Breaking news

ব্রিকস

ছবি : সংগৃহীত
ডলারের আধিপত্য ও ব্রিকসের চ্যালেঞ্জ : নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সন্ধানে

বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং এর বিপরীতে বিকল্প অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ‘ব্রিকস’ (BRICS) জোটের উত্থান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা বিগত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।   আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বৈশ্বিক ঋণ আদান-প্রদানের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রিত হয় ডলারের মাধ্যমে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রবণতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের কারণে এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হচ্ছে। এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত এবং পরবর্তী সময়ে নতুন সদস্য যুক্ত করে আরও বিস্তৃত হওয়া 'ব্রিকস' জোট। বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য ভাঙতে ব্রিকস কতটা সফল বা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে, তা মূল্যায়ন করার জন্য এই জোটের পদক্ষেপ, সম্ভাবনা এবং একই সাথে এর অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাগুলোকে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।   ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপটি হলো নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনা করা। চীন ও রাশিয়া ইতোমধ্যে তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ ইউয়ান ও রুবলের মাধ্যমে সম্পন্ন করছে। ভারত ও রাশিয়াও রুপিতে বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেছে। এ ছাড়া ব্রিকসের উদ্যোগে গঠিত ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (NDB) আন্তর্জাতিক ঋণের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারের বিকল্প হিসেবে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের নীতিকে উৎসাহিত করছে। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশকে ডলারের বৃত্ত থেকে বের করে আনার প্রক্রিয়াটি বিশ্বজুড়ে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলার-মুক্তকরণ প্রবণতাকে গতিশীল করেছে। অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্র এখন পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে এবং ডলারের মূল্যের ওঠানামা থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে ব্রিকসের এই স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের মডেলটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রিকস বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের একক বিকল্প গড়ে তুলতে না পারলেও একটি বহু-মেরুভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থার ধারণাকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।   ব্রিকসের শক্তি ও সাফল্যের আরেকটি প্রধান দিক হলো এর সাম্প্রতিক সম্প্রসারণ। বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশগুলোর ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তি বা যুক্ত হওয়ার আগ্রহ এই জোটের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সমৃদ্ধ দেশগুলোর এই জোটে আসার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে ডলারের যে একচেটিয়া আধিপত্য বা ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা ছিল, তার ভিত্তি কিছুটা হলেও দুর্বল হতে শুরু করেছে। যদি বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধানতম পণ্য অর্থাৎ তেল ও গ্যাসের লেনদেন ডলারের বাইরে অন্য কোনো মুদ্রায় ব্যাপকভাবে শুরু হয়, তবে তা মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক চাহিদাকে সরাসরি আঘাত করবে। ব্রিকস এই সম্ভাবনাটিকে একটি বাস্তব রূপ দেয়ার মঞ্চ তৈরি করেছে, যা এক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। এই জোটের অর্থনৈতিক পরিধি ও জনসংখ্যা এখন জি-৭ ভুক্ত পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়েও বড়, যা দীর্ঘ মেয়াদে ডলারের আধিপত্যের জন্য একটি বড় ধরনের কাঠামোগত হুমকি।   তবে এই আংশিক সাফল্য সত্ত্বেও ডলারের আধিপত্য সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে ব্রিকস এখনো একটি দীর্ঘ এবং জটিল পথের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক শেকড় অত্যন্ত গভীর। বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্ধেকেরও বেশি এখনো মার্কিন ডলারে সংরক্ষিত থাকে। আন্তর্জাতিক সুইফট (SWIFT) পেমেন্ট সিস্টেমে ডলারের ব্যবহার এখনো এককভাবে সর্বোচ্চ। এর বিপরীতে ব্রিকসের কোনো একক সাধারণ মুদ্রা এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। যদিও একটি সাধারণ ব্রিকস মুদ্রা চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে, তবে তা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত দুরূহ। কারণ, প্রতিটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মুদ্রাস্ফীতির হার এবং আর্থিক নীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরোজোনের মতো একটি অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যে ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংহতি প্রয়োজন, তা ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে এখনো অনুপস্থিত।   ব্রিকসের সাফল্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের ভিন্নতা। চীন ও ভারত ব্রিকসের দুটি প্রধান চালিকাশক্তি, কিন্তু তাদের পারস্পরিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সীমান্ত বিরোধ এই জোটের যেকোনো যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। চীন যেখানে ইউয়ানকে ডলারের প্রধান বৈশ্বিক বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, ভারত সেখানে নিজের মুদ্রা রুপির আন্তর্জাতিকীকরণ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে তীব্রভাবে ডি-ডলারাইজেশনের পক্ষে হলেও ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না। এ ধরনের দ্বিমুখী নীতি এবং উদ্দেশ্যগত ভিন্নতার কারণে ব্রিকস এখনো ডলারের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত এবং সুনির্দিষ্ট বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারেনি।   তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি এবং বিশ্বস্ততা এখনো বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ডলারকে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় বা ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে ধরে রেখেছে। সংকটের সময়ে বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় বিনিয়োগকারীরা এখনো ডলারে বিনিয়োগ করতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। চীনের ইউয়ান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও দেশটির কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক সচ্ছতার অভাবের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তা ডলারের মতো অবাধ গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ব্রিকস দেশগুলোর পুঁজিবাজার এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্মুক্ত, তরল এবং আইনি কাঠামোর দিক থেকে শক্তিশালী নয়। ফলে শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছার ওপর ভর করে ডলারের মতো একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানকে রাতারাতি প্রতিস্থাপন করা ব্রিকসের পক্ষে সম্ভব নয়।   সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, ডলারের আধিপত্য ভাঙতে ব্রিকস এখনো সম্পূর্ণ সফল না হলেও তারা মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র ক্ষমতার দেয়ালে একটি বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পেরেছে। ব্রিকস বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে ডলার ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করা সম্ভব এবং পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের বাইরেও বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। এটিকে সম্পূর্ণ বিজয় বলা না গেলেও একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক এবং কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। ব্রিকসের কারণে বিশ্ব এখন একটি একক মুদ্রার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে বহু-মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে।   ভবিষ্যতে ডলারের আধিপত্য কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে ব্রিকস দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার ঐক্য, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপর। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ব্রিকসের উত্থান বিশ্ব অর্থনৈতিক মানচিত্রে ডলারের চিরস্থায়ী একনায়কত্বের অবসান ঘটানোর প্রক্রিয়াটিকে অনিবার্যভাবে শুরু করে দিয়েছে।  

সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের যৌথ ঘোষণায় ঐকমত্য, ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের যৌথ ঘোষণায় ঐকমত্যে পৌঁছেছে সদস্য দেশগুলো। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, শনিবার ১২ সেপ্টেম্বর বিকেলে প্রকাশিতব্য ‘ব্রিকস নয়াদিল্লি ঘোষণা’য় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম উল্লেখ না করে সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা জানানো হবে। পশ্চিম এশিয়ায় চলমান তীব্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।   ঘোষণায় সংঘাত নিরসনে ‘সংলাপ ও কূটনীতিই একমাত্র পথ’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর আগে মে মাসে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে পশ্চিম এশিয়া সংকট নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতবিরোধের কারণে কোনো যৌথ বিবৃতি দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে এবার সব সদস্যকে একমত করতে পারাকে ভারতের কূটনীতি এবং ব্রিকসের শেরপাদের বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।   দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে সমবেত হয়েছেন ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা। সাত বছর পর ভারত সফরে আসা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শনিবার সন্ধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে। এর আগে শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পৃথক বৈঠক সারেন মোদি।   ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। ভারত দীর্ঘস্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে সংলাপের ওপর জোর দেয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের তাগিদ দেয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পেজেশকিয়ানের এই প্রথম ভারত সফরকে মোদি ‘বিশেষ’ বলে আখ্যায়িত করেন।   ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সম্মেলনে আঞ্চলিক সংকট নিরসন এবং সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও সুসংহত করার বার্তা প্রাধান্য পাচ্ছে। সব মতপার্থক্য কাটিয়ে যৌথ ঘোষণায় পৌঁছানো বৈশ্বিক অঙ্গনে ব্রিকস জোটের ঐক্য ধরে রাখার একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে।  

সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি এবং আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন : বহুমুখী ভারসাম্যের নতুন সমীকরণ

