Breaking news

গল্প

সমাপতন

পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই পুরুষ আর তেইশ বছরের টগবগে যুবতীর সম্পর্কের রসায়নটা এমনই যে অনায়াসে পিতা-পুত্রী ধরে নেয়া যেতে পারে। ভাই-বোনও বলা যেতে পারে সহজেই। কিন্তু প্রেমিক-প্রেমিকা রূপে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ নৈব নৈবচ।   সুমিত বাবুর সঙ্গে মোনালিসার অবশ্য এর মধ্যে কোনো সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি। অথচ বেশ নির্মল একটা যোগাযোগ গড়ে উঠেছে দুজনের মধ্যে। দেখাটা প্রথম হয়েছিল এক বর্ষার সকালে। পেশায় নার্স চটপটে হাস্যময়ী মোনালিসার সকালের শিফটে ডিউটিতে যোগ দেয়ার তাড়া ছিল । আর সুমিত বাবুর সাপ্তাহিক কাজের সূত্রে নার্সিংহোমের সামনে ঘণ্টাখানেকের অখণ্ড অবসর ছিল। এই ফাঁকেই পরিচয়টা ঘটে গেল হঠাৎ করে।   সুমিত বাবু লেখালেখির শখ রাখেন। গালে টোল পড়া অমায়িক স্বভাবের হাস্যোজ্জ্বল মোনালিসাকে দেখেই তাঁর মনে হলো একে তাঁর গল্পের নায়িকা করলে মানানসই হবে। এরপর টুকটাক কথাবার্তা হয়েছে।   সুমিত বাবু জেনেছেন, মোনালিসা আসলে ডায়মন্ড হারবারের বাসিন্দা। নার্সিং পেশার সূত্রে নার্সিং হোস্টেলে বাস করে। এই বয়সে বাবা-মাকে ছেড়ে একলা থাকতে হয় মেয়েটিকে ভেবে খারাপ লেগেছে তাঁর। মনে মনে ভেবেছেন, একদিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবেন। কিন্তু সংকোচ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কিন্তু দেখা হলেই গালে টোল ফেলে হেসেছে মোনালিসা। আর মুগ্ধ হয়েছেন সুমিত বাবু। কিন্তু প্রস্তাবটা আর দিয়ে উঠতে পারেননি। এখনকার ছেলে-মেয়েদের আত্মসম্মানবোধ খুব বেশি। যদি কিছু মনে করে বসে?   সেদিন সকালে সুমিত বাবু একটু অন্যমনস্ক ছিলেন। মোনালিসা একটু কাছে এগিয়ে এসে বলল, “আমি কিন্তু সামনের মাসে চলে যাচ্ছি। বাড়ির কাছাকাছি একটা সুযোগ পেয়েছি।" "তাই?" শুষ্ক হাসলেন সুমিত বাবু। “আমি ভেবেছিলাম, আমি অসুস্থ হলে তোমার নার্সিং হোমে চলে আসব।" "ছি, ছি! আপনি অসুস্থ হবেন কেন? আপনি অনেক দিন ভালো থাকুন। আমি চলে গেলেও আপনার লেখা পড়ব।"   ঈশ্বরের  লীলা বোঝা ভার। সেদিন রাতেই বাড়িতে হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে গেলেন সুমিত বাবু। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরল, তিনি দেখলেন তিনি একটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন। নাকে অক্সিজেনের নল। পাশে উদ্বিগ্ন স্ত্রী। জানলেন, রাতে খেতে বসার আগে কোনো কারণ ছাড়াই অজ্ঞান হয়ে যান সুমিত বাবু। ঘরোয়া উপায়ে জ্ঞান না ফেরায় নার্সিং হোমে আনতে হয়েছে। এর মধ্যে এক গাদা ছবি আর রক্তের রিপোর্ট করতে হয়েছে।   ডাক্তার বাবু রিপোর্টগুলো ভালো করে দেখে তাঁর স্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন, "ভয়ের কিছু নেই। অনেক সময় মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব হলে এমনটি হতে পারে। বিকেলেই ছেড়ে দেব।” অক্সিজেন নল খুলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন তিনি।   স্ত্রী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। গত রাত থেকে জলটুকু পর্যন্ত মুখে দেননি। একটু চায়ের খোঁজে তিনি বের হয়ে গেলেন।   চোখ দুটো একটু বুজে এসেছিল সুমিত বাবুর। হঠাৎ আদুরে গলার আদেশে তন্দ্রা ভেঙে গেল, "এই যে লেখক মশাই, এদিকে পাশ ফিরুন। একটা ইনজেকশন দিতে হবে।" সুমিত বাবু দেখলেন তাঁর দিকে দেবকন্যার মতো তাকিয়ে হাসছে মোনালিসা।   ইনজেকশন দেয়ার পর আবার একবার গালে টোল ফেলা হাসি হেসে বলল, "আরেকটা কথা, স্যার। আপাতত আমি এখান থেকে যাচ্ছি না।"   হাসলেন সুমিত বাবু, "কেন? কী হলো আবার?" "আরে! আপনি এই রকম অসুস্থ হলে দেখবে কে?" চোখ পাকিয়ে বলল মোনালিসা।   কথাটা হয়তো সত্যি নয়। তবে শুনতে বেশ ভালো লাগল সুমিত বাবুর। অনেক দিন ধরে বাকি থাকা একটা গল্পের প্লট ভাবতে ভাবতে চোখ বুজলেন তিনি।  

