প্রতিটি সৃষ্টি মূল্যবান। কোনো প্রাণী নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি; সৃষ্টিকর্তা এমনি এমনি সৃষ্টি করেননি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সব প্রাণীর বাঁচার অধিকার রয়েছে। ওদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করবেন না, পারলে সহানুভূতিশীল হয়ে পাশে দাঁড়ান। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় প্রাণীগুলো মানুষের ভালোবাসারই অপেক্ষায় থাকে। বিশেষ করে যেসব কুকুর-বিড়াল রাজপথে কিংবা অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায়, তাদের জীবনের বড় একটা অংশ কাটে অনাহারে। নিজের খাবারের সামান্য একমুঠো ওদের তুলে দিলে তাদের ক্ষুধার কষ্ট মেটে, আর বিনিময়ে পাওয়া যায় নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র ঠান্ডার সময়ে প্রাণীগুলোকে তাড়িয়ে না দিয়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ দিন। ওদের কৃতজ্ঞ চোখের চাহনিই আপনাকে বুঝিয়ে দেবে এই সামান্য দরদের মূল্য। ওদের গায়ে ছোটখাটো ক্ষত বা ঘা দেখলে অবহেলা করবেন না। ঘরে থাকা সামান্য হলুদের গুঁড়া কিংবা সামান্য কিছু টাকার একটু অ্যান্টিসেপটিক মেডিসিন ওদের ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তুলতে পারে। এতে শুধু তারাই সুস্থ থাকে না, সংক্রমণ থেকে আমাদের চারপাশের পরিবেশও নিরাপদ থাকে। পাখি শিকার বন্ধে সচেতন হোন এবং চোখের সামনে কোনো প্রাণীকে নির্যাতন হতে দেখলে তার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ওদের কথা বলার ভাষা নেই, নিজের অধিকার দাবি করার শক্তি নেই। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমরা যদি এই অবলা প্রাণীগুলোর পাশে না দাঁড়াই, তবে ওদের আগলে রাখবে কে! সামান্য সহানুভূতি দিয়েই শুরু হোক আমাদের পশুপাখিদের ভালোবাসার এই পথচলা।
বিকেলের তপ্ত রোদটা যখন ইট-কাঠের দালানে ঢলে পড়ে, তখন শাকিলের দিনটা যেন নতুন করে শুরু হয়। সকালে মেসেজ কুরিয়ারের ছোটখাটো কাজ সেরে বিকেলে তাকে ছুটতে হয় গলির ভেতরের সেই একতলা বাসাটার দিকে। গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করা হয়ে ওঠেনি, অল্প বিদ্যা আর অদম্য জেদ নিয়েই ঢাকা শহরে শাকিলের সংগ্রাম। কাজের ফাঁকে তিনটে প্রাইমারি স্কুলের শিশুকে পড়িয়ে যে কটা টাকা পায়, তা দিয়ে নিজের শহরের খরচ চালিয়ে গ্রামের বুড়ো বাবার হাতে কিছু তুলে দিতে পারে—এটাই তার আপাতত পরম তৃপ্তি। শহরের রূপ বিচিত্র। এখানে রোজ কত শত মানুষ আসে, কত রঙিন আলো জ্বলছে, আবার নিভেও যায়। শাকিল এই চাকচিক্যের ভিড়ে নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই ভালোবাসে। তবে পুরুষ হিসেবে তার একধরনের শান্ত আর দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব আছে, যা খুব সহজেই মানুষের চোখ টানে। যে পরিবারে পড়াতে যায়, সেখানকার বড় মেয়ে রিয়া মাঝে মাঝেই চা দেয়ার বাহানায় পড়াশোনার ছলে বসে থাকে। একদিন বেশ স্পষ্ট করেই বলেছিল, “শাকিল ভাই, আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনি অন্য ছেলেদের মতো নন।” শাকিল সেদিন মুচকি হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেছিল, “পড়াশোনা আর কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি রিয়া, ভালো লাগা-ভালোবাসার মতো বিলাসী ভাবনার সময় আমার ঘড়িতে মেপে দেয়া নেই।” সরাসরি ‘না’ বলে কাউকে আঘাত করার মতো রূঢ় সে নয়, তাই কথা ঘুরিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই তার পুরোনো কৌশল। কারণ, শাকিলের একটাই লক্ষ্য—আগে নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো, পরিবারকে একটু স্বস্তির মুখ দেখানো। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রেম বা মোহে নিজেকে জড়ানো তার সাধ্যের বাইরে। কিন্তু মন তো আর সব সময় হিসাব মেনে চলে না। সব নিয়ম এলোমেলো হয়ে গেল তন্নীকে দেখে। তন্নী ওই বাড়িরই দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়, গ্রামের মেয়ে, শহরের কলেজে ভর্তি হতে এসেছে। দেখতে খুব অসাধারণ কিছু না হলেও তার ভেতরে একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ছিল। খুব ছোটখাটো বিষয়ে তন্নীর মায়া আর বিচক্ষণতা শাকিলকে অবাক করত। শিশুদের পড়ানোর সময় তন্নী যখন নিঃশব্দে এক গ্লাস জল রেখে যেত, কিংবা শিশুগুলোর ভুলত্রুটি মায়ামাখা গলায় শুধরে দিত—শাকিল মুগ্ধ হয়ে শুধু চেয়ে থাকত। তন্নীর স্বাবলম্বী হওয়ার অদম্য ইচ্ছা আর বিনয় শাকিলের হৃদয়ের কোনো এক গোপনে গভীর দোলা দিয়েছিল। যে শাকিল কখনো কোনো মেয়ের দিকে দ্বিতীয়বার তাকাত না, সে এখন পড়ার টেবিল থেকে লুকিয়ে তন্নীকে খোঁজে। তন্নী হাসলে তার মনে হয় বিকেলের এই ধুলোবালি মাখা শহরটাও যেন একমুহূর্তে শান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু শাকিল তার এই ভালো লাগার কথা তন্নীকে কোনো দিন বলতে পারেনি। না সরাসরি, না কোনো ইশারায়। নিজের বর্তমান অপ্রতুল আয়, অসম্পূর্ণ শিক্ষা আর কাঁধে চেপে থাকা হাজারটা দায়িত্ব তাকে বারবার থামিয়ে দেয়। ভালো লাগার প্রকাশ মানেই তো একটা বড় অঙ্গীকার, যা দেয়ার মতো সামর্থ্য তার এখনো হয়নি। আজও পড়া শেষে টেবিল থেকে ওঠার সময় তন্নী সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে শাকিলের ফেলে যাওয়া ডায়েরিটা তুলে দিয়ে বলল, “আজ তো আপনার ডায়েরিটা ফেলে যাচ্ছিলেন, শাকিল ভাই।” শাকিল হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা নিল। তন্নীর চোখে চোখ পড়তেই বুকের ভেতরটা অচেনা এক ঝড়ে কেঁপে উঠল। কত কি বলতে ইচ্ছে করল! ইচ্ছে করল বলতে, ‘তুমি পাশে থাকলে এই কঠিন শহরটাকেও আমার খুব আপন মনে হয়।’ কিন্তু মুখ ফুটে বের হলো শুধু, “ধন্যবাদ, তন্নী।” তন্নী একটু হেসে ভেতরের ঘরে চলে গেল। শাকিল গলি পেরিয়ে মূল রাস্তায় এসে দাঁড়াল। শহরের ব্যস্ত ট্রাফিকের লাইট জ্বলছে আর নিভছে। শাকিল পকেটে হাত দিয়ে বুকভরে নিশ্বাস নিল। সে জানে, এই ভালো লাগা সে বুকের গভীরেই চেপে রাখবে, অন্তত যতদিন না সে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে। কবে সে মনের সব আগল ভেঙে এই না-বলা কথাগুলো তন্নীকে বলতে পারবে? সেই সাহসের পুঁজি জমা করার লড়াইয়ে শাকিল আবার নিজেকে সঁপে দিল শহরের কোলাহলে। তাদের এই মিষ্টি, অনুচ্চারিত প্রেম রয়ে গেল বিকেলের এক