Breaking news

রূপপুর

কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে ইউরেনিয়াম

পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য আনা পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়ামের নতুন চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। একইসাথে প্রথম ইউনিটের রিফুয়েলিংয়ের প্রয়োজনীয় জ্বালানিও এ চালানের সাথে আনা হয়েছে।   শনিবার ৩ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ইউরেনিয়াম বহনকারী বিশেষ বহরটি কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রবেশ করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে বিশেষ রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা পুরো পরিবহনে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।   এর আগে শুক্রবার রাতে রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম নিয়ে একটি বিশেষ কার্গো বিমান ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরে শনিবার সকালে নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তিনটি বিশেষ লরিতে করে ইউরেনিয়ামের চালানটি রূপপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রওনা হয়।   প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চালানটি গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে ইউরেনিয়াম বহনকারী কার্গো উড়োজাহাজকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেয়ায় নির্ধারিত সময়ে ফ্লাইটটি পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ফলে চালান পৌঁছাতে সময় লাগে।   রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি এর আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে আনা হয়। চলতি বছরের মে মাসে সেই জ্বালানি প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে স্থাপন করা হয়েছে। শিগগিরই ওই ইউনিটে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।   ২০১৩ সালে ১,২০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট নিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়। দুটি ইউনিট থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মাণাধীন প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।

অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
আকাশসীমার বাধা পেরিয়ে রূপপুর প্রকল্পের ইউরেনিয়াম আসছে আজ

পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের জটিলতা কাটিয়ে রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম আজ শুক্রবার ২ অক্টোবর দেশে আসছে। বিশেষ কার্গো উড়োজাহাজে করে ইউরেনিয়াম দুপুরের মধ্যে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। শনিবার কঠোর নিরাপত্তায় তা রূপপুরে নেয়া হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।   এর আগে বৃহস্পতিবার ইউরেনিয়াম আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে উড়োজাহাজের ফ্লাইট বাতিল করা হয়। পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না দেয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।   সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সাতটি এবং প্রথম ইউনিটের জ্বালানি পুনঃভরণের জন্য দুটি—মোট নয়টি চালানে ইউরেনিয়াম দেশে আনা হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো সরবরাহ শেষ করার কথা রয়েছে। সব ঠিক থাকলে ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের একমাত্র পারমাণবিক কেন্দ্রটি থেকে প্রাথমিকভাবে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে।   নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহিদুল হাসান বুধবার রাতে জানান, আগের রাত থেকে শুরু হওয়া পরীক্ষাটি প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ—উভয় স্থান থেকেই পরিচালনা করা হয়। পরীক্ষার সময় নিয়ন্ত্রণ ভালভগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। এগুলোর কার্যক্রম সন্তোষজনক পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রধান নিরাপত্তা ভালভের কার্যক্রম ও প্রতিক্রিয়াও পরীক্ষা করা হয়।   এ সময় ভালভের প্রতিক্রিয়া, খোলা ও বন্ধ হওয়ার কার্যক্রম, সতর্কসংকেত এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরীক্ষা শুরুর আগে ও চলাকালে যোগাযোগব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা ও বিকিরণ নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা হয়। পরবর্তী ধাপে প্রায় ১৮ মেগাপাসকেল চাপে আরও একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কমিশনিং দল ধাপে ধাপে এগিয়ে প্রতিটি পর্যায় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে।   গত ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা ভালভের ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে ত্রুটি মেরামত বা বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর নির্দিষ্ট সময়সীমা তখন জানানো হয়নি।  

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বায়েক অফিসে গভীর রাতে অগ্নিকাণ্ড

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বায়েক) অফিসে গভীর রাতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে বায়েকের সার্ভার রুমসহ আশপাশের কয়েকটি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনে পুড়ে গেছে কম্পিউটার, এসি, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ইন্টারনেট সার্ভারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।   রোববার ৬ সেপ্টেম্বর দিনগত রাত ৩টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে। তবে মঙ্গলবার ৮ সেপ্টেম্বর বিষয়টি জানা গেছে।   প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অগ্নিকাণ্ডের পর বায়েকের দুটি ভবনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঘটনার প্রায় ৪০ ঘণ্টা পরও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনায় বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।   সূত্রমতে, বায়েকের সার্ভার রুমে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া আশপাশের কয়েকটি কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঈশ্বরদী ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।   রূপপুর গ্রিনসিটি মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের অভ্যন্তরে আগুন লাগার খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। আগুনে বায়েকের অফিসের বিভিন্ন কম্পিউটার, এসি, কাগজপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও ইন্টারনেট সার্ভারের যন্ত্রাংশ পুড়ে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।  

সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৬ 0
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে বিশেষ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মক্ষমতা, উৎপাদন কার্যকারিতা ও কারিগরি তথ্য বিশ্লেষণ আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত করতে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সূচকসমূহ গণনাব্যবস্থা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে এ প্রশিক্ষণের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন বিভাগের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা অংশ নেন।   অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাশিয়ার রোসেনেরগোঅ্যাটমের বাংলাদেশ শাখার পরিচালক সিনিয়াকভ ভাদিম ভ্লাদিমিরোভিচ। সভাপতিত্ব করেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাছান। স্বাগত বক্তব্য দেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চিফ সুপারিন্টেন্ডেন্ট মো. ইয়ামিন আলী।   সভাপতির বক্তব্যে ড. জাহেদুল হাছান বলেন, আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মক্ষমতা ও উৎপাদন কার্যকারিতা বিভিন্ন কারিগরি, পরিচালনাগত ও অর্থনৈতিক সূচকের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন সিস্টেম, ইকুইপমেন্ট ও অপারেশনাল প্যারামিটারের পরিবর্তন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ইউনিটের সামগ্রিক কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।   তিনি বলেন, কারিগরি ও অর্থনৈতিক সূচকসমূহ গণনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে অপারেশনাল প্যারামিটার এবং সিস্টেম ও ইকুইপমেন্টের পরিবর্তন বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ইউনিটের কর্মক্ষমতায় কী প্রভাব ফেলছে, তা তথ্যভিত্তিক ভাবে মূল্যায়ন করা যাবে।   তিনি আরও বলেন, একটি উৎপাদন ইউনিটের বিভিন্ন সিস্টেম ও প্যারামিটারের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই কোনো একটি সিস্টেম বা প্যারামিটারের পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবস্থা ও সামগ্রিক উৎপাদন কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে। এসব প্রভাব সঠিকভাবে মূল্যায়নে সূচকসমূহের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।   ড. মোঃ জাহেদুল হাছান আশা প্রকাশ করেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের কর্মক্ষমতা, অপারেশনাল অবস্থা এবং কারিগরি ও অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণে বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করবেন। এ দক্ষতা ভবিষ্যতে তথ্য বিশ্লেষণ, উৎপাদন কার্যকারিতা মূল্যায়ন, প্রতিবেদন প্রণয়ন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে।   প্রধান অতিথি সিনিয়াকভ ভাদিম ভ্লাদিমিরোভিচ প্রশিক্ষণার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান অর্জন এবং তা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের আহ্বান জানান।   অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি চিফ সুপারিন্টেন্ডেন্ট দিমিত্রি কজলভ, ডেপুটি চিফ সুপারিন্টেন্ডেন্ট মোঃ গোলাম শাহিনুর ইসলাম, ডেপুটি ডিরেক্টর মুশফিকা আহমেদ, ডেপুটি চিফ সুপারিন্টেন্ডেন্ট মোঃ ওয়াজিহুর রহমান, ডেপুটি চিফ সুপারিন্টেন্ডেন্ট মোঃ মিজানুর রহমান, চিফ ইঞ্জিনিয়ার ইরতিয়াজ মাহমুদ এবং ব্যবস্থাপক মোঃ সোলায়মানসহ বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সদস্যরা।   অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রোডাকশন অ্যান্ড টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্টের (পিটিডি) প্রধান রাজু আহম্মেদ।   বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এ প্রশিক্ষণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণ, কারিগরি তথ্য বিশ্লেষণ ও উৎপাদন কার্যকারিতা মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।   পরে প্রধান অতিথি ও সভাপতি আনুষ্ঠানিকভাবে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সূচকসমূহ গণনাব্যবস্থা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন ঘোষণা করেন।  

সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬ 0
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ এবং ইউনিট-২-এর বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) আধুনিক (এসসিএডিএ/ইএমএস) নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) ও জিই ভারনোভার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দায়িত্বশীল একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।   প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ২ সেপ্টেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১ ও ইউনিট-২-এর বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা এবং ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি জিআইএস সাবস্টেশনের প্রয়োজনীয় তথ্য এনএলডিসির এসসিএডিএ/ইএমএস ব্যবস্থায় সংযুক্ত করার লক্ষ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির আওতায় রূপপুরের দুই ইউনিটের আটটি সঞ্চালন লাইন এবং ৪০০ কেভি ও ২৩০ কেভি জিআইএস সাবস্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারিত সিগন্যাল ও তথ্য জাতীয় গ্রিডের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় ইন্টিগ্রেট করা হবে। এর ফলে জাতীয় গ্রিড পরিচালনার সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্য ও সংকেত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।   তথ্যনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এনএলডিসির এসসিএডিএ/ইএমএস ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার ইন্টিগ্রেশন কার্যক্রম জিই ভারনোভার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এনএলডিসির এসসিএডিএ/ইএমএস ব্যবস্থায় যুক্ত করার কার্যক্রম জিই ভারনোভার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিষয়ে মতামত দেয়া হয়েছে।  

সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬ 0
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সাগরচুরি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সাগরচুরি : ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির বিল তোলা হয় প্রায় ২১৪

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরকারি মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ উঠে এসেছে বিশেষ নিরীক্ষায়। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ৯ অর্থবছরে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয়, ক্রয়প্রক্রিয়া ও তদারকি নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।   শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাবেই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির পরিদর্শনে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর হালনাগাদ কোনো কর্মপরিকল্পনা প্রকল্প কার্যালয়ে নেই। অসমাপ্ত কাজের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি। ফাপাডের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।   সূত্র জানিয়েছে, দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী সময়ে ২২ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। মোট ব্যয়ের মধ্যে ৯ বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা।   নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রথম পাঁচ অর্থবছরেই ৪১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আপত্তির পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই বছর ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার অডিট আপত্তি তোলে ফাপাড। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ৩ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।   বিশেষ নিরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন এলাকায়। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টি আপত্তি তোলা হয়েছে। এসব আপত্তির বড় অংশই নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনা এবং বিল পরিশোধসংক্রান্ত।    নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনায় সরকারি মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্রে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হলেও অন্য কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে মোট দরকে ‘গ্রহণযোগ্য’ রাখা হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আড়ালে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনিয়মের অন্যতম উদাহরণ গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়।    নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা। অথচ একই সরঞ্জাম কেনায় বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু এই একটি খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।   একটি ভবনের হিসাবেই এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট। উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, ট্রান্সফরমার, নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেল এবং জেনারেটরের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। কিন্তু একই সরঞ্জামের জন্য বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এতে একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।   রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অনিয়ম ছিল বালিশ কেনা। বিশেষ নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়। এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। বালিশগুলোর প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অথচ এগুলো কেনা হয়েছে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।   বিশেষ নিরীক্ষার তথ্য বলছে, বালিশকাণ্ড ছিল অনিয়মের একটি ছোট অংশ। গ্রিন সিটির ২০টি আবাসিক ভবনের নির্মাণ ও ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নিরীক্ষকরা ২৯৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য তুলে ধরেছেন। এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, মূল্য নির্ধারণে অসংগতি এবং চুক্তির শর্ত অনুসরণ না করার অভিযোগ করা হয়েছে।   আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। সংস্থাটির পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা যায়নি। দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। প্রকল্প দপ্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কোনো হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। এমনকি অসমাপ্ত কাজের তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি।   প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের প্রতিবছর প্রকল্প বাস্তবায়নের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়নি।    প্রকল্প দপ্তর জানিয়েছে, এ বিষয়ে একাধিকবার তাগিদ দেয়া হলেও নতুন কর্মপরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় আইএমইডি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দ্রুত হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা সংগ্রহ, প্রকল্পের সব অসমাপ্ত কাজের তালিকা প্রস্তুত, নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে।  জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে এসব পদক্ষেপ জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।    জানতে চাইলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধিগত দুর্বলতার বিষয়টি প্রকাশ করে। বিশেষ করে, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) পরিপালনে দুর্বলতা ছিল বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যদি ক্রয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হতো, তাহলে এত অডিট আপত্তি হওয়ার কথা নয়।    তিনি আরও বলেন, এটিকে শুধু প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা হিসেবে দেখলে হবে না। প্রকল্প তদারকি ও সুপারভিশনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত। মন্ত্রণালয়ের স্টিয়ারিং কমিটি এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, ক্রয়প্রক্রিয়া আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না। যেহেতু এসব সিদ্ধান্ত তাদের অনুমোদনের মধ্য দিয়েই হয়েছে, তাই তাদেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।   ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারিগরি প্রযুক্তি সরবরাহ ও ঋণদাতা দেশটি (রাশিয়া) শুধু একটি পারমাণবিক পরাশক্তি নয়, বৈশ্বিক দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। দেশটি চরম উদ্বেগজনক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হিসেবে চিহ্নিত। এ বাস্তবতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে আপাদমস্তক যোগসাজশের দুর্নীতিসহ ব্যাপক অনিয়ম যেমন অস্বাভাবিক নয়, তেমনই প্রতারণামূলকভাবে চুক্তির শর্তভঙ্গের ঘটনাও বিস্ময়কর নয়।    তিনি বলেন, প্রকল্পটি যখন অনুমোদিত হয় এবং চুক্তি সম্পাদিত হয়, তখন যেমন সংশ্লিষ্টদের রাশিয়া ও রোসাটম সম্পর্কে জানার সুযোগ ছিল, তেমনই বর্তমানেও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে সেটি অজানা নয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পতিত কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্র্রের চাপিয়ে দেয়া বিশাল এই বোঝা লাঘবের জন্য নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মের যথাযথ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতি প্রতিরোধব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

