Breaking news

দুর্নীতি

ছবি : সংগৃহীত
দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

আর্থিক অনিয়ম ও তথ্য গোপনের নানা অভিযোগের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ ছেড়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বুধবার ৯ সেপ্টেম্বর সংস্থাটির মহাপরিচালকের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ২০২৪ সালে পাঁচ বছরের মেয়াদে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি।   বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করে। পাশাপাশি ডব্লিউএইচও তাঁর বিরুদ্ধে চীন সফরের খরচে জালিয়াতি, ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য এবং অনিয়ম করে জমি নেয়ার অভিযোগে তদন্ত শুরু করে। এসব তদন্তের জেরে গত জুলাইয়ে তাঁকে অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায় সংস্থাটি।   সায়মা ওয়াজেদ শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। ৯০১ ডলারের ভ্রমণ ব্যয়ের অনিয়মকে তিনি সহকারীর প্রশাসনিক ত্রুটি বলে উল্লেখ করেন এবং তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রিটি অটিজমে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পাওয়া সম্মানসূচক সনদ ছিল বলে জানান। জমি বরাদ্দের বিষয়ে তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্য হিসেবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ীই তিনি ওই জমির মালিকানা পেয়েছিলেন।   পদত্যাগপত্রে ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুসের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। তিনি উল্লেখ করেন, কার্যক্রমে ক্রমাগত বাধা দেয়া এবং প্রায় এক বছর অবৈতনিক ছুটিতে রেখে বেতন বন্ধ রাখায় তিনি মারাত্মক আর্থিক টানাপোড়েনে পড়েছেন। এসব কারণে তিনি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।   এ বিষয়ে ডব্লিউএইচওর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, তাঁকে অপসারণের প্রক্রিয়া আগেই শুরু হয়েছিল। সংস্থাটি আগামী ১২ অক্টোবর পদটির জন্য নতুন মনোনয়ন আহ্বান, ডিসেম্বরে যাচাই-বাছাই এবং আগামী ২৪ জানুয়ারি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।  

সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬ 0
ছবি : সংগৃহীত
এনএসআইয়ের সাবেক দুজন কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আদালতের

বিভিন্ন অভিযোগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তরের (এনএসআই) দুজন কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আদালত। তাঁরা হলেন সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক এম এস কে শাহীন এবং যুগ্ম পরিচালক বদরুল আহমেদ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ৩১ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ জারি করেন।   জানা গেছে, এনএসআইয়ের অতিরিক্ত পরিচালক এম এস কে শাহীনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, চাঁদাবাজি এবং পদের প্রভাব খাটিয়ে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ বর্তমানে দুদকে অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। অন্যদিকে সংস্থাটির যুগ্ম পরিচালক বদরুল আহমেদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে।   এ দুই কর্মকর্তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে পৃথক আবেদন করেন দুদকের সহকারী পরিচালক বিলকিস আক্তার। আবেদনে বলা হয়, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা বর্তমানে দেশত্যাগের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তদন্ত চলাকালে তাঁরা কোনোভাবে বিদেশে পালিয়ে গেলে তাঁদের মাধ্যমে পাচারকৃত বা অবৈধ উপায়ে লব্ধ অর্থ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়বে। তাই অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের স্বার্থে তাঁদের বিদেশ গমন রহিতকরণে আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা জরুরি।   হাইকোর্ট বিভাগের একটি রিট পিটিশন সংক্রান্ত রায়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে দুদকের যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণপূর্বক সোমবার আদালতে এই আবেদন পেশ করা হয়। পরে আবেদনের যাবতীয় রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ করে আদালত তা মঞ্জুর করে এবং অভিযুক্তদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।  

আগস্ট ৩১, ২০২৬ 0
মফস্বল সাংবাদিকতা : সত্যের পথে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

  গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। আর সেই গণমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত অংশ হলো মফস্বল সাংবাদিকতা। রাজধানীর বাইরে জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকরাই সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, দুর্যোগ, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং উন্নয়নের বাস্তব চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যাঁরা সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের জীবনই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিতে আবদ্ধ।   প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন, তখন একজন মফস্বল সাংবাদিক ছুটে যান ঘটনার কেন্দ্রস্থলে। নিজের নিরাপত্তা, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেন; যাতে মানুষ সঠিক খবর জানতে পারে। গুজব থেকে দূরে থাকে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে। এই দায়িত্ববোধই সাংবাদিকতাকে একটি মহান পেশায় পরিণত করেছে।   তবে দুর্যোগের সংবাদ সংগ্রহের চেয়েও কঠিন কাজ হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ করা। একজন মফস্বল সাংবাদিক যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কিংবা স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় নানা ধরনের চাপ। কখনো হুমকি, কখনো সামাজিক অপপ্রচার, কখনো শারীরিক হামলা, আবার কখনো মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমে তাঁকে নীরব করার চেষ্টা করা হয়। এতে শুধু একজন সাংবাদিক নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকারও।   আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মফস্বল সাংবাদিকের নেই নিয়মিত সম্মানী, নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা কিংবা ঝুঁকির সময় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। দীর্ঘদিন একটি সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করেও অনেক প্রতিনিধি প্রয়োজনের সময় নিজেকে একা মনে করতে থাকেন। পাশে থাকে না প্রতিষ্ঠান। প্রভাবশালীদের চাপের মুখে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রতিনিধিকেই দূরে সরিয়ে দেয়। এই প্রবণতা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত।   আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে অভিযোগ তদন্ত করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটিও আইনের আলোকে যাচাই হওয়া উচিত। একইভাবে সাংবাদিকের ওপর হামলা, হুমকি কিংবা মিথ্যা মামলার অভিযোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আইনের চোখে সবাই সমান। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।   মফস্বল সাংবাদিকরা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নন, তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। তাঁদের কলমের মাধ্যমে উঠে আসে অবহেলিত মানুষের কথা, জনস্বার্থের প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতি। তাই তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কেবল সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাগরিক সমাজ এবং সর্বোপরি পুরো জাতির দায়িত্ব।   সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দেয়া যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। তাই মফস্বল সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে নয় বরং তাঁদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।  

আগস্ট ৬, ২০২৬ 0
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সাগরচুরি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সাগরচুরি : ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির বিল তোলা হয় প্রায় ২১৪

দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে সরকারি মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ উঠে এসেছে বিশেষ নিরীক্ষায়। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২৭ কোটি টাকার বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিপরীতে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ৯ অর্থবছরে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয়, ক্রয়প্রক্রিয়া ও তদারকি নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।   শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাবেই নয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংস্থাটির পরিদর্শনে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর হালনাগাদ কোনো কর্মপরিকল্পনা প্রকল্প কার্যালয়ে নেই। অসমাপ্ত কাজের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি। ফাপাডের বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং আইএমইডির পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।   সূত্র জানিয়েছে, দুই ইউনিটে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরুতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রকল্পের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। পরবর্তী সময়ে ২২ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। মোট ব্যয়ের মধ্যে ৯ বছরে খরচ হয়েছে প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা।   নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রথম পাঁচ অর্থবছরেই ৪১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়ে। ২০২১-২২ অর্থবছরে আপত্তির পরিমাণ ছিল ১০৬ কোটি টাকা। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকায়। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ধরা পড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই বছর ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার অডিট আপত্তি তোলে ফাপাড। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ৩ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।   বিশেষ নিরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে রূপপুর প্রকল্পের আওতায় নির্মিত গ্রিন সিটি আবাসন এলাকায়। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত এই আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টি আপত্তি তোলা হয়েছে। এসব আপত্তির বড় অংশই নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনা এবং বিল পরিশোধসংক্রান্ত।    নিরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনায় সরকারি মূল্যের তুলনায় অনেক বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দরপত্রে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হলেও অন্য কিছু পণ্যের দাম কম দেখিয়ে মোট দরকে ‘গ্রহণযোগ্য’ রাখা হয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের আড়ালে অতিরিক্ত ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনিয়মের অন্যতম উদাহরণ গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়।    নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সরঞ্জামের সরকারি মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা। অথচ একই সরঞ্জাম কেনায় বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু এই একটি খাতেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা।   একটি ভবনের হিসাবেই এই পার্থক্য আরও স্পষ্ট। উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম, ট্রান্সফরমার, নিম্ন ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, পাওয়ার ফ্যাক্টর কারেকশন প্যানেল এবং জেনারেটরের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। কিন্তু একই সরঞ্জামের জন্য বিল করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এতে একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।   রূপপুর প্রকল্পের সবচেয়ে আলোচিত অনিয়ম ছিল বালিশ কেনা। বিশেষ নিরীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশ কেনা হয়। এর মধ্যে ৬০টি বালিশের প্রতিটির দাম ধরা হয় ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। বালিশগুলোর প্রকৃত মূল্য ছিল ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অথচ এগুলো কেনা হয়েছে ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায়। এতে সরকারের প্রায় ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে নিরীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।   বিশেষ নিরীক্ষার তথ্য বলছে, বালিশকাণ্ড ছিল অনিয়মের একটি ছোট অংশ। গ্রিন সিটির ২০টি আবাসিক ভবনের নির্মাণ ও ক্রয় কার্যক্রম পর্যালোচনা করে নিরীক্ষকরা ২৯৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির তথ্য তুলে ধরেছেন। এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ, মূল্য নির্ধারণে অসংগতি এবং চুক্তির শর্ত অনুসরণ না করার অভিযোগ করা হয়েছে।   আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। সংস্থাটির পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা যায়নি। দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। প্রকল্প দপ্তরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর কোনো হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। এমনকি অসমাপ্ত কাজের তালিকাও সংরক্ষণ করা হয়নি।   প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের প্রতিবছর প্রকল্প বাস্তবায়নের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ২০১২ সালের ডিসেম্বরের পর প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো কর্মপরিকল্পনা জমা দেয়নি।    প্রকল্প দপ্তর জানিয়েছে, এ বিষয়ে একাধিকবার তাগিদ দেয়া হলেও নতুন কর্মপরিকল্পনা পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় আইএমইডি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দ্রুত হালনাগাদ কর্মপরিকল্পনা সংগ্রহ, প্রকল্পের সব অসমাপ্ত কাজের তালিকা প্রস্তুত, নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছে।  জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে এসব পদক্ষেপ জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।    জানতে চাইলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, এত বড় অঙ্কের অডিট আপত্তি প্রকল্প বাস্তবায়নে বিধিগত দুর্বলতার বিষয়টি প্রকাশ করে। বিশেষ করে, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) পরিপালনে দুর্বলতা ছিল বলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যদি ক্রয় প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হতো, তাহলে এত অডিট আপত্তি হওয়ার কথা নয়।    তিনি আরও বলেন, এটিকে শুধু প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা হিসেবে দেখলে হবে না। প্রকল্প তদারকি ও সুপারভিশনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত। মন্ত্রণালয়ের স্টিয়ারিং কমিটি এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদেরও নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, ক্রয়প্রক্রিয়া আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে কি না। যেহেতু এসব সিদ্ধান্ত তাদের অনুমোদনের মধ্য দিয়েই হয়েছে, তাই তাদেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।   ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারিগরি প্রযুক্তি সরবরাহ ও ঋণদাতা দেশটি (রাশিয়া) শুধু একটি পারমাণবিক পরাশক্তি নয়, বৈশ্বিক দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। দেশটি চরম উদ্বেগজনক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হিসেবে চিহ্নিত। এ বাস্তবতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে আপাদমস্তক যোগসাজশের দুর্নীতিসহ ব্যাপক অনিয়ম যেমন অস্বাভাবিক নয়, তেমনই প্রতারণামূলকভাবে চুক্তির শর্তভঙ্গের ঘটনাও বিস্ময়কর নয়।    তিনি বলেন, প্রকল্পটি যখন অনুমোদিত হয় এবং চুক্তি সম্পাদিত হয়, তখন যেমন সংশ্লিষ্টদের রাশিয়া ও রোসাটম সম্পর্কে জানার সুযোগ ছিল, তেমনই বর্তমানেও তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছে সেটি অজানা নয়। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পতিত কর্তৃত্বপরায়ণ চোরতন্ত্র্রের চাপিয়ে দেয়া বিশাল এই বোঝা লাঘবের জন্য নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মের যথাযথ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতি প্রতিরোধব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

জুলাই ২৩, ২০২৬ 0
জিয়াউল আহসানের জলসিঁড়ি
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন: জিয়াউল আহসানের বাড়িতে দুদকের অভিযান

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে। সোমবার সকালে দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই অভিযানে বাড়ির মালামাল জব্দের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সংস্থাটির মুখপাত্র তানজীর আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২২ কোটি ২৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, অনুমোদিত সীমা লঙ্ঘন করে ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার জমা এবং আটটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এসব অর্থ স্ত্রী নুসরাত জাহানের সহযোগিতায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তর এবং রূপান্তর করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানকে সরকার পতনের পরপরই গত ৬ আগস্ট চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর ১৬ আগস্ট একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারের পর চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি তাঁকে দুদকের এই জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারেই অবস্থান করছেন।

জুলাই ২০, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0