যেদিন আমি প্রথম পিরিয়ডের সাথে পরিচিত হই, বয়সটা তখন হবে নয় বছর মাত্র। ক্লাস ফোরে পড়ার সময় এই অবস্থা! আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। পরিবারের লোকজনও প্রত্যাশা করতে পারেনি। সেদিন আমি স্কুলে ছিলাম। স্কুলের ম্যাডাম বেঞ্চে রক্তের দাগ দেখে জিজ্ঞেস করলেন এখানে বসেছিল কে? আমি বললাম, আমি বসেছি। আমি বেঞ্চ চেঞ্জ করে বসেছিলাম। ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল। প্রথম বেঞ্চ থেকে সেকেন্ড বেঞ্চে গেলাম। রক্ত দেখে বুঝিনি সে কারণে। আমার সাথে অন্য মেয়েরা বসে ছিল। কিন্তু প্রথম বেঞ্চে রক্তের দাগের কারণে আর কেউ বসেনি। ম্যাডাম আমাকে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন ম্যাডাম আমাকে বাসায় পাঠালেন। একটা ছোট্ট চিরকুট লিখে দিলেন আমার গার্ডিয়ান বরাবর। বাসায় পৌঁছানোর পর আমার গার্ডিয়ান কাগজটা পড়ে আমার দিকে তাকালেন। এরপর আমার পোশাক সব চেঞ্জ করালেন এবং একটা কাপড় বিশেষ জায়গায় পড়তে দিলেন। বুঝতে পারছিলাম না। বুঝিয়ে দিলেন। এর পরও বুঝছিলাম না। পরে তিনিই পরিয়ে দিলেন। এই অসময়ে এভাবে পিরিয়ডের মুখোমুখি হাওয়ায় আমাকে ডাক্তারের কাছে পর্যন্ত নিতে হয়েছে। প্রায়ই আমার জ্বর আসত এবং ব্যথাও করত। ডাক্তার দেখে বলেছেন স্বাভাবিক আছে। যদিও ডাক্তার তখন ব্যাপারটা প্রত্যাশিত নয় বলেছেন। তিনি কিছু ওষুধ লিখে দেন। আমার যতটুকু মনে পড়ছে এই হলো নিজের জীবনের সংক্ষিপ্ততা। নিজের জীবনের একটা ধাপের পর অনেক বছর পর একদিন আমি স্কুলের জব শেষে বাসায় ফিরছিলাম। আমি যে পথ দিয়ে হাঁটি, সেটা সাধারণত নীরব থাকে। মানুষজনের চলাফেরা তেমন একটা থাকে না ওই পথ দিয়ে। আমার বাসার পথ এখান দিয়ে কাছে; সে জন্যই আমি ওই পথে আসতাম। আমি যখন হাঁটছি, আমার সামনে জেলার সরকারি স্কুলের একটি মেয়েকে দেখতে পাই। ড্রেস দেখে চিনি আর কি। কিন্তু একটু কাছাকাছি যেতেই দেখি মেয়েটির সাদা সালোয়ারটি রক্তে ভেজা এবং পা দিয়েও রক্ত পড়ছে। পেছনে জামাতেও প্রচুর রক্ত লেগে আছে। খেয়াল করে দেখলাম মেয়েটি কাঁদছে। আশপাশে দু-একটা রিকশা ও মানুষ হেঁটে যাচ্ছে এবং মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে। আমি মেয়েটির আরও অনেক কাছে চলে গেলাম দ্রুত। গিয়ে ওকে দাঁড় করালাম। আমি বললাম, তুমি কাঁদছ কেন? আর তোমার এ অবস্থা কেন? তখন মেয়েটি কাঁদতে থাকে। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কোন ক্লাসে পড়ো? ও বলে এইটে। কিছু কথা বলার পর আমি যা বোঝার বুঝে যাই। ওর মা ওকে রিকশার ভাড়া প্রতিদিন দেয়। আজ টাকা হারিয়ে ফেলেছে। তার ওপর এই অবস্থা! ও খুব অস্বস্তি পাচ্ছে বুঝলাম। টাকা না থাকায় রিকশা দিয়ে যেতে পারছিল না। তাই আরও দেরি হয়ে গেছে বুঝলাম। স্কুলে সম্ভবত ব্যাপারটা কেউ খেয়াল করেনি। একটা দোকান থেকে পানি নিয়ে ওকে খাওয়াই, রিকশা ডাকি। আমি তখন আমার বাসার কাছে চলে এসেছিলাম। আমার বাসার কাছ থেকে মেয়েটিকে রিকশায় তুলে ওর বাসার ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে ওকে নিয়ে চললাম ওর বাসায়। ওখানে পৌঁছে ওর মা-বাবার হাতে ওকে বুঝিয়ে দিই। আর রিকশাওয়ালাকে কিছু টাকা দিই, যাতে তিনি রিকশা ধুয়ে ফেলেন। কারণ, রিকশায় পিরিয়ডের দাগ লেগে গিয়েছিল এবং নিচেও পড়েছিল। রিকশাওয়ালা মধ্যবয়সী, সে জন্য সব বুঝতে পেরেছিল। তার পরও একটু রাগান্বিত ছিল; ঘ্যান ঘ্যান করছিল। আমি তাকে বুঝিয়ে চলে যেতে বলি। মেয়েটির মা-বাবার সাথে কথা বলি এবং মেয়েটির জন্য একটি সেনোরা প্যাড ওদের বাসার সাথে ডিসপেনসারি থেকে আনি। কিন্তু মেয়েটির দাদি আমাকে বাধা দেয়। আমি তার দাদিকে ও মাকে বোঝাতে সক্ষম হই এবং বলি, প্রতি মাসে যদি আপনারা প্যাড কিনতে না পারেন, তাহলে আমাকে বলবেন। আমি কিনে দেব। তখন মেয়েটির বাবা বলল, “না আপা, আপনি আজ অনেক উপকার করেছেন। লাগবে না। আমি প্রতি মাসে কিনে নিয়ে আসব আমার মেয়ের জন্য।” তখন মা আর দাদি কিছু বলল না। তাদেরকিছু স্বাস্থ্যসম্পর্কিত টিপস এবং এটার প্রয়োজনীয়তা বোঝাই। মেয়েটির পরিবারের সাথে আমার সখ্য ও যোগাযোগ ছিল দীর্ঘদিন। মেয়েটির ২১ বছর বয়সে বিয়ে হয়। বিয়ের আগে ছেলের সম্পর্কে বিস্তারিত জানায় আমাকে। তখন আমি বলি, তাহলে বিয়ে দেয়া যায়। তা ছাড়া মেয়েটির মধ্যেও যথেষ্ট ম্যাচুরিটি এসেছিল এবং সবকিছুই বুঝত, জানত। মেয়েটির এখন দুই সন্তান। সুখী জীবন যাপন করছে। একটি জেলা শহরে সম্ভবত তখন আমি এই ট্যাবুটা ভেঙেছি, কারণ তার মা-বাবা ও দাদি প্রায় জায়গায় আমার কথা বলত কীভাবে তাদের মেয়েকে রাস্তা থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম আর প্যাডের কাহিনি, মেয়ের বাপের সামনে বলা, রিকশাওয়ালাকে ম্যানেজ করা। তখন আমি নিজের মাঝে নিজে খুব আত্মতৃপ্তি পাই ঘটনাটি মনে করলে। আমার সময়ে আমি স্বাস্থ্য বার্তা সম্পর্কে জানতাম না। কেউ আমাকে জানায়নি। পরে মায়ের কাছে জেনেছি। পিরিয়ডের শুরুতে মা ছিল গ্রামে। আমি ঢাকায়। প্রতি মাসে পিরিয়ডের যন্ত্রণা ও কাজগুলো আমাকে খুবই প্যারা দিত। কাপড় ধোয়া, বাথরুমে শুকাতে দেয়া। বাথরুমে ওপরের দড়িতে নাগাল পেতাম না। সবার সামনে থেকে টুল এনে বারবার বাথরুমে যেতাম ২০ মিনিট পরপর। কাপড় শুকাত না। শুতে ভয় পেতাম। পরে যদিও বারান্দায় শুকানোর ব্যবস্থা করা হয়। তাতেও ছিল সমস্যা। দূরে থেকে মানুষ মনে হয় যেন তাকিয়ে থাকত কিছু একটা শুকাতে দিচ্ছি। এই মেয়েটির উপকারটা যখন আমি করি, সেদিনও মনে পড়ছিল নিজের জীবনের কাহিনিগুলো। আজ এখানে লিখতে পেরে অনেক ভালো লাগছে।
সাহিদা সাম্য লীনা
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
ব্যথা হলে সাধারণত ওষুধের কথাই প্রথমে মনে আসে। কিন্তু মানুষের শরীরের ভেতরেও রয়েছে ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব একটি ব্যবস্থা। এর সঙ্গে জড়িত এন্ডোজেনাস ওপিওয়েড, যার মধ্যে বিটা-এন্ডরফিন অন্যতম। ব্যায়াম, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম এবং শরীরের নানা জৈবিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে। তবে ‘ব্যায়াম করলেই শরীরে এন্ডরফিন বেড়ে গিয়ে সব ব্যথা চলে যায়’ এমন ব্যাখ্যা পুরোপুরি সঠিক নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ব্যায়ামের পর ব্যথা কম অনুভূত হওয়ার পেছনে এন্ডরফিনের পাশাপাশি এন্ডোক্যানাবিনয়েড, সেরোটোনিন, নরঅ্যাড্রেনালিন এবং মস্তিষ্কের ব্যথা-নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুপথও কাজ করে। ব্যায়ামের পর সাময়িকভাবে ব্যথার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় Exercise-Induced Hypoalgesia (EIH) বলা হয়। অর্থাৎ ব্যথার উৎস পুরোপুরি চলে না গেলেও মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র সেই ব্যথাকে কিছুটা কম তীব্র হিসেবে অনুভব করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের সময় শরীরের endogenous opioid system সক্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে, পর্যাপ্ত সময় ও তীব্রতার ব্যায়ামে বিটা-এন্ডরফিনসহ endogenous opioid-এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে শুধু এন্ডরফিনই এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ এমন প্রমাণ নেই। বরং ব্যায়ামের সময় মস্তিষ্কের descending pain modulation system সক্রিয় হয়। এই ব্যবস্থা মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্তরে ব্যথার সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে endocannabinoid system-ও সক্রিয় হতে পারে। ফলে ব্যথা অনুভবের পাশাপাশি উদ্বেগ, স্ট্রেস ও মানসিক অস্বস্তির মাত্রাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। এ কারণেই দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার বদলে নিয়মিত ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী শারীরিক সক্রিয়তা অনেকের জন্য ব্যথা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক ব্যথার ক্ষেত্রে ব্যায়ামকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ, কোন ধরনের ব্যায়াম, কতটা তীব্রতা এবং কোন রোগীর ক্ষেত্রে কতটা উপকারী হবে, তা ব্যক্তি ও রোগভেদে আলাদা। সাম্প্রতিক একটি umbrella review-তেও exercise-induced hypoalgesia নিয়ে প্রমাণকে পুরোপুরি একরকম বা নিশ্চিত বলা হয়নি। শুধু ব্যায়াম নয়, খাবারের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক। এখানে আসে পুষ্টির বিষয়টি। খাবার সরাসরি ‘এন্ডরফিনের ওষুধ’ হিসেবে কাজ করে এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যাভ্যাস শরীরের প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং শরীরের ওজনকে প্রভাবিত করতে পারে; আর এগুলোর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সম্পর্ক রয়েছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও meta-analysis-এ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় whole-food dietary intervention নিয়ে ৪৩টি গবেষণাগোষ্ঠী বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে সামগ্রিকভাবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যথা কমার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কোনো একটি নির্দিষ্ট ডায়েটকে সবার জন্য সবচেয়ে কার্যকর বলা যায়নি। গবেষকেরা খাদ্যের গুণমান, পুষ্টিঘনত্ব এবং ওজন ব্যবস্থাপনাসহ একাধিক বিষয়কে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ব্যথার সম্পর্ক নিয়ে অন্য একটি systematic review-তেও একই ধরনের সতর্কতা পাওয়া যায়। ২০টি observational study-এর মধ্যে অর্ধেক গবেষণায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে Mediterranean-type dietary pattern-এর সঙ্গে কম ব্যথার সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে বেশির ভাগ গবেষণা observational হওয়ায় কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না। সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের আরও একটি systematic review এবং meta-analysis-এ ৩৩টি randomized controlled trial এবং ৩,৪৭৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে Mediterranean diet কিছু প্রদাহ-সম্পর্কিত biomarker যেমন hs-CRP, IL-6 ও IL-17—কমাতে পারে। তবে সব inflammatory marker-এ একই ধরনের পরিবর্তন পাওয়া যায়নি। ব্যথা কমানোর জন্য খাদ্যের সামগ্রিক মানের দিকে নজর দেয়া বেশি যুক্তিযুক্ত। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম ও বীজ, মাছ এবং পরিমিত স্বাস্থ্যকর চর্বি এ ধরনের nutrient-dense খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ultra-processed খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিনির্ভর খাদ্য কমানো উপকারী হতে পারে। তবে পুষ্টি দিয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ এখনো সব রোগের ক্ষেত্রে সমান শক্তিশালী নয়। বিশেষ করে, নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো restrictive diet শুরু করা উচিত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮–৬৪ বছর বয়সী সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে ১৫০–৩০০ মিনিট moderate-intensity aerobic activity, অথবা ৭৫–১৫০ মিনিট vigorous-intensity activity করার পরামর্শ দেয়া হয়। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুদিন major muscle groups নিয়ে muscle-strengthening exercise করার কথা বলা হয়েছে। যারা বর্তমানে খুব কম সক্রিয়, তাদের অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় ও তীব্রতা বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়। অর্থাৎ ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পুষ্টি, ঘুম ও স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা সবকিছু মিলিয়েই শরীরের pain-modulation system-কে সহায়তা করা সম্ভব। এন্ডরফিন মানুষের শরীরে থাকা একটি জটিল জৈবিক ব্যবস্থার অংশ। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা শরীরকে শুধু শক্তিশালী করে না; ব্যথা, স্ট্রেস ও অনুভূতির সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। আর সেই প্রক্রিয়ায় ভালো খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও পুষ্টি জোগায়। তবে নতুন, তীব্র, ক্রমাগত বাড়তে থাকা বা কারণ-অজানা ব্যথাকে শুধু ‘এন্ডরফিনের অভাব’ মনে করে উপেক্ষা করা উচিত নয়। ব্যথা কখনো কখনো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও হতে পারে।
রাইসা মেহজাবীন
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
