Breaking news

অর্থনীতি

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং কৃষিতে এর সম্ভাব্য প্রভাব ও করণীয়

দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা কৃষি খাত এক অস্বাভাবিক চাপের মুখে পড়েছে। একদিকে সার সংকট অন্যদিকে সদ্য জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। দফায় দফায় একের পর এক উপকরণ ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়কে এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে ফসল ফলিয়েও লাভের মুখ দেখা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।   সবশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি আরও ২০ টাকা বাড়িয়েছে, যার ফলে নতুন দামে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে আগে এই দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়াকেই এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।   এই বৃদ্ধি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—চলতি বছরেই এটি তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা ও অকটেন ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল, এরপর ১ জুন থেকে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়।   এভাবে দফায় দফায় জ্বালানির দাম সমন্বয়ের ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ডিজেলের দাম প্রায় ১৭.৩৯ শতাংশ বেড়ে গেছে। ডিজেল এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে দেশের কৃষি উৎপাদন এবং এর পরিবহনব্যবস্থা সরাসরি জড়িয়ে আছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে সেচ, ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ, ফসল মাড়াই এবং পরিবহন—প্রতিটি ধাপেই ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ৭৩ শতাংশই ডিজেল। পরিবহনের পরে সবচেয়ে বেশি ডিজেলের ব্যবহার হয় কৃষি খাতে। ডিজেলের দাম সাড়ে ১৭.৩৯ শতাংশ বাড়ায় বড় প্রভাব পড়বে সার্বিক উৎপাদনে, ব্যয় বাড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আরও ভঙ্গুর হবে খাদ্যনিরাপত্তা।   কৃষির অন্যতম চাহিদা সেচ। বিশেষ করে, ধান চাষে সেচ অত্যাবশ্যকীয়। বাংলাদেশের সেচ কাঠামো এখনো মূলত ডিজেলনির্ভর। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ সেচ কার্যক্রম এখনো ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল, আর কৃষিকাজে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল ব্যবহৃত হয় যা মোট চাহিদার প্রায় ২৪ শতাংশ। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষের জন্য প্রায় ২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়—অর্থাৎ প্রতি লিটারে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি প্রতিটি বিঘায় গুণিতক হারে বাড়ে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ডিজেলের দাম বাড়ার পর বিঘাপ্রতি কৃষকের অতিরিক্ত খরচ কয়েক শ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে, আর জাতীয় পর্যায়ে এই বাড়তি বোঝা কয়েক শ থেকে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০২৬ সালের এপ্রিলের মূল্যবৃদ্ধির পরই কৃষি অর্থনীতিবিদরা হুঁশিয়ার করেছিলেন, ডিজেলের বাড়তি খরচ মিলিয়ে কৃষকের সামগ্রিক ব্যয় দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে যাবে বলে।   শুধু সেচ নয়, জমি চাষ, ফসল কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই ও পরিবহনের প্রতিটি ধাপে ডিজেলচালিত যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভরতার কারণে সামগ্রিক উৎপাদন খরচ বাড়ছে। রাজশাহী অঞ্চলের কৃষক ও কৃষিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সেখানে কৃষি উৎপাদন খরচ অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে, কারণ জমি চাষ থেকে শুরু করে ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহন প্রতিটি ধাপেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার জড়িত।   মাঠপর্যায়ের চিত্র আরও স্পষ্ট। শ্যালো মেশিন পরিচালনাকারী কৃষকরা জানান, তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টাপ্রতি সেচের ভাড়াও বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হন, কারণ আগের দামে সেচ দিলে তাদের পোষাবে না। একই সঙ্গে সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকের প্রকৃত মুনাফা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এক কৃষক জানিয়েছেন, সেচের পানি, সার, বীজ, কীটনাশক ও ধান কাটার খরচ মিলিয়ে এ মৌসুমে এমনিতেই তাঁর ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কৃষকের এই দুশ্চিন্তা, তাদের মুনাফার সংকোচন দেশের কৃষি খাতকে নতুন সংকটে ফেলবে। যেসব কৃষক বর্গাচাষি বা প্রান্তিক পর্যায়ের, তাদের জন্য এই বাড়তি খরচ সহ্য করা আরও কঠিন। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবধানও ক্রমশ বাড়ছে, যা কৃষি খাতে বৈষম্য তৈরি করবে।   উৎপাদন খরচ যে হারে বাড়ছে, বাজারে অনেক সময় কৃষকরা সেই অনুপাতে ফসলের দাম পান না। ফলে কৃষকদের ক্রমাগত লোকসান ও চাষাবাদে অনীহা তৈরি করছে। ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়ে অনেক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক চাষাবাদের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন অথবা কম সেচ লাগে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন। অনেকে কৃষি পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার তাগিদে শহরের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন।   উৎপাদন খরচ বাড়ার এই প্রভাব শুধু কৃষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি খাদ্যপণ্যের বাজারেও ছড়িয়ে পড়বে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত পণ্য আনার খরচ বেড়ে যাবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই গিয়ে পড়ে। নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ও কৃষি উৎপাদন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পণ্য পরিবহন ও সেচের খরচ বাড়িয়ে পরবর্তী সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এ কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষকের লোকসান, এবং শেষে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি—দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।   জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এর প্রভাব থেকে কৃষিকে রক্ষা করার দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদেরই। অন্যথায় দফায় দফায় এ মূল্যবৃদ্ধি কেবল কৃষকের ব্যক্তিগত সংকট নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যই বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করি।   প্রথমত, সেচে ভর্তুকির সম্প্রসারণ, কৃষি সেচে ব্যবহৃত ডিজেলের জন্য পৃথক ভর্তুকিমূল্য বা কার্ড-ভিত্তিক বরাদ্দ ব্যবস্থা চালু করা, যাতে বাজারদর বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি কৃষকের ওপর না পড়ে। দ্বিতীয়ত, সোলার ইরিগেশন পাম্প ও বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ স্থাপনে প্রণোদনা বাড়িয়ে ডিজেলনির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা। তৃতীয়ত, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ক্রয়মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা, যাতে কৃষক ন্যায্য দাম পান। চতুর্থত, পরিবহন খরচের অজুহাতে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তা কঠোরভাবে তদারকি করা। এ ছাড়া প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও ফসল বিমার আওতা বাড়ানো, যাতে বাড়তি খরচের ধাক্কা তারা সামলাতে পারেন।  

