চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে আবারও ঝরে গেল শ্রমিকের প্রাণ। ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথমে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যুতে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০। কয়েকজন শ্রমিক এখনো চিকিৎসাধীন। স্বজনদের আহাজারি, হাসপাতালের করিডোরে অপেক্ষমাণ পরিবার এবং দুর্ঘটনাস্থলের উদ্ধার তৎপরতা আমাদের আবারও সেই পুরোনো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের নিরাপত্তা কি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে, নাকি মুনাফা ও উৎপাদন ব্যয়ের হিসাবের কাছে শ্রমিকের জীবন এখনো উপেক্ষিত? জাহাজভাঙা শিল্প স্বভাবতই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পুরোনো একটি জাহাজের ট্যাংক, পাইপলাইন, কার্গো হোল্ড, ব্যালাস্ট ট্যাংক, ফুয়েল সিস্টেম কিংবা অন্য কোনো বদ্ধ অংশে দীর্ঘদিন ধরে বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাস, রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ কিংবা অক্সিজেন-স্বল্প পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তাই কোনো বদ্ধ স্থানে শ্রমিক প্রবেশের আগে শুধু চোখে দেখে কিংবা অনুমানের ভিত্তিতে সেটিকে নিরাপদ মনে করার সুযোগ নেই। প্রয়োজন গ্যাস পরীক্ষা, অক্সিজেনের মাত্রা যাচাই, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একবার পরীক্ষা করলেই ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না; কাজের ধরন ও জাহাজের বিভিন্ন অংশের অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই শ্রমিকেরা বদ্ধ ট্যাংকে প্রবেশের আগে কী পরীক্ষা করা হয়েছিল, গ্যাসের মাত্রা কে পরীক্ষা করেছিলেন, পরীক্ষার ফলাফল লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, কাজের অনুমতি কে দিয়েছিলেন এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী ও জরুরি উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই হয়তো বলে দেবে, এটি নিছক দুর্ঘটনা ছিল, নাকি প্রতিরোধযোগ্য নিরাপত্তা ব্যর্থতা। বাংলাদেশে জাহাজ রিসাইক্লিং খাতের জন্য আইন ও বিধিমালা রয়েছে এবং শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ও এতে গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও নিরাপদ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের হংকং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভাইরনমেন্টালি সাইন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস ২৬ জুন ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়েছে, যেখানে জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের সময় শ্রমিকের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, জরুরি প্রস্তুতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশও এই কনভেনশন অনুমোদন করেছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ—আইন, বিধিমালা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থাকার পরও যদি একই ধরনের প্রাণহানি বারবার ঘটে, তাহলে সমস্যাটি কোথায়? সমস্যা কি আইনের অভাবে, নাকি আইন ও নিরাপত্তা বিধিমালা বাস্তবায়নের দুর্বলতায়? শুধু একটি ইয়ার্ডের কাগজপত্র ঠিক থাকা মানেই সেটি নিরাপদ, এমন ধারণা অত্যন্ত বিপজ্জনক। একটি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড নিরাপদ কি না, তা বোঝার জন্য দেখতে হবে বাস্তবে সেখানে কী হচ্ছে। গ্যাস ডিটেক্টর আছে কি না, থাকলে সেগুলো সচল ও ক্যালিব্রেটেড কি না, বদ্ধ স্থানে প্রবেশের নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, ভেন্টিলেশন কার্যকর কি না, শ্রমিকেরা প্রয়োজনীয় পারসোনাল প্রটেকটিভ ইক্যুয়েপমেন্ট ব্যবহার করছেন কি না এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা কার্যকর কি না—এসব বিষয় সরেজমিনে পরীক্ষা করতে হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হলো ‘ধরে নেয়া’; ধরে নেয়া হলো জাহাজটি গ্যাসমুক্ত, ধরে নেয়া হলো ট্যাংক নিরাপদ, ধরে নেয়া হলো শ্রমিক জানেন কী করতে হবে, কিংবা ধরে নেয়া হলো কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু নিরাপত্তার মূলনীতি হওয়া উচিত—ধরে নেয়া নয়, পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ বদ্ধ স্থানে কাজের ক্ষেত্রে পারমিট টু ওয়ার্ক বা কাজের অনুমতিপত্র-ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। কোন শ্রমিক কখন কোন ট্যাংকে প্রবেশ করছেন, প্রবেশের আগে অক্সিজেনের মাত্রা কত ছিল, কোন গ্যাস শনাক্ত হয়েছে, কখন পুনরায় পরীক্ষা করা হয়েছে, কে অনুমোদন দিয়েছেন এবং জরুরি অবস্থায় উদ্ধার পরিকল্পনা কী—এসব তথ্য লিখিত এবং সম্ভব হলে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। কোনো জাহাজ কোনো একপর্যায়ে ‘গ্যাসমুক্ত’ ঘোষণা করা হলেও পুরো জাহাজ কাটার সময় সেটিই চূড়ান্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হতে পারে না; কাজের অগ্রগতির সঙ্গে নতুন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ধাপে পুনরায় পরীক্ষা, অনুমোদন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর থাকা উচিত। নিরাপত্তাব্যবস্থায় অনুমান নয়, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তই হতে হবে শেষ কথা। দুর্ঘটনার পর প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে—শ্রমিক কেন সেখানে গেলেন? কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তাঁকে সেখানে যেতে দিলেন কে? একজন শ্রমিক সাধারণত কর্মস্থলের নির্দেশনা অনুসরণ করেই কাজ করেন। তাই কোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশের ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ, ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা, কাজের অনুমোদনদাতা, ঠিকাদার ও সাব-ঠিকাদারের দায়িত্বও তদন্তের আওতায় আসতে হবে। যদি নিরাপত্তা অবহেলা প্রমাণিত হয়, তাহলে দায়ের স্তরগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে—কার দায়িত্ব কোথায় ছিল এবং কোথায় ব্যর্থতা ঘটেছে। ঠিকাদারি ও সাব-ঠিকাদারিব্যবস্থাও বিশেষভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। মূল প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক না হয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োজিত হলেও একজন শ্রমিকের নিরাপত্তার মান কম হতে পারে না। সস্তা শ্রমের নামে সস্তা নিরাপত্তা কোনো সভ্য শিল্পব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এ ঘটনার তদন্ত অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কারিগরি হতে হবে। শুধু দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ খুঁজে বের করলেই চলবে না; এর পেছনে কোনো ব্যবস্থাপনাগত, প্রশাসনিক বা নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতা ছিল কি না, তাও খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে সীতাকুণ্ডের সব শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে জরুরি ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ সেফটি অডিট পরিচালনা করা প্রয়োজন। এই অডিটে শুধু নথিপত্র পরীক্ষা নয়, বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করতে হবে—গ্যাস পরীক্ষার যন্ত্র, ভেন্টিলেশন, বদ্ধ স্থানে প্রবেশের পদ্ধতি, পিপিই, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ ও পারমিট টু ওয়ার্কব্যবস্থা সবকিছু সরেজমিনে পরীক্ষা করতে হবে। কোনো ইয়ার্ডে গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি পাওয়া গেলে শুধু নোটিশ বা জরিমানায় দায়িত্ব শেষ করা উচিত নয়; ঝুঁকি দূর না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কাজ বন্ধ রাখার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা ঘটার আগেই ঝুঁকি বন্ধ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তাকে অনেক সময় ব্যবসার অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত খরচ নয়; এটি উৎপাদনব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। প্রতিটি জাহাজের জন্য আলাদা ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্যাস পরীক্ষা, বদ্ধ স্থানে প্রবেশের কঠোর নিয়ম, প্রশিক্ষিত এইচএসই টিম এবং জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা থাকতে হবে। একজন শ্রমিক যদি কোনো জায়গাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন, তাহলে তাঁর সেই আপত্তিকে উৎপাদন ব্যাহত করার কারণ হিসেবে দেখা যাবে না; বরং সেটিকে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার আগাম সংকেত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করা শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি মালিকপক্ষের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও। শ্রমিকদেরও নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। গ্যাসের গন্ধ, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, চোখ জ্বালা কিংবা অস্বাভাবিক পরিবেশ অনুভূত হলে সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে। তবে সব দায় শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত কোনো সহকর্মীকে উদ্ধার করতে প্রশিক্ষণ ও উপযুক্ত শ্বাস-সুরক্ষা ছাড়া হঠাৎ বদ্ধ স্থানে