তোমারে দেখিবার পূর্বে
প্রেম যে কী, তাহা জানিতাম না;
জানিতাম না—একজন মানুষ
কীভাবে নীরবে
অন্য একটি মানুষের সমগ্র
পৃথিবী হইয়া উঠিতে পারে।
তুমি যখন নিকটে থাকো
সময় যেন থমকিয়া দাঁড়ায়;
আর যখন দূরে থাকো,
একটি দীর্ঘদিনের নীরবতাও
কেন জানি অসীম রাত্রি হইয়া যায়।
তোমার কণ্ঠের সামান্য একটি শব্দ
আমার হৃদয়ে কত কথা জাগায়
তাহা তোমাকে বলিতে পারি না।
কিছু অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ পায় না—
তাহারা কেবল নীরবে
হৃদয়ের গভীরে বাস করে।
তোমার সহিত পথ চলিবার
কোনো প্রতিশ্রুতি চাই না
চাই না আকাশভরা কোনো স্বপ্ন;
শুধু এতটুকু চাহি—
জীবনের কোনো এক নির্জন বিকেলে
তুমি যেন আমার কথা স্মরণ করো।
যদি কোনো দিন দূরত্ব
আমাদের মাঝখানে প্রাচীর তোলে
তবুও মনে রেখো—
কিছু মানুষ দূরে গিয়াও দূরে যায় না
তাহারা স্মৃতির ভেতর
চিরকাল নিকটেই রহিয়া যায়।
প্রেম হয়তো পাওয়ার নাম নহে
কখনো কখনো নীরবে ভালোবাসিয়া
কাহারও সুখ কামনা করিবার নামই প্রেম।
আর সেই প্রেমের গভীরতম স্থানে
তুমি থাকিবে—
আমার নীরব প্রার্থনার মতো।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ বা আবেগিক বুদ্ধিমত্তা ধারণাটি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৯০-এর দশকে মনোবিজ্ঞানী পিটার স্যালোভি ও জন মেয়ার এ তত্ত্বের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী সময়ে ড্যানিয়েল গোলম্যানের গবেষণার মাধ্যমে তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। গোলম্যানের কাঠামো অনুযায়ী আবেগিক বুদ্ধিমত্তার পাঁচটি মূল স্তম্ভ চিহ্নিত করা হয় : আত্মসচেতনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অভ্যন্তরীণ প্রেষণা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ ধারণার মূল উপাদানগুলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু আগে থেকেই আদর্শ চরিত্র ও কার্যকর নেতৃত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। কেবল এত দিন তাত্ত্বিক কাঠামোয় নামকরণ হয়নি। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাচরণে এই গুণাবলির এক সমন্বিত ও ব্যবহারিক রূপ বিদ্যমান, যা সমসাময়িক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব ও মনোবিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমসাময়িক মনোবিজ্ঞান ও নেতৃত্ববিষয়ক আলোচনায় আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক বুদ্ধিমত্তা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সচেতনতা, সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা ও ইতিবাচক চিন্তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে এই পরিভাষাগুলো আধুনিক হলেও মহানবি (সা.)-এর জীবনাচরণে এগুলোর বাস্তব ও গভীর প্রয়োগ বহু শতাব্দী আগেই প্রতিফলিত হয়েছিল। আবেগিক বুদ্ধিমত্তার একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে চিন্তাশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নবি করিম (সা.) তাঁর আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করতেন। মক্কা বিজয়ের সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বহু বছরের নিপীড়ন, অবরোধ ও যুদ্ধের ইতিহাস সত্ত্বেও প্রতিহিংসার পরিবর্তে সংহতি ও সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন তিনি। এই সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ায় আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়ার একটি কৌশলগত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা নেতৃত্বতত্ত্বের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সাংগঠনিক আচরণবিজ্ঞানে এ ধরনের সিদ্ধান্তকে প্রায়ই ‘ইমোশনাল রেগুলেশন ইন হাই-স্টেকস লিডারশিপ’ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নেতৃত্বে আবেগ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে তাৎক্ষণিক আবেগীয় তাড়নার বদলে দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের কথা বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সন্তান হারানোর শোক, নিকটাত্মীয় বিয়োগ কিংবা অনুসারীদের ভুল-ত্রুটির মুখোমুখি হয়েও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করতেন বলে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আবেগ প্রকাশে সংযম, অথচ আবেগকে সম্পূর্ণ দমন না করা, এই দ্বৈত ভারসাম্য আধুনিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশনাল রেগুলেশন’ এবং ‘ইমোশনাল সাপ্রেশন’-এর মধ্যকার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্ত হতে পারে। সামাজিক বুদ্ধিমত্তার একটি মূল উপাদান হলো ভিন্ন সামাজিক অবস্থান ও প্রেক্ষাপটের মানুষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক স্থাপনের দক্ষতা। নবি করিম (সা.) দাস, শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ ও ভিন্নধর্মাবলম্বী সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে তাদের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী সংবেদনশীলভাবে আচরণ করতেন। প্রতিবেশীর অধিকার, অতিথি আপ্যায়ন এবং পারস্পরিক পরামর্শ বা ‘শূরা’র নীতির ওপর তাঁর বিশেষ গুরুত্বারোপ এই সামাজিক সংবেদনশীলতারই প্রতিফলন বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পরামর্শের ভূমিকা। বদরের যুদ্ধের অবস্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে উহুদের যুদ্ধকৌশল পর্যন্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তিনি অনুসারীদের মতামত গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি ব্যক্তিগত মত ভিন্ন হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সাংগঠনিক নেতৃত্বতত্ত্বে এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়াকে ‘পার্টিসিপেটিভ লিডারশিপ’ বলা হয়। যেখানে নেতা তাঁর কর্তৃত্ব বজায় রেখেও অধস্তনদের মতামতকে মূল্য দেন; এবং এর মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে আস্থা ও সংশ্লিষ্টতার অনুভূতি তৈরি করেন। মদিনা সনদ, ইতিহাসে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখিত সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত, ছিল এই সামাজিক দক্ষতারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থানের একটি কাঠামো তৈরি করে তিনি বহুত্ববাদী সমাজ পরিচালনায় সংলাপ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন, যা সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সনদে বিভিন্ন পক্ষের অধিকার ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার মাধ্যমে একটি বহু-সাংস্কৃতিক নগর-রাষ্ট্র পরিচালনার যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা আধুনিক ‘কনফ্লিক্ট রেজোলিউশন’ বা সংঘাত-নিরসন তত্ত্বের অনেক মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। সহমর্মিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় তাঁর দৈনন্দিন আচরণে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতি তাঁর মনোযোগ, রোগীর সেবা এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা শোনার আগ্রহের মধ্যে। এই আচরণ কেবল ব্যক্তিগত সদাচরণের প্রকাশ নয়, বরং একধরনের সক্রিয় শ্রবণ বা ‘অ্যাক্টিভ লিসেনিং’-এর দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আধুনিক যোগাযোগ তত্ত্বে সম্পর্ক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্বীকৃত। তায়েফের ঘটনা মহানবি (সা.)-এর আবেগিক নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমাশীলতা ও ভবিষ্যৎমুখী ইতিবাচক চিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তায়েফে তিনি প্রত্যাখ্যাত, অপমানিত ও নির্যাতিত হন। শারীরিক নির্যাতন ও অপমানের শিকার হয়েও প্রতিশোধের পরিবর্তে তিনি ধৈর্য ও ক্ষমার পথ বেছে নেন। সহিহ আল-বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা তাঁকে তাঁর নির্যাতনকারীদের ওপর দুই পাহাড় চাপিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আশা করেন যে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে। এখানে ক্ষমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় সহনশীলতার উদাহরণ নয়, বরং তীব্র মানসিক চাপের মুহূর্তে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার একটি বাস্তব নজির, যাকে আধুনিক পরিভাষায় ‘স্ট্রেস রেগুলেশন’ বা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ বলা যেতে পারে। এক বেদুঈন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাঁকে থামাতে উদ্যত হন। কিন্তু মহানবি (সা.) তাঁদের বিরত করেন এবং পরবর্তী সময়ে জায়গাটি পানি দিয়ে পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। তিনি ভুলটিকে সমর্থন করেননি; বরং ভুলকারী ব্যক্তির অজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছিলেন। মূল শিক্ষা হলো : অজ্ঞতার চিকিৎসা অপমান নয়, শিক্ষা। আধুনিক সমাজে মানুষ প্রায়ই ভুল এবং ভুলকারীকে একইভাবে বিচার করে। একটি ভুলের ভিত্তিতে পুরো ব্যক্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। নববি পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। ভুল সংশোধন করতে হবে, কিন্তু এমনভাবে, যাতে মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং তার ফিরে আসার পথ বন্ধ না হয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই নীতি প্রয়োগ করা হলে বহু অপ্রয়োজনীয় সংঘাত ও সম্পর্কভাঙন এড়ানো সম্ভব। উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতেও মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্বে আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার উজ্জ্বল উদাহরণ দেখা যায়। কিছু সাহাবির সিদ্ধান্তের কারণে গুরুতর বিপর্যয় ঘটেছিল। মহানবি (সা.) নিজেও আহত হয়েছিলেন। কিন্তু সুরা আলে ইমরান ৩:১৫৯-এ তাঁকে তাঁদের প্রতি কোমল থাকতে, ক্ষমা করতে, তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে পরামর্শ অব্যাহত রাখতে বলা হয়। এখানে নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি প্রকাশিত হয়েছে। একজন অনুসারী ভুল করলেই তার মর্যাদা ও অংশগ্রহণের অধিকার চিরতরে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং কার্যকর নেতৃত্ব মানুষের ভুল সংশোধন করে তাকে পুনরায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণে ফিরিয়ে আনে। মহানবি (সা.)-এর নেতৃত্ব তাই শুধু শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা মানুষের পুনর্গঠন, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকৃত গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় কাছের মানুষের সাক্ষ্যে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় দশ বছর মহানবি (সা.)-এর সেবায় ছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে মহানবি (সা.) তাঁকে কোনো কাজ করা বা না করার জন্য অপমানজনক ভঙ্গিতে প্রশ্ন করেননি। এই সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনসমক্ষে ভদ্র থাকা তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু যারা নিকটবর্তী, অধীনস্থ বা প্রতিদিনের সম্পর্কের অংশ, তাদের সঙ্গে আচরণই ব্যক্তির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনাতেও পাওয়া যায় যে মহানবি (সা.) ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ নিতেন না এবং কোনো নারী বা খাদেমকে হাতে আঘাত করেননি। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কোমলতা বজায় রাখা তাঁর নৈতিক ও আবেগিক পরিপক্বতার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিশুদের প্রতি তাঁর আচরণ সামাজিক সংবেদনশীলতার আরেকটি মানবিক উদাহরণ। আনাস (রা.)-এর ছোট ভাই আবু উমাইরের একটি পাখি ছিল এবং মহানবি (সা.) তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও পাখিটির খবর নিতেন। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মীয় ও বিচারিক অসংখ্য দায়িত্বের মধ্যেও একটি শিশুর ক্ষুদ্র আনন্দ ও দুঃখ তাঁর কাছে গুরুত্ব হারায়নি। মহানবি (সা.)-এর সামাজিক বুদ্ধিমত্তা ধর্মীয় ভিন্নতার ক্ষেত্রেও মানবিক মর্যাদার প্রতি গভীর সম্মান প্রকাশ করে। একজন ইহুদি ব্যক্তির জানাজা অতিক্রম করার সময় তিনি উঠে দাঁড়ান। তাঁকে জানানো হলো যে মৃত ব্যক্তি ইহুদি। তিনি প্রশ্ন করেন, “সে কি একটি প্রাণ নয়?” এই সংক্ষিপ্ত ঘটনায় একটি সর্বজনীন মানবিক নীতি নিহিত রয়েছে। ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য মানুষের মৌলিক মর্যাদা অস্বীকারের কারণ হতে পারে না। বর্তমান বিভক্ত বিশ্বে এই শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামাজিক মেরুকরণ প্রায়ই মানুষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের দলের মানুষের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করা হয়। এ কারণেই মানুষ মহানবি (সা.)