Breaking news

ছোটগল্প

গন্তব্য

জ্ঞান ফিরতেই শুঁটকি মাছের তীব্র গন্ধ এসে নাকে লাগল বিশ্বজিতের। শরীরটা ঝিম ধরে আছে। ব্যথায় চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। মাথার ওপরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজছে অনবরত। গাড়িটা থেমে আছে।   শুঁটকির গন্ধের কারণে একটা জায়গার কথা মাথায় এল, এটা তো সৈয়দপুর বাস টার্মিনাল! এই জায়গা তার অতি পরিচিত। যখন নীলফামারীতে কাজ করত, তখন অসংখ্যবার তাকে এদিক দিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে। বেশ কয়েকবার পূজার সময় পরিবারসহ এখান থেকে কেনাকাটা  করেছিল। একবার লাল রঙের একটা ফ্রক কিনেছিল মেয়ের জন্য। ওটা পরলে একদম পরির মতো লাগত মামণিটাকে! জামা পাওয়ার পর তার সে কী আনন্দ!   তার সঙ্গে কী হয়েছিল, তা মনে করার চেষ্টা করছে এখন। চোখ ঘুরিয়ে পায়ের কাছে স্ত্রীকে বসে থাকতে দেখল। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে তার মেজ বোন, বড় ভাই আর... আর একমাত্র ভাগ্নেকেও দেখতে পেল যেন। দৃষ্টিবিভ্রম কি না, এখনো বোঝার চেষ্টা করছে। ঘোর লাগার মতো অনুভূতি, মুখের ভেতরটা নোনতা নোনতা, গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। খুব কষ্টে একবার ঢোক গিলে ওপরের দিকে তাকাল সে। “আল্লাই জানে, সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে কী হবে! কোন দেশে যে থাকি আমরা, ঘোড়ার ডিম! মানুষ অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনেও সাইড দিতে চায় না।” —সামনের সিটে বসা দুজন মানুষের কথোপকথন কানে এল বিশ্বজিতের। কণ্ঠ শুনে তাদের চিনতে পারল, ওরা তার সহকর্মী।   অ্যাম্বুলেন্সটা চলতে শুরু করেছে। সে যে চোখ খুলেছে, তা এখনো কেউ লক্ষ করেনি। ধীরে ধীরে সব মনে আসতে শুরু করছে। বিকেলে মিটিংয়ের মাঝখানে বসের নির্দেশে একটা রেজিস্টার আনতে বের হতে হলো। প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলে কেন যে বসেরা মিটিং ডাকেন, কে জানে! বিরক্তিকর, একটা উইকএন্ডের আগেও সময়মতো বাড়ি ফেরা যায় না। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মোটরসাইকেল চালাচ্ছিল সে।   ঝিরঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। রোদে পুড়ে থাকা পিচঢালা রাস্তাগুলো বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে এবার একটু স্বস্তিই পেল বোধ হয়। যাক বাবা, কদিনের চলা ভ্যাপসা গরম থেকে তো বাঁচা গেল! মনে মনে বুলি আওড়াল বিশ্বজিৎ।   পকেটে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করছে। নিশ্চয়ই লাইন ম্যানেজার কল দিয়েছে। এই লোক পারে তো সেকেন্ডে সেকেন্ডে ফোন করে। কল ধরলেই নির্ঘাত বলবে, ‘এত দেরি করছেন কেন? দ্রুত আসেন!’   চলতি অবস্থায় মোটরসাইকেল থামিয়ে এখন আর ঝাড়ি খাওয়ার দরকার নাই। তাই এক্সিলারেটরে হালকা মোচড় দিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকল। হঠাৎ পেছন দিক থেকে প্রচণ্ড ধাক্কা! ছিটকে মহাসড়কে পড়ার সময় শুধু দেখতে পেল, একটা অটোরিকশা ধেয়ে আসছে ওর দিকে। তারপর সব অন্ধকার।   “অ্যাই, মনে হয় আর বাঁচবেনি। ভেল্লা রক্ত বাইর হইসে বাগে... বা...আর পানজর খানও তো ভাঙিছে।” —ড্রেসিং করতে করতে ঠাকুরগাঁওয়ের জেনারেল হাসপাতালের কর্মীরা আঞ্চলিক ভাষায় নিজেদের মধ্যে এসব বলাবলি করছিল। বাইক থেকে ছিটকে পড়ার পর শুধু এইটুকু স্মৃতি মনে আসছে এখন।   “এই বান্দীর পুত! দেখে চালাতে পারিস না? ড্রাইভারের জাতই না এগুলা।” —অ্যাম্বুলেন্সচালকের কর্কশ চিৎকারে বাস্তবে ফিরে এল বিশ্বজিৎ। সামনে কোনো গাড়ি হঠাৎ করে ঢুকে পড়েছে মনে হয়। শক্ত করে ব্রেক ধরায় সাসপেনশনে চাপ পড়ে বেশ একটা ঝাঁকি খেয়েছে অ্যাম্বুলেন্সটা। এই ঝাঁকিতেই যে অবস্থা! মনে হচ্ছে নাট-বল্টু সব খুলে আসবে। মাঝরাস্তায় বন্ধ হয়ে ঝামেলা পোহাতে না হলেই হয় এখন।   ক্রমেই শীতল হয়ে আসছে ওর শরীরটা। “তোমার কিচ্ছু হবে না গো! ভগবান নিশ্চয় আমাদের সহায় হবেন!” মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলছিল ওর স্ত্রী। অনেক কষ্টে মুখ দিয়ে একটা কথা বের করতে পারল বিশ্বজিৎ, “ঠান্ডা! ঠান্ডা লাগছে আমার।”   অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে একটা কম্বল ছিল। সেটা গায়ের ওপর দিতে দিতে ওর স্ত্রী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শারীরিক যন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীর কান্না শুনতে খারাপ লাগছে তার। দুর্ঘটনাটা না ঘটলে বাড়ি ফিরতে পারত। হয়তো বউকে বলত, সীদল ভর্তা করতে দাও। শুকনো লঙ্কা দিয়ে বানানো ঝাল-ঝাল সীদল ভর্তা আর গরম ভাত হলে আগামীকালের ছুটির দিনটা ফাটাফাটি জমে উঠত তার।   “রংপুর মেডিক্যালে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে?” “কম করে হলেও কুড়ি মিনিট তো লাগবে। তা অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়ার কোনো ব্যবস্থা হলো কি দাদা?” তারপর একটু নীরবতা। বড়দা আর সহকর্মীর এই কথোপকথনগুলো লোহার পেরেকের মতো হৃদয়ে এসে বিঁধছে তার। এই বিপদের মুহূর্তে হঠাৎ চিকিৎসার এত খরচের জোগান যে কীভাবে হবে, তা ভেবে পাচ্ছে না বিশ্বজিৎ। “আচ্ছা দাদা, চিন্তা করবেন না। দেখি আমরা কতদূর কী করতে পারি।” —নীরবতা ভেঙে আবারও কথা বলে উঠল সহকর্মী। “জেলা ব্যবস্থাপক আপাতত কিছু টাকা দেবে বলেছে, সমস্যা নাই। আমরাও দিব সাধ্যমতো। কিছু টাকা হয়তো আমাদের স্বাস্থ্যবিমা কাভার দেবে, কিন্তু বাকিটা যে কীভাবে কী হবে কে জানে।”   ওর স্ত্রী তখনো চাপা গোঙানির মতো করে কাঁদছিল। “বৌদি, কান্না করবেন না, প্রার্থনা করেন।”—বললেন সেই সহকর্মী।   এ মুহূর্তে বিশ্বজিতের মনে হচ্ছে, সে একজন ফাঁসির আসামি। প্রিজন ভ্যানে করে তাকে নেয়া হচ্ছে অজানা গন্তব্যে। গাড়ি থেকে নামলেই ফাঁসি কার্যকর করা হবে।   শ্বাসকষ্ট শুরু হচ্ছে। অক্সিজেনের নলটা কে যেন নাকে ঢুকিয়ে দিল, বুঝতে পারল না। বুকের ওপর পাথরের মতো ভারী কিছু একটা চেপে বসেছে। স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। স্ত্রীর কান্না, সহকর্মীদের কথা, অ্যাম্বুলেন্সের হর্ন—সবকিছু কেমন যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। আলো ক্ষীণ হয়ে আসছে।   খুব চেষ্টা করছে চোখ মেলে তাকানোর। পারছে না। তাহলে কি সে মারা যাচ্ছে? কয়েক ঘণ্টা আগেও তো জীবনটা স্বাভাবিক ছিল। জীবনের একটা সুন্দর গন্তব্য ছিল। অফিস থেকে বাড়িতে গিয়ে, মেয়েটাকে কোলে নিয়ে, বউকে বলত—আজ সীদল ভর্তা করো, গরম ভাত খাব!   অ্যাম্বুলেন্স দ্রুত এগোচ্ছে। মহাসড়ক এখন মোটামুটি ফাঁকা। পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়িগুলো ছুটে যাচ্ছে যার যার গন্তব্যে। কিন্তু তার গন্তব্য এখন কোথায়, সে জানে না। হয়তো হাসপাতালে গিয়ে জ্ঞান ফিরবে, হয়তো আর ফিরবে না। মানুষের আসল গন্তব্যই তো মৃত্যু, কিন্তু জীবনের গন্তব্য যে কখন, কীভাবে বদলে যায়, তা কি কেউ কখনো জানতে পারে?  

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0
অশুচি

দুদিনের বিরতি নিয়ে তৃতীয় দিনে হাড় হিম করা বরফশীতল জলে ঘসে মেজে স্নান শেষে বাড়ি ফিরেছেন শ্যামল বাবু। উঠোনে এসে হাঁক ছাড়লেন, “কই গো, ভাত হলো?” শ্রীতমা রসুই ঘরে ভাত রাঁধছিলেন। স্বামীর হাঁকডাকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এলেন।   লম্বা, পাতলা, ছিপছিপে শরীরী গঠন। গায়ের রং রোদে পুড়ে যেমনটা হয় ঠিক তেমন। শ্রীতমার মুখখানি তার জীর্ণ-শীর্ণ দেহকে ছাপিয়ে গেছে বোধ করি তার সুন্দর মুখশ্রীর জন্য। গরিব ঘরের মেয়ে-বউদের এমন সৌন্দর্য বাড়াবাড়ি রকমের। তাদের যেন কদর্য চেহারায় মানায় ভালো।   শ্রীতমা ভাত বেড়ে দিল স্বামীকে। শ্যামল খাওয়ার মাঝে জিজ্ঞেস করল, “আজ কাজে যাওনি? ব্যাপারখানা কী?” শ্রীতমা মুখ ঘুরিয়ে বলল, “শরীরটা ভালো নেই।” শ্যামল কিছু না বলেই নিজ খাবারে মনোযোগ দিল।   গতকাল সন্ধ্যা থেকেই শ্রীতমার শরীর ভালো বোধ হচ্ছে না। তাই আজ আর কাজেও যায়নি। তার স্বামী শ্যামল কয়েক মাস আগে দুর্ঘটনায় এক পা ভেঙে এখন ঘরে বসে আছে একপ্রকার অক্ষম হয়ে। তার আগে অবশ্য  ভালো রোজগারই করত সে রিকশা চালিয়ে। কিন্তু অদৃষ্টে যা ছিল, তা আর কে ঠেকাবে। এখন অবশ্য শ্রীতমার নতুন এক নামও হয়েছে। ‘ল্যাংড়ার বউ’, অত্যন্ত আহত হয় লোকমুখে তাকে করা এমন সম্বোধন শুনে।    