আগস্ট ৪, ২০২৬ 0
প্রতীকী ছবি
রবিঠাকুর কখনো আমাদের বাড়ি আসেননি

রবিঠাকুর সশরীরে কখনো আমাদের বাড়ি আসেননি। পটুয়াপাড়া থেকে রবিঠাকুরের মূর্তি এনে বাড়ির বড় আলমারির মাথায় রেখেছিলেন বাবা। ছোটবেলায় ভাবতাম এই বুঝি কথা বলে উঠবেন রবিঠাকুর! আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড় দিদি, রোজ সন্ধেবেলায় হারমোনিয়াম নিয়ে সে রেওয়াজ করত। প্রথমে সা-রে-গা-মা-পা, তারপর ধীরে ধীরে গোটা গান তোলার চেষ্টায় ছিল। গানের মাস্টারমশাই দিদিকে প্রথম যে গানটা তুলিয়েছিলেন, সেটি আর কারোর নয়, রবিঠাকুরের।   প্রতি রবিবার বাবা রবিঠাকুরের মূর্তিটা পরিষ্কার করতেন। আত্মীয় ও প্রতিবেশীরা রবিঠাকুরকে দেখে বাবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। বাবার প্রশংসা শুনে মায়ের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠত।   বাড়িতে নতুন কাচ লাগানো বড় আলমারি এল। সেই আলমারি ভরাট করতে রবিঠাকুরের রচনাবলি আর তাঁর নানান বই যত্ন সহকারে সাজিয়ে রাখলেন বাবা। সেই আলমারির চাবি বাবা কখনো হাতছাড়া করেননি। আমরা ভাই-বোনেরা কোনো বই চাইলে বাবা তালা খুলে সেটা দিতেন।   একবার স্কুলের গরমের ছুটিতে ছোড়দি ও তার পাড়ার বন্ধুরা ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য করবে স্থির করেছে। বাবাকে বলা মাত্র ওই আলমারি থেকে বই বের করে গভীর রাত পর্যন্ত লিখে ফেলেছিলেন ফুলস্কেপ পৃষ্ঠায়। বাবার হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মতো। অফিস থেকে ফিরে জলখাবার খেয়ে একপ্রস্থ কপি করতেন। তারপর রাতের খাওয়া শেষ করে বাইরের বারান্দায় বসে যেতেন। একটানা সাত দিন পরে শেষ হয় কপি করা। মা মাঝে মাঝে বলতেন, “এভাবে রাত জাগলে শরীর খারাপ করবে।” বাবা মৃদু হেসে বলতেন, “রবিঠাকুরের সঙ্গে থাকলে কোনো রোগবালাই ধারেকাছে ঘেঁষবে না।”   ছোড়দির বন্ধুরা রোজ বিকেলে আমাদের বাড়ির ছাদে রিহার্সাল দিত। যেদিন বাবার অফিস ছুটি থাকত, বাবা তাড়াতাড়ি খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেল হতেই ছাদে উঠে পড়তেন। রিহার্সাল যত এগোত, বাবা যেন তন্ময় হয়ে দেখতেন। যেদিন মঞ্চস্থ হলো, সেদিন বাবা অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। বাবার মধ্যে সে কী উত্তেজনা! সন্ধে হতেই পাড়ার মাঠের বাঁধা মঞ্চে শুরু হয় নৃত্যনাট্য। বাবা একেবারে সামনের সারিতে বসে বিড়বিড় করছিলেন। নৃত্যনাট্যটা বাবার যেন কণ্ঠস্থ ছিল।   