Breaking news
ফিচার

ভগবানগোলা একটি বিশ্বনন্দিত নাম

মাজরুল ইসলাম
মাজরুল ইসলাম ছাতাই, মুর্শিদাবাদ, ভারত
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬ • 0
নবাবি আমলের ভগবানগোলার প্রতীকী ছবি
নবাবি আমলের ভগবানগোলার প্রতীকী ছবি

ভগবানগোলা মুর্শিদাবাদ জেলার একটি প্রাচীন জনপদ ও নদীবন্দরের নাম। এই জনপদ ও বাজারটির অবস্থান নিয়ে নানা মত প্রচলিত আছে। কেউ বলছেন, আঠারো শতকের ভাগীরথীর পূর্ব তীরের এক সমৃদ্ধ কিংবা প্রধান নদীবন্দর। আবার কেউ বলছেন, এটা আঠারো শতকের পদ্মা নদীর পশ্চিম তীরের একটি বিশাল বাজার কিংবা জনপদ। আসলে বন্দরটি আঠারো শতকেই গড়ে উঠেছিল। কিন্তু পদ্মা নদীর পশ্চিম তীরে যে এই জনপদ বা নদী বন্দরটি গড়ে উঠেছিল, তা অনেকেই জোরালো অভিমত প্রকাশ করেছেন। আরেকটি পক্ষের অভিমত স্থানটি আজকের চরলবণগোলা অর্থাৎ পদ্মার পূর্ব তীরবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল।

 

১৭৪০ সালে মারাঠারা চারবার লুণ্ঠন চালালে জনপদটি ধ্বংস হয়ে যায়। জনপদটিকে কেউ কেউ আলাতলী বলেও চিহ্নিত করেছে। চর্যাপদ খ্যাত গোবিন্দ দাসের শ্রীপাঠে একটি প্রাচীন মন্দির ছিল। মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল ভূধর কিসমত মৌজার তেলিয়া বুধুরিয়ায়। প্রাচীন জনপদ ও মন্দিরটির আজ আর কোনো অস্তিত্ব নেই। নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে ভগবানগোলা রেলস্টেশনের অদূরে আম্রকাননের ছায়াতলে।
 

জনশ্রুতি আছে, হুসেন শাহের রাজত্বকালে মুকসূদন দাস নামক জনৈক নানকপন্থী এক সন্ন্যাসী মুর্শিদাবাদে আসেন। তাঁর ভাবশিষ্য ভগবান দাস পদ্মাতীরে রঘুনাথের মন্দির এবং একটি গোলা বা বাজার গড়ে তোলেন। অনেকের মতে, এই ভগবান দাসের নামানুসারে জনপদটির নাম ভগবানগোলা।১৬০০ শতক থেকে এই জনপদের পত্তন হয়। অর্থাৎ বাংলায় মোগল শাসন প্রবর্তনের সময়কালে।

 

‘আইন -ই-আকবরী’তে সরকার মাহমুদাবাদের অন্তর্গত ভগবানগোলার নামোল্লেখ রয়েছে। এই বন্দর-বাজার থেকে নৌকায় করে তুলো, চাল, রেশম, শস্য, ঘি, তেল ও পণ্যসামগ্রী কেনা-বেচা চলত। এসব পণ্যসামগ্রীর বিদেশের বাজারগুলোতে প্রচুর চাহিদা ছিল। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এই বাজার ও নদীবন্দর থেকে বাৎসরিক ত্রিশ লাখ টাকার শুল্ক আদায় হতো।

 

প্রসঙ্গত, নবাব আলীবর্দীর শাসনামলে জনপদটি ও বন্দরটি চরম উন্নতির শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তাঁর আমলেই বর্গীরা চারবার আক্রমণ করলে এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। স্থায়ী সামরিক সেনা ছাউনির ব্যবস্থা করেও তা রক্ষা করা যায়নি। এ ছাড়া ভগবানগোলার সমৃদ্ধি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯ শতকের প্রথম দিকেই পদ্মার প্রবাহ প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে সরে যায় এবং এই জনপদের বাণিজ্যও শেষ হয়ে যায়।
 

‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে এই জনপদ ও নদীবন্দরের নাম উল্লেখ আছে। ইতিহাস স্বীকৃত ৬০০ মণের বজরা নদীবন্দর দিয়ে যাতায়াত করত। এবং সব সময় দেশি-বিদেশি বণিকরা তাঁদের পণ্য পরিবহন নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বিশ্বখ্যাত নদীবন্দর বা ব্যবসা কেন্দ্রটির অস্তিত্ব না থাকলেও ইতিহাসের পাতায় ঠিকই জায়গা আছে।

 

আজকের ভগবানগোলাকে মনে হয় হতশ্রী। কিন্তু আঠারো শতকে জনপদটি ছিল নগরসভ্যতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। নবাব আলীবর্দী খান বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করলে এই জনপদের বিশাল উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এই নদীবন্দর থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অতি সহজেই যোগাযোগ করা যেত, এমনকি বিদেশেও। নদীবন্দরটি খাদ্যশস্য ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল।
 

গঙ্গা নদী মুর্শিদাবাদ জেলাকে দুভাগে ভাগ করেছে, রাঢ় ও বাগড়ী। এ ছাড়া আরেকটি বিভাগের নাম ভড়। বাগড়ী ক্রমশই নিচু হয়ে পদ্মাকে স্পর্শ করেছে। নরম পলিমাটি যুক্ত হওয়ায় নদীগুলো বহুবার খাত পরিবর্তন করছে। এই বিভাগটি প্রধানত লালগোলা, ভগবানগোলা, জলঙ্গী প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত।
 