শ্যামল যখন সুস্থ ছিল, তখনো শ্রীতমা লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করত। শ্যামলের দুর্ঘটনার পর হঠাৎই কোনো এক তুচ্ছ কারণে তার এক বাড়ির কাজ চলে যায়। একে তো নিত্য দারিদ্র্য চলছে, তার ওপর স্বামীর পথ্য। সব মিলিয়ে শ্রীতমার যায় যায় অবস্থা। কিন্তু স্বামীকে এখনই জানিয়ে তার চিন্তা ক্লেশ আরও খানিকটা বাড়ানোর আশঙ্কায় না জানানো শ্রেয় মনে করল।   কয়েক দিনের মধ্যে নতুন এক কাজ পেয়েও গেল। তাদের বাড়ি থেকে মিনিট দশেক দূরে পরেশের বাড়িতে কাজ পেল শ্রীতমা। ঘরদোর ধোয়া-মোছা, কাপড় কাচা, থালাবাসন ধোয়া বাবদ একটা নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক শ্রীতমা পাচ্ছিল ঠিকই, এ ছাড়া বাড়তি উপঢৌকনও নেহাৎ কম নয়।  এসবের পেছনে কারণ ছিল বৈকি। পরেশের বাড়িতে তার নিষিদ্ধ স্পর্শ। তাদের নিষিদ্ধ শরীরী মেলামেশা বোধ করি স্পষ্ট কারণ।   প্রথম দিকে শ্রীতমা কঠিন প্রতিবাদ করলেও স্বামীগৃহের দারিদ্র্য, অভাব, নানা রকম সমস্যার উপদ্রবে সে যেন ভারি দমে গেল। স্বামীর প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠা স্ত্রীরা যেন এরূপেই বাধ্য হয়।   অভাবের জাঁতাকলে প্লিষ্ট সংসারে যখন খুব সহজেই স্বামীর পথ্য জোগান সম্ভব হয়, তখন অশুচি হওয়া না হওয়া নিয়ে এত কীসের ভাবনা! শরীরী খেলায় মত্ত হয়ে নিজেকে অপবিত্র অশুচি করে যেন বাঁচল শ্রীতমা।   শ্যামল এক পাশ কাত হয়ে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। এ যেন শান্তির, পরম নিশ্চয়তার এক ঘুম। শ্রীতমা ভাবে, মানুষের যত দুর্দশা, দারিদ্র্য আর চিন্তাই থাকুক না কেন এ ঘুম কিন্তু কিছু সময়ের জন্য তা ভুলিয়ে রাখে। যতক্ষণ নিদ্রা ততক্ষণ শান্তি। যেই ঘুম ভাঙবে, আবার সব অনিশ্চিতের শুরু।   শ্রীতমার খুব মায়া হলো শ্যামলের  জন্য। যতবার স্বামীকে দেখছে তার নোংরা অপবিত্র শরীর যেন তাকে আরও কাঁদিয়ে তুলছে। তার ভীষণ অনুতাপ হতে লাগল। শ্যামলের আর যা-ই থাকুক না থাকুক তার চরিত্রখানি ভালো। এটি যেন শ্রীতমাকে আরও জর্জরিত করে তুলছে। স্বামীর পাশে নিজেকে ভাগাড়ের আর্বজনার স্তূপ মনে হতে লাগল। আত্মোপলব্ধি শ্রীতমাকে এতটাই অনুতপ্ত করে তুলল যে সে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে একেবারে দিঘির পাড়ে এসে থামল। বিলম্ব না করে ঝাঁপিয়ে পড়ল দিঘির জলে। তার সমস্ত পাপ, শরীরী নোংরা, অপবিত্র, অশুচি সব যেন মুহূর্তেই দিঘির জলে মিশে গেল।  

সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬ 0
প্রতীকী ছবি
পুলক

ভিন্নমত, দ্বন্দ্ব, কলহ, হট্টগোল থেকে ঝগড়া পর্যন্ত মুখে মুখে চালিয়ে নেয়া গেলেও হাতাহাতির পর্ব শুরু হলে তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাণ্ডবে পরিণত হয়। ধাক্কাধাক্কি পর্যন্তও বেশি ঝুঁকি মনে হয় না আমার কাছে। পাশে দাঁড়িয়ে দেখা যায়। তবে এ পর্যন্ত শুধু দেখে মজা পাওয়া যায় না। খেয়াল করে শুনতেও হয়। এখানে দেখা অপেক্ষা শোনার গুরুত্ব বেশি। বিশেষ করে, অন্যের পারিবারিক বিষয়ে ঝগড়া শুনতে অনেককেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।   তখন আমার কিশোর বয়স। আমার দাদাবাড়ি থেকে নানাবাড়ির দূরত্ব এক মাইল পথ। ভ্যানে গেলে দুই টাকা, হেঁটে গেলে আধঘণ্টা সময় লাগে। হাতে টাকার অভাবের সাথে সময়ের অভাবের সংশ্লিষ্টতা অঙ্গাঙ্গী। টাকা ও সময় উভয়ের অভাব মানুষকে কোণঠাসা করে ফেললেও পর্যাপ্ত সময় থাকলে টাকার অভাব অনেকটা সামলে নেয়া যায়। সুতরাং কিছু সময় ব্যয় করে দুটি টাকা সাশ্রয় সহজ ও বুদ্ধিমানের কাজ ছিল আমার জন্য।   তখন গ্রামে এত ঘনবসতি ছিল না। দুই গ্রামের মধ্যে মস্ত ধানখেত। অধিকাংশ গ্রামের গড়ন গম্বুজ আকৃতির হয়ে থাকে। ঘনবসতি ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে গম্বুজের মাথার মতো গ্রামের শেষভাগে বিলের ধারে একটি বাড়ি দিয়ে বসতির শেষ হয়। দুই গ্রামের দুই প্রান্ত বিল বা মাঠে এসে শেষ হয়। সুতরাং গ্রামের এই শেষই গ্রামের শুরুও বটে।   