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬ 0
‎‎বন্ধ চিনিকলের পুনর্জাগরণে গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা‎‎

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হলেও কৃষিকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প, বাজার, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা এর গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো একসময় এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। আখচাষি, কৃষিশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক, মিলশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘদিনের লোকসান, পুরোনো যন্ত্রপাতি, কাঁচামালের সংকট এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় কয়েকটি চিনিকলের কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে। বিএসএফআইসির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলের কয়েকটির আখ মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এবং সেগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে শুধু মিল চালু নয়, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত আখের সরবরাহ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রয়োজন। সঠিক উদ্যোগে বন্ধ চিনিকলের পুনর্জাগরণ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।‎‎   চিনিশিল্পের প্রাণ হলো আখচাষি। একটি চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তায় পড়েন সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকেরা। কারণ আখ এমন একটি ফসল, যার জন্য নির্দিষ্ট বাজার ও শিল্পভিত্তিক ক্রেতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিল বন্ধ থাকলে কৃষক বিকল্প বাজার খুঁজতে বাধ্য হন অথবা অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আখচাষ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘ উৎপাদনকাল, ন্যায্যমূল্য নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিক্রির ক্ষেত্রে জটিলতা। বন্ধ মিলগুলো আধুনিক ব্যবস্থাপনায় চালু করা গেলে কৃষকের জন্য আবার একটি নিশ্চিত বাজার তৈরি হবে। এতে আখচাষে আগ্রহ বাড়বে এবং গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।‎‎   একটি চিনিকল শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মস্থল নয়; এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারও মানুষের জীবিকা জড়িয়ে থাকে। আখ কাটা, পরিবহন, লোডিং-আনলোডিং, যন্ত্রপাতি মেরামত, স্থানীয় বাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসা—সবখানেই চিনিকলের প্রভাব রয়েছে। বন্ধ মিল পুনরায় চালু হলে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ব্যাপক পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে, গ্রামীণ যুবকদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কাজের সুযোগ বাড়বে। এতে কর্মসংস্থানের সন্ধানে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে। সরকারও বন্ধ মিল পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেয়ার কথা জানিয়েছে।‎‎   গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় শক্তি হলো স্থানীয় পর্যায়ে অর্থের ঘূর্ণন। কৃষক আখ বিক্রি করে আয় করেন, সেই অর্থ দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটান, স্থানীয় দোকান থেকে পণ্য কেনেন এবং বিভিন্ন সেবায় ব্যয় করেন। অন্যদিকে মিলের শ্রমিক-কর্মচারীদের আয়ও স্থানীয় বাজারে প্রবাহিত হয়। চিনিকল বন্ধ হলে এই অর্থনৈতিক চক্র দুর্বল হয়ে পড়ে। দোকান, পরিবহন, হাটবাজার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতে, একটি মিল উৎপাদনে ফিরলে কৃষকের আয় থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি পর্যন্ত অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়। ফলে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুরো এলাকার অর্থনৈতিক গতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে।‎‎   চিনিকল পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যে কারণে মিলগুলো বন্ধ হয়েছিল, সেই সমস্যাগুলোর টেকসই সমাধান হয়েছে কি? বিএসএফআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলোর সম্মিলিত নিট লোকসান ছিল প্রায় ৫০৮ কোটি টাকা। পুরোনো যন্ত্রপাতি, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, কম উৎপাদনশীলতা এবং আখের তীব্র সংকট ছিল এ লোকসানের প্রধান কারণ। তাই সুনির্দিষ্ট সংস্কার ছাড়া শুধু পুরোনো অবয়বে মিল চালু করলে আবারও লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। সফল পুনর্জাগরণের জন্য আর্থিক শৃঙ্খলা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহি ও কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা জরুরি।‎‎   চিনিশিল্পকে লাভজনক ও টেকসই করতে হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত মিল দীর্ঘদিনের পুরোনো ও প্রযুক্তিগতভাবে অপ্রতুল যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে আখ থেকে চিনি আহরণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় মিলগুলোতে চিনি আহরণের হার অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল, যা আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক কম। আধুনিক যন্ত্রপাতি, রোগপ্রতিরোধী ও উচ্চ ফলনশীল আখের জাত এবং দক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই খাতকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাই বন্ধ মিল পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে কেবল জোড়াতালির সংস্কার নয়, বরং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যাচাই, মিলগুলোর সামগ্রিক আধুনিকায়ন (বিএমআরই) এবং দক্ষ জনবল তৈরির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।