Breaking news

প্রকৃতি

অপরূপা ও বৃষ্টিভেজা বিকেল

অপরূপার বৃষ্টি ভীষণ পছন্দ! সবুজ গাছপালা, পাখির কিচিরমিচির আর নিস্তব্ধ প্রকৃতি—এসব যেন তার অস্থির মনকে প্রশান্ত করে তোলে। এক বিকেলে সে একা হাঁটছে। চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ, ঝিরঝিরে বাতাসে পাতার মৃদু নড়াচড়া আর পাখির সুরেলা ডাক যেন এক স্বপ্নের জগৎ তৈরি করেছে।   আজ আকাশের মন ভালো নেই। চারপাশে কালো মেঘ ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হচ্ছে, সামলে রাখতে না পারলে আকাশ কেঁদে ফেলবে। কিন্তু অপরূপার মন খুব খুশি, কারণ এমন আবহাওয়া তার খুব প্রিয়।   হঠাৎ করে ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নামল বৃষ্টি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার সমস্ত মন যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে থেমে দাঁড়িয়ে গেল। কোথায় যেন হারিয়ে গেল তার চিন্তা। কিছু ভাবার চেষ্টা করেও পারল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে একা। নীরব। আর সেই নীরবতার মাঝেই তার শরীরের প্রতিটি কোণ বৃষ্টিতে ভিজে গেল।   একসময় বৃষ্টি থেমে গেল। চারদিকে নেমে এল প্রশান্ত এক নীরবতা। ভেজা চুল, চোখের লেপ্টে যাওয়া কাজল, বৃষ্টিভেজা গন্ধ আর ঠান্ডা বাতাস—সব মিলিয়ে পরিবেশটা এক গভীর আবেশ তৈরি করল। ঠান্ডা বাতাসে গা শিউরে উঠল অপরূপার। তবুও সে নড়ল না। এই মুহূর্তটা যেন কেবল তার একার। কোনো ব্যস্ততা নেই, কোনো কোলাহল নেই—শুধু সে আর প্রকৃতি।   বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়ে যে শব্দ তুলেছিল, তা যেন গিয়ে ঠেকেছে তার হৃদয়ের গভীরতম কোণে। সেই অনুভূতি বলে বোঝানো যায় না, কেবল অনুভব করা যায়।   হঠাৎ দূরে এক পাখির ডাক তাকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে। ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে সে। প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে যেন ফেলে আসছে তার অস্থিরতা, ক্লান্তি আর না-বলা কথাগুলো।   আজ বৃষ্টির সঙ্গে কেবল শরীরই নয়, মনটাও ভিজেছে। ভিজে গিয়ে ধুয়ে গেছে সব মলিনতা। আজ অপরূপা যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছে নতুনভাবে। তার ঠোঁটে এক অম্লান হাসি। চোখে তৃপ্তির ছায়া। বাতাসে ভেসে বেড়ায় অপরূপার শান্ত, স্থির মন।   তাকে দেখে মনে হয়, সে আজ সত্যিই মুক্ত।  

অক্টোবর ৩, ২০২৬ 0
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার সমীকরণ

‎সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা পথ, মেঘের রাজ্য সাজেক উপত্যকা, কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলরাশি আর নীলাচল-নীলগিরির নৈসর্গিক রূপকথা। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে প্রকৃতির আপন মহিমায় দাঁড়িয়ে থাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এই তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত সুউচ্চ পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল ও বন্য ঝরনা শুধু পর্যটকদের মনই ভোলায় না, বরং ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এটি দেশের সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চল। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই রূপসী সৌন্দর্যের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ।   