বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিপ্লবের ইতিহাস একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী পথচলার প্রতিচ্ছবি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যন্ত, প্রতিটি পর্যায়ে দেশের জনগণ অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছে। দেশের আপামর জনতা গণতন্ত্র, সম্পদের সুষম বণ্টন, মৌলিক অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। এসব আন্দোলন ও সংগ্রামের নারী, শিশুসহ সবার আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা। উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ছাত্র ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে ২১ ফেব্রুয়ারি কয়েকজন শহিদ হন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি এনে দেয়। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ঘোষিত ছয় দফা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরদার করে। এই দাবিগুলো পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে গণহত্যা শুরু হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে নির্বাচনটি অনিয়ম ও বিরোধী দল দমন দ্বারা চিহ্নিত হওয়ার পাশাপাশি দুই বছর আগে যে গণতন্ত্র ও পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য এত জীবনের নস্যাৎ করা হলো। একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার আর একটি দলের কাছে পরাজিত হলো কাঙিক্ষত স্বাধীনতা। সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে তৈরি করা হয় রাষ্ট্রীয় গুণ্ডাবাহিনী, যার নাম রক্ষীবাহিনী। এই বাহিনী দেশের স্বাধীনতাকামী, গণতন্ত্রকামী, মুক্তিকামী মানুষের কাউন্টার পার্ট হিসেবে অবস্থান নেয়। তিন বছরে এদের হাতে হাজার হাজার মানুষ হত্যার শিকার হয়। সে সময়ের সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল জাসদ, ভাসানী সমর্থিত দল ও নকশাল। এ প্রসঙ্গে আবু জাফর মোস্তফা সাদেক তাঁর ‘বৈপ্লবিক প্রেক্ষাপটে কমরেড সিরাজ সিকদার’ গ্রন্থে রক্ষীবাহিনী, মুজিববাদী ও আওয়ামী লীগারদের হাতে নিহত কিছু অংশের একটি ছোট তালিকা প্রকাশ করেন। তিনি লিখেছেন, “পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) প্রায় ১৩৯ জন শহিদ হন।” জাসদের ইনুকে শহিদের তালিকা দিতে বললে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্মরণশক্তি থেকে ৪৪ জনের নাম তুলে ধরতে পারেন। সে সময় সবচেয়ে জঘন্য ও আলোচিত ঘটনা ছিল কমরেড সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ড। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জাসদ নেতা মেজর এম এ জলিল ভারতের আগ্রাসন ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলায় তাঁকে কোনো উপাধি তো দেয়া হয়নি, বরং তাঁকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় যশোর সেনানিবাসে একটি নির্জন বাড়িতে আটকে রাখা হয়। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। সামরিক ট্রাইবুনালে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য জলিলকে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলেও কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়া হয়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে বিয়োগান্তক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে তাঁর হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন শুরু হয়। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। যদিও পরবর্তীকালে জাতিকে আশাহত হতে হয়। ১৯৯৬ সালে নির্বাচন বাতিল ও নতুন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করে, তবে ২০০৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের কারণে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসন করে। এ সময়ে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল যে সরকার ফ্যাসিবাদী নীতিতে পরিচালিত হয়েছে। একদলীয় শাসন, বিরোধী দলগুলোর প্রতি অত্যাচার, বাকস্বাধীনতাসহ সব মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ, গুম, হত্যা, আয়না ঘরের কার্যক্রম, যা টর্চার সেল হিসেবে ভীতির সৃষ্টি করে। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত, শাপলা চত্বরে আলেমসমাজকে রাতের আঁধারে নৃশংস হত্যা ও লাশ গুম করে গণকবর দেয়া হয়। নির্বাচনের নামে প্রহসন, রাতের আঁধারে ভোটের রেজাল্ট, নির্বাচন ছাড়াই ২০১৩ সালে ১৫৬ জন সাংসদের বিজয়, লুট, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বিদেশে অর্থ পাচারসহ এমন কোনো অপরাধ নেই, যা সংগঠিত হয়নি। ৭ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঢাকায় গণপরিবহন বন্ধ এবং রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি চালায় এবং পরবর্তী সময়ে সারা দেশে অবরোধ কর্মসূচি দেয়া হয়, যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি নামে পরিচিত। বাংলা ব্লকেড চলাকালীন রাজধানীতে শুধু মেট্রোরেল চালু ছিল। পরবর্তী দিনগুলোতেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একই কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ও পুলিশি হামলার শিকার হয়। ১৪ জুলাই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকায় গণপদযাত্রা করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে। এদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এক বক্তব্যে কোটা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি” হিসেবে অভিহিত করেন, প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ব্যঙ্গ করে ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার’ এবং ‘চাইতে গেলাম অধিকার; হয়ে গেলাম রাজাকার’ স্লোগান দেয়। এর পরের দিন ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, মন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নষ্ট করার অভিযোগ আনেন। ১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “গত রাতে বিক্ষোভ করে আমরা সোমবার ১২টার প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি।” পরবর্তী দিনগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলন চলে। ১৭ জুলাই রাতে তারা ১৮ জুলাইয়ের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা করে। এই আন্দোলনে হাসিনা সরকার নৃশংসভাবে প্রায় ১৪০০ নিরস্ত্র ছাত্রদের হত্যা করে এবং গণহত্যার দায়ভার এড়াতে ৫ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে সেনাবাহিনীর স্পেশাল বিমানে করে ভারতে পালিয়ে যায়। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পতিত হয় এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দিনশেষে দেখা গেল, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার রাজনৈতিক সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে চাপের মুখে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজেকে সবচেয়ে বেনিফিশিয়ারি হিসেবে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার জীবন ও শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা হারিয়ে গেল সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। দুই শত বছর ধরে বাঙালির সাম্য ও ন্যায্যতার রাষ্ট্রের সোনার হরিণ হাতের নাগালের বাইরে রয়ে গেল আজও।
নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। সবাই জানেন, গণবিপ্লবের আকাশচারী স্বপ্নসুখময়তা বিপ্লবীদের আলিঙ্গন করে। সমাজবিজ্ঞানের মৌলনীতি অধ্যয়নে এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার গণমানুষের ইচ্ছাকে দমন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছিল। সত্যানুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই উপসংহার বলে, সিংহভাগ মানুষ ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। যার অনিবার্য পরিণতি মেয়াদ পূর্তির পূর্বেই ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষিত স্বাদুপানি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের বিষাক্ততায় পান করার উপযোগিতা হারায়। ক্ষমতার রাজমসনদে অধিষ্ঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কার্যকর সংবিধানের আইনগত অনেক প্রশ্নের উত্তর নীরব থাকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের মেয়াদকালে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে অনেক অধ্যাদেশ জারি করে। তার মধ্যে অন্যতম হলো জুলাই সনদ ও গণভোট-সম্পর্কিত অধ্যাদেশ। বৈধ ও সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে জারি করা অধ্যাদেশ দুটি আইনি মর্যাদার দিক থেকে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়নি। সংবিধান সংস্কার কমিশনের বৈঠক চলাকালে জুলাই বিপ্লবের অংশীদার দলগুলো একমত পোষণ করে যে, আগের সংবিধান অবশ্যই সংশোধন করতে হবে । দীর্ঘ সময়ের বৈঠক, আগত প্রস্তাব ও মতামত আলোচনা ও পর্যালোচনা শেষে কাঙ্ক্ষিত জুলাই সনদ উপদেষ্টা পরিষদের কাছে গৃহীত হয়। একই সাথে গণভোট বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দল আপত্তি উত্থাপন করেনি। বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাসে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও হ্যাঁ ভোটের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠিত সেই ভোটে সরকার গঠনের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং সাধারণ মানুষ গণভোটের পক্ষে তাঁদের মতামত প্রকাশ করেন। সেই নির্বাচনের ফলাফল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে এবং ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের ১৫৩ অনুচ্ছেদের প্রদত্ত সংজ্ঞানুসারে বৈধ কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত গেজেট সরাসরি আইনি মর্যাদা লাভ করে। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। তাঁর নির্বাচনে কোনো ভোট হয়নি। সাংবিধানিভাবে একজন রাষ্ট্রপতির মর্যাদা, দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতার পরিধি কতটুকু এবং পদটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ কি না, তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বাস্তবিক পক্ষে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে কি না, তা আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের ঋণনির্ভর অর্থনীতির আলোকে সমাধান হওয়া জরুরি ছিল। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দেউলিয়াপনায় বিপর্যস্ত জনজীবনে এই বিতর্ক বাস্তবেই কোনো প্রভাব ফেলবে না, তা বোঝার জন্য বিদ্যাসাগর হওয়ার প্রয়োজন নেই । গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকথা এখনো জাতির জীবনে সম্মিলিত স্মৃতিশক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাষ্ট্র সংস্কারের মহতী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ পরিবর্তন চেয়ে একটি সফল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী রাজচৌকির বিরুদ্ধে নিরস্ত্রহীন অবস্থায় রুখে দাঁড়িয়েছিল। যেকোনো জাতির সম্মিলিত মেধাকে প্রতারণা করার স্পর্ধা যুগে যুগে কালে কালে শাসকগোষ্ঠী করেছে, এর স্বপক্ষে ঐতিহাসিক সূত্র ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। বিপ্লবের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত নির্বাচন প্রচলিত সংবিধান মেনে হয়নি। যে সংবিধান ফ্যাসিবাদকে উৎসাহিত করে, সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা ফৌজদারি অপরাধ না হলেও অন্তত অন্যায় বলা অযৌক্তিক হবে না। এ মাসের ২০ তারিখে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। শাসক দল থেকে একজন এবং সম্মিলিত বিরোধী দল থেকে একজন প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করছেন। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই বলা যায়, শাসক দলের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যে দল অধিষ্ঠিত হয়েছে, জাতীয় ইস্যুতে সবাই সংবিধানের দোহাই দিয়ে থাকে। অস্তিত্বশীল সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দল থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত প্রার্থী ছাড়া অন্য ব্যক্তিকে ভোট দিতে পারেন না। ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে এই অনুচ্ছেদ জাতীয় জীবনে কী শুভফল বয়ে নিয়ে এসেছে এবং এই অনুচ্ছেদের আসল বার্তা কী, তা আজও অন্ধকারের অমাবস্যা তিথিতে আত্মগোপন করে আছে। জুলাই সনদের মাধ্যমে ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থে সবাই একমত হয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদটি বিরোধী দলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। আমাদের অধ্যয়ন বলে, রাষ্ট্রপতি পদ রাষ্ট্রীয় কোনো নির্বাহী পদ নয়। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে সে পদের আইনগত কোনো কর্তৃত্ব নেই। শাসক দল এই পদও নিজেদের আয়ত্তে রাখতে চায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে গণভোট বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হবে না। জুলাই সনদও আলোর মুখ দেখবে না। পুরোনো বন্দোবস্তে ফিরে যাবে দেশ। ইতিহাসের অভিমানী অধ্যায় শাসকগোষ্ঠীকে তিরস্কার করবে। রক্তগহ্বর থেকে বেরিয়ে আসবে আবার কোনো বিপ্লবী স্লোগান। অদূর ভবিষ্যতে কোনো দুঃখবালিকার প্রেমপত্র হয়তো আমাদের জাতিসত্তার নিদ্রাকাতর ফুলশয্যার রাতে আশার বাণী শোনাবে। হাজারও রক্তলালপট্টির আত্মত্যাগ আপাতত কোনো আশার আলো দেখাচ্ছে না, তা অবলীলায় বলা যায়।
বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। স্বাধীন মতপ্রকাশ গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ শুধু নিজের মত বলার অধিকার নয়, বরং অন্যের ভিন্নমত শোনার ও সহ্য করার মানসিকতাও। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন আসে, সরকার বদলায়, নতুন নেতৃত্বের প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে : রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি সত্যিই বদলায়? ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচনের পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘাত, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা ও প্রতিহিংসার অভিযোগ সামনে এসেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র রাজনৈতিক দলগুলোকে পাল্টাপাল্টি সহিংসতা বন্ধে এবং কর্মীদের সংযত রাখার আহ্বান জানিয়েছিল। এই বাস্তবতা আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় : আমরা কি সত্যিই মতের ভিন্নতা সহ্য করতে শিখেছি? প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, আমাদের প্রত্যেকের জন্য। কারণ, অসহিষ্ণুতা এখন শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যঘর, টেলিভিশনের আলোচনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, এমনকি পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরেও দৃশ্যমান। কেউ নিজের পছন্দের দলের সমালোচনা করলে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়, আবার প্রতিপক্ষের কোনো ভালো উদ্যোগ স্বীকার করলেও তাকে ‘ওদের লোক’ বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, তথ্যের পরিবর্তে অপপ্রচার এবং রাজনৈতিক বিতর্কের পরিবর্তে চরিত্র হনন যেন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। সমস্যার জায়গাটি এখানেই। আমরা অনেক সময় মতের বিরোধিতাকে ব্যক্তির বিরোধিতা হিসেবে দেখি। একজন মানুষ আমার রাজনৈতিক মতের সঙ্গে একমত নন, এর অর্থ এই নয় যে তিনি আমার শত্রু। তিনি আমার ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন, আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে পারেন, এমনকি আমার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানেও দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু তার সেই অবস্থান প্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করা গণতান্ত্রিক মানসিকতার পরিচয় নয়। গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় নয়; বরং যে মতটি নিজের কাছে অস্বস্তিকর, সেটিকেও প্রকাশের সুযোগ দেয়ার মানসিকতায়। নিজের পছন্দের মতকে স্বাধীনতা দেয়া সহজ, কিন্তু নিজের বিপরীত মতের অধিকারকে সম্মান করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রকৃত পরীক্ষা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মতপার্থক্য আমাদের রাজনীতির নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, আদর্শ ও সংগঠনের মধ্যে তীব্র বিরোধ ছিল। কিন্তু ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও বৃহত্তর গণতান্ত্রিক স্বার্থে বিভিন্ন পক্ষ কখনো কখনো একই জায়গায় দাঁড়াতে পারে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের মধ্যে গভীর মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলন স্বৈরশাসনের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক শত্রুতা এক বিষয় নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু শত্রুতা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্বাচনে পরাজিত করা যায়, তার নীতির সমালোচনা করা যায়, তার রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করা যায়। কিন্তু তাকে কথা বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, ভয় দেখানো বা প্রতিশোধের শিকার করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হতে পারে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও আমাদের এই শিক্ষা নতুন করে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির হিসাবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ১,৯৩৩ জন আহত হয়েছেন; তাদের হিসাবে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ছিল ৩৪৬টি। অন্যদিকে নির্বাচনের পরও বিভিন্ন এলাকায় প্রতিশোধমূলক হামলার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ব্যালট বাক্সে ভোটের প্রতিযোগিতা শেষ হলেও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি অনেক সময় শেষ হয় না। গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক ভিত্তিও আমাদের একই কথা বলে। গণতন্ত্র