অমলিন, অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে। পাঁচটি বছর যেন ঝড়ের বেগে কেটে গেল। এই পাঁচ বছরে ঢাকা শহরের ট্রাফিক বদলেছে, কত উঁচু দালান মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, আর শাকিলের জীবনটাও পাল্টে গেছে অনেকটাই। অদম্য চেষ্টা আর রাতের পর রাত এক করে পরিশ্রম করার ফল সে পেয়েছে। ছোটখাটো কাজ আর টিউশনি ছেড়ে শাকিল এখন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ভালো পদে কর্মরত। গ্রামের বাড়িতে বাবার হাতে এখন আর দেনার বোঝা নেই, বরং ছোট বোনের পড়ার খরচ সে নিজেই চালায়। শাকিল এখন আর সেই দিশেহারা তরুণ নয়, সে এখন স্বাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী এক পুরুষ। এত কিছুর পরও শাকিলের বুকের ভেতর একটা জায়গা সব সময় খালি রয়ে গিয়েছিল। বহু চেনা-অচেনা মুখের ভিড়েও সে একটা মুখকে কখনো ভুলতে পারেনি—তন্নী। পড়ানোর পাঠ চুকিয়ে সে যখন ওই বাসা ছেড়েছিল, তন্নীর সেই মায়াবী চোখজোড়া শেষবারের মতো তাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। শাকিল তা বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করে চলে এসেছিল শুধু নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করার জন্য। আজ অফিসে একটা বড় প্রজেক্টের কাজে শাকিলকে যেতে হয়েছে ধানমন্ডির এক স্বনামধন্য সামাজিক উন্নয়ন সংস্থায়। মিটিং শেষ করে করিডর দিয়ে বের হওয়ার সময় হঠাৎ একটি পরিচিত কণ্ঠ শুনে শাকিল থমকে দাঁড়াল। “শিশুদের এই ড্রয়িং ওয়ার্কশপের তালিকাটা একটু দেখে দিন না...” কণ্ঠটা শুনেই শাকিলের বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল। দরজার পাশে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে তন্নী! শাড়ি পরা, চশমার আড়ালে সেই আগের মতোই স্নিগ্ধ এক জোড়া চোখ। তন্নীও হঠাৎ নজর ফেরাতেই শাকিলকে দেখতে পেল। মুহূর্তের জন্য পুরো করিডরটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। “শাকিল ভাই...” তন্নীর গলা দিয়ে সামান্য আওয়াজ বের হলো, যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না সে। শাকিল হালকা হেসে এগিয়ে এল, “কেমন আছ তন্নী? বহু বছর পর...” “আমি... আমি ভালো আছি। আপনি এখানে?” তন্নীর চোখে বিস্ময় আর আনন্দের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। মিটিং শেষে দুজনে এসে বসল কাছের এক শান্ত ক্যাফেতে। কথায় কথায় জানতে পারল, তন্নী পড়াশোনা শেষ করে এই প্রতিষ্ঠানেই শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে। সেও আর আগের সেই ছোট মেয়েটি নেই, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। চা পানের ফাঁকে তন্নী একটু হেসে বলল, “আপনার সেই পুরোনো ডায়েরিটা কিন্তু এখনো আমার কাছে আছে শাকিল ভাই। সেদিন আপনি ফেলে গিয়েছিলেন, আর কোনো দিন ফেরত নিতে আসেননি।” শাকিল চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তন্নীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। আজকের শাকিলের চোখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো হীনম্মন্যতা নেই। “সেদিন ডায়েরিটা হয়তো ইচ্ছা করেই ফেলে