কোষ্ঠকাঠিন্য খুবই সাধারণ একটি হজমের সমস্যা। তবে এটি নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। এসব ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় সঠিক ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, কোষ্ঠকাঠিন্য সম্পর্কে প্রচলিত পাঁচটি ভুল ধারণা সম্পর্কে জানা জরুরি। বেশি ফাইবার খেলেই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হবে : কোষ্ঠকাঠিন্য হলে অনেকে মনে করেন, বেশি আঁশযুক্ত খাবার খেলেই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা ঠিক নয়। পর্যাপ্ত ফাইবার না খাওয়া কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি কারণ হতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন : মানসিক চাপ, হরমোনের সমস্যা, অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচলে সমস্যা, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, থাইরয়েডের সমস্যা এবং খাদ্য অসহিষ্ণুতা।তাই হঠাৎ করে অনেক বেশি ফাইবার খাওয়া সব সময় উপকারী নয়। দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া উচিত। প্রতিদিন মলত্যাগ হলে কোষ্ঠকাঠিন্য নেই : প্রতিদিন মলত্যাগ করলেই যে কোষ্ঠকাঠিন্য নেই, এমন নয়। মলত্যাগের সময় বেশি চাপ দিতে হলে বা মল শক্ত, শুকনো ও দলাযুক্ত হলে সেটিও কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ হতে পারে। আবার মলত্যাগের পরও যদি মনে হয় পুরোপুরি মল বের হয়নি, সেটিও কোষ্ঠকাঠিন্যের একটি লক্ষণ হতে পারে। তাই শুধু কতবার মলত্যাগ হচ্ছে তা নয়, মলের ধরন এবং মলত্যাগের সময় কেমন অনুভূতি হচ্ছে, সেটিও খেয়াল করা জরুরি। টয়লেটে বসার ভঙ্গি নিয়ে ভাবার দরকার নেই : টয়লেটে বসার ভঙ্গিও মলত্যাগ সহজ বা কঠিন হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণ কমোডে বসার সময় পায়ের নিচে ছোট একটি টুল ব্যবহার করে হাঁটু নিতম্বের চেয়ে কিছুটা ওপরে রাখা যেতে পারে। এতে শরীরের ভঙ্গি কিছুটা পরিবর্তিত হয় এবং মলত্যাগ সহজ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত জোরে চাপ দেয়া উচিত নয়। কোষ্ঠকাঠিন্য শুধু অস্বস্তিকর, ক্ষতিকর নয় : কোষ্ঠকাঠিন্য সাধারণ সমস্যা হলেও দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য দৈনন্দিন জীবনকে অস্বস্তিকর করে তুলতে পারে এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ ছাড়া কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে। তাই বারবার কোষ্ঠকাঠিন্য হলে বা দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা থাকলে স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। মলত্যাগের চাপ চেপে রাখলে সমস্যা নেই : ব্যস্ততা, কর্মস্থল বা যাতায়াতের কারণে অনেকেই মলত্যাগের চাপ চেপে রাখেন। মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতি হলেও নিয়মিতভাবে মলত্যাগের চাপ উপেক্ষা করা ভালো নয়। মল দীর্ঘ সময় অন্ত্রে থাকলে সেখান থেকে আরও পানি শোষিত হয়। ফলে মল শক্ত হয়ে যেতে পারে এবং পরে মলত্যাগ করা আরও কঠিন হতে পারে। মলত্যাগের একটি নিয়মিত অভ্যাস তৈরি করাও উপকারী। যেমন : প্রতিদিন সকালের নাশতার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পর কিছু সময় টয়লেটে বসার অভ্যাস করা যেতে পারে। তবে জোর করে মলত্যাগ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। নিয়মিতভাবে শরীরকে মলত্যাগের সুযোগ দিলে ধীরে ধীরে একটি স্বাভাবিক রুটিন তৈরি হতে পারে। শেষ কথা হচ্ছে, কোষ্ঠকাঠিন্য শুধু কম ফাইবার খাওয়ার কারণে হয়—এমন ধারণা ঠিক নয়। খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাপন, মানসিক চাপ, ওষুধ এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে। তাই সমস্যা বারবার হলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে নিজের মতো করে চিকিৎসা না করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেয়া ভালো।
লিনা আকতার
অক্টোবর ৫, ২০২৬
0
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি সারা দিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে... সূর্য উদয়ের সাথে সাথে যার মুখ দিয়ে ওপরের শব্দগুলো উচ্চারিত হতো আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সাথে সাথে উচ্চারণ করতাম, সেই আমাদের গুরুকুলের গুরু দেবেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ। আমাদের শিক্ষাজীবনের গুরু মহাশয়। আমাদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে সামান্য একটুকরো জায়গায় ছিল আমাদের গুরুকুল। মাটির দেয়ালের ওপর ছনের ছাউনি ঘর। সামান্য উঠোন। মাটিতে আসন পেতে ছিল আমাদের পড়ার স্থান। আজ সেখানে মাটির ঘরও নেই গুরুও নেই। আমাদের গুরুকুল ছিল পূর্বমুখী। গাছগাছালি ছায়াঘেরা সুনিবিড় শান্ত পাখি ডাকা সকালে শুরু হতো আমাদের পাঠদান। শ্যামবর্ণের চেহারার দীপ্ত চোখের জ্যোতি ভোরের আলোর সাথে ছড়িয়ে দিতেন আমাদের পাঠদানে। কাঠের খড়ম পায়ে সামান্য জলচৌকিতে বসেই পড়াতেন আমাদের। জন্মের পর থেকে খড়ি দেয়ার পর আমরা প্রতিদিন ভোরে পাঠদান নিতাম গুরুকুলে। শাসন আদর মেশানো ছিল গুরুশিক্ষা। জীবনের সঠিক শিক্ষার বীজ বপন করে সুন্দর সত্য মানবিক গুণাবলি দিয়ে পরিচর্যা করে চারা গজানোই ছিল তাঁর মূল শিক্ষা। আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষে চাকরি জীবনে গুরু মহাশয়কে ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারিনি তাঁর আদর্শ। আজ না ফেরার দেশে তিনি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে গুরু মহাশয়কে হাজারও প্রণাম।
ঘোষ উত্তম
অক্টোবর ৫, ২০২৬
0
সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের সরু রাস্তা ধরে হাঁটলে প্রথমেই চোখে পড়ে সারি সারি পুরোনো বাড়ি। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর দেয়ালে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও পুরোনো দরজা-জানালা এখনো টিকে আছে। দিনের ছুটিতে এখানে মানুষের আনাগোনা বাড়ে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরছেন, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে দেখছেন কয়েক শ বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো। কিন্তু আজকের এই শান্ত পানাম নগর একসময় এমন ছিল না। একসময় এই জায়গায় মানুষের ব্যস্ততা ছিল, ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরবাড়ি আর প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। ব্যবসার কাজে মানুষ আসত, পণ্য কেনাবেচা হতো, পরিবার নিয়ে মানুষ বসবাস করত। যে রাস্তায় আজ পর্যটকেরা ধীরে ধীরে হাঁটেন, সেই রাস্তাতেই একসময় চলত মানুষের ব্যস্ত যাতায়াত। সোনারগাঁও ছিল বাংলার প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদগুলোর একটি। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্ব বহুদিনের। সেই বাণিজ্যিক পরিবেশের সঙ্গে গড়ে ওঠে পানাম নগরও। বিশেষ করে, কাপড় ও তাঁতপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে এর সমৃদ্ধির সম্পর্ক ছিল। ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে এখানে তৈরি হয়েছিল বসতি, আর সেই বসতিকে ঘিরেই ধীরে ধীরে একটি শহরের রূপ নেয় পানাম। সেই সময়ের পানাম নগরকে আজ চোখের সামনে দেখা সম্ভব নয়। তবে পুরোনো বাড়িগুলোর দিকে তাকালে কল্পনা করা যায় এর বিশাল কারুকাজ। কোনো একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো একসময় ব্যবসার হিসাব নিয়ে কথা বলতেন কয়েকজন মানুষ। পাশের বাড়ির বারান্দায় বসে পরিবারের কেউ অপেক্ষা করতেন। সকালে ঘরের দরজা খুলে মানুষ বের হতো, দিনের কাজ শেষে আবার ফিরে আসত। শিশুদের ছোটাছুটি, পরিবারের ব্যস্ততা, অতিথির আসা-যাওয়া—সব মিলিয়ে এই বাড়িগুলোও একসময় মানুষের জীবনে ভরা ছিল। আজ সেই মানুষগুলো নেই। কিন্তু তাদের বসবাসের চিহ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে। পানাম নগরের বাড়িগুলোর দিকে তাকালে স্থাপত্যের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ে। খিলান, জানালা, বারান্দা ও নানা অলংকরণে তৈরি ভবনগুলোতে স্থানীয় নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি ইউরোপীয় প্রভাবও দেখা যায়। রাস্তার দুই পাশে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলো যেন একটি সময়কে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। তবে এসব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শুধু স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখলেই গল্পটা শেষ হয় না। একজন দর্শনার্থী হয়তো একটি পুরোনো জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—এই জানালার পাশে কে দাঁড়াতেন? এই দরজাটা দিয়ে প্রতিদিন কত মানুষ যাতায়াত করত? এই বাড়ির ভেতরে কোনো শিশুর শৈশব কেটেছিল কি না? কোনো পরিবার এখানে কত বছর বসবাস করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সহজে পাওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে অনেক গল্প হারিয়ে গেছে। থেকে গেছে শুধু কিছু দেয়াল, দরজা, জানালা আর স্থাপত্য। একসময় পানাম নগরের জীবনও থেমে যেতে শুরু করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র বদলে যায়। মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে মানুষ এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে থাকে। যে বাড়িগুলো একসময় মানুষের কণ্ঠে মুখর ছিল, সেগুলো একসময় ফাঁকা হয়ে পড়ে। একটি শহর এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের শহর থেকে ইতিহাসের শহরে পরিণত হয়। আজ পানাম নগরে গেলে সেই পরিবর্তন সহজেই বোঝা যায়। পুরোনো ভবনগুলোর অনেকগুলোতেই বয়সের ছাপ। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও রং মলিন। তবু এসবের মাঝেও জায়গাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি। ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে আসা মানুষের ভিড় দেখা যায়। তরুণ-তরুণীরা ছবি তুলছেন। শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ঘুরছেন। কেউ স্থাপত্য দেখছেন, কেউ ইতিহাস জানতে চাইছেন। অনেকেই হয়তো প্রথমবার বুঝতে পারছেন, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকা কোনো বিষয় নয়, কখনো কখনো সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো যায়। একটি শিশুকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে পুরোনো বাড়িগুলোর সামনে হাঁটতে দেখা যায়। সে হয়তো বারবার জানতে চাইছে, “এখানে আগে মানুষ থাকত?” প্রশ্নটি ছোট। কিন্তু পানাম নগরের গল্পের সঙ্গে যেন পুরোপুরি মিলে যায়। কারণ, এ শহরের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভবন নয়, বরং সেই ভবনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন। আজ যারা এখানে ঘুরতে আসেন, তারা কেউ সেই পুরোনো মানুষগুলোর নাম জানেন না। তাদের পরিবার, পেশা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের কথাও জানেন না। তবু পুরোনো বাড়িগুলো দেখে তারা সেই অচেনা মানুষদের জীবন কল্পনা করেন। একজন ব্যবসায়ী কেমন ছিলেন, একটি পরিবার কীভাবে থাকত, একটি শিশুর দিন কীভাবে কাটত — এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই অতীতটা নতুন করে সামনে আসে। আর এখানেই পানাম নগরের আলাদা গুরুত্ব। এটি শুধু ছবি তোলার একটি জায়গা নয়। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে বর্তমানের মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য অতীতের একটি জীবনের কাছাকাছি যেতে পারে। তবে এই পুরোনো শহরকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও কম নয়। দর্শনার্থীদের অসচেতন আচরণ, দেয়ালে লেখা, স্থাপনার ক্ষতি কিংবা অবহেলা এসব ধীরে ধীরে পুরোনো স্থাপনাগুলোর ক্ষতি করতে পারে। একটি পুরোনো দেয়াল আমাদের কাছে হয়তো শুধু একটি দেয়াল, কিন্তু সেই দেয়ালের পেছনে হয়তো রয়েছে বহু মানুষের জীবনের গল্প। তাই পানাম নগর সংরক্ষণ মানে শুধু পুরোনো ভবনগুলোকে রক্ষা করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসটাকেও ধরে রাখা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে পানাম নগরের ভিড়ও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। যারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিলেন, তাঁরা ছবি আর কিছু স্মৃতি নিয়ে বাড়ির পথে ফেরেন। দোকানপাট গুটিয়ে যায়, রাস্তা আবার শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু সারি সারি পুরোনো বাড়িগুলো থেকে যায়। পরদিন আবার কেউ আসবে। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী ইতিহাসের অংশ হিসেবে এই শহর দেখতে আসবে, কোনো পরিবার সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে আসবে, কিংবা কোনো তরুণ পুরোনো একটি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে।তখন হয়তো আবার সেই একই প্রশ্ন উঠবে—এই বাড়িতে একসময় কারা থাকত? এখানে কি ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ হতো? পানাম নগরের সব উত্তর হয়তো আর কখনো পাওয়া যাবে না। কিন্তু যতদিন মানুষ সেই প্রশ্ন করবে, ততদিন এই পুরোনো শহর শুধু অতীত হয়ে থাকবে না। এ নগর সব সময় আমাদের অতীতের একটি গল্প বলে যাচ্ছে। এখন সেই গল্পের পরের অধ্যায় আমাদের হাতে; আমরা কি পানাম নগরকে শুধু দেখার মতো একটি পুরোনো শহর হিসেবে রেখে যাব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্যও তাকে একটি জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে বাঁচিয়ে রাখব? কারণ, একটি শহর তার মানুষ হারিয়ে ফেললেও মানুষের গল্প হারিয়ে যায় না কখনো। তা পুরোনো দেয়াল হয়ে থেকে যায়, আর নতুন প্রজন্ম এসে সেই দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আবার গল্পটি খুঁজে নেয়।
