সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ, মেঘের রাজ্য সাজেক উপত্যকা, কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলরাশি আর নীলাচল-নীলগিরির নৈসর্গিক রূপকথা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে প্রকৃতির আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত সুউচ্চ পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল ও বন্য ঝরনা শুধু পর্যটকদের মনই ভোলায় না, বরং ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এটি দেশের সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চল। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই রূপসী সৌন্দর্যের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। একদিকে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির তোরণ, অন্যদিকে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যু। এ দুইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ জাতীয় নিরাপত্তার এক মহা-কৌশলগত সংযোগস্থল। পর্যটন সম্ভাবনার দিক দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির এক উদীয়মান চালিকাশক্তি হতে পারে। রাঙামাটির সাজেক উপত্যকা, ঝুলন্ত সেতু, বান্দরবানের দেবতাখুম, আলীকদমের মারায়ং তং এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা ও তারেং প্রতিবছর কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা সৃষ্টি করছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) নীতি অনুসরণ করে এ অঞ্চলে ইকো-ট্যুরিজম ও সামাজভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটালে স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সম্ভব। বিশেষ করে, পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল, হস্তশিল্প, অর্গানিক কৃষি এবং কটেজ ইন্ডাস্ট্রির সঠিক প্রসারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে। অপার পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও বিকাশের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখানকার আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সশস্ত্র বাস্তবতা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংঘাত অবসানের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। চুক্তিপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপক্ষ পাহাড়ে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সীমান্ত সড়কসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও উপদলীয় কোন্দলের কারণে PCJSS (মূল), PCJSS (সংস্কার), UPDF (মূল), UPDF (গণতান্ত্রিক) এবং সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশ কিছু নতুন সশস্ত্র উপদলের উত্থান ঘটেছে। দেশের মূলধারার আইনি কাঠামো স্পর্শ না করে সশস্ত্র সহিংসতার পথ বেছে নেয়া এসব সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের অবৈধ কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার প্রবণতা পাহাড়ের সাধারণ জনজীবনকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় জনমানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করছে না, বরং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও পর্যটনের গতিকেও থামিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য, পর্যটনবাহী যানবাহন, ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গৃহস্থালি থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এই অবৈধ অর্থ দিয়ে আধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র কেনাই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পর্যটন ও অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় জায়গায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্পে অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করেন এবং বিপুল সম্ভাবনাময় একটি অর্থবহ অর্থনৈতিক জোন বারবার হোঁচট খাচ্ছে। এ ধরনের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বর্তমানের চেয়ে আরও ব্যাপক হওয়া জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মিয়ানমারের সাথে ২৮৩ কিলোমিটার এবং ভারতের সাথে বিশাল দুর্গম সীমান্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র, অস্ত্র চোরাচালানি কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো যাতে পাহাড়ে আস্তানা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করে নিরাপত্তা