দিনের বেলা হেঁটে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল। খেত-খামার, ধান-গম, গরু-ছাগল, গাছ-ফুল, কলা-কুল অনেক কিছু দেখতে দেখতে দাদাবাড়ি থেকে নানাবাড়িতে চলে যেতাম। রাতে সহচরী হতো চাঁদ। নানাবাড়ির মস্ত উঠোন থেকে চাঁদটা নিয়ে দাদাবাড়ির উঠোনে এনে ঝুলিয়ে দিতাম। ভাবটা এমন ছিল যে, চাঁদটা আমার বাপ-দাদার সম্পত্তি।   তেমনই একদিন শীতের সকালে দাদাবাড়ি থেকে নানাবাড়িতে যাচ্ছিলাম। গ্রাম শেষে মাঠ, মাঠ শেষে নানাবাড়ির গ্রাম। গ্রামে প্রবেশের আগেই মানুষের উচ্চকণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম। হাওয়ায় ভেসে আসছিল কথা। আমার হাঁটার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিলাম। কোন বাড়ির শব্দ, এগিয়ে দেখতে হবে।  প্রথম বাড়ি পরই গলিপথের শুরু। গলিপথ দিয়ে তিন-চাারটি বাড়ি পরই স্বামী-স্ত্রীর বাকবিতণ্ডা শুনতে পেলাম। দুজন একে অপরের প্রশ্নের উত্তর করছে। পাশাপাশিই তারা আছে, তবে যেন দুজন দুই গ্রামের শেষবাড়ি দুটিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে একে অপরের কুশল বিনিময় করছে।   আমি খুব ধীরগতিতে হাঁটছিলাম। যখন দেখলাম বেশ কিছু দর্শক-শ্রোতা সাপখেলা দেখার মতো নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, তখন নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলাম না। দাঁড়িয়ে গেলাম বাড়ির সামনেই। বাড়িটি কলাগাছের শুকনো পাতা দিয়ে ঘেরা। ঘেরাটাও বেশ পুরাতন। দু-এক জায়গায় পাতা নেই। তাই  উঁকি না দিলেও বাড়ির ভেতরটা দেখা যাচ্ছে। খেয়াল করলাম বেশ কিছু মহিলা মাথায় ঘোমটা দিয়ে মুখে আচল গুঁজে লজ্জানত মুখে ঝগড়া উপভোগ করছে। গলিতে যেসব পুরুষ গরুর খুঁটো, বাঁশের ঝুড়ি, কোদালের হাতল বানাচ্ছিল, তারা খুব ধীরে কাজ করছিল। কারণ, কাজে তাদের মনোযোগ ছিল না। আমাদের সকলের মনোযোগ ওই বাড়িতে।   দু-তিন বছরের একটি শিশু মা-বাবার উচ্চকণ্ঠের আলাপে ভীত হয়ে উঠোনের মাটিতে বসে কাঁদছে। শিশুটির গায়ে শীতের পোশাক বলতে একটি গেঞ্জি এবং মাথায় উলের টুপি পরানো আছে। শিশুটি চিৎকার করে সমানে কাঁদছে আর নাক দিয়ে সর্দি গড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে স্বামী-স্ত্রীর কোনো খেয়াল নেই। স্বামীর খেয়াল তার তেজী স্ত্রীর দেকে। তার দাবি, সবকিছুর কৈফিয়ত কেন স্ত্রীর কাছে দিতে হবে? স্ত্রীর দাবি, তাকে যদি স্বামীর কাছে কৈফিয়ত দিতে হয়, স্বামী কেন দেবে না? স্বামী বলল— দেব না কৈফিয়ত। কী করবি? তা দিবা কেন?  তুমি একটা খারাপ লোক। বদ বিটা। কী বললি? তুইসহ তোর পরিবারের সাবার স্বভাবই খারাপ। কী বললি, আর একবার বল। স্ত্রী তার সংলাপটি একনাগাড়ে তিনবার বলল— খারাপ, খারাপ, খারাপ।   বাকবিতণ্ডা, ঝগড়া, কলহ, গ্যাঞ্জাম পার হয়ে হাতাহাতিতে পৌঁছে তাণ্ডব শুরু হলো। স্বামী দুটি চড় দিতেই স্ত্রী কিছু একটা হাতে নিয়েছিল। সম্ভবত কলাপাতার ডাঁটি। ছাগলে কলার পাতা খেলেও ওই শক্ত অংশ খায়নি। হয়তো ছাগল বুঝেছিল। এ সংসারে কিছুই ফেলনা নয়। বাঁচিয়ে রাখলে সংসারের কাজে লেগে যাবে। স্ত্রী শুধু ডাঁটিটি উঁচু করেছিল। স্বামী দ্রুত ধরে ফেলে সেটারই ব্যবহার করল। প্রথম দু-তিন বাড়ি পর্যন্ত সবাই দেখলেও যখন দেখল স্ত্রীকে মারতে মারতে ভূপাতিত করে ফেলেছে, তখন দু-চারজন মহিলা স্ত্রীটিকে বাঁচাতে এগিয়ে গেল। একটি কিশোরী শিশুটিকে কোলে নিয়ে অদূরেই দাঁড়িয়ে রইল। কোদালের হাতলসহ চাচা এসে বলল, “আর যদি একটি বাড়ি বউমার গায়ে লাগে, তোকে এই হাতল দিয়ে মেরে শেষ করে দেব, হারামজাদা। বউ মারা কোনো ভদ্রলোকের কাজ? বদমাইশ।”  