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এখন তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এবং উত্তর থেকে দক্ষিণ গোলার্ধে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে ‘ব্রিকস’ (BRICS)।   ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত জোটটি আর কেবল উদীয়মান অর্থনীতির অর্থনৈতিক ফোরাম হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির এক প্রভাবশালী সমীকরণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান বিশ্বরাজনীতির উত্তাল প্রেক্ষাপটে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।   আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা নিহিত রয়েছে গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার মধ্যে। দীর্ঘকাল ধরে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়শই অনুভব করে যে তাদের স্বার্থ ও সমস্যাগুলো এই নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত থাকে। ব্রিকস এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছে। আসন্ন সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ন্যায্য বাণিজ্যের দাবিগুলো জোরালোভাবে উত্থাপিত হবে। পশ্চিমা আধিপত্যের বিপরীতে একটি বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থা (Multipolar World Order) গড়ে তোলার যে আকঙ্ক্ষা গ্লোবাল সাউথের রয়েছে, আসন্ন সম্মেলন তা বাস্তবায়নের একটি বড় মঞ্চ।   বর্তমান বিশ্বরাজনীতির আরেকটি বড় সংকট হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রবণতা অনেক রাষ্ট্রকেই বিকল্প খোঁজার তাগিদ দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের আসন্ন সম্মেলনে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার বিষয়টি অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ব্রিকস দেশগুলো ইতোমধ্যে তাদের নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়িয়েছে এবং একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা বা ডিজিটাল মুদ্রা চালুর বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসেবে ঋণ সহায়তার পরিধি বাড়াচ্ছে। আসন্ন সম্মেলনে যদি এই অর্থনৈতিক বিকল্প ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী রূপ নেয়, তবে তা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটাবে।   বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে জোটের সম্প্রসারণ বা ‘ব্রিকস প্লাস’ (BRICS+) ধারণাটি আসন্ন সম্মেলনের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল ও মধ্যম শক্তির দেশ—যেমন মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো—এই জোটে যোগ দিতে তীব্র আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত সম্মেলনগুলোতে বেশ কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার পর আসন্ন সম্মেলনেও নতুন সদস্য পদপ্রার্থীদের নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এই সম্প্রসারণ প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে ব্রিকসের গ্রহণযোগ্যতা ও আকর্ষণ দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ব্রিকসে অন্তর্ভুক্তি বা অংশীদারত্ব বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে পারে, যা পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ।   তবে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের পথ যে একেবারে মসৃণ, তা বলা যায় না। এই জোটের অভ্যন্তরে কিছু নিজস্ব দ্বন্দ্ব ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম অংশ। বিশেষ করে, ভারত ও চীনের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা ব্রিকসের ঐক্যকে প্রায়শই পরীক্ষার মুখে ফেলে। ভারত একদিকে যেমন ব্রিকসের মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব দিতে চায়, অন্যদিকে কোয়াড (QUAD) জোটের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে। বিপরীত দিকে, চীন ও রাশিয়া এই জোটকে সরাসরি মার্কিন-বিরোধী একটি শক্তিশালী ফ্রন্ট হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী। ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা আবার একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পছন্দ করে। আসন্ন সম্মেলনে এই অভ্যন্তরীণ ভিন্নতা ও স্বার্থের সংঘাত দূর করে কীভাবে একটি যৌথ ইশতেহার এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন করা যায়, তা হবে জোটের নেতৃত্বের জন্য এক বড় পরীক্ষা।   একই সাথে চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং তাইওয়ান প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বৈশ্বিক উত্তেজনা আসন্ন সম্মেলনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর ক্ষেত্রে ব্রিকস একটি বড় হাতিয়ার। পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়াকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন ব্রিকস সম্মেলন প্রমাণ করে যে বিশ্ব রাজনীতির একটি বড় অংশ এখনো রাশিয়ার সাথে সংলাপে ইচ্ছুক। অন্যদিকে চীন এই সম্মেলনের মাধ্যমে গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারে তার আধিপত্য আরও সুসংহত করতে চাইবে।   পরিশেষে বলা যায়, আসন্ন ব্রিকস সম্মেলন কেবল একটি রুটিনমাফিক কূটনৈতিক বৈঠক নয়। এটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের এক স্পষ্ট প্রতিফলন। পশ্চিমা শক্তির বিকল্প কোনো সামরিক ব্লক তৈরি করা ব্রিকসের লক্ষ্য নয়, বরং একটি সমতাভিত্তিক, বহু-মেরুবিশিষ্ট এবং ন্যায্য আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।   অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সত্ত্বেও যদি এই সম্মেলন থেকে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, নতুন সদস্য গ্রহণ এবং বৈশ্বিক সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে তা সমকালীন বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এই আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের সাফল্যের ওপর।  

সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0