-এর পাশে নিজেদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করত। ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কষ্ট পেলে তিনি শুনবেন, দুর্বল হলে অপমান করবেন না, শিশু হলে অবহেলা করবেন না, অধীনস্থ হলে মর্যাদা কমবে না এবং ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও মানবিক অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে না। এই নিরাপত্তাবোধ তাঁর নেতৃত্বের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কোরআনের ভাষায়, তিনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, মানুষ তাঁর চারপাশ থেকে সরে যেত। ফলে নববি নেতৃত্বের অন্যতম শিক্ষা হলো : মানুষ শুধু শক্তিশালী নেতার অনুসারী হয় না, তারা সেই নেতার প্রতি আস্থাশীল হয়, যার কাছে তাদের মর্যাদা নিরাপদ। কোরআন মহানবি (সা.)-এর এই মানবিক ও আবেগিক চরিত্রকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে তুলে ধরে। সুরা আত-তাওবা ৯:১২৮-এ বলা হয়েছে যে, মানুষের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ছিল, তিনি মানুষের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ালু ছিলেন। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, তাঁর সহমর্মিতা ছিল শুধু নৈতিক বক্তব্য নয়; বরং তা তাঁর নেতৃত্ব ও সামাজিক সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি ছিল। অন্যের দুর্দশা, ব্যথা ও দুর্বলতার প্রতি সংবেদনশীলতা তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তার আরেকটি কেন্দ্রীয় দিক ছিল আত্মসংযম। তিনি শক্তির প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। সহিহ আল-বুখারির হাদিসে তিনি বলেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই বক্তব্য মানবিক আত্মনিয়ন্ত্রণের গভীর তাৎপর্য প্রকাশ করে। নববী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত শক্তি হলো আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। মক্কিজীবনের প্রথম পর্যায়ে অর্থনৈতিক বয়কট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মুখেও নবুয়তি দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকা এবং অনুসারীদের মধ্যে আশাবাদ সঞ্চার করার প্রবণতা আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ‘রেজিলিয়েন্স’ বা প্রতিরোধ-সক্ষমতা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। বদর ও উহুদের যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও তিনি হতাশার পরিবর্তে ভবিষ্যৎমুখী পুনর্গঠনের নীতি অনুসরণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়। হিজরতের সময়কার একটি বহুল-উদ্ধৃত ঘটনাও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। সাওর গুহায় আশ্রয় নেয়ার সময় শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি তাঁর সহচরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনা চরম অনিশ্চয়তার মুহূর্তেও স্থিতধী মনোভাব বজায় রাখার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। ইতিবাচক মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘কগনিটিভ রিফ্রেমিং’ বলা যেতে পারে। অর্থাৎ একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ইতিবাচক মনোভাব কোনো নিষ্ক্রিয় আশাবাদ নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। শত্রুরা তাঁদের খুঁজছিল এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হলে মহানবি (সা.) বলেন, “চিন্তিত হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।” ( সুরা আত-তাওবা ৯:৪০) এখানে তিনি বাস্তব বিপদকে অস্বীকার করেননি, বরং বিপদের মাঝেও আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা বজায় রেখেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখায় যে জীবনের কোনো একটি সংকটকে সমগ্র ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের কৌশল গ্রহণ কিংবা মদিনায় অভিবাসনের পর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায়, তাঁর আশাবাদ বাস্তবতাবিবর্জিত ছিল না, বরং কার্যকর পরিকল্পনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এই সমন্বয়কে আধুনিক ব্যবস্থাপনা-তত্ত্বে ‘রিয়েলিস্টিক অপটিমিজম’ বা বাস্তবতাভিত্তিক আশাবাদ বলা হয়, যেখানে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন না হয়ে কার্যকর পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই আবেগিক ও সামাজিক প্রজ্ঞার সঙ্গে মহানবি (সা.)-এর ইতিবাচক চিন্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর জীবন পিতৃহীনতা, মাতৃহীনতা, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বর্জন, উপহাস, নির্যাতন, যুদ্ধ ও বিরোধিতায় পরিপূর্ণ ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি তিক্ত, প্রতিহিংসাপরায়ণ বা হতাশ হয়ে যাননি। মানুষের পরিবর্তনের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রেখেছেন। চাকরি হারানো, পরীক্ষায় ব্যর্থতা বা আর্থিক সংকট এসব জীবনের কঠিন অধ্যায় হতে পারে। কিন্তু পুরো জীবন নয়। মহানবি (সা.) আশাব্যঞ্জক কথাও পছন্দ করতেন। সহিহ হাদিসে তাঁর ভালো, সুন্দর ও আশাজাগানিয়া কথা পছন্দ করার কথা এসেছে। এর তাৎপর্য হলো, ভাষা মানুষের মনোবল ও আচরণে প্রভাব ফেলে। ‘তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ এবং ‘ভুল হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা করলে উন্নতি সম্ভব’ এ দুই ধরনের বক্তব্য একই বাস্তবতার প্রতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। নববি ইতিবাচকতা এমন ভাষার ব্যবহার করে, যা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে অক্ষুণ্ন রাখে। একই সঙ্গে এই ইতিবাচকতা কোনো কৃত্রিম আবেগ-দমন ছিল না। মহানবি (সা.) কেঁদেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন। মানুষের আচরণে কষ্ট পেয়েছেন এবং উম্মতের জন্য উদ্বিগ্ন হয়েছেন। ফলে দুঃখ অনুভব করা বা কান্না করা ইমানের দুর্বলতার প্রমাণ নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে কষ্ট অনুভব করতে পারে এবং আল্লাহর ওপর আস্থাও রাখতে পারে। সামগ্রিকভাবে মহানবি (সা.)