কৃষকদের দেশের ‘আসল ও শ্রেষ্ঠ মানুষ’ উল্লেখ করে কৃষি খাতে নতুন উদ্ভাবন এবং অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিতে ‘রাষ্ট্রপতি কৃষি পুরস্কার’ চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে বঙ্গভবনে বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কুল ময়েজের নেতৃত্বে আট সদস্যের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, “কৃষকরাই দেশ গড়ার যোদ্ধা। তাঁদের সম্মান জানানো, কৃষিকাজে আরও উৎসাহিত করতে নতুন উদ্ভাবন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কৃষি পুরস্কার চালুর উদ্যোগ নেয়া হবে।” তিনি দল-মত-পথের ঊর্ধ্বে উঠে কৃষকদের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্বার্থ রক্ষায় জাতীয় পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় কৃষক সংগঠন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। কৃষকদের সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে কৃষি ও বাণিজ্যমন্ত্রীসহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের পরামর্শও দেন তিনি। একই সঙ্গে কৃষকদের স্বার্থকে আন্দোলনে রূপ দেয়ার আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের সবচেয়ে ইতিবাচক খাত কৃষি। কৃষকের শ্রম, নতুন উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে ফসল উৎপাদন বহুগুণ বেড়েছে। কৃষকেরা দুর্নীতি না করে সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, কৃষিপণ্য যাতে সহজে ভোক্তার কাছে পৌঁছায় এবং কৃষক ন্যায্য দাম পান, সে জন্য কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের আরও সচেতন ও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কৃষকদের উন্নয়ন ও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার নতুন একটি স্কিম চালু করেছে জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, এরই মধ্যে তিন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সহজ শর্তে কম সুদে কৃষিঋণসহ কৃষকদের জন্য সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরে তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই কৃষকেরা এসব উদ্যোগের সুফল পাবেন। সাক্ষাৎকালে কৃষক সমিতির পক্ষ থেকে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, বিনা সুদে ঋণ, কৃষক দিবস পালন, জাতীয় পুরস্কার, শস্যবিমা চালু, জেলা-উপজেলার আইনশৃঙ্খলা কমিটিতে কৃষকদের প্রতিনিধিত্ব, বজ্রপাত ও সাপের কামড় থেকে সুরক্ষা এবং কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করার দাবিসহ বিভিন্ন বিষয় রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরা হয়। এ ছাড়া কৃষিপণ্য রপ্তানির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানিতে উদ্যোগী হতে কৃষক সমিতির সদস্যদের আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আধুনিক হিমাগার ও খামারে সোলার প্যানেল স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কৃষিঋণের সুদ, বিশেষ করে এনজিও থেকে নেয়া ঋণের সুদ কমানোর বিষয়েও উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন রাষ্ট্রপতি। সাক্ষাৎকালে কৃষক সমিতির সভাপতি ঈশ্বরদীতে কৃষিক্ষেত্রে অবদানের জন্য ৭০ বছরের বেশি বয়সী কৃষকদের সংবর্ধনা এবং আধুনিক কৃষিপণ্য প্রদর্শন ও বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে মেলার আয়োজনের কথা জানান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি মেলায় উপস্থিত থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের কৃতীসন্তান ও সফল মৎস্যচাষি আবু তালেব জোয়ার্দারের হাতে রাষ্ট্রপতি একটি উপহার সামগ্রী তুলে দেন।
দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা কৃষি খাত এক অস্বাভাবিক চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে সার সংকট অন্যদিকে সদ্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। দফায় দফায় একের পর এক উপকরণ ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়কে এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে ফসল ফলিয়েও লাভের মুখ দেখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। সবশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি আরও ২০ টাকা বাড়িয়েছে, যার ফলে নতুন দামে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে আগে এই দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়াকেই এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই বৃদ্ধি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—চলতি বছরেই এটি তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল, এরপর ১ জুন থেকে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। এভাবে দফায় দফায় জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ডিজেলের দাম প্রায় ১৭.৩৯ শতাংশ বেড়ে গেছে। ডিজেল এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে দেশের কৃষি উৎপাদন এবং এর পরিবহনব্যবস্থা সরাসরি জড়িয়ে আছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে সেচ, ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ, ফসল মাড়াই এবং পরিবহন—প্রতিটি ধাপেই ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশই ডিজেল। পরিবহনের পরে সবচেয়ে বেশি ডিজেলের ব্যবহার হয় কৃষি খাতে। ডিজেলের দাম সাড়ে ১৭.