেকে দুই হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি তাকে গভীরভাবে মানসিকভাবে আঘাত করে। একই সময়ে করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় তার স্বাভাবিক জীবন ও সামাজিক যোগাযোগও ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে তার মানসিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে এবং তাকে শেকলবন্দী করে রাখার পরিস্থিতি তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রিফাতের মানসিক অবস্থার জন্য শুধু রোল নম্বরকে দায়ী করা ঠিক হবে না। মানসিক স্বাস্থ্য জটিল একটি বিষয়; এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু তার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে, ‘আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু প্রথম হতে শেখাচ্ছি, নাকি পড়ে গেলে আবার উঠে দাঁড়াতেও শেখাচ্ছি?’ একজন শিক্ষার্থীকে যদি ছোটবেলা থেকে বোঝানো হয় যে প্রথম হওয়াই সাফল্য, তাহলে দ্বিতীয় হওয়া তার কাছে ব্যর্থতা মনে হতে পারে। অথচ জীবনে দ্বিতীয় হওয়া তো অপরাধ নয়। কখনো পিছিয়ে পড়াও জীবনের অংশ। শিক্ষার কাজ শুধু জিততে শেখানো নয়, হারকে বুঝতেও শেখানো। আমাদের মূল্যায়নব্যবস্থার আরেকটি সীমাবদ্ধতা এখানেই। সবাই একইভাবে মেধাবী নয়। কেউ পরীক্ষার খাতায় ভালো, কেউ কথা বলায়, কেউ গবেষণায়, কেউ সৃজনশীলতায়, কেউ আবার বাস্তব সমস্যার সমাধানে অসাধারণ। কিন্তু যখন শিক্ষার মূল্যায়ন প্রধানত লিখিত পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তখন অনেক প্রতিভা চোখের আড়ালে থেকে যায়। পরীক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। একজন শিক্ষার্থীর অগ্রগতি বোঝার জন্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরীক্ষা শিক্ষার অংশ, শিক্ষা নিজে নয়। একজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে হবে, নিজের মত প্রকাশ করতে হবে, অন্যের মত শুনতে হবে, ভুল করতে হবে এবং সেই ভুল থেকে শিখতে হবে। শ্রেণিকক্ষে আলোচনা, উপস্থাপনা, দলগত কাজ, প্রকল্প, গবেষণা ও বাস্তব সমস্যার সমাধান তাই শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এতে শিক্ষার্থী শুধু উত্তর মুখস্থ করবে না, উত্তর খুঁজতেও শিখবে। এখানে পরিবার ও শিক্ষকের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। কিন্তু ফলাফল যেন ভালোবাসার শর্ত না হয়ে যায়। একটি নম্বর কমে গেলে যদি সন্তানের মনে হয় সে পরিবারকে হতাশ করেছে, তাহলে সেই নম্বর আর শুধু নম্বর থাকে না, তা হয়ে ওঠে মানসিক চাপের উৎস। সন্তানকে শুধু জিজ্ঞেস করা উচিত নয়, ‘কত পেয়েছ?’ কখনো জিজ্ঞেস করতে হয়, ‘কী শিখেছ?’ আমাদের শিক্ষা এমন হওয়া দরকার, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য পড়বে না, মানুষ হওয়ার জন্যও পড়বে। সে যুক্তি করতে শিখবে, প্রশ্ন করতে শিখবে, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শিখবে এবং ব্যর্থতার পর নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে শিখবে। কারণ, জীবনের বড় পরীক্ষাগুলো কোনো প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে আসে না। সেখানে প্রয়োজন হয় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, বিবেচনাবোধ, যোগাযোগ দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার শক্তি। সনদ একজন শিক্ষার্থীর অর্জনের সাক্ষ্য দিতে পারে, কিন্তু তার শিক্ষার গভীরতা মাপতে পারে না। সনদ প্রমাণ করতে পারে আমরা কী শিখেছি; কিন্তু আমাদের চিন্তাভাবনাই প্রমাণ করে, শিক্ষাটি আমাদের কতটা বদলেছে।
আগামী বছর থেকে দেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নতুন এই শিক্ষাক্রমে শুধু তাত্ত্বিক পড়াশোনাই নয়, বরং লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মাঠে ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হবে। সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর রূপনগর আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এ তথ্য জানিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার শিক্ষাকে আনন্দময় করতে কাজ করছে। শুধু বইভিত্তিক পড়াশোনার পরিবর্তে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যেখানে পড়াশোনা শিক্ষার্থীদের কাছে ভয়ের নয়, বরং আনন্দের বিষয় হয়ে উঠবে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, পাঠ্যক্রমে খেলাধুলার ওপর লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মাঠে ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকবে। এছাড়া বিতর্ক, কোরআন তেলাওয়াত, সংগীত এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাকেও শিক্ষার অংশ করা হবে। শিশু-কিশোরদের সুস্থ শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে শিক্ষার্থীরা মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে থাকবে। খেলার মাঠের সংকট নিরসনে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় খালি সরকারি জমিতে শিশু-কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিদিন পাঠদানের শুরুতে অন্তত ৫ মিনিট নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং সততা ও মানবিকতায় সমৃদ্ধ দেশপ্রেমিক নাগরিক গড়ে তোলা। অনুষ্ঠানে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার সানজিদা ইসলাম তুলিসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে কর্মরত ১৪৫ জন প্রদর্শককে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের প্রভাষক পদে পদোন্নতি দিয়ে নতুন কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশের ভিত্তিতে এই পদোন্নতি কার্যকর করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী ৯ম গ্রেডে বেতন-ভাতা পাবেন। বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতির তালিকায় রসায়নে ৩০ জন, প্রাণিবিদ্যায় ৩৩ জন, পদার্থবিজ্ঞানে ৩০ জন, উদ্ভিদবিজ্ঞানে ৩০ জন, ভূগোলে ৮ জন, গণিতে ৩ জন, গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ৩ জন, মনোবিজ্ঞানে ২ জন, জীববিজ্ঞানে ২ জন এবং মৃত্তিকাবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান ও কম্পিউটার/আইসিটি বিষয়ে একজন করে প্রদর্শক প্রভাষক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের অবমুক্তি ও নতুন কর্মস্থলে যোগদানের প্রক্রিয়াটি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে। আগামী ২১ জুলাই বিকেল ৪টার মধ্যে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদন শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। যথাযথ প্রস্তুতি এবং নথিপত্রের অভাবে মূলত এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আবেদনের আগে কিছু সাধারণ ভুল সম্পর্কে সচেতন থাকলে ভিসা রিজেকশনের ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব। স্টুডেন্ট ভিসা বাতিলের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অসম্পূর্ণ নথিপত্র জমা দেওয়া, আবেদনপত্রে ভুল তথ্য প্রদান এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হওয়া। এছাড়া ভিসা সাক্ষাৎকারে আত্মবিশ্বাসের অভাব, দুর্বল একাডেমিক ফলাফল, শিক্ষা বা কর্মজীবনের দীর্ঘ বিরতির যৌক্তিক ব্যাখ্যা না থাকা, অসংগতিপূর্ণ কোর্স নির্বাচন এবং ভাষার দক্ষতার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারাও ভিসা বাতিলের বড় কারণ। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, আবেদনের আগে সব কাগজপত্র সঠিকভাবে যাচাই করা, সঠিক তথ্য প্রদান এবং সাক্ষাৎকারের জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিলে ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়।
শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে—বিশেষত প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি প্রায় সর্বজনীন হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা—বিশেষত পড়া, লেখা ও গণিতের দক্ষতা—উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল। এই বাস্তবতায় শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয় বরং একটি সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। মানসম্মত শিক্ষক নিশ্চিতকরণে দিতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।বিশ্বব্যাপী গবেষণা বলছে, শিক্ষার মান নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষক। একজন যোগ্য, দক্ষ ও আন্তরিক শিক্ষক একটি দুর্বল অবকাঠামোর স্কুলেও ভালো শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। বাংলাদেশে শিক্ষকসংখ্যা অনেক হলেও শিক্ষকের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ,শিক্ষক পেশার সামাজিক মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধি, ধারাবাহিক in-service training, শিক্ষক মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে শিক্ষকতা একটি উচ্চ মর্যাদার পেশা—যেখানে সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসে। বাংলাদেশের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণ হয়। শিক্ষাবিদদের মতে, একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি হয় প্রাথমিক স্তরে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণি অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। কিছু গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ২৫% শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে প্রত্যাশিত পাঠ ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে পারে। প্রাথমিক স্তরে ভাষা ও গণিত দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীসংখ্যা কমানো, শিশু-কেন্দ্রিক ও আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রাধিকারযোগ্য। পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। এর ফলে শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার পরিবর্তে মুখস্থবিদ্যায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা থেকে বের হয়ে দক্ষতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। সমালোচনামূলক চিন্তা ও সমস্যা সমাধান দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজার ও বাস্তব জীবনের সাথে সংযুক্ত করা সময়ের দাবী। এক্ষেত্রে ফিনল্যান্ডের শিক্ষা মডেল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে পরীক্ষার চেয়ে শেখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু বাংলাদেশে প্রযুক্তি ব্যবহারে শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় বৈষম্য রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৭% নিয়মিত ইন্টারনেট সংযোগ সমস্যার মুখোমুখি হয়, যা ডিজিটাল শিক্ষাকে সীমিত করে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ল্যাব, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, অনলাইন ও হাইব্রিড শিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়ন জরুরি। শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শিক্ষা উন্নয়নের অনেক প্রকল্প থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। গত এক দশকে প্রাথমিক শিক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষা প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ,বিদ্যালয় পর্যায়ে শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি। শিক্ষায় সমতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশে দরিদ্র, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ এখনো সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, শিশুশ্রম ও অল্প বয়সে বিয়ে শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত করে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যালয় ও শিক্ষক প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া শিক্ষার সাথে কর্মসংস্থানের সংযোগ থাকা প্রয়োজন। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন অনেক তরুণও কর্মসংস্থানের সংকটে পড়ে। STEM শিক্ষা ও উদ্ভাবনী দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সম্প্রসারণে শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সাফল্য নয়, এখন প্রয়োজন শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষক উন্নয়ন, শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষা, আধুনিক পাঠ্যক্রম, প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্প্রসারণ, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষায় সমতা—এই ছয়টি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে যদি এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা যায়, তবে শিক্ষাই হবে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। ড. মো. বিল্লাল হোসেন উপাধ্যক্ষ মোশাররফ হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কাঁচপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।