কৃষ্ণচূড়া গাছটা যখন লাল হয়ে উঠত, সেই সময় একটা দিনে আলমারির মাথা থেকে নামিয়ে রবিঠাকুরকে মালা পরিয়ে চেয়ারে বসানো হতো। প্রথমে বড়দি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান ধরতেন, সেই গান রবিঠাকুরের। ছোড়দি সালোয়ার-কামিজ পরে ওড়না জড়িয়ে 'আগুনের পরশমণি' গানে নাচতেন। পাড়ার দু-একজন ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে যারা আমাদের আপন হয়ে উঠেছিল, তারাও গান, নাচ, আবৃত্তি করত।   আমরা সবাই এদিক-সেদিক হাঁটাচলা করতাম, একমাত্র রবিঠাকুর ছাড়া। মা অবশ্য ব্যস্ত থাকতেন অভ্যাগতদের জন্য খাবার বানানোতে। সেদিন বাড়িতে বয়ে যেত আনন্দের বন্যা!   বাবা এককোণে বসে সব শুনতেন। যতক্ষণ অনুষ্ঠান শেষ না হতো, ততক্ষণ বাবাকে কেউ একচুলও সরাতে পারত না। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বাবা উঠোনের ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে রবিঠাকুরের মূর্তিটা কোলে তুলে নিতেন। যেভাবে আমাদের ছোটবেলায় কোলে নিতেন।   সারা রাত মনের মধ্যে রবিঠাকুরের গানের অনুরণন চলত। দিদিদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় রবিঠাকুরের কোনো গান, নাচ, আবৃত্তি, ছড়া শোনা যায়নি। একভাবে একদিকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন রবিঠাকুর। শ্রাবণের ঝরঝর বর্ষার দিনে রবিঠাকুরকে ফেলে রেখে বাবা পাড়ি জমালেন তারাদের দেশে। নিষ্পন্দ বাবার শরীরের ছৌঁয়া পেতে তৎপর হয়ে উঠেছিলাম আমরা। এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে গুনগুন করছিলেন মা। সেটাও ছিল রবিঠাকুরের গান।   আমরা ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। একমাত্র মা বেশ কয়েক বছর আগলে রেখেছিলেন রবিঠাকুরকে। তাঁর মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে তাঁরই লেখা একেকটা গান এক-একদিন গাইতেন। রুগ্ণ শরীরে মায়ের বেশি দিন গলায় আসেনি সেই কথা, সেই সুর। একদিন ভোররাতে তাল, লয় হারিয়ে নিশ্চুপ হয় পড়েছিলেন মা।   ক্রমশ জীর্ণ হয়ে ওঠা বাড়িতে তেমন কেউ না এলেও রবিঠাকুর সেখানেই ছিলেন। সমাজের বাহ্যিক খোলনলচে বদলে গিয়ে তাঁর মূর্তিটা এখন দাঁড়িয়ে আছে ঝা-চকচকে বহুতলে। আমাদের কখনো ছেড়ে যাননি রবিঠাকুর, আবার সশরীরে কখনো আমাদের বাড়িতে আসেনওনি।    