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজ-উদ-দৌলা পরাজিত হন এবং নৌকাযোগে মুর্শিদাবাদ থেকে গোপনে রাজমহলের দিকে রওনা হন এই ভগবানগোলা জলপথে। অবশ্য মালদহের কাছে সিরাজ ধরা পড়েন এবং বন্দী করে আবার মুর্শিদাবাদে নিয়ে এসে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আলাতলী ধ্বংস হলে পত্তন হয় নতুন ভগবানগোলার। এখনকার ভগবানগোলা কোনোমতেই তখনকার ভগবানগোলার সমকক্ষ নয়। তবে এখানে রেলস্টেশন, উচ্চ বিদ্যালয়, ডাকঘর, থানা ও বালিকা বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। সরকার বাহাদুরের কাছে বর্তমান বাসিন্দাদের একটি মহাবিদ্যালয়ের দাবি। আমিও সরকার বাহাদুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
 

ভগবানগোলা ভাগীরথী, পদ্মা ও ভৈরব এবং দামোসবেষ্টিত। এখানকার মাটি দোঁয়াশ, বেলে ও উর্বর। অনেক খাল দৃশ্যমান। বটতলা, বরসাতিগোলা, মহেশ নারায়ণগঞ্জ, রামবাগে প্রতিদিন সবজির বাজার বসে। এ ছাড়া পশুর হাট বসে। বৈশাখ মাসে খাতরের মেলা হয়। কেদার স্মৃতি পাঠাগার সকলের নজর কাড়ে।
 

ভগবানগোলায় সিরাজের ধরা পড়ার ইতিহাস জড়িত। আজ এই জনপদের সেই জৌলুশ নেই। আগের সব স্মৃতি মুছে গেছে। নদীবন্দরটিতে একসময় বণিকদের আস্তানা গড়ে উঠেছিল। জৌলুশ থাকুক আর না থাকুক, তবুও বিভিন্ন কারণে ইতিহাসের পাতায় চিরশাশ্বত থাকবে।
 

0 Comments

Popular post
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শে আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক সংবেদনশীলতা, ইতিবাচক চিন্তার শিক্ষা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা

আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি।   মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল।   আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।   সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে।   সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।   সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।   সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।   তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে।   এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা।   আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে।   একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।   তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে।   আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি।   মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না।   বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ।   কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে।   নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়।   হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।   আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ।   এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়।   মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না।   মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা।   আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  

চিঠি

সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়।   গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ  আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার।   চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম।   আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ।   লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো।   বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।  

সেবিকা

বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব।   হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ।   বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর।   কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল।    সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান।    পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।”   বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ।   বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।    

কিশোর গ্যাং এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম

একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।   সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে।   কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না।   এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে।   দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে।   আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়।   প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।   তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।  

সেই নীড়

যাচ্ছি  আমি নীড় ছেড়ে ইট পাথরের নগরে। দুঃখ আমার চিরসাথী বিষাদময় এ জীবনের। বাস্তবতার দাবদাহে পুড়ছি আমি অবিরাম। দেখছি কত বহুরূপী আঁধার এ পৃথিবীতে। সইছি কত বিষ-বাণী  কাছের প্রিয় মানুষ হতে শত বাধার ভিড়ে আমি জয়ী হয়ে ফিরব নীড়ে ফিরব আমি বীরের বেশে চিরচেনা সেই নীড়ে।  

ফিচার

View more
ড. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী
আধ্যাত্মিক মানুষ, দেহের কারিগর এবং একজন নির্মোহ চিকিৎসক ড. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী

আমি ঢাকায় থাকি। বিশ বছর আগে প্রায় পঙ্গুত্ববরণ করতে বসেছিলাম। সেটি ছিল আমার জীবনের একটি নির্মম অধ্যায়।   আমি বসে কাজ করি। দীর্ঘদিন বসে কাজ করার কারণে আমার মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করতাম এবং চেয়ারে একদমই বসতে পারতাম না। আমার হোম ফিজিশিয়ান সব সময় আমাদের পরিবারের চিকিৎসা দিতেন। তিনি আমার অবস্থা দেখে বললেন, “আপনি একটি এমআরআই করুন।”   আমি এমআরআই করলাম। তিনি রিপোর্ট দেখে বললেন, “এটি বেশ জটিল। আপনি একজন ভালো অর্থোপেডিক ডাক্তারের কাছে যান।” তিনি ঢাকার দুজন বিখ্যাত ও স্বনামধন্য অর্থোপেডিক সার্জনের পরামর্শ দিলেন। আমি তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলাম এবং প্রথমজনের কাছে গেলাম। এখানে তাঁদের নাম উল্লেখ করছি না, যেহেতু তাঁরা দুজনই স্বনামধন্য ও জনপ্রিয় চিকিৎসক।   প্রথমজন আমার এমআরআই দেখে বললেন, “আপনার লাম্বার ফোর ও লাম্বার ফাইভ (L4-L5) অংশে ডিস্কের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসকেরা যাকে ডিস্ক প্রোল্যাপ্স বলেন। এখানে অপারেশন লাগবে।” আমাকে বোঝালেন, মেরুদণ্ডের ওই অংশ থেকে ফ্লুইড বেরিয়ে যাচ্ছে।   বাজেট জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, “সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকার কমবেশি হতে পারে।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, হাসপাতালে আমাকে কত দিন থাকতে হতে পারে? তিনি বললেন, “এটা অপারেশনের পরের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। দশ, পনেরো, বিশ দিন, এমনকি এক মাসও থাকতে হতে পারে।” আমি বললাম, এখন কি আমাকে কোনো চিকিৎসাপত্র দেবেন? তিনি একটু চিন্তা করে একটি পেইনকিলার দিয়ে বললেন, “ব্যথা বেশি হলে খাবেন, না হলে খাবেন না।” আমি কিছুটা হতাশ হয়ে চলে এলাম।   এবার আমার হোম ফিজিশিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী দ্বিতীয় ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনিও অনেক স্বনামধন্য চিকিৎসক। তিনিও একই কথা বললেন—অপারেশন লাগবে। আমি বাজেটের কথা বললাম। তিনি বললেন, “চার-পাঁচ লাখের মতো লাগতে পারে।”   বাজেট তখন আমার জন্য বড় বিষয় ছিল না। কিন্তু আমি অপারেশনকে ভয় পেলাম। সাধারণত কাটা-ছেঁড়ার ব্যাপারে আমার একটু ভয় আছে।   আমি এসব তথ্য নিয়ে আবার আমার হোম ফিজিশিয়ানের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনিও অনেক স্বনামধন্য ছিলেন। আমেরিকায় ছিলেন, ৪৫ বছর বয়সে এসে বাংলাদেশে চিকিৎসা দেয়া শুরু করেছিলেন। মূলত তিনি ছিলেন মেডিসিন ও শিশু বিশেষজ্ঞ। তিনি বললেন, “না, আপনি অপারেশন করবেন না। এসব অপারেশনের ক্ষেত্রে সাকসেস হিস্টরি খুবই কম। আপনি চেষ্টা করুন, কোনো থেরাপির ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে একটু এগোতে পারেন কি না।”   আমি ঢাকার দুটি বড় থেরাপি সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। মূলত তাঁরাও কিছুটা চিন্তিত হলেন। চিকিৎসার ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। বললেন, “যদি ডাক্তার বলে থাকে অপারেশন করতে, তাহলে সেটাই করা আপনার জন্য উত্তম।”   আমি তখন আসলে বিছানায় পড়ে গেলাম। প্রায় ছয় মাস আমি বিছানায় ছিলাম। হঠাৎ একদিন আমার বন্ধুবর এক বড় ভাই ফোন করে বললেন, “দেলোয়ার, তুমি কোথায়?” আমি বললাম, আমি তো এই রকম অসুস্থ। আমার লাম্বার ফোর ও লাম্বার ফাইভ ডিস্ক প্রোল্যাপ্স। এখন আমি প্রায় ছয় মাস ধরে বিছানায়।   তিনি বললেন, “আমি তোমাকে একজন ডাক্তারের নাম ও ঠিকানা দিচ্ছি। সেখানে যোগাযোগ করে আমার কথা বলবে।” এরপর তিনি আমাকে ড. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলীর নাম ও ঠিকানা দিলেন। তখন তিনি সালাউদ্দিন স্পেশালাইজড হাসপাতালে বসতেন।   আমি আর কালবিলম্ব না করে পরের দিন ডাক্তারের কাছে গেলাম। প্রথম দেখাতেই আমি তাঁর ভক্ত হয়ে গেলাম। কী সুন্দর, প্রসন্ন চেহারা! তিনি এমআরআই রিপোর্ট দেখে বললেন, “আপনার ছোট্ট একটি অপারেশন আছে। এখানে কোনো কাটা-ছেঁড়া হবে না। আপনি বুঝতেও পারবেন না। আর এটা আমি আজই করব।”   তিনি আমাকে একটি কেবিন দিলেন। সেখানে কিছু চিকিৎসাপত্র দিয়ে বললেন, বিকেলে এই সার্জারিটি করা হবে। আমি বললাম, এটা কী ধরনের সার্জারি?   