‎   চিনিশিল্পের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে আখের উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মানের ওপর। একই জমিতে কম সময়ে বেশি ফলন ও চিনি আহরণ সম্ভব হলে কৃষক ও মিল—উভয়েই লাভবান হবে। এ জন্য বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএসআরআই) উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও চিনিসমৃদ্ধ আখের জাত মাঠপর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের আধুনিক চাষপদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। আখচাষকে সনাতন কৃষির গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক খাতে পরিণত করতে হবে। পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য, ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত ই-পুঁজি ও সময়মতো অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে আখচাষে তাঁদের আগ্রহ ফিরবে। কারণ, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন জোগান ছাড়া কোনো চিনিকলই দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনকভাবে চালানো সম্ভব নয়।‎‎   চিনিকলের বড় সম্ভাবনা রয়েছে উপজাত পণ্যে। আখের ছোবড়া (ব্যাগাস) থেকে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিএসএফআইসি এই উদ্যোগ নিয়েছে; এতে মিলের বিদ্যুৎ ব্যয় কমার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। উত্তরবঙ্গ সুগার মিলসেও বন্ধ মৌসুমে বিদ্যুৎ ও সাদা চিনি উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে অ্যালকোহল উৎপাদনও অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ডিস্টিলারি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অ্যালকোহল খাতে রেকর্ড ২২৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। একই সময়ে চিনি উৎপাদনে ৬০ কোটি টাকার বেশি লোকসান হলেও ডিস্টিলারি ও অন্যান্য ইউনিটের আয় প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ১৬৫ কোটিতে উন্নীত করেছে। এ ছাড়া প্রেসমাড থেকে জৈব সার এবং মোলাসেস থেকে ভিনেগার উৎপাদনেরও সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাতেও দেশের বন্ধ ও অচল কারখানাগুলো সচল করে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।   সরকারি চিনিকলগুলোকে আধুনিকায়ন, বহুমুখী উৎপাদন এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের মাধ্যমে এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাই ভবিষ্যতের চিনিকলকে শুধু চিনি উৎপাদনের কারখানা নয়, উপজাতনির্ভর সমন্বিত কৃষিভিত্তিক শিল্পকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। এতে লোকসান কমার পাশাপাশি নতুন আয়, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতির গতি বাড়বে।‎‎   ‎বন্ধ মিলগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হলে বিপুল পরিমাণ পুঁজি ও বিনিয়োগের প্রয়োজন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকার একাই সব মিলের আধুনিকায়ন ও পরিচালনার ব্যয় বহন করবে—এমন ধারণা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনস্বার্থবান্ধব সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) কার্যকর কাঠামো তৈরি করা। সাম্প্রতিক সময়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষও নতুন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বন্ধ মিল পুনরায় চালুর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে জাতীয় সম্পদ ও কৃষকের মৌলিক স্বার্থ অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে। যেকোনো যৌথ অংশীদারত্ব হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অর্থনৈতিক সুরক্ষার ভিত্তিতে।‎‎   দেশের সব চিনিকলের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এক নয়। তাই সব মিলের জন্য ঢালাওভাবে একই ধরনের নীতি গ্রহণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কোন মিলে পর্যাপ্ত আখ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, কোথায় দ্রুত আধুনিকায়ন সম্ভব এবং কোন এলাকায় বহুমুখী কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা যাবে—এসব বিষয় পৃথকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো ধাপে ধাপে পুনরায় চালুর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা ইতিবাচক। তবে প্রতিটি মিলের জন্য পৃথক ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, কাঁচামালের নিশ্চয়তা এবং বাজারভিত্তিক উৎপাদন কৌশল গ্রহণ করা গেলেই এই পুনর্জাগরণ বাস্তবসম্মত ও টেকসই হতে পারে।‎‎   সর্বোপরি, বন্ধ চিনিকলের পুনর্জাগরণ শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করার বিষয় নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির হারানো গতি ফিরিয়ে আনার বড় সুযোগ। এর সুফল পাবেন আখচাষি, শ্রমিক, পরিবহন খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত আখের জাত, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। চিনির পাশাপাশি মূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে মিলগুলো আরও টেকসই ও লাভজনক হবে। তাই সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বন্ধ চিনিকলকে গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।  