গিয়েছিলাম তন্নী, যাতে কোনো না কোনো বাহানায় তোমার কাছে ফিরে আসার একটা সুযোগ থাকে”, শাকিলের কণ্ঠ গভীর ও স্পষ্ট। তন্নী একটু চমকে উঠে শাকিলের দিকে তাকাল। শাকিল এক মুহূর্ত থামল, তারপর খুব নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “তখন আমার নিজের বলতে কিছু ছিল না, কাঁধে ছিল অনেক দায়িত্ব। তাই মনের ভেতরে থাকা অনুভূতির কথাগুলো বলতে পারিনি। ভেবেছিলাম, নিজেকে যোগ্য করে তবেই বলব। আজ কি সেই না-বলা কথাগুলো শোনার সময় হবে তোমার?” তন্নীর চোখ দুটো জলে ভরে উঠল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একচিলতে মিষ্টি হাসি। সে মাথা নিচু করে শুধু বলল, “আমি তো এ কথাগুলো শোনার জন্যই এতদিন কারও দিকে তাকাইনি শাকিল ভাই।”
ক্যাফেটেরিয়ার আড্ডা শেষ করে বের হতেই বৃষ্টি নামল। অবন্তীর সঙ্গে কোনো ছাতা ছিল না। সে ভেবেছিল, হয়তো মিনিট দশেকের মধ্যে বৃষ্টি থেমে যাবে। কিন্তু শ্রাবণের বৃষ্টি কি আর এত সহজে থামে? ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়াল নীলাদ্রী। হাতে একটি পুরোনো নীল রঙের ছাতা। “বাড়ি ফিরবে তো? এসো, অর্ধেক রাস্তা এগিয়ে দিই”, নীলাদ্রী সহজ গলায় বলল। অবন্তী আর নীলাদ্রী একই বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর পড়েও কখনো খুব বেশি কথা বলেনি। দুজন যেন দুই মেরুর মানুষ। অবন্তী চুপচাপ, নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকা এক নিজস্ব পৃথিবীতে বাঁচতে ভালোবাসে। আর নীলাদ্রী—ক্যাম্পাসজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক চঞ্চল, প্রাণবন্ত নাম। নীল ছাতার নিচে দুজন পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। বৃষ্টির একটানা শব্দে চারপাশে যেন তৈরি হলো এক অদ্ভুত নীরবতা। “তুমি সব সময় এত চুপচাপ কেন, অবন্তী?” হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ প্রশ্ন করল নীলাদ্রী। অবন্তী একটু হেসে বলল, “বলার মতো খুব বেশি কথা থাকে না হয়তো।” “কথা কি সব সময় বলতে হয়? কিছু কথা তো বুঝে নেয়ারও থাকে”, নীলাদ্রী মৃদু গলায় বলল। সেদিনের সেই দশ মিনিটের হাঁটাই ছিল তাদের গল্পের শুরুর রেখা। এরপর ছোট ছোট কারণ তৈরি হতে লাগল। লাইব্রেরিতে পাশাপাশি বসে বই পড়া, একসঙ্গে ক্যাম্পাসের টং দোকানে চা খাওয়া, ক্লাসের নোট আদান-প্রদান—সবকিছুই যেন অজান্তে তাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে লাগল। অবন্তী একদিন খেয়াল করল, নিজের চারপাশে তৈরি করে রাখা শক্ত দেয়ালগুলো সে ধীরে ধীরে নামিয়ে আনছে—শুধু নীলাদ্রীর হাসির সামনে। বছর ঘুরল। পড়াশোনা শেষ হলো। দুজনই আলাদা চাকরিতে যোগ দিল। শহরের ব্যস্ততা তাদের দিনের অনেকটা সময় কেড়ে নিলেও তাদের মধ্যকার সেই দূরত্ব আর বাড়ল না; বরং অদৃশ্য এক টানে তারা একে অপরের আরও কাছে থেকে গেল। একদিন শেষ বিকেলে অবন্তীর ছাদের দরজায় কড়া নাড়ল নীলাদ্রী। আকাশ তখন হালকা লালচে আর বেগুনি রঙে রাঙা। পশ্চিম দিগন্তে সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নীলাদ্রী পকেট থেকে ছোট্ট একটি নীল ফিতা বের করে অবন্তীর হাতে দিল। “এটা কী?” অবন্তী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। নীলাদ্রী