প্রবেশ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক; এতে প্রথম দুর্ঘটনার পর দ্বিতীয় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রতিটি ইয়ার্ডে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল, উপযুক্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জাম, জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা এবং নিয়মিত উদ্ধার মহড়া থাকা প্রয়োজন। এ দুর্ঘটনায় অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক থাকার যে তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। যদি এ তথ্য তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কীভাবে কাজ করছিলেন, তাঁকে কে নিয়োগ দিয়েছিল এবং বয়স যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর অবশ্যই দিতে হবে। জাহাজভাঙা এমনিতেই উচ্চঝুঁকির শিল্প; সেখানে বয়স, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও স্বাস্থ্যগত সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই ছাড়া কাউকে নিয়োগ দেয়া আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে। শ্রমিকের বয়স ও দক্ষতা যাচাই, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগে প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে উপযুক্ত কর্মী নির্বাচনকে তাই বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা মানবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু ক্ষতিপূরণ কখনো একজন মানুষের জীবনের বিকল্প হতে পারে না। একজন শ্রমিক শুধু একজন ব্যক্তি নন—তিনি একটি পরিবারের উপার্জনের প্রধান অবলম্বন হতে পারেন। তাঁর মৃত্যুতে একটি পরিবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। তাই ক্ষতিপূরণ অবশ্যই দিতে হবে, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও যথাযথভাবে নিতে হবে; কিন্তু রাষ্ট্র, মালিক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হওয়া উচিত এমন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারের কাছে ক্ষতিপূরণ নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন না পড়ে। জাহাজ রিসাইক্লিং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং দেশের ইস্পাতশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহ করে। ফলে দুর্ঘটনার কারণে পুরো শিল্প বন্ধ করে দেয়া কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন নিরাপদ, আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে তোলা। বিশ্ব যখন নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশেরও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডকে বাস্তব কর্মপরিবেশে পরিণত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করলে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা যেমন বাড়বে, তেমনি শ্রমিকের জীবনও সুরক্ষিত হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শ্রমিকের নিরাপত্তাকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং নিরাপদ শিল্পই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই শিল্প। সীতাকুণ্ডের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর শুধু শোক প্রকাশ, তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, দায় নির্ধারণ করতে হবে, সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে হবে এবং সীতাকুণ্ডের প্রতিটি শিপইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ আমরা বারবার দেখেছি—দুর্ঘটনা ঘটে, প্রাণহানি হয়, তদন্ত কমিটি হয়, ক্ষতিপূরণ ঘোষণা হয়, কিছুদিন আলোচনা চলে; তারপর সময়ের সঙ্গে সবকিছু আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়। এই চক্র এবার ভাঙতেই হবে। শ্রমিকের জীবন কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো উৎপাদন খরচও নয়। একজন শ্রমিক সকালে পরিবারের মুখে হাসি রেখে কর্মস্থলে যান; তাঁর নিরাপদে ঘরে ফিরে আসার নিশ্চয়তা দেয়া মালিকপক্ষের মানবিক ও আইনগত দায়িত্ব, একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে ঝরে যাওয়া প্রাণগুলোর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা হবে তখনই, যখন এই মৃত্যুগুলোকে আরেকটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে ভুলে না গিয়ে এর কারণ, দায় এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার প্রতিটি স্তর চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিরাপত্তা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; নিরাপত্তাই হোক জাহাজভাঙা শিল্পের প্রথম শর্ত।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।