রোগীদের অনেক নির্বোধ প্রশ্ন থাকে। কখনো কখনো মানুষ মানসিক চাপ, হতাশা বা মুডের নানা পরিবর্তনের মধ্যেও থাকে। এটাকে বলে মুড সুইং। অন্যের কথা বলতে পারব না, তবে আমার অসুস্থতার বেলায় বিষয়টি আমি নিজেও অনুভব করি। তাই অহেতুক অনেক প্রশ্ন মাথায় আসতেই পারে। তবে যত অভিজ্ঞতা বাড়ছে, ততই বুঝতে পারছি—সব প্রশ্ন হয়তো করার প্রয়োজন নেই।   তিনি নির্মল একটি হাসি দিয়ে বললেন, “এটা লেজার দিয়ে করা হবে। সংক্ষেপে PLDD বলে। আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই।”   তাঁর হাসিটা আমার মনে দ্যুতি ছড়াল। মনে মনে ভাবলাম, মানুষ এত সুন্দর হয় কীভাবে? আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। যদিও লেজার সম্পর্কে তখন আমার কোনো ধারণাই ছিল না এবং আমি বুঝতেও পারিনি এটি কীভাবে করা হয়। তার পরও নতুন একটি পদ্ধতির কথা শুনে এবং কাটা-ছেঁড়া যেহেতু লাগবে না, এতে আমি বেশ সন্তুষ্ট হলাম।   বিকেল পাঁচটায় ডাক্তার সাহেব আমার অপারেশন করলেন। প্রায় এক ঘণ্টা পরে আমাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হলো।   পরদিন সকালে এসে তিনি বললেন, “উঠুন।” আমি বললাম, আমি উঠতে পারব? তিনি হেসে বললেন, “আচ্ছা, চেষ্টা তো করুন।” আমি আস্তে আস্তে উঠলাম। তিনি বললেন, “আমার দুই আঙুল ধরুন।” আমি ধরলাম। তিনি আমাকে একটু হাঁটালেন। তারপর বললেন, “গুড। আজকেই আপনি বাড়ি যেতে পারেন। তবে বিছানায় প্রায় এক মাস রেস্ট নেবেন। আমি একটা চিকিৎসাপত্র পাঠিয়ে দিচ্ছি।”   আমি বললাম, বিলটা? তিনি হেসে বললেন, “চিকিৎসাপত্রের সঙ্গেই থাকবে।” আমি হাঁটতে পেরে যেন এটাকে চিকিৎসা না ভেবে মিরাকল কিছু ভাবলাম। যদিও তিনি বলেছিলেন, “No miracle. It’s happening.” এমন হাড়ের রোগের একজন ‘জাদুকর’ আমার শহরে আছেন—এই ভাবনায় আমার মন ভরে উঠল।   যথারীতি ত্রিশ মিনিটের মধ্যে আমার চিকিৎসাপত্র ও বিল হাতে এল। আমি বিলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। এও কি সম্ভব? মাত্র চল্লিশ হাজার টাকা! (বিশ বছর আগের কথা, বর্তমানের নয়)   যিনি বিলটি হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁকে ডাকলাম। বললাম, বিলে আপনাদের কোনো ভুল হয়নি তো? তিনি হেসে বললেন, “এখানে সেই সুযোগ নেই।” আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম—আমার এই দরিদ্র দেশে যেন ডাক্তারের বরপুত্র হয়ে ডা. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলীর আবির্ভাব হয়েছে।   এরপর কালে কালে প্রায় বিশ বছর পেরিয়ে গেল। হাঁটছি, চলছি, কখনো দৌঁড়াচ্ছি। যেন আমার নতুন ভুবন শুরু হলো। তাঁর কাছে আমার মায়ের হাড়ের জটিল চিকিৎসাও করিয়েছি। আমি এরপর ছোটখাটো, জটিল যেকোনো বিষয়ে পরামর্শ নিয়ে চলতাম। বর্তমানে আফতাবনগরে তাঁর দশতলা BLCS Institute and Hospital হয়েছে। দিন দিন তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব বাড়তে লাগল। ডাক্তার স্যার থেকে ধীরে ধীরে ভাই সম্বোধনে চলে এলাম; যদিও এ সম্পর্কের যোগ্য মানুষ আমি কখনোই ছিলাম না।   একজন রোগীর অস্বস্তি অনেক। সে দিশেহারা। এমনকি কখনো কখনো অসুস্থতার কারণে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু একটি বিশ্বাস, সঠিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা—তাকে আবার সজীব করে তোলে।   বহু প্রবাসী রোগী উন্নত দেশ থেকে ছুটে আসেন সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার আশায়। আমি তাঁর কাছে এমনও রোগী দেখেছি—অসহায়, ভারসাম্যহীন, কেমন যেন ফ্যালফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। কিন্তু তিনি জানেন, তিনি একজন মানবিক চিকিৎসক। সেই রোগীর মনোবল কীভাবে চাঙা করতে হয়, সেই অনুযায়ী তাঁর চিকিৎসা প্রদান করতে হয়। আর যখন সেই রোগী সুস্থতার পর হাসি দিয়ে বলেন, “আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আসি।” রোগীটি চেম্বার থেকে বেরিয়ে দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলে যখন বলেন, “হে মহান আল্লাহ, তুমি ডাক্তারকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রেখো।”—তখন আমার মনে হয়, এমন ডাক্তার তো আধ্যাত্মিক মানুষই।   পৃথিবীতে কিছু কিছু জিনিস একটাই হয়। যেমন বিখ্যাত কোহিনূর। তেমনি পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষও হয়তো একজনই হন। হয়তো আমার জীবনের বিচরণ খুবই স্বল্প, তাই দেখাটাও সীমিত। সেই সীমিত দেখার মধ্যেই তিনি আমার কাছে সেরা, তিনি একক।   