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ 0
পোশাকশিল্পে বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে 'মানবিক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দেশ' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে

বাংলাদেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাকশিল্প। এটি শুধু একটি ব্যবসা খাত নয়, এটি হাজারো মানুষের টিকে থাকার ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। কিন্তু এই ঘূর্ণায়মান চাকার নিচে পিষ্ট হওয়া একেকটি মানবজীবনের আখ্যান অত্যন্ত ধূসর, বেদনাবিধুর ও মর্মস্পর্শী।   আপাতদৃষ্টিতে ঝলমলে রপ্তানি আয়ের আড়ালে সুপ্ত থাকে কোটি শ্রমিকের বিবর্ণ, ক্ষতবিক্ষত ও লাঞ্ছিত অস্তিত্ব। একবিংশ শতাব্দীর করপোরেট সংস্কৃতির মোড়কে ঢাকা এই তৈরি পোশাককারখানার চার দেয়াল যেন একেকটি আধুনিক দাসপ্রথার জীবন্ত নরককুণ্ড।   গার্মেন্টস-জীবন মানেই এক চরম অস্তিত্ব সংকটের নির্মম মহাকাব্য। ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় নিজের সাথেই নিজের এক অমানবিক প্রতিযোগিতা। ডিউটিতে এলে শুরু হয় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বা 'টার্গেট' পূরণের অসম প্রতিযোগিতা। সেখানে শ্রমিকদের রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে নয়, বরং যন্ত্রের একেকটি প্রাণহীন ক্ষুদ্রাংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুইয়ের প্রতিটি সূক্ষ্ম ফোঁড়ে বিঁধে থাকে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু নিংড়ানো ক্লান্তি। পুঁজিপতিদের খাতায় মানুষ সেখানে কোনো আবেগ-অনুভূতির ধারক নয়, বরং স্রেফ একজন অপারেটর।   বাইরে থেকে যাকে শুধুই একটি 'শিল্প' মনে হয়, ভেতর থেকে তা আসলে ভাগ্যাহত এবং জীবনযুদ্ধে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের এক বিশাল আশ্রয়স্থল। সুখে বা শখে পড়ে কেউ এই হাড়ভাঙা খাটুনির জীবনে আসে না। এখানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের প্রায় প্রত্যেকের পেছনেই রয়েছে একেকটি দীর্ঘশ্বাস, ঋণের বোঝা কিংবা সামাজিক লাঞ্ছনার করুণ ইতিহাস।   একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে এসে গার্মেন্টস সেক্টরের চেনা সমীকরণ অনেকটাই বদলে গেছে। কেবল প্রান্তিক বা ভাগ্যাহত মানুষই নয়, তীব্র বেকারত্ব আর আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার খরচের চাপে পড়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান ও মার্জিত সন্তানরাও আজ এই পেশাকে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। হতদরিদ্র বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের স্বামী-পরিত্যক্ত ও ডিভোর্সি নারীরা সমাজের লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে এখানে কাজ নেন।   আবেগের বশে পরিবারের অমতে বিয়ে করা যে যুগলদের পরিবার মেনে নেয় না, চারপাশের সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যৌথ জীবন সচল রাখতে তাঁরা এই লড়াইয়ে নামেন। এমনকি গ্রামীণ দাদন ব্যবসা বা এনজিওর ঋণের কিস্তির মারাত্মক ফাঁদ থেকে বাঁচতে অনেকে এখানে আসেন।   অতীতে কোনো সামাজিক অপরাধ, অন্যায় বা আইনি জটিলতায় পড়ে এলাকাছাড়া হওয়া মানুষেরা এই বিশাল শ্রমিকগোষ্ঠীর ভিড়ে নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে, সোজা পথে দুমুঠো ভাতের খোঁজে কঠোর পরিশ্রম বেছে নিতেন। এখন শুধু তাঁরা নন, নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ভাঙা কিংবা উপকূলীয় মানুষসহ উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত অঞ্চলের নিঃস্ব লোকজন এ পেশায় সবচেয়ে বেশি যুক্ত হন।   শত বাধা-বিপত্তি ও দুঃখ-কষ্টের মাঝেও এই মানুষগুলো কেবল টিকে থাকার লড়াই-ই করেন না, বরং নিজেদের ভাগ্য বদলাতেও কাজ করেন। নিজের দেশ ও পরিবারের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্বপ্নই তাঁদের প্রতিদিন এই কঠিন পরিশ্রমে টিকে থাকার শক্তি জোগায়। এ জীবন নিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয় বেঁচে থেকেও জীবন্ত মরা। যেখানে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের শিফট কেবল খাতা-কলমে, বাস্তবে তা গড়ায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টায়। কখনো কখনো নাইট ডিউটিও করতে হয়। বাইরে থেকে কারখানার ভেতরের পরিবেশ মনে হয় বেশ ভালো, কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় সাক্ষাৎ নরক দর্শন করছি। মানুষ কেবল কর্মে ক্লান্ত হয় না, খারাপ কথার বিষেও সবচেয়ে বেশি ক্লান্ত হয়।   কারখানাগুলোতে কাজের সামান্য ভুল কিংবা লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সামান্য বিলম্ব হলেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা বসের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত ধেয়ে আসে অকথ্য ভাষায় গলাবাজি, অশালীন ও কটু কথা। বলাই চলে, এটি যেন তৈরি পোশাকের পাশাপাশি নিত্যনতুন অশালীন ও কটু কথার এক উৎপাদনমুখী শিল্পও বটে! শ্রমিকের আত্মসম্মানবোধকে সেখানে প্রতিনিয়ত পায়ের তলায় পিষে ফেলা হয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পক্ষে এই অবমাননাকর আচরণ মুখবুজে সহ্য করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না, কারণ চাকরি হারানোর ভয় তরবারির মতো মাথার ওপর ঝুলতে থাকে। এই প্রতিনিয়ত আত্মমর্যাদা বিসর্জনের গ্লানি শ্রমিকদের ভেতরটাকে নিঃশেষ করে দেয়। অজানা সব অকথ্য ভাষার গালিগালাজ সুস্থ ধারার মানুষকেও অসুস্থ করে তোলে, দিনে দিনে একজন সুস্থ মানুষও হয়ে ওঠে যান্ত্রিক ও অমানবিক।   এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে জীবনের মানে খুঁজতে যাওয়া এক পরম বিলাসিতা। গার্মেন্টস জীবন হলো এমন এক ঘূর্ণিপাক, যেখানে একবার প্রবেশ করলে বের হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে যায়। এটি কেবল ঘাম ঝরানোর গল্প নয়, এটি হলো রক্ত জল করা এবং আত্মাকে বন্দী রাখার এক নির্মম বাস্তবতা। এই শিল্পের প্রায় সিংহভাগ শ্রমিকই নারী, যাঁরা গ্রামীণ প্রান্তিক অর্থনীতি থেকে এসে শহরের এই শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছেন। আপাতদৃষ্টিতে একে 'নারীর ক্ষমতায়ন' বলে চালিয়ে দেয়া হলেও বাস্তবে এটি হয়ে উঠেছে নারীর 'শ্রমের সস্তাকরণ'। পারিবারিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব এবং রাষ্ট্রে মজুরি কাঠামোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নারী শ্রমিকদের ওপর কাজের যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হয়, তা আধুনিক সভ্যতার গায়ে এক মস্ত বড় কলঙ্ক।   মাস শেষে যে নামমাত্র পারিশ্রমিক তাঁদের হাতে ওঠে, তা দিয়ে বর্তমানের আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতির বাজারে বেঁচে থাকার মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতেই দম আটকে মারা যাওয়া অবস্থা। শ্রমের এই সস্তা মূল্যায়নের পেছনে কেবল স্থানীয় মালিকপক্ষের নিষ্ঠুর মন-মানসিকতাই দায়ী নয়, বরং এর পেছনে কাজ করে বিশ্ব পুঁজিবাদের এক জটিল সমীকরণ। ক্রেতা বা বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশকে বেছেই নিয়েছে 'সস্তা শ্রমের স্বর্গরাজ্য' হিসেবে। বিশ্ববাজারের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার দোহাই দিয়ে দেশীয় মালিকপক্ষ বৈশ্বিক বায়ারদের সামনে নিজেদের শ্রমের সস্তাত্বকে একধরনের ‘তুলনামূলক সুবিধা’ হিসেবে বিপণন করে। ফলে বিশ্ববাজারের করপোরেট লোভের খেসারত দিতে হয় মাঠপর্যায়ের শ্রমিককে। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা ও আত্মিক রক্তক্ষরণই এই জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।   রাষ্ট্র ও সমাজের বিত্তশালী শ্রেণি যখন এ শিল্পের সাফল্যে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলে, তখন এই বিশাল শ্রমিকগোষ্ঠী বকাবাজি, কাজের চাপ আর হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে কাঁদে। একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য শ্রমিকের শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। এই বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীকে অন্ধকারে রেখে দেশের প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কখনোই সম্ভব নয়। শ্রমিকের এই ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে যে বহুতল সংস্কৃতির প্রাসাদ গড়ে উঠেছে, তার ভিত্তি আসলে অত্যন্ত নড়বড়ে। আমরা যদি আজীবন তাঁদের কেবল সস্তা শ্রমের হাতিয়ার হিসেবেই দেখে যাই, তাহলে কোনো এক দিন এ শিল্প এক চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।   চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ যুগে যখন অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার সাথে সাথে সস্তা শ্রমের চাহিদা দিন দিন কমছে। রোবটিক্স যখন ১০ জনের কাজ নিখুঁতভাবে একাই করে দিচ্ছে, তখন আমাদের শ্রমিকদের যদি প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ করে তোলা না হয়, তবে শ্রমিকেরা বিশ্ববাজারে চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে না তুলে তাদের এই অসম প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া সত্যিই এক ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।   শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের লাভা যেমন পুরো অর্থনীতিকে গ্রাস করতে পারে, ঠিক তেমনি অদক্ষতার কারণে বিশ্ববাজার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিও আছে। তাই সময় এসেছে করপোরেট লোভের দেয়াল ভেঙে এই মানুষগুলোর অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার। বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে কেবল 'সস্তা শ্রমের দেশ' হিসেবে নয়, বরং 'মানবিক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দেশ' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে হবে। এর জন্য রাষ্ট্র, মালিকপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাগোষ্ঠী এই ত্রিপক্ষীয় দায়বদ্ধতা জরুরি।   শ্রমিকদের ঘামের প্রতিটি ফোঁটা যেন শোষণের দলিল না হয়ে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা পায়, রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষকে আজ সেই দায় নিতেই হবে। ইতিহাসের পাতায় বাংলাদেশ যেন কেবল পোশাক রপ্তানির শীর্ষে না থাকে, বরং শ্রমিকের অধিকার ও মানবিকতা রক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, তবেই সার্থক হবে এই কোটি শ্রমিকের প্রাণের নীরব আত্মত্যাগ।  