আগস্ট ৪, ২০২৬ 0
রিটায়ারমেন্ট

ভোর ছয়টা। ছুটির দিন। যদিও ছুটির দিন আর কাজের দিন দুটোই এখন রাহেলা বেগমের জন্য সমার্থক। শফিক সাহেব ফজরের নামাজ পড়ে ডাইনিং রুমে বসে অপেক্ষা করছেন। রাহেলা বেগম পাতিলে খাওয়ার পানির মধ্যে অল্প আদা, কাঁচা হলুদ ও রসুন কুচি দিয়ে জ্বাল দিচ্ছেন। সবশেষে এক টুকরো লেবু টিপে চায়ের চামচ দিয়ে ঘুটে শফিক সাহেবের সামনে রাখলেন।   এটা শফিক সাহেবের নতুন রেসিপি। এর কাজ হচ্ছে লিভার থেকে সব ধরনের টক্সিক পদার্থ বের করে তাকে শিশুর লিভারে পরিণত করা। শফিক সাহেব ইউটিউবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক চ্যানেল ফলো করেন। সেসবের কোনো একটা থেকে পাওয়া এই রেসিপি। এসব রেসিপিতে রাহেলা বেগমের খুব একটা বিশ্বাস নেই। বিশ্বাস না থাকলেও তিনি বানিয়ে দেন। কথা বাড়ান না।   আগে থেকেই তাঁর স্বামী বদমেজাজি ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পর আরও খিটখিটে হয়ে গেছেন। অল্পতেই রেগে যান। তাই খুব প্রয়োজন না থাকলে রাহেলা বেগম কথা বলেন না।   শফিক সাহেব প্রায় সারা দিন শুয়ে-বসে ফোন দেখেন এবং বই পড়েন। ব্যায়ামের মধ্যে ফোনটা পাশে রেখে দু-তিন মিনিটের জন্য হাত ও পায়ের আঙুল নাড়াচাড়া করেন। হাত মুঠো করে আবার খোলেন। রাহেলা বেগমের ধারণা, এটা তিনি করেন রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য।   আদা-রসুন জ্বাল দেয়ার আগের রেসিপিটা ছিল কাঁচা আদা, কাঁচা হলুদ, বিটরুট আর লেবুর রসের জুস। এটা খাওয়ার পর শফিক সাহেব চোখমুখ কুঁচকে ফেলতেন। একবার ‘কেমন খেতে?’ জিজ্ঞেস করায় এমনভাবে রাগ হয়ে তাকিয়েছিলেন যেন এই রেসিপির তিক্ততার পেছনে তাঁর বিশেষ চেষ্টা আছে।   স্বাস্থ্যবিষয়ক টোটকা ছাড়াও শফিক সাহেব আরও কিছু কাজ নিয়মিত করার চেষ্টা করেন। তার মধ্যে একটা হলো সকালে পত্রিকা পড়া। তিনি খুব যত্ন করে সময় নিয়ে পত্রিকা পড়েন চা খেতে খেতে। দৈনিক পত্রিকায় একটা বিভাগ আছে, যেখানে ছোট ছোট করে বিভিন্ন বিষয় থাকে, সাথে ছবি। এমনকি ‘রসের হাঁড়ি’ নামে বস্তাপচা কিছু জোকসও থাকে। সেই পাতাটা ইদানী শফিক সাহেবের প্রিয়র তালিকায়। পাতার সবকিছু তিনি খুঁটে খুঁটে পড়েন।   রাহেলা বেগমের মনে হয়, কেউ পাঁচশ জোকসের একটা বই কিনে প্রতিদিন সেখান থেকে একটা করে ছাপতে দেন। তিনিও মাঝে মাঝে পড়ে দেখেন। গতকালকের জোকসটা ছিল রোগী ও ডাক্তারের কথোপকথন- ডাক্তার সাহেব, এই চশমা পরলে কি আমি পড়তে পারব? অবশ্যই পারবেন। তাহলে  চশমা দেন।   হাস্যকর। শুধু হাস্যকর বললে রাহেলা বেগমের মনের জ্বালা মেটে না। তাই তিনি জোর দিয়ে মনে মনে বলেন, হাইস্যকর।   শফিক সাহেব একটা নোটবই কিনেছেন। সেখানে পত্রিকায় ছাপা হওয়া বিখ্যাত ব্যক্তিদের উক্তি লিখে রাখেন। রাহেলা বেগমের খুব কৌতূহল হচ্ছিল নোটবইটা ঘিরে। এর মধ্যে একদিন তাঁর স্বামী কলপ দিতে গোসলখানায় ঢুকলে তিনি খুলে এক ঝলক দেখেছেন। প্রথম পাতায় বড় করে নকশা এঁকে লেখা ‘স্মরণীয় বাণ’।   