বিশ বছর পর আমি তাঁর আরেকটি অধ্যায় আবিষ্কার করলাম। আমার জ্বর হয়েছিল। তাই আমার কাছাকাছি একটি স্বনামধন্য ও বহুল আলোচিত হাসপাতালে আমার বন্ধুবর বক্ষব্যাধি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞকে ফোন দিলাম। তিনি বললেন, “চেম্বারে আসতে হবে না। আপনি দুটি মেডিসিন খান। আমি SMS করে দিচ্ছি।” আমি সেই ওষুধ দুদিন নিলাম। কিন্তু আমার কোনো উন্নতি হলো না।   হঠাৎ করে ইয়াকুব ভাইয়ের ফোন পেলাম। একটু কথা হলো। তিনি বললেন, “আপনার কী হয়েছে?” আমি বললাম, আজ তিন দিন যাবৎ জ্বর। এর মধ্যে হয়তো আমি একটা কাশি দিয়েছিলাম। উনি বললেন, “কী কী ওষুধ খাচ্ছেন?” আমি ওষুধ দুটির নাম বললাম। তিনি বললেন, “এগুলো ফেলে দেন। আমি এখনই আপনাকে কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি। এটি সেবন করতে থাকুন।”   এ কথা বলেই ফোন কেটে দিলেন। তিনি পাঁচ রকমের ওষুধের একটি তালিকা SMS-এর মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলেন। আমি কালবিলম্ব না করে সেই ওষুধ সেবন শুরু করলাম। দুদিনের মধ্যে কিছুটা সুস্থতাবোধ করলাম।   তিনি দুদিন পরে আমাকে ফোন দিলেন। বললেন, “আপনার কিছু টেস্ট করা দরকার। এগুলো করিয়ে রাখেন।” আমি বললাম, আপনি কোথায়? তিনি বললেন, “আমি লন্ডনে। প্লেনে আছি, ঢাকায় আসছি। আগামীকাল রিপোর্টগুলো নিয়ে আসেন, আমি দেখব।”   আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম—একটি কাশি শুনে যে মানুষ ৮,০৪০ কিলোমিটার দূর থেকে সমস্ত শরীর স্ক্যান করে ফেলেন, তিনি কি শুধুই ডাক্তার?   আমি গভীর চিন্তায় মগ্ন হলাম। আমাকে এখন আর তাঁকে শুধুই ডাক্তার মনে হলো না। মনে হলো, একজন আধ্যাত্মিক মানুষ। আজ বুঝতে পারলাম, তিনি হাজার হাজার রোগীকে কীভাবে সেবা দেন, কীভাবে ধৈর্য ধরে তাঁদের কথা শোনেন, কীভাবে তাঁদের সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন। চোখে জল আসছে। কিন্তু বলার ভাষা আমার নেই।   আসলে আমি কোন ভাষায় তাঁকে সম্বোধন করব, কী লিখব—আমি জানি না। আমি অত বড় লেখকও নই। এত আবেগী মানুষ আমি যে লিখতে গিয়েও আসল সত্যটা লিখতে পারি না। তিনি একজন আধ্যাত্মিক মানুষ, দেহের কারিগর, তিনি একজন নির্মোহ ডাক্তার।   আমি যতদিন বেঁচে থাকব, তাঁর জন্য প্রার্থনা করব। তিনি বেঁচে থাকুন। শুধু আমার জন্য নয়—আমাদের এই দরিদ্রতম রাষ্ট্র বাংলাদেশের মানুষের সেবা করে যেন তাঁর দিন যায়।   যথাযথভাবে আমি সেদিনই পরীক্ষাগুলো করালাম। তিনি প্রায় আট রকমের পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তাতে ছিল একটি চেস্ট এক্স-রে। আমি পরের দিন যেহেতু কিছুটা সুস্থবোধ করছিলাম, আমার সহধর্মিণীকে বললাম, চলো, আমরা যাই।   ফোন করে বিকেলে আফতাবনগরে তাঁর চেম্বারে গেলাম। তিনি রিপোর্টগুলো দেখে বললেন, “এ তো দেখছি ইন্নালিল্লাহ পড়ার অবস্থা! আমি যে ধারণাটা করেছি, তাই। আপনার নিউমোনিয়া হয়েছে, ফুসফুসে পানি জমে গেছে।”   এরপর খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন, “আচ্ছা, কোনো সমস্যা নেই। আমি যে চিকিৎসাপত্র দিয়েছি, তা চলবে। আপনি যান। বাসায় গিয়ে রেস্ট নিন।”   আমি চেম্বার থেকে বের হতে হতে ভাবলাম, তিনি সাক্ষাৎ একজন অতিমানবীয়, আধ্যাত্মিক মানুষ। এবারও এ যাত্রায় বোধ হয় বেঁচে গেলাম।    বর্তমানে তাঁর স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা প্রায় শেষ—এমনটাই আমি জেনেছি। যদি এটির প্রবর্তন ও প্রয়োগ আমাদের দরিদ্রতম দেশে শুরু হয়, হয়তো অনেক দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় তিনি মানুষের উপকার করতে পারবেন এবং বিদেশমুখী না হয়ে আমরা এই দেশেই উন্নত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাব।   আমি একজন সাধারণ মানুষ, একজন সাধারণ নাগরিক। তবুও বলব, প্রতিটি সরকারের কাছে তাঁকে দেশের সম্পদ মনে করে সহযোগিতা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, লাখ লাখ রোগী হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের এই মানের একজন চিকিৎসক পাওয়া সহজ নয়। তিনি শুধু আমাদের সম্পদ নন, তিনি দেশের সম্পদ। তাঁকে রক্ষা করা, তাঁকে যত্ন করা আমাদের সকলেরই প্রয়োজন—এমনকি সরকারেরও। তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি।   এই লেখায় শুধু আমার মনের কথাই লিখেছি। চিকিৎসার কোনো টার্মিনোলজিই আমি জানি না। তাই হয়তো অনেক কিছু স্পষ্ট করে বলতে পারিনি। আমার চিকিৎসা-সংক্রান্ত বর্ণনায় কোথাও ভুল বা অস্পষ্টতা থাকলে তা সংশোধনযোগ্য। ভুলত্রুটি মার্জনীয়।  