আগস্ট ৫, ২০২৬ 0
রেমিট্যান্স যোদ্ধার প্রতীকী ছবি
ঘামে লেখা স্বদেশ : প্রবাসীদের প্রাপ্য মর্যাদা দিতে হবে এখনই

বাংলাদেশের অর্থনীতির অদৃশ্য স্তম্ভগুলোর কথা বলতে গেলে সবার আগে যে মানুষগুলোর নাম উচ্চারিত হওয়ার কথা, তাঁরা হলেন প্রবাসী শ্রমিক। রাষ্ট্রের উন্নয়নের পরিসংখ্যান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা গ্রামীণ অর্থনীতির সচলতার পেছনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ সবচেয়ে বড় এই অবদানকারীরা প্রায়শই থেকে যান আলোচনার বাইরে। তাঁদের ঘামে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, কিন্তু তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রশ্নে বারবার পিছিয়ে পড়ি। একজন প্রবাসীর জীবন কেবল বিদেশে গিয়ে অর্থ উপার্জনের গল্প নয়; এটি বিচ্ছেদের গল্প, আত্মত্যাগের গল্প, প্রতিদিন নিজের ইচ্ছাকে বিসর্জন দেয়ার গল্প। সন্তানের প্রথম হাঁটা, বাবার শেষ বিদায়, মায়ের অসুস্থতা, স্ত্রীর চোখের জল কিংবা ঈদের আনন্দ—সবকিছু থেকে দূরে থেকে তিনি কাজ করেন শুধু এই বিশ্বাসে যে, তাঁর কষ্টে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাবে, দেশেরও উপকার হবে। মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমি, মালয়েশিয়ার কারখানা, সিঙ্গাপুরের নির্মাণক্ষেত্র কিংবা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা লাখো বাংলাদেশি প্রতিদিন যে শ্রম দিচ্ছেন, তার প্রতিটি ফোঁটা ঘাম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করছে। তাঁরা মাস শেষে নিজের জন্য সামান্য অংশ রেখে উপার্জনের সিংহভাগ দেশে পাঠিয়ে দেন। সেই অর্থে চলে সংসার, গড়ে ওঠে ঘরবাড়ি, পড়াশোনা করে সন্তান, চিকিৎসা পান বৃদ্ধ মা-বাবা, সচল থাকে গ্রামের বাজার, শক্তিশালী হয় জাতীয় অর্থনীতি।   রেমিট্যান্সকে আমরা প্রায়ই একটি অর্থনৈতিক সূচক হিসেবে দেখি। অথচ এর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন মানুষের নির্ঘুম রাত, সীমাহীন পরিশ্রম, অপূর্ণ স্বপ্ন আর স্বদেশে ফেরার অপেক্ষা। তাই রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নয়; এটি লাখো প্রবাসীর ত্যাগ, ভালোবাসা আর দেশপ্রেমের জীবন্ত দলিল। রাষ্ট্র যখন প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে সম্মান জানায়, তখন সেই সম্মানের বাস্তব প্রতিফলনও মানুষের প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই ভিন্ন ছবি দেখায়। দীর্ঘদিন পর দেশে ফেরা একজন প্রবাসীর প্রথম অভিজ্ঞতা যদি হয় হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত জিজ্ঞাসাবাদ, দালাল চক্রের উৎপাত কিংবা অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি, তাহলে তাঁর বুকের ভেতর জমে থাকা স্বদেশপ্রেমে অজান্তেই আঘাত লাগে। যে মানুষটি বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকার মর্যাদা বহন করেছেন, নিজের কষ্টার্জিত অর্থে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন, মাতৃভূমির মাটিতে পা রেখেই তিনি যেন অনুভব না করেন—তিনি অবাঞ্ছিত। সমস্যা শুধু বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে অবস্থানরত বহু বাংলাদেশির কাছে পাসপোর্ট নবায়ন, জন্মনিবন্ধন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কিংবা অন্যান্য কনস্যুলার সেবা পাওয়া এখনো এক দীর্ঘ ভোগান্তির নাম। কোথাও ধীরগতি, কোথাও তথ্যের অস্পষ্টতা, কোথাও আবার অসাধু দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য—এসব মিলিয়ে একজন প্রবাসীকে অতিরিক্ত অর্থ, সময় ও মানসিক চাপের বোঝা বহন করতে হয়। প্রযুক্তির এই যুগে নাগরিক সেবা যদি এখনো হয়রানির সমার্থক হয়ে থাকে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।   বিদেশগামী শ্রমিকদের আরেকটি বড় দুর্ভাগ্য হলো প্রতারণার শিকার হওয়া। অনেকেই সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশে যান, কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন—চাকরি নেই, বেতন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নয়, কিংবা ভিসা-ই জাল। কেউ কেউ মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন, আবার অনেকে অবৈধ অবস্থানে পড়ে কারাভোগ কিংবা দেশে ফিরে আসার নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। এই প্রতারণা শুধু একজন মানুষের জীবনই ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয় এবং দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই বৈধ জনশক্তি রপ্তানির পুরো প্রক্রিয়াকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা আজ সময়ের দাবি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিমান টিকেটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। ঈদ, ছুটি বা বিশেষ মৌসুম এলেই যেন একটি অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে টিকেটের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। বছরের পর বছর পরিবারের মুখ না দেখা একজন প্রবাসীর আবেগকে এভাবে ব্যবসার পণ্যে পরিণত করা শুধু অমানবিকই নয়, চরম অনৈতিকও। প্রবাসীদের জন্য এখন আর করতালি বা আনুষ্ঠানিক সম্মাননার চেয়ে বেশি প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। বিমানবন্দরে হয়রানিমুক্ত ও দ্রুত সেবা, বিশেষ ইমিগ্রেশন লেন, দূতাবাসে সময়োপযোগী ও স্বচ্ছ কনস্যুলার ব্যবস্থা, পাসপোর্ট নবায়নে অযথা বিলম্বের অবসান, বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির কঠোর তদারকি, ভিসা প্রতারণা রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং বিমান টিকেটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে দৃঢ় পদক্ষেপ—এসব আর বিলাসিতা নয়; এগুলো একজন প্রবাসী নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। একই সঙ্গে প্রবাসীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদেশে আইনি সহায়তা জোরদার, দুর্ঘটনা বা কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং দেশে ফিরে তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণও জরুরি। কারণ, একজন প্রবাসী শুধু বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান না; তিনি বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পরিশ্রম, সততা ও সক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে দেশের মর্যাদাকেই সমুন্নত রাখা। আমরা উন্নয়নের গল্প বলি, মেগা প্রকল্পের কথা বলি, অর্থনৈতিক অগ্রগতির পরিসংখ্যান তুলে ধরি। কিন্তু সেই অগ্রগতির ভিত্তিপ্রস্তর যাঁরা নীরবে স্থাপন করেন, তাঁদের কথা যেন আড়ালেই থেকে যায়। যে হাত বিদেশের প্রখর রোদে পুড়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, সেই হাতকে সম্মানের সঙ্গে ধরে রাখার দায় রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের সবার। প্রবাসীরা কোনো করুণার পাত্র নন; তাঁরা বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কারিগর। তাঁদের পাঠানো প্রতিটি রেমিট্যান্সের সঙ্গে দেশে ফিরে আসে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ, একজন মায়ের চিকিৎসা, একটি গ্রামের নতুন সম্ভাবনা এবং একটি জাতির এগিয়ে চলার শক্তি। তাই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। প্রবাসীদের শুধু 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা' বলে প্রশংসা করলেই দায় শেষ হয় না; সেই সম্মানকে বাস্তব সেবায়, ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় এবং মর্যাদাপূর্ণ আচরণে রূপ দিতে হবে। কারণ, যে জাতি তার নীরব নির্মাতাদের সম্মান করতে শেখে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই জাতিকেই সম্মানের আসনে বসায়। প্রবাসীদের ঘামে লেখা বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা যেন আর অবহেলার ইতিহাস না হয়। তাঁদের চোখের জল নয়, মুখের হাসিই হোক আগামী বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক।  