৩৯ শতাংশ বাড়ায় বড় প্রভাব পড়বে সার্বিক উৎপাদনে, ব্যয় বাড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আরও ভঙ্গুর হবে খাদ্যনিরাপত্তা। কৃষির অন্যতম চাহিদা সেচ। বিশেষ করে, ধান চাষে সেচ অত্যাবশ্যকীয়। বাংলাদেশের সেচ কাঠামো এখনো মূলত ডিজেলনির্ভর। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ সেচ কার্যক্রম এখনো ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল, আর কৃষিকাজে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয় যা মোট চাহিদার প্রায় ২৪ শতাংশ। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষের জন্য প্রায় ২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়—অর্থাৎ প্রতি লিটারে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি প্রতিটি বিঘায় গুণিতক হারে বাড়ে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ডিজেলের দাম বাড়ার পর বিঘাপ্রতি কৃষকের অতিরিক্ত খরচ কয়েক শ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, আর জাতীয় পর্যায়ে এই বাড়তি বোঝা কয়েক শ থেকে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৬ সালের এপ্রিলের মূল্যবৃদ্ধির পরই কৃষি অর্থনীতিবিদরা হুঁশিয়ার করেছিলেন, ডিজেলের বাড়তি খরচ মিলিয়ে কৃষকের সামগ্রিক ব্যয় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে যাবে বলে। শুধু সেচ নয়, জমি চাষ, ফসল কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে ডিজেলচালিত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরতার কারণে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাড়ছে। রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক ও কৃষিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সেখানে কৃষি উৎপাদন খরচ অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে, কারণ জমি চাষ থেকে শুরু করে ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহন প্রতিটি ধাপেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার জড়িত। মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও স্পষ্ট। শ্যালো মেশিন পরিচালনাকারী কৃষকরা জানান, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টাপ্রতি সেচের ভাড়াও বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হন, কারণ আগের দামে সেচ দিলে তাদের পোষাবে না। একই সঙ্গে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকের প্রকৃত মুনাফা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এক কৃষক জানিয়েছেন, সেচের পানি, সার, বীজ, কীটনাশক ও ধান কাটার খরচ মিলিয়ে এ মৌসুমে এমনিতেই তাঁর ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কৃষকের এই দুশ্চিন্তা, তাদের মুনাফার সংকোচন দেশের কৃষি খাতকে নতুন সংকটে ফেলবে। যেসব কৃষক বর্গাচাষি বা প্রান্তিক পর্যায়ের, তাদের জন্য এই বাড়তি খরচ সহ্য করা আরও কঠিন। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবধানও ক্রমশ বাড়ছে, যা কৃষি খাতে বৈষম্য তৈরি করবে। উৎপাদন খরচ যে হারে বাড়ছে, বাজারে অনেক সময় কৃষকরা সেই অনুপাতে ফসলের দাম পান না। ফলে কৃষকদের ক্রমাগত লোকসান ও চাষাবাদে অনীহা তৈরি করছে। ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ে অনেক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক চাষাবাদের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন অথবা কম সেচ লাগে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। অনেকে কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার তাগিদে শহরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন। উৎপাদন খরচ বাড়ার এই প্রভাব শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি খাদ্যপণ্যের বাজারেও ছড়িয়ে পড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পণ্য আনার খরচ বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই গিয়ে পড়ে। নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও কৃষি উৎপাদন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহন ও সেচের খরচ বাড়িয়ে পরবর্তী সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এ কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষকের লোকসান, এবং শেষে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি—দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এর প্রভাব থেকে কৃষিকে রক্ষা করার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই। অন্যথায় দফায় দফায় এ মূল্যবৃদ্ধি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত সংকট নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করি। প্রথমত, সেচে ভর্তুকির সম্প্রসারণ, কৃষি সেচে ব্যবহৃত ডিজেলের জন্য পৃথক ভর্তুকিমূল্য বা কার্ড-ভিত্তিক বরাদ্দ ব্যবস্থা চালু করা, যাতে বাজারদর বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি কৃষকের ওপর না পড়ে। দ্বিতীয়ত, সোলার ইরিগেশন পাম্প ও বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ স্থাপনে প্রণোদনা বাড়িয়ে ডিজেলনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা। তৃতীয়ত, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ক্রয়মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা, যাতে কৃষক ন্যায্য দাম পান। চতুর্থত, পরিবহন খরচের অজুহাতে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করা। এ ছাড়া প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও ফসল বিমার আওতা বাড়ানো, যাতে বাড়তি খরচের ধাক্কা তারা সামলাতে পারেন।
দেশের অন্যতম প্রধান সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলখ্যাত ঈশ্বরদীর মাঠে মাঠে চলছে শীতকালীন সবজি চাষের জোর প্রস্তুতি। বীজতলার পরিচর্যার পাশাপাশি জমি প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষকেরা। তাঁরা আশায় বুক বেঁধেছেন, যেভাবে প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে, তাতে কোনো বিপর্যয় দেখা না দিলে স্বপ্ন পূরণের হাতছানি রয়েছে। সরেজমিনে ঈশ্বরদীর সবজিপ্রধান এলাকা সলিমপুর, দাশুড়িয়া, সাহাপুর, লক্ষ্মীকুণ্ডা ও মুলাডুলি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, শীতকালীন সবজি চাষের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চাষিরা। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বীজতলায় উৎপাদন করছেন রোপণ উপযোগী চারা। অনিষ্টকারী রোগ পোকা-মাকড় ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হওয়ায় চাষিরা বেগুন, মুলা, ফুলকপি, ওলকপি, বাঁধাকপি ও টমেটোর কাঙিক্ষত চারা উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় সবজি চাষেও সরবরাহ জোগাচ্ছে। অন্যদিকে আগাম জাতের কিছু কিছু সবজি ইতোমধ্যেই মাঠ সবুজ করে তুলেছে। মুলা, লাল শাক, গাজর, বেগুনসহ আগাম জাতের ফুলকপি ও বাঁধাকপি ইতোমধ্যেই বাজারজাত করতে শুরু করেছেন চাষিরা। আগাম এ সবজি চাষের খরচ বেশি হওয়ায় বাজারে এখন বেশ চড়া দামে এসব সবজি বিক্রি হচ্ছে। তবে চাষিরা আশা প্রকাশ করছেন, ভরা উৎপাদন মৌসুমে সবজির দাম সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। সলিমপুর ইউনিয়নের ভাড়ইমারী উত্তর পাড়া গ্রামের কৃষক আলহাজ নজরুল ইসলাম বলেন, “এবার ৩০ বিঘা জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি। ইতোমধ্যেই বাড়ির আঙিনায় ওলকপি, বাঁধাকপি, ফুলকপি ও টমেটোর চারা উৎপাদন করা হয়েছে। আগামী ২-৪ দিনের মধ্যেই এসব চারা জমিতে রোপণ করা হবে।” বেশ কিছু জমিতে মুলা, লাল শাক ও বেগুন রোপণ করা হয়েছিল, যা এখন বিক্রির উপযোগী বলেও জানান তিনি। বক্তারপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বিশ্বাস জানান, শীতকালীন সবজি চাষ ঘিরে আগামী ছয় মাস চলবে তাঁদের ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ। তিনি আরও জানান, পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর বিরাট অংশ বন্যাপ্লাবিত হওয়ায় সেখানকার চাষিরা চলতি মৌসুমে শীতকালীন সবজি চাষে পিছিয়ে পড়েছেন, যার ফলে ঈশ্বরদীর চাষিরা এ মৌসুমে অধিক মূল্যে সবজি বিক্রির সুযোগ পাবেন। চরমিরকামারী গ্রামের কৃষক আলম সরদার জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চাষিদের প্রস্তুতিতে কোনো বেগ পেতে হচ্ছে না, যা উৎপাদনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কৃষিশ্রমিক শামসুল আলম, রহমত আলী ও সাইদুল প্রামানিক জানান, শীতকালীন সবজি চাষ ঘিরে তাঁদের ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণে। প্রতিদিন সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চলছে তাঁদের জমি প্রস্তুতির কাজ। বীজতলা পরিচর্যা এবং আগাম মৌসুমের সবজির জমিতে তাঁদের আগাছা নিধনের কাজ চলছে। মৌসুমজুড়েই তাঁদের এই ব্যস্ততা থাকবে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ ইমরান খান সাগর জানান, ঈশ্বরদীতে সবজি চাষে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও ঈশ্বরদীতে ব্যাপক হারে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চাষিরা কাঙিক্ষত সবজি উৎপাদনে সক্ষম হবেন বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “এ লক্ষ্যে আমরা নিয়মিতভাবে মাঠ পরিদর্শন করে কৃষকদের উন্নত চাষ পদ্ধতির ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়ে চলেছি।” ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন জানান, চলতি মৌসুমে ঈশ্বরদীতে প্রায় ৬ হাজার ১৮৫ হেক্টর জমিতে সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে মাঠে মাঠে জোর প্রস্তুতি চলছে। মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কর্মকর্তাগণ সার্বক্ষণিক কৃষকদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে চলেছেন। তিনি আরও বলেন, এবার প্রতি হেক্টর জমিতে ১০ মেট্রিক টনের অধিক সবজি উৎপাদিত হবে। এখন পর্যন্ত বীজতলা এবং সবজি খেতে পোকা মাকড় ও রোগবালাইয়ের উপদ্রব লক্ষ করা যায়নি। কৃষি অফিস এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করতে কৃষক দিন-রাত পরিশ্রম করেন। রোদ-বৃষ্টি, বন্যা, খরা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারে না। অথচ দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এই কৃষকশ্রেণিই আজ নানা সংকটের মুখোমুখি। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া কঠিন হচ্ছে, আবার ভোক্তারাও উচ্চমূল্যের চাপে পড়ছেন। ফলে কৃষক ও ভোক্তা উভয় পক্ষই যেন একধরনের অদৃশ্য সংকটের মধ্যে আটকে আছে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে ক্ষুদ্র খাদ্য উৎপাদকদের অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে। দেশে খাদ্য উৎপাদকের ৫৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ ক্ষুদ্র উৎপাদক হলেও তাঁদের গড় আয় বড় উৎপাদকদের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ যাঁরা সংখ্যায় বেশি এবং দেশের খাদ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, অর্থনৈতিকভাবে তাঁরাই তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্বল। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষক উৎপাদন করবেন কীভাবে? বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এক মৌসুমের ফসল মুহূর্তেই নষ্ট করে দিতে পারে। চলতি আগস্ট মাসেও দেশের কয়েকটি অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া পূর্বাভাসসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি। অন্যদিকে ফসল উৎপাদনের পর কৃষক যখন বাজারে যান, তখন শুরু হয় আরেক বাস্তবতা। কৃষককে অনেক সময় উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম পেতে সংগ্রাম করতে হয়। অথচ একই পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর সময় দাম অনেক বেড়ে যায়। এই ব্যবধানের বড় কারণ বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং পরিবহনব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। সাম্প্রতিক সময়ে বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফসল ও কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারেও। চাল, সবজি, ডিম, ময়দাসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার খবর এসেছে। ফলে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের সংসার পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। খাদ্য উৎপাদন কমলে বা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলে বাজারে যে চাপ তৈরি হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। এই অবস্থায় কৃষিকে শুধু উৎপাদনের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; কৃষিকে দেখতে হবে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, সহজ শর্তে কৃষিঋণ দেয়া, মানসম্মত বীজ ও সার নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগের সময় দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা বাড়ানো যেতে পারে। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণেও গুরুত্ব দেয়া জরুরি। দেশে পর্যাপ্ত আধুনিক গুদাম, হিমাগার ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষক বাধ্য হয়ে দ্রুত কম দামে পণ্য বিক্রি করবেন না। এতে একদিকে কৃষক লাভবান হবেন, অন্যদিকে মৌসুমি সংকটের সময় বাজারে সরবরাহও স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতাও আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। কৃষককে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সহায়তা না দিয়ে আগাম সতর্কতা, আবহাওয়ার তথ্য, বন্যা ও খরা মোকাবেলায় উপযোগী জাত এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা এবং দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা কৃষকের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষককে সহায়তার পাত্র নয়, অর্থনীতির অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পেলে উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন, উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখাও সহজ হবে। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু শুধু খাদ্যের পরিমাণ বাড়ালেই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; মানুষের পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হয়। তাই কৃষকের আয়, উৎপাদন ব্যয়, বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা—সবকিছুকে একই নীতির আওতায় আনতে হবে। কৃষক বাঁচলে শুধু একটি পরিবার বাঁচে না—বাঁচে দেশের খাদ্যব্যবস্থা। কৃষকের ঘরে স্বস্তি ফিরলে বাজারেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই কৃষককে কেন্দ্র করেই হতে হবে ভবিষ্যৎ খাদ্য ও কৃষিনীতি। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে আজকের কৃষকের সংকট আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব কৃষকের নির্ভুল, স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ একটি তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করতে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের তাগিদ দেন তিনি। ৪ আগস্ট দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে কৃষক কার্ড-সংক্রান্ত এক সভায় তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেসসচিব হাসান শিপলু জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ছবি ও কিউআর কোডসংবলিত স্মার্ট কৃষক কার্ড প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন। এই কার্ডে কৃষকের পরিচয়ের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন, সরকারি সহায়তা ও বাজারসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। ইতোমধ্যে কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খোলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কৃষি খাতে সরকারের ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং অন্যান্য প্রণোদনা প্রকৃত কৃষকের কাছে দ্রুত ও সহজে পৌঁছে দিতেই মূলত এ কার্ড চালু করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষক এ কার্ডের সুবিধা পাবেন এবং আগামী তিন বছরের মধ্যে প্রায় ২ কোটি কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সভায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।