লামিয়া আক্তার তন্নি
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা নিজেকে খুঁজে পেতে চায়। এই ব্যস্ত পৃথিবীতে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়। কিন্তু সেই মানুষগুলো নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালেই রাখে। কারণটা হলো পারিবারিক সমস্যা। যেসব শিশু একটি বিশৃঙ্খল পরিবারে বড় হয়, তারা নিজেদের মধ্যে শুধু ভয় খুঁজে পায়। সেই ভয় শিশুর মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। পারিবারিক সমস্যা, বাবা-মায়ের ঝগড়া শিশুর নিজসত্তাকে বোঝার ও উপলব্ধি করার শক্তি নষ্ট করে দেয়। সেই শিশু যখন স্কুলে যায়, বাইরের পরিবেশে মেশে, তখন তার কাছে সেই জগৎ ভিন্ন মনে হয়। সে সবকিছুতেই ভয় খুঁজে পায়। তার মনে হয়, সকলে তার শুধু ক্ষতিই করবে। এ চিন্তা নিয়েই সে বড় হয়। পারিবারিক সমস্যার ফলে একটি ছয়-সাত বছরের শিশু জীবনকে অভিশাপ মনে করে। সেই কোমল মনে বেঁচে থাকার ইচ্ছা নষ্ট হয়ে যায়। সেই ছয়-সাত বছরের শিশু কোনো বন্ধু বানাতে পারে না। কারণটা হলো—তার মনে হয়, এই পৃথিবীটা যেন একটি ভয়ংকর জঙ্গল, যেখানে শুধু হিংস্র জন্তুরা থাকে। আর সেই হিংস্র জন্তুরা হচ্ছে ‘মানুষ’। শিশুর কোমল মনে এটি একটি ভয়ের কারণ। পারিবারিক সমস্যায় বেড়ে ওঠা শিশুটি যখন বড় হয়, কিশোর-কিশোরী হয়, তখনো তার মনের মধ্যে এ ভয় স্থান পেতে থাকে। এ ভয় তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়... তখনো তার চারপাশের ব্যস্ত পৃথিবীকে তার অচেনা লাগে। সে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে চায়, তবে প্রতিবারই সে নিরাশ হয়। পারিবারিক সমস্যা, বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ, ঝগড়া, এমনকি মারপিটও শিশুর মনে একধরনের ভয় সৃষ্টি করে, যা তার মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। সেই পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুটি প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠে। এর ফলে জন্ম নেয় দুর্বল মানসিকতা, দুশ্চিন্তা, ভয়, হতাশা, আত্মসন্দেহের মতো বড় বড় মানসিক সমস্যা। যার ফলে তারা বড় হলেও নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পায় না, একাকিত্বের মাঝে জীবনযাপন করে। প্রতিবারই নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে, তবুও খুঁজে পায় না। সুশৃঙ্খল পরিবারের মধ্যে শিশু বেড়ে উঠলে ভবিষ্যতে সে একজন শিক্ষিত, স্বাভাবিক ও সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। একটি আদর্শ শিক্ষিত রাষ্ট্রের জন্য একটি শিশুকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে একটি স্বাধীন ও উন্নত রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য শিশু কীভাবে বেড়ে উঠছে, সেদিকে লক্ষ করা উচিত। সবশেষে বলতে পারি, শিশুরা নিষ্পাপ ও সুন্দর। তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে, ন্যায়সঙ্গত আচরণ করতে হবে। তাদের সঙ্গে সুন্দর করে কথা বলতে হবে এবং মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
আবরার জাওয়াদ
অক্টোবর ৩, ২০২৬
0
আমরা জানি, বন্ধ্যাত্ব বলতে নিয়মিত ও অসুরক্ষিত শারীরিক সম্পর্কের পর ১২ মাস বা তার বেশি সময় ধরে গর্ভধারণে ব্যর্থ হওয়াকে বোঝায়। বর্তমানে প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে বন্ধ্যাত্বের সমস্যার সম্মুখীন হন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা। আমরা আরও জানি, তামাক ব্যবহার দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের অন্যতম কারণ। তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব শুধু এতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, তামাক ব্যবহার নারী ও পুরুষ উভয়েরই প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং দম্পতিদের জন্য গর্ভধারণকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। তাই WHO সুপারিশ করে, যারা সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের তামাকের এসব ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং তামাক ছাড়তে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সহায়তা প্রদান করা উচিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক প্রমাণে দেখা গেছে, গুলসহ তামাকজাত দ্রব্য চিবানো এবং ধূমপান নারীর প্রজননক্ষমতার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, যাঁরা ধূমপান করেন বা তামাকজাত দ্রব্য চিবান, তাঁদের বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি তামাক ব্যবহার না করা নারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ধূমপান বা তামাক চিবানো গর্ভধারণে বিলম্ব ঘটাতে পারে। যাঁরা গর্ভধারণের চেষ্টা করার সময়ও তামাক ব্যবহার চালিয়ে যান, তাঁদের গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায়। WHO জানিয়েছে, যাঁরা ধূমপান ছেড়ে দেন, তাঁদের বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি ধূমপান চালিয়ে যাওয়া নারীদের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম হতে পারে। এ ছাড়া যাঁরা নিজেরা ধূমপান করেন না, তাঁরাও পুরোপুরি নিরাপদ নন। পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শেও বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। তাই বাড়ি ও জনসমাগমস্থলে নারীদের তামাকের ধোঁয়া থেকে সুরক্ষা দেয়া প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু নারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। WHO-এর মতে, সিগারেট ধূমপান পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে রয়েছে বীর্যের গুণগত মানের অবনতি এবং যৌনক্ষমতার সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ধূমপান করেন বা তামাক ব্যবহার করেন, তাঁদের মধ্যে নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো বেশি দেখা যেতে পারে। যেমন : শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া; শুক্রাণুর চলাচলের ক্ষমতা কমে যাওয়া; অস্বাভাবিক আকৃতির শুক্রাণু; ইরেকটাইল ডিসফাংশন; বীর্যপাতজনিত সমস্যা; কিছু ক্ষেত্রে অ্যাজুস্পার্মিয়া, অর্থাৎ বীর্যে সম্পূর্ণভাবে শুক্রাণুর অনুপস্থিতি। এ ছাড়া ই-সিগারেট ও ওয়াটারপাইপ (হুক্কা) ব্যবহারও বীর্যের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং শুক্রাণুর গুণগত মান খারাপ হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। যেসব দম্পতি বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও ধূমপান চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। WHO-এর মতে, ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের (IVF) মতো চিকিৎসার সময় ধূমপানের কারণে গর্ভধারণের হার এবং জীবিত সন্তান জন্মের হার কমে যেতে পারে। অনেকেই মনে করেন, শুধু সিগারেটই ক্ষতিকর। কিন্তু WHO-এর মতে, তামাক বিভিন্ন রূপে ব্যবহৃত হয়, যেমন : সিগারেট, সিগার, বিড়ি, ওয়াটারপাইপ (হুক্কা), চিবানোর তামাক (গুল, জর্দা ইত্যাদি), নিকোটিনযুক্ত ই-সিগারেট এসব পণ্যই প্রজনন ব্যবস্থার ক্ষতি করতে পারে। বাংলাদেশের ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৫.৫ শতাংশ বর্তমানে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (HTP) এবং নিকোটিন পাউচের মতো নতুন ধরনের তামাকপণ্য ব্যবহার করছেন। আর জীবনে অন্তত একবার এসব পণ্য ব্যবহার করেছেন ২৮.১ শতাংশ তরুণ। WHO সুপারিশ করে, প্রজননক্ষম বয়সের মানুষের সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের নিয়মিত তামাক ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করা উচিত এবং তামাক ছাড়তে কার্যকর সহায়তা প্রদান করা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে কাউন্সেলিং, কুইটলাইন সেবা, মোবাইল মেসেজিং প্রোগ্রাম, চ্যাটবট ও মোবাইল অ্যাপের মতো ডিজিটাল সহায়তা, প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত তামাক ছাড়ার ওষুধ প্রভৃতি।
এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
প্রতিটি সৃষ্টি মূল্যবান। কোনো প্রাণী নিজে নিজে সৃষ্টি হয়নি; সৃষ্টিকর্তা এমনি এমনি সৃষ্টি করেননি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সব প্রাণীর বাঁচার অধিকার রয়েছে। ওদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণ করবেন না, পারলে সহানুভূতিশীল হয়ে পাশে দাঁড়ান। আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় প্রাণীগুলো মানুষের ভালোবাসারই অপেক্ষায় থাকে। বিশেষ করে যেসব কুকুর-বিড়াল রাজপথে কিংবা অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায়, তাদের জীবনের বড় একটা অংশ কাটে অনাহারে। নিজের খাবারের সামান্য একমুঠো ওদের তুলে দিলে তাদের ক্ষুধার কষ্ট মেটে, আর বিনিময়ে পাওয়া যায় নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও গভীর কৃতজ্ঞতা। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র ঠান্ডার সময়ে প্রাণীগুলোকে তাড়িয়ে না দিয়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ দিন। ওদের কৃতজ্ঞ চোখের চাহনিই আপনাকে বুঝিয়ে দেবে এই সামান্য দরদের মূল্য। ওদের গায়ে ছোটখাটো ক্ষত বা ঘা দেখলে অবহেলা করবেন না। ঘরে থাকা সামান্য হলুদের গুঁড়া কিংবা সামান্য কিছু টাকার একটু অ্যান্টিসেপটিক মেডিসিন ওদের ক্ষত দ্রুত সারিয়ে তুলতে পারে। এতে শুধু তারাই সুস্থ থাকে না, সংক্রমণ থেকে আমাদের চারপাশের পরিবেশও নিরাপদ থাকে। পাখি শিকার বন্ধে সচেতন হোন এবং চোখের সামনে কোনো প্রাণীকে নির্যাতন হতে দেখলে তার তীব্র প্রতিবাদ জানান। ওদের কথা বলার ভাষা নেই, নিজের অধিকার দাবি করার শক্তি নেই। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমরা যদি এই অবলা প্রাণীগুলোর পাশে না দাঁড়াই, তবে ওদের আগলে রাখবে কে! সামান্য সহানুভূতি দিয়েই শুরু হোক আমাদের পশুপাখিদের ভালোবাসার এই পথচলা।
সোহাগ চন্দ্র রায়
অক্টোবর ৪, ২০২৬
0
আমরা মেডিকেল জগতের সাথে যারা আছি, তারা সবাই কফি এনেমা সম্পর্কে কমবেশি জানি। তবে পুরোপুরি জানি না। কফি এনেমা হলো মলদ্বারের মাধ্যমে কোলনের ক্যাফেইনযুক্ত কফি ও পানির মিশ্রণ করে প্রবেশ করানো একটি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি। এটি আবিষ্কৃত হয় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। সেই সময় জার্মানি চিকিৎসকরা বিভিন্ন রোগের বিকল্প হিসেবে এবং ক্যান্সার চিকিৎসা উপায় খুঁজতে গিয়ে মলদ্বারে কফি ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ওষুধ আর ব্যথানাশক সংকট দেখা দিলে সেনাদের ওপর এই কফি এনেমা ব্যবহার করে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করা হতো। এ পদ্ধতিকে আরও বেশি জনপ্রিয় করেছে জার্মানি-আমেরিকান চিকিৎসক ডা. মাক্স গার্সন। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সালে তাঁর বিখ্যাত গার্সন থেরাপিতে কফি এনেমাকে যুক্ত করেন। এভাবে কফি এনেমা সম্পর্কে তৎকালীন চিকিৎসক সমাজ জানতে পারে। গার্সন থেরাপি অনুসারে এটি যকৃতের পিত্তরস নির্গমন করে, যা যকৃৎকে বিষমুক্তকরণ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। তারপর এতে পেটের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় এবং শরীরকে শক্ত ও হাড়গুলোকে মজবুত করে। তবে এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখা কোনো চিকিৎসক দিতে পারেননি। প্রোক্টোপ্রোকটিলাইটিস ও কোলাইটিস মলদ্বার ও বৃহদন্ত্রে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা রক্তপাত ও ব্যথার কারণ হয়। ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা : শরীরে খনিজের মাত্রা নষ্ট হয়ে যায়, যা গুরুতর ক্ষেত্রে হৃৎস্পন্দনের সমস্যা ঘটাতে পারে। সংক্রমণ ও সেপসিস : ভুল পদ্ধতিতে এনেমা করলে অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ এবং রক্তে মারাত্মক সংক্রমণ (Sepsis) হতে পারে। ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা : ক্যাফেইনের অতিরিক্ত শোষণের ফলে শরীর অতিরিক্ত তরল হারিয়ে ফেলে। অন্ত্রের পেশি দুর্বল হওয়া : নিয়মিত এনেমা ব্যবহারের ফলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য বেড়ে যায়। তবে এর অপকারিতা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ব্যাখা আছে এবং প্রমাণ আছে। তাই বর্তমান চিকিৎসকরা রোগীদের কফি এনেমার পরামর্শ দেন না। ২৫ মে ২০২৩ তারিখে Cleveland Clinic এর গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সামিতা গার্গ কফি এনেমা না দেয়ার পরামর্শ দেন। তারপর ২০২০ সালে এসিজি রিপোর্ট অনুসারে একটি Case রিপোর্ট পাবলিশ করে যে কফি এনেমার মাধ্যমে এক সুস্থ ব্যক্তির প্রোক্টোপ্রোকটিলাইটিস হয়েছে। তাই চিকিৎসকরা বলেন, কফির পরিবর্তে তরল পানি (ঠান্ডা পানি অথবা ঘর তাপমাত্রার পানি) দিয়ে এনেমা করলে ভালো হয়। আমি মনে করি, যেহেতু এর উপকারিতা সম্পর্কে কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখা বা যুক্তি প্রমাণ হয়নি, তাই কফি এনেমা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।
এস. এম. এম. মুসাব্বির উদ্দিন
অক্টোবর ২, ২০২৬
0