আগস্ট ৫, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় নতুন আইনের খসড়া

পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা আনা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার ‘বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ইতোমধ্যে খসড়াটি প্রকাশ করেছে। বর্তমানে এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাচাই-বাছাই ও নীতিগত পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তথ্যসূত্র : বাসস   প্রস্তাবিত এই আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ডকে (সিএমএসএফ) একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই আইন কার্যকর হলে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা নগদ লভ্যাংশ, বোনাস ও রাইটস শেয়ার, রিফান্ড অর্থ ও আইপিওর অনাদায়ী অর্থ ফান্ডের অধীনে পরিচালিত হবে। তবে প্রকৃত মালিক বা তাঁদের উত্তরাধিকারীরা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই শেষে এসব সম্পদ পুনরায় ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।   নতুন আইনটির ফলে সিএমএসএফ একটি আধুনিক নগদ লভ্যাংশ বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নগদ লভ্যাংশ বিতরণ প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীভূত হবে। বিনিয়োগকারীরা একই প্ল্যাটফর্ম থেকে তাঁদের প্রাপ্ত লভ্যাংশ এবং উৎসে কর কর্তনের সম্পূর্ণ চালান ও সনদ সংগ্রহ করতে পারবেন, যা কর সংক্রান্ত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতাকে অনেক সহজ করে তুলবে।   ফান্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে দৈনন্দিন কাজ পরিচালিত হবে। পাশাপাশি তদারকির জন্য বিভিন্ন আর্থিক ও পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ একটি শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফান্ডের সুষ্ঠু পরিচালনায় নিয়মিত নিরীক্ষা ও বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের আইনি বাধ্যবাধকতাও থাকছে। এ ছাড়া তথ্য গোপন, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান বা ফান্ডের সম্পদ অপব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। নতুন আইনটি কার্যকর হলে বিদ্যমান ২০২১ সালের বিধিমালা বাতিল হয়ে যাবে।   খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই আইন দেশের পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ বিষয়ে সিএমএসএফের অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. ওয়াসি আজম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে অব্যবহৃত বিনিয়োগকারীর সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে এবং পুরো ব্যবস্থাটি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ হওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।  

আগস্ট ২, ২০২৬ 0
বাংলা কিউআর লেনদেন সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করবে : গভর্নর

বাংলা কিউআর (Bangla QR) ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেন, এর ফলে নগদ অর্থ বহনের প্রয়োজন যেমন কমবে, তেমনি জাল ও ছেঁড়া নোটের ভোগান্তি থেকেও মুক্তি মিলবে। সোমবার (২০ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ‘বাংলা কিউআর রিলস মেকিং’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গভর্নর জানান, গত ১ জুলাই থেকে দেশের লেনদেনে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা একটি অভিন্ন কিউআর কোড ব্যবহার করে যেকোনো স্থান থেকে সহজে অর্থ পরিশোধ করতে পারছেন। এটি একদিকে যেমন লেনদেনের গতি বাড়াবে, অন্যদিকে আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে। অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশেও দ্রুত বাড়ছে। সব ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহকদের জন্য বাংলা কিউআরের ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দেশের লেনদেন ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও নগদ অর্থনির্ভরতামুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। উল্লেখ্য, বাংলা কিউআর সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ব্যবহার জনপ্রিয় করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই রিলস মেকিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত ১০ জন বিজয়ীকে পুরস্কার প্রদান করা হয়।

জুলাই ২২, ২০২৬ 0
২০২৬-২৭ বাজেট: আইন ও বিচার বিভাগে বরাদ্দ বাড়ল ২৮ কোটি টাকা

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই বিভাগে ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব পেশ করেছেন। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এই বরাদ্দ প্রায় ২৮ কোটি টাকা বেশি। প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন খাতে ১ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ১৮৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আগে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বিভাগে ২ হাজার ১৫৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম এই বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রণীত এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বাজেট প্রস্তাব

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আজ জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট পেশ করেন। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালন খাতে ১ হাজার ৯৯৮ কোটি ৮৬ লাখ এবং উন্নয়ন খাতে ১৮৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যার মূল প্রতিপাদ্য হলো 'ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ'। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে আইন বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ১৫৯ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যা এবার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম এই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়াতে নতুন কার্ড প্রবর্তনের ঘোষণাও এসেছে।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
প্রযুক্তির দাপটে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি: ইলন মাস্কের সম্পদের রহস্য ও ‘টেকনো-সামন্তবাদ’

টেসলা প্রধান ইলন মাস্কের রেকর্ড পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি বৈশ্বিক পুঁজিবাদ ও ডিজিটাল অর্থনীতির চরিত্র বদলে যাওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রথাগত পণ্য উৎপাদন বা সম্পদের চেয়ে এখন ডেটা, অ্যালগরিদম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মই অর্থনৈতিক ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানের এই নতুন ডিজিটাল ইকোসিস্টেম ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণকে অনেক অর্থনীতিবিদ ‘টেকনো-ফিউডালিজম’ বা প্রযুক্তিগত সামন্তবাদ হিসেবে অভিহিত করছেন। অতীতে সম্পদের উৎস ছিল তেল, ইস্পাত বা ব্যাংক, কিন্তু বর্তমানের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন এমন এক অবকাঠামো গড়ে তুলছে যা জনমত থেকে শুরু করে পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। জেফ বেজোস বা মার্ক জাকারবার্গের মতো ‘ক্লাউডালিস্ট’রা এখন প্রথাগত পুঁজিবাদের সীমানা ছাড়িয়ে এমন এক ডিজিটাল পরিসর তৈরি করেছেন, যেখানে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যই মুনাফার মূল কাঁচামাল। ব্যবহারকারীরা যখন এসব প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন, তখন তারা প্রতিযোগিতামূলক বাজারের পরিবর্তে অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এক ডিজিটাল বাস্তুসংস্থানে প্রবেশ করেন, যা মালিকপক্ষের মুনাফা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলন মাস্কের মতো ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির রহস্য লুকানো রয়েছে তাদের সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে, যেখানে স্টারলিঙ্ক, স্পেসএক্স, এক্স (টুইটার) ও টেসলার ডেটা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। এই মডেল কোনো একক পণ্য বিক্রির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। যদিও অনেকে একে সামন্তবাদের আক্ষরিক পুনরাবৃত্তি না বলে পুঁজিবাদেরই আরও আগ্রাসী ও কেন্দ্রীভূত রূপ মনে করেন, তবুও এই ধারায় ধনকুবেরদের সম্পদের পাহাড় গড়া এবং বৈশ্বিক সামাজিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
জুন মাসে ৩৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকার রেমিট্যান্স পাঠালেন প্রবাসীরা