আমি ভীত হয়ে গেলাম। এবার বুঝি এ দুই পুরুষে যুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু না। কিশোরীর হাত থেকে স্বামী তার ছেলেটিকে ছিনিয়ে নিয়ে আমার পাশ দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল মাঠের দিকে। যেন কালো একটি এঁড়ে গরু শিং দিয়ে রাগের চোটে মাটি খুঁচিয়ে অবশেষে দড়ি ছিঁড়ে গোয়াল থেকে বেরিয়ে গেল। তাণ্ডব শেষ। আমি ধীরগতিতে আবার হাঁটা শুরু করলাম। দুজন নারী আমার পিছেই হাঁটছিল এবং নিজেদের মধ্যে  আলাপ করছিল— কেন রে,  স্বামীর সব কথায় জাবাব দিতে হবে? পাইছিস জবাব? পুরুষ মানুষ কি ইয়ারকি? কী কও বু? জানি নে, ও বিটারও দোষ আছে। নিত্যদিন যে বউ তোর জ্বালায়, সে জ্বালা সইবি কেন? বউ বাদ দিলেই হয়। নিত্যদিন এ রকম নাটক আর দেখে পারা যাচ্ছে না। তা যা কইছো। কাজ বাদ দিয়ে নিত্যদিন এদের এই কাইজে দেখতিই আমার সময় চলে যায়। এতক্ষণে গোবর গাঁথার কাজটা শেষ হয়ে যেত। দেখো আমার আবার বাড়ি যেয়ে ময়নার বাপের হাতে ঘাপান খাওয়া লাগে কি না। নে পা চালিয়ে হাঁট।   তখন আমার কিশোর মনে ভাবছিলাম যে, আমি না হয় পথিক; পথে থমকে থমথমে মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে না পেরে সময় নষ্ট করলাম। এ তো আমার সাশ্রয় হওয়া দুই টাকার মধ্যে আশ্রয় পাওয়া ঘটনা। এরা যারা বাড়ির কাজ ফেলে ঝগড়া দেখতে এসেছিল, এদের পুলকটা কীসে? এখন বুঝি, অন্যের মাইর খাওয়া দেখাও একটি পুলক। আমরা পুলকে অন্যের অন্যায় দেখি; ঝগড়ায় নীরব সঙ্গ দিই।  

আগস্ট ২৫, ২০২৬ 0
কবর থেকে কঙ্কাল তোলার প্রতীকী ছবি
শিখা

রহমান মিঞা খুব ভোরে কবরস্থান থেকে বাড়ি ফিরলেন। তিনি সারা রাত তাঁর ছেলের কবরের পাশে কাটিয়েছেন। মাঝে মাঝে তাঁর সাথে কবরস্থানে অন্যদেরও দেখা যায়। গত সপ্তাহে তাঁর ছেলে রহমত খামারি বজ্রপাতে মারা গেছে।   ছেলের স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। নাবালক নাতিকে দেখলেই ছেলের কথা মনে পড়ে যায়। রহমান কিছুতেই তাঁর ছেলের লাশ চুরি হতে দেবেন না। গ্রামবাসীও তাঁকে আশ্বস্ত করেছে। রহমত বজ্রপাতে মারা যাওয়ায় তার লাশ এখনো পচেনি।   বজ্রপাতে মরে যাওয়া মানুষের অঙ্গ ও হাড় দিয়ে প্রাকৃতিক চুম্বক তৈরি হয়। এখন লাশ চুরির সিন্ডিকেট সক্রিয়। বিনসাড়া গ্রামে আগেও লাশ চুরি হয়েছে। রহমতের বাবা ও গ্রামবাসীরা প্রতিরাতে কবরস্থান পাহারায় থাকে। আগে চুরির লাশ কখনো উদ্ধার হয়নি। চোর কখনো ধরাও পড়েনি। থানার পুলিশও কখনো মুখ খোলেনি।   এভাবে আর কত দিন লাশ পাহারা দেয়া যাবে? ছয় মাস আগেও লাশ চুরি হয়েছে। পাহারা বন্ধ হলে যদি লাশ চুরি হয়? ওদের টার্গেট কঙ্কাল, যা অনেকাংশেই চলে যায় সীমানা পেরিয়ে। বজ্রপাতে মারা যাওয়া লাশের প্রতি ওদের বিশেষ নজর, এতে বেশি টাকা ওরা পায়। কী খবর? কয়টা মাল সরিয়েছিস? মাল সরাইনি। আর এট্টু হলি পারে ধরা পড়তাম। বলিস কী? এলাকার খবর কী? সারা রাত মুরুব্বি লাশ পাহারায় থাকে। মাঝে মাঝে গ্রামের মানুষও পাহারায় থাকে। ধরা পড়লেই  কাবাব। এখন উপায়? অপেক্ষা করা ছাড়া কী উপায়? এত সময় নাই। বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোন উপায়ে। লাশ কেউ চুরি করতে পারে না। লাশ চুরি করতে হলে আরেকটা লাশ ফেলতে হবে। বর্ডারের ওপাশে লাশের হাড় ও লাশের কিডনি নেবার অপেক্ষায় ওরা! খুন করলি কি লাভ হবে? আমার চাই কঙ্কাল। অন্য উপায় বের করতে হবে। খুন হলিপারে আরেকটা মামলা, আরেকটা তদন্ত হবে। আবার ধরা পড়ার ভয়। ওকে। তবে কাজ সমাপ্ত করতে হলে ঝুঁকি তো নিতেই হবে। পয়সা তো আর পায়ে হেঁটে বাড়ি আসবে না।   কুদ্দুস মণ্ডলের বাড়িতে আগুন লেগেছে। এখন সেখানে বেশ ভিড়। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা প্রকাণ্ড আকার ধারণ করল। কেউ যায় আগুন নেভাতে, কেউ যায় আগুন দেখতে! রহমান মিঞার বাড়ি কুদ্দুসের কয়েক বাড়ি পরই। রহমান মিঞা দৌড়ায় কুদ্দুসের বাড়িতে। এখন গোরস্থান ফাঁকা। সবাই আগুন নেভানোতে ব্যস্ত। এখন লাশ চুরির আসল সময়। এত বড় কেন? আগুন কি লাইগলো খড়ের গাদায়? আগুন আরও বাড়ে বাড়ুক। আমার কাজ আগে সারতে হবে। চল তাড়াতাড়ি হাত লাগা। লাশ চুরি করি বস্তায় ভরতি পারলি  তখন মনের আগুন নিভতি পারে। আগুন দিছ কনে? গোয়ালঘরে। অবলা পশুগুলা তো মরি যাবে! কাজটা করছ কী? যে মরে মরুক। আমার কী রে হারামজাদা? আমার চাই লাশের কঙ্কাল, লাশের কিডনি। এই কঙ্কাল পালি আমার মনের আগুন নিভে যাবে। যতক্ষণ কঙ্কাল-কিডনি না পাব, ততক্ষণ যা খুশি তা-ই করতি পারি। দরকার লাগলে গোটা দুনিয়া জ্বালাইয়া দিব। ওস্তাদ, তুমি চোর হলিও সরদার খারাপ না। কাজটা শেষ কর, ফিসফাস কম কর। কাজ শেষ হলিপারে কাইল মোটা টাকা পাবানি।   