বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে ৩.৪ শতাংশ হতে পারে। মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি জানায়, ২০২৮ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়ে ৩.৯ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সাল থেকেই দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। বিশেষ করে, আর্থিক ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়াও থমকে গেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, অর্থনৈতিক এই প্রতিকূলতার কারণে ২০২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য আরও বেড়েছে এবং প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং রাজস্ব ঘাটতিও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দুর্বল অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি দেশের বহিঃখাতকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে সতর্ক করে জানান, দীর্ঘমেয়াদি মন্দা এড়াতে ব্যাংকিং, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে দ্রুত মৌলিক সংস্কার জরুরি। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়িয়ে চরম দরিদ্রদের কাছে তা পৌঁছে দেয়ার তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি। এদিকে একই প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬.৭ থেকে ৬.৯ শতাংশের ঘরে থাকার অনুমিত হিসাব প্রকাশ করা হয়েছে।
শনিবার ৩ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সারা দেশে চার দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে মধ্যরাতে মাত্র ৭৫ মিনিটের ব্যবধানে মিয়ানমার, ভারতের মিজোরাম ও ত্রিপুরায় উৎপত্তি হওয়া তিনটি মাঝারি ও মৃদু ভূকম্পন আঘাত হানে। পরবর্তী সময়ে রবিবার ভোরে রাজধানী থেকে ৪৪৩ কিলোমিটার দূরে আরেকটি কম্পন রেকর্ড করা হয়। ইএমএসসি ও সিসমোলজিক্যাল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, রাত ১২টা ১২ মিনিটে মিয়ানমার সীমান্তে ৪.৯ মাত্রা এবং এক মিনিট পরই ভারতের মিজোরামে ৫.০ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ফেনীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। এরপর রাত ১টা ২৭ মিনিটে ত্রিপুরার ডালাই এলাকায় আঘাত হানা ৩.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকা। এদিকে রবিবার ভোর ৪টায় ৪.৮ মাত্রার চতুর্থ ভূকম্পনটি রেকর্ড করে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঘন ঘন এসব কম্পনে মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও তাৎক্ষণিকভাবে কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সম্ভাব্য উপস্থিতি চিহ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রজুড়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর যৌথ অনুসন্ধানের প্রাথমিক ফলাফল বলছে—বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের অজানা খনিজ সম্পদের দেশ হিসেবে নতুনভাবে উন্মোচিত হতে চলেছে। এ ক্ষেত্রে সোনাদিয়া খনিজ সম্পদের ওপর একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্র সুইজারল্যান্ডভিত্তিক জার্নাল ডিসকভার জিওসায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনের ওটাগো বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টান বিশ্ববিদ্যালয়; এবং বাংলাদেশের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোঃ সাকাউথ হোসেন, মোঃ শাহরিয়ার রহমান,গোলাম তকি এবং মাফতিহা জাহান। তাঁদের গবেষণা বাংলাদেশের সোনাদিয়া দ্বীপের ভারী খনিজ পদার্থের ভূ-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং রিজার্ভ অনুমান শীর্ষক দ্বীপের নানান দিক অন্বেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে এর ভারী খনিজ সম্পদের আয়তন। গবেষকদের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক মূল্য এবং লুকানো মজুদের ভূতাত্ত্বিক তাৎপর্য নিম্নরূপ : সোনাদিয়া কক্সবাজার জেলার মহেশখালী থানার ছোট একটি দ্বীপ, যার আয়তন প্রায় নয় বর্গকিলোমিটারের বিস্তৃত। দ্বীপটি ম্যানগ্রোভ। উপকূলীয় সমন্বয়ে গঠিত এবং এর চারদিকে পানি। এর পৃষ্ঠের নিচে ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল ও মোনাজাইটের মতো ভারী খনিজ পদার্থের মজুদ আছে। সোনাদিয়ায় এই মূল্যবান খনিজ পদার্থের অনুমানিক মজুদ প্রায় ৭ লাখ টন, যার মধ্যে গারনেট ও ইলমেনাইট সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে ১৯৮০ দশক থেকে ভূতাত্ত্বিক জরিপের কাজ শুরু হয়। তবে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) প্রায় ২০ বছর ধরে খনিজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে খনিজের সন্ধান পেয়েছেন। জিএসবি গবেষকদের মতে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও ময়মনসিংহের পাহাড়ি ঢলের আসা পলি, নদী অববাহিকার বালু, জেগে ওঠা চর এবং কয়লা খনি থেকে বিরল বা ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। জিএসবির অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ব বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আলী আকবর বলেন, “২০১৬ সালে যুমনা নদীর বালুতে আমরা ভারী আকরিকের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিরল বা ভারী মৃত্তিকা মৌল পেয়েছি। এবং সঙ্গে কিছু মাত্রায় লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম ও থরিয়াম পেয়েছি।” শুধু তা-ই নয়, দেশের সব কটি নদীতেই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এমনকি দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে পাওয়া কয়লা ও ছাইয়েও বিরল খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর পরে ধরলা নদীর বালু পরীক্ষা- নিরীক্ষা করে জিএসপির গবেষকরা স্যামারিয়াম, ইউরেনিয়াম,গ্যাভালিয়াম, টারবিয়াম ও ডিসপ্রোসিয়ামের মত বিরল মৃত্তিকা মৌলের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষক মোঃ আলী আকবর বলেন, মূলত বালুতে থাকা খনিজ মোনাজাইট ও জিরকনের সঙ্গে বিরল মৃত্তিকা মৌলের উপস্থিতি প্রমাণ মিলেছে। প্রতি কেজি বালুতে ৬০ থেকে ১৭৬ মিলিগ্রাম এসব মৌলের উপস্থিতি পেঁয়েছেন। তবে ধরলা নদীতে পাওয়া বিরল খনিজ বাণিজ্যিকভাবে কতটা উত্তোলনযোগ্য, তা জানাতে পারেননি জিএসবি গবেষকরা। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ১০০ মিলিগ্রামের ওপর হলে উত্তোলনযোগ্য হয়। দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়ায় গবেষকরা কয়লা গবেষণা করে দেখেছেন, পোড়া কয়লা ছাইয়ের ৭০০ থেকে ৮০০ মিলিগ্রাম বিরল খনিজের উপস্থিতি রয়েছে। গবেষকরা সোনাদিয়ার বালি গবেষণা করে দেখেছেন ৫১.৫২ শতাংশ গারনেট, ৩৮.১৪ শতাংশ ইলমেনাইট, ৫.৭৪ শতাংশ ম্যাগনেটাইট, ১.০১ শতাংশ জিরকন, ৩.৫৭ শতাংশ রুটাইল এবং ০.১ শতাংশ মোনাজাইট পাওয়া যায়। বেশ কয়েক বছর যাবৎ স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ে জরিপে ব্রহ্মপুত্র ও যুমনা নদীর বালুতে রুটাইল, গারনেট, জিরকন, ম্যাগনেটাইটসহ মূল্যবান খনিজ পদার্থের উপস্থিতির নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে। এরপর সোনাদিয়া দ্বীপের টিলাগুলোতে গবেষণা করে দেখা গেছে, ভারী খনিজের পদার্থের ঘনত্ব সমুদ্রের সৈকতের অংশের তুলনায় বেশি। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলের তুলনায়। গবেষকদের অনুমান অনুসারে টিলাগুলোতে প্রায় গারনেট ২৭৬,৮৬৮ টন, ইলমেনাইট আছে ১০,২৫,৫৫৮ টন, জিরকন ১৫৮,১১৭ টন, লিউকক্সিন ৯৬৭০৯ টন, ম্যাগনেটাইট ৮০,৫৯৯ টন, মোনাজাইট ১৭৩৫২ টন। তবে উপকূল অঞ্চল ও পশ্চাৎপসরণ অঞ্চলের পরিমাণে তারতম্য রয়েছে। গবেষণা করে দেখা গেছে যে সমুদ্রের স্রোত, ঢেউ এবং প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার কারণে ক্রমাগত পলি জমা হওয়ার ফলে সোনাদিয়া খনিজ মজুতকে ভবিষ্যতে আরও আশাব্যঞ্জক করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। দেশের প্রয়োজনের তুলনায় আহরণের পরিমাণ খুব কম। এর ফলে দেশের প্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে কয়লা, খনিজ তেল, চুনাপাথর, চিনামাটি, তামা, সিলিকা বালু, পারমাণবিক খনিজ পদার্থ জিরকন, মোনাজাইট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, লিউকক্সিন প্রভৃতি। এ ছাড়া গন্ধক, নুড়িপাথর, খনিজবালি, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ লবণ, কঠিন শিলা, সর্বাপেক্ষা সহজ ও হালকা হাইড্রো- কার্বন মিথেন। আন্তর্জাতিকভাবে ১৭টি মৌলের একটি গ্রুপ হলো বিরল বা ভারী খনিজ। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির নামকরণ অনুযায়ী, পর্যায় সারণির ল্যান্থানাইড সিরিজের ১৫টি মৌলের ল্যান্থানাম, সিরিয়াম, প্লাসিয়োডিমিয়াম, নিওডিমিয়াম, প্রমিথিয়াম, স্যারিয়াম, ইউরোপিয়াম, গ্যাডোলিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, হোলসিয়াম, আরবিয়াম, থুলিয়াম, ইটারবিয়াম, লুটোশিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম একত্রে বিরাল খনিজ বলছে যুক্তরাষ্ট্রের জিওসায়েন্স ইনস্টিটিউট সংস্থাটি। আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্প প্রতিরক্ষা খাতে বিরল খনিজ অপরিহার্য। আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিরল খনিজের ব্যবহার আছে। যেমন মুঠোফোন, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড, টেলিভিশনের এলইডি ডিসপ্লে তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি যেমন লেজার, রাডার, সোলার সিস্টেম, জেট ইঞ্জিন, মিশাইল সিস্টেম, যুদ্ধবিমান, রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরিতে ভূমিকা রাখে। বেশ কয়েকটি দেশের গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ১৭টি বিরল মৌলের মধো ৮ থেকে ১১টি মৌল বিদ্যমান। পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ ছাড়া বিরল মৌল নেই। তার মধ্যে বর্তমান বিশ্বে ৮০ শতাংশ খনিজ চীন নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটিতে ৪ কোটি ৪০ লাখ টন বিরল খনিজ মজুদ আছে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্রাজিল, যার মজুদ আছে ২ কোটি ১০ লাখ টন। তা ছাড়া ভারতের ৬৯ লাখ টন, অস্ট্রেলিয়ায় ৫৭ লাখ টন, রাশিয়ার ৩৮ লাখ টন, ভিয়েতনামের ৩৫ লাখ টন মজুত আছে। ২০২৪ সালে চীন খনিজ উৎপাদন করেছে ২ লাখ ৭০ হাজার টন। আমেরিকা উৎপাদন করেছে মাত্র ৪৫ হাজার টন। বিশ্বের যে সব দেশে খনিজ সম্পদ আছে এবং উত্তোলনে সক্ষম, সে দেশের অর্থনীতি সাসটেইনেবল। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, যারা খনিজের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সৌদি আরবে খনিজ তেল জিডিপির ৫০ শতাংশ অবদান রাখে। রাশিয়ায় জিডিপির ২০ শতাংশ, ইরান জিডিপির ২৩ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে বিশাল অর্থনীতির দ্বার উন্মোচনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ ব্যাপারে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি, জিএসবি দেশে আট ধরনের আবিষ্কৃত আর্থিক বাজার মূল্যের হিসাব নিরূপণ করেছে ২ কোটি ২৬ হাজার ১৪০ কোটি ডলার, বাংলা টাকায় কনভার্ট করলে দাঁড়ায় ২৪১.৯৭ ট্রিলিয়ন টাকা। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে কয়লা মজুদ আছে, যার পরিমাণ ৭২৫ কোটি টন। যার বর্তমান বাজার মূল্য আসবে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। পিট কয়লা মজুদের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ৩ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। চুনা পাথর পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫২৭ কোটি টন, যার বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াবে ৭৫ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। এভাবে আর অন্য সব খনিজের পরিমাণ যোগ করলে বিশাল পরিমাণ অর্থ দাঁড়াবে। জিএসবি গবেষকদের মতে, ভারী খনিজ ও অন্যান্য খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিজাত করা সম্ভব হলে দেশে প্রতিবছর ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব। ভারী বা বিরল ও অন্য সব খনিজ গবেষণা ও প্রক্রিয়াকরণের মধ্যে আনা সম্ভব হলে বাংলাদেশ এশিয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশে পরিগণিত হবে।
আমরা বাংলাদেশিরা যখন দেশ ছেড়ে প্রবাসে আসি, তখন দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও পলে পলে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও টান অনুভব করি সব সময়। মনে হয়, দেশে থাকতে যতটা মাতৃভূমিকে উপলব্ধি করেছি, বিদেশে এসে সেটা আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে, মা-বাবা ও আত্মীস্বজনকে যতটা মনে পড়ে, তার চেয়ে বেশি মনে পড়ে দেশকে। বিদেশে এসে আমরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যা আয় করি, তার পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে দিই। এতে করে আমাদের পরিবার যেমন স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে, তেমনি দেশ লাভবান হয় রেমিট্যান্স পেয়ে। এই আত্মতৃপ্তিই আমাদের একমাত্র পাওয়া। প্রবাস কোনো মতেই সুখের জায়গা নয়। এখানে এসে পদে পদে আমাদের ঠকতে হয়, প্রতারিত হতে হয়, কষ্ট ভোগ করতে হয়, এরপর অনেক কিছু শিখতে হয়, যার অভিজ্ঞতা জীবনে কাজে লাগানোর আগেই অনেককে দেশে ফিরতে হয় শূন্য হাতে অথবা লাশ হয়ে। অনেকে আবার সফলতার সাথে দেশে ফেরেন; কেউ আবার স্থায়ী হন বিদেশেই। বিদেশের মাটিতে আমাদের সহযোগিতা করার মতো মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এ কারণে নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত প্রবাসীদের পক্ষে কথা বলা, এমনকি আমরা যাতে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করতে পারি, সেই বিষয়টা যাতে আমাদের দেশ, দেশের সরকার গুরুত্বের সাথে অনুধাবন করে, তা নিশ্চিত করার জন্য প্রবাসীদের মুখপত্র হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ প্যারিস মেইল। আমরা আশাবাদী, বিশ্বের সব প্রবাসী বাংলাদেশি প্যারিস মেইলের মাধ্যমে তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা সবার সাথে শেয়ার করার সুযোগ পাবেন। আমরা সেসব কথা বাংলাদেশ সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করব। প্যারিস মেইল শুধু একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল নয়, এটি হয়ে উঠবে প্রবাসীদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর; অধিকারের কথা নির্বিঘ্নে প্রকাশ করার একটি সুদৃঢ় মাইক্রোফোন। প্রবাসীরা দূরে থাকলেও মা ও মাতৃভূমি থাকে আমাদের শয়নে, স্বপনে ও জাগরণে। আমাদের সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ একদিন বিশ্ব অর্থনীতির প্রথম কাতারে আবস্থান করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