বাহিনী। স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থার সুরক্ষাদান এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবির সার্বক্ষণিক সতর্ক নজরদারির বলেই হাজার হাজার পর্যটক প্রতিদিন দুর্গম পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে সক্ষম হন। বহিঃশত্রুর হুমকি এবং আঞ্চলিক সীমান্ত সংঘাতের নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিধি ও কৌশলগত নজরদারি আরও ব্যাপক আকারে বাড়ানো দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে জান্তা সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর (আরাকান আর্মি) মধ্যকার সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে দুর্গম সীমান্ত এলাকা ও গভীর বনাঞ্চলে ড্রোন প্রযুক্তি, থার্মাল ইমেজিং ও আধুনিক নিরাপত্তা চৌকির পরিধি বাড়ানো আবশ্যক। অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশদ্বার বন্ধ করতে এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর গোপন আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্রের একটি প্রধান কৌশলগত দায়বদ্ধতা। পাহাড়ের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে সুনির্দিষ্ট ও দ্বিমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। একদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত স্থানীয় সকল বাংলাদেশি অধিবাসীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে সকল প্রকার সশস্ত্র ও চাঁদাবাজ সংগঠনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক উপায়ে আলোচনার দরজা খোলা রেখেও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে সমূলে উৎপাটন করা ছাড়া পাহাড়ে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ত্রিবেণী সংগম ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতা ত্যাগ করে দেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতর ফিরে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কড়া নজরদারি এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সহযোগিতায় পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি পুরোপুরি বন্ধ হলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অপার ভূমি হয়ে উঠবে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতির এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু।
‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভা এবং কেক কাটার মধ্য দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে বিশ্ব পর্যটন দিবস পালিত হয়েছে। ঈশ্বরদীর স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের আয়োজনে রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর এসব কর্মসূচি পালিত হয়। বেলা ১১টার সময় স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্ট চত্বর থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। পরে রিসোর্টের পদ্মা কমিউনিটি সেন্টারে আলোচনা সভা ও কেক কাটা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। খায়রুল গ্রুপের স্বত্বাধিকারী আলহাজ খায়রুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খায়রুল গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ সাইদুল ইসলাম মান্না সরদার। এ সময় আরও বক্তব্য দেন ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান, স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের সিইও মুনেম তাজওয়ার অহিন, দৈনিক সমকালের ঈশ্বরদী প্রতিনিধি সেলিম সরদার, বিএনপি নেতা আবুল কাশেম, স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের জেনারেল ম্যানেজার মাহমুদুল হাসান প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে খায়রুল ইসলাম বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে পর্যটন খাতেও ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ব্যবহার পর্যটন শিল্পকে আরও আধুনিক, সহজলভ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থানীয় পর্যটন সম্ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাপ্তাহিক পদ্মার খবর পত্রিকার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম রিংকু, দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিনিধি সেলিম আহমেদ, ঈশ্বরদী অনলাইন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও সাপ্তাহিক হ্যালো ঈশ্বরদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজাউল করিম ফেরদৌস, দৈনিক আগামীর সময়ের প্রতিনিধি শিশির মাহমুদ, গ্রীন টিভির প্রতিনিধি তুহিন হোসেন, এস টিভির প্রতিনিধি সবুজ দেওয়ান, সাংবাদিক খায়রুল বাশার মিঠু, সিয়ামসহ অন্যরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রিসোর্টের সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) রোহান খান। কর্মসূচিতে স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