অক্টোবর ৯, ২০২৬ 0

আমাদের গুরুকুল : আমার শিক্ষাগুরু

কোষ্ঠকাঠিন্য বিষয়ে পাঁচটি ভুল ধারণা

রাস্তায় পিরিয়ড যন্ত্রণায় মেয়েটি

পানাম নগর : যেখানে অতীত আজও বেঁচে আছে

সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের সরু রাস্তা ধরে হাঁটলে প্রথমেই চোখে পড়ে সারি সারি পুরোনো বাড়ি। রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর দেয়ালে সময়ের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও পুরোনো দরজা-জানালা এখনো টিকে আছে। দিনের ছুটিতে এখানে মানুষের আনাগোনা বাড়ে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে ঘুরছেন, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে দেখছেন কয়েক শ বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো। কিন্তু আজকের এই শান্ত পানাম নগর একসময় এমন ছিল না।   একসময় এই জায়গায় মানুষের ব্যস্ততা ছিল, ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরবাড়ি আর প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। ব্যবসার কাজে মানুষ আসত, পণ্য কেনাবেচা হতো, পরিবার নিয়ে মানুষ বসবাস করত। যে রাস্তায় আজ পর্যটকেরা ধীরে ধীরে হাঁটেন, সেই রাস্তাতেই একসময় চলত মানুষের ব্যস্ত যাতায়াত।   সোনারগাঁও ছিল বাংলার প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদগুলোর একটি। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে এই অঞ্চলের গুরুত্ব বহুদিনের। সেই বাণিজ্যিক পরিবেশের সঙ্গে গড়ে ওঠে পানাম নগরও। বিশেষ করে, কাপড় ও তাঁতপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে এর সমৃদ্ধির সম্পর্ক ছিল। ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে এখানে তৈরি হয়েছিল বসতি, আর সেই বসতিকে ঘিরেই ধীরে ধীরে একটি শহরের রূপ নেয় পানাম।   সেই সময়ের পানাম নগরকে আজ চোখের সামনে দেখা সম্ভব নয়। তবে পুরোনো বাড়িগুলোর দিকে তাকালে কল্পনা করা যায় এর বিশাল কারুকাজ।   কোনো একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো একসময় ব্যবসার হিসাব নিয়ে কথা বলতেন কয়েকজন মানুষ। পাশের বাড়ির বারান্দায় বসে পরিবারের কেউ অপেক্ষা করতেন। সকালে ঘরের দরজা খুলে মানুষ বের হতো, দিনের কাজ শেষে আবার ফিরে আসত। শিশুদের ছোটাছুটি, পরিবারের ব্যস্ততা, অতিথির আসা-যাওয়া—সব মিলিয়ে এই বাড়িগুলোও একসময় মানুষের জীবনে ভরা ছিল। আজ সেই মানুষগুলো নেই। কিন্তু তাদের বসবাসের চিহ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে।   পানাম নগরের বাড়িগুলোর দিকে তাকালে স্থাপত্যের বৈচিত্র্যও চোখে পড়ে। খিলান, জানালা, বারান্দা ও নানা অলংকরণে তৈরি ভবনগুলোতে স্থানীয় নির্মাণশৈলীর পাশাপাশি ইউরোপীয় প্রভাবও দেখা যায়। রাস্তার দুই পাশে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা ভবনগুলো যেন একটি সময়কে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। তবে এসব বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে শুধু স্থাপত্যের সৌন্দর্য দেখলেই গল্পটা শেষ হয় না।   একজন দর্শনার্থী হয়তো একটি পুরোনো জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—এই জানালার পাশে কে দাঁড়াতেন? এই দরজাটা দিয়ে প্রতিদিন কত মানুষ যাতায়াত করত? এই বাড়ির ভেতরে কোনো শিশুর শৈশব কেটেছিল কি না? কোনো পরিবার এখানে কত বছর বসবাস করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সহজে পাওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে অনেক গল্প হারিয়ে গেছে। থেকে গেছে শুধু কিছু দেয়াল, দরজা, জানালা আর স্থাপত্য।   একসময় পানাম নগরের জীবনও থেমে যেতে শুরু করে। ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র বদলে যায়। মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে মানুষ এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে থাকে। যে বাড়িগুলো একসময় মানুষের কণ্ঠে মুখর ছিল, সেগুলো একসময় ফাঁকা হয়ে পড়ে। একটি শহর এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের শহর থেকে ইতিহাসের শহরে পরিণত হয়।   