আমি ভালো আছি। বিষাদের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও মৃদু হেসে বলি, ভালো আছি। অথচ এ দুটি শব্দের অন্তরালে চাপা পড়ে আছে সহস্র দীর্ঘশ্বাস, অগণিত অনুচ্চারিত অভিমান ও অভিযোগ। একদিন মানুষকে সহজেই বিশ্বাস করতাম, সবাইকে আপন করে নেয়াই ছিল আমার স্বভাব। আজ সেই সরলতাই আমার সবচেয়ে পুরোনো ক্ষত। আপনজনের আঘাত বারবার পেতে পেতে শিখেছি—সব নৈকট্য আপন নয়, সব মমতা চিরস্থায়ী নয়, সবার ভালোবাসা আমার জন্য নয়। আমি পাষাণ হইনি। শুধু অনুভূতির দরজাকে শক্ত করে দিয়েছি। কষ্ট এখনো হয়, অভিমান এখনো জাগে; শুধু প্রকাশ করার ভাষাটা হারিয়ে গেছে। মানুষের ভিড়ে হাসি, স্বাভাবিকতার অভিনয় করি, আর রাত্রির নৈঃশব্দ্যে নিজের কাছেই স্বীকার করি—আমি ক্লান্ত। কখনো কখনো আমার আগের সরলতায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। কেউ আপন সেজে এলে আজ ভালোবাসার আগে ভয় জাগে—যদি তারাও একদিন বদলে যায়? তাই দূরত্বই এখন আশ্রয়, নৈঃশব্দ্যই সঙ্গী। অন্যের সুখকে নিজের সুখের চেয়ে বড় করতে করতে একদিন আবিষ্কার করলাম—সবাইকে আপন করতে গিয়ে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি। আমারও স্বপ্ন ছিল, নিজের মানুষদের আজীবন আপন রাখার। কিন্তু জীবন শিখিয়েছে, মানুষ আসে শুধু ভালোবাসতে নয়, কখনো কখনো বিশ্বাসের মূল্য শেখাতেও। তাই আজও কেউ জিজ্ঞেস করলে ‘কেমন আছ?’ আমি হাসি। কারণ, কিছু সত্য বলা যায় না। শুধু নীরবে বহন করতে হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সরলতা হারাই। এর চেয়েও বড় সত্য হলো, আমাদের আশপাশের মানুষের আচরণই অনেক সময় আমাদের বদলে যেতে শেখায়।
ফাবিহা ইসলাম
অক্টোবর ২, ২০২৬
0
জীবন আসলে কোনো সরল পথের নাম নয়। তার বাঁকে বাঁকে ছড়িয়ে থাকে রৌদ্র, ছায়া, প্রাপ্তি আর হারানোর মৃদু পদধ্বনি। যে দিনটিকে আমরা দুহাত দিয়ে আঁকড়ে রাখতে চাই, সে-ই যেন সবার আগে দূরে সরে যায়। আবার যে বেদনা একদিন অসহনীয় মনে হয়, সময়ের গভীরে তারই ভেতর থেকে জন্ম নেয় নতুন কোনো বোধ, নতুন কোনো আলো। তাই জীবনের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি নয়—শুধু এতটুকু, চলার পথে হৃদয় যেন কঠিন না হয়ে যায়। মানুষ আসুক, মানুষ চলে যাক; সম্পর্ক বদলাক, সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে যাক—তবু ভালোবাসা থাকুক তার নিজস্ব আলোয়। শেষ প্রহরে ফিরে তাকিয়ে যেন বলতে পারি—সব পাইনি, সবকিছু আমার হয়ে থাকেনি; তবু যা পেয়েছি, তাকে হৃদয় দিয়ে গ্রহণ করেছি। যে মানুষগুলো এসেছিল, তাদের ভালোবেসেছি; যে দিনগুলো চলে গেছে, তাদের স্মৃতিকে সযত্নে রেখেছি। আর যে জীবন আমাকে দেয়া হয়েছিল, তাকে কোনো অভিযোগের ভারে নয়—ভালোবাসার আলোয়, গভীর মমতায়, সত্যিকার অর্থেই ভালোবেসে বেঁচেছি।
ড. নজরুল ইসলাম খান
সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
0
শরতের আশ্বিনকে বলা হয় শুভ্রতার প্রতীক। শরতের আশ্বিন মানেই বৈচিত্র্যময় লাবণ্যময়ী। সাদা কাশফুল, শিউলি ঝরা সকাল, ঢাকের শব্দ, স্নিগ্ধ জোছনা, আলো-ছায়ার খেলা দিনভর। আশ্বিনে শরৎ সেজে ওঠে ভোরের শিউলি ফুল আর ঘাসের ওপর হালকা মুক্তোর দানার মতো শিশির ভেজা মিষ্টি রোদের পশরা নিয়ে। শাপলা, শালুক, পদ্ম, জুঁই, মল্লিকা, মালতি, ছাতিম, দোলনচাঁপা, জারুল, নয়নতারা, ধুতরা, কেয়া আর কাশফুলে সৌরভ ছড়াবে প্রকৃতির রারি শরৎ। শরতের মেঘহীন নির্মল নীলাকাশে সাদা মেঘমালার ভেলা ভেসে বেড়ানোর সাথে সবুজ মাঠের ওপর উড়ে যায় শালিক, ময়না, টিয়ের ঝাঁক। অবারিত সবুজ মাঠের ছোঁয়ায় নিথর প্রকৃতি ফিরে পায় সজীবতা। অপরূপ চিত্র আশ্বিন শরতের আগমনে শ্বেতশুভ্র রূপলাবণ্যে নতুন সাজে সেজে উঠবে প্রকৃতি। বিলের জলে নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে লাল-সাদা শাপলা ও শালুক ফুল। শরতের আশ্বিনরূপ ঐশ্বর্য এত মোহ, এত বৈচিত্র্যময়! প্রকৃতির অপরূপ অপার সৌন্দর্যে মোহিত রূপের সান্নিধ্যে চায় প্রকৃতির কাছাকাছি কবিও খুঁজে ফেরে তারে। আশ্বিন এলেই ভোরের বাতাসে কেমন এক মায়াবী গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে—শিউলির গন্ধ। রাতের আঁধার পেরিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই সাদা-কমলা শিউলিরা নীরবে ঝরে পড়ে ঘাসের বুকে, যেন প্রকৃতি আপন হাতে লিখে রাখে শরতের শুভেচ্ছা পত্র। শিশির ভেজা পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া শৈশব বুঝি আবার ফিরে এসেছে। শিউলি কুড়োনোর সেই ভোর, মায়ের আঁচল, পূজার গন্ধ আর অকারণ আনন্দ—সবকিছু মিশে যায় আশ্বিনের কোমল হাওয়ায়। শিউলি ঝরে যায়, কিন্তু তার সুবাস থেকে যায় হৃদয়ের গোপন অলিন্দে; ঠিক তেমনি কিছু স্মৃতি সময়ের কাছে হার মানে না, বরং প্রতি আশ্বিনে নতুন করে মন ছুঁয়ে যায়। একদিন খুঁজেছিনু যারে বকের পাখার ভিড়ে বাদলের গোধূলি-আধাঁরে মালতীলতার বনে, কদমের তলে নিঝুম ঘুমের ঘাটে, কেয়াফুল শেফালীর দলে! যাহারে খুঁজেছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে। ‘ঝরা পালক’, জীবনানন্দ দাশ। ভোরের শিশির ভেজা শিউলি ঝরা টুপটাপ শব্দহীন অনুভূতিই হলো আমাদের আশ্বিনের শরৎকাল। হালকা শীতের আমেজ আড় ভেঙে পদ্ম, শাপলা, শালুকের হাসি হৃদয়-মনকে করে তোলে প্রকৃতির প্রেমিক। তাই তো শরতের আশ্বিন আমাদের ভালোবাসার রানি।
ঘোষ উত্তম
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নবীন প্রজন্মের ওপর। আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজনির্মাতা। তাই নবীনদের জাগরণ শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ। বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি তৈরি করেছে নানা রকম চ্যালেঞ্জ। তাই নবীনদের শুধু শিক্ষিত হলেই চলবে না; তাদের হতে হবে জ্ঞানী, বিবেকবান, দায়িত্বশীল ও মানবিক। শিক্ষা মানুষের চিন্তাকে প্রসারিত করে এবং সত্য-মিথ্যা বিচার করতে শেখায়। তাই পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি জ্ঞানমূলক বই পড়তে হবে, প্রশ্ন করতে হবে এবং যুক্তি দিয়ে বিষয়কে বিচার করতে হবে। অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ না করে সত্য অনুসন্ধানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বিশ্বজ্ঞান অর্জনের জন্য অন্যান্য ভাষাও শেখা প্রয়োজন। ভাষা যত জানা যায়, জ্ঞানের তত বেশি দরজা খুলে যায়। সময় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। হারানো সময় কখনো ফিরে আসে না। তাই অলসতা, অকারণ আড্ডা কিংবা প্রযুক্তির অপব্যবহারে সময় নষ্ট না করে পড়াশোনা, সৃজনশীলতা, শরীরচর্চা ও আত্মউন্নয়নে সময় দিতে হবে। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে, তবে স্বপ্নের সঙ্গে থাকতে হবে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা। ব্যর্থতা এলে হতাশ না হয়ে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে—হোঁচট খাওয়া পরাজয় নয়; পড়ে গিয়ে আর না ওঠাই পরাজয়। জ্ঞান ও অর্থের চেয়ে মানুষের চরিত্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সত্যবাদিতা, সততা, বিনয়, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতাই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। লোভ, অহংকার ও হিংসা থেকে দূরে থাকতে হবে। অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা না করে অনুপ্রেরণা নিতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ, মানুষ বড় হয় শুধু অর্থ-বিত্তে নয়, মানুষের জন্য কাজ করার মধ্য দিয়ে। পিতা-মাতার ত্যাগ ও ভালোবাসার ঋণ অপরিসীম। তাঁদের সম্মান করা, যত্ন নেয়া এবং তাঁদের মুখে হাসি ফোটানো সন্তানের দায়িত্ব। শিক্ষকরাও একজন শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের জ্ঞান, শাসন ও পরামর্শ জীবনের সঠিক পথ দেখাতে পারে। তাই পিতা-মাতা ও শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নবীনদের জীবনের অন্যতম নৈতিক শিক্ষা হওয়া উচিত। কৈশোর ও তারুণ্যে বন্ধুত্বের প্রভাব গভীর। ভালো বন্ধু মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত করে; অসৎ সঙ্গ তাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। তাই বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। মাদক, নেশা ও অপরাধ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটকে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের কাজে ব্যবহার করতে হবে; যেন প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং আমরা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করি। নিজেকে জয় করাই মানুষের বড় বিজয়। রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কথা বলার আগে ভাবতে হবে এবং ভুল হলে ক্ষমা চাইতে শিখতে হবে। নম্রতা ও আত্মসংযম মানুষের সৌন্দর্য বাড়ায়। একই সঙ্গে মানবিক হতে হবে। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের কষ্ট বোঝা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা একটি সুন্দর সমাজের ভিত্তি। দেশপ্রেম শুধু মুখের কথা নয়; এটি দায়িত্বশীল কর্মের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। অন্যায়, অসততা ও দুর্নীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে পারে। পরিবেশ রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব। বৃক্ষরোপণ, নদী-জলাশয় রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনে নবীনদের এগিয়ে আসতে হবে। আজকের নবীনরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের জ্ঞান, চরিত্র, শ্রম ও মানবিকতার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের সমাজ কেমন হবে। তাই হে নবীন, জাগো। জ্ঞানকে করো তোমার আলো, সততাকে করো শক্তি, শ্রমকে করো হাতিয়ার এবং মানবতাকে করো জীবনের আদর্শ। পিতা-মাতাকে সম্মান করো, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করো, ভালো সঙ্গ গ্রহণ করো এবং নেশা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো—ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে পাওয়া যায় না, ভবিষ্যৎ গড়ে নিতে হয়। আজকের ছোট্ট চারাই একদিন মহিরুহ হয়। তেমনি আজকের সচেতন নবীনই আগামী দিনের আলোকবর্তিকা। হে নবীন, জাগো—নিজেকে গড়ো, সমাজকে গড়ো, দেশকে গড়ো।
মোঃ নুরুল ইসলাম নিলয়
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
দীর্ঘ সময়ের কর্মচাপ শুধু মানসিক ক্লান্তি বা ঘুমের সমস্যার কারণ নয়; শরীরের বিপাকীয় ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং শরীরে কর্টিসল নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তনের সঙ্গে পেটের ভেতরে জমা ভিসেরাল ফ্যাট ও ইনসুলিন প্রতিরোধের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। ভিসেরাল ফ্যাট হলো পেটের গভীরে বিভিন্ন অঙ্গের চারপাশে জমা চর্বি। ত্বকের নিচে জমা চর্বির তুলনায় এটি বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসের ক্ষেত্রে শরীরের হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রিনাল (HPA) অক্ষ সক্রিয় হয়। এর মাধ্যমে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল নিঃসরণে পরিবর্তন ঘটে। কর্টিসল স্বল্পমেয়াদে শরীরকে চাপ মোকাবেলায় সাহায্য করলেও দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেসে এর নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। চাপের সময় কর্টিসল শরীরে গ্লুকোজের প্রাপ্যতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। দীর্ঘস্থায়ীভাবে কর্টিসলের কার্যক্রমের পরিবর্তন হলে গ্লুকোজ বিপাক ও ইনসুলিনের কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণায় উচ্চ কর্টিসল কার্যক্রম, ভিসেরাল ফ্যাট এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে ভিসেরাল ফ্যাট নিজেও বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় টিস্যু। এটি বিভিন্ন সিগন্যালিং অণু ও প্রদাহ-সম্পর্কিত উপাদান নিঃসরণ করে, যা ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস, ভিসেরাল ফ্যাট এবং বিপাকীয় পরিবর্তনের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। গবেষণার ফল এখানে একেবারে একমুখী নয়। ২০২৪ সালের একটি সিস্টেমিক রিভিউতে ৩২টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও শারীরিক গঠন বা বিপাকীয় সূচকের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাগুলোর ফল বেশ অসঙ্গতিপূর্ণ। অনেক গবেষণায় স্ট্রেসের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও শুধু স্ট্রেসকে সরাসরি শরীরের চর্বি বৃদ্ধির একক কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপের সঙ্গে অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, শারীরিক কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং উচ্চ-ক্যালরির খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়তে পারে। এসব আচরণগত পরিবর্তনও ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় স্ট্রেস ও অ্যাডিপোসিটির সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন জীবনযাপনগত উপাদান গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ওজন বা কোমরের মাপ কমানোর আলোচনায় শুধু খাবারের পরিমাণ কমানোর দিকে নজর না দিয়ে ঘুম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, কর্মঘণ্টার ভারসাম্য এবং স্ট্রেস ব্যবস্থাপনাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কাজের মাঝে অল্প সময় হাঁটা, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার বিরতি নেওয়া, কর্মদিবসের নির্দিষ্ট সমাপ্তি রাখা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ তৈরি করা সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট কোনো শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল বা ‘কুল-ডাউন’ পদ্ধতি সরাসরি ভিসেরাল ফ্যাট কমিয়ে দেয় এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। স্ট্রেস-ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কর্টিসল পরিবর্তনের প্রমাণ নিয়েও গবেষণার ফল এখনও সীমিত ও বৈচিত্র্যময়। অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রের দীর্ঘস্থায়ী চাপকে শুধু মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের স্ট্রেস শরীরের হরমোন ও আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে ভিসেরাল ফ্যাট বৃদ্ধির পেছনে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, ঘুম, জেনেটিক্সসহ একাধিক কারণ কাজ করে তাই কর্টিসলকে এককভাবে দোষী ও করা যাবে না।