খড়ের গাদায় আগুনের তেজ কমে এসেছে। কাঞ্চন ডাকাতের মনের শিখাও ম্রিয়মাণ হয়েছে। বস্তায় লাশের কঙ্কাল ভরে কাঞ্চন স্বস্তিতে। আগুন নিভিয়ে কিছু মানুষ রাস্তা দিয়ে ঘরে ফিরছে। কাঞ্চন সিএনজি নিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যের মুখে ধাবমান। গ্রামের মানুষ একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছে, কোন গেরামের গাড়ি? কনে যায়? কাঞ্চনের সিএনজির গিয়ার চেঞ্জ হয়ে গেল। গাড়ি এখন আরও দ্রুত চলতে শুরু করল। গ্রামের মানুষের আবেগ দাবানলের মতোই, একবার জ্বলে উঠলে না পুড়িয়ে রক্ষা নেই। এ সত্য কাঞ্চনের ভালো করেই জানা রয়েছে।  

আগস্ট ৫, ২০২৬ 0
একটি হাসির জন্য

কলেজের শেষ ক্লাসটি নিয়ে যখন বের হলাম, তখনো আকাশে বিকেলের রোদ ঝিকমিক করছিল। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই চারদিক যেন থমকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে নীল আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। প্রকৃতি নিস্তব্ধ, যেন ভয়ংকর এক কালবৈশাখীর অপেক্ষায়। আমি তখন শাওনাজ রোডে, বাসার কাছাকাছি। হঠাৎ ধুলোবালির উন্মত্ত ঝাঁপটা শুরু হলো। চোখ মেলাই দায়।   এমন সময় রাস্তায় পড়ে থাকা একটি তরমুজের খোসায় পা পিছলে আছাড় খাওয়ার উপক্রম। শেষ মুহূর্তে পাশের বৈদ্যুতিক খুঁটি আঁকড়ে নিজেকে সামলালাম। ঠিক তখনই বাম পাশের চারতলা বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে ভেসে এল খিলখিল হাসি।   তাকিয়ে দেখি, এক অপরূপা তরুণী আমার দুরবস্থা দেখে হেসে কুটিকুটি। চোখাচোখি হতেই সে লজ্জা পেয়ে বারান্দায় মেলে দেয়া কাপড়গুলো গুছিয়ে দ্রুত ভেতরে চলে গেল। আমি তখনো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর ছয়-সাত বছরের একটি ছেলে বারান্দায় এসে গম্ভীর মুখে বলল- এই যে মিস্টার, হাঁ করে থাকবেন না, মুখে মশা ঢুকবে কিন্তু! কথাটি বলেই সে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।   এরই মধ্যে নেমে এল মুষলধারে বৃষ্টি, সাথে ঝড়। আশ্রয় নিলাম রাস্তার ডান পাশের একটি চায়ের দোকানে। এমন একটি কোণে বসলাম, যেখান থেকে ওই বারান্দাটি স্পষ্ট দেখা যায়। ধূমায়িত চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম, মেয়েটি কি আমাকে অপমান করল? পরক্ষণেই নিজেকে বুঝিয়ে বললাম, রাস্তায় এমন কাণ্ড ঘটলে যে-কেউ হাসতেই পারে। তবু কেন জানি ওর হাসিটা বারবার কানে বাজছিল। মনে হচ্ছিল, ঝরনার কলকল ধ্বনির মতো নির্মল, আবার কোথায় যেন অদ্ভুত এক মাদকতা লুকিয়ে আছে।   বাড়ি ফিরতেই দেখি মা দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। সেই শিশুকালে এক কালবৈশাখী ঝড়ে নৌকাডুবিতে আমাকে আর মাকে বাঁচাতে গিয়ে বাবা চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছেন চিনিডাঙ্গা বিলের অতল জলে। তার পর থেকে মা-ই আমার সমস্ত পৃথিবী। আমি স্থানীয় এ জি সরকারি কলেজে বাংলা পড়াই, আর অবসরে কবিতা লিখি।   ঘটনাটা মন থেকে সরাতে পারছিলাম না। নাশতা শেষ করেই কাগজ-কলম নিয়ে বসে গেলাম। অদ্ভুত এক অভিমান আর মুগ্ধতা মিলেমিশে জন্ম দিল একটি কবিতার-   এলোকেশী সুহাসিনী   তুমি সুহাসিনী তুমি হেমাঙ্গিনী কেমন তোমার মন? পথিক বেভুল আজ চুলবুল তাই হাসিতে উচাটন?   গোধূলি লগ্নে কী কুক্ষণে দীঘল কুন্তল ছড়ালে; ঘনঘটা কালে এলোচুলে কালবৈশাখী আনলে।   কালোর মাঝে সেই সাজে কলকলানো হাসি; আকাশ জুড়ে আঁধার ফুঁড়ে এলো আলোর শশী।   কারও কষ্টে স্বীয় তুষ্টে এ কেমন ভব্যতা? নির্দয় তুমি, পাষাণ তুমি এ কেমন সভ্যতা!   কবিতাটি সেদিনই লোক মারফত দৈনিক দিনমণি পত্রিকার সম্পাদক জগলু জোয়ার্দারের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। এরপর প্রায় প্রতিদিন বিকেলে সেই চায়ের দোকানে বসি। আলো-ছায়ার ঝিলিক চলছিল।  একদিন চায়ে চুমুক দিচ্ছি, এমন সময় সেই ছোট্ট ছেলেটি হাতে একটি পত্রিকা নিয়ে হাজির। আপনিই রেজাউল আলম সরকার? হ্যাঁ, কেন? সে সাহিত্যপাতা খুলে আমার সামনে ধরল। 