আজ পানাম নগরে গেলে সেই পরিবর্তন সহজেই বোঝা যায়। পুরোনো ভবনগুলোর অনেকগুলোতেই বয়সের ছাপ। কোথাও দেয়ালে ফাটল, কোথাও রং মলিন। তবু এসবের মাঝেও জায়গাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি।   ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে আসা মানুষের ভিড় দেখা যায়। তরুণ-তরুণীরা ছবি তুলছেন। শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে ঘুরছেন। কেউ স্থাপত্য দেখছেন, কেউ ইতিহাস জানতে চাইছেন। অনেকেই হয়তো প্রথমবার বুঝতে পারছেন, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় থাকা কোনো বিষয় নয়, কখনো কখনো সেই ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো যায়।   একটি শিশুকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে পুরোনো বাড়িগুলোর সামনে হাঁটতে দেখা যায়। সে হয়তো বারবার জানতে চাইছে, “এখানে আগে মানুষ থাকত?” প্রশ্নটি ছোট। কিন্তু পানাম নগরের গল্পের সঙ্গে যেন পুরোপুরি মিলে যায়। কারণ, এ শহরের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ভবন নয়, বরং সেই ভবনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন।   আজ যারা এখানে ঘুরতে আসেন, তারা কেউ সেই পুরোনো মানুষগুলোর নাম জানেন না। তাদের পরিবার, পেশা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের কথাও জানেন না। তবু পুরোনো বাড়িগুলো দেখে তারা সেই অচেনা মানুষদের জীবন কল্পনা করেন। একজন ব্যবসায়ী কেমন ছিলেন, একটি পরিবার কীভাবে থাকত, একটি শিশুর দিন কীভাবে কাটত — এসব প্রশ্নের মধ্য দিয়েই অতীতটা নতুন করে সামনে আসে। আর এখানেই পানাম নগরের আলাদা গুরুত্ব।   এটি শুধু ছবি তোলার একটি জায়গা নয়। এটি এমন একটি স্থান, যেখানে বর্তমানের মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য অতীতের একটি জীবনের কাছাকাছি যেতে পারে। তবে এই পুরোনো শহরকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও কম নয়। দর্শনার্থীদের অসচেতন আচরণ, দেয়ালে লেখা, স্থাপনার ক্ষতি কিংবা অবহেলা এসব ধীরে ধীরে পুরোনো স্থাপনাগুলোর ক্ষতি করতে পারে। একটি পুরোনো দেয়াল আমাদের কাছে হয়তো শুধু একটি দেয়াল, কিন্তু সেই দেয়ালের পেছনে হয়তো রয়েছে বহু মানুষের জীবনের গল্প। তাই পানাম নগর সংরক্ষণ মানে শুধু পুরোনো ভবনগুলোকে রক্ষা করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাসটাকেও ধরে রাখা।   বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে পানাম নগরের ভিড়ও ধীরে ধীরে কমতে থাকে। যারা দূর-দূরান্ত থেকে এসেছিলেন, তাঁরা ছবি আর কিছু স্মৃতি নিয়ে বাড়ির পথে ফেরেন। দোকানপাট গুটিয়ে যায়, রাস্তা আবার শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু সারি সারি পুরোনো বাড়িগুলো থেকে যায়।   পরদিন আবার কেউ আসবে। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী ইতিহাসের অংশ হিসেবে এই শহর দেখতে আসবে, কোনো পরিবার সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে আসবে, কিংবা কোনো তরুণ পুরোনো একটি জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলবে।তখন হয়তো আবার সেই একই প্রশ্ন উঠবে—এই বাড়িতে একসময় কারা থাকত? এখানে কি ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজ হতো?   পানাম নগরের সব উত্তর হয়তো আর কখনো পাওয়া যাবে না। কিন্তু যতদিন মানুষ সেই প্রশ্ন করবে, ততদিন এই পুরোনো শহর শুধু অতীত হয়ে থাকবে না। এ নগর সব সময় আমাদের অতীতের একটি গল্প বলে যাচ্ছে। এখন সেই গল্পের পরের অধ্যায় আমাদের হাতে; আমরা কি পানাম নগরকে শুধু দেখার মতো একটি পুরোনো শহর হিসেবে রেখে যাব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্যও তাকে একটি জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে বাঁচিয়ে রাখব? কারণ, একটি শহর তার মানুষ হারিয়ে ফেললেও মানুষের গল্প হারিয়ে যায় না কখনো। তা পুরোনো দেয়াল হয়ে থেকে যায়, আর নতুন প্রজন্ম এসে সেই দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আবার গল্পটি খুঁজে নেয়।  

অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0

প্রাণী নির্যাতন নয়, সংরক্ষণ করুন পরিবেশের স্বার্থে

তামাক শুধু ফুসফুস নয়, ক্ষতি করতে পারে ভবিষ্যৎ পরিবার গঠনের সম্ভাবনাও

নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা

ব্যায়াম, খাবার ও নীরব ব্যথানাশক ‘এন্ডরফিন’ : শরীর কীভাবে নিজেই ব্যথা সামলাতে শেখে

ব্যথা হলে সাধারণত ওষুধের কথাই প্রথমে মনে আসে। কিন্তু মানুষের শরীরের ভেতরেও রয়েছে ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের নিজস্ব একটি ব্যবস্থা। এর সঙ্গে জড়িত এন্ডোজেনাস ওপিওয়েড, যার মধ্যে বিটা-এন্ডরফিন অন্যতম। ব্যায়াম, মানসিক চাপ, শারীরিক পরিশ্রম এবং শরীরের নানা জৈবিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্ক রয়েছে।   তবে ‘ব্যায়াম করলেই শরীরে এন্ডরফিন বেড়ে গিয়ে সব ব্যথা চলে যায়’ এমন ব্যাখ্যা পুরোপুরি সঠিক নয়। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, ব্যায়ামের পর ব্যথা কম অনুভূত হওয়ার পেছনে এন্ডরফিনের পাশাপাশি এন্ডোক্যানাবিনয়েড, সেরোটোনিন, নরঅ্যাড্রেনালিন এবং মস্তিষ্কের ব্যথা-নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুপথও কাজ করে।    ব্যায়ামের পর সাময়িকভাবে ব্যথার প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার ঘটনাকে বিজ্ঞানের ভাষায় Exercise-Induced Hypoalgesia (EIH) বলা হয়। অর্থাৎ ব্যথার উৎস পুরোপুরি চলে না গেলেও মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র সেই ব্যথাকে কিছুটা কম তীব্র হিসেবে অনুভব করতে পারে।   গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের সময় শরীরের endogenous opioid system সক্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে, পর্যাপ্ত সময় ও তীব্রতার ব্যায়ামে বিটা-এন্ডরফিনসহ endogenous opioid-এর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে শুধু এন্ডরফিনই এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ এমন প্রমাণ নেই।    বরং ব্যায়ামের সময় মস্তিষ্কের descending pain modulation system সক্রিয় হয়। এই ব্যবস্থা মেরুদণ্ড ও মস্তিষ্কের বিভিন্ন স্তরে ব্যথার সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে। একই সঙ্গে endocannabinoid system-ও সক্রিয় হতে পারে। ফলে ব্যথা অনুভবের পাশাপাশি উদ্বেগ, স্ট্রেস ও মানসিক অস্বস্তির মাত্রাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।    এ কারণেই দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার বদলে নিয়মিত ব্যক্তির সক্ষমতা অনুযায়ী শারীরিক সক্রিয়তা অনেকের জন্য ব্যথা ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা অস্বাভাবিক ব্যথার ক্ষেত্রে ব্যায়ামকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ, কোন ধরনের ব্যায়াম, কতটা তীব্রতা এবং কোন রোগীর ক্ষেত্রে কতটা উপকারী হবে, তা ব্যক্তি ও রোগভেদে আলাদা। সাম্প্রতিক একটি umbrella review-তেও exercise-induced hypoalgesia নিয়ে প্রমাণকে পুরোপুরি একরকম বা নিশ্চিত বলা হয়নি।    শুধু ব্যায়াম নয়, খাবারের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক। এখানে আসে পুষ্টির বিষয়টি। খাবার সরাসরি ‘এন্ডরফিনের ওষুধ’ হিসেবে কাজ করে এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যাভ্যাস শরীরের প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং শরীরের ওজনকে প্রভাবিত করতে পারে; আর এগুলোর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার সম্পর্ক রয়েছে।   ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও meta-analysis-এ দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় whole-food dietary intervention নিয়ে ৪৩টি গবেষণাগোষ্ঠী বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে সামগ্রিকভাবে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যথা কমার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেলেও কোনো একটি নির্দিষ্ট ডায়েটকে সবার জন্য সবচেয়ে কার্যকর বলা যায়নি। গবেষকেরা খাদ্যের গুণমান, পুষ্টিঘনত্ব এবং ওজন ব্যবস্থাপনাসহ একাধিক বিষয়কে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।    স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ব্যথার সম্পর্ক নিয়ে অন্য একটি systematic review-তেও একই ধরনের সতর্কতা পাওয়া যায়। ২০টি observational study-এর মধ্যে অর্ধেক গবেষণায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে Mediterranean-type dietary pattern-এর সঙ্গে কম ব্যথার সম্পর্ক দেখা গেছে। তবে বেশির ভাগ গবেষণা observational হওয়ায় কারণ-ফল সম্পর্ক নিশ্চিত করা যায় না।    সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের আরও একটি systematic review এবং meta-analysis-এ ৩৩টি randomized controlled trial এবং ৩,৪৭৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে যে Mediterranean diet কিছু প্রদাহ-সম্পর্কিত biomarker যেমন hs-CRP, IL-6 ও IL-17—কমাতে পারে। তবে সব inflammatory marker-এ একই ধরনের পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।    ব্যথা কমানোর জন্য খাদ্যের সামগ্রিক মানের দিকে নজর দেয়া বেশি যুক্তিযুক্ত। শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম ও বীজ, মাছ এবং পরিমিত স্বাস্থ্যকর চর্বি এ ধরনের nutrient-dense খাবারকে খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ultra-processed খাবার, অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিনির্ভর খাদ্য কমানো উপকারী হতে পারে।   তবে পুষ্টি দিয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ এখনো সব রোগের ক্ষেত্রে সমান শক্তিশালী নয়। বিশেষ করে, নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো restrictive diet শুরু করা উচিত নয়।   বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮–৬৪ বছর বয়সী সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে ১৫০–৩০০ মিনিট moderate-intensity aerobic activity, অথবা ৭৫–১৫০ মিনিট vigorous-intensity activity করার পরামর্শ দেয়া হয়। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুদিন major muscle groups নিয়ে muscle-strengthening exercise করার কথা বলা হয়েছে। যারা বর্তমানে খুব কম সক্রিয়, তাদের অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় ও তীব্রতা বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়। অর্থাৎ ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পুষ্টি, ঘুম ও স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা সবকিছু মিলিয়েই শরীরের pain-modulation system-কে সহায়তা করা সম্ভব।   এন্ডরফিন মানুষের শরীরে থাকা একটি জটিল জৈবিক ব্যবস্থার অংশ। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা শরীরকে শুধু শক্তিশালী করে না; ব্যথা, স্ট্রেস ও অনুভূতির সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। আর সেই প্রক্রিয়ায় ভালো খাবার শরীরকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও পুষ্টি জোগায়।   তবে নতুন, তীব্র, ক্রমাগত বাড়তে থাকা বা কারণ-অজানা ব্যথাকে শুধু ‘এন্ডরফিনের অভাব’ মনে করে উপেক্ষা করা উচিত নয়। ব্যথা কখনো কখনো শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও হতে পারে।  

অক্টোবর ৪, ২০২৬ 0

আমি ভালো আছি

কফি এনেমা চিকিৎসার জন্য ক্ষতিকর নাকি উপকারী

জীবনের আলো

সংশ্লিষ্ট খবর

ড. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী
ফিচার

আধ্যাত্মিক মানুষ, দেহের কারিগর এবং একজন নির্মোহ চিকিৎসক ড. মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী

অক্টোবর ৯, ২০২৬ 0