রাইসা মেহজাবীন
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
থিয়েটার হলো নান্দনিক কলা, দর্শন, ব্যাকমঞ্চের নিষ্ঠা ও যৌথ শ্রমের এক সার্বিক সংশ্লেষ। সাধারণ দর্শক মনে বা প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে অনেক সময় অভিনয়, নির্দেশনা ও পান্ডুলিপিকেই থিয়েটারের একমাত্র চালিকাশক্তি মনে হতে পারে, যা অত্যন্ত স্বাভাবিক—কারণ প্রজেকশনের আলোয় এই দিকগুলোই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। তবে নাট্যতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, থিয়েটার তার চেয়েও বহুগুণ বিস্তৃত, গভীর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ এক শিল্প-পরিবেশ। আধুনিক নাট্যরীতির অন্যতম পথপ্রদর্শক কনস্টান্টিন স্তানিস্লাভস্কি তাঁর অভিনয়তত্ত্বে বারবার জোর দিয়েছেন যে, মঞ্চের প্রতিটি উপাদান—শব্দ, আলোকসম্পাত, মঞ্চসজ্জা ও সহশিল্পীর প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলেই অভিনেতার ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক সত্যকে গড়ে তোলে। ফরাসি নাট্যচিন্তক ও নির্দেশক অ্যান্তনা আর্তো তাঁর ‘থিয়েটার অব ক্রুয়েলটি’ ধারণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন, মঞ্চের স্থান, আলো, ধ্বনি, নেপথ্য রূপসজ্জা ও দৃশ্যগত অলংকারই নাটকের নিজস্ব মৌলিক ভাষা তৈরি করে। আবার বিখ্যাত জার্মান নাট্যকার ও নির্দেশক বের্টোল্ট ব্রেখট তাঁর এপিক থিয়েটার ধারণায় দেখিয়েছেন, থিয়েটারের মূল শক্তি লুকিয়ে থাকে এর সামাজিক সংযোগ, নির্দেশনামূলক কৌশল, দৃশ্যপটের পরিবর্তন এবং দর্শকের সঙ্গে এর মেলবন্ধনে—যা কোনো একজন নির্দেশক বা লেখকের একা তৈরি করা সম্ভব নয়। ঠিক একইভাবে, ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী নাট্যশাস্ত্রের স্রষ্টা ভরত মুনি তাঁর ‘নাট্যশাস্ত্র’-এ রসংভূতির জন্য অভিনয় (আঙ্গিক, বাচিক, আহার্য ও সাত্ত্বিক) এবং নেপথ্য ব্যবস্থাপনার সুষম সমন্বয়কে অপরিহার্য বলে উল্লেখ করেছেন। অতএব, থিয়েটারকে কেবল বাহ্যিক কয়েকটি উপাধিতে সীমাবদ্ধ না রেখে এর নেপথ্য শৃঙ্খলা, আলো-আঁধারির বুনন, শব্দ বিন্যাস, রূপসজ্জা এবং সার্বিক যৌথ আত্মত্যাগের সমন্বয় হিসেবে দেখাই এর প্রকৃত সৌন্দর্যকে স্পর্শ করা। এই নীরব সাধনা, অগণিত মহড়া এবং নাটকের প্রতি আজীবন গভীর ভালোবাসার কারণেই থিয়েটার মানবচেতনার চিরন্তন ও সার্বভৌম স্থান ধরে রাখে।
শাহ্ জাহাঙ্গীর
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
শরৎকাল অনেক আগেই এসেছে। কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারিনি, শরৎ কতটা নেমে এসেছে মোর আঙিনায়। সে খুব সহজে ধরা দেয় না। যদি বনগাছের পাশ দিয়ে না হেঁটে যাই কিংবা ভোরের আলো ফোটার মলিন প্রকৃতির সঙ্গে একটু একাত্ম না হই, তবে সে ধরা দেবে না। চার দেয়ালে বন্দি হয়ে ডাকলেও সে আসবে না। কিন্তু প্রকৃতিতে সে ঠিকই এসে পড়েছে। আমার নিরবধি ডাক, জননী-জন্মভূমির সম্বোধন—সে কারও ডাকই শুনবে না। এখন সে অবহেলিত। তবু কেন যেন তার আগমনী আভাস শুনতে পাচ্ছি। পাখিদের কিচিরমিচির ডাক শুনতে পাচ্ছি। গ্রীষ্মের কড়া দাবদাহ কিংবা বর্ষার বাদলমুখর দিনের চেয়ে এখন মেঘলা দিনের ভেজা ভেজা প্রকৃতিই শ্রেয়তর লাগে। আজ আমি শরতের সেই ঢেউ, সেই কাশবনের ফুলের অম্লান অকৃত্রিম গন্ধ অনুভব করছি। প্রজাপতি কিংবা ভ্রমরের আনাগোনাও সুস্পষ্ট। চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখি, ফুল-কাশবনের মধ্যে দিয়ে আমি হেঁটে যাচ্ছি। সেই ‘পথের পাঁচালী’র অপু আর দুর্গা ছুটে যাচ্ছে রেল দেখতে, শরতের ঘন কাশবন ডিঙিয়ে ছোট ভাইয়ের হাত ধরে। মনে হয়, ওরা আমার পাশ দিয়ে ছুটে গেল। সেই অস্পৃশ্য ডাক, কৌতূহলী ভাবনা—সবই যেন শরতের প্রভাতে মিশে আছে। মনে হয়, আমার ছায়ার সঙ্গে হাঁটছে আর দ্রুতপদে শরতের গল্প বলছে। কাশবনের ভেতর দিয়ে তাদের সেই অবাধ ছুটে চলা যেন বাংলার প্রকৃতিরই এক অনিন্দ্য সৃষ্টি। মনে হয়, আমিও ছুটে যাই কাশবনের ভেতর দিয়ে দূরে কোথাও। কাশবনের ভেতরে সেই দুর্গাপ্রতিমার অনিন্দ্য রূপ দেখতে। যেন প্রকৃতির এক শোভনীয় রূপকায় সৃষ্টি। সত্যিই শরতের মোহ, শরতের গান, শরতের ভাবার্থ—সবকিছুর মধ্যে এমন এক আকর্ষণ আছে, যা মানুষকে বারবার প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যেমন শরৎ এক আবহ নিয়ে আসে, তেমনই বাংলার কথাসাহিত্যে বারবার শরতের দোলা, কাশে কাশে দোলা ফুটে ওঠে। মনে হয়, শরৎ শুধু একটি ঋতু নয়; বাংলা সাহিত্যিক কল্পনারও এক দীর্ঘস্থায়ী অংশ। প্রকৃতির রূপ কতটা নির্মোহ, কতটা সুন্দর—তাই অকপটে স্বীকার করি। আজ একটু ঘুম থেকে উঠে শান্ত হয়ে উঠোনের ধারে চুপটি করে বসে ছিলাম। সেই মুহূর্তেই এমন এক স্নিগ্ধ, শীতল বাতাস গায়ে এলিয়ে গেল, মনে হলো আমাকে মুহূর্তেই শান্ত করে দেবে, সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দিতে পারে। এই বাতাসের এমন একটি গন্ধ থাকে, যেটা প্রতিবছরের এই সময়টাতে খুব মনে পড়ে—বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া মাঠ-ঘাট, ছোট রাস্তার অলি-গলির ভেজা পাতায় মাখানো কাদা। আঙিনার পাশের বটগাছটার বড় বড় ভেজা পাতার কথাগুলো যেন মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। হাত দিয়ে পাতাটি উঠালেই দেখতে পাওয়া যায় পাতার রেখে যাওয়া গল্প, শরতের গল্প। হয়তো গ্রাম-শহরতলির কোণে কোণে এখন কাশবনের দোলা দুলছে। গাঁয়ের খেত-মাঠে ভরা জল ধীরে ধীরে কমছে। কচুরিপানা, শেওলা প্রায় শুকিয়ে যাচ্ছে। শোলগাছের পাতাগুলো কেমন যেন চুপসে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, তাদের সময় শেষ। ফসল রোপণের জন্য ছেড়ে দিতে হবে তাদের বিস্তার। বিলে তেমন জল নেই। কচুরিপানাগুলো বড় হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে একধরনের নীরব, অদৃশ্য পরিবর্তন। খুব সাধারণ দৃশ্য, অথচ আমার চোখে তা নয়নাভিরাম। যেখানে গেলে আমি খুব সাধারণ স্বপ্ন দেখি—ওই পাখিটা যদি একবার দেখা দেয়, ওই বুনো হাঁসটা যদি একবার কাছে এগিয়ে আসে, ওই সাদা বকটি যদি মাথার ওপর দিয়ে একবার উড়ে যায়, ওই পানকৌড়িটার মাছ শিকারের অপ্রতুল ধৈর্য, ওই দূরের আধো-অনুজ্জ্বল প্রকৃতি—সবই কত সাধারণ! অথচ এই একটি শরতের অপেক্ষায় তারা যেন অধীর আগ্রহে থাকে। আশ্বিন এসে গিয়েছে। ভাদ্র বিদায়ের পথে। সেই মস্ত বড় তালগাছ, গাছ থেকে তাল পড়া, জলের মধ্যেও কেমন একটা কুঁঠাসা শব্দ হওয়া। সেই তাল কুড়াতে হাঁটুজলে ছুটে যাওয়া, তালের পিঠা খাওয়া, মায়ের হাতের তালের পিঠা। আর অকারণে সারা দিন মাঠে-মাঠে ঘুরে বেড়ানো। গ্রামের এই স্মৃতিগুলো হয়তো সকলেরই আছে। কিন্তু আমার একটু অন্য রকম স্বাদ। আমি সেগুলো তখন থেকেই ভালোবেসে এসেছি। এগুলো যেন আমার নীরব পথের সঙ্গী, আমার সাহচর্য। হয়তো একদিন এগুলো আর পাব না। কিন্তু দিনগুলো আমার খুব মনে থাকবে। সেই কারণেই আজও শরৎ এলেই আমার ভেতরে কোথাও একটা পুরোনো দরজা খুলে যায়। দিগন্তঘেঁষে অদ্ভুত বাতাস নীরবে বয়ে যায়। ছুটে যেতে ইচ্ছে হয় দিকদিগন্তের নানাদিকে। প্রতিবছর এই সময়টি হাজার লেখক-সাহিত্যিক মানুষের অনুভূতির জায়গা। এটি তাদের কিছু লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। কেউ কবিতা লেখে, কেউ গল্প, কেউ শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু শরৎকে একেবারে উপেক্ষা করে থাকা কঠিন। এটাই বর্ণিল শরৎ। প্রকৃতির এক অনন্য সুন্দর সময়। সে বারবার ডাকে—একবার ফিরে তাকাও। রূপটি সুন্দর হোক বা না হোক, ফিরে তাকাও। শরৎ এমনই একটি মহৎ ঋতু, প্রাণবন্ত উৎসাহের ঢেউ, যে ঢেউ সকলের মনে-প্রাণে বয়ে চলে অবিরাম ধারায়। দক্ষিণায়নের মৃদুমন্দ বায়ুর ছলছল ঢেউ প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে একেবারে উন্মীলন হয়ে যায়। অজান্তেই শরতের শুভ্র কাশবন পেঁজা পেঁজা মেঘের মতো মাঠে মাঠে দুলে যায়। আকাশে মেঘ থাকে না বললেই চলে। দুই-একটি হাতেগোনা পেঁজা পেঁজা মেঘ নিরুদ্দেশ ঘুরে বেড়ায়। যেন দেখা দিয়েও দেখা দিতে চায় না। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড গরম হয়ে বর্ষার রেশ জুড়ে দেয়। তবু এই সময়ের প্রকৃতিতে অন্য রকম সৌন্দর্য থাকে। সংসারের জগতের কোলাহল থেকে বেরোতে পারলেই প্রকৃতির স্বাদ নেওয়া যায়। একটু দক্ষিণাবেলার হাওয়া গায়ে লাগলেই নতুন এক সৃষ্টিকল্পের উচ্ছ্বাস ভেসে ওঠে। আমাদের দেখতে হবে, ভাবতে হবে, শিখতে হবে। বাংলাদেশের প্রকৃতি শরতের দেশ। সব ঋতুতেই বিভিন্ন রকম সময় বিরাজ করে, যা প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলে এবং প্রত্যেককে জাগতে শেখায়। আমি আবার গ্রামে ফিরে যাচ্ছি। গাঁয়ের কথাই তো বলব। এ জন্যই মনে হয়, আমার গায়ে বেশি জোর। একটা কেমন যেন শক্তি ফিরে পাই। গায়েই যে আমি মানুষ, মাটি-মনের মানুষ। গাঁয়ে এখন এক অনন্য সুন্দর প্রকৃতি বিরাজ করছে। আর কিছুদিন পরই অতিথি পাখিরা চলে আসবে দক্ষিণের, উত্তরের কিংবা পশ্চিমের বিলগুলোতে। এখন শরতের যে রূপ প্রকৃতিতে বিরাজ করছে, তা এক ভাবার্থ বয়ে আনে। ধীরে ধীরে জল কমছে, বিলের কৃষিকাজ ও মৎস্য আহরণে ব্যস্ততা বাড়ছে। একই সঙ্গে ঘরে ঘরে অন্য রকম এক আবহ ধ্বনিত হয়। আশ্বিন মাসে দেবী দুর্গার আগমন এই ধরায়। শরতের কাশবনের পথে পথে যেন দেবী দুর্গা পৃথিবীতে আগমন করেন। শ্রীচণ্ডীপাঠের বর্ণিত কাহিনিতে শোনা যায়, দেবী দুর্গা কয়েকটি দিনের জন্য বাপের বাড়িতে এসে আবার ফিরে যান। এ সময় পূজা-অর্চনা, ভক্তি, পুষ্পাঞ্জলি ও অর্ঘ্য নিবেদন করা হয়। এই লোকসংস্কৃতি, লোকজ ধর্মীয় আচারযজ্ঞ—সবকিছুই শরতের এক বৃহত্তর প্রতিফলন। গোধূলিবেলায় পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্ত যায়। সূর্যের আশপাশে লাল মেঘ ঘোরাফেরা করে, যেন রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। ধু-ধু বনপ্রান্তরের ফাঁক দিয়ে সূর্য যখন উঁকি দিয়ে বিদায় নেয়, তখন আমরা আবার নতুন কিছু রচনা করতে উঠেপড়ে বসি। যেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের একটি কাহিনি। শরতের জাদু যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই সত্যি। আমি এখনো বুঝতে পারলাম না, শরতের মহামুক্ত প্রকৃতি আসলে কতটা শরৎ! কাশবন নিয়ে আর কত গল্প বলব? ফুলে ফুলে নুইয়ে পড়ে কাশবনের খেত। শরৎরূপী প্রকৃতি, তুমি আর কত লীলা দেখাবে? জগৎ-সংসারে সবই তো হচ্ছে অপরূপ ধারায়। কেউ দেখে, কেউ দেখে না। যারা দৃষ্টিহীন, তারাও কি শরতের শোভা পায়? তারা কি শরতের ধ্বনি শুনতে পায়? তুমি কি তাদের জন্য অন্য কোনো উপায় রেখেছ? কত প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে। শরতের রূপকে বলি, তাদের আমি দেখাতে পারি না। আমার লেখা তারা পড়তে পারে না, আমার কথা, আমার ভাষা তারা বুঝতে পারে না। তবে কীসের শরৎ, কীসের রূপ, কীসের আগমনী বার্তা? সত্যিই মনে এক কালি জমে যায়। সেই কালি আবার মুখে চলে আসে লিখতে লিখতে। এটাও কেমন একটা প্রকৃতি, কেমন একটা শরৎ! হয়তো কবিদের কোনো লেখায় আছে কি না, আমার জানা নেই। যদি থেকেও থাকে, তাহলে তাদের জন্য কিছু করে দাও। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে শরতের কাদা। শরতের কাদা খুব সুন্দর। বিলের পাড়ে শুকনো কাদার স্তর জমে। সেই জমির মধ্য দিয়ে এক পা এক পা করে হাঁটি। কিছুদূর এগোতেই নরম কর্দমাক্ত কাদার মধ্যে প্রবেশ করি। তখন কেমন যেন এক স্নিগ্ধ, শীতল অনুভূতি পাই। এর সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তারা হয়তো ঢের বুঝতে পারে। কাদারও একটা গন্ধ আছে। সেটা সব ঋতুরই। তবে এখন অনেকটা সুন্দর—ঠান্ডা, নরম, কলকলে। সঙ্গে যদি থাকে সবুজ ঘাস, সবুজ পাতা, তাহলে তো কথাই নেই। বারবার কেন আমরা শরতে গ্রামবাংলার প্রকৃতির মধ্যে ফিরে যাই? কেন সাহিত্যিক, লেখক, কবিরা শরতের মোহমুক্ত নেশায় ডুবে থাকেন? কেন শরতের শারদীয় রূপ বারবার ফুটে ওঠে? কেন কাশবনের দোলায় দোলায় প্রকৃতি মেতে ওঠে? এটাও এক অনন্ত প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি অবাক হয়ে যাই—আমি কী বলছি, কী সৃষ্টি করছি, এর সত্যতা কতটুকু, এর ধ্বনি কতটুকু?