নোটবইয়ের প্রথমাংশে প্রায় প্রতিটি পাতায় তারিখসহ সেদিনের বাণী লেখা। মাঝখানে বেশ কিছু পাতা বাদ দিয়ে শেষের দিকে একটা পাতায় বড় করে লেখা ‘আমার বাণী’ ।   তিনি খানিকটা বিস্মিত হন। শেষের পাতাগুলোতে শফিক সাহেবের নিজের লেখা বাণী! বেশির ভাগ বাণীই স্ত্রীর উদ্দেশে লিখেছেন। বাকিগুলো জীবন সম্পর্কে। যেমন : ১১/৪/২৬ প্রেম ছাড়াও জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।   ১২/৪/২৬ সত্যকে কখনো ঘুরিয়ে বলা যায় না। ঘুরিয়ে বলা কথা সত্য নয়।   ১৩/৪/২৬ প্রকৃতি হৃদয়কে হালকা করে। তাই প্রকৃতির মাঝেই মানুষের মুক্তি।   ১৪/৪/২৬ কারও সত্যিকারের মনের ভাব জানতে চাইলে তাকে সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে বলো তোমার জন্য।   ১৫/৪/২৬ মৃত্যুকে খুঁজে পেতে জীবনের শেষ পর্যন্ত যাও।   এ পর্যন্ত পড়ে রাহেলা বেগম বিরক্ত হন মনে মনে। মৃত্যুকে খোঁজার জন্য এতদূর যাওয়ার কী দরকার! মৃত্যু যেকোনো সময় চলে আসতে পারে। এর জন্য এত দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন নেই।   বিরক্ত হলেও তিনি এটা নিয়ে বেশি ভাবেন না। কারণ, এই অভ্যাসও তাঁর স্বামী বেশি দিন ধরে রাখতে পারবেন না। আগেও এ রকম একটা খাতা ছিল তাঁর। সেখানে মলাটে বড় বড় করে লেখা ছিল, ‘পর্যবেক্ষণ’। আশপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা, তার ব্যাখ্যা ও পর্যবেক্ষণ ছিল সেই খাতার বিষয়। যেমন তাঁর সম্পর্কে সেখানে থাকা একটা পর্যবেক্ষণ ছিল অনেকটা এ রকম- ঘটনা : আমার স্ত্রী দ্রুত রাগ হয় এবং দ্রুত তার রাগ পড়ে যায়। তারপর সে আমার জন্য এক কাপ চা নিয়ে আসে। ব্যাখ্যা : এতে বোঝা যায়, রাহেলা তার আচরণের জন্য অনুতপ্ত। পর্যবেক্ষণ : অনুতপ্ত হৃদয়ের মানুষ ফুলের মতো সুন্দর।   রিটায়ারমেন্টের পর শফিক সাহেব ভালো আছেন। বিভিন্ন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু রাহেলা বেগম নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। সকালবেলা যদি কখনো স্বামীর সাথে মর্নিং ওয়াকে যেতে চান, উত্তর আসে, ‘না’। বিকেলে কোথাও যদি ঘুরতে যেতে চান একসাথে তার উত্তরও, ‘ন’। সবকিছুতে শুধু না আর না।   রাহেলা বেগমের দুই ছেলে। বড়জন ফ্লোরিডা থাকে, ছোট ছেলে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ঢাকার বাইরে। ছেলেরা দূরে থাকায় তাঁর আরও একা লাগে। ছোট ছেলে দু-তিন মাস পরপর এলে রাহেলা বেগমের একটু ভালো সময় কাটে কিছুদিন। ছেলেকে সাথে নিয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যান তখন।   রাহেলা বেগমের মাঝেমধ্যে একটা অদ্ভুত ইচ্ছা হয়। কাউকে বলেন না তিনি। তারও স্বামীর মতো রিটায়ারমেন্টে যেতে ইচ্ছে করে। এমন সুযোগ এলে তিনি কুশিকাটার কাজ শিখবেন। ছবি তোলাও শিখতে পারেন। আজকাল কত জায়গায় কত ধরনের কোর্স করায়। শুধু একটা ক্যামেরা লাগবে তাঁর। বড় ছেলেকে বললেই পাঠিয়ে দেবে।   এ ছাড়া স্বামীর সাথে কাছাকাছি কোনো দেশে ভ্রমণে যেতে ইচ্ছে করে। সেখানে দুজন হাত-ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াবেন। মাথায় থাকবে চওড়া বারান্দাওয়ালা টুপি আর রোদচশমা।  