প্রতিটি বিষয় পড়ানোর আগে একজন শিক্ষককে প্রথমে বুঝতে হয় শিক্ষার্থী আসলে কোন প্রশ্নটা নিয়ে দ্বিধায় আছে? পর্যটনবিদ্যা পড়াতে গিয়ে গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটা শুনেছি তা হলো, এআই যদি সব করে দেয়, তাহলে আমরা এই পেশায় কেন পড়ছি? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বোঝা যায়, এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য : ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন, কেবল সরকার বা ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি জরুরি পাঠ। শিক্ষকতার একটি নিয়ম হলো, কোনো ভীতিকর প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমে পুরো সংখ্যাটা দেখাতে হয়, অর্ধেক সংখ্যা নয়। বিশ্ব পর্যটন ও ট্রাভেল কাউন্সিলের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালে পর্যটন খাত বিশ্বব্যাপী রেকর্ড ৩৫৭ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সমর্থন করেছে, এবং এ সংখ্যা চলতি বছরেই ৩৭১ মিলিয়নে পৌঁছানোর কথা। আগামী দশকে এই খাতে নতুন ৯১ মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনটি নতুন চাকরির একটি হবে পর্যটন খাতে। কিন্তু প্রতিবেদনটি একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে এই খাতে শ্রমিকের চাহিদা সরবরাহের তুলনায় ৪৩ মিলিয়নের বেশি ছাড়িয়ে যাবে, বিশেষত হসপিটালিটি খাতে যেখানে ঘাটতি হতে পারে প্রায় ১৮ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে পড়লে একটি জরুরি শিক্ষা পাওয়া যায়, পর্যটন খাতে সমস্যা চাকরি হারানোর নয়, বরং দক্ষ মানুষের অভাবের। যন্ত্র মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছে না, বরং মানুষের অভাব পূরণ করছে, এবং একই সঙ্গে নতুন একধরনের দক্ষতার দাবি তুলছে। শিক্ষার্থীদের যে ভুল ধারণাটি সবচেয়ে বেশি সংশোধন করতে হয়, তা হলো এআই মানেই চাকরি বিলুপ্তি। প্রকৃত পরিবর্তনটি ভিন্ন, ট্যুর গাইডের কাজ থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত হবে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির দক্ষতা। হোটেল রিসেপশনিস্টের কাজ থাকবে, কিন্তু তাকে বুঝতে হবে এআই বুকিং ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআইয়ের বিকাশ পর্যটন খাতে সম্পূর্ণ নতুন কিছু পদ তৈরি করবে, যেমন ভার্চুয়াল রিয়েলিটিনির্ভর হোটেল অভিজ্ঞতা তৈরির বিশেষজ্ঞ, যাদের কাজ হবে প্রযুক্তি ও অতিথি সেবার মাঝখানে সেতুবন্ধ তৈরি করা। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা নিজেই এগিয়ে এসেছে। সংস্থাটি তাদের অনলাইন একাডেমিতে দশটি নতুন কোর্স যুক্ত করেছে, যেখানে উন্নত এআই সরঞ্জাম একীভূত করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতের পর্যটনকর্মীরা প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বাজারে প্রবেশ করতে পারেন। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক নাতালিয়া বায়োনা এই প্রসঙ্গে যে কথা বলেছেন। তাঁর মূল বার্তা হলো, পর্যটনের মূল শক্তি এখনো গল্প বলার ক্ষমতা, এবং প্রযুক্তিকে সেই গল্পের বিপণন, প্রচার ও ব্যক্তিগতকৃত অভিজ্ঞতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাই এখন সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। আমাদের নিজের প্রেক্ষাপটে ফিরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে জাতীয় জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৩ শতাংশের সামান্য বেশি, আর সরকার এই অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। এই লক্ষ্য কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ট্রাভেল অ্যান্ড টুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স থেকে, যেখানে ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯ নম্বরে, এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে সর্বনিম্ন। শিক্ষক হিসেবে আমি এই সূচক পড়াই ভিন্নভাবে, নম্বর কম পাওয়ার লজ্জা নয়, বরং কোন বিষয়ে দুর্বলতা আছে তা চিহ্নিত করার সুযোগ হিসেবে। সূচক বলছে, বাংলাদেশ ভালো করেছে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের মাত্রায়, দুর্বল হয়েছে টিকে থাকার সক্ষমতা তথা টেকসই ব্যবস্থাপনায়। অর্থাৎ আমাদের হাতে কাঁচামাল আছে, নেই কেবল তা প্রক্রিয়াজাত করার দক্ষতা ও অবকাঠামো। আশার কথা হলো, সরকার এই ঘাটতি পূরণের কাজ শুরু করেছে। সংসদে জানানো হয়েছে, সারা দেশের প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি সম্ভাব্য পর্যটন স্থান চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা এবং পর্যটন নীতিমালা ২০২৬ প্রণয়নের কাজ চলছে, যার আওতায় আগামী চার বছরে ২৬ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার বিনিয়োগে ৬০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এই মহাপরিকল্পনায় কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম মডেলের কথা বলা হয়েছে, যেখানে পর্যটন এলাকার বেকার যুবক ও নারীদের শেফ, ওয়েটার বা কারিগর হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। শিক্ষক হিসেবে আমার প্রশ্ন একটাই, এই প্রশিক্ষণ কারিকুলামে ডিজিটাল মার্কেটিং, এআই সহায়ক ব্যবহার এবং তথ্যভাণ্ডার ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় কি যুক্ত হচ্ছে, নাকি শুধু ঐতিহ্যবাহী দক্ষতাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে? শিক্ষকতায় সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো তুলনামূলক উদাহরণ। ভারতের ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বহুভাষিক তথ্য ও ব্যক্তিগতকৃত ভ্রমণসূচি দিচ্ছে, এবং মহাকুম্ভ মেলায় কুম্ভসহায়ক নামের বহুভাষিক চ্যাটবট এগারোটি ভাষায় কোটি কোটি তীর্থযাত্রীকে সহায়তা দিয়েছে। সৌদি আরব ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ মিলিয়ন পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যে নিওম মেগাসিটির মতো প্রকল্পে প্রযুক্তিকে জাতীয় কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছে। এ দুই দেশের অভিজ্ঞতা থেকে একটি স্পষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায়, প্রযুক্তি গ্রহণের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিতে হয় মানুষ তৈরির প্রক্রিয়াকে। প্রযুক্তি কেনা যায় দ্রুত, কিন্তু দক্ষ মানুষ তৈরি করতে সময় লাগে বছরের পর বছর। তাই যে দেশ আজ প্রশিক্ষণ কারিকুলামে বিনিয়োগ শুরু করছে না, দশ বছর পর তার হাতে থাকবে চকচকে অ্যাপ, কিন্তু তা চালানোর মতো দক্ষ মানুষ থাকবে না। আমাদের দেশের হোটেল ম্যানেজমেন্ট ও পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রম এখনো মূলত সনাতনী, খাদ্য পরিবেশন, অতিথি সেবা এবং অদক্ষ ভাষাজ্ঞানে আবদ্ধ। এসব দক্ষতা আজও অপরিহার্য, কিন্তু এখন এর সঙ্গে তিনটি নতুন বিষয় যুক্ত করা জরুরি। প্রথমত, ডিজিটাল উপস্থিতি তৈরির দক্ষতা, যাতে একজন ক্ষুদ্র হোমস্টে মালিকও নিজের প্রতিষ্ঠানকে অনলাইন তথ্যভাণ্ডারে দৃশ্যমান করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, তথ্য বিশ্লেষণের মৌলিক জ্ঞান, যাতে একজন গন্তব্য ব্যবস্থাপক বুঝতে পারেন কোন সময়ে কোন গন্তব্যে পর্যটকের চাপ বাড়বে। তৃতীয়ত, নৈতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বোধ, যাতে পর্যটকের তথ্য সুরক্ষা ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করে প্রযুক্তি প্রয়োগ করা যায়। আমার শিক্ষার্থীদের প্রায়ই বলি, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব প্রথমে ভয় জাগায়, পরে সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু কেবল তাদের জন্য যারা সময়মতো প্রস্তুতি নেয়। বিশ্বব্যাপী পর্যটন খাতে যেখানে দক্ষ মানুষের ঘাটতি একটি বড় সংকট হয়ে উঠছে, বাংলাদেশের তরুণ জনসংখ্যা সেখানে একটি বিরল সম্পদ হতে পারে, যদি তাদের সঠিক দক্ষতায় প্রস্তুত করা যায়। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবস তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে, পর্যটন শিক্ষার পাঠ্যক্রম এখনই হালনাগাদ করতে হবে, নইলে যে সুযোগ আজ বিশ্বব্যাপী তৈরি হচ্ছে, বাংলাদেশ কেবল দর্শক হয়েই তা দেখে যাবে। আমার সেই শিক্ষার্থীদের জন্য এই একটি বার্তাই রেখে যেতে চাই, এআই তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং তোমার হাতের নতুন একটি যন্ত্র, যাকে ব্যবহার করে তুমি হয়ে উঠতে পারো এমন একজন পর্যটন পেশাজীবী, যাকে কোনো যন্ত্র প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। মো. মামুন হাসান ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।