সৈকত মল্লিক
সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬
0
সকালটা অন্য সবার মতো তারও শুরু হয়। কিন্তু তার সকালটা একটু আলাদা। অন্যরা যখন অফিসে বসে দিনের পরিকল্পনা করে, তখন সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায়। কখনো প্রচণ্ড রোদ, কখনো বৃষ্টি, কখনো যানজট—সবকিছুকে সঙ্গী করেই শুরু হয় তার কর্মদিবস। তার কাজ শুধু পণ্য বিক্রি করা নয়, তার কাজ হলো মানুষের দরজায় দরজায় গিয়ে নিজের কোম্পানি, নিজের পণ্য এবং নিজের যোগ্যতার কথা বোঝানো। কতবার যে শুনতে হয়, ‘আজ লাগবে না’, ‘পরে আসেন’, ‘আপনার পণ্য দরকার নেই’ প্রভৃতি। কখনো কেউ কথা না শুনেই ফিরিয়ে দেয়। তবুও সে থামে না। কারণ, তার পেছনে থাকে একটি পরিবার। মা-বাবার ওষুধ, সন্তানের স্কুলের খরচ, সংসারের বাজার, বাড়িভাড়া—সবকিছুর হিসাব তার মাথায় ঘুরতে থাকে। অনেক সময় দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয় না। তবুও মুখে হাসি রেখে পরের কাস্টমারের কাছে যেতে হয়। বৃষ্টিতে জামাকাপড় ভিজে যায়, রোদে শরীর পুড়ে যায়, পায়ে ব্যথা হয়, তবুও মাস শেষে টার্গেট পূরণ করতে না পারলে কেউ তার কষ্টের হিসাব করে না। অফিসে হয়তো শুধু একটা প্রশ্ন আসে, “টার্গেট কতটুকু হলো?” কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে না, “সারা দিন কতটা কষ্ট করেছ?” একজন সেলস ম্যানের হাসির আড়ালে তাই অনেক না-বলা গল্প থাকে। প্রতিদিনের প্রত্যাখ্যান, ব্যর্থতা, অপমান আর ক্লান্তিকে বুকের ভেতর চাপা দিয়ে সে আবার পরের দিন নতুন করে শুরু করে। কারণ সে জানে, তার ব্যর্থতা মানে শুধু তার নিজের ব্যর্থতা নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন। তাই একজন মার্কেটিং ও সেলস ম্যানকে শুধু তার বিক্রির সংখ্যা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। তার পেছনে হয়তো লুকিয়ে আছে হাজারও প্রত্যাখ্যান, অসংখ্য ঘামের ফোঁটা এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর এক নিরন্তর সংগ্রাম। সত্যি বলতে, সেলস ম্যান শুধু পণ্য বিক্রি করে না, সে প্রতিদিন নিজের আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য আর স্বপ্নকে বিক্রি না করে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই করে।
মোঃ হযরত আলী
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬
0
বাংলা সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে বহুল প্রচলিত একটি পঙ্ক্তি— ‘কুঁচবরণ কন্যা রে, তার মেঘবরণ কেশ।’ এ ধরনের উপমা বাংলার লোকসাহিত্যে প্রকৃতিনির্ভর সৌন্দর্যবোধের পরিচয় বহন করে। মানুষের রূপকে ফুল, ফল, নদী, মেঘ, পাখি কিংবা গাছের সঙ্গে তুলনা করা ছিল গ্রামীণ কাব্যভাষার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। এই ‘কুঁচ’ শব্দটি আজ অনেকের কাছেই অপরিচিত। অথচ একসময় গ্রামবাংলার প্রকৃতির সঙ্গে যার পরিচয় ছিল গভীর। কুচ একটি লতানো উদ্ভিদ, যার ছোট উজ্জ্বল লাল-কালো বীজ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গ্রামীণ জীবনে এটি শুধু অলংকার বা খেলনার উপকরণ ছিল না, বরং এর ছিল ব্যবহারিক গুরুত্বও। একসময় স্বর্ণকাররা কুঁচ ফলকে ওজনের একক হিসেবে ব্যবহার করতেন। প্রতিটি কুঁচ ফল প্রায় সমান ওজনের হওয়ায় ‘এক রত ‘ বা ‘আধরতি’ সোনা মাপতে এই বীজ ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ একটি ছোট্ট বীজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বাংলার বাণিজ্য, কারুশিল্প ও লোকঐতিহ্যের ইতিহাস। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কুঁচ আজ হারিয়ে যেতে বসেছে মানুষের চেনাজানা পৃথিবী থেকে। বিশেষ করে. শহুরে প্রজন্মের কাছে এটি প্রায় অচেনা। প্রযুক্তি, আধুনিকতা ও নগরায়ণের প্রবল স্রোতে প্রকৃতিনির্ভর বহু উপাদান, শব্দ ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে। তবে পরিবর্তন মানেই পুরাতনকে মুছে ফেলা নয়। সভ্যতা এগোবে, নতুন আসবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রায় যদি পুরোনো ঐতিহ্য, দেশীয় উদ্ভিদ ও প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, তবে মানুষই একসময় শেকড়হীন হয়ে পড়বে। কারণ, সভ্যতা শুধু মানুষের জন্য গড়ে ওঠে না। জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি আমাদের মাতৃক্রোড়ের মতোই আগলে রেখেছে। বর্তমানে বিদেশি ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছের আগ্রাসনে দেশীয় বহু উদ্ভিদ হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের আঙিনা, গ্রাম, পথঘাট ও বনভূমিতে দেশি গাছের উপস্থিতি কমে যাচ্ছে দিন দিন। অথচ দেশীয় গাছ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে না, এরা পাখি, পোকামাকড় ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থলও তৈরি করে। তাই প্রয়োজন নতুন ও পুরাতনের সমন্বয়। আধুনিকতার পাশাপাশি দেশীয় প্রকৃতি ও ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করতে হবে। সন্তানদের দেশি গাছ, ফল, ফুল ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। প্রকৃতিকে কেবল ব্যবহার নয়, বন্ধুর মতো ভালোবাসতে হবে। কারণ, প্রকৃতি বাঁচলে তবেই টিকে থাকবে মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতা।
জামান আল আসাদ
সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
0
রক্ষণশীল উনিশ শতকে যখন নারীর পৃথিবী ছিল ঘরের চার দেয়ালে বন্দী, তখনই শিক্ষার প্রদীপ হাতে এগিয়ে এসেছিলেন এক নারী। নিজের সম্পদ, মেধা ও সাহস দিয়ে তিনি তৈরি করেছিলেন নতুন পথ। তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী। কুমিল্লার লাকসামের পশ্চিমগাঁও। সবুজে ঘেরা এই জনপদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। আজ থেকে প্রায় দেড় শ বছর আগে এ মাটিতেই জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক নারী, যাঁর চিন্তা ও কর্ম তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। তখন সমাজে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। মুসলিম নারীদের ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা ছিল আরও প্রকট। কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে থেমে যাননি ফয়জুন্নেসা। বরং শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজসেবাকে জীবনের ব্রত করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার নারীশিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৮৩৪ সালে তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার লাকসামের পশ্চিমগাঁওয়ে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্ম ফয়জুন্নেসার। পারিবারিক পরিবেশে থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চার সুযোগ পান। বাংলা, আরবি, ফারসি, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি জ্ঞান অর্জন করেন। তবে তাঁর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল কেবল নিজের জ্ঞান বাড়ানোর জন্য নয়। পরবর্তী সময়ে তিনি উপলব্ধি করেন—নারীরা শিক্ষিত না হলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিই তাঁকে ব্যক্তিগত জ্ঞানচর্চার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সমাজের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়। ফয়জুন্নেসার সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি নারীশিক্ষার প্রসারে। মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি তাঁদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৮৭৩ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি পরবর্তীকালে নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত হয়। আজ মেয়েদের স্কুলে যাওয়া স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু উনিশ শতকে একজন নারী নিজ উদ্যোগে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করছেন—এটি ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। তিনি যেন নিজের কাজ দিয়েই সমাজকে প্রশ্ন করেছিলেন—জ্ঞান অর্জনের অধিকার থেকে নারীরা কেন বঞ্চিত থাকবে? ফয়জুন্নেসার সমাজসেবার পরিধি ছিল বিস্তৃত। নিজের জমিদারি থেকে পাওয়া অর্থ তিনি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক, পুকুর ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে তাঁর অবদান ছিল। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্যও তিনি কাজ করেছেন। তাঁর কাছে জমিদারি ছিল কেবল সম্পদ ভোগের মাধ্যম নয়; বরং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ। ফয়জুন্নেসার পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর সাহিত্যকর্ম। তিনি রচনা করেন ‘রূপজালাল’। উনিশ শতকের একজন মুসলিম নারী হিসেবে সাহিত্যচর্চা করা ছিল নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী ঘটনা। ‘রূপজালাল’ তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি তৎকালীন সমাজ ও নারীজীবনের নানা দিক বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কলমে ব্যক্তিগত অনুভূতি, জীবনসংগ্রাম ও সমাজবাস্তবতার ছাপ ফুটে উঠেছে। এক হাতে সমাজসেবা, অন্য হাতে কলম—ফয়জুন্নেসার জীবন যেন প্রমাণ করে, নারীর সামর্থ্যকে কোনো একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। ফয়জুন্নেসার কাজ ও অবদানের স্বীকৃতি এসেছিল তাঁর জীবদ্দশাতেই। ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী রানি ভিক্টোরিয়া তাঁকে ‘নওয়াব’ উপাধিতে ভূষিত করেন। একজন বাঙালি মুসলিম নারীর জন্য এই স্বীকৃতি ছিল সেই সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে ইতিহাসের বিচারে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো রাজকীয় উপাধি নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়েছে মানুষের জন্য করা তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে। ফয়জুন্নেসার জীবনকে শুধু একজন জমিদার নারীর জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্ব বোঝা যাবে না। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের সময়ের সামাজিক বাস্তবতাকে বুঝেছিলেন এবং সেই বাস্তবতার পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তিনি জানতেন, একটি মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে শুধু একজন মানুষকে শিক্ষিত করা নয়; বরং একটি পরিবারকে, একটি প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা। এই চিন্তাই তাঁকে নারীশিক্ষার জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সময় বদলেছে। বাংলাদেশের মেয়েরা আজ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, গবেষক, উদ্যোক্তা, প্রশাসকসহ নানা পেশায় নারীরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। এই পরিবর্তন এক দিনে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে বহু মানুষের দীর্ঘ সংগ্রাম ও উদ্যোগ। সেই পথের প্রাথমিক পর্যায়ের সাহসী নারীদের একজন নওয়াব ফয়জুন্নেসা। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় কোনো ক্ষমতা প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় দূরদর্শী চিন্তা, সাহস এবং মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা। ১৯০৩ সালে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণীর জীবনাবসান হয়। কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যু তাঁর আদর্শের মৃত্যু নয়। পশ্চিমগাঁওয়ের সেই নারী আজও বেঁচে আছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তাঁর সাহিত্যকর্মে, তাঁর সমাজসেবার স্মৃতিতে এবং সবচেয়ে বেশি—নারীশিক্ষার যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তার বাস্তবতায়। উনিশ শতকের এক রক্ষণশীল সমাজে দাঁড়িয়ে তিনি যে প্রশ্নটি তুলেছিলেন, আজ তার উত্তর আমরা দেখতে পাই বাংলাদেশের লাখো শিক্ষিত নারীর জীবনে। তাই নওয়াব ফয়জুন্নেসা শুধু ইতিহাসের একটি নাম নন; তিনি এমন এক আলোকবর্তিকা, যার আলোয় পথ চলেছে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য নারী।
হুমায়রা তাবাসসুম আফসানা
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
0
শরীরচর্চার প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিমে নিয়মিত ব্যায়াম করার প্রবণতাও বাড়ছে। তবে শুধু ভারী ওজন তোলা বা দীর্ঘ সময় জিমে কাটালেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। সঠিক কৌশল, ধারাবাহিক অনুশীলন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সুষম খাদ্যের সমন্বয় প্রয়োজন। ব্যায়ামের সময় মনোযোগ জরুরি। নির্দিষ্ট পেশিকে লক্ষ্য করে ব্যায়াম করার সময় সেই পেশির নড়াচড়া ও সংকোচনের দিকে মনোযোগ দেয়া কার্যকর হতে পারে। একে সাধারণভাবে ‘মাইন্ড-মাসল কানেকশন’ বলা হয়। তাই জিমে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা ফোন ব্যবহারের বদলে অনুশীলনে মনোযোগ দেয়া ভালো। পরিশ্রমের পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা। প্রতিটি সেটে ব্যর্থতার পর্যায়ে পৌঁছানো বাধ্যতামূলক নয়। বরং নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী এমন ওজন ও পুনরাবৃত্তি বেছে নেয়া উচিত, যাতে ধীরে ধীরে পেশির ওপর প্রশিক্ষণের চাপ বাড়ানো যায়। প্রোগ্রেসিভ ওভারলোড শরীরচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। সময়ের সঙ্গে ওজন, পুনরাবৃত্তি, সেট বা অনুশীলনের মান ধীরে ধীরে বাড়ানোর মাধ্যমে শরীরকে নতুন উদ্দীপনা দেয়া যায়। তবে এটি অবশ্যই সঠিক কৌশল বজায় রেখে করতে হবে। সব ব্যায়াম সবার জন্য সমান কার্যকর নয়। কোনো ব্যায়াম করার সময় অস্বস্তি, ব্যথা বা ভুল ভঙ্গি তৈরি হলে সেটি জোর করে চালিয়ে যাওয়া ঠিক নয়। প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে নিজের লক্ষ্য ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যায়াম নির্বাচন করা ভালো। শরীরের তুলনামূলক দুর্বল অংশগুলো শনাক্ত করে প্রশিক্ষণ পরিকল্পনায় সেগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। তবে কোনো পেশিকে দীর্ঘ সময় সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে পুরো শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। ব্যায়ামের সময় নিয়েও বাস্তবসম্মত হতে হবে। কার্যকর শরীরচর্চার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে থাকা আবশ্যক নয়। ব্যক্তির লক্ষ্য, প্রশিক্ষণের ধরন ও সক্ষমতার ওপর ওয়ার্কআউটের সময় নির্ভর করে। আবার সেটের মাঝখানে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ। খুব কম বিশ্রাম নিলে সব ধরনের ব্যায়ামে ভালো ফল নাও পাওয়া যেতে পারে। শরীরচর্চার ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণ ও পুষ্টি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য বই, গবেষণা এবং যোগ্য প্রশিক্ষকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইউটিউবের সব তথ্যকে বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক ধরে নেয়া ঠিক নয়। পেশি গঠন ও শরীরের পুনরুদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য নিয়মিত ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম উপকারী। সবশেষে আসে পুষ্টি। পর্যাপ্ত প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, স্বাস্থ্যকর চর্বি, ভিটামিন, খনিজ ও পানি শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে। শুধু খাবার বা শুধু ব্যায়াম কোনোটিই একা কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করে না। নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম ও ধারাবাহিকতা এই সবকিছুর সমন্বয়েই স্বাস্থ্যকরভাবে পেশি গঠন ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব।