জুলাই ৩১, ২০২৬ 0
নীরব ডাকপিয়ন
নীরব ডাকপিয়ন

আমাদের গ্রামে এখন আর ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টি শোনা যায় না। তবু শ্রাবণের প্রথম বৃষ্টি নামলেই মনে হয়, কেউ যেন অদৃশ্য হাতে একটি পুরোনো চিঠি এসে রেখে গেছে উঠোনে, যে চিঠি কোনো দিন লেখা হয়নি, তবু যার প্রতিটি শব্দ আমি মুখস্থ জানি। বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ত। দাদি তখন জানালার পাশে বসে দূরে তাকিয়ে নরম গলায় বলতেন, “আজ তোর দাদাজানের কথা খুব মনে পড়ছে।”   তারপর গল্প খুলে বসতেন। এমনই এক বর্ষার বিকেলে দাদাজান নাকি প্রথম এসেছিলেন। ভিজে কাপড় থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে, হাতে এক তোড়া কদম ফুল। দাদি লজ্জায় আঁচল টেনে মুখ ঢেকেছিলেন, কিন্তু চোখের কোণে ফুটে উঠেছিল এক নিঃশব্দ হাসি। সেই হাসির কথা বলতে বলতে দাদির মুখেও যেন আবার যৌবনের আলো ফিরে আসত।   আমাদের মেঠোপথ তখন কাদায় থকথকে। স্কুল থেকে ফিরতে গিয়ে কতবার যে পিছলে পড়েছি! বই-খাতা ভিজে নরম হয়ে যেত, জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি। তবু সে ছিল অদ্ভুত আনন্দের সময়। আমরা বন্ধুরা কাগজের নৌকা বানিয়ে রাস্তার ধারের জমে থাকা পানিতে ভাসাতাম। কার নৌকা সবার আগে বাঁক পেরোবে, কারটা সবচেয়ে দূরে যাবে — এসব নিয়েই কত হাসি, কত হইচই! হাওরপাড়ের সেই গ্রামে বর্ষা ছিল যেন আরেকটি পৃথিবী। পানি বাড়তে বাড়তে উঠোন ছুঁয়ে ফেলত। দূরের তালগাছগুলোকে মনে হতো, তারা যেন জলের বুক থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। গভীর রাতে শুয়ে শুনতাম ঢেউয়ের ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ। মনে হতো, পুরো গ্রাম যেন জলের বুকে ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে অচেনা কোনো স্বপ্নের দিকে।   সময় অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। দাদি নেই, দাদাজানও নেই। সেই কদমগাছটি আর আগের মতো ফুলে ভরে ওঠে না। মেঠোপথের জায়গায় পাকা রাস্তা এসেছে, আর কাগজের নৌকার জায়গা দখল করেছে মুঠোফোনের নীল আলো। তবু প্রথম বর্ষার বৃষ্টি নামলেই বুকের ভেতর কোথায় যেন একটি ভেজা খাম খুলে যায়। মনে হয় ভালোবাসা, অপেক্ষা আর ফেলে আসা শৈশবের নামে লেখা এক অলিখিত চিঠি আজও পৌঁছাতে দেরি করেনি। তাই আমার কাছে বর্ষা কেবল একটি ঋতুর নাম নয়। বর্ষা এক নীরব ডাকপিয়ন, যে প্রতিবছর ভিজে হাতে ফিরে আসে, স্মৃতির পুরোনো খামগুলো নিঃশব্দে খুলে দেয়, আর হৃদয়কে আবার পড়িয়ে যায় সেই সব চিঠি, যাদের কোনো ঠিকানা ছিল না, অথচ কোনো দিন হারিয়েও যায়নি।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
বৃক্ষপ্রেমী
বৃক্ষপ্রেমী