একদিকে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির তোরণ, অন্যদিকে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ইস্যু। এ দুইয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ জাতীয় নিরাপত্তার এক মহা-কৌশলগত সংযোগস্থল। ‎ ‎পর্যটন সম্ভাবনার দিক দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির এক উদীয়মান চালিকাশক্তি হতে পারে। রাঙামাটির সাজেক উপত্যকা, ঝুলন্ত সেতু, বান্দরবানের দেবতাখুম, আলীকদমের মারায়ং তং এবং খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা ও তারেং প্রতিবছর কোটি টাকার পর্যটন ব্যবসা সৃষ্টি করছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার (UNWTO) নীতি অনুসরণ করে এ অঞ্চলে ইকো-ট্যুরিজম ও সামাজভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটালে স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সম্ভব। বিশেষ করে, পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল, হস্তশিল্প, অর্গানিক কৃষি এবং কটেজ ইন্ডাস্ট্রির সঠিক প্রসারের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পূর্ণ সক্ষমতা রাখে। ‎ ‎অপার পর্যটন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও বিকাশের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এখানকার আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর সশস্ত্র বাস্তবতা। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (PCJSS) মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংঘাত অবসানের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। চুক্তিপরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপক্ষ পাহাড়ে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সীমান্ত সড়কসহ ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করেছে। তা সত্ত্বেও রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও উপদলীয় কোন্দলের কারণে PCJSS (মূল), PCJSS (সংস্কার), UPDF (মূল), UPDF (গণতান্ত্রিক) এবং সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশ কিছু নতুন সশস্ত্র উপদলের উত্থান ঘটেছে। দেশের মূলধারার আইনি কাঠামো স্পর্শ না করে সশস্ত্র সহিংসতার পথ বেছে নেয়া এসব সংগঠনের আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের অবৈধ কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার প্রবণতা পাহাড়ের সাধারণ জনজীবনকে প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। ‎ ‎আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর অনিয়ন্ত্রিত চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেবল স্থানীয় জনমানুষের জীবনকেই দুর্বিষহ করছে না, বরং অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও পর্যটনের গতিকেও থামিয়ে দিচ্ছে। পাহাড়ে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য, পর্যটনবাহী যানবাহন, ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গৃহস্থালি থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। এই অবৈধ অর্থ দিয়ে আধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র কেনাই সশস্ত্র গ্রুপগুলোর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো পর্যটন ও অপার অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় জায়গায় টেকসই ইকো-ট্যুরিজম প্রকল্পে অংশ নিতে দ্বিধাবোধ করেন এবং বিপুল সম্ভাবনাময় একটি অর্থবহ অর্থনৈতিক জোন বারবার হোঁচট খাচ্ছে। ‎ ‎এ ধরনের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বর্তমানের চেয়ে আরও ব্যাপক হওয়া জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত জরুরি। মিয়ানমারের সাথে ২৮৩ কিলোমিটার এবং ভারতের সাথে বিশাল দুর্গম সীমান্ত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র, অস্ত্র চোরাচালানি কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো যাতে পাহাড়ে আস্তানা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করে নিরাপত্তা বাহিনী। স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থার সুরক্ষাদান এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বিজিবির সার্বক্ষণিক সতর্ক নজরদারির বলেই হাজার হাজার পর্যটক প্রতিদিন দুর্গম পাহাড়ের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে সক্ষম হন। ‎ ‎বহিঃশত্রুর হুমকি এবং আঞ্চলিক সীমান্ত সংঘাতের নতুন বাস্তবতা বিবেচনায় পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিধি ও কৌশলগত নজরদারি আরও ব্যাপক আকারে বাড়ানো দরকার। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে জান্তা সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর (আরাকান আর্মি) মধ্যকার সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ছে, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে দুর্গম সীমান্ত এলাকা ও গভীর বনাঞ্চলে ড্রোন প্রযুক্তি, থার্মাল ইমেজিং ও আধুনিক নিরাপত্তা চৌকির পরিধি বাড়ানো আবশ্যক। অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশদ্বার বন্ধ করতে এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর গোপন আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর আধুনিকায়ন করা রাষ্ট্রের একটি প্রধান কৌশলগত দায়বদ্ধতা। ‎ ‎পাহাড়ের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র ও সরকারকে সুনির্দিষ্ট ও দ্বিমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। একদিকে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাসহ সব ক্ষেত্রে জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত স্থানীয় সকল বাংলাদেশি অধিবাসীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে সম্পূর্ণ অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে সকল প্রকার সশস্ত্র ও চাঁদাবাজ সংগঠনের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক উপায়ে আলোচনার দরজা খোলা রেখেও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে সমূলে উৎপাটন করা ছাড়া পাহাড়ে স্থায়িত্ব আনা সম্ভব নয়। ‎ ‎পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ত্রিবেণী সংগম ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহিংসতা ত্যাগ করে দেশের সংবিধান ও আইনি কাঠামোর ভেতর ফিরে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কড়া নজরদারি এবং স্থানীয় অধিবাসীদের সহযোগিতায় পাহাড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানি পুরোপুরি বন্ধ হলেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই অপার ভূমি হয়ে উঠবে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতির এক অনন্য কেন্দ্রবিন্দু।

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
শরৎ নেমেছে ধরায় সুললিত নীরবতায়

শরৎকাল অনেক আগেই এসেছে। কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারিনি, শরৎ কতটা নেমে এসেছে মোর আঙিনায়। সে খুব সহজে ধরা দেয় না। যদি বনগাছের পাশ দিয়ে না হেঁটে যাই কিংবা ভোরের আলো ফোটার মলিন প্রকৃতির সঙ্গে একটু একাত্ম না হই, তবে সে ধরা দেবে না। চার দেয়ালে বন্দি হয়ে ডাকলেও সে আসবে না। কিন্তু প্রকৃতিতে সে ঠিকই এসে পড়েছে।   আমার নিরবধি ডাক, জননী-জন্মভূমির সম্বোধন—সে কারও ডাকই শুনবে না। এখন সে অবহেলিত। তবু কেন যেন তার আগমনী আভাস শুনতে পাচ্ছি। পাখিদের কিচিরমিচির ডাক শুনতে পাচ্ছি। গ্রীষ্মের কড়া দাবদাহ কিংবা বর্ষার বাদলমুখর দিনের চেয়ে এখন মেঘলা দিনের ভেজা ভেজা প্রকৃতিই শ্রেয়তর লাগে।   আজ আমি শরতের সেই ঢেউ, সেই কাশবনের ফুলের অম্লান অকৃত্রিম গন্ধ অনুভব করছি। প্রজাপতি কিংবা ভ্রমরের আনাগোনাও সুস্পষ্ট। চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখি, ফুল-কাশবনের মধ্যে দিয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছি। সেই ‘পথের পাঁচালী’র অপু আর দুর্গা ছুটে যাচ্ছে রেল দেখতে, শরতের ঘন কাশবন ডিঙিয়ে ছোট ভাইয়ের হাত ধরে। মনে হয়, ওরা আমার পাশ দিয়ে ছুটে গেল। সেই অস্পৃশ্য ডাক, কৌতূহলী ভাবনা—সবই যেন শরতের প্রভাতে মিশে আছে। মনে হয়, আমার ছায়ার সঙ্গে হাঁটছে আর দ্রুতপদে শরতের গল্প বলছে।   কাশবনের ভেতর দিয়ে তাদের সেই অবাধ ছুটে চলা যেন বাংলার প্রকৃতিরই এক অনিন্দ্য সৃষ্টি। মনে হয়, আমিও ছুটে যাই কাশবনের ভেতর দিয়ে দূরে কোথাও। কাশবনের ভেতরে সেই দুর্গাপ্রতিমার অনিন্দ্য রূপ দেখতে। যেন প্রকৃতির এক শোভনীয় রূপকায় সৃষ্টি।   