সরকারি চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় সফল হওয়ার জন্য কেবল পরিশ্রম নয়, বরং প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা। বিসিএস, ব্যাংক কিংবা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে সঠিক সিলেবাস ও বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। যারা দীর্ঘমেয়াদি এই যাত্রায় সফল হতে চান, তাদের জন্য থাকছে প্রস্তুতির পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন। প্রস্তুতির শুরুতেই লক্ষ্য নির্ধারণ অত্যন্ত জরুরি, কারণ বিসিএস, ব্যাংক ও সাধারণ সরকারি পদের প্রশ্নপদ্ধতি ভিন্ন হয়। প্রস্তুতির মূল ভিত্তি হিসেবে বাংলা ব্যাকরণ, ইংরেজি গ্রামার, গণিতের মৌলিক বিষয় এবং সাধারণ জ্ঞান ও সমসাময়িক তথ্যে গভীর দখল আনা প্রয়োজন। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণীর বোর্ড বইগুলো নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করা বা ‘জব সল্যুশন’ প্রার্থীর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে দারুণ ভূমিকা রাখে। সপ্তাহব্যাপী রুটিন মেনে পড়ার চেয়ে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই অধিক কার্যকর। প্রস্তুতির একটি আদর্শ চক্র হলো—প্রথম দুই সপ্তাহ প্রশ্ন বিশ্লেষণ, পরের চার মাস বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা এবং শেষে প্রচুর মডেল টেস্ট দেওয়া। এছাড়া মানসিক চাপ সামলাতে সুষম ঘুম ও শারীরিক সুস্থতার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। ভুল তথ্যের বিভ্রান্তি এড়াতে বেসরকারি গাইডের চেয়ে সরকারি অফিশিয়াল পোর্টাল ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে ইলিয়াস খান নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। রোববার রাতে উপজেলার পাঙ্গাসী ইউনিয়নের কালিঞ্জা গ্রামে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করেছে পুলিশ এবং মূল অভিযুক্ত পলাতক রয়েছেন। বিকেলে মাঠে ফুটবল খেলা নিয়ে কথা-কাটাকাটির জের ধরে রাতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে অভিযুক্ত সিয়াম ধারালো ছুরি দিয়ে ইলিয়াসের বুকে আঘাত করলে তিনি গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। রায়গঞ্জ থানার ওসি মো. আহসানুজ্জামান জানান, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। আটক রাসেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং পলাতক সিয়ামকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ফ্রান্সে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের কনস্যুলার সেবা সহজতর করতে প্যারিসের বাংলাদেশ দূতাবাস নতুন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি দূতাবাস আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম. তালহা অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে বৈধতার আবেদনের জন্য প্রবাসীদের বিশেষ পাসপোর্ট সেবা প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদূত জানান, ৩ জুন চালু হওয়া অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা প্রবাসীদের ভোগান্তি কমিয়ে পাসপোর্ট সেবায় স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে। তিনি এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। প্রবাসীদের বিশেষ সুবিধার্থে আগামী ২৫ জুলাই, ৮ আগস্ট ও ২২ আগস্ট কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই পাসপোর্ট সংক্রান্ত সব সেবা দেওয়া হবে। এছাড়া ১৬ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অনলাইনে নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সভায় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও প্রবাসী বাংলাদেশীদের উপস্থিতিতে সেবার মান উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধাদানের লক্ষ্যে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হতে যাচ্ছে সরকারের ‘প্রবাসী কার্ড’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই কার্ডের মাধ্যমে ১০টি বিশেষ সুবিধা প্রদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে এই কার্ড বিতরণ শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে সব প্রবাসী বাংলাদেশিকে এর আওতায় আনা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা বিমানবন্দর লাউঞ্জ ও মিট অ্যান্ড গ্রিট সুবিধা, টিকিট ও হোটেলে বিশেষ ছাড়, সরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকার এবং বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসায় বিশেষ ছাড় পাবেন। এছাড়া কার্ডধারীর মৃত্যুতে মরদেহ দেশে পরিবহন, প্রবাসফেরতদের পুনর্বাসন, বীমা সুবিধা এবং জমি রেজিস্ট্রেশন ও ইউটিলিটি সেবায় অগ্রাধিকারের মতো সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স রিওয়ার্ড পয়েন্ট, সহজ ঋণ সুবিধা এবং পাসপোর্ট-কনস্যুলার সেবায় কার্ডধারীরা বাড়তি গুরুত্ব পাবেন। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ৫০ হাজার এবং ২০২৭ সালের জুন নাগাদ ২ লাখ প্রবাসী কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এর সব কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে কার্ডের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আরও আধুনিক করার নির্দেশনা দিয়েছেন। বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমানে প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য একটি বিশেষ মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার কনস্যুলেট জেনারেল, দুবাই এবং বাংলাদেশ কমিউনিটি, আজমানের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় আমিরাতের আইন-কানুন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রবাসীদের কনস্যুলার সেবা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সতর্ক থাকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়। দুবাই ও উত্তর আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মো. রাশেদুজ্জামান সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আমিরাতের প্রচলিত বিধি-বিধান এবং স্থানীয় রীতি-নীতি যথাযথভাবে অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়া প্রবাসীরা তাদের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা ও বিভিন্ন সেবা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করার সুযোগ পান এবং কনস্যুলেট প্রতিনিধিরা এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন। সভায় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ও বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী অংশ নেন।
(প্রথম পর্ব) একদিন সম্পর্কের বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারটা অদ্ভুত! সেখানে আলু-পেঁয়াজ, কাপড়-চোপড়, সোনা-রুপা কিছুই বিক্রি হয় না। শুধু সর্ম্পক। ছোট ছোট দোকানে সাজানো আছে মানবতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, দায়িত্ব, আত্মীয়তা, স্বার্থ, ক্ষমতা, যেন মানুষের জীবনকে টুকরো টুকরো করে তুলে রাখা হয়েছে। একজন দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই সে মাথা তুলে তাকাল— কী চাই? আমি বললাম— একটু সর্ম্পক। সে হেসে বলল— কোনটা? মানবতার, না ভালোবাসার? বিশ্বাসের, না ব্যবসার? আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম— বন্ধুত্বের। লোকটা তখন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল। যেন বহুদিন পরে কোনো বিলুপ্ত শব্দ শুনেছে। তারপর ধীরে ধীরে বলল— জনাব, পৃথিবী এখনো যে কটা কারণে টিকে আছে, বন্ধুত্ব তার মধ্যে একটা। কিন্তু দুঃখিত, এই জিনিসি বিক্রির জন্য নয়। সেদিন দোকান থেকে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ হাঁটলাম। মনে হচ্ছিল, লোকটা বোধহয় সত্যি কথা বলেছে। চারপাশে কত মানুষ! বিমানবন্দরে মানুষ, রেলস্টেশনে মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানুষ, অফিসে মানুষ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ। মানুষ আর মানুষ। কিন্তু বন্ধু? বন্ধু যেন বর্ষার দিনে মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একা কদমগাছ। আছে কিন্তু সহজে পাওয়া যায় না। প্রবাসে এসে এই অভাবটা আরও বেশি টের পাই। একেক দিন শরীর ভালো থাকে না; একেক দিন মন। আবার কোনো কোনো দিন দুটোই ভালো থাকে না। সেই দিনগুলোতে খুব ইচ্ছে করে পাশে বসে কেউ নির্বিকার মুখে এক কাপ চা খেতে খেতে বলুক— তোর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পৃথিবীর শেষ দিন আজ। তারপর দুজন মিলে হাসতে হাসতে পৃথিবীর শেষ দিনটাও পার করে দেয়া যেত। এখানে অনেক মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একসঙ্গে খয়েছি, গল্প করেছি, লং ড্রাইভে গিয়েছি, ইউরোপের পুরোনো শহরে হাঁটাহাঁটি করেছি, আমেরিকার সরল রেখার মতো দীর্ঘ মহাসড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে সূর্যাস্ত দেখেছি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, পরিচয় হয়েছে অনেক, বন্ধুত্ব হয়নি তেমন। আজকাল সর্ম্পকগুলো কেমন যেন মোবাইল ফোনের অ্যাপের মতো। ডাউনলোড করা যায় সহজে, আবার ডিলিট