মানে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে বহুত্ববাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু মতের অধিকার, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সবাই একই মত পোষণ করবে, এমনটি কখনোই সম্ভব নয়। বরং ভিন্ন মতের মানুষ একই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করবে, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। রাজনৈতিক সহনশীলতার অর্থ এই নয় যে আমাকে আপনার মতের সঙ্গে একমত হতে হবে। এর অর্থ হলো, আমি আপনার মতের বিরোধিতা করব, কিন্তু আপনার মতপ্রকাশের অধিকারকে অস্বীকার করব না। আমি আপনার যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেব, আপনার বক্তব্যের জবাব তথ্য দিয়ে দেব এবং প্রয়োজন হলে নির্বাচনের মাধ্যমে আপনাকে পরাজিত করার চেষ্টা করব। কিন্তু আপনাকে নিশ্চুপ করে দেয়ার চেষ্টা করব না। এই জায়গাটিই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ, অসহিষ্ণুতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় রাষ্ট্রের। যখন মানুষ ভিন্নমত প্রকাশ করতে ভয় পায়, তখন ভুল নীতি নিয়ে প্রশ্ন করার মানুষ কমে যায়। সরকার নিজের ভুল দেখতে পায় না, রাজনৈতিক দল নিজেদের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারে না এবং সমাজে একটি কৃত্রিম নীরবতা তৈরি হয়। অথচ গণতন্ত্রের শক্তি নীরবতায় নয়, মুক্ত বিতর্কে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। প্রযুক্তি মানুষকে কথা বলার অভূতপূর্ব সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে তৈরি করেছে দ্রুত অপমান, গুজব ও মেরুকরণের সুযোগও। কোনো বক্তব্য পছন্দ না হলেই তার বক্তব্যের যুক্তি খণ্ডন করার পরিবর্তে ব্যক্তিকে আক্রমণ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় মানুষের বিচারবোধকে এমনভাবে প্রভাবিত করছে যে একই ঘটনা নিজের দলের ক্ষেত্রে একভাবে এবং প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই সংস্কৃতি বদলাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকেই প্রথমে এগিয়ে আসতে হবে। দলের ভেতরে ভিন্নমতকে জায়গা দিতে হবে। কর্মীদের বোঝাতে হবে, প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল মানেই শত্রু নয়। নির্বাচনে বিজয় মানে প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নেয়ার লাইসেন্স নয়। একইভাবে বিরোধী দলকেও বুঝতে হবে, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করাই দায়িত্ব নয়; ভালো উদ্যোগের প্রশংসা করাও রাজনৈতিক পরিপক্বতার অংশ। ক্ষমতায় থাকলে যে অধিকার নিজের জন্য দাবি করা হয়, বিরোধী দলে থাকলেও সেই অধিকার অন্যের জন্য স্বীকার করার নৈতিকতা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৈরি করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যদি শুধু নিজের পক্ষের জন্য হয়, তাহলে সেটি স্বাধীনতা নয়; সেটি সুবিধাবাদ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে আইন প্রয়োগের সুযোগ থাকলে অসহিষ্ণুতা আরও বাড়বে। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। আবার কেবল মতপ্রকাশের কারণে কাউকে হয়রানি করা যাবে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। সংবাদমাধ্যম যদি রাজনৈতিক বিতর্ককে কেবল পক্ষ-বিপক্ষের লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করে, তাহলে মেরুকরণ আরও বাড়ে। বরং তথ্য যাচাই, যুক্তির মূল্যায়ন এবং ভিন্ন মতকে জায়গা দেয়ার মাধ্যমে গণমাধ্যম রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। সবশেষে প্রশ্নটি আমাদের নিজেদের কাছেও। আমরা কি কেবল নিজের কথা বলার অধিকার চাই, নাকি অন্যের কথা বলার অধিকারও রক্ষা করতে প্রস্তুত? আমরা কি নিজের দলের ভুল স্বীকার করতে পারি? প্রতিপক্ষের ভালো কাজের প্রশংসা করতে পারি? রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে একজন মানুষকে একজন নাগরিক হিসেবে দেখতে পারি? গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই নয় যে সবাই একই কথা বলবে। বরং সৌন্দর্য হলো, ভিন্ন মানুষ ভিন্ন কথা বলেও একই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে পাশাপাশি থাকতে পারে। মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, বরং গণতন্ত্রের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। দুর্বলতা তখনই শুরু হয়, যখন আমরা ভিন্ন মতকে সহ্য করতে না পেরে ভিন্নমতের মানুষটিকেই শত্রুতে পরিণত করি। বাংলাদেশে সরকার বদলাতে পারে, রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে পারে, নতুন