-এর আবেগিক বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক প্রজ্ঞা এবং ইতিবাচক চিন্তা একটি সমন্বিত মানবিক দর্শন নির্মাণ করে। এ দৃষ্টিভঙ্গির সারকথা হলো : মানুষের হৃদয় জয় করতে তাকে পরাজিত করার প্রয়োজন নেই। তাকে বোঝা প্রয়োজন। মানুষের ভুলের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে হবে। কষ্টের মধ্যেও আশা রাখতে হবে। ভয়ের মধ্যেও দায়িত্ব পালন করতে হবে। অশ্রুর মধ্যেও পথচলা অব্যাহত রাখতে হবে। এই শিক্ষা শেষ পর্যন্ত কোরআনের সেই গভীর ঘোষণার সঙ্গে সংযুক্ত হয় : মহানবি (সা.) বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর শক্তির গভীরে ছিল দয়া। তাঁর নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিল মানুষের হৃদয়। তাঁর ইতিবাচকতার কেন্দ্রে ছিল আল্লাহর ওপর আস্থা। আধুনিক সমাজে যেখানে তথ্যের প্রাচুর্য থাকলেও সহমর্মিতার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে তাঁর জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো ক্ষমতার মধ্যেও কোমল থাকা। কষ্টের মধ্যেও ন্যায়বান থাকা। ক্রোধের মধ্যেও আত্মসংযমী থাকা। মানুষের ভুলের মধ্যেও তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে দেখতে শেখা। বর্তমান কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নেতৃত্বের সংকট, মানসিক চাপ ও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের জটিলতা ক্রমবর্ধমান একটি আলোচ্য বিষয়। বিশ্বজুড়ে ব্যবস্থাপনা-শিক্ষায় ‘ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স’ ও ‘রেজিলিয়েন্স’ এখন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এবং বহু প্রতিষ্ঠান নেতৃত্ব-উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই দক্ষতাগুলোকে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমান বা তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশসহ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও কর্মক্ষেত্রে নৈতিক নেতৃত্বের আদর্শ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণাত্মক পাঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সাদা খামে লিখব চিঠি মায়ের ঠিকানায় মা যে আমার বেঘোর ঘুমে একলা নিরালায়। গাছের ছায়ায় নিরিবিলি মেলে না চোখ আর মা মা বলে ডাকি কত আমি যে বারবার। চিঠি পেলে যদি মায়ের ভাঙে এবার ঘুম ঝাঁপটে ধরে মায়ের পায়ে দেব হাজার চুম। আঁচল তলে চুপটি করে লুকিয়ে আমার মুখ গন্ধ নেব মায়ের গায়ের লুটব যত সুখ। লক্ষ্মী পিয়ন কথা রেখো মাকে চিঠি দিয়ো আসা যাওয়ার ভাড়াটুকু আমার থেকে নিয়ো। বড়ই আশায় আছি আমি পাব মায়ের খোঁজ তথ্য নিতে আসব আমি তোমার বাড়ি রোজ।
না জানিয়া না বুঝিয়া না শুনিয়া না মানিয়া নাইতে নামিয়া নদীতে নমিতা নাশিকায় নিশ্বাস নিতে নাপারিয়া নিমেষেই নিজের নাড়ির নিনাদ নিষ্প্রাণ নীরব, নিষ্প্রভ, নীলাভ। না হেরি নিলয়ে না খেয়ে না নেয়ে নমিতার নৃপতি নব নিশীথে নিবিড় নৈবেদ্যে নমিল নিজেকে নদে নীলাম্বরের নির্মেঘ নিশি নির্দয় নহরের নির্জনতা নাশি নীপবনে না জানি নিবংশ নমিতা নিরধির নির্ঝর নিধি, নিপাবলির নিরন্তর নৃত্যে নিজেকে নাটকীয় নৈকট্যে নিবেদন। নেই! নেই! নিয়তির নির্মম নিঘাত নমিতা নিধনে নদ নিত্য নিশাত নীহারিকায় নির্লিপ্ত নিগূঢ় নির্বিকার। নমিতা নাই-বা নামিবে নরকায় নিষেধ নেই তো নিগ্রহ নাশি নমিতার নিত্য নাদিম নব নিরুদ্দেশী।
একটি দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তার তরুণ প্রজন্ম। তারুণ্যের উদ্দীপনা, সৃষ্টিশীলতা এবং অদম্য শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক অন্যতম প্রধান উদ্বেগের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। কৈশোরের যে সময়টিতে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা, খেলার বল কিংবা সৃজনশীলতার উপকরণ, সেই বয়সে একশ্রেণির কিশোরের হাতে দেখা যাচ্ছে ধারালো অস্ত্র, মাদক এবং অপরাধের নীল নকশা। আমাদের অমিত সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যেভাবে এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল একটি পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। সাধারণত ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার সংস্কৃতিকে 'কিশোর গ্যাং' বলা হয়। মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরে দলবদ্ধ হয়ে থাকার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে, যা তাদের সামাজিকীকরণে সাহায্য করে। কিন্তু এই দলবদ্ধতা যখন নেতিবাচক রূপ নেয় এবং পাড়া-মহল্লায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং, মাদক ব্যবসা ও খুনোখুনির মতো অপরাধে জড়ায়, তখন তা গ্যাং কালচারে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজে এর বিস্তৃতি রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন নামে এরা নিজেদের দল পরিচালনা করে এবং নিজেদের শক্তির জানান দিতে প্রায়ই লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কোনো কিশোর একদিনেই অপরাধী বা গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে ওঠে না, এর পেছনে রয়েছে সামাজিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক নানাবিধ কারণ। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক জীবনে পারিবারিক অসচেতনতা ও দূরত্বের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ। পরিবারের সঠিক তদারকি না থাকা, মা-বাবার মধ্যকার কলহ এবং সন্তানদের সাথে গুণগত সময় না কাটানোর ফলে কিশোররা একাকিত্বে ভোগে এবং এই শূন্যতা পূরণের জন্য বাইরের বন্ধুদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। এর পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরাঞ্চলে কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ কিংবা বিনোদনের চরম সংকট রয়েছে। ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক শক্তি প্রকাশের কোনো সুস্থ মাধ্যম তারা পাচ্ছে না। এই গ্যাং কালচার গড়ে ওঠার পেছনে আরেকটি বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করে স্থানীয় রাজনৈতিক কিছু ‘বড় ভাই’। এই স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে বা মিছিল-মিটিংয়ে লোক বাড়াতে কিশোরদের ব্যবহার করে এবং তাদের আইনি সুরক্ষা দেয়ার লোভ দেখিয়ে অপরাধের পথে ঠেলে দেয়। একই সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও সোশ্যাল মিডিয়া। টিকটক, লাইকি বা বিভিন্ন অনলাইন গেমসের মাধ্যমে সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ এবং ইন্টারনেটে সহিংসতা দেখে তারা বাস্তবেও তার অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এর ওপর মাদকের সহজলভ্যতা কিশোরদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, কারণ নেশার টাকা জোগাড় করতেই তারা প্রথম দিকে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নামছে। কিশোর গ্যাং কালচার আমাদের সামগ্রিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে এবং দেশের মেধার অপচয় ঘটাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি এই তরুণরা যখন পড়ালেখা ছেড়ে অপরাধের খাতায় নাম লেখায়, তখন দেশ এক বিশাল দক্ষ জনশক্তি হারায়। এর ফলে সমাজে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, যার কারণে সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পায়। পাড়া-মহল্লায় এই ভয়ের সংস্কৃতি সুস্থ তরুণদের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার দেখে অন্য সাধারণ কিশোরদের মধ্যেও আইন অমান্য করা, বড়দের অসম্মান করা এবং দ্রুত ও অনৈতিক উপায়ে টাকা আয়ের ভুল মানসিকতা বা নৈতিক অবক্ষয় তৈরি হচ্ছে। এই কিশোর অপরাধ কেবল তরুণদেরই ধ্বংস করছে না, বরং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। চুরি, ছিনতাই এবং তুচ্ছ কারণে খুনের ঘটনা প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের শিরোনাম হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত এদের গ্রেপ্তার করলেও মূল শেকড় উপড়ানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এদের পেছনে থাকা গডফাদাররা অধরাই থেকে যায়। একটি দেশের তরুণ সমাজ যদি এভাবে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে সেই রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এ-জাতীয় ব্যাধি থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত ও বহুমুখী উদ্যোগ প্রয়োজন, যার সূচনা হতে হবে পরিবার থেকে। মা-বাবাকে সন্তানের প্রতি আরও বন্ধুসুলভ হতে হবে এবং সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে বা ইন্টারনেটে কী দেখছে—সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি এলাকায় কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা সুস্থ বিনোদনের সুযোগ পায়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি সন্তানকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে শেখাবে। একই সাথে কিশোরদের যারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে, সেই সব তথাকথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোরও উচিত কিশোরদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বন্ধ করা। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কিশোর অপরাধীদের সাধারণ জেলে না রেখে কিশোর উন্নয়ন বা সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সেখানে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। তরুণ প্রজন্ম একটি দেশের স্বপ্ন, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিশোর গ্যাংয়ের মতো একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি এই বিপুল সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে না। এটি কেবল আইন প্রয়োগ করে বা জোরপূর্বক দমন করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক আন্দোলন। সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজ যদি একযোগে কাজ করে কিশোরদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবেই আমাদের তরুণ প্রজন্ম এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরে আসবে এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে অবদান রাখতে পারবে।
বয়সটা নিতান্তই বাল্যকাল। শখের প্রিয় টেপা পুতুলঘোড়ার খেলনাগুলো এক পাশে রেখে যখন থার্মোমিটার, রক্তচাপ মান যন্ত্রাংশের স্পর্শতা পেয়েছিল, ঢের বুঝেছিলাম একদিন সু-বিশালতার আদর্শ সেবিকা হব। হঠাৎ অগোচরে বাবার শরীর কাঁপুনিতে জ্বরের আগমনী বার্তা। মনের উদ্দীপ্ত একাগ্রতা চিত্তের আকুলতায় সেবিকা আদর্শে স্পর্শ ছোঁয়ায় অনবদ্য মাধুর্যতা। স্নিগ্ধতায় মস্তকে হাত বুলিয়ে বাবার পরশমণির মৃদু হাসির আড়ালে এক উচ্চারিত প্রতিধ্বনি, “অনেক বড় হও মা। সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার আলোয় আলোকিত করো প্রতিটি জীবের শুদ্ধতার পবিত্র অন্তর।” এই উচ্চারিত প্রতিধ্বনি কেবল এক নিচ্ছুক শব্দ নয়, জীবনবৃত্তান্তে বেড়ে ওঠা স্বপ্ন পূরণের বহিঃপ্রকাশ। বাংলার সবুজ দিগন্তে প্রকৃতির নিবিড়য়তায় স্বপ্নগুলো আমার একান্তই সঙ্গী। সন্ধ্যা আঁধারে ঝিঁঝি পোকার আলোই বয়ে চলা নিঃসঙ্গতা নদীপথ। নিদ্রা যাপনে কল্পনার জগৎ ভাবে ভাবান্তর অতুলনীয় স্বপ্ননীল সুন্দর। কালবেলার দ্বিখণ্ডিত পর্বে শতাব্দীর অবসান। কত শত জীবন্ত মরুভূমি প্রান্তরে অলীক চিন্তার মোড়কে স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার। স্বপ্নসিঁড়ির যাত্রাপথে শহরতলির অভিশপ্ত নগরী আমার আবাসস্থল। ইট-পাথরের শহর গলিপথে অসহায়ত্বের শান্তিনিকেতনে আমার দিবালয় মিশনারি হাসপাতাল। সমুদ্রের কিনারে সূর্যাস্তে ঢলে পড়া ক্লান্ত সন্ধ্যায় মুঠোফোনের ওপাশ থেকে এক শুভেচ্ছা বার্তা। এই তো এখানে জায়গা আছে। হৃদয়ের সুপ্ত গভীরতায় যে স্বপ্ন বুনেছিলাম, তার প্রতিটি অপেক্ষা পূরণের ব্যাকুলতায় সীমাহীন আনন্দ অভিমান। পাখিডাকা ভোরের উষ্ণ শীতলতায় ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার। হাসপাতালের প্রতিটি ইট, ধূলিকণা যেন এক নির্বাক বাঁচার আকুতি। কিছু মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিলাম বিষাদ সিন্ধুর একাকিত্বে। হঠাৎ দরজায় কড়া নেড়ে রুক্ষ মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে এক জীবন্ত সেবিকা। বিষণ্ন বাতাসে মৃদু হেসে বলিয়া উঠিল, “তোমার ডিউটি ওয়ান জিরো ফোর অপারেশন থিয়েটার রুম।” বেস্ট রঙের যুগলবন্দী পোশাকের ঘ্রাণের মাধুর্যতা আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় বহমান। মুহূর্তেই এক দুঃখবিলাসী জীবনের কাতরতায় অভাগীর অনুপ্রবেশ। বাঁচার আকুতি এবং সেবা গ্রহণের প্রতীক্ষায়। আগ্রহ বাড়িয়ে হৃদয়স্পর্শী সেবা দানে সমাপ্ত হইল তাহার নিকট আমার প্রথম সেবার আত্মনিবেদন।