করাও সহজ। একটি অপছন্দের মন্তব্য। একটি ভিন্ন মত। একটি না-পছন্দ সিদ্ধান্ত। ব্যস, সম্পর্কের সমাপ্তি। তখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বন্ধুদের কথা মনে পড়ে। তারা ছিল অন্য রকম। আমাদের কাছে তখন পৃথিবী ছিল ছোট। কিন্তু বন্ধুত্ব ছিল বিশাল। আমাদের জাতিসংঘ ছিল না, ছিল বন্ধুসংঘ। আমাদের পাখা ছিল না, কিন্তু উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। ঘাসফড়িংয়ের পেছনে দৌড়ানোর সময় ছিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় ছিল। বৃষ্টির শব্দ শোনার সময় ছিল। কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্না গুনে গুনে ভোর করে দেয়ার সময় ছিল। আমরা তখন জানতাম না পৃথিবী কত জটিল! জানতাম না মানুষ একদিন এত ব্যস্ত হয়ে যাবে। শুধু জানতাম, বিকেলে মাঠে দেখা হবে। এই জানাটুকুই যথেষ্ট ছিল। আজ বুঝি, মানুষ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিস নয়, সময় হারায়। আমি বাংলাদেশকে যতটা মিস করি, তার চেয়েও বেশি মিস করি বাংলাদেশের কিছু সময়কে। ঝুমবৃষ্টির দুপুর। বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। শীতের সকাল। ডিমভরা পুঁটি মাছ ভাজা ঘ্রাণ। ধানখেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া বিকেল। আর মিস করি সেই সব মানুষকে যাদের সঙ্গে কোনো প্রয়োজন ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা যেত। একবার একজন জিজ্ঞেস করেছিল— বাংলাদেশে যাচ্ছি, তোর জন্য কী আনব? আমি বলছেলিাম— যদি পারিস, চৈত্রদিনের একটা ঘুঘু-ডাকা দুপুর নিয়ে আয়। সে ভেবেছিল আমি মজা করছি। আসলে করিনি। মানুষের জীবনে একটা সময় আসে, যখন সে বস্তু নয়, মুহূর্ত সংগ্রহ করতে চায়। আমাদেরও মনে হয় সেই সময় এসেছে। ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতেও কোনো ঘড়ি ছিল না। আম্মা শুকতারা দেখে ভোরের সময় আন্দাজ করতেন। তারপর আমাকে ডাকতেন। আমি আধোঘুমে চোখ খুলে বলতাম— এখনো তো অন্ধকার। আম্মা বলতেন— আগে শুরু কর বাবা। পড়তে পড়তে সব আলো হয়ে যাবে। বহু বছর কেটে গেছে। আমি এখনো পড়ছি। কতটুকু আলো হলো জানি না। তবে এটুকু বুঝেছি, মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আলোগুলো বই থেকে আসে না। আসে মানুষ থেকে। বন্ধু থেকে। ভালোবাসা থেকে। স্মৃতি থেকে। এই যে আজ এত দূরে বসে আছি, হাজার হাজার মাইল দূরে, তবু কোনো কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ মনে হয়, ক্যাম্পাসের কোনো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। বন্ধুরা পাশে আছে। কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে। কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে পৃথিবী ধ্বংসের ঘোষণা দিচ্ছে। কেউ আবার অবলীলায় পকেট থেকে শেষ দশ টাকা বের করে সবাইকে চা খাওয়াচ্ছে। সেই সব বিকেল কোথায় গেল? কোথায় গেল সেই মানুষগুলো? আমরা কি সত্যিই বড় হয়ে গেছি? নাকি শুধু দূরে সরে গেছি? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিষয় বুঝেছি। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বর্পূণ সম্পর্কগুলো অনেক সময় নিয়মিত যোগাযোগে বেঁচে থাকে না। বেঁচে থাকে বিশ্বাসে। কোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে বছরের পর বছর কথা হয় না। তার পরও গভীর রাতে ফোন করলে সে বলবে— বল, কী হয়েছে? এবং এই একটি প্রশ্নই যথেষ্ট। কারণ সত্যিকারের বন্ধুত্বের অভিধানে ‘কেন’ শব্দটা খুব কম থাকে। সেখানে থাকে শুধু— ‘আমি আছি।’ [চলবে]
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আজ জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট পেশ করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালন খাতে ১ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮৬ লাখ এবং উন্নয়ন খাতে ১৮৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো 'ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ'। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আইন বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৫৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা এবার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়াতে নতুন কার্ড প্রবর্তনের ঘোষণাও এসেছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান মন্তব্য করেছেন যে, এক টাকায় বিচার বিভাগ পরিচালনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সংসদে বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাই করে এক টাকা করার প্রস্তাবের জবাবে তিনি এই কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। মন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিচার বিভাগ অচল হয়ে দেশ একসময় পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হবে। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা মঞ্জুরির দাবি পেশ করেন আইনমন্ত্রী। এর বিপরীতে বিরোধী দলীয় সদস্যরা বিচার বিভাগের সংকট, মামলাজট এবং বাজেট স্বল্পতার কথা তুলে ধরে বরাদ্দ এক টাকা করার ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন। সভায় বিরোধী দলীয় কয়েকজন সংসদ সদস্য বিচারক সংকট এবং জিডিপিতে বিচার বিভাগের নামমাত্র বরাদ্দ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন। সংসদ সদস্যদের এসব বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো স্ববিরোধী এবং কার্যপ্রণালি বিধির পরিপন্থি। তিনি বলেন, এক টাকা বরাদ্দ দিয়ে বিচার বিভাগ চালানোর কোনো বিকল্প প্রস্তাব সংসদ সদস্যরা দিতে পারেননি। সংসদ সদস্যদের দাবিকে ‘জনপ্রিয় কিন্তু ভুল’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মন্ত্রী জানান, বর্তমান বাস্তবতায় এই বাজেট বিচার বিভাগের জন্য অপ্রতুল হলেও, তা মেনে নেওয়া ছাড়া আপাতত বিকল্প নেই। এরপর ছাঁটাই প্রস্তাব নাকচ করে মূল বরাদ্দ অনুমোদনের আহ্বান জানান তিনি।
সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে নতুন আইন কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ বিষয়ক এক জাতীয় অবহিতকরণ সভায় তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে পুলিশ, বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধীদের পরিবর্তনশীল কৌশলের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। সদ্য প্রণীত এই আইনটি মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে, যা তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করবে। এছাড়া ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়ানোয় নতুন আইনটিকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে সরকার। সভায় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধান এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকে আইনটির বিধান ও প্রয়োগের কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন।
বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (জেএটিআই) আয়োজিত ২২তম ওরিয়েন্টেশন কোর্সের জন্য ৪০ জন বিচারককে মনোনয়ন দিয়েছে আইন ও বিচার বিভাগ। রবিবার আইন মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ অধিশাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আগামী ১১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ঢাকার জেএটিআই কেন্দ্রে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে মনোনীত বিচারকদের তালিকায় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তারা রয়েছেন। এছাড়া আইন বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর, আনসার ও ভিডিপি এবং কাস্টমস ট্রাইব্যুনালে কর্মরত বিচারিক কর্মকর্তারাও এই কোর্সে অংশ নেবেন। প্রশিক্ষণ চলাকালীন অংশগ্রহণকারীরা নিয়ম অনুযায়ী টিএ (ভ্রমণ ভাতা) ও ডিএ (দৈনিক ভাতা) পাবেন। মনোনীত বিচারকদের কোর্সে যোগ দেওয়ার আগে জেএটিআই-এর ওয়েবসাইট থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তি দূর করতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রূপপুরে ব্যবহৃত থার্ড-জেনারেশন প্রযুক্তির কারণে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই এর নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। প্রকল্প পরিচালক ড. জাহেদুল হাছান জানান, রূপপুরে অত্যাধুনিক Generation-III+ VVER-1200 প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা অতীতের সব পারমাণবিক দুর্ঘটনার শিক্ষা থেকে তৈরি। কেন্দ্রটিতে কোর ক্যাচার, প্যাসিভ হিট রিমুভাল সিস্টেম এবং ডাবল কন্টেইনমেন্টের মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম। কমিশনিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অত্যন্ত কঠোর একটি শিল্পপ্রক্রিয়া, যা তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), আইএইএ (IAEA) এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো ধরনের কারিগরি দুর্বলতা নয়, বরং সর্বোচ্চ নিরাপত্তার স্বার্থেই প্রতিটি পরীক্ষা ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হচ্ছে। তাই প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বন্যা-পরবর্তী সম্ভাব্য রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। শুক্রবার (১৭ জুলাই) চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ঢলু খালের ভাঙন এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ শেষে তিনি এ কথা জানান। তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সম্পূর্ণ পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত সরকারের এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন। অর্থমন্ত্রী জানান, দুর্গত এলাকায় রোগ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার বসতবাড়ি, সড়ক যোগাযোগ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চলমান এই সংকট কাটাতে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে এক লাখ ৫৫ হাজার পরিবারকে চালসহ বিভিন্ন খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও একজনের প্রাণহানি এবং নতুন করে ১৪০ জনের রোগটি শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজার ২৪৪ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন। অধিদপ্তর জানায়, মৃতদের মধ্যে ৯৫ জন নিশ্চিতভাবে হামে এবং বাকি ৬৮৫ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। এছাড়া আলোচিত সময়ে এক লাখেরও বেশি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিলেও, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের বড় অংশই ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
দেশের স্বাস্থ্য খাতে আমূল পরিবর্তন আনতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ ও ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। বৃহস্পতিবার ঢাকায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) আয়োজিত এক সেমিনারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এই তথ্য জানান। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল রোডম্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা আরও শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। ই-হেলথ কার্ড হলো নাগরিকদের একটি ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। হাসপাতালে গেলে চিকিৎসকরা এই কার্ডের মাধ্যমে রোগীর পূর্বের সব রোগের ইতিহাস, পরীক্ষার রিপোর্ট ও ওষুধের বিবরণ মুহূর্তেই দেখতে পারবেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে গত দুই বছর ধরে এই ডিজিটাল রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ এনামুল হক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীমসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসা অক্সিজেনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল মেডিকেল অক্সিজেন রোডম্যাপ (২০২৬–২০৩০)’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই কর্মপরিকল্পনা তৈরির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিতকে সভাপতি করে ২৭ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব শাহ ইমাম আলী রেজা। এতে স্বাস্থ্য ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, বুয়েট এবং আইসিডিডিআর,বি-এর বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা যুক্ত আছেন। এই কমিটির প্রধান কাজ হলো চিকিৎসা অক্সিজেনের মান নিয়ন্ত্রণ এবং একটি কার্যকর জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করা। এর মাধ্যমে দেশের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সহজলভ্যতা নিশ্চিতের পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সদ্য বিদায়ী জুন মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ২৮০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রবাসী আয়ের এই সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত অর্থবছরের (জুলাই-জুন) পুরো সময়ে দেশে মোট ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। তবে আগের মাসগুলোর ধারাবাহিকতার তুলনায় জুনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। গত বছরের জুনেও দেশে ২৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডকে অন্যান্য সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি পণ্য বিতরণের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত টিসিবির কার্যক্রম মূল্যায়ন সভায় এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণের একটি রূপরেখা নিয়ে এসব আলোচনা হয়। সভায় বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, দরপত্রে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়লে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য কমবে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এজন্য দেশি-বিদেশি বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ভুল ব্যয় প্রাক্কলনের ওপর তিনি জোর দেন। এআই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করা হবে। অন্যদিকে, ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে টিসিবির পণ্য তালিকায় আরও নতুন সামগ্রী যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফয়সল আজাদ।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।