জুলাই ২৩, ২০২৬ 0
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি: চেরনোবিল-ফুকুশিমার সঙ্গে তুলনা অমূলক

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি দূর করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুরে ব্যবহৃত থার্ড-জেনারেশন প্রযুক্তির কারণে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এর নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান জানান, রূপপুরে অত্যাধুনিক Generation-III+ VVER-1200 প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা অতীতের সব পারমাণবিক দুর্ঘটনার শিক্ষা থেকে তৈরি। কেন্দ্রটিতে কোর ক্যাচার, প্যাসিভ হিট রিমুভাল সিস্টেম এবং ডাবল কন্টেইনমেন্টের মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম। কমিশনিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত কঠোর একটি শিল্পপ্রক্রিয়া, যা তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), আইএইএ (IAEA) এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো ধরনের কারিগরি দুর্বলতা নয়, বরং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রতিটি পরীক্ষা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তাই প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
আগস্টেই রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

  চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ১,০০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এসব বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসানের সঙ্গে কথা হলে তিনি কেন্দ্রটির নিরাপত্তা, পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তদারকি কাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেন।  ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক স্বাধীন কারিগরি, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তা সংস্থার সমন্বিত তদারকির মাধ্যমে এর প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হয়।  তিনি জানান, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্ব পালন করছে। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড আইন অনুযায়ী কেন্দ্রটির অপারেটিং অর্গানাইজেশন। কমিশনিং, নিরাপদ পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে ডিকমিশনিং পর্যন্ত সব অপারেশনাল দায়িত্ব এনপিসিবিএলের ওপর ন্যস্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স প্রদান করছে। কমিশনিং কার্যক্রমের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের জন্য বিএইবিএ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ভিও সেফটিকে এক্সপার্ট অর্গানাইজেশন হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার সিআরইএ কমিশনিং, অপারেশনাল প্রস্তুতি, অপারেটর প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান স্থানান্তরে এনপিসিবিএলকে সহায়তা করছে। রাশিয়ার স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা Rostechnadzor গুরুত্বপূর্ণ কমিশনিং পর্যায়ে বিএইআরএর সঙ্গে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময় করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বিভিন্ন Peer Review Mission ও Technical Review পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রস্তুতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়ন করছে এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ড. জাহেদুল বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করেই গ্রহণ করা হয়। এনপিসিবিএল এখনো দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি—এমন সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হলো দক্ষ জনবল ও শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকার এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ, বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তা, রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী রাশিয়াসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। তারা Full Scope Simulator, On-the-Job Training এবং Classroom Training-সহ আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। একই সময়ে সিআরইএর বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে এনপিসিবিএলের কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা অনুযায়ী জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা স্থানান্তর নিশ্চিত করছেন। ফলেএনপিসিবিএল বর্তমানে প্রযুক্তিগত, অপারেশনাল ও প্রাতিষ্ঠানিক—সব দিক থেকেই দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য একটি সক্ষম Operating Organization হিসেবে গড়ে উঠেছে।  স্পেন্ট ফুয়েল (ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি) ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি—এমন আলোচনার প্রসঙ্গে ড. জাহেদুল বলেন, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শিল্পের প্রচলিত পদ্ধতি সম্পর্কে সীমিত ধারণার কারণেই এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মধ্যে চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও টিভিইলের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আইএইএর নিরাপত্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নকশার অংশ হিসেবে নির্মিত স্পেন্ট ফুয়েল পোলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়, যা বিশ্বের সব আধুনিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেই অনুসরণ করা হয়।   পরবর্তীতে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি, বাণিজ্যিক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হয়। উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিবিইআর-১২০০ মডেলের তৃতীয় প্রজন্মের দুটি রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, রিয়্যাক্টরগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণে সক্ষম। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।  

জুলাই ১৬, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0