রিমা বিছানা ছেড়ে আড়মোড়া দিয়ে উঠে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল, বিকেল চারটে বেজে গেছে। জানালার কাছে গিয়ে দেখল, আকাশটা একদম পরিষ্কার। আনমনে  রিমা বলল, যাহ, একটুও বৃষ্টি নেই! রিমা ঝটপট সাজগোজ করে বাসার নিচে এল। একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠেই বলল, “এই মামা, বৃক্ষমেলায় চলো।” বরাবরই তার বৃক্ষমেলায় ঘুরতে ভীষণ ভালো লাগে। বৃক্ষমেলার কাছেই তার বাসা। রিমা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার এক পরিচিত আত্মীয়র বাসায় ভাড়া থাকে। রিমার গাছ কিনতে খুব ভালো লাগে। সে বিভিন্ন ফুল-ফুলের গাছ গাছ কিনে তার বাড়িতে পাঠায়। এ জন্য তার বাবা খুব খুশি হন। এবারও অনেক চারা কিনল সে। নিজে নিজে কিছু সেলফিও তুলছিল। হঠাৎ পেছনে দেখে রোহান দাঁড়িয়ে আছে। সেলফিতে একসঙ্গে ক্যামেরায় বন্দী হলো দুজনই। রিমা শুধু পেছনে একবার রোহানের দিকে তাকিয়ে সামনের দিকে হেঁটে চলল। রোহান রিমার হাতটা টেনে ধরে বলল- কী ব্যাপার, কিছু না বলে চলে যাচ্ছ যে! এখনো রেগে আছ? আমি সরি বলছি তো! অভিমানে রিমা আরও দ্রুত হেঁটে যেতে লাগল। রোহান তখন বলল- প্লিজ রিমা, কী এমন বলেছিলাম সেদিন, তাতে এত রাগ! দুই থেকে তিন মাস তুমি আমার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখছ না। এসো রিমা, আমরা দুজন একটা চা-স্টলে বসে কিছু খাই আর কথা বলি।   কী কথা বলবে? সেই কথা যে আমি রাত জাগি, রাত জেগে কত গল্প করি!এগুলো বলবে তো? দরকার নেই, তুমি তোমার মতো থাকো, আমি আমার মতো। সামান্য এ কথাতেই তুমি ভুল বুঝেছ? আমি শুধু তোমার বান্ধবী রিতুকে বলেছি যে ঋতু, রিমা যেন রাত না জাগে। ওর শরীর খারাপ করবে, এইটুকু শুধু বলেছি।   আচ্ছা ঠিক আছে, আমি এখন বাসায় ফিরব। আমি অনেক গাছ কিনেছি, ওগুলো নিয়ে ভালো করে রাখতে হবে। পরে কথা হবে। না, আর একটু বসো। তোমার সাথে আমার কথা আছে। তুমি কি জানো আমার চাকরি হয়েছে আর চাকরির জন্য ট্রেনিংয়ে আমি জাপানে যাচ্ছি? রিমা একটু মিষ্টি হেসে বলল- যাক একটা সুখবর শুনতে পেলাম। তা আমাদের মিষ্টি খাওয়াচ্ছ কবে? আর হ্যাঁ, আমি ছুটিতে বাড়িতে যাচ্ছি। খুব ভালো হলো, তাহলে বাড়িতে আমাদের দেখা হচ্ছে কিন্তু। রোহান এবার জিজ্ঞেস করল- চলো না একসাথে যাই?   দেখতে দেখতে কয়কটা দিন চলে গেল এবং বাড়ির দিকে রওনা হলো রিমা ও রোহান। দুজনের বাড়িই পাবনায়। শহর থেকে একটু দূরে পাশাপাশি গ্রামে বসবাস করে। গ্রামের নাম সুবর্ণপুর।   বাড়ি পৌঁছানোর দুদিন পর রোহান ফোন দিল রিমাকে- রিমা, আমার মা-বাবা তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে যাবে। তাই নাকি? তাঁরা আসবেন খুব ভালো কথা, তুমি আসবে না?   আমি আসব এক দিন পরে। রিমা তার মা-বাবার কাছে গিয়ে বলল- মা, আমার বন্ধু রোহানের কথা তোমাকে বলেছিলাম একদিন। তার মা-বাবা আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবেন। অনেক দিন ধরে বলছিল আসবে, তো বিশেষ করে তোমার হাতের বাগান দেখতে। রিমার মা-বাবা বললেন- খুব ভালো কথা আসুক, পরিচিত হওয়া যাবে।   যথাসময়ে রোহানের মা-বাবা এলেন। রোহান একটু মিথ্যে বলেছিল সে আসবে না, কিন্তু সেও এসেছে। রিমা একটু গাল ফুলিয়ে ছিল। রিমার ভাবি মনি বলল- চলো তোমরা আমাদের ঘরে বসবে, গল্প করবে কেমন? আমি চা করে নিয়ে আসি।   