নিদ্রাহীন রাতের ভার মাঝে মাঝেই আমাকে ভোরের নিঃশব্দ আহ্বানে টেনে নেয় লেকের পাড়ে। রাত জাগা ছিল আমার অবসর। তবু ভোরের নির্মল হাওয়া, গুরুজনদের বাচ্য, হাজার টাকার দাওয়া! লেকের ধারে নিঃশব্দ হেঁটে চলা, সেও তো আমার প্রাপ্য। তন্দ্রা পেরিয়েও প্রত্যুষের শান্তি আমি কি একটু নিতে পারি না? উত্তর পেয়েছি, পারি। তাই চরণ ফেলি লেকের উদ্দেশে। আর সে, তাকে প্রথম দেখি এক ভোরে। লেকের পাশে নির্জন রাস্তায় ধীরপায়ে হেঁটে যাচ্ছিল। চোখে ঘুমের চিহ্ন ছিল না, আমার মতোই। তবে সে নিশাচর নয়। মনে হচ্ছিল না, সে নিয়মিত জাগরণে অভ্যস্ত একজন। তার চোখে আমি যা দেখছিলাম, তা ভয়, আকুতি, অভিজ্ঞতা। আমি সচরাচর অপরিচিত পুরুষদের সঙ্গে কথা বলি, বেশিই বলি। তবে যদি বন্ধুত্ব জন্ম নেয়, এটিই ব্যতিক্রম। কিন্তু নারীদের বেলায় সে ব্যতিক্রমও ব্যতিক্রমী, সামান্য বন্ধুত্বে যেটি সম্ভব নয়। সেদিন কেন জানি মনে হয়েছিল, কিছু ভেঙেছে নিজের মাথার ওপর। নিদ্রাহীনতায় নয়, বোধে। তাই অজান্তেই কাছে এসে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রোজ হাঁটেন? সে মাথা নাড়াল। হ্যাঁ কি না, বুঝে উঠতে পারিনি। আমি যে সত্যিই বুঝিনি, সেটা সে বুঝতে পেরেছিল। একরাশ নীরবতা তার মুখাবয়বে। নীরবতা চিরে হঠাৎ বেরিয়ে এল একটি বাক্য, “ওরা আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল।” সকালবেলার ধোঁয়াটে আলো আর নিঃশব্দ হাওয়ার ভেতর একটি মলিন মুখ উচ্চারণ করল এক অতলস্পর্শী বাক্য, যা মুহূর্তে নাড়িয়ে দিল আমার ভেতর। তখনই বুঝলাম, সে কেবল আর পাঁচজনের মতো নয়, সত্যিই অনন্য। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। বললাম, কীসের থামিয়ে দেয়া? কে থামিয়ে দিল? কীভাবে থামিয়ে দিল? সে বলল, “অনিচ্ছাতে।” আমি আইন পড়ি। তাই ‘অনিচ্ছা’ শব্দটি অন্তত বোধ হয় কিছুটা ভিন্নভাবে বুঝি। আইনের পরিভাষা নয়, বরং আমার ফিলোসফি এটিই বলে, যেখানে ইচ্ছা থাকে বাদিনীর, সেখানে অনিচ্ছা জন্ম দেয় প্রতিরোধের, প্রতিকারের দাবিতে। যার চোখে আমি দেখছিলাম একরাশ ঘন অন্ধকার। যেন সে নিজের শরীর ছেড়ে বহুদূরের কোনো শূন্যতায় বাস করে। সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এত সকালে এখানে! রাতের অন্ধকারের ভাব কাটেনি ঠিকমতো। আপনার ভয় করে না? সে মাটির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “ভয় নয়। আমার মনে হচ্ছে, আমি লজ্জা নিয়ে জন্মাইনি। তবু এই সমাজ আমাকে লজ্জা শিখিয়েছে, স্বাভাবিকভাবে নয়, ভিন্নতায়। আমি নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। কিছু বলার ছিল না, কিছু বোঝার ভাষা ছিল না। কিন্তু আমার চোখ যে তাকে সাহস দিচ্ছিল, সেটি সে বুঝেছে। সে বলতে থাকে, “কাল রাত নামছিল। আমি ফিরছিলাম। তিনজন... পরিচিত মুখ, চেনা হাসি, বিকৃত রসনা। তারপরের অংশ মনে রাখতে চাই না। আর তারা বলেছিল, কাউকে বলবি না। কেউ বিশ্বাস করবে না তোকে।” আমি বুঝেছিলাম, সে শিকার হয়েছে। জানোয়াররা শিকার করে বেঁচে থাকার জন্য, আর মানুষ নামের জানোয়াররা শিকার করে কাউকে ভেঙে দেয়ার জন্য। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মায়াবিনী। অথচ সমাজের চোখে সে এখন আর ‘মানুষ’ নেই। শোনা মাত্র হয়ে যাবে এটি একটা ঘটনা, একটা খবর, একটা গল্প। সেই গল্পে আসবে মেয়েটির দোষ। সে লজ্জা শেখেনি। ছেলেদের স্পৃহা কি স্বাভাবিক নয়? এই তো নিয়ম। যখন মেয়েটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল, চোখে, মুখে, মনে, ঠিক তখনই কয়েকজন ছেলে সামনে এসে দাঁড়াল। চোখেমুখে তাদের কৌতূহল, কথায় দায়িত্বের ছায়া, অথচ ভেতরে অন্য কিছু। এই জায়গায় কী করছেন? ওনাকে চিনেন? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি? প্রথমে মনে হলো, ওরা বুঝি সাহায্য করতে এসেছে। কিন্তু না। সাহায্যের আড়ালে ছিল স্পষ্ট এক হিসাব। তাদের চোখ বলছিল, “এই মেয়ের মুখ মলিনতার ভারে আচ্ছন্ন। ভালো সুযোগ। এখন কিছু দিলে আমরা পাই, নাহয় কিছু বানিয়ে বলি, ভয় দেখাই।” এমনই হয় আজকাল। একটা মেয়ের মলিনতা শুকায়নি, আর কিছু মুখ হাসি লুকিয়ে ভাবছে, কীভাবে মুনাফা করা যায়? কেউ মুনাফা তো চায়, কিন্তু শরীরের মুনাফা কোন হিসাব? যেটিও হয় মাঝেমধ্যে। আবার কেউ শুধু ক্ষমতার অনুভূতি নিয়ে বাঁচে, এমন অনুভূতি যে, পুরো আলোকশূন্য। এ এক অদ্ভুত সময়ের মুখোমুখি আমরা। যেখানে যুবসমাজের বড় একটি অংশ ক্ষমতা বলতে বোঝে ভয়কে পুঁজি করে নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। পাশে কেউ দুর্বল থাকলে হয়ে ওঠে ঠিক সুযোগের সমানুপাতিক সমীকরণ। আর কোনো মেয়ে একা থাকলে তাদের মানসিকতায় হঠাৎ বদল ঘটে। ভদ্র মুখোশের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে হিংস্র চোখ, বিকৃত হাসি, আর বিকল বিবেক। এ কেমন ক্ষমতা? যা সৃষ্টির নয়, বরং চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়ার। যা বাঁচাতে নয়, শাসাতে চায়। যেখানে প্রভাব মানেই আরেকজনকে ভয় পাইয়ে রাখা। সে ভালো হোক, মন্দ হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। দরকার কেবল একপাক্ষিক শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতি। এই প্রজন্মের একাংশ যেন ভুলে যেতে বসেছে, মানুষের মাঝে শ্রদ্ধা জন্মায় সমবেদনায়, শোষণে নয়। তবু তারা চায়, তাদের কালোতে অন্যরা অন্ধ থাকুক, আলোতে নয়। এই ছেলেরাই একসময় রূপ নেয় সম্মতিহীনতার শিকারি হিসেবে। শুরুটা হয় নীরব চাহনিতে, অনুমতির অনুপস্থিতি উপেক্ষা করে এগিয়ে যায় স্পর্শে। তারপর ধীরে ধীরে তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে অসম্মতির খেলায়। কখনো মুখোশ পরে আসে সহানুভূতির নামে। আসে ‘ভ্রাতৃত্ব’ হয়ে, তার পরই খোঁজে ফাঁকফোকর, একটি মুহূর্ত, যেখানে মেয়ে একা, প্রতিবাদ দুর্বল, অথবা সমাজ নীরব। এই আলোকবর্জিত প্রাণীরা দূর কোনো অরণ্যের নেকড়ে নয়। তারা আমাদের চেনা ভিড়েই মিশে থাকে। মানুষের আড়ালে, চায়ের কাপে কিংবা ঠোঁট ছোঁয়ায়। এসব ভাবছি, আর মেয়েটির মুখের দিকে তাকাচ্ছি। ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ আমার মনের সঙ্গে কথা বলছে। যেন বলছে, সে বিচার চায় না, সে বদল চায়। কামনার দস্যুদের শাস্তি হোক, হোক আইনরক্ষার কঠোর প্রয়োগ। তবু তা যথেষ্ট নয়, যদি এই সমাজের মনোবৃত্তিই অপরিবর্তিত থাকে। তার চোখে আমি খুঁজে পাইনি প্রতিশোধের আগুন। বরং ছিল এক ক্লান্ত যন্ত্রণার রেশ। যা আত্মচিৎকার করে বলছে, ‘বিচার নয়, আগে বদলাও মানুষগুলোকে। কারণ ধ্বংসের আগেও জন্ম নেয় অপচেতনা।’ আমি বুঝলাম, এই অপরাধের গোড়ায় কেবল একেকজন ধর্ষক নয়, আছে একটি প্রজন্ম, যা শেখেনি সম্মতি, শিখেছে শুধু দখল। যাদের নৈতিকতা তৈরি হয়ে ওঠেনি ভালোবাসায়, বরং গেঁথে গেছে ক্ষমতার বিকৃত বোধে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, বিচার আদালতের বিষয়। কিন্তু পরিবর্তন? তা আমাদের ঘরে। যার জন্ম রক্তে, শিক্ষায়, নৈতিকতায়।