রাইসা মেহজাবীন
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
0
ডেঙ্গু এ দেশের প্রতিবছরের সমস্যা। একসময় করোনা সারা বিশ্বের সমস্যা ছিল। সবার প্রচেষ্টায় দ্রুত টিকা আবিষ্কার করে এ রোগ থেকে মুক্তি মিলেছে, কিন্তু ডেঙ্গু একান্তই আমাদের সমস্যা। সারা বছর এ সময়টা হাসপাতালগুলো ভরা থাকে ডেঙ্গু রোগীতে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, শনির আখড়া এই এলাকাগুলো সব সময় অন্য এলাকা থেকে এগিয়ে থাকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর দিক থেকে। জুরাইনের প্রতিটি ঘরে এখন ডেঙ্গুর রোগী। জ্বর, মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা নিয়ে ভুগছে অনেকেই। এ ক্ষেত্রে কে ডেঙ্গু রোগী, আর কার সাধারণ জ্বর, তা রক্ত পরীক্ষা ছাড়া বোঝার উপায় নেই। দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষের জন্য রক্ত পরীক্ষা, ডেঙ্গু হলে তার চিকিৎসা করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মধ্যবিত্তের জন্য এ রোগের চিকিৎসা ব্যয় মেটানো এখন দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। চার বছরের শিশুটা মায়ের ওড়না ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মলিন মুখে। মা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সাত-আট মাসের পেগনেন্ট মা শিশুটি দরজার কাছে গিয়ে দারোয়ানকে বলছে, “আংকেল, আমাকে একটু ভেতরে যাইতে দ্যান। আমার বাবা আমারে না দেখলে কান্দে।” আইসিইউতে শিশুটির বাবা। দুদিনের জ্বর নিয়ে এসেছে। অবস্থা খারাপ দেখে দেয়া হয়েছে আইসিইউতে। এই লোকের লাঞ্চ, লিভারে পানি জমেছে। এ বছর ডেঙ্গুর চরিত্র বোঝা দায়। কারও এক শ চার ডিগ্রি জ্বর। কারও নিরানব্বই। কারো পাতলা পায়খানা সাথে। কারও লাঞ্চে, কারও লিভারে পানি জমে যাচ্ছে। জানি না শিশুটির বাবার কী খবর। আইসিইউতে নেয়া আটজনের ছয়জনই মারা গেছে। দুই বছর আগে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ভাইকে দেখেছি রোগীদের মাঝে। শিশুটির মাথায় হাত রেখে বললাম, তোমার বাবা ভালো হয়ে যাবে। নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কাছেই অচেনা লাগল। দুই বছর ধরে আট বছরের এতিম ভাতিজাকে খাওয়ার সময় বোঝাতে হচ্ছে, আমাদের কোনোমতে খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে বাবা। একদিন সব সমস্যা শেষ হবে। বাবা না থাকায় একটি শিশুর পুরোটা জীবন বদলে গেল আঁধারে। একটি আটত্রিশ বছরের বিধবা মেয়ের জীবনযুদ্ধটা কঠিন থেকে কঠিন হয়ে গেল। একজন নব্বই উত্তীর্ণ পিতার জীবন জাহান্নাম হয়ে গেল। হাসপাতাল থেকে আসার সময় দেখে এসেছি, লোকটির প্লাটিলেট পাঁচ হাজার। স্বামীর জীবন, আর আইসিইউয়ের বিলের দুঃশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে একটি সন্তান পেটে এবং একটি সন্তানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নারী হাউমাউ করে কেঁদে জড়িয়ে ধরল। বললাম, সব ঠিক হয়ে যাবে। আল্লাহকে ডাকো। আমাদের বলার কোনো জায়গা নেই। সমস্যার সমাধানে কোনো গবেষণা নেই। আমাদের আছে লাখ লাখ টাকা বিল করার মতো হাসপাতাল। আকাশের পানে তাকাব, সে উপায় নেই। উন্নয়নের চিহ্ন আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা আমাদের আকাশকেও কেড়ে নিয়েছে। আমরা এখন মানুষের কাছে রক্তের প্রার্থনায় হাত পেতে আছি।
শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
0
পৃথিবীতে এমন একটি দিন কল্পনা করা যাক, যেদিন কোনো মানুষ মিথ্যা বলতে পারবে না। ইচ্ছা থাকলেও সত্যকে আড়াল করার সুযোগ থাকবে না। মুখে যা আসবে, তা আড়াল করার আগেই প্রকাশ পাবে। সম্পর্ক, রাজনীতি, ব্যবসা, বন্ধুত্ব কিংবা পারিবারিক জীবনের বহু অপ্রকাশিত কথা সেদিন হঠাৎ প্রকাশ্যে চলে আসবে। মিথ্যাগুলোর সত্যরূপ বের হয়ে যাবে। পৃথিবীটা ওই দিন চরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষ নিজের এবং অন্যের বাস্তবতাকে নতুন করে দেখতে শিখবে। বাস্তব বিষয়টা জানবে। মানুষের জীবনে মিথ্যার উপস্থিতি খুব স্বাভাবিক। মিথ্যাটাকে মাধ্যমস্বরূপ ব্যবহার করা হয় নিজেকে বাঁচাতে, অন্যকে কষ্ট না দিতে, কখনো নিজের দুর্বলতা লুকাতে। আবার কখনো মিথ্যা হয়ে ওঠে স্বার্থরক্ষার অস্ত্র। প্রকৃতির সাথে থেকেই মানুষ শিখে যায় কোন সত্য বলা যায়, কোন সত্য গোপন রাখতে হয় এবং কখন একটি মিথ্যা পরিস্থিতিকে সহজ করে দিতে পারে। কিন্তু যদি সেই সুযোগটি এক দিনের জন্যও না থাকে? সকালের শুরুতেই পৃথিবী বদলে যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রে বহু প্রশংসা হঠাৎ অর্থহীন হয়ে যাবে। যোগ্যতার চেয়ে পরিচিতি বা সুবিধা পাওয়ার যে অদৃশ্য পথগুলো রয়েছে, সেগুলো প্রকাশ্যে চলে আসবে। কেউ নিজের ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হবে, কেউ অন্যের প্রাপ্য কৃতিত্ব নেয়ার বিষয়টি প্রকাশ করবে। অনেক প্রতিষ্ঠানের সুন্দর মুখোশের আড়ালে থাকা অসংগতি মানুষের সামনে চলে আসতে পারে। সত্যের পর্দায় আড়াল করা দুর্নীতি, অবিচার সব উন্মোচিত হয়ে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়বে। ভালো ফলাফলের পেছনে পরিশ্রমের পাশাপাশি যে চাপ, ভয়, তুলনা ও প্রত্যাশা কাজ করে, সেগুলো প্রকাশ পাবে। শিক্ষার্থীরা হয়তো প্রথমবার স্বীকার করবে যে সব সময় ভালো থাকার অভিনয় তাদের কতটা ক্লান্ত করে। অভিভাবকেরাও বুঝতে পারবেন, সন্তানের ভালো ফলাফল নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশা কখনো কখনো সন্তানের নিজের স্বপ্নকে চাপা দিয়ে দেয়। বন্ধুত্বের জায়গাটি সেদিন মোটেও সহজ থাকবে না। বহু বন্ধুত্ব টিকে থাকে কিছু না বলা কথা, ছোটখাটো অভিমান কিংবা গোপন ঈর্ষার ওপর। সত্য প্রকাশের দিনে সেই আবেগগুলো আর লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কিছু বন্ধুত্ব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে, আবার কিছু বন্ধুত্ব আরও শক্ত হতে পারে। কারণ, সত্য কখনো কখনো সম্পর্ক শেষ করে, আবার কখনো সম্পর্ককে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকার হাত থেকে বাঁচায়। পরিবারের ক্ষেত্রেও দিনটি হতে পারে সবচেয়ে কঠিন। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি যে অভিমান, প্রত্যাশা, ভয় ও না-পাওয়া জমিয়ে রাখে, সেগুলো সামনে আসবে। হয়তো কেউ প্রথমবার বুঝতে পারবে, তার কাছের মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রেখেছে। আবার কেউ উপলব্ধি করবে, ভালোবাসার নাম করে সে অন্যের ওপর কতটা চাপ, কতটা অভিনয় করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জগতেও ব্যতিক্রম হবে না। সেদিন সাজানো জীবন দেখানোর সুযোগ থাকবে না। সাফল্যের ছবির পাশাপাশি ব্যর্থতার গল্পও প্রকাশ পাবে। আনন্দের পোস্টের আড়ালে থাকা একাকিত্ব, আত্মবিশ্বাসের আড়ালে থাকা ভয় কিংবা নিখুঁত জীবনের ছবির পেছনের বাস্তবতা সামনে চলে আসবে। মানুষ বুঝতে পারবে, পর্দায় দেখা জীবন আর বাস্তব জীবন এক নয়। তবে সত্যের সেই দিনটি শুধু অস্বস্তিকর হবে না; শিক্ষণীয়ও হবে। মানুষ বুঝতে পারবে, সত্য সব সময় সুন্দর নয়। সত্য শুনলে কষ্ট হয়, কিছু সত্য সম্পর্কের ভিত নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু মিথ্যার ওপর তৈরি শান্তি অনেক সময় সাময়িক। সত্যের মুখোমুখি হওয়ার পর যে সম্পর্ক টিকে যায়, সেটি আগের চেয়ে বেশি বাস্তব। দিন শেষে পৃথিবী আবার আগের মতো হয়ে যাবে। মানুষ আবার প্রয়োজনমতো কিছু কথা লুকাবে, কিছু কথা সাজিয়ে বলবে, কিছু সত্য নিজের ভেতরে রেখে দেবে। কিন্তু সেই এক দিনের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে থেকে যাবে। হয়তো সবাই প্রতিদিন পুরোপুরি সত্য বলতে পারবে না। কিন্তু অন্তত নিজের কাছে সত্যি থাকার অভ্যাস তৈরি হতে পারে। কারণ, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী অনেক সময় অন্য কেউ নয় নিজের কাছেই নিজের বলা মিথ্যাগুলো এক দিনের সত্য পৃথিবীকে বদলে দেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। কিন্তু মানুষকে নিজের মুখোশের দিকে তাকাতে বাধ্য করবে এটুকু নিশ্চিত। আর হয়তো সেই এক দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হবে, সত্য সম্পর্ক ভাঙার থেকে মিথ্যার তৈরি দেয়াল সরিয়ে সম্পর্ককে সত্যিকারের করে তোলা।
মিফতাহুল জান্নাত মুনা
সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
0
ইট-পাথরের ধূসর ঢাকায় বুক ভরে একটু শ্বাস নেয়ার ভরসাস্থল জিয়া উদ্যান। চন্দ্রিমা উদ্যান নামেও পরিচিত জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীতের এই সবুজ প্রাঙ্গণটি নাগরিক ক্লান্তি কাটানোর এক পরিচিত ঠিকানা। সবুজে ঘেরা বিশাল লেক আর দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত সেতু পার্কটির মূল আকর্ষণ। প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী আসেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রাঙ্গণে জিয়ারত করতে। আবার অনেকেই আসেন ছায়াশীতল প্রকৃতির বুকে পরিবার নিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে। লাখো মানুষের এই সমাগম ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ হকার ও চা-ফুচকার এক প্রাণবন্ত ক্ষুদ্র অর্থনীতি। সহজ যোগাযোগের কারণে যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে একচিলতে স্বস্তি পেতে জিয়া উদ্যান আজও নগরবাসীর প্রিয় আশ্রয়।
সাব্বির হোসাইন
সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
0
প্রবাস মানেই টাকার গাছের নিচে বসবাস নয়। এখানে ডলার কামাই করতে হয় শরীরের ঘাম ঝরিয়ে। এটা সেই প্রবাসজীবন, যেখানে সারা রাত ছারপোকার ও মশার কামড়, অবৈধ অভিবাসনের দায়ে পুলিশের ভীতি, বিষণ্ন মেজাজে ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাপড় ধোয়া, খাবার বানানো, সারা দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম, ক্লান্ত শরীরে রুমে এলে পরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নতুবা খাবার ও রান্নার গোসলের পানির সংকট। কখনো-বা ড্রেনের পানি দিয়েই গোসল করে ভাগ্যবদল করতে আসা প্রবাসীরা। প্রবাসজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত এক একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার অভিজ্ঞতা জন্ম দেয়। সেই সাথে প্রতিটি দিন গায়ে মাখতে হয় গ্রীষ্মের দাবদাহ। মাথায় গায়ে পরানো থাকে যন্ত্রণাদায়ক পারসোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) হেলমেট, মোটা কাপড় পরিধান, সেফটি লম্বা বুটজুতা — এ যেন আমার আমি; এক জীবন্ত রোবট। মাথার ওপর দিয়ে ঘোরে হাজার টন লোহার ভারী বাহন, ঝুঁকিতে সঁপে দিতে হয় নিজেকে। ইট-পাথরের পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত দেশটি; পাথরের মতো শক্ত এখানকার মানুষের মন। এখানে অবহেলা অনাদরে ভরা নিয়োগকর্তার কাজের চাপাচাপি বুঝতে বাকি থাকে না; এখানে মানুষের চেয়ে কর্মের মূল্য বেশি। যখন মাঝরাতে প্রচণ্ড জ্বরে কাঁপে নিজের শরীর, বিষাদে তেতো থাকে মুখ, নিজের হাতে বালতি টেনে মাথায় নিজেই দিতে হয় পানি; কখনো চলে জ্বরের প্রলাপ, ‘কাল কাজে যাব না, দীর্ঘদিন বিশ্রামবিহীন’, কিন্তু সকাল হলে পরে নিজের কথা না ভেবে ঠিকই কর্মস্থলে ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে যোগদান করে এসব প্রবাসী। আমার সবুজ শ্যামল জন্মভূমির পরতে পরতে ছিটানো থাকে মায়া-মমতা আর ভালোবাসা। তৃষ্ণা পেলে পান করি মাতৃভূমির স্তনের শীতল অমৃত সুধা। পক্ষান্তরে অবহেলায় ভরা জন্মভূমিহীন অভিবাসন — এ শুধু মরীচিকা। এখাকার পানিতে তৃষ্ণা মেটে, তবে মাতৃভূমির দুগ্ধের মতো নয়। নিছক দায় এড়ানো বা বেঁচে থাকার তাগিদে। তবু উদ্দেশ্য একটাই, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা; পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। একটু ভালো থাকার আশা বুকে বেঁধে কষ্টের মাঝে দিনাতিপাত। ‘শত জীর্ণতায় জীবন যাপন করেও পরিবারকে বলছে ‘আমরা ভালো আছি’। পরিবারের কাছে মিথ্যা বলেও সুখ পায় এসব হতভাগ্য প্রবাসী।
আব্দুল্লাহ আল মামুন
সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
0
বাবার দেরাজ থেকে চুরি করে পড়া আমার প্রথম উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’। বর্ষা রাতে টিনের চালে একটানা বৃষ্টির শব্দ টিমটিমে হারিকেনের আলোয় পড়া আমার স্মৃতিতে অম্লান অপুর জীবন আজও আমার গ্রামের আনাচকানাচে খুঁজে বেড়াই। নদীর তীরে ঘাটে বসে শ্মশানে কল্পনা করি, এখানেই বুঝি অপুর মায়ের শেষকৃত্য করা হয়েছিল। প্রতিটি সন্তানের জীবনে মা-বাবা হারানো সুর এক এক রকম। অপুর জীবনেও তেমনি। বিশেষ করে অপুর মা-বাবার মৃত্যু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অপুর অনুভূতির ছোঁয়ায় হৃদয়স্পর্শী করে তুলেছেন, “যে বাবাকে সকলে মিলিয়া আজ মণিকর্ণিকার ঘাটে দাহ করিতে আনিয়াছিল,... রোগে, জীবনের যুদ্ধে পরাজিত সে বাবা স্বপ্ন মাত্র... অপু তাহাকে চেনে না, জানে না... তাহার চিরদিনের একান্ত নির্ভরতার পাত্র, সুপরিচিত, হাসিমুখ বাবা জ্ঞান হইয়া অবধি পরিচিত সহজ সুরে, সুকণ্ঠে, প্রতিদিনের মতো কোথায় বসিয়া যেন উদাস পূরবীর সুরে আশীর্বাচন গান করিতেছে— কালে বর্ষতু পর্জন্যাং পৃথিবী শস্যশালিনী লোকাঃ সন্তু নিরাময়ঃ। “ঘরের পৈঠায় অপু চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। উঠানের বাহিরে আগড়ের কাছে এক জায়গায় পোড়া খড় জড়ো করা। সেদিকে চোখ পড়িতেই অপু শিহরিয়া উঠিল। সে বুঝিয়াছে, মাকে যাহারা সৎকার করিতে গিয়াছিল, দাহ অন্তে তাহারা কাল এখানে আগুন ছুঁইয়া নিমপাতা খাইয়া শুদ্ধ হইয়াছে। প্রথাটা অপু জানে। মা মারা গিয়াছেন এখনো অপুর বিশ্বাস হয় নাই। একুশ বছরের বন্ধন, মন এক মুহূর্তে টানিয়া ছিড়িয়া ফেলিতে পারে নাই, কিন্তু পোড়া খড়গুলাতে নগ্ন, রূঢ়, নিষ্ঠুর সত্যটা। মা নাই! মা নাই...”