মৃদু হেসে বলল, “সেই প্রথম দিনের কথা মনে আছে? তোমার সঙ্গে যে নীল ছাতাটার নিচে হেঁটেছিলাম? ছাতাটা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এই ফিতাটা আমি ফেলে দিইনি।” অবন্তী ফিতাটার দিকে তাকাল। তারপর তাকাল নীলাদ্রীর চোখের দিকে। সেখানে ভালোবাসার কোনো বিরাট দাবি ছিল না। ছিল না কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতিও। ছিল শুধু হাজারটা সাধারণ মুহূর্ত একসঙ্গে কাটিয়ে দেয়ার এক নীরব আশ্বাস। নীলাদ্রী খুব শান্ত গলায় বলল, “সারাটা জীবন কি আমার সঙ্গে এই এক ছাতার নিচে হাঁটবে?” অবন্তী কিছু বলল না। সে শুধু নীল ফিতাটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় চেপে ধরল। তারপর ধীরে ধীরে নীলাদ্রীর কাঁধে মাথা রাখল। দুজন নীরবে তাকিয়ে রইল দূর আকাশের দিকে। শেষ বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল, আর তাদের সামনে যেন খুলে যাচ্ছিল এক নতুন জীবনের দরজা। কিছু অনুভূতির জন্য কবিতার প্রয়োজন হয় না। কিছু ভালোবাসার জন্য বড় কোনো প্রতিশ্রুতিও লাগে না। কখনো কখনো শুধু একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের নীরবে থেকে যাওয়ার বিশ্বাসই যথেষ্ট। আর সেই বিশ্বাসের নামই হয়তো ভালোবাসা।
তোর সংসার করি কী পানু এ জীবনে? মোর জীবনটা ত্যানা ত্যানা করি দিলু। দুইটা ছাওয়া, তার ওপর আরও একটা প্যাটোত — বলে ফুঁপিয়ে কাঁদছে জরি। চুপ করবু! মাইর কি কম হইছে? গতর খাটে যা পাও, সোগ বাজার করি আনো। একনা সবুর করো। একটে কথা কইছ, রডের কাম। যদি পাও, তাইলে চিন্তা নাই। আর ছাওয়া-পোয়া নিয়া খবরদার ফালতু কতা কবু না। আল্লায় দেছে, খাওয়াইবেও আল্লায়। মুই রিকশা নিয়া বেড়ানু। রান্দি খাইস। না খায়া থাকিস না — বলেই রিকশার প্যাডেলে পা দিলাম। রায়েরবাজার, পাবনা হাউস গলি। ফাল্গুন মাস। সকালের রোদে তেজ নেই। শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের বিস্তর এলাকায় নয়ন জুড়ানো শিমুল হাসছে। আজ নাকি ভালোবাসা দিবস। মাঝেমধ্যে ভাবি, ভালোবাসতে দিবস নাগে? জরি রে কি মুই ভালোবাসো? তাইলে পেটাও কেন? সন্ধ্যা নামছে। প্রশ্নগুলো মাথায় নিয়ে রিকশা চালিয়ে শরীর ক্লান্ত। গলির মুখে দুইটা ছোট মেয়ে গোলাপ ফুল নিয়ে বসেছে। লাল গোলাপ। একটা ১০ টাকা। দুইটা ১৫ টাকা। দুইটা কিনলাম জরির জন্য। এই বয়সে এসব শিশু দেখলে হাসবে। তাই ভেবে ইচ্ছা করেই সন্ধ্যা গাঢ় করে বাসায় ফিরলাম। একটা লাল শাকের আঁটি, দুই কেজি চাল কিনেছি। সকালে যে পেটাইছি, পিঠ তো চিরে গেছে অবশ্যই। রমিজের দোকান থেকে কয়েকটা ওষুধও তাই নিয়েছি। এই শরীরেও রান্না করেছে জরি। আলু ভর্তা করে রেখেছে। ঘরে ক্লান্ত শরীরে শুয়ে আছে। মেয়ে দুইটা কোথায় যেন গেছে। আমাকে দেখে উঠে বসার চেষ্টা করে। অনুতপ্তের স্বরে ওষুধগুলো এগিয়ে দিয়ে বললাম, রাগের মাথায় গায়ে হাত দিছি রে। মাফ করি দেইস। অবাক তাকিয়ে আছে জরি। টলমল চোখ নিয়ে কিছু বলতে চেয়েও পারছে না। গোলাপগুলো সামনে এগিয়ে দিয়ে বললাম, জরি, এই নে ভালোবাসার লাল গোলাপ। বিয়ার পর কতদিন হইল, আমারে আদর কইরা কইস না ‘ভালোবাসি’। চোখের জল মুছতে মুছতে জরি গোলাপগুলো হাতে নেয়। মুচকি হেসে বলে, “হইছে, মাইরবার সময় মনে থাকে না? এই বয়সে এত পিরিতের দরকার নাই। হাত-মুখ ধুইয়া আইসো। খাবার দেও তোমাক।” হাসিমুখে একবার আমার দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার ফুলের দিকে তাকাচ্ছে জরি।