সদ্য বিদায়ী জুন মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ২৮০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রবাসী আয়ের এই সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত অর্থবছরের (জুলাই-জুন) পুরো সময়ে দেশে মোট ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। তবে আগের মাসগুলোর ধারাবাহিকতার তুলনায় জুনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা কমেছে। গত বছরের জুনেও দেশে ২৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা আনতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে টিসিবি

সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডকে অন্যান্য সরকারি সেবার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি পণ্য বিতরণের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত টিসিবির কার্যক্রম মূল্যায়ন সভায় এআইভিত্তিক বাজার বিশ্লেষণের একটি রূপরেখা নিয়ে এসব আলোচনা হয়। সভায় বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, দরপত্রে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়লে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য কমবে এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এজন্য দেশি-বিদেশি বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ভুল ব্যয় প্রাক্কলনের ওপর তিনি জোর দেন। এআই প্রযুক্তি বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করা হবে। অন্যদিকে, ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে টিসিবির পণ্য তালিকায় আরও নতুন সামগ্রী যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফয়সল আজাদ।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
ঋণনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশকে একটি ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে পুরোপুরি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি জানান, আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়াই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ, ব্লু-ইকোনমি ও ইকো-ট্যুরিজম খাতে ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জনশক্তি রপ্তানি আরও সহজ ও কার্যকর করতে যুবসমাজের জন্য চাহিদাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা, বিভিন্ন ভাষা শেখানো এবং যুগোপযোগী কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও দুর্বল অর্থনীতির মধ্যেও দেশ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সব বাধা দূর করে তরুণ ও উদ্যোক্তাদের কাজে লাগানোর মাধ্যমেই একটি প্রত্যাশিত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
চট্টগ্রাম বন্দরের ‘বে টার্মিনাল’ দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে: প্রধানমন্ত্রী

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত ‘বে টার্মিনাল’ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে তা অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, এই টার্মিনাল চালু হলে বন্দরে সরাসরি বড় মাদার ভেসেল ভিড়তে পারবে, যার ফলে আমদানি-রপ্তানির পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। একই সঙ্গে বন্দরকেন্দ্রিক কোনো ধরনের দুর্নীতি সহ্য করা হবে না এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর বিচার করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। সংসদ অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বন্দরটিকে দেশের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে জানান, রাষ্ট্রীয় সম্পদের কোনো ধরনের অপচয় রোধে সরকার বদ্ধপরিকর। নাব্যতা সংকটের কারণে বর্তমানে বড় জাহাজগুলো সরাসরি বন্দরে আসতে পারে না। বে টার্মিনাল নির্মিত হলে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে : সরকারি প্রতিবেদন

অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বহুমুখী সংকটে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটালে চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সরকারি এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধা হারানো, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের মতো বিষয়গুলো এই চলমান সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পেছানোর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছে। আসন্ন জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) বৈঠক সামনে রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণ তিন বছর স্থগিত করার সুপারিশ করেছে, যা এখন সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া মেধাস্বত্ব সুবিধা বাতিল হলে দেশে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি তৈরি পোশাকে শ্রম অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তদন্তের কারণে দেশটির বাজারেও শুল্ক জটিলতা তৈরি হতে পারে। দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতিও বেশ চাপে রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে থাকায় দারিদ্র্যের হার বাড়ছে এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তেলের আমদানি ব্যয় ৭২ শতাংশ ও সারের ব্যয় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভে টান পড়েছে। বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ এবং রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এই অস্থিতিশীল অর্থনীতিকে স্বাভাবিক পথে ফিরিয়ে আনতে এবং একটি মসৃণ এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে অন্তত আরও কয়েক বছর প্রস্তুতির সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে।

জুলাই ২২, ২০২৬ 0
সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সরকারের বড় উদ্যোগ: লক্ষ্য ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বিকাশে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি প্রায় ৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সদ্য পাস হওয়া ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সৃজনশীল শিল্পকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ স্থাপন করা হবে। এসব হাবে সাংস্কৃতিক মঞ্চ, সিনেপ্লেক্স এবং স্থানীয় পণ্যের বিপণন ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া ‘একটি গ্রাম-একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, তাঁত, নকশিকাঁথাসহ দেশীয় পণ্যের প্রসার ঘটানো হবে। বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা জানান, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে গ্রামীণ তরুণদের দক্ষতা কাজে লাগালে বিপুল উদ্যোক্তা তৈরি হবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন মনে করেন, দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক হাব গড়ে উঠলে শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য আয়ের নতুন পথ উন্মুক্ত হবে। এ খাতের প্রান্তিক উদ্যোক্তারাও সহজ শর্তে ও বিনা জামানতে ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0