সূর্যদয়ের দেশ ও নান্দনিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বলে খ্যাত জাপানের রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে জাপানি জীবনধারা আকৃষ্ট করে আসছে বিশ্ববাসীকে। একটা জাতির সংস্কৃতি ও মানসের গভীরে যেতে হলে আগে জানতে হবে তার সাহিত্যভাণ্ডার সম্পর্কে; জাপানি সাহিত্যের উৎপত্তি ও বিকাশ বেশ চমকপ্রদ। সেই প্রাচীন যুগ থেকে বর্তমানে পদার্পণের ইতিহাস চলুন জেনে নেয়া যাক। জাপানি সাহিত্যের শুরুটা ছিল চৈনিক ভাষা ও সংস্কৃতি দ্বারা ব্যাপক প্রভাবিত, নিজস্ব লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত মৌখিকভাবেই টিকে ছিল তাদের সাহিত্যচর্চা। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে প্রথম নিদর্শন পাওয়া যায় লিপিবদ্ধ জাপানি সাহিত্যের। সেগুলো লেখা হয়েছিল চৈনিক লিপি ব্যবহার করে। ‘কোজিকি’ (৭১২) ও ‘নিহন শোকি’ (৭২০): তৎকালীন শাসকদের নির্দেশে বিভিন্ন দাপ্তরিক তথ্য, লোককাহিনি, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও দেব-দেবীর কাহিনি সেগুলোতে বর্ণিত হয়। এ যুগ জাপানি ভাষা ও সাহিত্যের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ; জাপানি হরফ ‘কানা’ উদ্ভাবিত হয় এ যুগেই। নিজস্ব ভাষায় তারা আরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাহিত্যচর্চা করার সক্ষমতা লাভ করে। কিয়োটোর দরবার ধীরে ধীরে পরিণত হতে থাকে শিল্প ও সাহিত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে। নারীরা তখন খুব একটা স্বাধীন ছিলেন না; পর্দার আড়ালেই তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করতে হতো। নারীদের চৈনিক ভাষা শেখার ওপরও ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। তাই তারা ‘কানা’ ব্যবহার করে রচনা করতে শুরু করেন একের পর এক কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। ‘মুরাসাকি শিকিবু’ লিখেছিলেন বিশ্বের প্রথম উপন্যাস ‘গেঞ্জি মনোগাতারি’। এ ছাড়া ‘সেই শোনাগন’ রচনা করেন ‘মাকুরা নো শোশি’। এ যুগেই প্রচলন ঘটে দিনলিপির; নারীরাই মূলত সাহিত্যচর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন হেইয়ান যুগে। মধ্যযুগীয় জাপান যুদ্ধ আর বিদ্রোহে পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার আর সামুরাই শ্রেণির উত্থান জাতীয় থেকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বলা বাহুল্য, সাহিত্যেও তার উপস্থিতি লক্ষণীয়। এ যুগের লেখকগণ ধর্মচিন্তা, মানবজীবনের স্বল্পতা, সরলতা আর আধ্যাত্মিকতা নিয়ে বহু সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন। মধ্যযুগের সবচেয়ে আলোচিত সাহিত্যকর্ম হলো ‘হেইকি মনোগাতারি’, ১২ শতকে তাইরা এবং মিনামতো গোত্রের মধ্যে সংঘটিত ‘গেম্পেই যুদ্ধ’ এই দীর্ঘ কবিতা সংকলনের মুখ্য বিষয়। শোবোগেঞ্জো এই যুগে লিখিত প্রথম বৌদ্ধ ধর্মসংক্রান্ত গ্রন্থ। ‘রেঙ্গা’ নামক নতুন একধরনের কবিতারূপ প্রকাশ পায় এই যুগে। এর আক্ষরিক অর্থ হলো সংযুক্ত স্তবক। একাধিক কবি ঐক্যবদ্ধভাবে একটি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেন; প্রথম কবি ৫-৭-৫ অক্ষরের একটি স্তবক লেখেন, দ্বিতীয় কবি ৭-৭ অক্ষরের আরেকটি স্তবক সেটিতে যুক্ত করেন। এভাবেই পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে রচিত হয় একটি দীর্ঘ কবিতা। ‘নোহ নাট্য’ নামক সংগীত, নৃত্য ও অভিনয়ের সমন্বয়ে একধরনের থিয়েটারও খুব জনপ্রিয়তা পায় মধ্যযুগে। সর্বোপরি জাপানিরা উৎসাহিত হয়ে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করে এ সময়ে। শেকিগাহার যুদ্ধে জয়ী হয়ে তকুগাওয়া লিয়াশু, জাপান সম্রাট গো-ইয়োজেই-এর কাছ থেকে গ্রহণ করেন ‘শোগান’ পদবি, আর এভাবেই সূচনা হয় এঁদো যুগের। জাপান দীর্ঘকাল পর শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরে পায় এঁদো যুগে। বর্তমান টোকিও শহরের পূর্বনাম ছিল এঁদো। মানুষজন শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয় এবং সাহিত্য পৌঁছে যেতে থাকে সর্বসাধারণের হাতে। শিক্ষিত সমাজে পুরোদমে সাহিত্যসংক্রান্ত চিন্তাধারা বিকশিত হতে থাকে। ‘হাইকু’ একধরনের ছন্দহীন ক্ষুদ্র কাব্যরূপ, মোট তিনটি চরণে ১৭টি অক্ষরের সমন্বয়ে যা রচনা করা হয় (৫-৭-৫ অক্ষর বিন্যাসে)। মাতসুয়ো বাশো হাইকুকে সংস্কার করে আধুনিক রূপ দান করেন। তাঁর কবিতায় গভীর আবেগ ও অনুভূতি খুব সরলভাবে প্রকাশ পায়। এ যুগের রচনা বেশ প্রাণবন্ত এবং রসাত্মক। বিখ্যাত রচনার মধ্যে আছে কো শোকু ইচিদাই অতোকো, কো শোকু গেনিন অন্না, অকু নো হসোমিচি ইত্যাদি। জাপানে মেইজি সংস্কারকালকে আধুনিক যুগের গোড়াপত্তন হিসেবে গণ্য করা হয়। সম্রাট মেইজির নামে নামকরণ করা হয় সেই যুগকে। জাপানি সাহিত্য তত দিনের সীমান্ত পেরিয়ে আমদানি করেছিল নতুন নতুন উপাদান। বিশেষ করে পশ্চিমা সাহিত্যের ছোঁয়ায় নতুন করে উজ্জীবিত হয় জাপানি সাহিত্য। ইউরোপীয় নানান ধ্যান-ধারণা ও মতবাদ প্রকাশ পেতে থাকে সেই যুগের লেখকদের কলমে। কবিতা যে রকম নতুন সাজে সজ্জিত হয়েছিল, তেমনি গদ্য সাহিত্যেও এসেছিল লক্ষণীয় পরিবর্তন। ১৯২০–৩০-এর দশকে প্রলেতারিয়েত সাহিত্য আন্দোলন গতি লাভ করে। তাকেজি কোবায়াশি ও ইউরিকো মিয়ামতো শ্রমিক শ্রেণি ও নারীদের নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছিলেন। বিশেষ করে এই যুগে নাতসুমে সসেকি আধুনিক জাপানি গদ্যের প্রচলন ঘটান। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হচ্ছে কোকোরো, বতচান, আই অ্যাম আ ক্যাট ইত্যাদি। এ ছাড়া মোরি ওগাই, আকুতাগাওয়া রিউনোসুকে প্রমুখ এই যুগে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করেন। যুদ্ধোত্তর জাপানি সাহিত্য পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে যেতে শুরু করল। বহু রথী-মহারথী লেখকগণ আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করলেন। কবিতা বা পদ্যকে ছাড়িয়ে গদ্য তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে এই যুগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ গভীরভাবে জাপানি জনজীবনের ছাপ রেখে গিয়েছিল; পৃথিবীর ইতিহাসে সেবারই প্রথম পারমাণবিক হামলা হয়েছিল কোনো দেশে। অগণিত লাশ আর ক্ষতবিক্ষত মানস নিয়ে যখন কলম ধরা হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সব ক্ষত উঠে আসে লেখার মাধ্যমে। ওসামু দাজাই, কেনজাবুরো ওয়ে, ইউকিও মিশিমা, হারুকি মুরাকামি—তাঁদের রচনায় বহুবার এসব দুঃস্বপ্নের স্মৃতিচারণা করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনজন জাপানি নাগরিক সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন: ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা, কেনজাবুরো ওয়ে ও কাজুয়ো ইশিগুরো। নোবেল পাওয়ার যোগ্য অনেক লেখক এখনো সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত আছেন, তার মধ্যে হারুকি মুরাকামির নাম বহুল চর্চিত। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে জাপানি সাহিত্যের বহুল আলোচিত সংযোজন হলো মাঙ্গা। পশ্চিমা কমিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সাদা-কালো একধরনের স্বতন্ত্র কমিক হলো মাঙ্গা—জাপানি প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কাছে যা সোনার খনি। পশ্চিমা কমিক থেকে ভিন্ন এই সাহিত্যরূপ কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে অবিশ্বাস্য রকমের জনপ্রিয়। কোনো কোনো মাঙ্গা ১০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে; ওয়ান পিস নামক একটি মাঙ্গা আজ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি কপি বিক্রি হয়েছে সারা বিশ্বে। অনেক সাহিত্যবিশারদ মাঙ্গাকে সাহিত্যের অংশ হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। উপসংহারে এটুকু বলা যায়, জাপানি সাহিত্যের ইতিহাস সত্যিই চমকপ্রদ। সেই প্রাচীন আমল থেকে বর্তমান যুগ, অনেক চড়াই-উতরাই পার করে টিকে আছে স্বগৌরবে। সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে সীমাবদ্ধ নয়; সকল সাহিত্যপ্রেমীর কাছে তা একান্তই আপন ও নিজস্ব। আজ সারা বিশ্বে জাপানি সাহিত্যের লাখ লাখ অনুরাগী রয়েছেন, তাঁদের মাধ্যমে চর্চিত, আলোচিত এবং প্রশংসিত হচ্ছে নিত্যদিন। এই সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার টিকে থাকুক সহস্র বছর, পৃথিবী আলোকিত হোক জ্ঞানের আলোয়।
নদীর বাঁকে, হাওরের জলে, ধানের শীষে, তাঁতের খটখটে শব্দে কিংবা কুমোরের চাকার ঘূর্ণনে—বাংলার মানুষ প্রতিদিন নিজের অজান্তেই রচনা করেছে এক মহাকাব্যিক শিল্পভাষা। সেই ভাষার নাম লোকায়ত সংস্কৃতি। প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পচর্চার বহু আগে মানুষ অনুভূতি প্রকাশের পথ খুঁজেছে প্রকৃতি ও জীবনসংগ্রাম থেকে। ভাটির নদীমাতৃক জীবনের উদাসীনতায় জন্ম নিয়েছে ভাটিয়ালি, উত্তরবঙ্গের গাড়িয়ালের বিরহ ও পথচলার স্পন্দনে সুর পেয়েছে ভাওয়াইয়া, আর ফসলের মাঠে গর্ভবতী মাটির বন্দনায় উচ্চারিত হয়েছে ধামাইল। বাউলের একতারায় ধরা দিয়েছে দেহ ও আত্মার জটিল দর্শন; মুর্শিদি ও মারফতি গানে মানুষ খুঁজেছে পরমের সন্ধান। এসব সুরের স্রষ্টারা হয়তো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নন্দনতত্ত্ব জানতেন না, কিন্তু জীবনকে অনুভূতির গভীরতায় দেখার যে ক্ষমতা তাঁদের ছিল, তা তত্ত্বের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়। লোকায়ত বাংলার আরেক বিস্ময় তার নাট্যঐতিহ্য। যাত্রার উচ্চকিত সংলাপ, গম্ভীরার তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, আলকাপের কৌতুক কিংবা পালাগানের দীর্ঘ আখ্যান—প্রতিটি ধারাই নিজস্ব প্রথায় সমাজের সঙ্গে মৌলিক সংলাপ তৈরি করেছে। এখানে কোনো বিলাসী মঞ্চ, আধুনিক আলোকসজ্জা বা কৃত্রিম প্রোপসের প্রয়োজন পড়েনি; মানুষের উপস্থিতি, কণ্ঠের জোর, বডি মেকানিকস ও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সংলাপ রচনার ক্ষমতাই নির্মাণ করেছে এই নাট্যপরিসর। ক্ষমতাবানকে বিদ্রূপ করা, সামাজিক অসংগতি উন্মোচন এবং মানুষের কষ্টকে সম্মিলিত শক্তিতে রূপান্তর করার মধ্য দিয়ে লোকনাট্য হয়ে উঠেছে জনজীবনের এক অনানুষ্ঠানিক ও আপসহীন ভাষ্যকার। নকশিকাঁথার প্রতিটি সেলাইয়ে যে নারী নিজের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের মানচিত্র এঁকেছেন, মাটির পুতুল কিংবা সরাচিত্র গড়তে গড়তে যে কারিগর রূপের নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করেছেন, কিংবা পটচিত্রে কাহিনি বলতে বলতে যে শিল্পী ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন—তাঁদের সৃষ্টিকে নিছক কারুশিল্প বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এসব শিল্পকর্মে ব্যক্তিগত আবেগ ও সমষ্টিগত স্মৃতি এমনভাবে মিশে আছে যে, প্রতিটি বস্তুশিল্পই নিজের সময়ে একেকটি সামাজিক ও ঐতিহাসিক দলিল। তবে লোকবিশ্বাসের ভেতরে যেমন প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক সংহতি রয়েছে, তেমনি কোথাও কোথাও জমাট বেঁধেছে অন্ধ সংস্কার ও বৈষম্যের চিহ্ন। লোকসংস্কৃতির প্রকৃত অনুধাবন সেখানেই, যেখানে উত্তরাধিকারের প্রতি গভীর মমতা বজায় রেখেও যুক্তি ও মানবিকতার আলোয় তার সুস্থ মূল্যায়ন করা যায়। সময়ের পরিবর্তনে লোকায়ত শিল্পের পরিসর বদলাচ্ছে। গ্রামের মেলা সংকুচিত হচ্ছে, অনেক পালাগানের আসর হারিয়ে যাচ্ছে, আর পারিবারিক সূত্রে শিল্প শেখার ধারাও শিথিল হয়ে পড়ছে। কেবল অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করে লোকশিল্প বাঁচানো সম্ভব নয়। লোকশিল্পীর জীবনমান ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আধুনিক ডিজিটাল মাধ্যম ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সাহায্যে নতুন প্রজন্মের কাছে একে পৌঁছে দেয়া এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের বাইরে শিল্পের মূল সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন সময়ের দাবি। লোকায়ত বাংলার আসল শক্তি মানুষের অকৃত্রিম সৃজনশীলতায়, প্রতিকূলতার মধ্যেও আনন্দ নির্মাণের ক্ষমতায় এবং নিজের ভাষায় জগৎকে চেনার স্বাধীনতায়। আধুনিকতার সঙ্গে লোকঐতিহ্যের বিরোধ অনিবার্য নয়; প্রয়োজন এমন এক সৃজনশীল সেতু, যেখানে শেকড়ের গভীরতা নতুন প্রকাশের সাহস জোগাবে। বাংলার লোকসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সেখানেই—যেখানে পুরোনো সুর নতুন কণ্ঠে উচ্চারিত হবে, মাটির শিল্প সমকালীন জীবনের ভাষা খুঁজে পাবে, আর সাধারণ মানুষের সৃষ্টিশীলতাই হবে সংস্কৃতির প্রধান পরিচয়।