কানুন মেহমুদ। এক শহুরে নীরবতার নাম। গ্রামের মানুষ। বাবার নাম তালহা মেহমুদ, একজন সাদাসিধে মুদি দোকানদার। রাজশাহীর মাটি আর মহুয়ার গন্ধে যার শৈশব কেটেছে। কিন্তু এখন সে ঢাকায়, একটি ব্যাচেলর জীবনের নির্জন গলিতে। মা, বাবা, পরিবারের বাকি সবাই গ্রামেই থাকে। কানুন থাকে একা। যাত্রাবাড়ীর রহিম সাহেব নামের এক চাচার বাসায় সাবলেটের একটি ছোট্ট রুমে তার জীবন সীমাবদ্ধ। এই শহরে তার কোনো আত্মীয় নেই। নেই কোনো বন্ধু, যার কাছে সে নির্দ্বিধায় নিজের হৃদয়ের কথা খুলে বলতে পারে। কানুনের জীবনে একটা বৈচিত্র্য আছে—তার শিল্পসত্তা। দিনভর অফিসের হিসাবরক্ষণ, একঘেয়ে সংখ্যার গুণ ও ভাগে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হলেও সন্ধ্যায় সে একা বসে হারমোনিয়াম নিয়ে। সুরে সুরে তার নিঃসঙ্গতা গলে যায়। মাঝে মাঝে লেখেও সে। দুটি সাপ্তাহিক কাগজে কবিতা ছাপা হয়। একটি সাহিত্য অনলাইন ম্যাগাজিনেও সে লেখে নিয়মিত। এসব কাজই তার নীরব অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখে। না হলে শহরের কংক্রিট আর ট্রাফিক সিগন্যালের পেছনে কোথাও হারিয়ে যেত সে। রহিম সাহেবের বাসায় থাকে কানুন। এক সাবলেট রুমে। একই ফ্ল্যাটে থাকেন রহিম চাচা, তাঁর স্ত্রী ও ছোট মেয়ে রুমা। পাশের ইউনিটে রজব আলী সাহেবের পরিবার—তিন সন্তানসহ। বড় মেয়ে কাহিনা মেহজাবিন—ইডেন কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। একটু চুপচাপ, কিছুটা রিজার্ভ ধরনের মেয়ে। চোখে আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি, কপালে চিন্তার রেখা। এ দুই পরিবারের মধ্যকার সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। একসঙ্গে তিন বছর বসবাস করে সবাই যেন একে অপরের আত্মীয় হয়ে উঠেছে। শুধু কানুন নতুন, মাত্র সাত মাস ধরে এই বাসায়। কানুন গান করে। শুক্রবারের সকালে হারমোনিয়ামে সে যখন সুর তোলে, পাশের রুমে কাহিনা বসে কার্টুন দেখে ছোট ভাই-বোনদের সঙ্গে। হঠাৎ শুনতে পায় হারমোনিয়ামের সুর। সুর আসে, হৃদয়ে বাজে। এই রুমা, তোমাদের বাসায় কে গান করে? ভাইয়া। মানে কানুন ভাইয়া। কানুন কে? উনি আমাদের ভাড়াটিয়া, বাসায় সাবলেট থাকেন। কাহিনা কোনো উত্তর দেয় না। শুধু একবার বারান্দা থেকে কানুনের বন্ধ দরজার দিকে তাকায়। হারমোনিয়ামের সুর তখনো ভেসে আসছে। এক গভীর, বিষণ্ণ সুর—যেন কারও হারিয়ে যাওয়ার ব্যথা। সেদিন সন্ধ্যায় ছাদের ওপর সবাই মিলে গল্পগুজব করছে। ছেলে-মেয়েরা খেলছে, বড়রা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। হঠাৎ কানুন ছাদে আসে। আন্টি, কেমন আছেন? ভালো আছি বাবা। তুমি কেমন? এই তো, চলেই যাচ্ছে জীবন। কাহিনা পাশে বসে কাগজে কিছু আঁকছে। কানুন দূর থেকে দেখতে পায়। এগিয়ে গিয়ে বলে— দেখি? বেশ ভালো আঁকেন তো আপনি! ধন্যবাদ, কাহিনা সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয়। রুমা হঠাৎ বলে— কানুন ভাইয়া, রাইসা আপু খুব সুন্দর আঁকে। আর ওর বিড়ালটা না কী মিষ্টি! ও, এ জন্যই তো চোখ দুটো বিড়ালের মতো। কাহিনা গম্ভীর হয়ে বলল— মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি আপনার মতো কাউকে এমন বলতে দিই না। আমি তো মজা করছিলাম। আপনি নিজের সীমা বোঝেন। ফাজিল! কানুন চুপ করে যায়। মাথা নিচু করে বিড়ালটার দিকে তাকায়। বিড়ালটা তখনো তার দিকে এক জ্যোতির্ময় চোখে তাকিয়ে ছিল। পরদিন কাহিনা কলেজে যাচ্ছে। বাসে উঠে দেখে কানুন এক কোণে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ভিড়ের চাপে কানুন এক মহিলার গায়ের ওপর পড়ে যায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কেউ কিছু না বুঝেই কানুনকে ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে নামিয়ে দেয়। ঠিক তখনই পেছন থেকে আসা একটি সিএনজি তাকে ধাক্কা দেয়। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে কানুনের। হাসপাতালের বিছানায় কানুন চোখ খুলে দেখে সাদা ছাদ। পাশের চেয়ারে বসে এক নারী কাঁদছে—কাহিনা। অথচ কানুন তাকে চেনে না। কাউকেই চেনে না। শুধু এক বিড়াল তার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছে। সে বিড়ালটির গা ছুঁয়ে হাসে। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে কানুন। ডাক্তাররা বলেন, এটি টেম্পোরারি অ্যামনেশিয়া হতে পারে। তবে মানসিক ট্রমার কারণে সেটি স্থায়ীও হতে পারে। রুমা একদিন কাহিনাকে বলল— আপু, তুমি জানো না, ভাইয়া তোমাকে কত ভালোবাসে! সেদিন ছাদে বলেছিল তোমার আপু অনেক সুন্দর। ওর চোখে একধরনের বিষণ্ণতা আছে, যা আমার গানের মতো। কাহিনার চোখ ভিজে ওঠে। মনে পড়ে, প্রথম দেখা, প্রথম রাগ, আর সেই বিড়ালের চোখের সঙ্গে তুলনা করা, যা একসময় তার কাছে অপমান বলে মনে হয়েছিল, আজ যেন সেটিই সবচেয়ে গভীর প্রেমের প্রকাশ। এক সপ্তাহ পর কানুনের বড় ভাই তাকে নিতে আসে। গ্রামে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। ঢাকার ব্যস্ত এক বাসস্ট্যান্ডে ছেঁড়া জামা পরা কানুন রাস্তার ধারে পড়ে থাকা মুড়ি কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে। কাহিনা বাস থেকে নেমে দেখে দৃশ্যটা। ছুটে আসে। বলে— কানুন! তুমি এখানে? এসব কী করছ? এসো, আমি মুড়ি কিনে দিই! কানুন তাকায় না। চুপচাপ মাথা নিচু করে খুঁটে খুঁটে খায়। কে আপনি — কানুনের ভাই জিজ্ঞেস করে। আমি কাহিনা । আমরা এক বাড়িতে থাকতাম। আমি কানুনকে ভালোবাসি। কানুনের ভাই স্তব্ধ হয়ে যায়— বোন, আমার ভাই তো এখন নিজেকেই চেনে না। তবু আমি যাব কানুনের সঙ্গে — এই বলে কাহিনা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। কাহিনাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। ডাক্তার বলেন, সে গভীর মানসিক আঘাত পেয়েছে। শোক ও অপরাধবোধের চাপে তার নিজের স্নায়ু ভেঙে পড়েছে। আজ সে কথা বলে না। শুধু হাসপাতালের বেডে বসে বিড়ালটার দিকে চেয়ে থাকে। অন্যদিকে কানুনকে বাড়িতে নিয়ে যায় তার ভাই। গ্রামের বাড়ির উঠোনে বসে খোলা আকাশে তাকিয়ে বিড়ালের সঙ্গেই কথা বলে...
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।