ঘোষ উত্তম
সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
0
প্রিয় আকাশ কেমন আছ আকাশ? কেমন আছে তোমার দখিনের জানালা? বলাবাহুল্য, তবু জানতে চাইলাম। তুমি যে ভালো নেই, সে আমি খুব বুঝতে পারি। আমি জানি, তোমার বুকে মেঘ জমেছে খুব। জানো আকাশ, আমারও বড্ড বেড়েছে অসুখ। এমন কেন হয়! তোমার বুকে মেঘ জমলে আমার চোখে বৃষ্টি নামে কেন? গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, কামিনী, দোলনচাঁপা বৃষ্টির জল পেয়ে কেমন চনমনিয়ে উঠেছে দেখো। অথচ আমি বিষাদ পুষি আজও। হঠাৎ হঠাৎ অসুখ করে, দুচোখ এমন জলে ভরে, ঘুম উড়ে যায় কোথায় কোথায়, বুক ভেঙে যায় দারুণ ব্যথায়। এমন কেন হবে? আবার যখন মেঘ ভেসে যায়, জোছনা এসে উঠোন ভাসায়, আমি বসি ঘরের দাওয়ায়। নেই যে তুমি আমার পাশে, তাই তো জোছনা আগলে রাখি সবুজ ঘাসে। ছুঁয়ে থাকি, যেমন করে দূর থেকে তোমার বুকে গল্প আঁকি। তেমন করেই ছুঁয়ে থাকি। কখন যেন ভোর হয়ে যায়, উদিত কিরন পরাগ মাখায় চোখের পাতায়। আমি চমকে উঠি, চমকে উঠি ভীষণ। এই যে সারা রাত আগলে ছিলাম, ফুরিয়ে গেল! ফুরিয়ে গেলে তুমি? তাকিয়ে দেখি তোমার বক্ষজুড়ে আলোকধারা নামছে ভূপৃষ্ঠ চুমি। হাতের মুঠো শূন্য আমার ফুরিয়ে গেছে সব। ফুরিয়ে গেছে জোছনা রাতি, পাখির কলরব। তুমি বলেছিলে, বলছিলে একদিন আমরা একত্রে মেঘ জমিয়ে বৃষ্টি হব, ঝিলের জলে পদ্ম হব। আমাদের অনেক গল্প হবে, স্বপ্নগুলো জীবন পাবে। কিন্তু সেসব কিছু হয়নি আকাশ। অথচ দেখো, তোমার আকাশে আজও মেঘ করে বৃষ্টি নামে, কেবল আমি ছুঁতে পারি না। আজও তুমি জোছনা নামাও, অন্য কারও উঠোন ভাসাও। কেবল আমি, আমিই ভিজতে পারি না। আমাদের আর কোনো গল্প হয়নি। কেবল একটা সময় বুঝতে পারলাম, আমরা তুমি আর আমি হয়ে গেছি। ইতি ফুরিয়ে যাওয়া বসন্ত
আয়শা আক্তার শিল্পী
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
0
ভগবানগোলা মুর্শিদাবাদ জেলার একটি প্রাচীন জনপদ ও নদীবন্দরের নাম। এই জনপদ ও বাজারটির অবস্থান নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। কেউ বলছেন, আঠারো শতকের ভাগীরথীর পূর্ব তীরের এক সমৃদ্ধ কিংবা প্রধান নদীবন্দর। আবার কেউ বলছেন, এটা আঠারো শতকের পদ্মা নদীর পশ্চিম তীরের একটি বিশাল বাজার কিংবা জনপদ। আসলে বন্দরটি আঠারো শতকেই গড়ে উঠেছিল। কিন্তু পদ্মা নদীর পশ্চিম তীরে যে এই জনপদ বা নদী বন্দরটি গড়ে উঠেছিল, তা অনেকেই জোরালো অভিমত প্রকাশ করেছেন। আরেকটি পক্ষের অভিমত স্থানটি আজকের চরলবণগোলা অর্থাৎ পদ্মার পূর্ব তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল। ১৭৪০ সালে মারাঠারা চারবার লুণ্ঠন চালালে জনপদটি ধ্বংস হয়ে যায়। জনপদটিকে কেউ কেউ আলাতলী বলেও চিহ্নিত করেছে। চর্যাপদ খ্যাত গোবিন্দ দাসের শ্রীপাঠে একটি প্রাচীন মন্দির ছিল। মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল ভূধর কিসমত মৌজার তেলিয়া বুধুরিয়ায়। প্রাচীন জনপদ ও মন্দিরটির আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে ভগবানগোলা রেলস্টেশনের অদূরে আম্রকাননের ছায়াতলে। জনশ্রুতি আছে, হুসেন শাহের রাজত্বকালে মুকসূদন দাস নামক জনৈক নানকপন্থী এক সন্ন্যাসী মুর্শিদাবাদে আসেন। তাঁর ভাবশিষ্য ভগবান দাস পদ্মাতীরে রঘুনাথের মন্দির এবং একটি গোলা বা বাজার গড়ে তোলেন। অনেকের মতে, এই ভগবান দাসের নামানুসারে জনপদটির নাম ভগবানগোলা।১৬০০ শতক থেকে এই জনপদের পত্তন হয়। অর্থাৎ বাংলায় মোগল শাসন প্রবর্তনের সময়কালে। ‘আইন -ই-আকবরী’তে সরকার মাহমুদাবাদের অন্তর্গত ভগবানগোলার নামোল্লেখ রয়েছে। এই বন্দর-বাজার থেকে নৌকায় করে তুলো, চাল, রেশম, শস্য, ঘি, তেল ও পণ্যসামগ্রী কেনা-বেচা চলত। এসব পণ্যসামগ্রীর বিদেশের বাজারগুলোতে প্রচুর চাহিদা ছিল। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই বাজার ও নদীবন্দর থেকে বাৎসরিক ত্রিশ লাখ টাকার শুল্ক আদায় হতো। প্রসঙ্গত, নবাব আলীবর্দীর শাসনামলে জনপদটি ও বন্দরটি চরম উন্নতির শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তাঁর আমলেই বর্গীরা চারবার আক্রমণ করলে এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। স্থায়ী সামরিক সেনা ছাউনির ব্যবস্থা করেও তা রক্ষা করা যায়নি। এ ছাড়া ভগবানগোলার সমৃদ্ধি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯ শতকের প্রথম দিকেই পদ্মার প্রবাহ প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে সরে যায় এবং এই জনপদের বাণিজ্যও শেষ হয়ে যায়। ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে এই জনপদ ও নদীবন্দরের নাম উল্লেখ আছে। ইতিহাস স্বীকৃত ৬০০ মণের বজরা নদীবন্দর দিয়ে যাতায়াত করত। এবং সব সময় দেশি-বিদেশি বণিকরা তাঁদের পণ্য পরিবহন নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বিশ্বখ্যাত নদীবন্দর বা ব্যবসা কেন্দ্রটির অস্তিত্ব না থাকলেও ইতিহাসের পাতায় ঠিকই জায়গা আছে। আজকের ভগবানগোলাকে মনে হয় হতশ্রী। কিন্তু আঠারো শতকে জনপদটি ছিল নগরসভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। নবাব আলীবর্দী খান বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করলে এই জনপদের বিশাল উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এই নদীবন্দর থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অতি সহজেই যোগাযোগ করা যেত, এমনকি বিদেশেও। নদীবন্দরটি খাদ্যশস্য ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। গঙ্গা নদী মুর্শিদাবাদ জেলাকে দুভাগে ভাগ করেছে, রাঢ় ও বাগড়ী। এ ছাড়া আরেকটি বিভাগের নাম ভড়। বাগড়ী ক্রমশই নিচু হয়ে পদ্মাকে স্পর্শ করেছে। নরম পলিমাটি যুক্ত হওয়ায় নদীগুলো বহুবার খাত পরিবর্তন করছে। এই বিভাগটি প্রধানত লালগোলা, ভগবানগোলা, জলঙ্গী প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হন এবং নৌকাযোগে মুর্শিদাবাদ থেকে গোপনে রাজমহলের দিকে রওনা হন এই ভগবানগোলা জলপথে। অবশ্য মালদহের কাছে সিরাজ ধরা পড়েন এবং বন্দী করে আবার মুর্শিদাবাদে নিয়ে এসে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আলাতলী ধ্বংস হলে পত্তন হয় নতুন ভগবানগোলার। এখনকার ভগবানগোলা কোনোমতেই তখনকার ভগবানগোলার সমকক্ষ নয়। তবে এখানে রেলস্টেশন, উচ্চ বিদ্যালয়, ডাকঘর, থানা ও বালিকা বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। সরকার বাহাদুরের কাছে বর্তমান বাসিন্দাদের একটি মহাবিদ্যালয়ের দাবি। আমিও সরকার বাহাদুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ভগবানগোলা ভাগীরথী, পদ্মা ও ভৈরব এবং দামোসবেষ্টিত। এখানকার মাটি দোঁয়াশ, বেলে ও উর্বর। অনেক খাল দৃশ্যমান। বটতলা, বরসাতিগোলা, মহেশ নারায়ণগঞ্জ, রামবাগে প্রতিদিন সবজির বাজার বসে। এ ছাড়া পশুর হাট বসে। বৈশাখ মাসে খাতরের মেলা হয়। কেদার স্মৃতি পাঠাগার সকলের নজর কাড়ে। ভগবানগোলায় সিরাজের ধরা পড়ার ইতিহাস জড়িত। আজ এই জনপদের সেই জৌলুশ নেই। আগের সব স্মৃতি মুছে গেছে। নদীবন্দরটিতে একসময় বণিকদের আস্তানা গড়ে উঠেছিল। জৌলুশ থাকুক আর না থাকুক, তবুও বিভিন্ন কারণে ইতিহাসের পাতায় চিরশাশ্বত থাকবে।
মাজরুল ইসলাম
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
0
বাংলাদেশের মেঠোপথ আর পাহাড়ি বা গ্রামীণ অঞ্চলের রূপবৈচিত্র্যের অন্যতম উপাদান হলো ছোট নদী বা ছড়া। এসব পাহাড়ি ছড়া ও ছোট খালের ওপর স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা থাকে একটি সরল বাঁশের সাঁকো। কাঠ বা বাঁশ দিয়ে তৈরি এই সাঁকো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। গ্রামের শিশু, নারী কিংবা বৃদ্ধদের নিত্যদিনের পারাপারে এই সাঁকো এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। ছবির মতো সুন্দর এই দৃশ্যগুলোতে দেখা যায় পাহাড়ের ঢালে এবং সবুজ গাছপালার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা ঘোলা জলের ছড়ার ওপর নড়বড়ে এক সাঁকো দিয়ে মানুষ পার হচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগা এসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাঁশের সাঁকো কেবল পারাপারের সেতুই নয়, বরং গ্রামবাসীর মেলবন্ধন ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক জীবন্ত প্রতীক।
আলমগীর হোসেন রানা
সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
0
চিঠি আসবেই জানি আসবেই—একদিন ডাকপিয়নের হাতে, ডাকঘরের সিলমোহর লাগানো খামে। চিঠি আসবেই। কারণ চিঠি শুধু কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়, চিঠি হলো হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা অনুভূতির নাম। একসময় চিঠির জন্য মানুষ দিনের পর দিন অপেক্ষা করত। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলেই বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ উঠত। দূরদেশে থাকা সন্তানের চিঠি ছিল মায়ের কাছে পরম শান্তি, প্রিয় মানুষের চিঠি ছিল নিঃসঙ্গ হৃদয়ের গোপন আনন্দ। একটি চিঠি হাতে পাওয়া মানেই যেন দূরের মানুষটিকে একটু কাছে পাওয়া। আজ ডিজিটাল যুগ। মুঠোফোনে মুহূর্তেই পৌঁছে যায় বার্তা, ভিডিও কলে দেখা যায় প্রিয় মুখ। অপেক্ষার সময় কমেছে, কিন্তু অনুভূতির গভীরতা কি কমেছে? হয়তো চিঠির ব্যবহার কমেছে, কিন্তু চিঠি হারায়নি। কারণ, মানুষের কিছু অনুভূতি এখনো ‘সেন্ড’ বাটনে ধরা পড়ে না। পুরোনো চিঠির হলুদ পাতায় আজও লেগে থাকে হাতের স্পর্শ, ভালোবাসার গন্ধ আর হারানো দিনের স্মৃতি। কিছু চিঠি লেখা হয়, কিন্তু পাঠানো হয় না—থেকে যায় হৃদয়ের গোপন ডায়েরিতে। তাই বিশ্ব চিঠি দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রযুক্তির ভিড়েও অনুভূতির এই প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখব। একদিন চিঠি আসবেই—যতদিন মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, অপেক্ষা আর না-বলা কথা থাকবে।
ঘোষ উত্তম
সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬
0
শৈশব মানে নিয়ম না মানার আনন্দ। একটি দুরন্ত শৈশবই পারে একজন মানুষকে জীবনভর হাসার মতো সুন্দর কিছু স্মৃতি উপহার দিতে। আজকের শিশুদের পিঠে বইয়ের ভারী ব্যাগ কেবল কাগজের বোঝা নয়, যেন শৈশবের সব আনন্দকে বিনষ্ট করার এক অদৃশ্য যন্ত্র। যেখানে শৈশব হওয়ার কথা ছিল খোলা মাঠে দৌড়ঝাঁপ, প্রজাপতির পিছু নেয়া আর কৌতূহলী চোখে চেনার গল্প, সেখানে আধুনিক প্রতিযোগিতা শিশুদের আটকে ফেলেছে বইয়ের স্তূপ আর কোচিংয়ের চার দেয়ালে। ভারী ব্যাগ শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগ বহন করার ফলে কোমলমতি শিশুদের শরীর ও মনে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। প্রতিদিন শরীরের ওজনের তুলনায় অতিরিক্ত ভার বহনের ফলে শিশুদের মেরুদণ্ড ও কাঁধে ব্যথার সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরবর্তী জীবনে স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা হাড়ের বিকৃতির ঝুঁকি বাড়ায়। পড়ালেখার এই অস্বাভাবিক চাপে শিশুরা শৈশবের সহজাত চঞ্চলতা হারিয়ে বিষণ্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা আর অতিরিক্ত সিলেবাসের কারণে শিশুদের কল্পনাশক্তি ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের তালিকা, প্রতিনিয়ত পরীক্ষার ভয় এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক প্রত্যাশা যৌথভাবে শিশুদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। খেলাধুলার জন্য মাঠের অভাব এবং আনন্দদায়ক শিক্ষার পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক পাঠদান এ সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে এবং তাদের পড়ার টেবিলকে আনন্দময় করতে প্রাথমিক পর্যায়ের অভিজ্ঞতাভিত্তিক ও আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা, প্রতিদিনের ভারী বইখাতা বাড়িতে না নিয়ে বিদ্যালয়ে শেলফের ব্যবস্থা করা, অভিভাবকদের সচেতন করা, যেন কেবল নম্বর বা ফলাফলের পেছনে না ছুটে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে প্রাধান্য দেয় তারা। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য বইয়ের বোঝা বাড়ানো নয় বরং জ্ঞান ও চিন্তার পরিধি প্রসারিত করা। নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে কেবল আমরা আমাদের শিশুদের কাঁধ থেকে এই অনাবশ্যক ভার নামিয়ে তাদের মুক্ত ও প্রাণবন্ত শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারি।
সুজন কর
আগস্ট ৩১, ২০২৬
0
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
যাচ্ছি আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।