সত্যিই শরতের মোহ, শরতের গান, শরতের ভাবার্থ—সবকিছুর মধ্যে এমন এক আকর্ষণ আছে, যা মানুষকে বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন শরৎ এক আবহ নিয়ে আসে, তেমনই বাংলার কথাসাহিত্যে বারবার শরতের দোলা, কাশে কাশে দোলা ফুটে ওঠে। মনে হয়, শরৎ শুধু একটি ঋতু নয়; বাংলা সাহিত্যিক কল্পনারও এক দীর্ঘস্থায়ী অংশ। প্রকৃতির রূপ কতটা নির্মোহ, কতটা সুন্দর—তাই অকপটে স্বীকার করি।   আজ একটু ঘুম থেকে উঠে শান্ত হয়ে উঠোনের ধারে চুপটি করে বসে ছিলাম। সেই মুহূর্তেই এমন এক স্নিগ্ধ, শীতল বাতাস গায়ে এলিয়ে গেল, মনে হলো আমাকে মুহূর্তেই শান্ত করে দেবে, সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিতে পারে। এই বাতাসের এমন একটি গন্ধ থাকে, যেটা প্রতিবছরের এই সময়টাতে খুব মনে পড়ে—বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া মাঠ-ঘাট, ছোট রাস্তার অলি-গলির ভেজা পাতায় মাখানো কাদা। আঙিনার পাশের বটগাছটার বড় বড় ভেজা পাতার কথাগুলো যেন মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। হাত দিয়ে পাতাটি উঠালেই দেখতে পাওয়া যায় পাতার রেখে যাওয়া গল্প, শরতের গল্প।   হয়তো গ্রাম-শহরতলির কোণে কোণে এখন কাশবনের দোলা দুলছে। গাঁয়ের খেত-মাঠে ভরা জল ধীরে ধীরে কমছে। কচুরিপানা, শেওলা প্রায় শুকিয়ে যাচ্ছে। শোলগাছের পাতাগুলো কেমন যেন চুপসে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, তাদের সময় শেষ। ফসল রোপণের জন্য ছেড়ে দিতে হবে তাদের বিস্তার। বিলে তেমন জল নেই। কচুরিপানাগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে একধরনের নীরব, অদৃশ্য পরিবর্তন। খুব সাধারণ দৃশ্য, অথচ আমার চোখে তা নয়নাভিরাম।   যেখানে গেলে আমি খুব সাধারণ স্বপ্ন দেখি—ওই পাখিটা যদি একবার দেখা দেয়, ওই বুনো হাঁসটা যদি একবার কাছে এগিয়ে আসে, ওই সাদা বকটি যদি মাথার ওপর দিয়ে একবার উড়ে যায়, ওই পানকৌড়িটার মাছ শিকারের অপ্রতুল ধৈর্য, ওই দূরের আধো-অনুজ্জ্বল প্রকৃতি—সবই কত সাধারণ! অথচ এই একটি শরতের অপেক্ষায় তারা যেন অধীর আগ্রহে থাকে।   আশ্বিন এসে গিয়েছে। ভাদ্র বিদায়ের পথে। সেই মস্ত বড় তালগাছ, গাছ থেকে তাল পড়া, জলের মধ্যেও কেমন একটা কুঁঠাসা শব্দ হওয়া। সেই তাল কুড়াতে হাঁটুজলে ছুটে যাওয়া, তালের পিঠা খাওয়া, মায়ের হাতের তালের পিঠা। আর অকারণে সারা দিন মাঠে-মাঠে ঘুরে বেড়ানো। গ্রামের এই স্মৃতিগুলো হয়তো সকলেরই আছে। কিন্তু আমার একটু অন্য রকম স্বাদ। আমি সেগুলো তখন থেকেই ভালোবেসে এসেছি। এগুলো যেন আমার নীরব পথের সঙ্গী, আমার সাহচর্য। হয়তো একদিন এগুলো আর পাব না। কিন্তু দিনগুলো আমার খুব মনে থাকবে। সেই কারণেই আজও শরৎ এলেই আমার ভেতরে কোথাও একটা পুরোনো দরজা খুলে যায়। দিগন্তঘেঁষে অদ্ভুত বাতাস নীরবে বয়ে যায়। ছুটে যেতে ইচ্ছে হয় দিকদিগন্তের নানাদিকে।   প্রতিবছর এই সময়টি হাজার লেখক-সাহিত্যিক মানুষের অনুভূতির জায়গা। এটি তাদের কিছু লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। কেউ কবিতা লেখে, কেউ গল্প, কেউ শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু শরৎকে একেবারে উপেক্ষা করে থাকা কঠিন।   এটাই বর্ণিল শরৎ। প্রকৃতির এক অনন্য সুন্দর সময়। সে বারবার ডাকে—একবার ফিরে তাকাও। রূপটি সুন্দর হোক বা না হোক, ফিরে তাকাও। শরৎ এমনই একটি মহৎ ঋতু, প্রাণবন্ত উৎসাহের ঢেউ, যে ঢেউ সকলের মনে-প্রাণে বয়ে চলে অবিরাম ধারায়।   দক্ষিণায়নের মৃদুমন্দ বায়ুর ছলছল ঢেউ প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে একেবারে উন্মীলন হয়ে যায়। অজান্তেই শরতের শুভ্র কাশবন পেঁজা পেঁজা মেঘের মতো মাঠে মাঠে দুলে যায়। আকাশে মেঘ থাকে না বললেই চলে। দুই-একটি হাতেগোনা পেঁজা পেঁজা মেঘ নিরুদ্দেশ ঘুরে বেড়ায়। যেন দেখা দিয়েও দেখা দিতে চায় না। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড গরম হয়ে বর্ষার রেশ জুড়ে দেয়। তবু এই সময়ের প্রকৃতিতে অন্য রকম সৌন্দর্য থাকে। সংসারের জগতের কোলাহল থেকে বেরোতে পারলেই প্রকৃতির স্বাদ নেওয়া যায়। একটু দক্ষিণাবেলার হাওয়া গায়ে লাগলেই নতুন এক সৃষ্টিকল্পের উচ্ছ্বাস ভেসে ওঠে। আমাদের দেখতে হবে, ভাবতে হবে, শিখতে হবে।   বাংলাদেশের প্রকৃতি শরতের দেশ। সব ঋতুতেই বিভিন্ন রকম সময় বিরাজ করে, যা প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলে এবং প্রত্যেককে জাগতে শেখায়। আমি আবার গ্রামে ফিরে যাচ্ছি। গাঁয়ের কথাই তো বলব। এ জন্যই মনে হয়, আমার গায়ে বেশি জোর। একটা কেমন যেন শক্তি ফিরে পাই। গায়েই যে আমি মানুষ, মাটি-মনের মানুষ।   গাঁয়ে এখন এক অনন্য সুন্দর প্রকৃতি বিরাজ করছে। আর কিছুদিন পরই অতিথি পাখিরা চলে আসবে দক্ষিণের, উত্তরের কিংবা পশ্চিমের বিলগুলোতে। এখন শরতের যে রূপ প্রকৃতিতে বিরাজ করছে, তা এক ভাবার্থ বয়ে আনে। ধীরে ধীরে জল কমছে, বিলের কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণে ব্যস্ততা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঘরে ঘরে অন্য রকম এক আবহ ধ্বনিত হয়। আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার আগমন এই ধরায়। শরতের কাশবনের পথে পথে যেন দেবী দুর্গা পৃথিবীতে আগমন করেন। শ্রীচণ্ডীপাঠের বর্ণিত কাহিনিতে শোনা যায়, দেবী দুর্গা কয়েকটি দিনের জন্য বাপের বাড়িতে এসে আবার ফিরে যান। এ সময় পূজা-অর্চনা, ভক্তি, পুষ্পাঞ্জলি ও অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়।   এই লোকসংস্কৃতি, লোকজ ধর্মীয় আচারযজ্ঞ—সবকিছুই শরতের এক বৃহত্তর প্রতিফলন। গোধূলিবেলায় পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যায়। সূর্যের আশপাশে লাল মেঘ ঘোরাফেরা করে, যেন রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। ধু-ধু বনপ্রান্তরের ফাঁক দিয়ে সূর্য যখন উঁকি দিয়ে বিদায় নেয়, তখন আমরা আবার নতুন কিছু রচনা করতে উঠেপড়ে বসি। যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের একটি কাহিনি। শরতের জাদু যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই সত্যি। আমি এখনো বুঝতে পারলাম না, শরতের মহামুক্ত প্রকৃতি আসলে কতটা শরৎ!   কাশবন নিয়ে আর কত গল্প বলব? ফুলে ফুলে নুইয়ে পড়ে কাশবনের খেত। শরৎরূপী প্রকৃতি, তুমি আর কত লীলা দেখাবে? জগৎ-সংসারে সবই তো হচ্ছে অপরূপ ধারায়। কেউ দেখে, কেউ দেখে না। যারা দৃষ্টিহীন, তারাও কি শরতের শোভা পায়? তারা কি শরতের ধ্বনি শুনতে পায়? তুমি কি তাদের জন্য অন্য কোনো উপায় রেখেছ? কত প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে।   শরতের রূপকে বলি, তাদের আমি দেখাতে পারি না। আমার লেখা তারা পড়তে পারে না, আমার কথা, আমার ভাষা তারা বুঝতে পারে না। তবে কীসের শরৎ, কীসের রূপ, কীসের আগমনী বার্তা? সত্যিই মনে এক কালি জমে যায়। সেই কালি আবার মুখে চলে আসে লিখতে লিখতে। এটাও কেমন একটা প্রকৃতি, কেমন একটা শরৎ! হয়তো কবিদের কোনো লেখায় আছে কি না, আমার জানা নেই। যদি থেকেও থাকে, তাহলে তাদের জন্য কিছু করে দাও।   সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে শরতের কাদা। শরতের কাদা খুব সুন্দর। বিলের পাড়ে শুকনো কাদার স্তর জমে। সেই জমির মধ্য দিয়ে এক পা এক পা করে হাঁটি। কিছুদূর এগোতেই নরম কর্দমাক্ত কাদার মধ্যে প্রবেশ করি। তখন কেমন যেন এক স্নিগ্ধ, শীতল অনুভূতি পাই। এর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তারা হয়তো ঢের বুঝতে পারে। কাদারও একটা গন্ধ আছে। সেটা সব ঋতুরই। তবে এখন অনেকটা সুন্দর—ঠান্ডা, নরম, কলকলে। সঙ্গে যদি থাকে সবুজ ঘাস, সবুজ পাতা, তাহলে তো কথাই নেই।   বারবার কেন আমরা শরতে গ্রামবাংলার প্রকৃতির মধ্যে ফিরে যাই? কেন সাহিত্যিক, লেখক, কবিরা শরতের মোহমুক্ত নেশায় ডুবে থাকেন? কেন শরতের শারদীয় রূপ বারবার ফুটে ওঠে? কেন কাশবনের দোলায় দোলায় প্রকৃতি মেতে ওঠে? এটাও এক অনন্ত প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে যাই—আমি কী বলছি, কী সৃষ্টি করছি, এর সত্যতা কতটুকু, এর ধ্বনি কতটুকু?  