'এলোকেশী সুহাসিনী' কবিতাটা কি আপনার লেখা? জি। ভালোই লিখেছেন বটে। কিন্তু তাই বলে কাউকে অপমান করতে পারেন? আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, মানে... আমি... এত মানে করার দরকার নেই। চলুন, আমাদের বাসায়। আমি ইতস্তত করলেও সে কোনো সুযোগ দিল না। বাধ্য হয়ে তার সঙ্গে গেলাম।   ছেলেটির নাম লাবিব খান জনি। আর সেই হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটির নাম লায়লা খানম জুঁই। মা, মেয়ে আর ছেলেকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। সেদিন ওদের মা বাড়িতে ছিলেন না। পরিচয়ের সেই শুরু। তারপর জনির দুষ্টুমি আর জুঁইয়ের প্রাণখোলা হাসির টানে প্রায়ই ওদের বাসায় যাওয়া-আসা শুরু হলো। কখন যে জুঁই আমার প্রতিদিনের অপেক্ষা হয়ে উঠল, নিজেও বুঝতে পারিনি।   ঠিক এই সময়ের কিছুদিন আগে মা আমার বিয়ের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন- রেজা, তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি। তুই কি মেয়েটিকে একবার দেখবি? আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বলেছিলাম- মা, তুমি যাকে পছন্দ করবে, তাকেই আমি বিয়ে করব। দেখাদেখির কোনো প্রয়োজন নাই।   কিন্তু এতদিনে আমার মনজুড়ে জায়গা করে নিয়েছে জুঁই। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে সম্পাদক  জগলু জোয়ার্দারের  কাছে গেলাম। সব শুনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন- মা সারাটা জীবন তোকে নিয়েই বেঁচেছেন। তাঁর সিদ্ধান্তকে অবহেলা করিস না। আগে তাঁর প্রতি দায়িত্ব পালন কর।   বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। তবু শেষবারের মতো জুঁইকে একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ডেকে সব খুলে বললাম। আমার কথা শেষ না হতেই জুঁইয়ের মুখের রং বদলে গেল। কিছুক্ষণ নির্বাক বসে থেকে সে ফিসফিস করে বলল- তাহলে এতদিন যা বলেছ, সবই মিথ্যে? আমি মাথা নিচু করে বললাম- মাকে কষ্ট দিতে পারব না, জুঁই। জুঁই ছলছল চোখে ধীরে  উঠে দাঁড়াল। এরপর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে একনাগাড়ে বলে উঠল- তুমি ভণ্ড... প্রতারক... বিশ্বাসঘাতক! আমাদের সমাজে প্রেমে পড়ার সময় সব পুরুষই একেকজন বীরপুরুষ রূপ নেয়। কিন্তু বিয়ের সময় মায়ের একটা ধমক কিংবা অনুভূতির দোহাই শুনলে একসাথে পদ্মা-মেঘনা পাড়ি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া ছেলেটাও আর ছোট্ট একটা ড্রেন ডিঙানোর সাহস পায় না! তোমার মতো কাপুরুষের মুখে প্রেম কিংবা শিক্ষকতার মতো মহান পেশা কোনোটাই মানায় না! আর একটি মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে সে হনহন করে দ্রুত বেরিয়ে গেল। সেদিনের পর যেন আমার ভেতরের সমস্ত আলো নিভে গেল। ক্লাসে মন বসে না, লেখায় মন বসে না, সিনেমা দেখতেও ভালো লাগে না। চারপাশে মানুষ আছে, অথচ আমি ভীষণ একা। স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে এসে বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে।   নিজেরই লেখা কয়েকটি পঙক্তি আমাকে তাড়া করে ফেরে- কোথায় পালাবে? কোথায় লুকাবে? যাবে কোথায়? কতদূর? আমার স্মৃতিকণার মিছিল রইবে যাবে তুমি যতদূর!   মা প্রায়ই মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করতেন- কী হয়েছে বাবা? তোর কীসের এতো  কষ্ট? আমি মৃদু হেসে বলতাম- না মা। 'মোমের শেষ শিখা' শিরোনামে একটা ট্র্যাজিক গল্প লিখছি। তাই মনটা একটু ভার। মা আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। আমার মন খারাপের সময় মা শুধু চুলে বিলি কেটে বলতেন- একটু ঘুমিয়ে নে। আমি চোখ বন্ধ করে মৃত মানুষের মতো পড়ে থাকতাম, কিন্তু ঘুম আসত না।   অবশেষে বিয়ের দিন এল। নিজেকে নিজে টেনে চলছি। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাসরঘরে ঢুকতেই বুকের ভেতর অপরাধবোধ আরও তীব্র হয়ে উঠল। ঘোমটা দেয়া নববধূর সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে বললাম- তুমি আজ থেকে আমার জীবনসঙ্গিনী। তাই তোমার কাছে কিছু লুকাতে চাই না। আমি একসময় একজনকে ভালোবাসতাম। কথা শেষ হতেই নববধূ অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বলে উঠলেন- তাহলে আমাকে বিয়ে করলেন কেন? আমিও তো একজনকে... কিন্তু যখনই কনে ঘোমটা ফেলে দাঁড়িয়ে গেল তৎক্ষণাৎ আমরা চরম বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম! অতঃপর এক গাল হাসি দিয়ে- তুমি!  একসঙ্গে উচ্চারিত হলো শব্দটি। ‘তুমি’ বলেই আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্বয়ং আমার  জুঁইফুল!   চুড়ির রিনিঝিনি শব্দের সাথে বারান্দার সেই খিলখিল হাসি আজও আমার কানে বাজে। পার্থক্য শুধু একটাই সেদিন সে ছিল অচেনা এক রূপসী, আর আজ সে আমার ঘরের আঙিনায় ফুটে থাকা চিরচেনা জুঁইফুল।  

আগস্ট ৫, ২০২৬ 0
মৃত্যুর ছায়া

মরি মরি করেও যেন মরছেন না। সবাইকে জ্বালিয়ে মারবেন বলেই হয়তো বেঁচে রয়েছেন। মৃত্যু যে আসন্ন, তা তিনি বুঝে গেছেন। বীভৎস মৃত্যুর ছায়া যেন তাঁকে ঘিরে ধরেছে। কিন্তু তিনি প্রাণপণ টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জরাজীর্ণ একখানা কুঠুরি ভেতরে, শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহখানি কোনোমতে বয়ে চলেছেন। আর ভাবছেন, হয়তো এ যাত্রায় টিকেও যাবেন। কল্পনার জগৎ হাতড়ে খুঁজে ফিরছেন তাঁর অতীতকে। কত সুন্দর ছিল তাঁর শৈশবের দিনগুলো! সেই বকুলতলায় ফুল কুড়ানো মেয়েটির কথা আজও মনে গেঁথে রয়েছে। রোজ বিকেলে সে আসত। ফুল কুড়ানোর ছলে দেখা হতো দুজনার। মাঝে মাঝে চোখাচোখিও হতো। ভীষণ লজ্জা পেয়ে মৃদুস্বরে নিজেকে ভর্ৎসনা করতে করতে ফিরে যাওয়া—সেই কিশোরী মেয়েটির মুখচ্ছবি এখনো যেন জীবন্ত, অমলিন। অবারিত সবুজ মাঠের আল ধরে ছোটাছুটি করা কৈশোরের কথা ভীষণ মনে পড়ে যাচ্ছে আজ। বাবার শাসন আর মায়ের আদর যেন কল্পনার হাত ধরে আসছে মাখামাখি করে। দূরন্তপনার মহা-সমুদ্র সাঁতরে যাঁরা বড় হয়েছেন, কেবল তাঁরাই বুঝবেন দস্যিপনার অপার আনন্দ কেমন হতে পারে। হঠাৎই চাপা উঁহু শব্দে পাশ ফিরলেন। শরীরের ডান পাশটাকে মনে হচ্ছে অসাড়-অচল! যেন কোনোমতে শরীরের অন্য অংশগুলো সাথে জুড়ে রয়েছে; নিতান্তই অনিচ্ছাকৃতভাবে। মৃত্যুর নিকষ কালো ছায়াটাকে পাশ কাটিয়ে তিনি আবারও স্মৃতিমন্থর করতে লাগলেন। এই তো সেদিনের কথা, কত সুন্দর একটি সংসার ছিল তাঁর—ভাবতেই মনটা আলোড়িত হচ্ছে। অল্প বয়সেই বিয়ে; ঘর-সংসার নিয়ে কত কাজ করতে হয়েছিল তাকে। নতুন ঘর, সেই ঘরে নতুন ঘরণী এলো। তার কোল আলো করে এলো একে একে চার সন্তান। চোখের সামনে সন্তানদের বেড়ে ওঠা, পুতুলের মতো সুন্দর বউয়েরও বয়স বেড়ে যাওয়া। যেন কল্পনার রাজ্যের এক কল্পকথা! জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে সবকিছুকে অলীক আর কল্পনা মনে হচ্ছে। বয়সে বউয়ের চেয়ে দশ বছরের বড় হয়েও তিনি দিব্যি বেঁচে রয়েছেন। অথচ যাকে ঘিরে তাঁর সুন্দর একটি কল্পনার রাজ্য ছিল, যাকে ঘিরে সাজানো সোনার একটি সংসার ছিল, সেই সোনায় মোড়ানো মুখটি বহু আগেই তাকে ত্যাগ করে অজানায় পাড়ি জমিয়েছে। সেই মুখটি যেন আজও শীতল জলের ঝাঁপটার মতো ক্ষণে ক্ষণে উপস্থিত হয়। তাঁর হৃদয়কে শীতল করার জন্য। আবারও চাপা একটি আর্তনাদ ওঠে। তবে সেই শব্দ ঠোঁটের আশপাশটা ভেদ করে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। যেন বিকট শব্দকে হঠাৎ থামিয়ে দেয়া হয়েছে। পায়ের আঙুলগুলো কাঁপছে। শরীরটা যেন হঠাৎই শীতল হয়ে যাচ্ছে। শরীরের ডান পাশটা অসাড়-অচল হলেও ক্ষণিকের জন্য যেন দুলে উঠছে। চোখের পাতা যেন পিটপিট করছে অবিরত। হৃৎস্পন্দন বাড়ছে। কেমন যেন গোঙানির মতো শব্দ হচ্ছে। আচমকা একটি দীর্ঘশ্বাস—নাতিদীর্ঘ হয়ে বের হয়ে গেল। সেই দীর্ঘশ্বাসে জড়িয়ে ছিল যেন কত গল্প; কত কথা! কত হাসি-কান্নার ছবি! শান্ত শীতল দেহখানি বিছানার সাথে জড়াজড়ি করে মিশে আছে। মুখজুড়ে  মৃত্যুর ছায়া স্পষ্ট। দেখে মনে হচ্ছে, কিছু গল্প বলা এখনো বাকি। সেই গল্প আর বলা হয়ে উঠল না। শরীরের ডান পাশটার মতো বাম পাশটাও যেন স্থির, অচল, অসাড় হয়ে পড়ে রয়েছে খাটের এক প্রান্তে।  

জুলাই ২৮, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0