এদিকে রোহানের মা-বাবা রিমাদের বিভিন্ন ফল-ফুলের বাগান, পুকুর এগুলো দেখে তো ভীষণ খুশি। তাঁরা সবাই ড্রয়িং রুমে এসে বসলেন। বিকেলে চা খেতে খেতে কথা শুরু হলো। প্রথমে রোহানের বাবা বললেন- আপনাদের মেয়েকে আমাদের খুব ভালো লেগেছে। আমাদের ছেলেকে যদি আপনাদের ভালো লাগে, তাহলে আমরা আত্মীয়তা করতে ইচ্ছুক। একটু শুনেছিলাম যে ওরা দুজন দুজনকে পছন্দ করে। রিমার মা বললেন- হ্যাঁ, রিমা আমাকে বলেছিল রোহানকে তার পছন্দ। আপনারা যখন আমাদের বাড়িতে এসেছেন, আপনাদের ভালো লেগেছে, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। রিমার বাবা বললেন- হ্যাঁ, আমারও কোনো আপত্তি নেই।   রিমার ভাবি দৌড়ে এসে হাসতে হাসতে রিমাকে বলল- হা করো রিমা, হা করো।   রিমা সত্যি সত্যি হা করল। ভাবি বড় একটা রসগোল্লা রিমার মুখে দিয়ে বলল-   হয়ে গেছে।   কী হয়ে গেছে? আশ্চর্য আমি তো কিছুই বুঝলাম না! তারপর ভাবি রোহানকেও মিষ্টি খাইয়ে দিল। রোহান হাসতে হাসতে বলল - ভাবি, আমি বোধহয় এবার মার খাবো, আমি পালাই। বলেই সে রিমাদের ছাদে দৌড়ে চলে গেল। রিমা পিছু পিছু দৌড়ে গিয়ে রোহানকে ডাকতে ডাকতে ছাদে চলে গেল। এরপর বলল-   রোহান, তুমি কি জানো কী হয়েছে?   রোহান বলল- ঢাকা থেকে পৌঁছে রাতে একসঙ্গে খেতে বসে মা-বাবা যখন জানল আমার চাকরি হয়েছে এবং খুব ভালো চাকরি, তখন মা বলল, চাকরি যখন পেয়েছিস, তাহলে এবার একটা বউ নিয়ে আয়। আমি তখন বললাম, তাই? এখন একটা বউ লাগবে? ঠিক আছে বউ ঠিক করা আছে। তোমরা গিয়ে দেখে আসো। এখনই বিয়ে? আমার পড়াশোনাই তো শেষ হলো না এখনো। না না রোহান, এটা তুমি ঠিক করোনি। না না আর দেরি নয়, তুমি পড়াশোনা করো। মা-বাবার ইচ্ছে আমরা পূরণ করি। রোহান একটু দুষ্টুমি করে বলল- কী পাত্রী মশাই, পাত্র কি পছন্দ হয়েছে? রিমা ‘হ্যাঁ’ বলে দৌড়ে নিচে নিজের ঘরে চলে এল। একসঙ্গে সবাই বসে বিয়ের দিন-তারিখও সব ঠিক করলেন। রিমার বাবা রোহানের বাবাকে উদ্দেশ করে বললেন- আমরা তো এখন বিয়ান-বিয়াই হয়ে গেলাম। রিমার বাবা বললেন- আমি একটা কথা বলি বিয়াই সাহেব, যৌতুকের কিছু থাকলে বলেন।   ছি ছি বিয়াই সাহেব, কী বলছেন এসব? আমার কোনো যৌতুক লাগবে না। যৌতুকের কথা বলে লজ্জা দেবেন না।   না না, লজ্জা দেয়ার কিছু নয়। খোলাখুলি কথা বলাই ভালো আমি যদি খুশি হয়ে কিছু দিই, সেটাকে আপনি যৌতুক ভেবে নেবেন না। এটাই আমার অনুরোধ। তাহলে আপনি কি আমাকে যৌতুক দিতে চাচ্ছেন? না না, যৌতুক দেয়া বা নেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। তারপর একদিন অনেক ধুমধাম করে রোহান আর রিমার বিয়ে হয়ে গেল। এবার মেয়েকে বিদায়ের পালা। স্বাভাবিকভাবেই মেয়ের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার সময় বিদায় বেলায় খুশি ও আনন্দময় কান্নায় ভেঙে পড়েন রিমার মা-বাবা। মেয়ে যেন সুখী হয় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে, তাঁদের যেন সুখী করতে পারে, এটাই মা-বাবার একমাত্র চাওয়া। বিয়ের শেষ লগ্নে এসে রোহানের বাবা দেখেন, বড় বড় কয়েকটি কার্টন একটা পিকআপে সাজিয়ে দেয়া হচ্ছে।   রোহানের বাবা কাছে গিয়ে বললেন- বিয়াই সাহেব, এসব কী হচ্ছে? এত বড় বড় কার্টনে কী দিচ্ছেন? আমি আগেই বলেছি যে কোনো যৌতুক নেব না।   রিমার বাবা বললেন- প্লিজ, আমার এই উপহারের জন্য আপনারা রাগ করবেন না। আপনাদের এটা রাখতেই হবে। এসব তেমন কিছু না। রোহানের বাবা নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন- না আমাকে দেখাতেই হবে সেগুলোতে কী আছে! এমনকি কোনোভাবেই রোহানের বাবা কার্টনগুলো নিয়ে যেতে রাজি হলেন না। ঠাই দাঁড়িয়ে থাকলেন। পরে সবার সামনেই রিমার মা-বাবা কার্টনগুলো খুলে দেখালেন।   কার্টনের ভেতরটা দেখে বরপক্ষের সবাই অবাক না হয়ে পারলেন না।  

জুলাই ১৯, ২০২৬ 0
Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

Top week

সাহিত্য

শরৎ

অক্টোবর ২, ২০২৬ 0