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬ 0
প্রকৃতি সংরক্ষণ : টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি

প্রকৃতি মানবজীবনের অস্তিত্ব, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি। মানুষ যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক না কেন, তার জীবন এখনো প্রকৃতির ওপরই নির্ভরশীল। বিশুদ্ধ বায়ু, নিরাপদ পানি, উর্বর মাটি, খাদ্য, বনভূমি, খনিজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য—সবই প্রকৃতির অমূল্য দান। প্রকৃতির এই সম্পদ কেবল মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমৃদ্ধ করে না, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং জীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার পূর্বশর্ত এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি। অথচ আমরা এর  থেকে ক্রমান্বয়ে পেছনের দিকে যাচ্ছি।    দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নয়নের নামে আমরা প্রকৃতিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচারে বন উজাড়, নদী-খাল দখল, শিল্পবর্জ্যের দূষণ, অতিরিক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক আহরণের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি আজকের বাস্তবতা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দাবানল, অতিবৃষ্টি, খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি তারই প্রমাণ।   বাংলাদেশও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। নদীমাতৃক এ দেশের অসংখ্য নদী আজ দখল ও দূষণের শিকার। একসময় যেসব নদী, খাল ও জলাভূমি কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস ছিল, সেগুলোর অনেকই আজ অস্তিত্ব সংকটে। বনভূমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি কৃষি উৎপাদন ও সুপেয় পানির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস এবং বন্যার মতো দুর্যোগ মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে।   প্রকৃতির ওপর মানুষের এই অবিবেচনাপ্রসূত আচরণের ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য ভেঙে পড়ছে। একটি বন ধ্বংস মানে শুধু কিছু গাছ কাটা নয়; এর অর্থ অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়া, কার্বন শোষণের সক্ষমতা কমে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনিশ্চিত পৃথিবী রেখে যাওয়া। একইভাবে একটি নদীর মৃত্যু মানে শুধু পানির প্রবাহ বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীবিকা এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।   বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান হারে পরিবেশ ধ্বংস অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই পৃথিবীর বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। তাই প্রকৃতি সংরক্ষণ এখন কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।   প্রকৃতি সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জীববৈচিত্র্য। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী, উদ্ভিদ এবং অণুজীব বাস্তুতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। ক্ষুদ্রতম কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে বৃহত্তম প্রাণী পর্যন্ত প্রত্যেকেই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। একটি প্রজাতির বিলুপ্তি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ মানেই প্রকৃতির স্বাভাবিক কার্যক্রমকে টিকিয়ে রাখা।   টেকসই উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে। স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য যদি বন কেটে ফেলা হয়, নদী ভরাট করা হয় কিংবা পাহাড় ধ্বংস করা হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে অর্জিত উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকেই সংকটে ফেলবে।   বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ, বনায়ন, জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সচেতনতা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং কঠোর আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কমানো, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং নদী ও জলাভূমি রক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে, উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে অভিযোজন সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।   সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রকৃতি সংরক্ষণ একটি ব্যক্তিগত দায়িত্বও বটে। একটি গাছ লাগানো, অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় রোধ করা কিংবা আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা এসব ছোট ছোট উদ্যোগই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। রাষ্ট্রীয় নীতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়েই একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।   পৃথিবী আমাদের একমাত্র আবাস। এর বিকল্প কোনো গ্রহ এখনো মানুষের নাগালের মধ্যে নেই। তাই এই পৃথিবীকে রক্ষা করা মানে নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষা করা। আমরা যদি আজ প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল না হই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে একটি নিরাপদ, সবুজ এবং টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে, আর মানুষ বাঁচলেই টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।  

আগস্ট ৫, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0