প্রজন্ম রাজনীতিতে আসতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি না বদলালে পুরোনো সমস্যাগুলো নতুন নামে ফিরে আসবে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি শুধু কে ক্ষমতায় আছে, তা নয়; ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষের অধিকারও আমরা কতটা সম্মান করি, সেটি নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা ব্যালট বাক্সে নয়, আমাদের আচরণে। আমি আমার মতপ্রকাশের অধিকার চাই, কিন্তু আমার বিপরীত মতের মানুষটির অধিকারও কি আমি রক্ষা করতে প্রস্তুত? এ প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা সত্যিকার অর্থে ‘হ্যাঁ’ করতে পারি, তাহলেই হয়তো বলা যাবে, আমরা শুধু গণতন্ত্রের কথা বলতে শিখিনি, গণতন্ত্রের সংস্কৃতিও শিখতে শুরু করেছি।
গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো স্বাধীন গণমাধ্যম। আর সেই গণমাধ্যমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে অবহেলিত অংশ হলো মফস্বল সাংবাদিকতা। রাজধানীর বাইরে জেলা-উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকরাই সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, দুর্যোগ, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং উন্নয়নের বাস্তব চিত্র জাতির সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, যাঁরা সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করেন, তাঁদের জীবনই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিতে আবদ্ধ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয় খোঁজেন, তখন একজন মফস্বল সাংবাদিক ছুটে যান ঘটনার কেন্দ্রস্থলে। নিজের নিরাপত্তা, পরিবার কিংবা ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেন; যাতে মানুষ সঠিক খবর জানতে পারে। গুজব থেকে দূরে থাকে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে। এই দায়িত্ববোধই সাংবাদিকতাকে একটি মহান পেশায় পরিণত করেছে। তবে দুর্যোগের সংবাদ সংগ্রহের চেয়েও কঠিন কাজ হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ করা। একজন মফস্বল সাংবাদিক যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কিংবা স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে শুরু হয় নানা ধরনের চাপ। কখনো হুমকি, কখনো সামাজিক অপপ্রচার, কখনো শারীরিক হামলা, আবার কখনো মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমে তাঁকে নীরব করার চেষ্টা করা হয়। এতে শুধু একজন সাংবাদিক নন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকারও। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মফস্বল সাংবাদিকের নেই নিয়মিত সম্মানী, নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা কিংবা ঝুঁকির সময় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। দীর্ঘদিন একটি সংবাদমাধ্যমের হয়ে কাজ করেও অনেক প্রতিনিধি প্রয়োজনের সময় নিজেকে একা মনে করতে থাকেন। পাশে থাকে না প্রতিষ্ঠান। প্রভাবশালীদের চাপের মুখে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রতিনিধিকেই দূরে সরিয়ে দেয়। এই প্রবণতা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অশনিসংকেত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে অভিযোগ তদন্ত করা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটিও আইনের আলোকে যাচাই হওয়া উচিত। একইভাবে সাংবাদিকের ওপর হামলা, হুমকি কিংবা মিথ্যা মামলার অভিযোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। আইনের চোখে সবাই সমান। এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই পারে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে। মফস্বল সাংবাদিকরা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নন, তাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। তাঁদের কলমের মাধ্যমে উঠে আসে অবহেলিত মানুষের কথা, জনস্বার্থের প্রশ্ন এবং রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতি। তাই তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা কেবল সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নাগরিক সমাজ এবং সর্বোপরি পুরো জাতির দায়িত্ব। সত্যকে সাময়িকভাবে চাপা দেয়া যেতে পারে, কিন্তু পরাজিত করা যায় না। তাই মফস্বল সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে নয় বরং তাঁদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করেই জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।